পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

পরিবেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
পরিবেশ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

ভয়ের বিপরীতে অভয়

 


মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী। কবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের ভাষায়, ‘জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কথা কবে’। কার, কখন, কোথায়, কীভাবে মৃত্যু হবে, সেটা তো কারো পক্ষে আগাম বলা বা জানা সম্ভব নয়। যে কারণে মৃত্যুর জন্য একটা প্রস্তুতি ভিতরে ভিতরে থাকেই। হঠাৎ আসা মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনো সুযোগও থাকে না। আহাজারি যেটুকু হয়, তা কেবল স্বজনদের। তা তো দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। কিন্তু মৃত্যুর আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা কী যে দুঃসহ যন্ত্রণার, সেটা বিশ্ববাসী পলে পলে অনুভব করছেন। মৃত্যুর নিরন্তর ফিসফিসানি বুকের মাঝে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। আততায়ীর মতো করোনাভাইরাস প্রতি মুহুর্তে আমাদের অনুসরণ করছে। না জেনে ভাইরাসবাহিত কোথাও স্পর্শ করলে, ভাইরাসবহনকারী কারো সংস্পর্শে গেলে অমনি যে কাউকেই চুম্বক লোহার মতো খপ করে ধরে ফেলতে একটুও দ্বিধা করছে না। এ যেন গ্রিক পুরাণের সেই ‘মিডাস টাচ’। লোভী রাজা মিডাস যা কিছু স্পর্শ করেন, তা সোনা হয়ে যায়। নিজের প্রিয় কন্যাও যখন স্বর্ণপিণ্ড হয়ে যায়, তখন তার হুঁশ হয়। রাজা তো লোভের কারণে এমন বর চেয়েছিলেন। দুনিয়ার মানুষ তো ‘করোনা টাচ’ চায়নি। তাহলে এমন হচ্ছে কেন? করোনা ধরলেই যে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলছে, তা অবশ্য নয়। ভয় দেখিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আধমরা করে ফেলছে। আর মারলেও কিছুটা করুণা তো করছে। দয়াপরবশত হয়ে মারার আগে লড়াই করার একটা সুযোগ দিচ্ছে। বাঁচা-মরা অনেকটা নির্ভর করছে প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যার শক্তি, সাহস ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, সে জিতে যাচ্ছে। প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন নিজের থাকতে হবে, তেমনিভাবে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর তা অনেকটা নির্ভরশীল। 

এ রোগের সংক্রমণ হওয়ার যে কৌশল, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। যে ইউরোপ-আমেরিকাকে আমরা সভ্যতার মানদণ্ড হিসেবে নির্ভর করে এসেছি, ভরসা করে এসেছি, মান্য করে এসেছি, করোনাভাইরাস যেভাবে তাদের রীতিমতো ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে, তা কোনো হিসেবেই মিলছে না। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। এখন অব্দি এটা থামানোর কোনো ওষুধ নেই। কোনো প্রতিকার নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এটা কোথায় গিয়ে থামবে, তার নিশ্চয়তা তো দূরে থাক, ঘুণাক্ষরে আঁচ করাও যাচ্ছে না। এটি এমন একটি রোগ, কেউ কাউকে সাহায্য করতে গেলেও আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি একটি দেশ অন্য কোনো দেশকে যে সাহায্য বা সহযোগিতা করবে, সে অবস্থাও নেই। বরং কে কতটা দূরত্ব গড়ে তুলতে পারে, সেটাই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার জিয়নকাঠি। এরচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

আর আমাদের মতো ঘনবসতির দেশে এর পরিণতির কথা চিন্তা করে অনেকের ঘুমই হারাম হয়ে গেছে। সেটাই হওয়ার কথা। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যে বৌদ্ধিক মান, জাতীয় অভ্যাস ও অর্থনেতিক অবস্থা, তা এ ধরনের মহামারি সামাল দেওয়ার মতো নয়। অনেকেই এর মর্ম বোঝেন না। যে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকে বুঝলেও বেসামাল আচরণ করেন। মনে করেন, পুরো বাজারটা নিজের বাসায় নিয়ে গেলেই তিনি বা তাঁর পরিবার অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। আবার অনেকে নিজে সচেতন হলেও অন্যকে সচেতন করা কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে সংক্রমণমুক্ত করার ব্যাপারে মোটেও উৎসাহী নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে কোনো সংকটে প্রথমেই আমরা মানবিক ও বিবেচনা বোধটা হারিয়ে ফেলি। অথচ যে কোনো সমস্যায়, সংকটে সবার আগে সেটাই প্রয়োজন।

জানি, ভাইরাসটি খুবই স্বার্থপর ধরনের। একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আপনকেও পর করে দিচ্ছে। তারপরও এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সম্মিলিতভাবে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া করোনাভাইরাসকে ঠেকানো যাবে না। কারণ আপনি-আমি এককভাবে চাইলেও ‘করোনা টাচ’ থেকে দীর্ঘ দিন রেহাই পাওয়া মোটেও সহজ নয়।


করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বরং সর্বত্রই একটা আতঙ্কময় পরিবেশ। মনে হচ্ছে, সবাইকে যত বেশি আতঙ্কিত করা যাবে, তত সুফল পাওয়া যাবে। অনেকেই মহা আনন্দে সেটা করছেন। এ অবস্থা কত দিন অব্যাহত থাকবে, তা তো আমরা জানি না। সেক্ষেত্রে আতঙ্কিত পরিবেশ যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি কি হিতে বিপরীত হয়ে যাবে না? অনেকের পক্ষে এই মানসিক চাপ সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ছে মানসিক রোগ। 

যে কারণে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মৃত্যু উপত্যকা ইতালিতে বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে গান-বাজনা করা হয়। জাগিয়ে তোলা হয় জীবনের স্পন্দন। আমাদের পক্ষে তো সেটা সম্ভব নয়। এমনকি পারবো না জেনিফার হলার হতেও। কিন্তু ভয়ের বিপরীতে অভয়টা জাগিয়ে তোলার মনোভাবটা থাকতে হবে। জ্বালাতে হবে আশার আলো। দূরত্ব বজায় রেখেই গাইতে হবে জীবনের জয়গান ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’।

২১ মার্চ ২০২০

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

অন্তহীন চলার পথ আর মানসিক প্রশান্তি

বুকের মধ্যে একটা মারাত্মক রোগ পুষে রেখে আমি জীবন যাপন করছি। আমার এ রোগটির কথা খুব একটা কেউ জানেন না। আমাকে দেখে সেটি বোঝার উপায়ও নেই। ‘অস্থিরতা’ নামক সেই রোগটি আমাকে কোনো কিছু সুস্থিরভাবে করতে দেয় না। এটা নিয়ে আমি অবশ্য কখনো কোনো চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হইনি। তবে এই রোগটি থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা সহজাত সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। 

আমাকে প্রায়শই বিকেলে বেসরকারি পরিবহনে পল্টন থেকে নাবিস্কো যেতে হয়। এই রুটে কোনো গাড়ি পাওয়া কি যে কঠিন, সে ভুক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব না। টিকিট কেটেও গাড়ি মেলে না। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে যেভাবে গাড়িতে উঠতে হয়, সেটা রীতিমত মল্লযুদ্ধকেও হার মানায়। মল্লযুদ্ধের কিছু নিয়ম-কানুন আছে। এখানে তার কোনো বালাই নেই। বিধ্বস্ত অবস্থায় গাড়িতে উঠার পর দম নিতে বেশ কষ্ট হয়। মুরগি যেভাবে চাপাচাপি করে খাঁচায় বন্দি করে নেওয়া হয়, তারচেয়েও কঠিন অবস্থায় যেতে হয়। বসার তো প্রশ্নই আসে না, দাঁড়িয়ে থাকার পর বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়। একজনের পা আরেকজনের পায়ের ওপরে, একজনের হাত আরেকজনের ঘাড়ে। কুংফু জাতীয় নানা প্যাঁচ তো আছেই। লাগামহীন মন্তব্য না শোনাটা ভাগ্যের ব্যাপার। কারো সাত-পাঁচে না থেকেও শুনতে হতে পারে কটু বাক্য। কখনো-সখনো পরিস্থিতি হয়ে উঠে উত্তপ্ত। 

গাড়ির মধ্যে এত কিছু হয়ে হচ্ছে, গাড়ির কিন্ত কোনো হেলদোল নেই। জায়গা থেকে খুব একটা নড়ে না। কোনো কোনো সময় ইঞ্চি ইঞ্চি মেপে এগুতে থাকে। আবার কোনো কোনো সময় থম্ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। যেন গাড়ির যাত্রী সবাই চলেছে অচিন কোনো পথে। যে পথের কোনো গন্তব্য জানা নেই। সময় জানা নেই। শুধুই অপেক্ষা আর অপেক্ষা। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ব্যথা তো মামুলি ব্যাপার। সারা শরীরও কঁকিয়ে উঠে ব্যথায়। যারা বসে থাকেন, তারাও স্বস্তিতে থাকেন না। কিছুক্ষণ পর পর দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙ্গেন। কতক্ষণ আর চুপচাপ বসে থাকা যায়? গরমে ডিম সিদ্ধ হওয়ার মতো হয়ে যায় সবার অবস্থা। কেউ কেউ সইতে না পেরে গন্তব্য আসার অনেক আগেই নেমে যান। গাড়িতে উঠাটা যত কঠিন, নামাটাও তত সহজ নয়। কেউ যখন নামতে যান, তখন অবশ্য সবাইকে কম-বেশি যোগব্যায়ামের কসরত করতে হয়। 


এই জীবনের সমস্ত সিগনাল পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু মগবাজারের সিগনাল অতিক্রম করা এত সহজ নয়। সেটা করতে পারাটা অনেক পুণ্যির কাজ। অন্তহীন সময় হাতে নিয়ে এখানে অপেক্ষা করতে হয়। এই সিগনালকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জমজমাট ব্যবসা। নানা রকম পানীয়, খাদ্যসামগ্রীর পাশাপাশি কত কিছুই না বেচাকিনি হয়। গরমের দিনে হাতপাখা আর রোজার দিনে ইফতারির চাহিদা অনেক বেশি। সময় বয়ে যেতে থাকে দ্রুত। আকাশে চলতে থাকে মেঘ-রোদের খেলা। সিগনাল বাতিও লাল হয়। হলুদ হয়। সবুজও হয়। সব কিছুর বদল হতে থাকে। কিন্তু গাড়ির সারি অনড়, অটল। কোনো ভাবান্তর নেই। 

একটা সময় অন্তহীন এই অপেক্ষার অবসান ঘটে। মগবাজারের সিগনাল অতিক্রম করার সময় গাড়ি যাত্রীদের মনে পুলসিরাত পেরিয়ে যাওয়ার স্বস্তি দেখা যায়। যেন জীবনে বড় কিছু একটা অর্জন হলো। অর্জন তো বটেই। আমিও তো এই অর্জনের সুফল পাচ্ছি। এই পথ দিয়ে চলাচলের সময় মনের মধ্যে আসে অনেক পরিবর্তন। রাগ-ক্ষোভ-অভিমানগুলো ভিতরে ভিতরে দীর্ণ হতে থাকে। যে আমি একটুতেই অস্থির হয়ে উঠি, সেও ক্রমশ মিইয়ে যেতে থাকি। চিত্তচাঞ্চল্য দূর হয়ে যেতে থাকে। অজান্তেই গুনগুন করে গান গাইতে থাকি, ‘গাড়ি চলে না, চলে না রে, গাড়ি চলে না’। আশপাশের সবাই হয়ত আমাকে পাগল ঠাওরায়। আর আমি মনে মনে বলি, ওম্ শান্তি। ওম্ শান্তি। ওম্ শান্তি। 

একদিন-দু’দিন নয়, দিনের পর দিন এই অবস্থার মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। কী পরিমাণ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও সহ্যশক্তি থাকলে প্রতিদিন এই মর্মযাতনা পলে পলে অনুধাবন করা যায়। জীবনের জটিলতা এড়িয়ে একটু স্থিরতা, একটু স্বস্তির জন্য যোগব্যায়ামসহ কতজনে কত কিছুই করছেন। তাদের এত কিছু করার দরকার নেই। তারা যদি একটু কষ্ট করে একটা দিন পল্টন থেকে নাবিস্কো পর্যন্ত বাসে চলাচল করেন, তাহলে মনের অস্থিরতা একদমই দূর হয়ে যাবে। তারাও আমার মত পাবেন মানসিক শান্তি। তখন হয়ত তারাও একবুক প্রশান্তি নিয়ে নচিকেতার মত বলবেন, ‘অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন‘।

বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

‘এখান তোকে মানাইছে না গো’


আমার চোখের সামনেই ছোট্ট পরিসর থেকে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। পরিণত হয়েছে মেগাসিটিতে। বদলে যাচ্ছে তার বহিরঙ্গ। দিনে দিনে খোলতাই হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রূপ পাচ্ছে। কখনো কখনো চিনতেও ভুল হয়। এটিই আমার শহর কিনা মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে। এ শহরের জাঁক যত বাড়ছে, জমক যত বাড়ছে, ততই যেন জটিল হয়ে উঠছে। একটা সময় খুব সামান্যতেই খুশি হয়ে যেতাম। আনন্দ পেতাম। এখন অনেক বেশি পেয়েও তেমনটি হতে পারছি না। মতিঝিলে নির্মিত প্রথম উঁচু ভবন ‘টয়োটা বিল্ডিং’ দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসতেন। এখন সারি সারি সুউচ্চ হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের আড়ালে পড়ে গেছে একসময়ের দর্শনীয় এ ভবনটি। ফার্মগেটের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ দেখে তাকিয়ে থেকেছি মুগ্ধতা নিয়ে। এখন দীর্ঘ ফ্লাইওভারের ডানায় উড়াল দিতে দিতে ফুটওভার ব্রিজকে খুবই অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। বিশ্বায়নের এ দুনিয়ায় এখন কোনো কিছু আর অবাক করে দেয় না। যে শহরটি ছিল নির্জন ও নিরিবিলি, এখন সেটি হয়ে ওঠেছে জনবহুল ও কোলাহলময়। এভাবে শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের অনেক কিছুই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। হারিয়েও যাচ্ছে জীবন থেকে। তার মাঝে আমিও যেন অনাহুত হয়ে পড়েছি। জন্মের সামান্য পর থেকেই এ শহরেই বসবাস। এখন এ শহরের সঙ্গে একদমই মানিয়ে নিতে পারছি না। না শারীরিক, না মানসিকভাবে। অনেকটাই মিসফিট হয়ে গিয়েছি।


পথের যে ধুলা না মিশলে চটপটি ‘টেস্টি‘ লাগে না, সেই ধুলাবালিতে রীতিমতো কাহিল হয়ে পড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠি। অথচ এ শহরে বসবাস করবো, আর ধুলোবালি থেকে দূরে থাকবো, এটা কি সম্ভব? চারপাশেই উড়ছে বিস্তর ধুলোর রেণু। পুরো শরীর চিটচিট করে। চুলগুলো হয়ে যায় ধূসর পা-ুলিপির মতো। সুস্থ-সবল থাকার জন্য চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেন প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটার জন্য। অবশ্য এমনিতেই না হেঁটে উপায় নেই। একসময় নির্জন এ শহরে একা একা হাঁটতে রীতিমতো ভয় লাগতো। ছিনতাইকারীর ছুরিতে কখন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাই। আর এখন এত এত মানুষের ভিড়ে হাঁটার সুযোগ পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। মানবজটের এ শহরে হাঁটতে গেলে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে। আর ফুটপাথ শব্দের অর্থগত তাৎপর্য তো হারিয়ে গেছে। এটিকে ‘ফুটবাণিজ্য’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সারি সারি দোকানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গেলে সব রকম ধকল সইতে হয়। কখনো-সখনো হতে হয় নাজেহাল। তাছাড়া অধিকাংশ ফুটপাথই তো মসৃণ নয়। নয় চলার উপযোগী। একটুখানি অমনোযোগী বা অন্যমনস্ক হলেই হোঁচট খাওয়া বা আহত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। পিছলেও পড়তে হয়।


যানজট এ শহরের এক চরম দুর্ভোগের নাম। অসহনীয় এ যানজটে ঘণ্টার ঘণ্টার পর গাড়িতে অসহায়ভাবে নিশ্চুপ বসে থাকতে হয় ধ্যানী বকের মতো। সময় বয়ে যায় আপন নিয়মে। গন্তব্যে কখন পৌঁছানো যাবে, কারো জানা থাকে না। হতাশায় দীর্ণ হতে হয়। অস্থিরতা পেয়ে বসে। বেড়ে যায় অসহিষ্ণু আচরণও। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই। সব মিলিয়ে যানজট কেড়ে নিচ্ছে উচ্ছ্বাস, উদ্দাম, প্রাণশক্তি। এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও।
ইদানিং স্মায়ু কেমন যেন বিবশ হয়ে যাচ্ছে। লোপ পাচ্ছে স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে স্মৃতিশক্তি। ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে অনুভূতি। এটা কেন হচ্ছে, সেটা আমরা যেন বুঝতে পারছি না। যে কারণে এ বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের বিপন্ন করে তুলছে গাড়ির তীব্র হর্ন। বিকট শব্দ ভিতরটা এমনভাবে কাঁপিয়ে দেয়, প্রতিটি স্মায়ুকোষ নির্জীব-নিস্তেজ-নিশ্চল হয়ে যায়। আর গাড়ির বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভিতরটা হয়ে যায় কৃষ্ণবর্ণ।  দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি যে একদমই ভালো হয় না, সেটা অন্তত অনুভব করছি পলে পলে। বাস্তব অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, হর্ন না বাজালে কারো মেজাজ ভালো থাকে না। আবার হর্ন না শুনলে অনেকেরই বোধকরি ভালো লাগে না। যে কারণে সামগ্রিকভাবে এ নিয়ে খুব একটা হেলদোল দেখা যায় না।
কোথাও একটুখানি জিরিয়ে নেওয়া কিংবা খোলা প্রান্তরে মুক্ত হাওয়া সেবন করা, অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে ওঠেছে। সবুজ প্রকৃতি তো দূরে থাকুক, এ শহরে কোনো গাছের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই পাখির কলকাকলি শোনা যায় না। আর খোলা মাঠ, খোলা প্রান্তর এখন যেন বিলাসিতার বিষয়। বরং পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে চিকিৎসালয়। যেন চিকিৎসাধীন থাকাটা আমাদের বিধিলিপি। এটাই হয়ে ওঠেছে আমাদের বড় বিনোদন। চিকিৎসকের কাছে ধন্না না দিলে আমাদের ভালো লাগে না। কে কত বড় চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, কে কত বড় চিকিৎসালয়ে যাচ্ছেন, সেটাই হয়ে ওঠেছে স্ট্যাটাস সিম্বল।


আমার মতো যাঁদের পাবলিক পরিবহনে চলতে হয়, তাঁদের যে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়! কোনো কোনো গাড়ির অবয়ব ও অবকাঠামো দেখলেই মনে হয় প্রাচীন কোনো জাদুঘর থেকে তুলে এনে প্রদর্শনীর জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিতরের জীর্ণ-শীর্ণ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা। বসতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার। বসতে পারলেও চেপেচুপে এমনভাবে বসতে হয়, তাতে স্বস্তিটুকু উবে যায়। একবার বসলে সহজে আর বের হওয়া যায় না। কন্ডাক্টর আর ড্রাইভারের জমিদারি মেজাজ-মর্জির কাছে নিজেকে প্রজা প্রজা মনে হয়। কোনো নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। কখনো মনে হয় যেন মৃত্যুযানের সওয়ার হয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে কফিনবন্দি হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। চলন্ত অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে নামতে বাধ্য করা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না নেমে উপায়ও থাকে না। অবশ্য কোনো কোনো যাত্রীর আচরণও বিদঘুটে। তাঁদের অন্যায় ও অন্যায্য আবদার ও নির্দেশ রাখতে হয় চালককে। সবাই নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। অন্যের কি অসুবিধা হলো, তা নিয়ে মোটেও তোয়াক্কা করেন না। যাতায়াতের সময় যে কত অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা হয়, বেশিরভাগ সময়ই তিক্ত, এ নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।


এ শহর বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে এর জেল্লা। কিন্তু বিনোদনের ক্ষেত্রে এ শহর এখনও সাবালক হয়ে ওঠতে পারলো না। বরং বিনোদনের যে উৎসগুলো ছিল, তা অনেকটা শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু সময় কাটানো কিংবা আনন্দ পাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। জনবহুল এ শহরে বিনোদন নিয়ে কেন যে এত কার্পণ্য, ঠিক বুঝে ওঠতে পারি না। মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হলেও এই একটি ক্ষেত্রে উদার হওয়া যায় নি। যেন বিনোদন খুব একটা তুচ্ছ বিষয়। এর কোনো প্রয়োজন নেই!  
এ শহরে কারো কাছে ভালো কথা, ভালো ব্যবহার, ভালো আচরণ আশা করা যায় না। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, নির্লজ্জতা, দুর্ব্যবহার, মিথ্যা বলা যেন হয়ে ওঠেছে আদর্শ লিপি। যে যত বেশি শঠ, তার কদর তত বেশি। এর ব্যতিক্রম যাঁরা, তাঁদের জন্য যেন এ শহর নয়। যে কারণে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। কূটিলতাও। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।    
এ শহর আমাকে এখন অবসন্ন করে দেয়। ক্লান্ত করে দেয়। বিষণœ করে তোলে। শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। মানসিকভাবেও বিপন্ন করে তোলে। কেবল টেনেটুনে বেঁচে থাকার জন্যই যেন এ শহরে বসবাস। নিজেকে মনে হয় আজনবি। প্রকৃতঅর্থেই মোটেও অ্যাডজাস্ট করতে পারছি না। এভাবে বসবাস করতে আর ইচ্ছেও করে না। যে কারণে বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়, ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা/রাঙামাটির দেশে যা/এখান তোকে মানাইছে না গো/এক্কেবারে মানাইছে না গো’। আমি তো জানি, আমাকে ‘এক্কেবারে মানাইছে’ না। এখান থেকে চলে যেতে চাই। কিন্তু কোথায় পাবো লাল পাহাড়ির দেশ? কোথায় পাবো রাঙামাটির দেশ? সেখানে আমাকে কে নিয়ে যাবে?    

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

‘তোমায় আমি জোছনা দেব’

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো। ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো।। পাগল হাওয়া বুঝতে নারে ডাক পড়েছে কোথায় তারে-- ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো।। নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা, বাণীবনের হংসমিথুন মেলেছে আজ পাখা। পারিজাতের কেশর নিয়ে ধরায়, শশী, ছড়াও কী এ। ইন্দ্রপুরীর কোন্ রমণী বাসরপ্রদীপ জ্বালো।। হায়! এ শহরে এখন চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর উছলে পড়া আলো দেখার সুযোগ দিনে দিনে সীমিত হয়ে পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে ইট-বালু-সিমেন্ট-লোহার আস্তরণ দিয়ে যেভাবে কংক্রিটের সৌধ গড়ে ওঠছে, তাতে হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ, হারিয়ে যাচ্ছে নীল আকাশ, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের সারল্য। সেইসঙ্গে কৃত্রিম আলোর বন্যায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে জোছনার রুপালি আলো। কখন জোছনা আসে, কখন জোছনা চলে যায়, অধিকাংশ নাগরিকই সেটা অনুধাবন করতে পারেন না। পারেন না বলেই জীবন ক্রমশ নিঃসঙ্গ, বিষণ্ন ও জটিল হয়ে যাচ্ছে। তার প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও। এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে একদমই যায় না। তবুও কেউ কেউ এখনও জোছনা ভালোবাসেন। স্নান করেন জোছনায়। ভেসে যান জোছনায়। সুবীর সেনের মতো উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, ‘নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ/নয় রাখলে হাতে দুটি হাত/নয় ডাকলে আরো কিছু কাছে/দেখো জোছনা ভেজা এই রাত’। বেইলি রোডে চ্যানেল আইয়ের অফিসের পরিসর হয়তো ছোট ছিল। কিন্তু চারপাশে ছিল আলোর ঝলকানি। গ্ল্যামার ছিল। সৌন্দর্য ছিল। (ছিল বলা ঠিক হচ্ছে না। এখনও আছে।) আছে ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের সুরেলা কিচিরমিচির। কাছাকাছি আছে রমনা পার্কের সবুজাভ। আছে নাট্যমঞ্চ, মন্ত্রিপাড়া, অফিসার্স ক্লাব। আছে অভিজাত্যের ছোঁয়া।


মুখরোচক খাবার আর জমজমাট আড্ডায় সারাক্ষণ সরগরম তো হয়ে আছেই। আছে কত রকম রসনার হাতছানি। রোজার দিনে রকমারি ইফতারের পসরা সাজানো হয়, তার আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসেন। রাস্তার পাশের ভ্যানে স্বল্প দামের ফাস্ট ফুড যেমন আছে, তেমনি আছে দামি চেইন শপ। আছে ঝকমকে, স্মার্ট, ড্যাশিং সব ক্রেতা। বাহারি পোশাক। আছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের কলগুঞ্জন। পুরো বেইলি রোড যেন হেসে ওঠে রঙধনুর মতো। আর সন্ধ্যা হলে তো আরো বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। অফিস থেকে বের হলেই মনটা কেমন উড়ৃ উড়ৃ হয়ে যেত। এমন একটি আনন্দময় পরিমণ্ডল থেকে তেজগাও শিল্প এলাকায় চ্যানেল আইয়ের অফিস স্থানান্তর হওয়ায় মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। যদিও বর্তমান অফিসের সঙ্গে আগের ছোট্ট গণ্ডির অফিসের কোনো তুলনাই হয় না। একটি কর্পোরেট অফিস যেমনটি হওয়া উচিত, তার কোনো কমতি নেই নতুন অফিসে। সাজ-সজ্জায়, সৌকর্যে-সৌন্দর্যে, বহিরঙ্গে। আছে সবুজের কিঞ্চিত ছোঁয়াও। তবুও মনটা পড়ে থাকতো বেইলি রোডে। কিন্তু প্রয়োজন ও চাহিদাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আবেগও গুরুত্বহীন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একসময় সব কিছু বদলে যায়। এখন আর বেইলি রোডের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। দেখতে দেখতে তাও তো প্রায় সাত বছর হতে চললো। কম সময় তো আর নয়। চ্যানেল আই অফিসের পরিসর এখন অনেক বড়। পরিবারের পরিধিও বেড়েছে। ‘সাপ্তাহিক’, ‘আনন্দ আলো’ পত্রিকার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘রেডিও ভূমি’ ও ‘চ্যানেল আই অনলাইন’ (এ অনলাইনের আজ প্রথম জন্মবার্ষিকী)। সব মিলিয়ে অনেক বেশি জমজমাট।


তাছাড়া অফিস চত্বরে সারা বছরই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই আছে। এক একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বদলে যায় চ্যানেল আই। সেজে ওঠে নতুন রূপে। হয়ে ওঠে এক খণ্ড বেইলি রোড। কখনো গ্রামীণ পরিবেশের আমেজ পাওয়া যায়। কখনো নাগরিক জীবনের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো লাল-সবুজের ছোঁয়ায় বর্ণিল হয়ে ওঠে। কখনো ব্যান্ড সংগীতে নেচে ওঠে হৃদয়। আবার মাতিয়ে দেয় রবীন্দ্রমেলা, নজরুলমেলা, হুমায়ূনমেলা। এ সব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমাগম লেগেই থাকে। পাশ দিয়ে হেঁটে যান স্বপ্নের তারকারা। কেউ কেউ মুচকি হাসি দিয়ে আলাদাভাবে নজর কেড়ে নেন। তাঁদের ডিওডোরেন্টের সুগন্ধ বুকটা ভরিয়ে দেয়। মনটাও ফুরফুরে হয়ে ওঠে। চাইলে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলা যায়। দূরের মানুষদের এতটা কাছাকাছি থাকতে পারাটা তো কম আনন্দদায়ক নয়। তবে আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় চ্যানেল আইয়ের খোলামেলা রুফটপ। এখানেও আয়োজিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কখনো গানে গানে স্বাগত জানানো হয় ভোরবেলাকে। কখনো প্রাণবন্ত আড্ডা জমে ওঠে লেখক-সাহিত্যিকদের। কখনো সম্ভাবনাময় মডেলদের পদচারণায় অন্য রকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। চ্যানেল আই ‘নিউজ নাইট’ও কম সৌরভ ছড়ায় না। ক্যান্টিনকে কেন্দ্র করে হরওক্ত ছোট-খাট আড্ডা লেগেই থাকে। ডালপুুরি, লুচি, পরটা-ডিম, মোগলাই পরটা, চায়ের জন্য ছুটে আসেন কম-বেশি সবাই। আপ্যায়িত করা যায় অতিথিদেরও। সিগারেটের নিষিদ্ধ প্রলোভন যাঁরা এড়াতে পারেন না, তাঁদের তো বাধ্য হয়ে আসতেই হয়। আর কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠলে একবুক তাজা বাতাস নেওয়ার জন্য ছাদটাই উত্তম স্থান। খুলে যায় মাথার অনেক জট। ফাঁকে ফাঁকে পুরো অফিসের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত সবার সঙ্গে সবার দেখা-সাক্ষাতও হয়ে যায়। ঘুচে যায় দূরত্ব। মোবাইলে সেরে ফেলা যায় গোপন আলাপনও। ছাদটা কখনো হয়ে ওঠে প্রকৃতঅর্থেই খেলার মাঠ। শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলা তো হয়ই, সেইসঙ্গে অনুশীলন চলে ক্রিকেটেরও। একটি ছাদকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। এই ঢাকা শহরে হাইরাইজ বিল্ডিং যেভাবে ওঠছে, তাতে খোলা চাতাল দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে ওঠছে। এমনকি আকাশও ঢেকে যাচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে চাঁদমামাও। এ ক্ষেত্রে বিশেষ আকর্ষণ চ্যানেল আইয়ের ছাদ। চারপাশ থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে আছে এই খোলা চত্বর। আধো আলো, আধো অন্ধকারে পাওয়া যায় বসন্তের মাতাল সমীরণ। রিমঝিম বৃষ্টির স্পর্শ। কখনো-সখনো ভালোবাসার মানুষের কাল্পনিক ফিসফিসানি।


সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার, অবলোকন করা যায় মায়াভরা চাঁদ আর মায়াবিনী রাত। সেই সূত্রে ‘আসমান ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’। সেই ধবল জোছনায় ইচ্ছেমতো অবগাহন করা যায়। লুটোপুটি খেলা যায়। চাইলে মন উজাড় করে বিলিয়েও দেওয়া যায় অঢেল জোছনা। এমন জোছনায় বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই অনুভব, ‘তোমায় আমি জোছনা দেব/তারার চাদরে জড়িয়ে নেব’।

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

মোবাইল ফোন কতটা নিরাপদ

পাঁচ তারকা হোটেলের লবিতে সুসজ্জিতা ঝলমলে এক মধ্য বয়সী ভদ্রমহিলা আয়েশী ভঙ্গিতে একাকী বসে আছেন। কিয়ৎ দূরে বসা স্যুটেড-ব্যুটেড মধ্যবয়সী এক সুবেশী ভদ্রলোক। এমন সময় ভদ্রমহিলা রোমান্টিক কণ্ঠে ফিস ফিস করে বলতে থাকেন : আর ইউ ফ্রি টু নাইট? সামনে বসা ভদ্রলোক ভাবলেন, বুঝিবা তাকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। টাইয়ের নট ঠিকঠাক করতে করতে স্মার্ট ভঙ্গিমায় ভদ্রমহিলার কাছে যেয়ে চাপা খুশি নিয়ে বিনীতভাবে জানতে চাইলেন, মী! ভদ্রমহিলা একটু কটাক্ষ হেনে তাচ্ছিল্যভরা দৃষ্টিতে ভদ্রলোককে হোটেলের ওয়েটার মনে করে বললেন, ওয়ান ব্ল্যাক কাপ কফি, প্লিজ! তাকে ওয়েটার মনে করায় ভদ্রলোক দারুণভাবে বিব্রতবোধ করতে থাকেন। আসলে ভদ্রমহিলা মোবাইল ফোনে অন্য একজনের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলছিলেন, মনে হচ্ছিল তিনি বুঝি সামনে বসা ভদ্রলোককে অ্যাপ্রোচ করছেন। এটা একটি মোবাইল ফোনের বিজ্ঞাপন। সাড়া জাগানো এই বিজ্ঞাপনের মতো মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করে ইদানীং ঘরে-বাইরে কিংবা পথে-ঘাটে নানাভাবে মানুষজন বিব্রত হচ্ছে। মোবাইল ফোনের সংখ্যা দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তাতে এর জনপ্রিয়তার উত্তাপ সহজেই অনুভব করা যায়।


এখন সর্বস্তরের মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। কেউ যদি কান চুলকাতে থাকেন, তাতেও মনে হয় বুঝিবা তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলছেন। মোবাইল ফোন এখন আর শুধু স্ট্যাটাস সিম্বল নয়, অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। প্রযুক্তির অনন্য বিস্ময় মোবাইল ফোনের এই প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করা যায় না। বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদ বিশ্বের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে। ২০০০ সাল পর্যন্ত বিশ্বের কমপক্ষে ২০০ মিলিয়ন লোক মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন বলে এক সমীক্ষায় জানানো হয়। এ সংখ্যা দ্রুত বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ এ থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন? ইতোমধ্যে বাংলাদেশের চারটি মোবাইল ফোন কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা তের লাখ ছাড়িয়ে গেছে। যোগাযোগের জন্য জনগণের প্রিয় বাহন মোবাইল ফোন, যা পাশ্চাত্যে সেল ফোন হিসেবে পরিচিত। মোবাইল ফোনের উপকারিতা অবশ্যই আছে। বদলে দিচ্ছে অনেক মানুষের জীবন-জীবিকা। মোবাইল ফোন আসার আগে বাংলাদেশে ব্যবহৃত হতো অ্যানালগ ফোন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এ ফোন পেতে মানুষকে বছরের পর বছর অপেক্ষায় থাকতে হয় চাতক পাখির মতো। যেন এটা এক অমূল্য সম্পদ। সহজে মানুষের হাতে পৌঁছে গেলে ক্ষতি হয়ে যাবে দেশ ও দশের! আনুমানিক হিসাবে জানা যায়, এই কিছুদিন আগেও বাংলাদেশের প্রতি এক হাজার লোকের মধ্যে মাত্র তিনজনের এই ফোন ছিল। বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ফোনের ব্যবহার ছিল খুবই সীমিত পরিসরে। আর এখন এ সংখ্যা দারুণভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। বেসরকারি পর্যায়ে উন্মুক্ত করে দেয়ার পর মোবাইল ফোন ঢুকে পড়েছে অজপাড়াগাঁয়ে। অবশ্য এক/দু’জন দুস্থ মহিলা বা কৃষকের হাতে মোবাইল ফোন ধরিয়ে দিয়ে তাকে যেভাবে বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে, তেমনটি না হলেও এই ফোন সবার মাঝে উন্মুক্ত করে দেয়ার পর খুলে গেছে যোগাযোগের দুয়ার। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে অনায়াসে কথোপকথন কিংবা তথ্য আদান-প্রদান করা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, চলতে চলতে কিংবা কাজে ডুবে থেকেও কথা বলতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। মোবাইল ফোন সবার জীবনে নিয়ে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের হাওয়া। সূর্যটা সবে ডুবছে। সন্ধ্যা আসি আসি করছে। এমন সময় আপনার ব্যক্তিগত কারে লং ড্রাইভে কোথাও যেতে ইচ্ছে হলো। পাশে বান্ধবী বা সদ্য বিবাহিত স্ত্রী। সিডিতে ধীরে ধীরে বাজছে ম্যাডোনার কোনো রোমান্টিক গান। পীচ-ঢালা পথের দু’পাশে সবুজের নিসর্গ। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। মাতাল করা অনুপম পরিবেশ। এমন সময় মোবাইল ফোনটি গুনগুনিয়ে উঠলো। গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে আবেগময় কণ্ঠে মেতে উঠলেন কথোপকথনে। সব মনোযোগ তখন মোবাইল ফোনে। এমন সময় চলমান কারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নির্জন কোনো স্থানে দুর্ঘটনার শিকার হলেন। সাহায্য করার মতো আশপাশে তখন কেউ নেই। অথচ গুরুতর আহত অবস্থা থেকে উদ্ধার না পেলে অনিবার্য মৃত্যুর হাতছানি। এমন সময় হাতের মধ্যে ধরা অক্ষত মোবাইল ফোনটি প্রিয় বন্ধুর মতো আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে আপনি উদ্ধার পেতে পারেন। মোবাইল ফোনটা আপনার বন্ধু এবং শত্রু দুটোই। মোবাইল ফোনে নিমগ্ন না হলে দুর্ঘটনাটি ঘটতো না। আবার মোবাইল ফোনটি কাছে না থাকলে মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শও ছুঁয়ে যেতে পারতো। নতুন কোনো প্রযুক্তি এলে আমরা দ্রুত তার প্রেমে মজে যাই। কিন্তু এর বিপরীত দিকটা কখনো ভেবে দেখতে চাই না।

মোবাইল ফোন একদিকে আমাদের জীবনকে যেমন দ্রুতগামী করেছে, অন্যদিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন মোবাইল ফোন ব্যবহার করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক। এমনকি এ থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। আমরা যে কোনো শব্দ শুনি, তার উৎস শব্দতরঙ্গ। কানের ভেতরে এয়ার ড্রামের সঙ্গে সংযুক্ত ছোট ছোট তিনটি হাড়ের সাহায্যে শব্দতরঙ্গ মস্তিষ্কে পৌঁছায়। মোবাইল ফোনে ফ্রিকোয়েন্সির কারণে কম্পনের সৃষ্টি হয়। এ কম্পন একটি শক্তি। তবে মোবাইল ফোনে স্বল্প মাত্রার ফ্রিকোয়েন্সির চেয়ে বেশি মাত্রার ফ্রিকোয়েন্সিগুলো মারাÍক। ক্রমাগত শব্দতরঙ্গে যে তাপ উৎপন্ন হয়, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কানের শ্রবণ সহায়ক টিস্যু। প্রাথমিক অবস্থায় হেয়ারিং নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হলে মানুষ কানে কম শোনে, কানের মধ্যে ঝিঁ ঝিঁ শব্দ হয়, মাথা ঘোরায়, বসা থেকে দাঁড়ালে মাথা চক্কর মারতে থাকে ইত্যাদি। তবে সবচেয়ে যেটি মারাত্মক, তাহলো হেয়ারিং নার্ভের সঙ্গে মস্তিষ্কে অবস্থিত হেয়ারিং সেন্টারের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। ফ্রিকোয়েন্সি থেকে ক্রমাগত শব্দতরঙ্গ হতে থাকলে তা মস্তিষ্কের হেয়ারিং সেন্টার ক্ষতিগ্রস্ত করে। মস্তিষ্কের কোনো কোষ একবার নষ্ট হলে তা আর ঠিক হয় না। মোবাইল ফোন ব্যবহারজনিত বিপর্যয় অনেকটা এক্স-রে’র বিকিরণজনিত ক্ষতির সমতুল্য। একবার এক্স-রে এক্সপোজারের বিকিরণে হাজার হাজার সেল নষ্ট হয়ে যায়। ইট-পাথর দিয়ে যেমন বাড়ি তৈরি করা হয়, তেমনিভাবে সেল দিয়ে গঠিত হয় মানব দেহ। মস্তিষ্কের কোনো কোষ (ব্রেন সেল) ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে তা ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনতে পারে। ক্যান্সার ছাড়াও মস্তিষ্কের কোনো অংশ অকেজো হয়ে গেলে আস্তে-ধীরে অথর্ব কিংবা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। তবে যারা শক্তিশালী ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার এবং সার্বক্ষণিকভাবে মোবাইল ফোনে কথা বলে থাকেন, মূলত তারাই এর ভয়ানক শিকারে পরিণত হন। বিশ্বের কোটি কোটি লোক ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন। তাদের মধ্যে প্রতি বছর হাজার হাজার লোক আক্রান্ত হচ্ছে ব্রেন ক্যান্সারে। যে যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শীর্ষে অবস্থান করছে এবং যেখানে একটি জীবনের মূল্য অপরিসীম, সেখানেও মোবাইল ফোনের কারণে প্রতি এক লাখে ৬ জন ব্রেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। ১৯৯২ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত স্বাস্থ্যের ওপর মোবাইল ফোনের ক্ষতিকর প্রভাবের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফ্লোরিডার একজন বাসিন্দা ডেভিড রেনার্ড আদালতে অভিযোগ দায়ের করেন যে, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তার স্ত্রী আক্রান্ত হয়েছেন মারাত্মক ব্রেন ক্যান্সারে। কিন্তু আদালতে উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক নমুনা তুলে ধরতে না পারায় ১৯৯৫ সালে ফেডারেল কোর্ট তার মামলা খারিজ করে দেন। তবে আদালতে মোবাইল কোম্পানির সওয়াল-জবাবও সন্তোষজনক ছিল না। যে কারণে আদালত তাদেরকে সাবধানতা অবলম্বনের নির্দেশ প্রদান করেন। পরবর্তীকালে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যত্র মোবাইল ফোনের ব্যবহারের সঙ্গে বিকিরণ ও ক্যান্সারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়। মামলা খারিজ হওয়ার পর দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়ে ডেভিড রেনার্ড বৈজ্ঞানিক নমুনাসহ পুনরায় আদালতে মামলা উত্থাপন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্পেকট্র্যামে বিভিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে তারবিহীন যোগাযোগ করা হয়। মূলত দুটি ফ্রিকোয়েন্সিতে যুক্তরাষ্ট্রে মোবাইল ফোন পরিচালিত হয়। পুরনো সিস্টেমটি হচ্ছে, ৮৫০ মেগাহার্জ এবং নতুন পার্সোনাল কমিউনিকেশন্স সার্ভিস অর্থাৎ পিসিএস-এ প্রায় ১৯০০ মেগাহার্জ। ইউরোপীয়রা একটি ভিন্নধর্মী প্রযুক্তি এবং কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করে থাকে। তাদের পদ্ধতি হচ্ছে, গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন্স (জিএসএম)। তাছাড়া অ্যানালগ হ্যান্ডসেট ফোনে বিকিরণ হয় মাত্র ৬০০ মেগাওয়াট কিংবা তার চেয়েও কম। অনেক ডিজিটাল মডেল ফোন উৎপন্ন হয় ১২৫ মেগাওয়াটে। এ কারণে অ্যানালগ ফোন তেমন কোনো ক্ষতিকর নয়। কিন্তু মোবাইল ফোন নিয়ে আদালতে মামলা হওয়ার পর তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রয়েছে। মোবাইল কোম্পানিগুলো এর পেছনে ব্যয় করেছে কোটি কোটি ডলার। তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে, একটানা খুব বেশি ব্যবহার না করলে মোবাইল ফোন তেমন ক্ষতির কারণ নয়। এমন একটি তথ্য ১৯৯৯ সালের নভেম্বর প্রকাশিত হয় আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে। কিন্তু সুইডিশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিলের অর্থায়নে সুইডেনের বিজ্ঞানী লেনার্ট হার্ডেল ও তার সহযোগীরা পরীক্ষা চালিয়ে দেখতে পান, ৪২৫ জন স্বাস্থ্য সচেতন ব্যক্তির তুলনায় মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী ২০৯ জন সুইডিশ ব্রেন টিউমারে আক্রান্ত হয়েছেন। সিয়াটলের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের হেনরি লেই ও তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন, ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে তারা মোবাইল ফোনের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির বিকিরণ থেকে ক্ষতিকর প্রভাব দেখতে পেয়েছেন। এর ফলে মস্তিষ্কের কোষের ডিএনএ ভেঙ্গে যায়। তাতে ক্যান্সারের সম্ভাবনা থেকে যায়। কানাডিয়ান টেলিভিশনে এক সাক্ষাৎকারে ওয়ারলেস টেকনোলজি কমিউনিকেশন্সের সাবেক প্রধান কার্লো বলেছেন, যারা তারবিহীন ফোন ব্যবহার করেন, তাদের মস্তিষ্কের ক্যান্সারে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। মোবাইল ফোনের ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের প্রেক্ষিতে এগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গলা ও মাথায় ক্যান্সার হয় কিনা- তা ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা করার জন্য ইউরোপীয় কমিশন ৮০ লাখ ইউরো দিয়েছে ফ্রান্সের দ্য ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অব ক্যান্সারকে। তবে ১০টি দেশ এই সমীক্ষায় অংশ নেবে। তিন বছরের মধ্যে এই সমীক্ষা শেষ করতে হবে। এছাড়া শরীরের ওপর মোবাইল ফোনের প্রভাব নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও যুক্তরাষ্ট্রে ১০০ মিলিয়ন ডলারের পরীক্ষা চালাচ্ছে। মোবাইল ফোন থেকে কানের সমস্যা, ক্যান্সার ও অন্যান্য রোগ থেকে রেহাই পেতে সাময়িকভাবে একটি নতুন ধরনের ডিভাইস তৈরি করা হয়েছে। এই ডিভাইস যারা ব্যবহার করেন না, তারা ব্যবহারকারীদের তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি ক্যান্সার ও অন্যান্য সমস্যায় আক্রান্ত হন। কিন্তু এই ডিভাইস মূলত পাশ্চাত্য দেশগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে তো কোনো কিছুরই যথাযথ সমীক্ষা হয় না। সবকিছুই কল্পিত ধারণা দিয়ে নিরূপণ করা হয়। যে কারণে যে কোনো তথ্য পাওয়া খুব কঠিন। তবে ইদানীং ইএনটি (নাক-কান-গলা) চিকিৎসকদের অবস্থা রমরমা হয়ে উঠেছে। যদিও এ নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি, তদুপরি কিছু রোগী ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের কান ও কানকে কেন্দ্র করে আনুষঙ্গিক সমস্যা ক্রমশ বাড়ছে। আমাদের দেশে কী ধরনের মোবাইল ফোন ব্যবহৃত হচ্ছে এবং এর ক্ষতিকারক প্রভাব কী, তা জানা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলোর ভূমিকাও স্বচ্ছ নয়। মোবাইল ফোন বন্ধু, না নীরব ঘাতক- তা জরুরিভিত্তিতে নিরূপণ করা প্রয়োজন। কেননা, মোবাইল ফোনের যদি ক্ষতিকর প্রভাব থেকে থাকে, তাহলে আমাদের জাতীয় জীবনে যে সর্বনাশ হয়ে যাবে, তা থেকে খুব সহসা পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না। বিভিন্ন দেশে যেহেতু নানা গবেষণা ও সমীক্ষায় এটা অন্তত প্রমাণিত হয়েছে যে, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত কথা বলা শরীরের জন্য ক্ষতিকর, সেক্ষেত্রে এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আপনি কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কিংবা আদৌ হচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে আপনাকে সাহায্য করতে পারে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক স্ট্যাবিলাইজার ৗই*ঊ*ইৗ. আপনি যদি তাদের একটি প্রশ্নমালার ছক পূরণ করে পাঠান, তাহলে দু’মিনিটের মধ্যে পেয়ে যাবেন আপনার কাক্সিক্ষত উত্তর। যোগাযোগ করুন এই ই-মেইলে : র্র্দয://ষষষ.রটঢটর৩.ডমব/ ণফণর্ডরমবটথভর্ণধড-রটঢধর্টধমভর্-র্ণ্র.র্দবফ. 

দৈনিক বাংলাবাজার : ২৩ জুলাই ২০০৩

যাত্রীরা জিম্মি, ফুটপাত দখল এবং...


এমনিতেই মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। জীবনযাত্রার মান যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে যেয়ে যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে চলাফেরা করাটা একটা বড় ধরনের দায় হয়ে উঠেছে। শহরের মানুষের দীর্ঘদিনের চলাচলের বাহন রিকশা। বোধকরি অসংখ্য মানুষের প্রিয় বাহনও। পরিবেশবান্ধব রিকশায় চড়ে যেখানে খুশি, সেখানে অনায়াসে যাওয়া যায়। খুব বেশি ঝঞ্ঝাটও নেই। রিকশায় চড়ার মধ্যে এক ধরনের রোমান্টিকতা জড়িয়ে আছে। মিঠে রোদে বা বৃষ্টিতে রিকশায় চড়ার মজাই আলাদা। বিশেষ করে সদ্য বিবাহিত দম্পতি কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছে রিকশার কদরই অন্যরকম। পাকিস্তান আমলে রিকশার প্রচলন হলেও এখন নাগরিক জীবনের সঙ্গে দারুণভাবে জড়িয়ে পড়েছে রিকশা। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, আর্থিক অসচ্ছলতা আর বেআইনিভাবে রিকশার সংখ্যা খুব দ্রুত এত বেড়ে যায় যে, তা নাগরিক বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিনের যানজটের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে রিকশা। যে কারণে এরশাদ সরকারের আমল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল ক্রমান¦য়ে সীমিত, তারপর বন্ধ করে দেয়া হতে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ রাস্তায় রিকশা চলাচল করতে দেয়া হয় না। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণের কারণে বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রিকশা চলাচল সীমিত ও বেবিট্যাক্সি নিষিদ্ধ করায় রাজধানীবাসীর চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই সংকট দূর করার জন্য নানা রঙের ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি ও মিশুক চালু করা হয়েছে। কিন্তু জনচাহিদার অনুপাতে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। সব মিলিয়ে ঢাকা মহানগরে ১৮ হাজার ক্যাব, সিএনজি, অটো ও মিশুক চলাচল করে। এর মধ্যে বেশকিছু যান থাকে চলাচলের অনুপযোগী। ফলে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একে তো রিকশা ও বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দেয়ায় চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে; তদুপরি আগে যেখানে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকায় যে কোনো এলাকায় যাওয়া যেতো, এখন সেখানে ৩০ টাকার নিচে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। অবশ্য শুরুতে ট্যাক্সি ক্যাবের সার্ভিস ছিল চমৎকার। ফোনে কল করলে কিংবা রাস্তায় থামিয়ে ইচ্ছে অনুসারে নির্ধারিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া যেতো। মিটারে যে বিল উঠতো, তাই পরিশোধ করলে চলতো।

বাড়তি কোনো অর্থ দিতে হতো না। আর এখন ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি চালিত ফোর স্ট্রোক অটোরিকশা ও মিশুকে যে কোনো গন্তব্যে যেতে চাওয়াটা স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। চালকরা অল্প দূরত্বে যেতে চাওয়া তো দূরের কথা, কোথাও যেতে চাওয়াটা নির্ভর করে তাদের মেজাজ-মর্জি ও নানা শর্তের ওপর। তারপর কোথাও যেতে চাইলে মিটারের সাথে বাড়তি টাকা চাওয়াটা রীতিমত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর তারা কোথাও যেতে চায় না। ট্যাক্সি ক্যাব ও সিএনজি চালকদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রতিদিন সিএনজি নিতে তাদের ২/৩ ঘণ্টা লেগে যায়। যে কারণে নির্ধারিত ভাড়ায় তাদের পোষায় না। অথচ ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস নীতিমালা ১৯৯৮-এর শর্তানুসারে, শুধুমাত্র সংযোজিত মিটারের মাধ্যমে ভাড়ায় ট্যাক্সি ক্যাব চলাচল করবে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা যাত্রীদের চাওয়া মাত্র চালক দেখাতে বাধ্য থাকবে। নির্ধারিত স্ট্যান্ডে অবস্থানকালে কোনো ক্যাব চালকই প্রকৃত যাত্রী বহনে অস্বীকৃতি জানাতে পারবে না। এসব শর্ত চালকরা মানছে না। প্রতিটি ট্যাক্সি ক্যাবের সঙ্গে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে। কোনো ট্যাক্সি ক্যাব কোথাও যেতে না চাইলে, বাড়তি ভাড়া চাইলে কিংবা অন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি করলে যাত্রীরা টেলিফোনে অভিযোগ করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে সার্জেন্ট নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হবেন। তাছাড়া যাত্রীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ যাত্রীর তাৎক্ষণিকভাবে ফোন করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার ঝক্কি-ঝামেলা এবং জরুরি প্রয়োজন থাকলে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। পুলিশকে ফোন করে সহসা সাড়াও পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলাচল করাটা বিড়ম্বনাময় ও ভোগান্তিকর হয়ে উঠেছে। একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তের অন্যতম অবলম্বন বিআরটিসি বাস দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এমনিতেই বিআরটিসি বাসের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, তারপরও যে ক’টি বাস এখনও চলাচল করে, তা যাতে না চলাচল করতে পারে, সে জন্য নানা রকম কলা-কৌশল ও ফন্দি-ফিকির করা হয়। এমনিতেই সাধারণ মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত, তার মধ্যে পথচলা অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহন সংকটের কারণে অপচয় হচ্ছে অর্থ ও সময়ের। আমাদের জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ বেকার। এর সাথে যারা বিভিন্ন পেশায় কর্মরত, তাদের বড় অংশই বসবাস করে রাজধানী ঢাকায়। কর্মরত জনসংখ্যার বড় একটি অংশ যানবাহন সমস্যার কারণে সময়মত কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে অসংখ্য শ্রমঘণ্টা। অপচয় হচ্ছে শ্রমমুখী মানব সম্পদের। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তাছাড়া রিকশা ও বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দিয়েও ট্রাফিক জ্যাম নিরসন করা যায়নি। কেননা, বিপুল জনসংখ্যার এই রাজধানীতে ছোট ছোট যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে নতুন গাড়ি ক্রয়ের সুবিধার্থে নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে করভার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। এতে করে ট্রাফিক জ্যাম আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।


 ছোট ছোট যান চলাচলে নিরুৎসাহিত করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একতলা ও দোতলা বাসের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হলে সাধারণ মানুষের উপকারের পাশাপাশি ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পেতে পারতো। শিল্পোন্নত দেশেও সাধারণ যাত্রী চলাচলের সুবিধার্থে পর্যাপ্তসংখ্যক বাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাসগুলো চলাচল করে ঘড়ির কাঁটা মেপে। কিন্তু আমাদের দেশ প্রতিবছরই বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁট করে বিত্তবানদের জন্য সুবিধার দুয়ার খুলে দেয়া হয়। পরিবহন খাতে সুষ্ঠু কোনো নীতিমালা না থাকায় ঢাকায় হরেক রকম যানবাহন চলাচল করছে এবং এ কারণে ঢাকা পরিণত হয়েছে যানজটের শহরে। বাজেটে পরিবহন খাতে যতই অর্থ বরাদ্দ করা হোক না কেন, সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে যান চলাচলের ক্ষেত্রে যে বিশৃংখল অবস্থা বিরাজ করছে, তা দূর করা যাবে না। যানজট, অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য সচেতনতাসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ অন্তত কাছাকাছি দূরত্বের পথ হেঁটে অতিক্রম করতে চায়। কিন্তু ঢাকা শহরে হেঁটে চলাচল করাটা এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ ফুটপাতই বেদখল হয়ে গেছে। এমনিতেই ঢাকায় পর্যাপ্ত রাস্তা নেই। যা রাস্তা আছে, তার সর্বত্র দু’পাশে ফুটপাত নেই। রাজধানীতে প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সে অনুপাতে ফুটপাত নেই বললেই চলে। যে কারণে যানজটের পাশাপাশি এখন মানুষজটও স্বাভাবিক ঘটনা। ঢাকায় এমন কোনো ফুটপাত খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যেখান দিয়ে খুব সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে যাওয়া যায়। স্থায়ী দোকান, ভাসমান হকার, গ্যারেজ, ডাস্টবিন ইত্যাদি কারণে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ ফুটপাতই ভেঙ্গেচুরে একাকার অবস্থা। একটুখানি অসতর্ক বা অসচেতন হয়ে হাঁটলে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। মাঝে মাঝে পুলিশ অ্যাকশনে নেমে গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানের ফুটপাত খালি করে দিলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি দাঁড়ায় যথা পূর্বং তথা পরম। এমনিতে ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত মাঠ, খোলা জায়গা, পার্ক নেই। অথচ দেশে হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিসসহ মারাত্মক রোগের রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। যে কোনো হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীদের লাইন লেগেই থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের পথ্য দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের পরামর্শ হচ্ছে : প্রতিদিনই কিছু সময়ের জন্য হাঁটুন। কিন্তু হাঁটার মতো জায়গা কোথায়? রমনা পার্ক, সংসদ ভবন, ধানমন্ডি লেকে সকালে বা বিকালে মানুষের ভিড় লেগে যায়। তাছাড়া সবার পক্ষে নির্ধারিত সময়ে হাঁটার অবকাশ হয় না। এ জন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে অথবা কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে হেঁটে হেঁটে প্রয়োজনটুকু সারা হয়, একই সঙ্গে হাঁটার কাজটুকুও হয়ে যায়। এ রকম লোকের সংখ্যাই বেশি। শারীরিক এক্সারসাইজের জন্য সাঁতার ও সাইকেল চালানো চমৎকার ব্যায়াম। কিন্তু ঢাকা শহরে সাঁতার কাটার কোনো ব্যবস্থা নেই। পাঁচ তারকা হোটেল কিংবা অভিজাত পাড়ায় যেসব সুইমিংপুল আছে, সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য খুবই কম লোকের আছে।


এছাড়া ঢাকা শহরে সাইকেল চালানো অনেকটা নিজের জীবনকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়ার শামিল। ব্যস্ত নগরী যানজটের ভিড়ে সাইকেল চালানোর সুযোগ কোথায়? যে জন্য রাজধানী ঢাকায় সাইকেল এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যার কারণে হাঁটাহাঁটি করাটা যেখানে শরীর সুস্থ ও শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার একমাত্র ভরসা, সেটাও এখন মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। নানা প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে শীতকালে যা হোক কিছুটা হলেও হাঁটাহাঁটি বা পদচারণা করা যায়। কিন্তু বর্ষাকালে অবস্থা দাঁড়ায় ভয়াবহ। একটুখানি বৃষ্টি হলেই রাজধানীর নিচু এলাকা ডুবে যায়। আর ভারি বর্ষণ হলে তো কথাই নেই। কি অভিজাত, কি বাণিজ্যিক, কি আবাসিক- সব এলাকায় থৈ থৈ করে পানি। নগরীর পথঘাট, অলি-গলিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এমনিতে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভাঙ্গা-চোরা ও খানা-খন্দকে পরিপূর্ণ। যানবাহনে চলাচল করাই ঝুঁকিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে পদব্রজে চলাচল করা একদম অসম্ভব হয়ে পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে কিংবা নিজের তাগিদে হাঁটাহাঁটি যাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের জন্য বর্ষাকালটা একটা অভিশাপ হয়ে নেমে আসে। 

দৈনিক সংবাদ : ২৫ জুন ২০০৩

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

প্লিজ, গাছ কাটবেন না


প্রতিদিন বাসস্থান থেকে কর্মস্থলে যাবার স্বল্প পরিসরের যে পথটুকু, যা যানজটের কল্যাণে বেশ কিছুটা দীর্ঘ হয়ে যায়, চাই বা না চাই, যাত্রাকালীন সময়টুকু গাড়িতে বসে আশপাশের নানা দৃশ্যাবলী কখনো বাধ্য হয়ে, কখনো একরাশ কৌতূহল নিয়ে দেখতে হয়। এ সময় নানা রকম অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। কখনো-সখনো সাত-সকালে সিটি কর্পোরেশনের ময়লাবাহী গাড়ির পিছে পিছে চলতে হয়। নাকে এসে লাগে রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ। কানে তীব্র চিৎকার হয়ে ভেসে আসে পঞ্চাশ ও ষাট দশকে গাছপালা পরিবেষ্টিত অবস্থায় গড়ে ওঠা চমৎকার সব বাড়ি ভাঙ্গার নির্মম শব্দ, দেখতে হয় বহুতল ভবনের শক্ত-গাঁথুনি। শুনতে হয় যানবাহনের অহেতুক হর্ন। ডুবে যেতে হয় নিকষ কালো ধোঁয়ার ধূম্রজালে। যানবাহনের নিয়ম না-মানা তো রুটিনমাফিক দৃশ্য। সড়কগুলোর মানচিত্র বদলে যাওয়া, ট্র্যাফিক সিগন্যালের নিত্য-নতুন নিয়ম-কানুনের ফাঁদে প্রায়শই আটকা পড়তে হয়। সড়কদ্বীপ কিংবা আইল্যান্ডের ওপরে দু’হাত মেলে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষগুলোর মন্দভাগ্যসহ ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া রাজধানী ঢাকাকে যেন কখনো উত্তরাধুনিক কবিতার মত দুর্বোধ্য, আবার কখনো গীতল কবিতার মতো সহজবোধ্য মনে হয়। এর মাঝে মনটা তখনই বেশি খারাপ হয়ে যায়, যখন দেখি ইট-পাথর-সিমেন্টের অরণ্যে হারিয়ে যাচ্ছে সবুজের নিসর্গ। কিছুদিন কোনো রাস্তায় যাতায়াত না করলে সে এলাকাকে চিনতে কষ্ট হয়। দু’পাশে সটান দাঁড়িয়ে যায় বহুতল ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট ও ঝলমলে মার্কেট। কিন্তু চোখকে স্বিগ্ধ ও মনকে ভালো লাগায় ভরিয়ে দেয়ার জন্য যে গাছগুলো সেখানে ছিল, তার লেশমাত্র চিহ্ন কোথাও থাকে না। প্রতিদিনই নির্মূল হয়ে যাচ্ছে গাছ-গাছালি। এর পাশাপাশি যানজটের সর্বগ্রাসী লাগাম টেনে ধরার জন্য আইল্যান্ডগুলোকে নিয়ে বছরের পর বছর ধরে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তাতে গাছের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। অথচ সড়কদ্বীপ ও আইল্যান্ডগুলোতে অনেক অযত্ন-অবহেলা আর বাধা-বিঘ্ন ও প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে ওঠে এক-একটি গাছ। কত চারা যে গাছ হয়ে ওঠার আগেই ঝরে যায় অকালে! এর মাঝেও যা গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে এই পচা-গলা-নোংরা শহরের শোভা বর্ধন করে, তারও বলি হতে হয় কথিত সড়ক, সড়কদ্বীপ ও আইল্যান্ডের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এছাড়াও প্রতি বছর ঝড়, বৃষ্টি ও টর্নেডোয় বিনষ্ট হয় হাজার হাজার গাছ। প্রকৃতির ওপরে কারো হাত না থাকলেও অধিকাংশ গাছই উপড়ে পড়ে আমাদের অবহেলায়। এর কারণ সড়ক উন্নয়ন, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ-টেলিফোনসহ নানা কারণে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি করায় রাস্তার পাশের গাছগুলোর মাটি আলগা হয়ে যায়। এছাড়া অধিকাংশ গাছের গোড়ায় পর্যাপ্ত মাটি নেই। এ কারণে একটুখানি বাতাসে বা ঝড়ে গোড়াসহ হেলে পড়ে প্রাচীন ও নবীন- সব বয়সী গাছ।


এমনিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে উজাড় হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের মূল্যবান বৃক্ষসম্পদ। তার ওপর জনগণের অজ্ঞতা আর পরিবেশ সম্পর্কে অসচেতনতার কারণে দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে গাছ-গাছালির সংখ্যা। একটা সময় এই ঢাকা ছিল বৃক্ষ ও ফুলের শহর। প্রতিটি বাড়ি ছিল বৃক্ষময়। ছিল নানারকম ফুল ও ফলের সমাহার। কবি বুদ্ধদেব বসু কতই না প্রশস্তি গেয়েছেন এই ঢাকা শহরকে নিয়ে। ঢাকার নিসর্গ ও নির্জনতার কথা কখনোই তিনি ভুলতে পারেননি। বুদ্ধদেব বসুর স্বপ্নের ঢাকা শহরকে চিনতে এখন বড্ড কষ্ট হয়। ইট-পাথরের আকাশছোঁয়া কংক্রিটে ঢেকে গেছে ঢাকার খোলা আকাশ। ফুল, ফল ও বৃক্ষ দেখতে হলে চলে যেতে হয় নাগরিক কোলাহল ছেড়ে দূরে কোথাও। তাছাড়া অল্প কিছু বৃক্ষ যে এখনো দেখা যায়, তার অধিকাংশই অপরিচিত- বিদেশি বৃক্ষ। সবকিছুতেই যেখানে বিদেশ-নির্ভরতা, সেখানে গাছই বা বাদ যাবে কেন! বিদেশ থেকে আমদানিকৃত গাছগুলোর না আছে সৌন্দর্য, না আছে কোনো গুণাবলী। বরং কিছু কিছু গাছ পরিবেশ ও মাটির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠেছে। বৃক্ষের পাশাপাশি এখন আর দেখা যায় না নয়নমনোহর ও মাতাল করা বাহারি সুগন্ধী ফুল ও ফলের গাছ। বৃক্ষ, ফল ও ফুল এখন ঢাকা শহরে বিরল হয়ে ওঠায় তা সরকারি উদ্যানে যেয়ে টিকিট কেটে দেখতে হয়। বিশাল বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট বা ফ্ল্যাট বাড়ির টবে, কোনো কোনো বাড়ির ছাদে কিছু কিছু সৌখিন ব্যক্তি গাছ লাগান; নতুবা অধিকাংশ বাড়িতে প্লাস্টিকের গাছ কিংবা ড্রয়িং রুমে শোভা পায় প্রকৃতির দেয়াল চিত্র। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে হলে প্রকৃতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। যে কারণে মরুভূমি এখন মরুদ্যান হয়ে উঠেছে। যেখানে ছিল ধু-ধু বালুকারাশি, সেখানে এখন আশ্চর্যরকমভাবে দিগন্তব্যাপী সবুজের ছোঁয়া। এমন অসম্ভব সম্ভব হয়েছে মানুষের সচেতনতা ও অপরিসীম প্রচেষ্টার কারণে। আর অপরিকল্পিত নগরায়নের নামে ঢাকা শহর বৃক্ষহীন মরু শহরে পরিণত হতে চলেছে। বিশ্বের কোন্ শহরে নগরায়ন হচ্ছে না? সব শহরেই উন্নয়নের পাশাপাশি গাছ, ফল ও প্রকৃতিকে গুরুত্ব দেয়া হয়। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর শহরে বৃক্ষকে সাজানো হয়েছে স্থাপত্য শিল্পের মতো করে। দেখলে জুড়িয়ে যায় চোখ ও মন। আর পুরনো লন্ডন শহরকে উদ্যানের শহর বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। গাছ, ফল ও প্রকৃতি মানুষের অনেক পুরনো বন্ধু। মানব জীবনের জন্য গাছ অত্যন্ত অপরিহার্য। গাছের কাছে আমরা কী পাই না? খাদ্য, জ্বালানি, পশুসম্পদ, বাড়ি-ঘর তৈরির উপকরণ, ছায়াময় পরিবেশ, মাটির উর্বরতার পাশাপাশি প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও প্রবল সামুদ্রিক ঝড় থেকে রক্ষা করে গাছ। সবচেয়ে যেটি গুরুত্বপূর্ণ, চমৎকার নৈসর্গিক দৃশ্যপট ও আবহাওয়া সৃষ্টির মাধ্যমে বেঁচে থাকার জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের মূল উপজীব্য অক্সিজেন আমরা গাছ থেকে গ্রহণ করি। বাংলাদেশে যেখানে ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল বা গাছ-গাছালি থাকা দরকার, সেখানে আছে মাত্র ৬ শতাংশ। যা পরিবেশের জন্য দারুণ বিপজ্জনক। বিবেকবর্জিত এক শ্রেণীর মানুষ অর্থের লোভে নির্বিচারে লোপাট করছে বৃক্ষসম্পদ। এ কারণে সৃষ্টি হচ্ছে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা। উত্তপ্ত হয়ে উঠছে জলবায়ু। বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। মানুষের মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে অস্থিরতা ও চঞ্চলতা। যে জন্য অসুস্থ হয়ে পড়ছে সামাজিক পরিবেশ। অবক্ষয় ঘটছে মূল্যবোধের। আসলে গাছের সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক ও হার্দিক সম্পর্ক, তা অনুভবের ও অনুধাবনের বিষয়। জাতীয় পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ ও বৃক্ষ পরিচর্যার ওপর গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সর্বত্রই গাছ লাগানো প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিনামূল্যে কিংবা স্বল্পমূল্যে গাছের চারা সরবরাহ, গাছের পরিচর্যা করা ও গাছের গুরুত্ব তুলে ধরে জনমত গড়ে তুলতে হবে।


ইদানীং অবশ্য কিছুটা সচেতনতা বেড়েছে। গ্রাম এলাকায় গাছ লাগানো হচ্ছে। তবে লাগাতে হবে বনজ, ফলজ, ভেষজ ও ঔষধি গাছ। ফুল, ফল, দারুবৃক্ষ, অশ্বত্থ গাছ শুধু প্রকৃতিকে সুন্দর করে না, ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ হয়ে থাকে। দারিদ্র্য দূরীকরণে বৃক্ষ হতে পারে অকৃত্রিম বন্ধু। স্কুল-কলেজ, রাস্তার পাশে, হাইওয়ে, ট্রেন লাইনের দু’পাশে, নদীর তীরে, বাড়ির সামনে এবং খোলা জায়গা পেলে গাছ লাগাতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী একটি গাছ কাটলে অন্তত তিনটি গাছ লাগানো প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুখ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে গাছের কোনো বিকল্প নেই। শুধু গাছ লাগালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। কেননা, গত কয়েক বছরে কোটি কোটি গাছের চারা লাগানো হয়েছে। সে অনুপাতে তা গাছ হয়ে ওঠেনি। এর কারণ, যথাযথ পরিচর্যার অভাব। এই ঢাকা শহরে সড়কদ্বীপ ও আইল্যান্ডগুলোতে বিভিন্ন সময় গাছের চারা লাগানো হয়েছে। তার বেশিরভাগই গাছ হয়ে ওঠার আগেই ঝরে যায়। অনাদরে ও অবহেলায় যে গাছগুলো বেঁচে যায়, সেগুলো নগরায়ন ও সৌন্দর্যের নামে কেটে ফেলা হয়। ফলে ঢাকা শহর ক্রমশ বৃক্ষ ও ছায়াশূন্য হয়ে যাচ্ছে। নগরপিতার প্রতি অনুরোধ, প্লিজ, যে অল্প কিছু গাছ এখনো অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, তাকে রক্ষা করুন। আর যাতে কোনো গাছ না কাটা হয়, সে ব্যবস্থা নিন। সে সঙ্গে নতুন নতুন গাছ লাগানোর ব্যবস্থা ও তার যথাযথ পরিচর্যা করে পৃথিবীর অন্যান্য শহরের মতো ঢাকাকেও একটি সুন্দর, নৈসর্গিক ও তিলোত্তমা শহরে পরিণত করুন।

দৈনিক ভোরের কাগজ : ৩০ মে ২০০৩

রাসায়নিক মৌসুমি ফল আর স্বাদহীন ইলিশ


বাঙালির সব ঐতিহ্যই একে একে হারিয়ে যেতে বসেছে। সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে বাঙালি খাদ্যের যে সুনাম ও সুখ্যাতি, তা-ও যেন ম্লান হয়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে বাঙালির আহার-বিহার ও আতিথেয়তা দেশ-বিদেশে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়ে এসেছে। কিন্তু নষ্ট সময়ের আবর্তে বাঙালির সব গৌরব যেন অস্তমিত হতে চলেছে। মৌসুমি ফল আর পদ্মার ইলিশ বাঙালির জাতীয় গৌরব, সম্মান ও মর্যাদার প্রতীক। ফল ও ইলিশ দিয়ে মেহমানদের আতিথেয়তা করা বাঙালির চিরায়ত অভ্যাস এবং এটা সব সময় দারুণভাবে প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু মৌসুমি ফল ও ইলিশের সেই খ্যাতি এখন আর নেই বললেই চলে। কুচক্রী ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার কাছে সমর্পিত হয়েছে আমাদের যাবতীয় অর্জন। গাছের ফল ও নদীর ইলিশও তা থেকে বাদ যায়নি। বরং এক অসম্ভবকে সম্ভব করেছে মুনাফালোভীরা। ভেজালে ভেজালে ছেয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রতিটি পণ্য। নির্ভেজাল কোনো কিছু পাওয়া এখন কঠিন হয়ে উঠেছে। বিশেষত খাদ্য জাতীয় পণ্য সয়লাব হয়ে গেছে ভেজালে। আর এই ভেজাল জাতীয় খাদ্য খেয়ে বাংলাদেশে রোগ-বালাই বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকভাবে। হাট-বাজারে বা মার্কেটে গিয়ে কোনো ক্রেতার পক্ষেই নির্ভেজাল জিনিস যাচাই করে ক্রয় করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। ফলে অধিকাংশ মানুষই এখন ভেজাল জিনিসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে নিয়মিত ভেজাল জিনিস খাচ্ছেন। বিক্রেতাদের কাছে এক ধরনের জিম্মি হয়ে পড়েছে ক্রেতারা। ভেজালকারীরা যতটা সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী, অসংগঠিত ক্রেতাদের তাদের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। বাংলাদেশের পণ্যের গুণ ও মান যাচাই করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই) নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু তাদের সক্রিয়তা তেমনভাবে টের পাওয়া যায় না। যে কারণে ভেজাল পণ্য, ভেজাল খাদ্যে পরিবৃত হয়ে ক্রেতারা ক্রমশ ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর পথে এগিয়ে চলেছে। তাদের রক্ষা করার কোনো ব্যবস্থা বা উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ভেজাল পণ্য, ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের মাঝে এতদিন ক্রেতাদের কাছে নির্ভেজাল হয়ে ছিল মৌসুমি ফল এবং শাক-সব্জি। সবারই এমন একটা ধারণা ছিল- গাছের ফলমূল ও শাক-সব্জিতে সম্ভবত ভেজাল দেয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এ ধারণাটাও মিথ্যে হতে চলেছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের তালপাকা গরমে নগরবাসী অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও মধুমাস হিসেবে জ্যৈষ্ঠের আলাদা একটা মর্যাদা রয়েছে। জ্যৈষ্ঠের পাকা আমের মধুর রসে সবার মুখ হয় রঙিন।


এই মাস হরেক রকম মৌসুমি ফলে টইটম্বুর হয়ে থাকে। আম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, তরমুজ, ফুটি, পেঁপে, কলা এবং মৌসুমি শাক-সব্জিতে সর্বত্র একটা মৌ মৌ সৌরভ ছড়িয়ে পড়ে। অতীতে আমরা দেখেছি, নির্দিষ্ট সময়ে মৌসুমী ফল গাছে ধরেছে এবং নির্দিষ্ট সময় তা পেকেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই টসটসে পাকা আম, তরমুজ, পেঁপে, টমেটো, কলা ইত্যাদি বাজারে এসে যাচ্ছে। বিষয়টি নিশ্চয়ই ব্যতিক্রমধর্মী। হাজার বছর চলে আসা নিয়মের হঠাৎ করে এভাবে ব্যত্যয় ঘটায় সবাই অবাক হয়ে যায়। সময়ের জিনিস অসময়ে পেয়ে গেলেও তার দাম যেমন সাধারণের নাগালের বাইরে থাকে, তেমনি তার স্বাদও মোটেই মধুর নয়। জানা যায়, বিভিন্ন রকম বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করে মৌসুমি ফল পাকানো এবং শাক-সব্জি তরতাজা করা হয়। ইথিলিন অক্সাইড দিয়ে কাঁচা আম, পেঁপে, তরমুজ, কলা, টমেটো ইত্যাদি ফল কৃত্রিমভাবে পাকানো এবং ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য মৌসুমি ফল ও শাক-সব্জি সতেজ করার জন্য কার্বাইড পাউডার ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইথিলিন অক্সাইডও রাসায়নিক তরল পদার্থ। সাধারণত এটি বিভিন্ন শিল্পের রাসায়নিক উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এটা দাহ্য জাতীয় ও অত্যন্ত বিক্রিয়াশীল। এর সংস্পর্শে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা, ফুসফুস ক্ষত-বিক্ষত, মাথাধরা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট ও সাইনোসিস ছাড়াও ক্যান্সারসহ মারাত্মক অসুখে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে ফল পাকানোর জন্য। আম, কাঁঠাল, পেঁপে, কলাসহ গ্রীষ্মকালীন কাঁচা ও অপরিপক্ব ফল দ্রুত পাকাতে হলে ফলের ওপর ইথিলিন অক্সাইড ছিটিয়ে দিতে হয়। এরপর সারারাত ঢেকে রাখলে ফলগুলো কৃত্রিমভাবে পেকে এমন রূপ ধারণ করে- মনে হবে গাছপাকা ফল। কিন্তু এই রাসায়নিক পদার্থ ফলের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। সঙ্গত কারণে ফলগুলো বিষাক্ত হয়ে ওঠে। যা খেলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, কার্বাইড হলো এক ধরনের পাউডার। এ পাউডার দিয়ে গ্যাস বেলুনের গ্যাস তৈরিতে লাগে। এ পাউডারে ফলের রঙ পরিবর্তন ও সতেজকরণ করা হয়। কার্বাইড মানবদেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে থাকে। আর এসব ফল ও শাক-সব্জি খেয়ে ক্রেতারা ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট, লিভার ও কিডনির রোগ এবং চর্মরোগসহ নানা মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশেষত শিশু ও গর্ভবতী মহিলারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যায়। বাংলাদেশে মৌসুমি ফল ও শাক-সব্জির অসম্ভব কদর। দাম বেশি হলেও সব ধরনের ক্রেতাই কম-বেশি তা ক্রয় করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বিক্রেতাদের প্রলোভন ও অসচেতনতার কারণে অসংখ্য মানুষ মারাত্মক রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলায় কপার সালফেট ব্যবহার করে কাঁঠাল, কলা ও অন্যান্য ফল পাকানোর খবর জানা যায়। এখানে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কপার সালফেট দিয়ে পাকানো কাঁঠাল খেয়ে একজনের মৃত্যু ও ১১ জন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সবাই আক্রান্ত হয়েছে জ্বর, পাতলা পায়খানা, বমি ও পেট ব্যথায়। যুক্তরাষ্ট্রে ইথিলিন অক্সাইড কীটনাশক, কসমেটিক্স ইত্যাদি তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়। আর যেসব শ্রমিক এসব উৎপাদনের কাজে সম্পৃক্ত, তাদের মধ্যে একটি বিরাট অংশ লিউকেমিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে ঝরে পড়ছে।


আর সেই ইথিলিন অক্সাইড আমরা এখন খাদ্যের সঙ্গে গলাধঃকরণ করছি। বিষয়টি আশঙ্কাজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ইথিলেন অক্সাইড ও কার্বাইড পাউডার সাধারণত সবার হাতে পৌঁছানোর কথা নয়। নির্দিষ্ট প্রেসক্রিপশন কিংবা সার্টিফিকেট ছাড়া ওষুধ বিক্রেতাদের এটা বিক্রি করার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধ থাকার কথা। কিন্তু মুনাফার আশায় বিক্রেতারা কোনো রকম বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে যার-তার কাছে ইথিলিন অক্সাইড ও কার্বাইড পাউডার বিক্রি করছে। কিছুসংখ্যক লোক এটা বুঝে অধিক মুনাফার লোভে মৌসুমি ফল ও শাক-সব্জিতে ব্যবহার করলেও অধিকাংশ ফল ও শাক-সব্জি বিক্রেতা এর ক্ষতিকারক প্রভাব সম্পর্কে মোটেও ওয়াকিবহাল নয়। তেমনিভাবে ওয়াকিবহাল নয় ক্রেতারাও। কেননা, এমন একটি অভিনব প্রতারণার ফাঁদ যে পাতা হয়েছে, এটা ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা বা অনুধাবন করা মোটেও সম্ভব নয়। আর এ জন্য আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি ক্রেতা-বিক্রেতাদের সচেতন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই কিছুদিন আগেও স্বাদে-গন্ধে ইলিশ মাছের কোনো তুলনা ছিল না। এক বাড়িতে ইলিশ মাছ রাঁধা হলে তার গন্ধ পেতেন আশপাশের বাড়ির লোকেরা। কিন্তু ইদানীং ইলিশ মাছের স্বাদ ও গন্ধ তো দূরে থাক, খেতেও ইচ্ছে করে না। মাছের রাজা ইলিশ তার গুণাগুণ ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে বড় মৎস্য সম্পদ হলো ইলিশ মাছ। একক প্রজাতি হিসেবে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের শতকরা প্রায় ২০ ভাগই ইলিশ। সেই প্রাচীনকাল থেকে ইলিশের প্রতি বাঙালির আকর্ষণ চিরন্তন। শুধু প্রিয় খাদ্য হিসেবে নয়, জেলেদের আয়ের প্রধান উৎসও ইলিশ। কিন্তু নানাবিধ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মানুষের লোভের কারণে ইলিশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। সাগর, মোহনাঞ্চল ও নদীতে ইলিশের দেখা মেলে। উপকূলীয় নদ-নদীসমূহে পর্যাপ্তসংখ্যক ইলিশের বিচরণ। এ উপমহাদেশের ৭৫ শতাংশ ইলিশের বিচরণস্থল আমাদের এই বাংলাদেশ। বাংলাদেশের ইলিশের খ্যাতি জগতজোড়া। বিশেষ করে কলকাতায় বসবাসরত পূর্ববাংলার মানুষ এবং অভিবাসী বাংলাদেশীদের কাছে ইলিশ মাছ এক ধরনের নস্টালজিয়া। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব ফুটবল খেলায় জয়ী হলে ইলিশের চাহিদা দারুণভাবে বৃদ্ধি পায়। ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ। প্রজনন মৌসুমে এ মাছ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে উজান স্রোতে সাঁতার কেটে চলে আসে। ডিম ছাড়ার পর আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। ডিম থেকে পরিপক্ব মাছ হওয়ার মাঝামাঝি সময়টাকে বলা হয় ‘জাটকা’। জাটকা বড় হওয়ার জন্য সমুদ্রে চলে যায়। পরিপক্বতা লাভের পর প্রজননের জন্য সমুদ্র হতে মিঠা পানিতে আসে। কিন্তু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা জাটকা মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করায় নদীর ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ষাটের দশক থেকে ইলিশের উৎপাদন হ্রাস পেতে থাকে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের নদ-নদীতে আর ইলিশ মাছ দেখা যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০০০ সালে ২০ হাজার টন জাটকা ধরা পড়েছে। ১৯৯০ সালে এর পরিমাণ ছিল ৫ হাজার টন। এত জাটকা ধরার পরও বাংলাদেশে বছরে ইলিশ উৎপাদন হয় দেড় লাখ টন। ইলিশ মাছ তার গতিপথ পরিবর্তন করে মিয়ানমারের নাফ ও অন্যান্য নদীতে চলে যাচ্ছে। আগে বাংলাদেশের যেসব নদীতে ৯৫ শতাংশ ইলিশ পাওয়া যেত, এখন সেখানে তা হ্রাস পেয়ে ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।


আমরা বাজারে যে ইলিশ মাছ দেখতে পাই, তার সিংহভাগই সমুদ্রের ইলিশ এবং মিয়ানমার থেকে আসে। যে কারণে ইলিশ মাছে মিঠা পানির স্বাদ ও গন্ধ নেই। তবে সরকারিভাবে ইলিশ মাছ হ্রাস পাবার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে নদ-নদীর উজান এলাকায় পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়ায় পদ্মা ও মেঘনাসহ দেশের সব নদীর পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় ইলিশের প্রজননক্ষেত্র বিনষ্ট, প্রজনন মৌসুমে অধিকহারে ডিমওয়ালা ইলিশ ও জাটকা নিধন করায় ইলিশের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত, নদীতে ইলিশের সংখ্যা হ্রাস, প্রবাহিত নদীগুলোর উজানে ফারাক্কাসহ ভারতের বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণের ফলে বাংলাদেশের নদীতে পানি প্রবাহ হ্রাস ও গতিপথ পরিবর্তিত হওয়া, দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও সেচ প্রকল্পের কারণে নদ-নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ব্যাহত এবং কারেন্ট জালের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি। এসব কারণে বাংলাদেশের নদীতে ক্রমান্বয়ে ইলিশ মাছ কমে যাচ্ছে। সে জায়গায় আসছে সমুদ্র ও মিয়ানমারের ইলিশ। যে কারণে বাঙালির প্রিয় খাদ্য ইলিশ মাছ এখন অপ্রিয় খাদ্যে পরিণত হতে চলেছে। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশ তার গন্ধ, বর্ণ, সৌন্দর্য হারিয়ে স্বাদহীন মাছে পরিণত হয়েছে। ইলিশ মাছের সেই বনেদিয়ানা ও স্বাদ ফিরিয়ে আনতে হলে জাটকা নিধন রোধ, কারেন্ট জাল বন্ধ করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে। বাঙালি তার যাবতীয় অর্জনগুলো হারিয়ে নিঃস্ব হলেও তার খাদ্য ও আতিথেয়তাটুকুর অন্তত সুখ্যাতি ছিল। কিন্তু মৌসুমি ফল আর ঐতিহ্যবাহী পদ্মার ইলিশ এখন বাঙালির রসনাকেই তৃপ্ত করতে পারছে না। সে ক্ষেত্রে বাঙালি তার আতিথেয়তার দুই প্রিয় উপকরণ দিয়ে কীভাবে অতিথিকে আপ্যায়িত করবে? একে একে বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি নানা অর্জনগুলো যখন নষ্ট-ভ্রষ্ট হয়ে গেছে, ঠিক তখন মৌসুমি ফল আর পদ্মার ইলিশকে হারিয়ে আমরা আরো বেশি নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছি। 

দৈনিক সংবাদ : ২৩ মে ২০০৩

আমরা কি বধির হয়ে যাব?


আজকাল ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিংবা দূরালাপনীতে কথা বললেও আশপাশের মানুষজনও সচকিত হয়ে ওঠেন। কথা বলার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ তো দূরে থাক, একান্তে বা নিঃশব্দে কথা বলার চল যেন আমাদের জীবন থেকে উঠে গেছে। চিৎকার করে কথা না বললে যেন কেউ কারো কথা শুনতে পান না। এমনটি তো এই কিছুদিন আগেও ছিল না। তাহলে হঠাৎ এমন কি হলো, যে জন্য বদলে যাচ্ছে মানুষ! কথা বলছেন উচ্চ কলরবে। আসলে নাগরিক জীবন আমাদের বদলে দিচ্ছে। ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে কোলাহল। চারপাশের কোলাহলে মানুষ ক্রমশ উচ্চভাষী হয়ে যাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে- জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলার কী সম্পর্ক? সম্পর্কটা এখানে, ঢাকায় যে হারে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, তার চেয়ে বেশি বাড়ছে যানবাহন। বছর তিনেক আগের এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, প্রতি বছর ঢাকায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পক্ষান্তরে পরিবহন বৃদ্ধির হার আনুমানিক ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এই বিপুলসংখ্যক পরিবহনের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায় শব্দ ও বায়ু দূষণের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। আর এর ফলে মানুষ ক্রমান্বয়ে বধির হয়ে যাচ্ছে। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, আমরা সবাই কথা বলছি জোরে জোরে, নতুবা একজনের কথা আরেকজনের পক্ষে শুনতে অসুবিধা হচ্ছে। অনেকটা কৌতুকাভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায়ের সেই দুই বধিরের কথোপকথনের মতো। পৃথিবীর যে ক’টি শহরে শব্দ দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে ঢাকা অন্যতম। মূলত পরিবহন খাত থেকেই শব্দ দূষণের সূত্রপাত। রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ডিজাইনের গাড়ি চলাচল করে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত দুই স্ট্রোকবিশিষ্ট বেবিট্যাক্সির উৎপাতে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল নাগরিক জীবন। কিন্তু বেবিট্যাক্সি উঠে গেলে বায়ু দূষণ কিছুটা হ্রাস পেলেও শব্দ দূষণের মাত্রা কিন্তু একটুও কমেনি।


কেননা, ঢাকায় যেসব নানা কিসিমের যানবাহন চলাচল করে, তাদের অধিকাংশই পুরনো মডেলের। পুরনো মডেল হলেও কিছু আসে যায় না। কিন্তু এসব গাড়ির বেশিরভাগই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব গাড়ির কারণে শব্দ ও বায়ু দূষণ বেড়েই চলেছে। কেউ যদি ঢাকার গণ্ডি ছাড়িয়ে একটুখানি গ্রামের দিকে যান, তিনি পাবেন তাজা ও সতেজ নিঃশ্বাস এবং শব্দহীন এক নির্জন পরিবেশ। ঢাকার তুলনায় গ্রামে দূষণের মাত্রা অনেক কম। বৃষ্টি-মৌসুমে বিশেষত নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত দূষণের পরিমাণ থাকে অত্যধিক। তবে কোনো মৌসুমেই শব্দ দূষণের হেরফের হয় না। ঢাকায় শব্দ দূষণের উৎপত্তিস্থল যানবাহন ছাড়াও আছে যখন-তখন ও যত্রতত্র নির্বাচনী প্রচারণা, সমাবেশ ও পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য সশব্দে মাইকিং, ইট ভাঙ্গার মেশিন, শিল্প-কারখানা, ঘরে-মিলনায়তনে-গাড়িতে উচ্চ শব্দে গান শোনা, জেনারেটরের তীব্র গর্জন ইত্যাদি। শব্দ দূষণের পাশাপাশি বায়ু দূষণও ঢাকাকে রোগাক্রান্ত করে রেখেছে। যানবাহন, শিল্প-কারখানা, ইটের ভাটাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে নির্গত হয় কালো ধোঁয়া। এই কালো ধোঁয়ায় থাকে কার্বন মনোক্সাইড, হাইড্রো কার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড, সালফার অক্সাইডের দূষিত উপাদান। আবাসিক এলাকা ও কর্মস্থলের আশপাশে এসব দূষিত উপাদান ছড়িয়ে পড়লে তা সরাসরি মানুষের দেহে ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে। এ কারণে অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেশি। শব্দ ও বায়ু দূষণের কারণে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৫ হাজার লোক অকালে ঝরে যায়। এ তথ্য দিয়েছেন স্বয়ং পরিবেশমন্ত্রী।


শব্দ ও বায়ু দূষণের কারণে যে রোগে আক্রান্ত হতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম- রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, ব্রঙ্কাইটিস, বধির হয়ে যাওয়া, স্মায়ুর চাপ, ক্রনিক ডিজিজ ইত্যাদি। এছাড়া অমনোযোগিতা, ঘুমে ব্যাঘাত, মেজাজ চড়ে যাওয়া, আতংকিত হওয়ার মতো মানসিক ব্যাধি তো আছেই। হাসপাতালের রোগীদের মারাত্মক অসুবিধা ছাড়াও স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের চলাচলের সমস্যা ও পড়ালেখায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়ে থাকে। প্রতিবছর মৃত্যু ছাড়াও লাখ লাখ লোক নানারকম শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়। শব্দ ও বায়ু দূষণ এড়ানো গেলে বাংলাদেশে প্রতি বছর ৬৫ লাখ লোককে চিকিৎসাধীন এবং সাড়ে ৮ কোটি লোককে ছোটখাট অসুখে ভুগতে হতো না। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশীয় পরিবেশ ইউনিটের একজন ঊর্ধ্বতন পরিবেশ বিজ্ঞানী জীতেন্দ্র শাহ এক সমীক্ষায় জানিয়েছেন, শব্দ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে প্রতি বছর বাংলাদেশ শুধু চিকিৎসা খাতেই ২০০ থেকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি এড়াতে পারবে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরে শব্দ ও বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য ২০০০ সালে ৯ আগস্ট বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সরকার প্রায় ২৪ কোটি টাকা ঋণ লাভ করে। কিন্তু সে টাকার কতটুকু সদ্ব্যবহার হয়েছে, তা জানা না গেলেও শব্দ ও বায়ু দূষণের মাত্রা বরং আগের মতোই আছে। প্রতিটি দিন, প্রতিটি ঘণ্টা দূষিত হচ্ছে বায়ু, সঙ্গে শব্দ দূষণের তীব্রতা। নাক ও মুখ দিয়ে দূষিত বায়ু ঢুকে শ্বাস-প্রশ্বাসের পাশাপাশি ফুসফুস ঝাঁজরা হয়ে গেলেও এ মুহূর্তে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শব্দ দূষণ। শব্দ দূষণে বধির হয়ে যাওয়াটা একটা মামুলি ঘটনা। কিন্তু এর ফলে আমাদের øায়ু ও মানসিক যে বৈকল্য ঘটছে, তা থেকে উদ্ধার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে স্মায়ু ও মানসিক রোগীর সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এক সমীক্ষায় দেখা যায়, শতকরা ৯৭ শতাংশ ছাত্র জানিয়েছে, গাড়ির হর্নের কারণে তাদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটে। ৮৬ শতাংশ লোক শব্দ দূষণকে বড় সমস্যা বলে স্বীকার করেছেন। সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে চালানো এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শব্দ দূষণকে ৭৮ শতাংশ লোক বলেছেন অধিকতর খারাপ, ৭১ শতাংশ বলেছেন শিরঃপীড়ার কারণ, ৪৯ শতাংশ বলেছেন মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। ৪৩ শতাংশ অমনোযোগী হয়ে পড়ে ও ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি হয় এবং ৩৩ শতাংশ কানে কম শুনতে পান। এঁদের সবাই কম-বেশি স্মায়ু ও মানসিক পীড়ায় ভুগছেন। আমাদের দেশে গবেষণার মান আশানুরূপ নয় বিধায় হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন কিংবা যারা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন কিংবা হন না, তাদের রোগের মূল কারণটা ধরতে পারা যায় না। তবে বিদেশি গবেষকরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের রোগের অন্যতম কারণ শব্দ ও বায়ু দূষণ। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, শব্দ ও বায়ু দূষণ বাংলাদেশে কতটা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ শব্দ ও বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ যেহেতু আমরা জানি, সেহেতু এই সমস্যা দূর করাটা কঠিন কোনো বিষয় নয়। প্রধানত যানবাহনের কারণেই হয় শব্দ ও বায়ু দূষণ। বিশেষ করে শব্দ দূষণ সৃষ্টি হয় ট্রাফিক জ্যাম থেকে। অধিকাংশ গাড়ির চালক ট্রাফিক জ্যাম ও সিগন্যাল থাকা সত্ত্বেও অনর্থক হর্ন বাজিয়ে নাভিশ্বাস তোলেন। রিকশা ও পথচারীদের কারণে গাড়ির চালকদের হর্ন বাজাতে হয়। রিকশাওয়ালারা অধিকাংশ সময় ট্রাফিক আইন মানতে চান না। অনেক পথচারী ইচ্ছেমত রাস্তা পারাপার এবং রাস্তার ওপর আড্ডা মারেন।


তাছাড়া ফুটপাত হকারদের দখলে চলে যাওয়ায় পথচারীদের রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হয়। পরিস্থিতির কারণে গাড়ি চালকদের হর্ন বাজানো ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। ঢাকায় শব্দ ও বায়ু দূষণ দূর করার জন্য জরুরিভিত্তিতে যা করা দরকার : খুব বেশি প্রয়োজন না হলে গাড়ির হর্ন না বাজানো, নির্বাচনী প্রচারণা, সমাবেশ ও বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য মাইকিং নিষিদ্ধ, ট্যানারি, লেদ মেশিনসহ শিল্প-কারখানা করতে না দেয়া, ইট ভাঙার মেশিন নিষিদ্ধ, ২০ বছরের বেশি পুরনো যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ, আনফিট যানবাহন চলাচল বন্ধ, হাইড্রোলিক হর্ন নিষিদ্ধ, গাড়ির চালকরা যাতে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন, সেটুকু শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা, বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা বিদ্যুৎ থাকলেও জেনারেটর না চালিয়ে সৌরচুল্লী ব্যবহার করা, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতি, ট্রাফিক ও শব্দ দূষণ সংক্রান্ত আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা। সর্বোপরি জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। জনসচেতনতা গড়ে উঠলে শব্দ দূষণ ও বায়ু দূষণ দূর করা কঠিন নয়। মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকার কারণেই দেশব্যাপী পলিথিনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠেছে। জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে শব্দ ও বায়ু দূষণ সংক্রান্ত লেখা থাকা এবং তা বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ করা; পাশাপাশি সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরও এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। মানুষ যখন এর অপকারিতা বুঝতে পারবে, তখন তারা এমনি এমনিই সচেতন হয়ে উঠবে। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের পাশাপাশি একটুখানি নিরিবিলি থাকতে কে না পছন্দ করে? নিরিবিলি পরিবেশ ছাড়া মানুষের মৌলিক চিন্তা-ভাবনার প্রসারণ ঘটে না। সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, মনীষী ও পণ্ডিত ব্যক্তিরা একটু একাকীত্ব থাকতে ভালোবাসেন। জ্ঞানচর্চার জন্য তারা বেছে নেন নির্জন পরিবেশ। এছাড়া কোনো কোনো ব্যস্ত মানুষও চান কাজের ফাঁকে একটুখানি প্রশান্তি। সাপ্তাহিক ছুটিতে সবাই ছুটতে চান এমন এক প্রাকৃতিক পরিবেশে, যেখানে নেই কোনো ঝঞ্ঝাট ও শব্দের কোলাহল। কিন্তু ঢাকা থেকে আস্তে আস্তে নির্জন পরিবেশ যেন হারিয়ে যাচ্ছে।


যে হারে ইট-পাথর-সিমেন্টের কর্কশ নিসর্গ গড়ে উঠছে, তার মাঝে একটুখানি স্বস্তিতে নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ নেই। যে সবুজ-শ্যামল প্রকৃতিতে রাজধানীর ঢাকার বিকাশ ও বিবর্তন, সেই ঢাকা এখন প্রাণহীন হয়ে পড়ছে। গাছপালা, সবুজ প্রকৃতি ক্রমশ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে খোলা প্রান্তর, মাঠ, উদ্যান। ক্রমান্বয়ে তা সংকুচিত হয়ে আসছে। এর মাঝে ঢাকার আইল্যান্ডগুলোতে রোপিত বৃক্ষগুলো কিছুটা হলেও আমাদের চোখ ও মনের ভোজন তৃষ্ণা মেটায়, সেই বৃক্ষগুলোও সড়ক উন্নয়নের নামে বিরল হয়ে উঠছে। একদিকে যখন সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ; অন্যদিকে রাজধানী ঢাকা শব্দ দূষণ ও কোলাহলময় হয়ে উঠছে। প্রতি মুহূর্ত শব্দ তরঙ্গে কেঁপে কেঁপে উঠছে। কোথাও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ নেই। আমরা যেন শব্দের সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে হাবুডুবু খাচ্ছি। নিরন্তন উঁচু উঁচু ভবন গড়ে ওঠায় তার শব্দে প্রতিটি পাড়া-মহল্লার নির্জনতা ও নিরিবিলিটুকু হারিয়ে যাচ্ছে। একটুখানি বিশ্রাম ও পিন-পতন নীরবতায় ঘুমানো এখন স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। ঘরের বাইরে বের হলে তো কথাই নেই। গাড়ির হর্নে কেঁপে ওঠে আমাদের শরীরের প্রতিটি লোমকূপ। যে হারে মানুষের জনস্রোত বাড়ছে, সে অনুপাতে বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। বাড়ছে শব্দ-নিনাদ। ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছে কান, মস্তিষ্কের নিউরন। আর এর ফলে অনেকেই নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বধির হয়ে যাচ্ছেন। প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন অসুস্থ ও বধির হয়ে যাচ্ছেন অসংখ্য লোক। তাহলে কেন জেনে-শুনে আমরা বিষ পান করবো! তাই আমাদের সবারই উচিত শব্দ দূষণ ও বায়ু দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করা। এ মুহূর্তে এবং এখনই। 

দৈনিক ভোরের কাগজ : ৮ মে ২০০৩

সার্স : মিশন ইম্পসিবল থ্রি!


ইরাকে মার্কিন আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব থিতু হতে না হতেই ‘সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি সিনড্রম’ বা ‘সার্স’ ভাইরাস নিয়ে এখন সারা দুনিয়ায় তোলপাড় চলছে। হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা এই রোগে প্রতিদিনই আক্রান্ত হচ্ছে অসংখ্য ব্যক্তি এবং মৃতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। ইতোমধ্যে বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ‘সার্স’। একমাত্র কানাডা ছাড়া অধিকাংশই আসিয়ানভুক্ত, আসিয়ান সংলগ্ন কিংবা এশিয়ান দেশ। মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৪০০ ছাড়িয়ে গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা ছয় সহস্রাধিক। প্রতিদিনই এর বিস্তার ঘটছে। যে হারে মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে, তাতে অতীতের যে কোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। ১৯১৮ সালের স্প্যানিশ ফ্লু মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়লে পাঁচ কোটি লোকের মৃত্যু হয়েছিল। শুধু গত বছর এইডসে মারা গেছে ৩০ লাখ লোক। একদল বিজ্ঞানী মনে করছেন, স্বাস্থ্যসেবার মান খুবই নিম্ন এমন সব দেশে যদি ‘সার্স’ একবার হানা দেয়, তাহলে বিশ্বে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। সেক্ষেত্রে ‘সার্স’ এই পৃথিবীকে কোথায় নিয়ে যাবে, তা কেউ অনুধাবন করতে পারছে না। মরণঘাতী ‘সার্স’-এর আগ্রাসন থেকে কীভাবে বাঁচা যাবেÑ তা নিয়ে বিশ্ববাসী ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যার দেশ চীন। আর জনবহুল শহর রাজধানী বেইজিং। প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এই শহরটা ঘড়ির কাঁটা মেপে মেপে চলে। ২৪ ঘণ্টার প্রতিটি সেকেন্ডই কখন যেন কর্মব্যস্ততায় কেটে যায়! সাধারণত বাসস্ট্যান্ড ও বাসে থাকে উপচে পড়া ভিড়। চলতে থাকে সারি সারি সাইকেল। সারাদিন জীবনের উত্তাপে ফুটতে থাকে বেইজিং। সেই বেইজিংয়ে এখন অবিশ্বাস্যভাবে শুনশান নীরবতা। কোথাও ট্রাফিক জ্যাম নেই। রেস্তোঁরা ও শপিং মলগুলো পরিত্যক্ত শ্মশানের মতো ভূতুড়ে। সিনেমা হলগুলোর ফটক শিকল দিয়ে আটকানো। কোনো সংলাপ ভেসে আসে না। নেই কোনো সুর। খাঁখাঁ করছে ইন্টারনেট ক্যাফে। স্কুলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। থেমে গেছে বালক-বালিকাদের চপলতা। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রদের থাকতে দেয়া হচ্ছে না। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে লাখ লাখ ছাত্র-ছাত্রীর জীবন। গুরুতর প্রয়োজনেও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য লবণ, তেল, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস ক্রয়ের জন্য দু’একজন লোক মুখোশ এঁটে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন। পুরো শহরই যেন মুখোশ পরিধান করে আছে। সবাই স্বেচ্ছায় এক ধরনের বন্দি জীবনযাপন করছেন। খুঁজছেন নির্জনতা। এর মাঝে ব্যতিক্রম রেলস্টেশন। বেইজিংবাসী শহর ছেড়ে চলে যাবার জন্য ভিড় করছেন রেলস্টেশনে। তবে বাইরের লোকজন যাতে ঢুকতে না পারেন, সে জন্য বেইজিং-এর বাইরের গ্রামগুলোতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলছে পুরো সমাজতান্ত্রিক চীন। আর এমনটি হয়েছে ‘সার্স’ নামক এক রহস্যময়ী রোগের প্রাদুর্ভাবে। তবে যতটা না আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, তারচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। রহস্যজনক এই রোগটি এখন চীনের জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। চীনের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। ধস নেমেছে পরিবহন, বিমান, পর্যটন ব্যবসায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ক্রমশ নিম্নগামী। ‘সার্স’ ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির ভিত্তিকে দারুণভাবে কাঁপিয়ে দিয়েছে। মাস ছয়েক আগে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ গুয়ানডঙে ‘সার্স’-এর সূত্রপাত। শুরুতে চীন সরকার বিষয়টিকে হালকা করে দেখে। চীন তার রুদ্ধ দুয়ার নীতি অনুসারে সব কিছু ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে, অজ্ঞাত কোন রোগ যখনই কোথাও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সরকারসহ বিভিন্ন কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে ওই রোগটিকে কেন্দ্র করে গঠনমূলক পদক্ষেপের চেয়ে ভীতি, কুসংস্কার, গুজব ছড়ানো ও অজ্ঞতাপ্রসূত মাত্রাতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের প্রবণতা বেড়ে যায়। তাছাড়া পুরো বিষয়টি চেপে রাখার যে প্রবণতা, সেক্ষেত্রে চীনাদের ভূমিকা তো প্রবাদে পরিণত হয়েছে। চীনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঝাং ওয়েনকাং এই রোগটিকে নিয়ে অবজ্ঞা ও উপহাস করতে থাকেন। কিন্তু পরিস্থিতি যখন ভয়াবহ হয়ে ওঠে, তখন তার পক্ষে তা সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতির কথা স্বীকার করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) প্রতিনিধিদের বেইজিংয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়। হু’র প্রতিনিধিরা বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনে যেয়ে ঘটনার ভয়াবহতা ফাঁস করে দিলে ফুসে ওঠে বেইজিংবাসী। তাদের বিক্ষোভের মুখে ২০ এপ্রিল স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়।

১৯৪৯ সালে চীনে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা লাভের পর এই প্রথম সরকার অসততার জন্য কোনো একজন মন্ত্রীকে বরখাস্ত করলো। একই দিন বরখাস্ত করা হয় বেইজিং-এর মেয়রকে। মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা যথাযথভাবে জানতে পেরে পরিস্থিতিকে মহামারী হিসেবে ধরে নিয়ে চীনা সরকার যেসব অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্তোঁরায় ‘সার্স’ আক্রান্ত রোগীদের পদস্পর্শ পড়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গরোধ করার জন্য বিচ্ছিন্ন করে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে দুই সহস্রাধিক স্বাস্থ্যকর্মীকে। বেইজিং হাসপাতপালে আক্রান্তদের মধ্যে আছেন ৭০ জন চিকিৎসক, নার্স ও ২০ জন রোগী। চীনের একটি স্কুলে ‘সার্স’ রোধে কোয়ারেন্টাইন (রোগ-সংক্রমণ প্রতিরোধে পৃথক বা আটক রাখা) সেন্টার স্থাপনকে কেন্দ্র করে ২৭ এপ্রিল রাতে বন্দরনগরী তিয়ানজিনে ব্যাপক দাঙ্গা বেধে যায়। বেইজিং বিদেশীদের আসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু যে বেইজিং ‘সার্স’-এ আক্রান্ত হয়েছে এবং তারাই যে কেবল এরকম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে তা নয়। বিশ্বের যেসব দেশ আক্রান্ত হয়েছে, সবারই কম-বেশি একই রকম অবস্থা। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে কী এই ‘সার্স’? যে জন্য দেশে দেশে সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থার। ‘সার্স’-এর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, মারাত্মক অ্যাকিউট শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহজনিত এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দেহে তাপমাত্রা বেড়ে যায় ১০৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এর সঙ্গে থাকে শুকনো কাশি। শ্বাসকষ্ট, মাথা ধরা, অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠা, শরীরে চাক চাক দাগ, মাংসপেশীতে ব্যথা, কাঁপুনি, পেট খারাপ ইত্যাদি। এই ভাইরাসটি মুখ, নাক ও চোখ দিয়ে শরীরে ঢোকে। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি কেউ থাকলে হাঁচি-কাশির সঙ্গে বের হওয়া ভাইরাসে সংক্রমণ ঘটে। কোনো স্থানে ভাইরাসে সংক্রমিত হলে, সেখানে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত তা জীবিত থাকে। সে সময়ের মধ্যে কেউ আক্রান্ত স্থান দিয়ে চলাচল করলে তার দেহেও ভাইরাস ছড়িয়ে পড়বে। এ থেকে রক্ষা পেতে হলে মাস্ক, কালো চশমা ও গ্লাভস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
 কিন্তু সব নিয়ম-নীতি ও আইন লংঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বেপরোয়া আগ্রাসন চালিয়ে যখন ইরাক দখল করে নেয়, ঠিক তখন ‘সার্স’-এর প্রাদুর্ভাব হওয়ার সঙ্গে অনেকে বিষয়টিকে এক সুতোয় গাঁথার চেষ্টা করছেন। যারা এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন, তাদের যুক্তি কি একদমই উড়িয়ে দেয়া যাবে? একসময়ের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের ভগ্নাংশ রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, ইরাকের আগ্রাসন থেকে বিশ্বের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া এবং ওই আগ্রাসনের সময় অন্যতম পরাশক্তি চীনকে তার নিজের ঝামেলা নিয়ে ব্যস্ত রাখতে মার্কিনিরাই ‘সার্স’ ভাইরাস ছড়িয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অন্যতম স্থায়ী সদস্য চীন ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের অন্যতম বিরোধিতাকারী শক্তিধর দেশ। চীনকে টার্গেট করার আরেকটি কারণও উড়িয়ে দেয়া যায় না। জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের পয়লা নম্বর দেশ চীনের প্রতিটি লোকের হাতকে কর্মীর হাতে পরিণত করা হয়েছে।


চীন যেভাবে সস্তায় ও সুলভে পণ্যসামগ্রী উৎপাদন করতে পারে, তেমনটি কারো পক্ষে সম্ভব নয়। যে কারণে সারা বিশ্বে ছেয়ে আছে চীনের পণ্যসামগ্রী। এমনকি খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার দখল করে আছে চীন। চীনসহ ১১০টিরও বেশি দেশ গ্যাট (জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অব ট্যারিফস অ্যান্ড ট্রেড)-এর সদস্য। ১৯৪৭ সালে প্রথম স্বাক্ষরিত গ্যাটের চুক্তি অনুযায়ী সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ২০০৫ সালে মার্কেট উন্মুক্ত হয়ে যাবে। ফলে ট্রেড মার্কযুক্ত এক দেশের পণ্য অন্য দেশসমূহে অবাধে বিক্রি করা সম্ভব হবে। উন্মুক্ত বাণিজ্যের ফলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে চীন। ফলে গ্যাট চুক্তি অনুসারে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে চীন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠবে। তখন পরাশক্তি হিসেবে চীনের সঙ্গে অন্য যে কারোই টেক্কা দেয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এমন এক দূরদর্শী কূট-পরিকল্পনা থেকে চীনকে দুর্বল করা হতে পারে। এক্ষেত্রে রাশিয়ার একাডেমি অব মেডিক্যাল সায়েন্সের বিজ্ঞানী সের্গেই কোলেসনিকভের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ২৫ এপ্রিল সাইবেরিয়ার আর্কতুস্কে এক সংবাদ সম্মেলনে ওই বিজ্ঞানী বলেন, পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী নিউমোনিয়া আদলের রোগ ‘সার্স’-এর ভাইরাস কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং সম্ভবত ব্যাকটেরিয়াঘটিত জীবাণু অস্ত্র হিসেবেই একে প্রয়োগ করা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনের সময় চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে ব্যতিব্যস্ত রাখা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে অগ্রসরমান এ অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করার লক্ষ্যে পশ্চিমা শক্তির কোনো ক্রীড়নক সংস্থা কৌশলে তা ছড়িয়ে দিয়েছে। এতে পর্যটন শিল্প ও বিমান পরিবহন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে যুদ্ধের চেয়েও এর ক্ষয়ক্ষতি কম তো নয়ই, বরং অনেক বেশিই হবে। এই বিজ্ঞানী আরো বলেন, ‘সার্স’ ভাইরাস মানুষের সৃষ্ট এবং এটি সম্ভবত একটি জীবাণু অস্ত্র। এই ভাইরাসে এমন উপাদান আছে যা এখনো নির্ণীত হয়নি। এতে যে জেনেটিক উপাদান আছে, তার সঙ্গে মানুষের পরিচিত কোন ভাইরাসের মিল নেই। এগুলো সিনথেটিক ভাইরাস। নিউমোনিয়া ধরনের ‘সার্স’ রোগের ভাইরাস দুটি ভাইরাসের সংমিশ্রণ আর এগুলো হাম, মাম্পসের দুটি ভাইরাসের সংমিশ্রণে গঠিত। প্রাকৃতিকভাবে যা অসম্ভব ধরনের ভাইরাস। এটি কেবল ল্যাবরেটরিতে প্রস্তুত করা হতে পারে। এটা যেহেতু বানানো হয়েছে, তাই এর প্রতিষেধকও তৈরি করা সম্ভব। ‘সার্স’ ভাইরাস দিয়ে চীনে বদ্ধ দুয়ার খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চেষ্টার কমতি নেই। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে চীন। চীনকে টুকরো টুকরো করে দিতে পারলে একে একে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তরায়গুলো দূর হয়ে যাবে। যদিও বিশ্বে রাজনীতি ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়, তারপরও ‘বিশালদেহী’ চীন খণ্ডিত হলে ভেঙে পড়বে বিশ্ব ব্যবস্থা। এ কারণে ‘সার্স’কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের বড়শি ফেলা সহজ হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টির পাশাপাশি চীনের অভ্যন্তরীণ সংকটও সৃষ্টি করতে পেরেছে। প্রাথমিক অবস্থায় চীন তার রীতি অনুযায়ী ‘সার্স’ রোগ নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখলেও এই রোগের বিস্তার দ্রুত ঘটতে থাকায় তারা এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার সিদ্ধান্ত নেয়। জনদাবির প্রেক্ষিতে স্বচ্ছতার জন্য ক্যারিয়ার-আমলা ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী দৃঢ়চেতা উ সিকে ‘সার্স’-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সরকারের তরফ থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। পাশ্চাত্য ঘেঁষা ও উদারপন্থী এই কূটনীতিককে দায়িত্ব দেয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি সংস্কারের পথে অনেকটা এগিয়ে যেতে পারবে। পার্টির বয়োজ্যেষ্ঠরা দীর্ঘদিন যাবৎ সংস্কারের বিপক্ষে লড়াই চালিয়ে আসছেন, পার্টির একজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাও টঙ বলেছেন, জনগণের সমর্থন পাবার এইতো চমৎকার সুযোগ। এর ফলে আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় হবে।
১৯৮৯ সালে তিয়ানআনমেন স্কোয়ারে অভ্যুত্থানের পর বাও টঙকে পার্টি থেকে অপসারণ করা হয়। তিনি আরো বলেন, উদধভট ডটভ পণণয ফধশধভথ ধভ ট ঠফটডপ ঠমস মভ র্ধ ডটভ ফধশণ ধভর্ দণ ্রলভ্রদধভণ. অত দণ ডটভর্’র্ টপণ টঢশটর্ভটথণ মতর্ দধ্র ্রর্ধলর্টধমভ টভঢ বমরণ ধর্ভমর্ দণ ্রলভ ভমষ.র্ দণভ ষদণভ? অর্থাৎ চীন একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কিংবা রৌদ্রকরোজ্জ্বল আলোয় বসবাস করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে প্রাপ্ত সুযোগ কাজে লাগাতে এবং আলোয় আসতে যদি না পারে, তাহলে আর কবে পারবে? এ কথাগুলো যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন যাবৎ আকারে-ইঙ্গিতে বলে আসছে। চীনকে গণতন্ত্রের উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের চোখে যেন ঘুম নেই। তারা ছলে-বলে-কৌশলে চীনকে গণতন্ত্রের পাঠ দেয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ‘সার্স’কে কেন্দ্র করে তাদের চাওয়াটা যেন চীনের সংস্কারপন্থী নেতাদের মুখে সরব হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্র নিশ্চয়ই উত্তম ব্যবস্থা। কিন্তু হালে গণতন্ত্রের যে রূপ ফুটে উঠেছে, তাতে আতংকিত না হয়ে পারা যায় না। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার যেভাবে খর্ব করা হয়েছে এবং বিশ্ব জনমতকে উপেক্ষা করে যেভাবে ইরাকে আগ্রাসন চালানো হয়েছে, তেমন গণতন্ত্র নিশ্চয়ই কেউ আশা করেন না। এ কারণে চীনে গণতন্ত্র প্রবর্তনের যে তথাকথিত উদ্যোগ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তাতে বিশ্ববাসী সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাবার মতো অবস্থা হয়েছে।
যা হোক, চীনের গণতন্ত্র নিয়ে আপাতত না ভাবলেও চলবে। কিন্তু যেটি ভাবনার বিষয়- সেটি হচ্ছে ‘সার্স’। ‘সার্স’ নিয়ে সারা দুনিয়া আতঙ্কিত হলেও এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তেমন ভাবনা নেই। ছয় মাস পরও যুক্তরাষ্ট্র ‘সার্স’-এ আক্রান্ত হয়নি। এ নিয়ে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কিংবা কোনো গবেষণার খবরও চোখে পড়ছে না। তারা অনেকটা চুপচাপ ও নির্বিকার। বিষয়টি রহস্যজনক নয় কি? এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি)-এর পরিচালক ডা. জুলি গারবার্ডিং যখন বলেন, ‘জানি না, কেন এখনও আমরা সৌভাগ্যবান। তবে আমরা কোনো সুযোগ দেব না’। তখন সেই বাংলা প্রবাদটি কি মনে হয় নাÑ ঠাকুর ঘরে কে রে! আমি কলা খাইনি’র মতো। এখন অবধি বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে ‘সার্স’ ভাইরাস কীভাবে এলো, সেটা আবিষ্কার করতে পারেননি। বরং এটা আবিষ্কার করতে যেয়ে একজন বিজ্ঞানীর অকাল মৃত্যু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছেন, ‘সার্স’ হচ্ছে মানবসৃষ্ট ভাইরাস। কেউ এটা বাজারে ছেড়ে চুপি চুপি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এটা নিয়ন্ত্রণের চাবিটা নিশ্চয়ই তাদের হাতে। উদ্দেশ্য পূরণ হলে সময়মত চাবি দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। তাছাড়া পৃথিবী ক্রমশ ‘বায়োলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’-এর দিকে এগিয়ে চলেছে। শত্রু এলাকায় রোগ-জীবাণু ছড়িয়ে দিয়ে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার কৌশল এটি। অর্থাৎ জীবাণু যুদ্ধে জয়ী শত্রুপক্ষ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। কিন্তু মাটি ও সম্পদের কোনো ক্ষতি হবে না। বিজয়ী দেশের মানুষের প্রয়োজন নেই। দরকার মাটি ও সম্পদ।


 ‘সার্স’ ভাইরাস ঘটনার সঙ্গে হলিউডের ব্যয়বহুল মুভি ‘মিশন ইম্পসিবল-টু’ ছবির কাহিনীর সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে। পাশ্চাত্যের হাইটেক ও জেমস বন্ড মার্কা ছবি দেখে আমাদের কাছে তা আজগুবি, গাঁজাখুরি ও অসম্ভব বলে প্রতীয়মান হয়। আসলে প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর কাছে তেমনটি মনে হতে পারে। কিন্তু অধিকাংশ পাশ্চাত্য ছবিতে আজ যা দেখানো হয়, আমরা তা ভবিষ্যতে সত্যি হতে দেখি। ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ১২৩ মিনিটের ‘মিশন ইম্পসিবল-টু’ ছবিটি দেখে এমনটি যে সম্ভব, তা প্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে কল্পনাবিলাস মনে হয়েছে। ছবির কাহিনী অনেকটা এমন : একজন বিজ্ঞানী একটি ভাইরাস আবিষ্কার করেন। যে ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দু’দিনের মধ্যে একজন মানুষের দেহের সব সিস্টেম অকেজো হয়ে যায় এবং মৃত্যুমুখে পতিত হন। অবশ্য এই জীবাণু নষ্ট করার জন্য জেনেটিক্যালি পরিবর্তন করার জন্য ফ্লু জাতীয় রোগবীজের ভয়াবহ জীবাণু প্রতিষেধক ওষুধ রয়েছে। সীন আব্রাহামরূপী ওগরে স্কট নামক একজন ভিলেন একটি বায়ো-টেক ফার্ম থেকে এই জীবাণু চুরি করেন। এর ফলে পৃথিবীর মানুষের জন্য তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই ভাইরাস যাদের কাছে থাকে, সেই অল্প ক’জন লোক নিয়ন্ত্রণ করবে পুরো পৃথিবী। এই জীবাণু থেকে বিশ্বকে রক্ষার লক্ষ্যে অ্যামব্রোসকে নিবৃত্ত করার জন্য অ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হয় ইথান হান্টরূপী টম ক্রুজকে। এ জন্য তিনি ঘটনাস্থল অস্ট্রেলিয়ায় যান। সহযোগিতার জন্য রিক্রুট করেন চুরিই যার নেশা ও পেশা এবং অ্যামব্রোসের সাবেক গার্লফ্রেন্ড নিয়াহ হলরূপী কৃষ্ণাঙ্গ সুন্দরী টান্ডি নিউটন এবং কম্পিউটার জিনিয়াস লুথাররূপী ভিঙ রামেসকে। যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ইথান হান্ট মুখোমুখি হন অ্যামব্রোসের। পুরো ছবিটি মরণঘাতী ভাইরাসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। বুদ্ধি, কৌশল ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সাজানো ছবিটির পরতে পরতে শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা ও রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। মারাÍক জীবাণু উদ্ধার এবং অ্যামব্রোসের উদ্দেশ্য নস্যাৎ করার জন্য ইথান হান্ট একের পর এক দুর্ধর্ষ ও বিস্ময়কর অভিযানে শামিল হন। অ্যামব্রোসের সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলা চালিয়ে শেষ অবধি সফল হয় তার মিশন। ভয়াবহ ভাইরাস থেকে বেঁচে যায় পৃথিবীর মানুষ।
‘মিশন ইম্পসিবল-টু’ ছবিতে ভাইরাস থেকে পৃথিবীবাসী রেহাই পেলেও প্রায় একই রকম ভাইরাস ‘সার্স’ একের পর এক ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশে এবং কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের জীবন। মরণঘাতী এই ভাইরাস থেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন ‘মিশন ইম্পসিবল-থ্রি’ নামের একটি অভিযান। অবশ্য এই অভিযান পরিচালনার জন্য থেমে নেই বিজ্ঞানীরা। হংকং-এর একটি হাসপাতালের ডা. হেনরি লিকুয়ান নিজেই আক্রান্ত হয়েছিলেন ‘সার্স’ রোগে। সেরেও উঠেছেন এই যাত্রায়। তিনি বলেছেন, ‘আমি এখন রীতিমত এক আগ্রাসী মানুষ। সার্সকে যেভাবেই হোক, আমি জয় করবো।’ এই বিশ্বে আমরা যারা ভীত ও দুর্বল, তারা ‘মিশন ইম্পসিবল-থ্রি’র অপেক্ষায় আছি। যার মাধ্যমে জয় করা যাবে ভয়াবহ ভাইরাস ‘সার্স’-কে।

 দৈনিক সংবাদ : ৬ মে ২০০৩