পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

এক খণ্ড উপলব্ধি

‘এভাবে জীবন আমি চাইনি

জীবনের মানে খুঁজে পাইনি।’


নিজেকে আজও বুঝতে পারলাম না। কীভাবে জীবন যাপন করলে শুদ্ধতার মাপকাঠি হতে পারে, সেটা না বুঝেই পেরিয়ে এলাম কত দিন, কত মাস, কত বছর। পেছন ফিরে তাকালে ফুটে উঠে কেবলই নিরাশার ছবি। মানুষ হিসেবে আমার যে অনেক খামতি, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? এ জীবনে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা আমার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। অন্তর্মুখী স্বভাব, গুছিয়ে কথা বলতে না পারা আর উচ্চাভিলাষ না থাকাটা আমার অনেক অপূর্ণতার জন্য দায়ী। তা নিয়ে তো আক্ষেপ করে লাভ নেই। আমার যা কিছু খামতি, যা কিছু অপূর্ণতা, যা কিছু অপারগতা তা একান্তই আমার। সেটাকে তো মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। 

তারপরও হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে প্রশ্ন করি, এ কেমন আমি? একটা বলয়ের মধ্যে কেমন বেখাপ্পাভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছি। সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশতে পারি না। মন খুলে সবার সঙ্গে কথা বলতে পারি না। সবার মন জুগিয়ে চলতে পারি না। আমার এ অক্ষমতা আমাকে করে তুলেছে অনালাপী, অমিশুক ও অসামাজিক। এ জীবনে কোনো অবস্থান্তর নেই। কোনো বৈচিত্র্য নেই। কোনো রূপান্তরও নেই। খুবই সাদামাটা, ম্লান ও বিষণ্ন জীবনযাপন। সে নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপও নেই। আমি যার যোগ্য নই, সেটা কেন আমি পেতে চাইবো? 

তবে ভালো কি মন্দ জানি না, আমার একটা দুর্বলতা আছে। যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করি, কথা বলি, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রতি আমার এক ধরনের সফটকর্নার তৈরি হয়ে যায়। আমার গণ্ডি যেহেতু খুব বড় নয়, সীমিত পরিধির এই মানুষগুলোকে আমার একান্তই আপন মনে হয়। এ মানুষগুলোই প্রতিনিয়ত আমার ভাবনার খোরাক হয়ে আসে। তাঁদের ভালো-মন্দ আমাকে উদ্বেলিত করে। আমি হয়তো যথাযথভাবে তা প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। সেটা কেউ হয়তো বুঝতে পারে না। বুঝতে দিতে চাওয়াটাও আমার অভিপ্রায় নয়। জেনে-শুনে কারো ক্ষতি করা কিংবা অনিষ্টর কারণ হওয়ার প্রশ্ন আসে না। আর কখনো-সখনো কোনো কারণে কারো সমালোচনা করলেও গিবত বা কুৎসা রটানো কখনোই আমার পছন্দের বিষয় নয়। তারপরও কখনও যদি এ মানুষগুলোর ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়াই, সেটা আমাকে দারুণভাবে আহত করে। ব্যথিত করে। নিদারুণ কষ্ট দেয়। 

পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে কেউ হোক না কেন, আমাকে দিয়ে যদি তাঁদের কোনো উপকার বা কাজ হয়, যদি আমার সামর্থ্যে কুলোয়, তাহলে আন্তরিকভাবে তা করার চেষ্টা করি। অনেক সময় নিজের কাজটাকে স্থগিত রেখেও করে দেই। বলে রাখা ভালো, আমি এমন কেউকেটা নই যে, কারো বড় কোনো কাজ করে দেওয়ার সামর্থ্য রাখি। আমার সেই ক্ষমতা বা সক্ষমতা নেই। আর তদবির করতে না পারাটা আমার একটা অক্ষমতা। সেটা পারি না বলে অনেক কিছু না পাওয়া রয়ে যায়। আমার চৌহদ্দির মধ্যে যতটা পারি, কাজ করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাতে পারতপক্ষে আমার কোনো কসুর থাকে না। তারপরও যেটুকু ঘাটতি থেকে যায়, তা একান্তই অনিচ্ছাকৃত। আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলেও তারপরও কেন যেন দূরত্বটা রয়ে যায়! নৈকট্যের বন্ধনটা তেমনভাবে গড়ে উঠে না। সম্পর্কটা হয়ে থাকে তেল-জলের মতো।              

একদম নিঃস্বার্থ মানুষ হওয়া অনেক সাধনার ব্যাপার। সমাজ-সংসারে বসবাস করে তেমনটি কার্যত পারা যায় না। আমিও কোনো সাধক পুরুষ নই। আমারও ইচ্ছে আছে। অনিচ্ছে আছে। চাওয়া-পাওয়া আছে। সেটা না থাকাটা খুবই অস্বাভাবিক। আমার যেহেতু বড় কোনো কাজ করে দেওয়ার ক্ষমতা নেই, সঙ্গত কারণেই কারো কাছে খুব বড় কিছু চাওয়ার সাহসও হয় না। তাছাড়া মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু চাওয়া, আমার কাছে জগতের কঠিনতম কাজের একটি মনে হয়। আমার চাওয়াগুলো সাধারণত খুবই ছোট ছোট। এমনকি সেগুলোকে কারো কাছে চাওয়ার মতো কিছু মনে নাও হতে পারে। মজার ব্যাপার, আমার ছোট ছোট এ চাওয়াগুলোও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপূরণীয় রয়ে যায়। যা খুব সহজেই হয়ে যাওয়ার কথা, আমার ক্ষেত্রে তা কেন যেন হয় না। কোথায় যেন একটা বাধা-বিপত্তি এসে পথরোধ করে দাঁড়ায়। বার বার ধাক্কা খেতে খেতে এখন কারও কাছে কিছু অনুরোধ করতেও ভয় লাগে। প্রত্যাখ্যানটা বুকের মধ্যে বড় বেশি ব্যথা হয়ে বাজে। আর যা হোক, উপেক্ষা একদমই সইতে পারি না। 

অনেককে খুবই আপন মনে হয়। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমি তাদের আপন হয়ে উঠতে পারি না। তাদের কারো কারো মিষ্টি হাসি, মিঠা মিঠা মন রাখা কথা ও ‘আন্তরিক’ ব্যবহারে আমি সহজেই পটে যাই। মনে হয়, এঁরা আমার কত কাছের। আমার আপদে, বিপদে নিশ্চয়ই এ মানুষগুলো বাড়িয়ে দেবেন সহযোগিতার নির্ভরযোগ্য হাত। যদিও এমন প্রত্যাশা আমার সঙ্গে খাপ খায় না। তবে আর কিছু না হলেও আন্তরিক সহানুভূতিটুকু পাওয়ার আশা তো করতেই পারি। কিন্তু ঘটনাচক্রে তাদের নেতিবাচক মনোভাবটা যখন টের পেয়ে যাই, তখন কী যে কষ্ট হয়, বোঝাতে পারবো না। মুখে এক, অন্তরে আরেক, এমন দ্বিচারিতা আমি একদমই মেনে নিতে পারি না। মিথ্যের কুহক দিয়ে কেউ যখন আমাকে ভোলাতে চায়, তখনও খুব করুণা হয়। আমার বোধ-বুদ্ধি মোটেও শাণিত নয়, এটা স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই। কিন্তু যখন কেউ আমাকে ‘শিশু’ মনে করে অনেক বেশি চালাকি করেন, তখন নিজেই লজ্জা পেয়ে যাই। কারো কাছে আমার খুব বেশি চাওয়ার নেই। তবে কেউ ভালো না বাসুক, অন্তত বিনা কারণে আমাকে যেন অবহেলা না করেন, এটা আমার চিরদিনের চাওয়া। সেই চাওয়ার হিসেব কেন যেন মেলে না। 

তবে এটাও তো ঠিক, অযাচিতভাবে কারো কারো সহানুভূতি ও সহযোগিতা পেয়েছি। সেই পাওয়াগুলো আমার সঞ্চয়ের খাতায় মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে। এ ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। তবে তেমনটা হয়ে থাকে কালেভদ্রে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোক দেখানো সহানুভূতি পেলেও আনুকূল্য ও সহযোগিতা পাওয়া হয় না। এমনকি অকারণে ভিতরে ভিতরে একটা অনাদর, এক রকম অবহেলা, এক ধরনের তাচ্ছিল্য অনুধাবন করতে পারি। কেন এমনটি হয়, সেটার যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পাই না। 

ঠিক বুঝতে পারি না, আমি কেন সবার আপন হতে পারি না? নাকি আমাকে কেউ আপন ভাবতে পারেন না। কেন পারি না বা কেন পারে না, সে রহস্য আজও উদ্ঘাটন করতে পারলাম না। কোথায় যে আমার অপূর্ণাঙ্গতা ও অসম্পূর্ণতা এটা খুবই জানতে ইচ্ছে করে। জানতে পারলে জীবনের ভুলগুলি শুধরে নেওয়ার অন্তত চেষ্টা তো করতে পারতাম। 

আচ্ছা, সবার সঙ্গে আপন হতে না পারার যে অক্ষমতা, তারসঙ্গে ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন