পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আন্তর্জাতিক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

যেখানে থেমে নেই রক্তঝরা



সেই ১৯৪৮ সাল থেকে রক্ত ঝরছে ফিলিস্তিনে।

ঝরেই চলেছে।

কখনই থামছে না।

সব রক্তই মিশছে ভূমধ্যসাগরে।

না হলে এই রক্ত জমে জমে সৃষ্টি হতো আলাদা একটি রক্তনদী।

সভ্য দুনিয়ায় চলছে নিদারুণ এক অসভ্যতা।

কোনো বিবেক-বিবেচনা নেই।

কোনো আইন-কানুন নেই। 

কোনো বাছ-বিচার নেই।

একটাই মিশন।

যেভাবে পারো হত্যা করো। 

নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের।

নিষ্ঠুরভাবে প্রাণ নেওয়া হচ্ছে নারীদের।

নৃশংসভাবে খুন করা হচ্ছে সব বয়সী মানুয়কে।

অকারণেই জীবন দিতে হচ্ছে 

নতুবা 

ক্ষত-বিক্ষত হতে হচ্ছে।

পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে চিরকালের জন্য।

কোনো প্রতিকার নেই।

সাফাই গেয়ে চলেছেন জন কেরিরা। 

যেন মানুষ নয়, এক একটি সংখ্যা।

এই সংখ্যা যত কমবে, ততই নিজেদের আধিপত্য নিরঙ্কুশ হবে। 

নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েও রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না।

কোনো নিয়ম-নীতির বালাই নেই।

হত্যালীলা চলছেই। 

এ নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ নেই

উৎকণ্ঠা নেই।

আছে অশালীন উল্লাস।

আছে বিবেকহীন তৎপরতা। 

নিয়তিরও যেন পরিহাস করছে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে।

ভূখণ্ড হারিয়েছে।

গৃহহারা হয়ে শরণার্থী জীবন যাপন করছে। 

দখলদারদের জবরদস্তির শিকার হতে হচ্ছে।

কোথাও কোনো আশার আলো নেই।

বরং ক্রমান্বয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে।  

বৃটিশদের বেঈমানির কারণে ফিলিস্তিনিদের আজ এই পরিণতি।

তাদের কূট-কৌশলের কারণে ফিলিস্তিনিরা নিজ দেশে হয়ে যায় পরবাসী।

আর এতে ইন্দন দিয়ে আসছে আমেরিকনারা।

অর্থ দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে, রাজনীতি দিয়ে। 

আরব ভূখণ্ডে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে জন্ম দেওয়া হয় ইসরাইল নামে একটি দানবীয় রাষ্ট্রের। 

নিধিরাম সর্দার জাতিসংঘকে ব্যবহার করে অবৈধ এই দেশটির জন্ম দেয় ইঙ্গ-মার্কিন পরাশক্তি। 

এরপর থেকে ইহুদি এই রাষ্ট্রের সীমানা বেড়েই চলছে। 

বাড়ছে অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন।

বাড়ছে জবরদখল। 

বাড়ছে হত্যাকাণ্ড।

ক্রমান্বয়ে উচ্ছেদ হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা।

দেশে দেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য আর তাদের মিত্রদের কি আকুলতা!

আহ্ রে কি দরদ!

আর তাদের সব রকম সাহায্য ও সহযোগিতায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে যে নৃশংসতা, যে নির্মমতা, যে তাণ্ডবলীলা চলছে, সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

যেন হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করছে ইসরাইল।

আর ইসরাইলকে জামাই আদর করাই তাদের মূলমন্ত্র।

এই ভণ্ডামির কোনো তুলনা হয় না।

এভাবেই তারা সারা দুনিয়ায় খবরদারি করে আসছে।  

সবচে’ বিস্ময়কর হলো, আরব দেশগুলোর ভূমিকা।

আরব ভূখণ্ডের পেটের মধ্যে বিষ ফোড়ার মতো বিস্তৃত হচ্ছে একটি দেশ,

এই দেশটি একদিন তাদেরও সর্বনাশের কারণ হতে পারে, 

অথচ এ ব্যাপারে তাদের কোনো হেলদোল নেই।

ক্ষুদ্র স্বার্থের কাছে বিকিয়ে দিয়েছে নিজেদের। 

প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের জীবন ঝরছে, ঝলসে যাচ্ছে ঘর-বাড়ি, 

এ নিয়ে তাদের সামান্যতম বিকার নেই।

ফিলিস্তিনিদের অসহায় আর্তনাদ পৌঁছাচ্ছে না সিরিয়া, জর্ডান, মিসরে.....।

প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় না পেয়ে নির্বিচারে খুন হচ্ছেন ফিলিস্তিনিরা। 

এই ফিলিস্তিনিরা যেন তাদের কেউ নয়। 

এঁরা যেন তাদের সহোদর নয়।

এঁরা যেন মুসলমান নয়। 

ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তো দিচ্ছেই না, 

বরং তারা যাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়, সে ব্যাপারে প্রকারান্তরে অবদান রাখছে।

শুধু ইঙ্গ-মার্কিন স্বার্থই রক্ষা করছে না, তাদের রীতিমতো প্রতিপালন করছে।

সৌদি আরবসহ বিভিন্ন আরব দেশে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে আমেরিকানরা।

আরবদের নীরবতা দেখে মনে হয়

যেন ফিলিস্তিনিরা শেষ হয়ে গেলে মুসলমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে।

ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করাই তাদের এবাদত।

অথচ একযোগে আরব রাষ্ট্রগুলো রুখে দাঁড়ালে ফিলিস্তিনিদের এতটা অসহায় হয়ে পড়তো না।

এই যখন অবস্থা, তখন আমরা কী করতে পারি?

কিছুই করতে পারছি না।

ফিলিস্তিনিদের মতো এক সময় আমাদের এই অবস্থা ছিল।

আমরা সেই অবস্থা থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তি পেয়েছি।

আমরা বিশ্বের পরাশক্তির একটি অংশের সমর্থন পেয়েছিলাম। 

প্রতিবেশী দেশের আশ্রয় আর সহযোগিতা পেয়েছিলাম।

তা না হলে আমাদেরও ফিলিস্তিনিদের মতো রক্তপাতের মধ্যে কাটাতে হতো বিনিদ্র রজনী।

তাই ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আমরাও একাত্ম অনুভব করি।

মনে-প্রাণে তাদের বিজয় কামনা করি। 

ফিলিস্তিনি শিশুদের রক্তপাত দেখে আমাদের বুকেও রক্তক্ষরণ হয়। 

চোখ ভিজে যায় জলে।

দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া ছাড়া এই নৃশংসতা সইতে পারা যায় না।

ফিলিস্তিনিদের জন্য আমাদের দেশে কত কান্না-কাটি করা হয়। 

পড়া হয় দোয়া-দরুদ-মোনাজাত। 

প্রত্যাশা করা হয় অলৌকিক কোনো কিছুর।

বছরের পর বছর এমনটি কায়মনোবাক্যে চাওয়া হয়ে আসছে। 

কিন্তু তাতে ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

বরং দিনে দিনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে তাদের পরিসর। 

সীমিত শক্তি নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তির বিপক্ষে লড়াই করার মতো শক্তি-সামর্থ্য তাদের কোথায়?

কেউ তাদের প্রতি বাড়িয়ে দিচ্ছে না সহযোগিতার হাত। 

তবুও তাদের প্রতিবাদ থামছে না

প্রতিরোধ স্তিমিত হচ্ছে না। 

পরাভবও মানছে না।

জীবন ঝরছে। জন্ম হচ্ছে নতুন জীবনের। 

কিন্তু এভাবে কত দিন চলবে?

কবি নবারুন ভট্টাচার্যের কবিতার মতো অক্ষম বেদনা নিয়ে ফিলিস্তিনিরা বলতে পারেন,

এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না

এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না

এই বিস্তীর্ণ শ্মশান আমার দেশ না

এই রক্তস্মাত কসাইখানা আমার দেশ না।

বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১

রাজনীতির আকাশে মহিলা তারকা

১৯৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম, 'রাজনীতির আকাশে মহিলা তারকা'।

আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। রাজনীতির সংস্পর্শে মানুষের মনে সচেতনা বোধের সঞ্চার ও মতামতের প্রতিফলন ঘটে। আর ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার আলোকে যিনি অধিক মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেন, তিনিই নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হন। মানুষ তার আহ্বানে সাড়া দিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। তবে রাজনীতির পথ বড্ড জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ ৷ প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার হাতছানি।

এ কারণেই রাজনীতির বিসর্পিল পথে মহিলাদের বিচরণ সহজলভ্য নয়। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের পানে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, মহিলাদের পশ্চাৎপদতা। অবশ্য পুরুষের পাশাপাশি রাজনীতিতে মহিলাদের অবদানের কথা অস্বীকার করার জো নেই। 

সক্রিয় মহিলা রাজনীতিবিদের সংখ্যা অপ্রতুল হলেও অনেকেই নেপথ্যে থেকে রাজনীতির কলকাঠি নাড়িয়ে কিংবা পুরুষকে অনুপ্রাণিত করে রাজনীতি চত্বরকে গতিশীল করেছেন।

এর মাঝেও এমন কিছু মহিলা আছেন যারা শুধুমাত্র রাজনীতিতে কর্মঠ নন পাশাপাশি তারা রাজনীতির অগ্নিকন্যা হিসেবে সারা দুনিয়ায় ঝড় তুলেছেন। টলিয়ে দিয়েছেন - একনায়কতন্ত্র, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরচারী সামরিক শাসকের ভিত। কোথাও কোথাও তারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও আপোষহীন ভাবে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কারাগার, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, জুলুম, অত্যাচার তাদের আন্দোলনকে পিছপা করতে পারছে না। কেউ কেউ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন। সরকার পরিচালনায় অপরিসীম দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। 

তবে যেখানে নারী স্বাধীনতার উত্তুঙ্গ পরিবেশ, সেই টালমাটাল পাশ্চাত্যের তুলনায় রাজনৈতিক আসরে প্রাচ্যের মহিলারা অনেক এগিয়ে। পশ্চিমা দেশগুলোররা জনীতিবিদরা জনগণকে ব্যক্তিত্বের ইমেজ ও মোহে প্রলুব্ধ করতে পারলেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াক ষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক ক্ষেত্র বড় বেশি দুর্গম, অমসৃণ ও অনিশ্চয়তায় ভরপুর। জনগণের একচেটিয়া সমর্থনেও ক্ষমতার সিংহাসনে আরোহণ করা যায় না। তাদেরকে ফ্যাসিবাদী সরকার কিংবা বন্দুকের নলের বিরুদ্ধে লড়াই করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। এই অবস্থায় যেখানে বলবান পুরুষেরা হিমসিম খেয়ে যান, সেখানে মহিলাদের চলারপ থ পুরোপুরি অসমতল।

এমনিকেই পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদাভুক্ত বলে মনে করা হয়। তাছাড়া ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা মহিলাদের রাজনীতি করাটা মোটেও মেনে নিতে পারেন না। এখনও সামন্তবাদের গুরুতর প্রভাব। সামগ্রিক অর্থে তলিয়ে দেখলে তৃতীয় বিশ্বে পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এত সব প্রতিকূলতার মাঝে মহিলাদের রাজনীতিমুখীন হওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তা সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বে মহিলা রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে। বরং বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বে বার বার মহিলারাই ওঠে আসছেন রাজনৈতিক শিখর দেশে। ফলে পরিবর্তন ঘটছে সনাতন মূল্যবোধের। তবে যুগে

যুগে বিশ্ব রাজনীতিতে মহিলাদের আবির্ভাব ঘটে থাকলেও বর্তমান শতাব্দীতে তারা লাইমলাইটে আসছেন অধিক মাত্রায়। তৃতীয় বিশ্বের একজন মহিলা রাজনীতিবিদকে এখন সারা বিশ্বের লোক চেনেন, জানেন।

তবে মহিলা রাজনীতিবিদদের পথপ্রদর্শক হলেন সুলতানা রাজিয়া। ঘোরতর পশ্চাৎপদ দেশে ও সমাজে তিনি পুরুষদের ডিঙ্গিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হন। যদিও সিংহাসনে বেশি দিন স্থায়িত্ব পাননি। পুরুষদের চক্রান্তে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন।

উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অনগ্রসর সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবের স্থানে নেই। কোনও পুরুষের দুর্বল ও উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবে নয়, স্বীয় শক্তি, মেধা ও অধিকারে রাজনীতির জমজমাট হাটে নিজেদের আসনকে পাকাপোক্ত করতে হয়। সামগ্রিক নারী মুক্তির প্রতিফলন কিংবা নারী চেতনায় প্রগতির চিহ্ন হিসেবে তারা রাজনীতির পথে এগিয়ে যান। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক শীর্ষ দেশে মহিলাদের প্রবেশ ও বিকাশ বস্তুত একট সামাজিক ও একটি ব্যক্তিক ঘটনা। কেননা যতটা না সচেতন প্রয়াসের ফল, তার চেয়ে অনেক বেশী আকস্মিক ঘটনা, যতটা না জীবনের দান, তার চেয়ে অনেক বেশী মৃত্যুর। অর্থাৎ তাদের কৃতিত্বের পিছনে প্রাথমিকভাবে পারিবারিক অবস্থানই এত সহজে, এত দ্রুত রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের আলোয় আলোকিত করেছে।

হাজার বছরের বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে মহিলারা রাজনীতি সম্পৃক্ত না হয়েও হয়ত প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন কিংবা রাজনীতি সচেতন হয়েও প্রচারণার স্বল্পতার কারণে বন্দী থেকেছেন দেশের সীমানায়।

তাদের সম্পর্কে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আলোচনা সম্ভব নয়। মূলতঃ যারা রাজনৈতিক আকাশে মহিলা তারকা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন অর্থাৎ যাঁদের কথা দুনিয়ার মানুষ জানেন কম-বেশি জানেন, তাঁদের সম্পর্কেই এখানে বলা হয়েছে।



সিরিমাভো বন্দরনায়েক 

বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হলেন সিরিমাভো ডব্লিউ, আর, ডি, বন্দরনায়েক। ১৯৫৯ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর তাঁর স্বামী শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী এন, ডব্লিউ. আর, ডি, বন্দরনায়েক কলম্বোতে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দ্বারা নিহত হন। স্বামীর হত্যায় রাজনীতিতে বিকশিত হয়েছেন সিরিমাডো বন্দরনায়েক। প্রায় ১৯ বছর স্বামীর সাথে সংসার জীবন করার পর ১৯৬০ সালে রাজনৈতিক জীবনের দীক্ষা নেন। স্বামীর মুত্যুর ছয় মাস পর তিনি শ্রীলংকা ফ্রীডম পার্টি (এস এল এফ ডি)-র পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। একই বছর তিনি এসএলএফডি-র প্রেসিডেন্ট হন। তারপর তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র ক্রমশঃ প্রসারিত হয়েছে। ঐ বছরই তিনি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি একটানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন, মাঝে একটি মেয়াদ ক্ষমতায় উত্তীর্ণ না হতে পারলেও পুনরায় তিনি ১৯৭০ সাল থেকে ৭৭ সাল পর্যন্ত প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য সিরি মান্ডে ৬০ সাল থেকে ৮০ সাল পর্যন্ত একটানা ২০ বছর শ্রীলংকার পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তিনি প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা, অর্থ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছেন। ১৯৬৫ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিরোধী দলের নেত্রী। ১৯৭৬-৭৭ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্ণাচ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সিরিমাভো বন্দরনায়েক এখন সত্তরোর্ধ বয়সেও শ্রীলংকা ফ্রীডম পার্টর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শ্রীলংকার লৌহমানব জয়বর্ধনকে অস্থির করে রেখেছেন। আজও জয়বর্ধন তাঁর সমর্থন সংগ্রহ করতে আগ্রহী। 

ইন্দিরা গান্ধী

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের সর্বাধিক আলোচিত নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরার উত্থানের ক্ষেত্রে কোনও নাটকীয়তা না থাকলেও তিনি শক্তি সঞ্চার করেছেন পিতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কিছুটা আকস্মিক এবং মহান মৃত্যুর ঘটনা থেকে। সেই মৃত্যুতেই উদ্দীপিত করেছে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনকে, অবশ্য মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ১৯৩৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। ১৯৫৯-৬০ সালে কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট, ১৯৬২ সালে সিটিজেন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ১৯৬৪-৬৬ সালে লোকসভার সদ্স্য হন। ১৯৬৬ সালের ১১ই জানুয়ারী লাল বাহাদুরের রাশিয়ার তাসখন্দে আকস্মিক মৃত্যু হলে ইন্দিরা বিশাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দীর্ঘ ১১ বছর একটানা ক্ষমতাসীন থাকার পর নির্বাচনে বিরোধী দলের কাছে হার মানেন। কিন্তু তিন বছর পর পুনরায় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। আততায়ীর তীতে নিহত হওয়ার আগাবধি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমানে তাঁরই পুত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। 

গোল্ডামেয়ার

রাজনীতিবিদ হিসেবে গোল্ডা মেয়ার সাফল্যের শিখরে ওঠার কৃতিত্ব অর্জন করেন। আমেরিকায় শিক্ষার্থী মেয়ার আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরুর পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনেও জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৮ সালে শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে রাজনীতির হাতেখড়ি নেন। ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মন্ত্রী পরিষদে (১৯৪৯-৫৬) তিনি শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৬-৬৬) হন। ১৯৬৭ সালে তিনি লেবার পার্টি গঠন করেন। এই পার্টি ক্ষমতায় গেলে (১৯৬৯-৭৪) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার পান। তিনি ৮১ বছর বয়সে ১৯৭৯ সালে মারা যান । গোল্ডা মেয়ার ব্যক্তিগত প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে ধাপে ধাপে সাফল্যের শিখরে উঠেছেন।

মার্গারেট থ্যাচার 

মার্গারেট থ্যাচার, ইউরোপ-আমেরিকার প্রথম মহিলা সরকার প্রধান। থ্যাচারের ক্ষমতায় আরোহণ কোনও দায়সারাগোছের ঘটনা নয়। বরং মহিলা রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যক্তিত্বের দীপ্তছটা দিয়ে তিনি সফলকাম হয়েছেন। ১৯৭০ সালে তিনি কাউন্সিলর, ১৯৮৩ সালে রয়াল সোসাইটির ফেলো এবং ১৯৫৯ সাল থেকে তিনি কনসারভেটিভ পার্টির এম পি হন। ১৯৭৫ থেকে '৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলের নেত্রী থাকার পর ১৯৭৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হন। সম্প্রতি তৃতীয়বারের মতো মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন। বিশ্ব ইতিহাসে এটি একটি দুর্লভ দৃষ্টান্ত। এর ১৮০ বছর আগে বৃটেনেরই লর্ড লিভারপুল ১৮১২ থেকে ১৮২৭ সাল পর্যন্ত তিন দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত দৃঢ়চেতা, কঠোর ও অনমনীয় থ্যাচার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। ৬২ বছর বয়স্ক থ্যাচার যে কোন সমস্যা মোকাবেলায় এখনও প্রত্যয়ী। 

গারাল্ডাইন ফেরারো

গারাল্ডাইন অ্যান ফেরারো হলেন প্রথম মহিলা যিনি ১৯৮৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ওয়াটার মণ্ডেল। ৫২ বছর বয়স্কা ফেরারো ১৯৭৪-৭৮ সালে নিউইয়র্কের এ্যাসিস্টেন্ট ডিস্ট্রিক্ট এটৰ্নী, ১৯৮১-৮৫ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেনটিভ-এর সদস্য ছিলেন। 

কোরাজন একুইনো

কোরাজন একুইনো এখন এবং আগামী বহুদিন বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আন্দোলন গণতান্ত্রিক আবেগের জন্ম ও বিকাশভূমি। অথচ ১৯৮৩ সালের ২১শে আগষ্ট ম্যানিলা বিমান বন্দরে বেনিগনো একুইনোর আততায়ীর হাতে মৃত্যু না হলে কোরাজন কখনই ক্ষমতায় আসতেন কিনা সন্দেহ। কেননা স্বামী যত দিন বেঁচে ছিলেন সেই ২৮ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি থেকেছেন আড়ালে আড়ালেই। ১৯৮৪ সালে রাজনীতির আসরে নেমে তিনি প্রথম চোটেই নির্বাচনে জিতে জাতীয় পরিষদে আসন দখল করেন। ১৯৮৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী কোরাজান নির্বাচিত হলেও ২৫শে ফেব্রুয়ারী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এক ফোটা রক্ত না ঝরিয়ে মার্কোসকে যেভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেন, তা অভাবিত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এনরিলে এবং ভাইস চীফ অব স্টাফ রামোস তাঁকে সমর্থন করলেও হাজার হাজার লোক কোরাজনের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। আমেরিকায় শিক্ষিতা পাঁচ সস্তানের জননী কোরাজন এই ৫৪ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি একের পর এক বিদ্রোহ দমনে ইস্পাত-দৃঢ় ও একরোখা মনোভাবের স্বাক্ষর রাখছেন।

চিয়াঙ চিঙ 

চীনের গ্যাঙ অব ফোর-এর চিয়াঙ চিঙ (জিয়াঙ কিঙ) মাও সে তুঙ-এর পত্মী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাত। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিসিপি) যোগ দেন এবং ১৯৫০ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রী হন। ১৯৬৫-৬৯ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী কার্যক্রমে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে পলিটব্যুরোর নবম জেনারেল কমিটি এবং ১৯৭৩ সালে পলিটব্যুরোর দশম জেনারেল কমিটির সদস্য হন। ১৯৭৬ সালে 'গ্যাঙ অব ফোর' এর সদস্য হিসেবে গ্রেফতার হন। ১৯৭৭ সালের জুলাইতে সিসিপি থেকে বহিষ্কৃত, ১৯৮০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু পরে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারীতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। 

ইভা পেরণ

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট (১৯৪৬-৫০) জুয়ান দোমিনগো পেরণের প্রথম স্ত্রী ইভা মারিয়া দুয়ার্তে ডি পেরণ। প্রথম জীবনে একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ইভা তার অপরিমেয় কর্মক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্খার দরুন রাজনৈতিক ময়দানেও সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। 

বিংশ শতাব্দীর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক নেতা জুয়ার পেরণকে বন্দী করা হলে ইভা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি শ্রমিক ইউনিয়নকে চমৎকার কুশলতায় সংগঠিত করে সমগ্র বুয়েন্স আয়ারের্সে র ্যালির আয়োজন করে ১৯৪৫ সালের ১৭ই অক্টোবর জুয়ান পেরণকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন। এর কয়েক দিন পর প্ররণ সুদরী ও আকর্ষণীয়া ২৬ বছর বয়স্কা ইভাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি ইভা সামাজিক কার্যক্রমেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। ইভা পেরণ মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ক্যান্সারে মারা যান।

বেনজির ভুট্টো 

"আমার ভাই ও বোনেরা জেনে রাখুন, এই মৃত্যু উপত্যকায় আমি প্রবেশ করেছি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়। ঘাতকরা যখন আমার বাবা আপনাদের প্রিয় নেতা, শহীদ জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর জীবনের সেই অন্তিমতম লগ্নে, তাঁরই ব্রত অবলম্বন করে আমি আমি বাঁচবো এবং মরবো। এই মুহূর্তে সেই ব্রতই আমি উদযাপন করছি। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে আজ আর কোনও ফারাক নেই।" 

এই ব্রত নিয়েই উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিতা বেনজির ভুট্টোর রাজনীতিতে প্রবেশ। আট বছর আগে বাবার অসহায় বধ্যভূমিতে এবং ভাই শাহ নেওয়াজের বিদেশে আকস্মিকভাবে মৃত্যু বেনজিরকে হঠাৎ জীবনের চেয়েও বড় করে দিল। পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষোভ ও বিদ্রোহ এসে শক্ত করে দিল, বেনজিরের রাজনৈতিক মঞ্চকে। ভারতীয় একটি পত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয় যে, কি তাঁর যাদু! যাতে কেঁপে য্য় পাকিস্তান। পাকিস্তানের এ যাবৎ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসন। এই সম্মোহন কেন? বেনজির ভুট্টো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় ছাত্র সংসদের সভানেত্রী ছিলেন। সে সময় তাঁর ভূমিকা যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। অবশ্য মাত্র ১৬ বছর বয়সে রাজনীতির সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে।

পাকিস্তানে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বেনজিরকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ দিন তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে জোরদার করতে গিয়ে তিনি অগ্রগামী ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান হিসেবে জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে তীব্রতর করে তুলেছেন ।



নূসরত ভুট্টো 

সাবেক ফার্স্ট লেডি নুসরত ভুট্টো স্বামীর মৃত্যুর পর পাকিস্তানী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান হলেও ৫৩ বছর বয়স্কা নুসরত ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে পার্টির দায়িত্ব কন্যার হাতে বুঝিয়ে দেন। ১৯৮৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে নুসরত যথেষ্ট অবদান রাখেন।

মেনেকা গান্ধী 

শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মান-অভিমান করে মেনেকা আনন্দ গান্ধী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। পাঞ্জাবের মেয়ে, সাবেক বিউটি কুইনের সাথে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরার কনিষ্ঠ সন্তান সঞ্জয় গান্ধীর বিয়ে হয়। ১৯৮০ সালে সঞ্জয় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর বিধবা মেনেকার সাথে শাশুড়ির মনোমালিন্য শুরু হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে তিনি লক্ষৌ কনভেনশনে যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে রাজনৈতিক দল 'রাষ্ট্রীয় সঞ্জয় মঞ্চ' প্রতিষ্ঠা করেন। ৩১ বছর বয়স্কা মেনেকা গান্ধী বর্তমানে রাজনীতির অঙ্গনে তেমন একটা সরব নন।

শেখ হাসিনা

বিশ্ব মহিলা রাজনীতিবিদের পাশাপাশি বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিবিদদের পদচারণা দীপ্তোজ্জ্বল। উপরন্তু বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিবিদের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। সরকার বিরোধী তাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রথম সারিতে তাদের অবস্থান। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পরিবার পরিজনসহ নিহত হন। সেই মৃত্যু সমস্ত জীবনকে শেষ করে দেয়নি। বরঞ্চ মাটি ফুঁড়ে তা বের করে দিয়েছে শেখ হাসিনাকে। অবশ্য ছাত্রী জীবনেই শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দীক্ষা পান। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাবস্থায় তিনি ছাত্রী সংসদের নির্বাচনে সহ-সভানেত্রী হন। এর পর পিতার বিশাল রাজনৈতিক জীবনের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠায় রাজনীতির সাথে তাঁর নিবিড়তা গড়ে ওঠে। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং পরে ১৫ দলের নেত্রী মনোনীত হন। তারপর থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন, ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরও তিনি তিনটি আসনে জয়ী হন। তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। 

খালেদা জিয়া

১৯৮১ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার। এককালের বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান এবং পরে ৭ দলের নেত্রী মনোনীত হয়ে খালেদা সরকার বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিতে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আইভী রহমান প্রমুখ দীর্ঘ দিন যাবৎ প্রভাব বিস্তার করে আছেন।

আর সকল ক্ষেত্রের মত রাজনীতিতেও পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারা ক্রমশঃ এগিয়ে আসছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের স্নান করে দিয়ে স্বীয় প্রতি ভাকে উজ্জ্বল করে তুলছেন।

১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭

বিশ্বশান্তিঃ দুই পরাশক্তির দর-কষাকষি



আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সৃষ্ট স্নায়ুযুদ্ধের সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এখন আর তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। অথচ এই দুই পরাশক্তির আধিপত্য নিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিদ্যমান ছিল, তার জন্য কত না খেসারত দিতে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই শান্তিপ্রিয়দের কাছে বিশ্বশান্তি ছিল প্রার্থিত। সেই আলোকে ১৯৮৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম, 'বিশ্বশান্তিঃ দুই পরাশক্তির দর-কষাকষি'।


সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

বিশ্বায়নের গোলকধাঁধা


আমরা যারা অনুন্নত, দুর্বল ও শক্তিহীন দেশের অধিবাসী, তারা এখন চাতক পাখির মতো একরাশ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে বসে থাকি, ‘বিশ্বের মালিক’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের মুখের ‘অমৃত বাণী’ শোনার প্রতীক্ষায়। তিনি কখন কি বলেন, সেটাই বিশ্ববাসীর কাছে অপরিসীম কৌতূহলের বিষয়। কেননা, দুনিয়াটা চলছে তো তার কথায়। তার কথার ভারও যেমন আছে, তেমনি আছে ভারিক্কি। সঙ্গত কারণে তার কোনো কথাকে অবজ্ঞা বা উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। ইরাকি জনগণকে মুক্তি দেবেন বলে যে আশ্বাস তিনি দিয়েছিলেন, তা অনেকেই খুব বেশি পাত্তা দেয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। ভেবেছিলেন, বাত কি বাত। কিন্তু তার কথাকে গুরুত্ব না দেয়ার পরিণতি আমরা দেখতে পেলাম হলিউডি মারদাঙ্গা ছবির কাহিনীর মতো করে। তাতে অ্যাকশন, ড্রামা ও সাসপেন্সের কোনো কমতি ছিল না। রোমান্সটাও অবশ্য আমাদের দেখার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য হয়নি। প্রেসিডেন্ট বুশ ইরাকি জনগণকে এমনই মুক্তির স্বাদ এনে দিয়েছেন, তাতে তাদের অবস্থা দাঁড়িয়েছে- ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য দূরীকরণে বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য বিস্তারের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, যে কোনো সমাজে বাণিজ্য হচ্ছে উন্নয়নের অন্যতম চাবিকাঠি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অন্তরায়গুলো নিরসনে আমেরিকা ও ইউরোপকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। অবাধ বাণিজ্য বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। প্রেসিডেন্ট বুশের এ আশাবাদ তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে যতটা না আশাবাদী করেছে, তার চেয়ে বেশি সৃষ্টি করেছে আতংক। বুশের কথার মারপ্যাঁচে কী লুকিয়ে আছে, তা এ মুহূর্তে আঁচ করতে না পেরে সবাই কিছুটা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ইতোমধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সর্বত্র নিন্দা, সমালোচনা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। যারা এই অসম বাণিজ্য নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত, তারা তো বটেই; যারা মানবতাবাদী, তারাও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। কেননা, বুশ যে অবাধ বাণিজ্যের কথা বলছেন এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অবাধ বাণিজ্যের নামে সারা দুনিয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের যেসব বিধি-বিধান প্রবর্তন করছে- তার মধ্যে কোনো তফাত নেই। উভয়ই একে অপরের পরিপূরক। ১৯৪৭ সালে বিশ্ব বাণিজ্য পরিচালনার জন্য আইন ও শৃ´খলা প্রতিষ্ঠা, প্রতিযোগিতা বিনষ্ট করে- এমন বাণিজ্যিক বাধা ও অন্যান্য প্রতিকূলতা দূর, বাণিজ্য বিরোধ মীমাংসা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে গঠিত হয় গ্যাট (জেনারেল অ্যাগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফ অ্যান্ড ট্রেড) অর্থাৎ শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ সমঝোতা। কিন্তু মূল বিষয়কে উপেক্ষা করে ধনী দেশগুলো বাজার দখলের খেলায় গ্যাটকে ব্যবহার করে। বর্তমান বিশ্বের একক পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা নির্মাণের কথা বলে নিজের অবস্থানকে সুসংহত করেছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর দ্রুত ও শক্তিশালী সমর্থন পেয়ে যুক্তরাষ্ট্র গ্যাটকে শুধু পণ্যের শুল্ক কিংবা বাণিজ্যের সীমা থেকে জোর করে বের করে আনার দিকে অগ্রসর হয়। বর্তমান কাঠামোতে সন্তুষ্ট না হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গ্যাটের আওতাকে সেবা, বিনিয়োগ ও মেধাস্বত্বের অধিকার পর্যন্ত বাড়ানো এবং সে সাথে এ বিষয়গুলোকে দেখাশোনা করার জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেয়। গ্যাটের সংশোধিত কাঠামো নিয়ে উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মধ্যে এবং তার সঙ্গে অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে পড়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো ভয়ংকর বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এই চূড়ান্ত সংকটের মুহূর্তে গ্যাটের তৎকালীন মহাসচিব আর্থার ড্যাঙ্কেল কিছু আপোষের চিন্তা মাথায় রেখে বিবেচনার জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব হাজির করেন। প্রায় আট বছর তুমুল তর্ক-বিতর্কের পর কিছু রূপান্তর ঘটিয়ে ড্যাঙ্কেল প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বরে কর্মকর্তা পর্যায়ে এবং ১৯৯৪ সালের মার্চে মন্ত্রী পর্যায়ে এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি গঠন করা হয় বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অর্থাৎ ডব্লিউটিএ। এর পাশাপাশি কৃষিপণ্যসহ অপরাপর পণ্যের শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিষয়ে দেখাশোনা, সেবামূলক খাত, বিনিয়োগ ও মেধাজাত অধিকারের সাথে সম্পর্কিত এবং পারস্পরিক প্রতিশোধমূলক বিধান সংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তার কার্যাবলী হচ্ছে : উরুগুয়ে রাউন্ডে গৃহীত সব চুক্তি ও আইনি হাতিয়ারগুলো বাস্তবায়ন সহজতর করে তুলবে, সকল ধরনের সমঝোতার লক্ষ্যে একটি ফোরাম হিসেবে কাজ করবে, বাণিজ্য নীতি পর্যালোচনার পদ্ধতি ও বিরোধ মীমাংসা পরিচালনার নিয়মনীতি সম্পর্কিত আলাপ-আলোচনা পরিচালনা করবে এবং বিশ্ব অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণে পরস্পরের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে কাজ করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংককে সহযোগিতা করবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে মূলত লাভবান হচ্ছে শিল্পোন্নত দেশ এবং তাদের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।


বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর আধিপত্য ক্রমশ দৃঢ়তর হচ্ছে। তারা উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে খবরদারি করছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং মুক্তবাজারের শাসনে বহুজাতিক কর্পোরেশনের আদলে বিশাল আকারের কর্পোরেট পুঁজি এখন বিশ্বের শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ পুঁজি এখন পুঁজিবাদী বিশ্ব শক্তি হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এই কর্পোরেট পুঁজির আন্তর্জাতিক চলাচল এবং তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবার জন্য বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন গড়ে তোলার নামই বিশ্বায়ন; যা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিপ্লবকে ধারণ করে দরিদ্র দেশগুলোকে আবারো আরেকটি অদৃশ্য ঔপনিবেশিক শৃংখলে আবদ্ধ করে ফেলেছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর মনোভাব হলো এমন : ‘বিচার মানি, তবে তালগাছটা আমার’। তাদের পক্ষে কোনো নীতি গ্রহণযোগ্য না হলেই তারা মনগড়া এক ফতোয়া দিয়ে বসে। কোনো দেশ যদি তার অর্থনীতি ঠিক করার জন্য কোনো নীতি গ্রহণ করে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা তাতে বাধা দেবে এই বলে যে, এর সাথে উন্নয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ উন্নত দেশগুলোর ম্যাক্রো অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সিদ্ধান্ত হয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে। তাতে ভোটাভুটির কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে শিল্পোন্নত বা ধনী দেশগুলো তাদের কোনো সিদ্ধান্ত অনুমোদন করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হলে সেসব দেশের প্রতিনিধিদের আপোষের মাধ্যমে বা নানা কৌশল প্রয়োগ করে বশ করার পথ বেছে নেয়। ফলে কোনো অগণতান্ত্রিক ও একতরফা সিদ্ধান্ত তারা সহজেই অনুমোদন করিয়ে নেয়। তারপর শিল্পোন্নত দেশের প্রতিনিধির সংখ্যা ইচ্ছেমাফিক বাড়িয়ে নেয়া, যখন-তখন সভা আহ্বান করা- যাতে স্বল্পোন্নত দেশগুলো সহজেই অংশ নিতে না পারে। এমন চালাকি তো আছেই। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা শুধু সারা দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রকই নয়, তারাই হয়ে উঠবে এক বিশ্ব সরকার। যাদের সুতো থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থ রক্ষাকারী এ সংস্থার কার্যক্রম, বিধি-বিধানের ফলে সারা দুনিয়ায় বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। তীব্র হবে বৈষম্য। উন্নত বিশ্ব আর উন্নয়নশীল বিশ্বের মাঝে এবং ধনী আর দরিদ্রের মাঝে ব্যবধান বাড়বে। গরিব আরো গরিব হয়ে যাবে। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় আর্থ-সামাজিক মূল্যবোধ, জীবনযাপন পদ্ধতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে যাবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার অগণতান্ত্রিক ও অসম নীতির ফলে বিপদাপন্ন হবে আমাদের মতো দেশের কৃষি, শিল্প ও প্রতিবেশ। তথ্য প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিপ্লব আর গুটিকয়েক রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের নজিরবিহীন বল প্রয়োগের ক্ষমতা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনে এক বিশ্বে এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং মুক্ত বাজারের শাসন মানবজাতির জন্য একটি স্বাভাবিক ব্যবস্থা। রাজনৈতিক বিশ্বায়ন নয়া উদার নৈতিক ভাবাদর্শের আধিপত্য সৃষ্টি করছে। তথাকথিত গণতন্ত্র ও মুক্তবাজারের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে।


সবকিছুর মাতবর হচ্ছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবি। এদের চাপিয়ে দেয়া কাঠামোগত সমন¦য় কর্মসূচি দারিদ্র্য কমানোর নামে বেসরকারিকরণ কর্মসূচিকে ত্বরািন্বত করেছে। ফলে একটি বিশেষ শ্রেণী সেবা-পণ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক হয়ে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রীয় সেবা, চাকরি ও খাদ্য নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দরিদ্র দেশের সার্বভৌমত্ব সীমিত এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি সরকারগুলোর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। সে তুলনায় এনজিওরা অনেক শক্তিশালী হয়েছে। তাদের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বর্তমান তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বহুপাক্ষিক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় বিশ্বায়ন ও বাণিজ্য উদারীকরণের গতিকে ত্বরানি¦ত করে উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস করার লক্ষ্যেই বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান খাত হলেও ২০০৫ সাল থেকে গার্মেন্টস শিল্প কোটা সুবিধা হারিয়ে অন্যান্য দেশের সাথে এক অসম ও কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রায় ১৫ লাখ নারী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়তে পারে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় টেক্সটাইল ও বস্ত্র চুক্তির ফলে এ খাত দুটো ইউরোপ ও আমেরিকার আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ কোনো কোটা সুবিধা পাবে না। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়মে টেক্সটাইল ও বস্ত্রখাত পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ পোশাক রফতানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে জিএসপি (জেনারেল সিস্টেম অব প্রিফারেন্স) স্কিমের সুবিধা ভোগ করে। এখন থেকে বাংলাদেশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সুবিধা পেতে হলে মেনে চলতে হবে ‘রুলস অব অরিজিন’-এর শর্তাবলী। এর ফলে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার হারাতে হবে। বেসরকারিকরণের নামে আমাদের জাতির সুষম বিকাশের জন্য জাতি গঠনকারী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বাজার ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। পেটেন্ট রাইটসের নামে কৃষক সমাজের হাজার বছরের লালিত গাছপালা, বীজ ও প্রাণসম্পদকে বহুজাতিক কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধির কাছে তুলে দিয়ে কৃষক সমাজকে নিঃস্ব করে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমাদের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করেন না। তাছাড়া আমাদের প্রশাসনিক অবস্থাও শক্তিশালী নয়। যে কারণে আমাদের অসতর্কতা ও অসচেতনতার সুযোগে আমরা ধনী দেশগুলোর পাতা ফাঁদে ক্রমান¦য়ে আটকা পড়ে যাচ্ছি। যখন আমাদের হুঁশ হয়েছে, তখন পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। যা হোক, সেপ্টেম্বরে মেক্সিকোর কানকুন শহরে অনুষ্ঠিত হবে পঞ্চম মিনিস্টারিয়্যাল কনফারেন্স। এ সম্মেলন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ অবস্থায় উন্নত দেশের বাজারে স্বল্পোন্নত দেশের পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার এবং বিশ্ব শ্রম বাজারে শ্রমিকের অবাধ চলাচলসহ ১৩ দফা দাবির ‘ঢাকা ঘোষণা’র মধ্য দিয়ে ২ জুন স্বল্পোন্নত দেশের বাণিজ্য সম্মেলন শেষ হয়। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে ১৬ দফা ‘ঢাকা ঘোষণা’য় স্বল্পোন্নত দেশের প্রধান দাবি ১৩টি। দাবিগুলো : ১। বিশ্ব বাণিজ্যে স্বল্পোন্নত দেশের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি, নমনীয় এবং সহজতর ‘রুলস অব অরিজিন’ প্রবর্তনের মাধ্যমে এসব দেশের সব পণ্যের জন্য শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা দেয়া; ২। কানকুন সম্মেলনের মধ্যে বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্ট সব ইস্যুর সমাধান এবং স্বল্পোন্নত দেশের জন্য স্পেশাল ও ডিফারেন্সিয়াল ট্রিটমেন্ট প্রথার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটানো; ৩। বিশ্ব শ্রম বাজারে অদক্ষ ও আধা-দক্ষ শ্রমিকের অস্থায়ী চলাচল অবাধ করার লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি প্রদান, ভিসা পদ্ধতি সহজকরণ এবং ইকোনমিক নিড টেস্টের প্রশ্ন উত্থাপন না করা; ৪। স্বল্পোন্নত দেশের নিজস্ব অগ্রগতি, আর্থিক ও বাণিজ্যিক চাহিদা কিংবা প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা অনুসারে প্রতিশ্রুতি প্রদান ও বাধ্যবাধকতা পালনে নমনীয় থাকা; ৫। স্বল্পোন্নত দেশের উৎপাদন ও রফতানিভিত্তিক উন্নয়ন এবং রফতানি ভিত্তির বহুমুখীকরণ ও শক্তিশালীকরণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি করা; ৬। স্বল্পোন্নত দেশের সরবরাহ ঘাটতি দূর করা, রফতানি ভিত্তির সম্প্রসারণ করা এবং আর্থিক সম্পদ প্রাপ্তি উন্নয়নের প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে সম িন্বত কাঠামো শক্তিশালী করা; ৭। অ্যান্টি জাম্পিং, কাউন্টারডেইলিং ও নিজেদের পণ্য সুরক্ষার পদক্ষেপ থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে অব্যাহতি প্রদান; ৮। এমএফএন শুল্ক কমানোর কারণে প্রেফারেন্স মার্জিন কমার বিষয়টি সমাধানের জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণমূলক পদ্ধতি ও অন্যান্য কার্যক্রম উদ্ভাবন করা; ৯। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় স্বল্পোন্নত দেশের প্রবেশাধিকার নীতিমালা দ্রুত কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন; ১০। স্বল্পোন্নত দেশের উন্নয়নে সিঙ্গাপুর সম্মেলনের প্রভাব নিরূপণের লক্ষ্যে কার্যক্রম ও সমীক্ষা চালু রাখা; ১১। ক্ষুদ্র অর্র্থনীতি ও স্থলবেষ্টিত দেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশ চরম দুর্দশা উত্তরণে সহায়তার লক্ষ্যে কৌশল উদ্ভাবন করা; ১২। জেনেটিক, সম্পদ, প্রচলিত জ্ঞান ও কৃষকের অধিকার সংরক্ষণ এবং সব জীবিত বস্তুর স্বত্বাধিকার ট্রিপস চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক কৌশল বলবৎ করা; ১৩। রোগের ওপর ভিত্তি না করে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ওষুধ শিল্পের বাধ্যতামূলক লাইসেন্সিং সমস্যার সমাধান করা। স্বল্পোন্নত দেশের পক্ষ থেকে এসব দাবি আগামী সেপ্টেম্বরে মেক্সিকোর কানকুনে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সম্মেলনে উপস্থাপন করা হবে। ন্যায্য ও পক্ষপাতহীন সুবিধা পেতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোরালো রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ, বিশ্ব বাণিজ্যে স্বল্পোন্নত দেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন, এসব দেশের জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও একযোগে কাজ করার আকাক্ষা থাকা এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নিজেদের সামর্থ্য ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞান উন্নত করা প্রয়োজন।


বর্তমান বিশ্বের ১২০ কোটি মানুষ দৈনিক এক মার্কিন ডলারেরও কম আয়ে চরম দারিদ্র্যসীমায় বসবাস করছে। এসব মানুষের অধিকাংশের ঠিকানা ৪৯টি স্বল্পোন্নত দেশ। আঙ্কটাড-এর এক হিসাব অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি চরম দরিদ্র। দ্রুত জরুরি কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হলে স্বল্পোন্নত দেশে দারিদ্র্য এক-তৃতীয়াংশ বেড়ে যাবে। অর্থনীতির চালিকাশক্তির হিসাবে বাণিজ্যের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জীবিকার প্রধান খাত হচ্ছে কৃষি। বহির্বাণিজ্যে এই খাতটি কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। উন্নত দেশের বাধার কারণে আমাদের কৃষিপণ্য ঢুকতে পারে না। কানকুন সম্মেলনে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলোর কাছ থেকে খুব সহজে সুবিধা আদায় করা সহজ হবে না। তাদের কৌশল, চালাকি ও মেধার কাছে স্বল্পোন্নত দেশের এঁটে ওঠা কঠিন হয়ে পড়বে। স্বল্পোন্নত দেশকে সঠিক নেতৃত্ব প্রদান এবং তীক্ষন মেধা ও যুক্তির ছুরিতে প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়ার মতো বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দারুণভাবে অনুভূত হচ্ছে। তারপরও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে ন্যায্য ও পক্ষপাতহীন সুবিধা পেতে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জোরালো রাজনৈতিক ইচ্ছা ও সমনি¦ত উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে নিজেদের সামর্থ্য মেলে ধরতে হবে। কানকুন সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলো কতটা কি আদায় করতে পারবে- সেটা বলা মুশকিল। তবে বিশ্বায়নের গোলকধাঁধা থেকে রেহাই পেতে হলে বাংলাদেশকে দাঁড়াতে হবে নিজের পায়ে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে নিজের অবস্থান করে নিতে হলে বাংলাদেশকে তাকাতে হবে সামনের দিকে। দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল, আইন-শৃ´খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি, মাস্তানি, কথায় কথায় হরতাল, ধর্মঘট বন্ধ, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণসহ আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে গার্মেন্টসসহ রফতানিযোগ্য পণ্যের বাজার শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কেননা, বাংলাদেশে শ্রম সহজ, সুলভ ও সস্তায় পাওয়া যায়। এটাকে পুঁজি করে অবাধ শ্রমের বাজারে প্রতিদ্বন্দি্বতা করে টিকে থাকতে চেষ্টা করাটাই হবে বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম পথ। 

দৈনিক সংবাদ : ৪ জুলাই ২০০৩

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

ইরাকের অস্তিত্ব কি বিলীন হয়ে যাবে?


পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে বেঁচে থাকার তাগিদে মানুষকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এগুতে হচ্ছে। পৃথিবীটা সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট অর্থাৎ যোগ্যদের জন্য। আর এই টিকে থাকতে গিয়ে কিংবা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন করতে গিয়ে যুগে যুগে দেশে দেশে যুদ্ধ কিংবা মানুষে মানুষে লড়াই ও সংঘাত অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। হত্যা, ধ্বংসলীলায় শেষ হয়ে গেছে কত মানুষের জীবন ও সম্পত্তি। এসব যদি এড়ানো যেতো, তাহলে এই পৃথিবী হয়ে উঠতে পারতো স্বর্গীয় উদ্যানে। কিন্তু লোভ, স্বার্থপরতাকে মানুষ প্রশমন করতে পারেনি। যে কারণে হত্যা ও ধ্বংসলীলার কারণে এই পৃথিবী কখনো সুস্থ ও সবল হয়ে উঠতে পারছে না। প্রাচীনকালে কিংবা মধ্যযুগে যুদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিল দখলদারিত্বের মধ্যে। মানুষকে দাসত্বের শৃ´খলে বন্দি রাখা এবং সম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা করে ভোগদখল করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। আধুনিককালে যুদ্ধ হলেও তা ছিল পরাধীনতার নাগপাশ থেকে ছিন্ন হওয়ার সংগ্রাম এবং নানা স্বার্থের টানাপড়েনে সাময়িকভাবে যুদ্ধে বা সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া। এতে অবশ্য জীবন ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু কোনো দেশ দখলের ঘটনা ঘটেনি। এসব যুদ্ধ ও সংঘাত সম্ভব হয়েছে আন্তর্জাতিক আইনের বন্ধন শিথিল থাকায়। কেননা, এমনটি হতে পেরেছে কোনো নিয়ম-নীতির বালাই ছিল না বলে। যুদ্ধবাজ হিটলার, মুসোলিনির জবরদস্তিমূলক শাসনের অবসানের পর পৃথিবীর মানুষের মনে ফিরে আসে শান্তি। যুদ্ধ, মৃত্যু, ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য শান্তিকামী দেশগুলো একটি আন্তর্জাতিক ফোরামে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার তাগিদ অনুভব করতে থাকে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকালে আন্তর্জাতিক আইনের সীমারেখা দৃঢ় হওয়ায় দেশগুলোর স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত হয়েছে। বিশেষত ছোট ছোট দেশগুলোও সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করছে। বিশ্বের শান্তিকামী সার্বভৌম দেশগুলো নিরাপত্তার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালে গঠিত হয় ‘জাতিসংঘ’। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, জাতিতে জাতিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক সমস্যা সমাধান এবং মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি নিবেদিত থেকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার যে ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদিত হয়, তার ছায়াতলে আশ্রয় খুঁজে পায় প্রতিটি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা ও সংস্কৃতি। অবশ্য জাতিসংঘের হালকা নীল ও সাদা পতাকাতলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সমবেত হলেও যুদ্ধ ও সংঘাতের অবসান হয়নি। আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সোভিয়েত ও মার্কিন বলয়ের ঠা-া লড়াই চলতে থাকে। চার দশকের ঠাণ্ডা লড়াইয়ে উত্তাপ-উত্তেজনা, স্মায়ুযুদ্ধ ও রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটেছে। ১৯৫০ সালে দ্বিতীয় যুদ্ধ-উত্তরকালে দুই কোরিয়ার যুদ্ধ, ১৯৫৬ সালে দুই র্ভিয়েতনামের যুদ্ধ, ১৯৫৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করায় মিসরের সঙ্গে ইসরাইলের যুদ্ধে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের নির্লজ্জ সমর্থন, ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধ, ১৯৬৩ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধ, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, ১৯৭৫ সালে লেবাননের গৃহযুদ্ধ, একই বছর অ্যাঙ্গোলায় গৃহযুদ্ধ, ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধ, ১৯৮০ সালে ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ১৯৮২ সালে শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ, ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখল, ১৯৯২ সালে বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় যুদ্ধ প্রভৃতি ছিল মূলত দুই পরাশক্তির ইন্ধনে আধিপত্য বিস্তার, জবরদখল, গৃহযুদ্ধ, সীমান্ত বিরোধ, গণহত্যা, স্বাধীনতা সংগ্রাম, জাতিগত সংঘাতকে কেন্দ্র করে। এতে লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝরেছে। বিনাশ হয়েছে মূল্যবান সম্পত্তির। এর মধ্যে আরব ভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের জঠর থেকে সৃষ্টি হয়েছে ‘ইসরাইল’ নামক অবৈধ রাষ্ট্রের। ইসরাইলের আরব ভূখণ্ড দখল, চীনের ভারতের লাদাখ অঞ্চল দখল ছাড়া ভূখ- জবরদখলের আর কোনো বড় ধরনের ঘটনা ঘটেনি। এমনটি সম্ভব হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য। এর মধ্যে শুধু আফগানিস্তানে কিছুটা বিতর্কিত ভূমিকা থাকলেও অধিকাংশ যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত সংঘাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা ছিল ইতিবাচক। তারা বরাবরই স্বাধীনতাকামী, শান্তিকামী ও দুর্বল শক্তির পক্ষাবলম্বন করেছে।

পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সব সময়ই আগ্রাসী, জবরদখলকারী, আধিপত্যবাদী, স্বৈরাচারীদের সপক্ষে। এই দু’পক্ষের মধ্যে একটা স্মায়ুযুদ্ধের উত্তাপ ও উত্তেজনা বিরাজ করলেও পরোক্ষভাবে একটা ভারসাম্যমূলক অবস্থা বিরাজ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র যা খুশি, তা করতে চাইলেও সোভিয়েত ইউনিয়ন বরাবরই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে কারণে বিশ্বব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো সঙ্কট সৃষ্টি হয়নি। এসব যুদ্ধে নীরব ক্ষত ও স্বার্থের টানাপড়েন রয়ে গেলেও পুরো দেশ দখলের ঘটনা ঘটেনি। ঘটলেও তা ছিল সাময়িক এবং সামান্য কিছু ভূখণ্ডের মধ্যে সীমিত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় ভেঙে পড়েছে বিশ্বব্যবস্থা। এককেন্দ্রিক পৃথিবীতে এখন একক প্রভু যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র একক সুপার পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় বিভিন্ন দেশের নিরাপত্তার স্বস্তিটুকু হারিয়ে গেছে। অতি সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য আগ্রাসন চালিয়ে পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের ধমকে এবং অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে যেভাবে ইরাক জবরদখল করে নিয়েছে, তাতে সারা পৃথিবীর মানুষ শুধু স্তম্ভিতই নয়- আতঙ্কিতও হয়ে পড়েছে। ইসরাইলের স্বার্থ অটুট রাখতে এবং তার জন্য যে বা যারা হুমকি, তাদের ঘায়েল করা, মধ্যপ্রাচ্যে আধিপত্য বিস্তার করা ও তেল সম্পদ ভোগদখলের জন্য প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে ইরাক গ্রাস করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এটা আধুনিক সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং কলঙ্কজনক তো বটেই। মানুষের জীবন নিঃসন্দেহে সবচেয়ে মূল্যবান; কিন্তু যুদ্ধ, লড়াই, সংঘাতে জীবনহানি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এ কারণে পৃথিবীতে অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধের বিরোধী। যুদ্ধের হুঙ্কার পাওয়া গেলেই রাজপথে নেমে আসে শান্তিকামী মানুষ। কিন্তু যুদ্ধবাজদের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। তারা নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে লিপ্ত হয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। অবশ্য এতে যুদ্ধবাজদের কিছু না হলেও জীবনহানি ঘটে সাধারণ ও নিরীহ নাগরিক এবং দু’মুঠো অন্নের জন্য সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত দরিদ্র সৈনিকদের। যুদ্ধের নৃশংসতা ও বেদনাদায়ক ঘটনাবলী তাই এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকে না। তবে আধুনিক যুগে মানুষ সভ্যতার পাঠ নিয়েছে। গণতন্ত্র, মৈত্রী, শান্তি, মানবাধিকার, আইনের শাসনের প্রতি মানুষ এখন শ্রদ্ধাশীল। যে কোনো বিরোধ পারস্পরিক সমঝোতা কিংবা জাতিসংঘের মাধ্যমে নিরসন করে নিতে পারেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন অখণ্ড অবস্থায় থাকার সময় একটা স্মায়ুযুদ্ধের চাপ ও তাপ বিশ্ববাসীকে উদ্বিগ্ন করে রাখে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর শান্তিকামী মানুষ এই বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়েছিলেনÑ যাক, আর যুদ্ধ নয়। পৃথিবীতে নেমে আসবে শান্তির নহবত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যকে মানুষ জেনে এসেছে নানা জাতি, ধর্ম, আদর্শ, মতবাদ ও গণতন্ত্রের লালনকেন্দ্র হিসেবে- যারা বিশ্বকে দিয়েছে বিজ্ঞান ও সভ্যতার আশীর্বাদ। অথচ তাদের নীতি ও নৈতিকতা যখন ভেঙে পড়ে, তখন আর কীভাবে আশাবাদী হওয়া যায়? নানা সমস্যা থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল মুক্ত স্বাধীনতার দেশ- যা পৃথিবীর জন্য ছিল একটি মডেল। বিভিন্ন সুযোগ, সমৃদ্ধি ও ঝলমলে জীবনধারার টানে বহুজাতিক এই দেশটিতে ছুটে আসে পৃথিবীর নানা প্রান্তের লোক। হ্যামিলনের বংশীবাদকের সুরে সুরে ছুটে আসা এই লোকদের মধ্যে রয়েছে নানা জাতি, ধর্ম ও বংশ পরিচয়ের বিচিত্র ধারার লোক। গণতন্ত্রের শক্তিতে নানা দেশের নানা মানুষকে নিয়ে এক সুতোয় গেঁথেছে বিশ্বের শক্তিমান দেশ যুক্তরাষ্ট্র এবং ১৭৭৬ সালে জন্মের পর থেকে যেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হয়ে এসেছে, তা ছিল তাবৎ পৃথিবীর মানুষের জন্য অভূতপূর্ব। প্রত্যক্ষ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কখনোই কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। হয়তো ভেতরে ভেতরে নানা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, প্রলোভন, কূটকৌশল ও রাজনৈতিক দ্বন্দ¡-সংঘাত চলেছে; কিন্তু সবকিছুর নির্ধারক হয়ে দাঁড়ায় সরাসরি ভোটাধিকারপ্রাপ্ত জনগণ। মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থা পৃথিবীর মানুষের কাছে অসীম আগ্রহ ও কৌতূহলের বিষয়। কিন্তু ২০০০ সালের যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন মানুষের যাবতীয় আস্থা ও ধারণায় কুঠারাঘাত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে গেছে, তা যেন হঠাৎ করে সবার কাছে উন্মোচিত হয়ে যায়। নিপাট ভদ্রলোক হিসেবে পরিচিত গণতন্ত্রের সত্যিকার পূজারী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোর প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে আস্থা, জনপ্রিয়তা ও ভালোবাসা দিয়ে আমেরিকানদের মন জয় করেন এবং পপুলার ভোটে তার জয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সবাই বুঝতে পারেন ভোটাভুটিতে আল গোরকে হারানো সম্ভব হবে না। নির্বাচন চলাকালে বিভিন্ন রাজ্য থেকে আল গোরের সাফল্যের বার্তা আসতে থাকে। কিন্তু অস্ত্র ও তেল ব্যবসায়ী ইহুদি লবি তখন অন্য হিসাব কষতে থাকে। তারা নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে জুনিয়র জর্জ বুশের জয়ের জন্যে মরিয়া হয়ে ওঠে। শেষ খেলাটা দেখান ফ্লোরিডার গভর্নর জর্জ বুশের অনুজ জেব বুশ। ভোট কারচুপির মাধ্যমে এমন একটা ধোঁয়াটে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য দ্বারস্থ হতে হয় আদালতের। সেই আদালতের বিচারক ছিলেন কারা? তাদের নিয়োগদাতা ছিলেন জুনিয়র জর্জ বুশের পিতা সিনিয়র বুশ। আইন, বিচার ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মুখে কালিমা লেপন করে তারা পক্ষপাতমূলক ও নির্লজ্জের মতো জুনিয়র জর্জ বুশের পক্ষে অন্যায় ও অযৌক্তিকভাবে রায় দেন। এমন একটা লজ্জাজনক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র কেঁপে উঠলেও কেঁপে ওঠেনি আমেরিকান জনগণ। যারা সামান্য কোনো ঘটনায় বিস্ফোরিত হয়ে ওঠেন, তারা কেন জানি সবকিছু নীরবে মেনে নেন। পরবর্তীতেও এ নিয়ে কেউ উচ্চবাচ্য করেননি। মনে হয় সেদিনই শেষ হয়ে যায় মানুষের বোধ, বুদ্ধি, বিবেক, বিবেচনা, গণতন্ত্র, মৈত্রী, শান্তি, মানবাধিকার, আইনের শাসন, ন্যায়-নীতি। এরই ধারাবাহিকতায় কোনো এক অদৃশ্য শক্তি ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়েছে, আজ অবধি তা নির্ণয় করা না গেলেও তাকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের যে রণহুংকার ও তাণ্ডব তাতে এমনটি মনে হওয়া স্বাভাবিক ‘ডাল মে কুচ কালা হ্যায়’। কিন্তু সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার নামে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই সন্ত্রাসবাদের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করছে হিংসা ও সহিংসতার মাধ্যমে। আফগানিস্তান, ইরাকে আগ্রাসন, দেশে দেশে ‘লাদেন’ ফোবিয়ার নামে উন্মাদনার সৃষ্টি এবং একের পর এক মানব জাতি, মানবতা ও মানব সভ্যতাবিরোধী নতুন নতুন টার্গেট নির্ধারণ করার ঘোষণা করে চলেছে। পৃথিবীকে তারা কোথায় নিতে চায়- একমাত্র তারা ছাড়া আর কেউ তা জানে না। এতো কিছু বলার উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্র যে রণোন্মাদ হয়ে গেছে- তার মূলে রয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত করে জুনিয়র বুশের নির্বাচনী বৈতরণী অতিক্রম। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় বিশ্বকে নিয়ে পুতুল নাচের খেলা। তারা শুধু আগ্রাসন, জবরদখল ও আত্মসাতের খেলায় মেতে ওঠেনি, পাশাপাশি তারা মেতে উঠেছে সভ্যতা বিধ্বংসী খেলায়।

ইরাককে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নেয়ার পাশাপাশি এখন তারা সভ্যতার ইতিহাস ও নিদর্শন মুছে দিতে চাচ্ছে। অথচ যুদ্ধ শুরুর আগে ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রত্মতাত্ত্বিক সংস্থা ইরাকের সভ্যতার নিদর্শনগুলো যাতে যুদ্ধের শিকার না হয়, তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানিয়েছিল। এ ক্ষেত্রে আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইরাক দখল করার পর মার্কিন মেরিন সেনাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায় লুট হয়েছে ইরাকি জাদুঘর, পাঠাগার, প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ। ভাংচুর, তছনছ ও লুটতরাজ করা হয়েছে ইরাকি সভ্যতার হাজার বছরের নিদর্শন। মানব সভ্যতার সূর্যোদয় ঘটেছিল ইরাকি ভূখণ্ড। দজলা ও ফোরাত নদীর মধ্যবর্তী এলাকায় বিভিন্ন সময়ে গড়ে ওঠা ব্যাবিলনীয়, সুমেরীয় ও অ্যাসিরীয় সভ্যতার অনেক প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন পরিকল্পিতভাবে চিরতরে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। ৪০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মেসোপটেমিয়া থেকে ইরাকের উদ্ভব। সে সঙ্গে মানব সভ্যতার বিকাশ। সমৃদ্ধ সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু ইরাককে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার জন্য ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী সুকৌশলে এগিয়ে চলেছে। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে ইরাককে একাধিক খণ্ডে বিভক্ত করার চক্রান্ত করছে। এ জন্য তারা বিবদমান শিয়া-সুন্নি ও কুর্দিদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে উসকে দিয়ে আলাদা নামে ইরাককে খণ্ড-বিখণ্ড করতে চাচ্ছে- যাতে ইরাক নামক দেশটির অস্তিত্ব কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সে সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্বের ধ্বংসসাধন করে প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শন লুট ও ধ্বংস করে আরব সভ্যতাকে মুছে দিতে চাইছে। এমনিতে বিশ্বব্যাপী ইয়াঙ্কিদের জয়জয়কার। শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মেধার ক্ষেত্রে তারা অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করছে। দুনিয়ার সেরা প্রতিভাবান ও মেধাবীদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে নিয়ে গিয়ে তাদের মেধা ও বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্যতার জয়ঢঙ্কা বাজানো হচ্ছে। ফলে প্রাচ্য ও অনগ্রসর দেশগুলোর জ্ঞানের ভা-ার আরো শূন্য হয়ে যাচ্ছে; ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে শিক্ষা-দীক্ষায়, মেধায়-মননে, বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে ও যোগাযোগ ব্যবস্থায়। কিন্তু পুরনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের দিক দিয়ে ইয়াঙ্কি সভ্যতা আরবীয় সভ্যতা, সৌন্দর্যবোধ ও ঐতিহ্যের তুলনায় সমৃদ্ধ নয়। এ কারণে একটি সূক্ষ্ম ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা থেকে আরব সভ্যতার বিনাশে ইয়াঙ্কিরা বেছে নিয়েছে চরম পন্থা। আমরা অতীতে দেখেছি, লুটতরাজ চললেও সভ্যতার নিদর্শনগুলো বরাবরই অক্ষত থেকে যায়। এমনকি যুদ্ধ শেষে লুট করে নিয়ে যাওয়া নিদর্শনগুলো ফিরিয়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাদপীঠ প্যারিসের চিত্রকলা, ভাস্কর্যসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাওয়ার পর যুদ্ধ শেষে আগ্রাসী জার্মানরা তা ফিরিয়ে দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফিরিয়ে না দেয়া হলে তা যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু এবার আমরা ইরাকে কী দেখছি? ইরাকি সভ্যতার নিদর্শনগুলো শুধু লুটতরাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যাবতীয় সভ্যতার নিদর্শন, প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ, দুর্লভ পাণ্ডুলিপিসহ ইরাকি সভ্যতা ও ইতিহাসের যাবতীয় নিদর্শন ভেঙেচুরে মাটির সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে, যাতে করে তা উদ্ধার করা না যায়। অর্থাৎ ইরাকি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতা সুপরিকল্পিতভাবে মহাকাল থেকে চিরতরে মুছে ফেলা হচ্ছে। হালাকু খান ইরাকি সভ্যতার যে চরম সর্বনাশ করেছিল, বুশ-ব্লেয়ার বাহিনী তার শেষটুকু নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। তারা কি চাইছে ইরাক নামক একটি দেশকে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত করে দিতে? যে ইরাকি সভ্যতা মানুষের সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছে, তাকে বিলীন করে দিতে? ইরাকি সভ্যতাকে তাদের কেন এত ভয়? তার কারণ কি এই নয় যে, আমেরিকান আদিবাসী ইন্ডিয়ান ও উপজাতীয়দের প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে শিকড়হীন বহিরাগতদের নিয়ে যেভাবে মিথ্যে মিথের ওপর গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র নামক একটি অভিবাসী দেশ, তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য পৃথিবীর সমৃদ্ধ সভ্যতার সব চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে! নতুবা বিশ্ববাসীর অনুরোধ-উপরোধ উপেক্ষা করে মার্কিন মেরিন সেনাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকায় কেন ইরাকি জাদুঘর, গ্রন্থাগার ও প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ লুণ্ঠন ও ধ্বংস করা হয়েছে? কিন্তু চাইলেই কি মুছে ফেলা যায় কোনো সভ্যতা? এই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে যে সভ্যতার চিত্রলিপি, তাকে তো কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। হয়তো নিদর্শনগুলো নিশ্চিহ্ন করা যাবে, সাময়িকভাবে ব্যাহত হবে মানুষের অনুসন্ধিৎসা। কিন্তু এ কথা তো সত্যি- সভ্যতার ইতিহাস বয়ে চলে বহতা নদীর মতো। দৈনিক সংবাদ : ৫ জুন ২০০৩

ইরাকে আগ্রাসন এবং আমাদের শিক্ষা


ইরাকে মার্কিন-বৃটিশ হানাদার বাহিনীর আগ্রাসন ও দখলদারিত্বে পরাধীনতার গ্লানিতে ভুগছেন ইরাকের পাশাপাশি আরববাসীরাও। কিন্তু আগ্রাসী ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীকে ইরাকের মাটিতে স্বাগত জানিয়েছে শিয়া সম্প্রদায় ও কুর্দি গোষ্ঠী। মনে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, কেন তারা এমনতরো নিন্দনীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো? নিশ্চয়ই এর পেছনে এমন কোনো নিগূঢ় কারণ আছে- যে জন্য তাঁরা দখলদার বাহিনীকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছে। এই দুই গোষ্ঠী ক্ষমতা থেকে অপসারিত ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের দুই যুগের শাসন ও শোষণে নিপীড়িত, বঞ্চিত এবং এক ধরনের পরাধীন জীবনযাপন করেছে। যদিও শিয়া সম্প্রদায় জনসংখ্যার দিক দিয়ে ইরাকে সংখ্যাগরিষ্ঠ। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আচরণ করা হয়েছে সংখ্যালঘুর মতো। দমন-পীড়ন চালিয়ে সর্বদা তাদের ব্যতিব্যস্ত রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিকসহ মূল স্রোতধারায় তাঁরা কখনই সুবিধা করতে পারেনি। বরং তারা যাতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে, সে জন্য তাঁদের ওপর চালানো হয় নানান রকম নির্যাতন ও নিগ্রহ। রাসায়নিক গ্যাস প্রয়োগ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে হাজার হাজার কুর্দিকে। এ কথা তো সর্বজনবিদিত, শাসক হিসেবে সাদ্দাম হোসেন ছিলেন একরোখা ও স্বৈরাচারী মনোভাবাপন্ন। সামান্য এদিক-সেদিক হলে দূরের মানুষ তো বটেই, রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনকেও পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে একটুও কার্পণ্য করতেন না। তুরস্কের কামাল আতাতুর্ক, মিসরের জামাল আব্দুল নাসেরের মতো তিনি আরব জাতীয়তাবাদী নেতা হতে চাইলেও তাঁর এসব দুর্বলতার কারণে তিনি ক্রমান্বয়ে ইসলামী দেশগুলোর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। ইরানের সঙ্গে বছর আটেক ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে এবং কুয়েতে অনর্থক আগ্রাসন চালিয়ে আরব বিশ্বে তিনি রীতিমত আতংকের কারণ হয়ে দাঁড়ান। এ কারণে প্রতিবেশী দেশ ইরান, কুয়েত, সৌদি আরব, জর্ডান, মিসর, তুরস্ক প্রভৃতি আরব দেশগুলোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা মোটেও স্বাভাবিক ছিল না। মার্কিন-বৃটিশ বাহিনী আগ্রাসী শক্তি হিসেবে নির্লজ্জের মতো ইরাকে হামলা চালালেও এর প্রতিবাদে এক সিরিয়া ছাড়া আর কোনো আরব রাষ্ট্র টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি, এমনকি কোনো কোনো দেশ এক ধরনের পুলক অনুভব করেছে। তারা মনে-প্রাণে চেয়েছে সাদ্দাম-যুগের অবসান। সঙ্গত কারণে নিপীড়িত, লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত শিয়া সম্প্রদায় এবং কুর্দিরা তাৎক্ষণিক‘মুক্তি’র উল্লাসে তাদের বরণ করে নিয়েছে। মার্কিন ও বৃটিশ বাহিনী যে মাত্র ২০ দিনে ইরাক দখল করতে পেরেছে, সেক্ষেত্রে তাদের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র এবং ইরাককে জাতিসংঘের মাধ্যমে দুর্বল ও নিরস্ত্রীকরণের বড় ভূমিকা অবশ্যই ছিল। তদুপরি সংখ্যালঘু কুর্দি ও সংখ্যাগরিষ্ঠ শিয়াদের নির্লিপ্ত এবং বিদ্রোহী ভূমিকা ইরাককে পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ করতে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর জন্য সহজ হয়েছে। কোনো কোনো আরব দেশের নীরব সমর্থন এবং শিয়া ও কুর্দিদের উল্লসিত ভূমিকায় মার্কিন-বৃটিশ বাহিনীর আগ্রাসন জায়েজ হয়েছে তা বলা যাবে না। তবে আগ্রাসী বাহিনী যখন একের পর এক ইরাকের ভূখণ্ড দখল করে নিতে থাকে, ঠিক তখন শিয়া ও কুর্দিরা যেভাবে তাদের সুস্বাগতম জানিয়েছে এবং পাশ্চাত্যের টেলিভিশনের পর্দায় তা যেভাবে ঢালাওভাবে সম্প্রচারিত হয়েছে, তা ছিল অবশ্যই দৃষ্টিকটু। তারা যেভাবে লুটতরাজ, ভাংচুর ও সহিংসতার পথ বেছে নেয়, তাতে বিশ্ববাসী বিহ্বল ও হতবাক হয়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এ ঘটনায় তাদের সুবিধাবাদী ও সুযোগসন্ধানী মনে হতে পারে। কিন্তু শিয়া ও কুর্দিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করলে তাদের উচ্ছৃংখল আচরণের যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। দেয়ালে পিঠ ঠেঁকে গেলে মানুষ তখন প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে চরমতম পথ বেছে নিতে দ্বিধা করে না। আবার অবস্থার পরিবর্তন হলে তারা ফিরে আসে স্বাভাবিক জীবনধারায়। তখন হিসাব কষে পরিস্থিতির মূল্যায়ন করেন। শিয়া ও কুর্দিরা যখন বুঝতে পেরেছে, তারা বাঘের মুখ থেকে সিংহের মুখে পড়েছে, তখনই তাদের মোহভঙ্গ ঘটে যায়। প্রথম কিছুদিন মার্কিন ও বৃটিশ বাহিনীকে স্বাগত জানালেও শিয়া ও কুর্দিরা এখন আর ইরাকের মাটিতে তাদের দেখতে চায় না। ইরাকে দখলদার মার্কিন-বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও বিষোদগার ক্রমশঃ বাড়ছে। তারা মার্কিন বাহিনীকে অবিলম্বে ইরাক ত্যাগের দাবি জানিয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তারা সাদ্দাম হোসেনের পতন কামনা করলেও শাসক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে কখনো মেনে নেবে না। ইরাকের ঘটনায় একটি অভিজ্ঞতা বা শিক্ষা বিশ্ববাসীর অন্তত হয়েছে যে, দেশের একটি অংশকে ক্ষুব্ধ করে কিংবা দমিয়ে রেখে দেশ পরিচালনার বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে। ইরাকে আগ্রাসন-পরবর্তী নয়া বিশ্ব ব্যবস্থায় ‘জোর যার মুল্লুক তার’ মনোভাবের কারণে যে কোনো দেশই যে কোনো সময় আক্রান্ত হতে পারে। সে জন্য দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য যে কোনো হুমকি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সবার সতর্ক থাকলেই শুধু চলবে না, এ জন্য বৃহত্তর রাজনৈতিক ও জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। আর এ জন্য দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সর্বজনীন চেতনা ও ঐক্যের মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। সে ক্ষেত্রে জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ না করে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব-মৈত্রী-সম্প্রীতির সুদৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। সবার আগে ভেবে দেখতে হবে, কোনো রকম বৈষম্য যেন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা বা অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়। কোনো জনগোষ্ঠীর মনে যেন পুঞ্জিভূত ক্ষোভের সৃষ্টি না হয়, যাতে তারা নিজেদের অসহায় ও বঞ্চিত মনে করে। বাংলাদেশে নানা সম্প্রদায়ের বসবাস। এ দেশের জনগণের গরিষ্ঠ অংশ মুসলমান। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের আচার-আচরণ ও মনোভাবে এমনটি যাতে প্রতিফলিত না হয়, যেন তারা সর্বেসর্বা। এমনটি হলে সংখ্যালঘুরা মানসিকভাবে হীনমন্যতায় ভুগতে পারে। তাহলে দেশের মধ্যে একটা বিভেদের দেয়াল সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আর তাহলে সেটা হবে নিজের পায়েই কুড়াল মারার শামিল। আয়তনের দিক দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রের ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। অনগ্রসরতা ও সামরিক শক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুবই নাজুক। শক্তি ও সামর্থ্যে প্রতিবেশী দেশগুলো আমাদের তুলনায় যথেষ্ট শক্তিশালী বলে আপাতদৃষ্টিতে প্রতীয়মান হয়। যে কোনো দেশের সঙ্গে যুদ্ধ বা সংঘাতে আমরা কতটা কী করতে পারবো- তা বলা দুষ্কর। যদিও ১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানের বিপক্ষে যুদ্ধ করে জিতেছি। সেটি মুক্তিযুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তখনকার সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির ঢের ঢের তফাৎ। বিশ্বশক্তি এককেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় এখন কারো নিঃস্বার্থ সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া সহজ নয়। সামরিক সমর্থন ছাড়া শুধু মানসিক শক্তি দিয়ে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার দিন এখন অতীত হয়ে গেছে। সে ক্ষেত্রে দেশের মানুষ যদি এক সূতোয় গাঁথা মালা হয়ে আগ্রাসী শক্তির বিপক্ষে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়, তাহলে আঘাত হানার আগে প্রতিপক্ষকে একাধিকবার ভাবতে হবে। অবশ্য ১৯৭১ সালে আমাদের অভিজ্ঞতাও যথেষ্ট তিক্ততায় ভরা। এদেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সর্বাত্মক সাহায্য ও সহযোগিতা করে নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা নিতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আমাদের সদর্থক ভাবনার দিগন্তকে প্রসারিত করতে হবে। এটা অন্তত বুঝতে হবে- মাতৃভূমির সাথে বেঈমানি করে সভ্য মানুষ হিসেবে নিজেদের দাবি করা যায় না। ইরাকে আগ্রাসনের ঘটনায় আমরা দেখতে পেয়েছি, শান্তির প্রতি এবং নিজ দেশের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ ও ভালোবাসা অনেকখানি বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে দেশে দেশে আত্মরক্ষার নতুন কৌশল নিয়ে ব্যাপক চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতাকারী চারটি ইউরোপীয় দেশ ২৯ এপ্রিল ২০০৩ নিজেদের মধ্যকার সামরিক বন্ধনকে অধিকতর সুদৃঢ় করার বিষয়ে আলোচনার জন্য ব্রাসেলসে এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে এই দেশ চারটি অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করায় যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃটেনের সঙ্গে তাদের মন-কষাকষির সূত্রপাত ঘটে। ফ্রান্স, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ ও বেলজিয়াম- এই চারটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশ ইরাকে হামলা এবং তার পরিণতি মূল্যায়নপূর্বক উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিজেদের মধ্যে প্রতিরক্ষার বন্ধন জোরদার করার উদ্যোগ নিচ্ছে।


ইরাক যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার সর্বাধুনিক ও ভয়ংকর সব অস্ত্রের যে প্রদর্শনী করেছে এবং যে উপায়ে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘকে ঠুঁটো জগন্নাথ ও বিশ্ব জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইরাকে হামলা চালিয়েছে, তাতে ইউরোপীয় এই দেশগুলো বিচলিত ও ক্ষুব্ধ। যুক্তরাষ্ট্রের এই ভয়ংকর আগ্রাসী চেহারাদৃষ্টে এই দেশ চতুষ্ঠয়ের নেতারা উপলব্ধি করেছেন যে, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় শক্তির ভারসাম্য রচিত না হলে ইরাকের মতোই অন্য সবার জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করবে মাত্র। ইউরোপীয় এই চারটি দেশের এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা অন্য সবাইকেও স্পর্শ করছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও নিশ্চয়ই পিছিয়ে থাকবে না। বাংলাদেশের জন্য আশার কথা, মানব সম্পদের দিক দিয়ে দেশটি সমৃদ্ধ। যে কোনো বিচারে ১৪ কোটি লোক বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শক্তি। এই শক্তিকে বিভক্ত ও বিভাজন না করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের আলোকে দেশকে পরিচালনা করা হলে শুধু দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থানেরই উন্নতি হবে না, একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের লাল-সবুজ পতাকা সমুন্নত থাকবে।

দৈনিক প্রথম আলো : ৪ জুন ২০০৩

শ্রেষ্ঠ সংগীত, ফুল আর পরাধীনতা


মার্কিন ও বৃটিশ বাহিনীর আগ্রাসনে বধ্যভূমিতে রূপ নিয়েছে সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র এবং শ্রেষ্ঠ সংগীত ও ফুলের নন্দনকানন ইরাক। পরাক্রম শক্তির অন্যায় ও অনৈতিক হামলায় প্রাণ দিয়েছেন হাজার হাজার ইরাকী। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বাসস্থান ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, নিঃশেষ হয়ে গেছে হাজার হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শনসমূহ- সর্বোপরি যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁরাও ধুঁকে ধুঁকে এগিয়ে চলেছেন মৃত্যুর পথে। অল্প কিছুদিনের ব্যবধানে একটি সজীব ও প্রাণোচ্ছ্বল দেশের যে মুমূর্ষু অবস্থা হয়েছে, তা কি এড়ানো যেত? অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ও যুদ্ধ প্রকৌশলে সর্বশক্তিমান যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যখন ইরাকে আগ্রাসন চালানোর হুমকি প্রদান করতে থাকে, তখন তো এটা ধরেই নেয়া হয়, তাদের প্রতিরোধ করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য ইরাকের নেই। শুধু ইরাক কেন, পৃথিবীর আর কোন দেশেরই বা আছে? ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনও প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা এবং নিজের দুর্বলতার কথা খুব ভালভাবেই জানতেন। জানতেন বলেই জাতিসংঘের নির্দেশনামা মেনে চলেছেন। হ্যান্স ব্লিক্সের নেতৃত্বে জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দলকে ইরাকে সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়। কথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভাণ্ডার খুঁজে বের করার নামে জাতিসংঘ অস্ত্র পরিদর্শক দল একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য যেটুকু অস্ত্র থাকে- তাও তন্ন তন্ন করে খুঁজে ধ্বংস করে দিয়ে যায়। ইরাক ত্যাগের আগে হ্যান্স ব্লিক্স তাঁর প্রতিবেদনে জানিয়ে দেন, ইরাকে আর কোনো জীবাণু ও রাসায়নিক অস্ত্র নেই। এতে অনুধাবন করা যায়, ইরাকের সামরিক শক্তি অসম্ভব দুর্বল হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বিশ্বের দণ্ডমুণ্ডের হর্তা-কর্তা তো এমনি এমনি হয়নি। তাদের অর্থ, সম্পদ, রাসায়নিক ও পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডারই যে শুধু সমৃদ্ধ তা নয়, তাদের কূটকৌশলের দক্ষতা সর্বজনবিদিত।
আমরা যেটা আজকে চিন্তা করি, মার্কিনীরা সেটা অনেক আগেই ভেবে রাখে। তারা যে হুট করে ২০ মার্চ ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছে- এমনটি ভাবা বোকামির নামান্তর। তারা দীর্ঘদিন যাবৎ পরিকল্পনা করে এবং সেই অনুযায়ী ছক কেটে একের পর এক ইরাককে একঘরে ও দুর্বল করেছে। তাদের কৌশলী পরিকল্পনায় ইরাক ১৯৯০ সালে নির্বোধের মত কুয়েত দখল করেছে, তারই পথ বেয়ে আরব অঞ্চলে নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিবেশী দেশ কুয়েত, সৌদি আরব, জর্দান, তুরস্ক, মিশর, ইরান, কাতার, আরব আমিরাত, বাহরাইনের সঙ্গে ক্রমান্বয়ে ইরাকের যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তার নেপথ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিখুঁত দাবার চাল। পর্যায়ক্রমে বন্ধুহীন ও নিরস্ত্র করার মাধ্যমে ইরাককে শক্তিহীন করে ফেলা হয়েছে। তারপর জাতিসংঘের মাধ্যমে ১৯৯০ সাল থেকে ইরাকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ আরোপ করে ভেঙে দেওয়া হয়েছে তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড। নির্দয় অবরোধে, অনাহারে ও বিনা চিকিৎসায় অকালে ঝরেছে ১০ লাখ মানুষের জীবন। সবদিক দিক দিয়ে ইরাক যখন ভেঙে পড়েছে, ঠিক তখন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে এবং প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে নিরস্ত্র করার দায়িত্ব নিজ হাতে নিয়ে নখদন্তহীন ইরাকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ বাহিনী। এক্ষেত্রে তারা কোনো নিয়ম-নীতি ও বৈধতার তোয়াক্কা করেনি। এ প্রসঙ্গে ১৯৯৫ সালে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিদ জোসেফ রটব্ল্যাটের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য : ‘একজন কুশাসককে উৎখাত করার জন্য যুদ্ধ শুরু করতে হবে- এটা কোনো বৈধ যুক্তি হতে পারে না। জাতিসংঘের বর্তমান সনদে সুস্পষ্টভাবে প্রত্যেক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অতএব, কোনো রাষ্ট্র তার ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে যাই করুক, এমনকি সে যদি তার নিজের নাগরিকদের হত্যাও করে, তাহলেও অন্য রাষ্ট্র এসে কোনো যুক্তিতেই তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে পারে না।’


 অথচ বিশ্ব সংস্থা, বিশ্ব জনমত ও বিশ্ব বিবেককে তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ইরাকের ওপর বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাদ্দাম হোসেনের করারই বা কী ছিল? শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও তার ছেলেদের নির্বাসনে যেতে অথবা যুদ্ধ ঠেকাতে ৪৮ ঘণ্টার যে চরমপত্র প্রদান করে, তাতে তিনি কী করতে পারতেন? প্রথম যে পথটি খোলা ছিল তা হলো, সাদ্দাম হোসেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় ও অযৌক্তিক দাবির কাছে নতি স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করতে পারতেন। তাতে অন্তত তাৎক্ষণিকভাবে ইরাকি জনগণের জীবন, সম্পত্তি ও সভ্যতার নির্দশনসমূহ রক্ষা পেত। কিন্তু এতে কি সত্যি সত্যি ইরাকি জনগণ ‘মুক্তি’ পেতেন? যুক্তরাষ্ট্র কি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন ও তার সহযোগীদের অপসারণে সন্তুষ্ট থাকতো? সেটাই যদি হবে, তাহলে তারা নির্বিচারে ইরাকী নিরীহ মানুষকে হত্যা, ব্যাংক, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, দোকানপাট লুট, অগ্নিসংযোগসহ অবকাঠামো ধ্বংস এবং সভ্যতার নিদর্শনসমূহ নিশ্চিহ্ন করছে কেন? সাদ্দাম হোসেন ও তাঁর অনুগতরা যখন দৃশ্যপটে নেই, তখনও কেন লুটপাট, নৈরাজ্য, সহিংসতা, ধ্বংসলীলা ও মৃত্যুর মিছিল চলছে? বেশুমার লুটতরাজে সমগ্র ইরাক বিরান হতে চলেছে, তখন তা প্রতিহত না করে কেন মার্কিন মেরিন সেনারা শুধু তেল স্থাপনাগুলো পাহারা দিচ্ছে?
কেন ইরাকি জাতীয় পতাকার পরিবর্তে ওড়ানো হয়েছে মার্কিন পতাকা? যে উদ্দেশ্যের কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইরাকে আগ্রাসন চালিয়েছে, কার্যত সেই উদ্দেশ্যও পূরণ হয়েছে, তাহলে তারা কেন এখনো ইরাকের মাটিতে অবস্থান করছে? তাছাড়া যে ভয়ংকর অস্ত্র ইরাক লুকিয়ে রেখেছে বলে তারা আগ্রাসন চালিয়েছে, কোথায় সেই অস্ত্র? আসলে এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, ইরাকি জনগণের মুক্তি বা পরাধীনতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মাথাব্যথা নেই। থাকার কথাও নয়। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখতে পাই, যুক্তরাষ্ট্র কখনেই কোনো দেশের বন্ধু বা মিত্র ছিল না। বরং এ কথাটি আমরা বরাবরই সত্যি হতে দেখেছি, যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার আর শত্রুর প্রয়োজন নেই। স্বৈরাচারী, গণধিকৃত ও পরাক্রমশালী শাসকদের যুক্তরাষ্ট্র সর্বদা সাহায্য ও সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু সুদিনের বন্ধুদেরও যুক্তরাষ্ট্র অবলীলায় দূরে ছুঁড়ে দিতে মোটেও কার্পণ্য করে না। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে, সেখানেই তারা ছলে-বলে-কৌশলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। আব্রাহাম লিঙ্কনের গণতন্ত্রের কালজয়ী সেই মূলমন্ত্র : ‘বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল অ্যান্ড অফ দ্য পিপল’ এখন কিছু শব্দের কঙ্কালমাত্র। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হচ্ছে- যুক্তরাষ্ট্রের জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে ও যুক্তরাষ্ট্রের সেবায় যারা নিবেদিত, তারাই গণতন্ত্রের মানসপুত্র। যুগে যুগে দেশে দেশে যুক্তরাষ্ট্র এই চণ্ডনীতি অনুসরণ করে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের হুমকি হয়ে দাঁড়ায় ইরাক। কেননা আরব ভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গর্ভস্রাব থেকে সৃষ্টি হয়েছে ইসরাইল নামক একটি অবৈধ রাষ্ট্রের। ইসরাইলকে কেন্দ্র করে সমগ্র আরব ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করার জন্য একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বা ছক কাটা হয়েছে। আর এ কারণে অর্থ দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে ও বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে ইসরাইলকে শুধু শক্তিশালী নয়, একটি দুর্ভেদ্য রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। ইসরাইলের কাছে যে পারমাণবিক ও রাসায়নিক অস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে, তা শিল্পোন্নত অল্প ক’টি দেশ ছাড়া আর কারো নেই। সমগ্র আরব জাহান এক ইসরাইলের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। ইরাক, ইরান, সিরিয়াসহ গুটিকয়েক দেশ ইসরাইলের অস্তিত্ব মেনে না নেওয়ায় এখন তাদের নানা ছলে-বলে-কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নেপথ্যে থেকে ফিলিস্তিনিদের সাহায্য-সহযোগিতা করায় ইসরাইলের ইশারায় ইরাক হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের প্রধান টার্গেট। এক ঢিলে দুই পাখি মারার উদ্দেশ্যে ইরাককে ‘সাইজ’ করার পাশাপাশি বাড়তি পাওয়া হয়ে যায় তাদের অফুরন্ত তেলভাণ্ডার। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেলসমৃদ্ধ দেশ ইরাক। তাদের মাটির নিচে সঞ্চিত রয়েছে প্রায় ১১ হাজার ২০০ কোটি ব্যারেল তেল।

সাম্প্রতিক আগ্রাসনের আগে ইরাকের তেল রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলার। যা মোট রাজস্বের ৯৫ শতাংশ। এই তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রলোভন দীর্ঘদিনের। সাদ্দাম হোসেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের শ্যেন দৃষ্টিতে পড়ে যায় ইরাক। সেই থেকে তারা ইরাককে কব্জা করার জন্যে ভেতরে ভেতরে কলকাঠি নাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র তো সবসময় কৈয়ের তেলে কৈ ভেজে এসেছে। ইরাকে হামলা চালিয়ে মার্কিন অর্থনীতিতে যে আঁচড় লেগেছে, তা পূরণ করা ছাড়া কী যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে এক পা নড়বে? এমনিতেই উপসাগরীয় দেশে বছরের পর বছর ধরে তারা যে ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে, তার ব্যয়ভার বহন করে আসছে দুই ইসলামী দেশ সৌদি আরব ও কুয়েত। আর যুদ্ধে কোটি কোটি ডলার কী তারা এমনি এমনি ব্যয় করেছে? মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের পাশাপাশি তাদের ব্যয়ভার সুদে-আসলে তুলে নেওয়াটাই তাদের অন্যতম লক্ষ্য। এই লক্ষ্য পূরণে যদি সাদ্দাম হোসেন বাধা হয়ে না দাঁড়াতেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে তিনিও হতে পারতেন ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’। মোদ্দা কথা, সাদ্দাম হোসেন কিংবা ‘থিফ অব বাগদাদ’ খ্যাত আহমেদ শালাবি কোনো ফ্যাক্টর নয়। এক সময় সাদ্দাম হোসেন তো ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জিগিরি দোস্ত। বন্ধুত্বের সেই মোহ হঠাৎ কেন কেটে গেল? আসলে যার দ্বারা স্বার্থ পূরণ হবে, তাকেই বরণ করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। আপাতদৃষ্টিতে সাদ্দাম হোসেন ‘অদৃশ্য’ হয়ে গেলেও তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মাথা-ব্যথা নেই। এখন ইরাককে নিজেদের মতো ‘গড়ে তোলা’ই তাদের প্রধান লক্ষ্য। আর এ কারণেই কট্টর ডানপন্থী হিসেবে পরিচিত অস্ত্র ব্যবসায়ী অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন জেনারেল গার্নারকে ‘বাগদাদের শেরিফ’ বানিয়ে ইরাককে বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে পুনর্গঠনের যে কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে, তাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেওয়া হয়েছে মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানিকে। সম্ভবত ইরাক পুনর্গঠন করে পকেট ভারি করার জন্য নানা অজুহাতে ইরাকে অকারণে চালানো হয় বেপরোয়া ধ্বংসলীলা। অবকাঠামো নির্মাণ, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ, টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ নির্মাণের বিশাল অংকের কাজ পেয়ে যায় মার্কিন রিপাবলিকান পার্টির সমর্থনপুষ্ট ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির কোম্পানি অন্যতম। এতে প্রকৃত ইরাকি জনগণের কোনো ভূমিকা থাকছে না।
মার্কিনিদের অসৎ উদ্দেশ্য বুঝতে পারায় জেগে উঠেছে ইরাকের স্বাধীনচেতা জনগণ। তাঁরা আগ্রাসন ও দখলদারিত্বের প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। এখন এই প্রতিবাদীদের দমন করার জন্যে তাদের হত্যা করা হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায়। তাহলে এই কি ইরাকি জনগণের মুক্তি? ইরাকি জনগণ অনুধাবন করতে পারছেন, তারা সাদ্দামের শাসনামলে এর চেয়ে অনেক ভালো ছিলেন। কেইবা চায় নিজের মাটিতে প্রতিনিয়ত দখলদারদের হাতে দুর্ব্যবহারের সম্মুখীন হতে? পরাক্রমশীল একটি দেশ অন্যায়ভাবে একটি দেশকে হুমকি দেবে, তা মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণ করাটা স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল একটি দেশের পক্ষে কি সম্ভব? অতীতেও ইরাককে অনেক মূল্য দিতে হয়েছে, কিন্তু তারা কখনো আগ্রাসন ও পরাধীনতাকে মেনে নেয়নি। পরাধীনতার মতো গ্লানিকর জীবনে আর কিছুই হয় না। এ কারণে যুগে যুগে মানুষ স্বাধীনতার বেদিতে সঁপে দিয়েছে নিজের জীবন ও যৌবন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর জীবন ও যৌবন পার করে দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তী নেলসন ম্যান্ডেলাসহ অসংখ্য ব্যক্তিত্ব। অবলীলায় উপেক্ষা করেছেন প্রলোভনের সহস্র হাতছানি। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন। তাঁরা পরাধীন সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের ঘেরাটোপে বন্দি হয়েও পরাধীন জীবনযাপন করতে আগ্রহী নয়। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ধুন্দুমার কাণ্ডকীর্তি বা তার নৃশংসতা যে কোনো সুস্থ মানুষের পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে ভিনদেশী শাসন, শোষণ ও পরাধীনতার শৃংখলে বন্দি হয়ে থাকাটা ইরাকি নাগরিকদের কাছে মোটেও কাম্য নয়। এটা এক ধরণের আত্মহত্যার শামিল। এ কারণে অবধারিত মৃত্যু ও পরাজয় নিশ্চিত জেনেও সাদ্দাম হোসেন, তাঁর অনুগত বাহিনী ও ইরাকি জনগণ মার্কিন-বৃটিশ বাহিনীর আগ্রাসনের বিপক্ষে রুখে দাঁড়ায়। যুদ্ধে যুদ্ধে বিধ্বস্ত আর অবরোধে অবরোধে নিঃশেষিত ইরাক শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
যেখানে মার্কিন-বৃটিশ বাহিনী তিন দিনেই ইরাক জয়ের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিল, ভেবেছিল ইরাকিরা তাঁদের ফুল ও সংগীত দিয়ে তাদের বরণ করে নেবে, সেখানে তাদের তিনটি সপ্তাহ রক্তক্ষয়ী মরণপণ লড়াই করতে হয়েছে। সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করা সত্ত্বেও মার্কিন-বৃটিশ বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়। ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে বেশ। ইরাকিরা পরাজিত হয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, ধ্বংসলীলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু জয় হয়েছে তাঁদের নীতির। জয় হয়েছে আদর্শের। জয় হয়েছে নৈতিকতার। বিশ্ববাসী দেখেছে, মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে ইরাকিরা যেভাবে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা ইতিহাসে অমর ও অমলিন হয়ে থাকবে। আত্মসমর্পণ করা কিংবা আগ্রাসী বাহিনীকে বরণ করে নেওয়ার চেয়ে তাঁরা মৃত্যুকে শ্রেয়তর মনে করেছেন। এটা ইরাকিরা অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের মুখে তাদের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। যে মানুষ স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েছে, সে কখনো পরাধীনতাকে মেনে নিতে পারে না। অসম শক্তির কাছে পরাজিত হলেও স্বাধীনতার অগ্নিশিখা সবার বুকেই দেদীপ্যমান থাকে। ইরাকিদের এই পরাজয়ও বোধকরি সাময়িক। তাঁরা একদিন পরাধীনতার এই শৃংখল ভেঙে ফেলবে। কেননা সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী। ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ দ্বিতীয় জন পল বলেছেন : ‘আপাতদৃষ্টিতে যদিও মনে হচ্ছে ঈশ্বর দুষ্টুদের হাতে ইতিহাসকে ছেড়ে দিয়েছেন, তারপরও ঈশ্বরের সুবিচার ও দুর্গতদের রক্ষায় তাঁর অসীম ক্ষমতার ওপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ঈশ্বর নীরবতার মধ্যেও যে কোনো সময় আবির্ভূত হতে পারেন।’ ক্যাথলিক পোপের এই বাণীর মধ্যে যে আশাবাদ সুপ্ত আছে, তা আমরা দেখতে পেয়েছি পৃথিবীর হাজার বছরের ইতিহাসে। কোনো আগ্রাসী শক্তি স্বাধীনতাকামী মানুষকে সাময়িকভাবে দমিয়ে রাখতে পারলেও চিরতরে পারে না।

প্রতিকারহীন শক্তির অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদলেও কারো দিনই একই রকম যায় না। তাহলে মহাক্রমশালী বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধঃপতন ঘটত না এবং বর্তমানে পরাক্রমশালী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও অনায়াসেই পৃথিবীব্যাপী বিস্তার করতো তার সাম্রাজ্য। স্মায়ুযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণ পেলেও শক্তির ভারসাম্যহীনতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় একক পরাশক্তির হুংকারে কেঁপে উঠেছে পৃথিবীর তাবৎ মানুষ। পৃথিবীকে এমন একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ। হঠাৎ কোথা থেকে এসে ‘পেরেস্ত্রোইকা’ ও ‘গ্লাস্তনস্ত’ নামক কী এক অলৌকিক মন্ত্র পড়ে ভেঙে দিয়েছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক একটি স্বপ্নকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় বিশ্বের শক্তিশালী মানুষরা হারিয়ে ফেলেছে নিরাপদ আশ্রয়। জানি না, এ জন্য গর্বাচেভের কোনো অনুশোচনা হয় কি না? আর সেই গর্বাচেভ এখন বলছেন : ‘জগতসংসারের ভিত্তিভূমি আন্তর্জাতিক আইনকেও এ যুদ্ধে (ইরাকে মার্কিন-বৃটিশ আগ্রাসন) মানা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন যদি মূল্য না পায়, এই আইনের সর্বদা মেনে চলার নীতিগুলো এবং তার আলোকে নিষেধাজ্ঞা যদি একক পরাশক্তির জন্যে শুধু ফাঁকা বুলিতেই পরিণত হয়, তাহলে এর পরিণতিতে আমরা দেখতে পাব শক্তির প্রভাব, যথেচ্ছাচার এবং শুধুই নিজের ইচ্ছেমতো কাজ করার ভয়াবহ প্রবণতা আর তাহলে যে বিশাল ঝড়ের উদ্ভব হবে- তা থেকে আমেরিকাও রক্ষা পাবে না।’ আমরা যারা অসহায় ও দুর্বল, তাঁদের কাছে পোপ দ্বিতীয় জন পল এবং মিখাইল গর্বাচেভের বাণীই এখন সান্ত্বনা ও স্বস্তি। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের স্বৈরাচারী শাসক ও তাদের সমর্থকদের পতনের অপেক্ষায় আছি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি করে ও অবৈধভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যে ব্যক্তি পৃথিবীর শান্তি ও স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে, তার প্রতি রয়েছে শান্তিকামী মানুষের তীব্র ঘৃণা। এই ঘৃণার অনলে নিশ্চয়ই পুড়ে যাবে অশুভ শক্তির আস্ফালন। আজ না হোক, একদিন নিশ্চয়ই পৃথিবীর সব অসহায় মানুষের এই আকাক্সক্ষা অবশ্যই পূরণ হবে। পরাধীনতা চিরায়ত নয়। শ্রেষ্ঠ সংগীতের অনুভূতি ও ফুলের মাধুর্য চিরন্তন। অন্তত ইরাকের বেলায় এ কথা চিরসত্য।

দৈনিক সংবাদ : ২২ এপ্রিল ২০০৩

জাতিসংঘ : নিধিরাম সর্দার


ধ্বংসের মাঝে যেমনভাবে জেগে ওঠে প্রাণের স্পন্দন, তেমনিভাবে বিশ্ব বিবেকের চৈতন্য জাগ্রত করে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাঝেই অনুভূত হয় পৃথিবীকে ‘একটি শান্তির নীড়’ হিসেবে গড়ে তোলার তাগিদ। এগিয়ে আসেন শান্তিকামীরা। মানবতাবাদীরা। তাঁরা সোচ্চার কণ্ঠে বলেন : ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, চাই শান্তি।’ একই সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধ রোধের পাশাপাশি নানান সমস্যা সম্মিলিতভাবে সমাধানের কথা ব্যক্ত হয়। এরই আলোকে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানব মর্যাদাকে সমুন্নত রাখতে ‘জাতিসংঘ’ নামের প্রথম ধারণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট। জার্মানি, ইতালি ও জাপানের মিলিত আগ্রাসী শক্তি যখন বিশ্বকে নিজেদের হাতের মুঠোয় বন্দি করতে উদ্ধত, ঠিক তখন ‘জাতিসংঘ’ ধারণা মিত্র জোটের কাছে বাস্তব হয়ে ওঠে। ১৯৪২ সালের ১ জানুয়ারি ‘জাতিসংঘ ঘোষণা’য় স্বাক্ষর করে ২৬টি রাষ্ট্র। এ ঘোষণাকে সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর করে তোলার লক্ষ্যে ১৯৪৫ সালের ২৫ এপ্রিল সানফ্রান্সিসকোতে আহ্বান করা হয় ‘একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন প্রশ্নে জাতিসমূহের সম্মেলন’। ‘বিগ ফোর পাওয়ার’ খ্যাত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনসহ ২৬টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সম্মেলনের শেষ দিন ২৬ জুন গৃহীত হয় ‘জাতিসংঘ সনদ’। ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র দিয়ে শুরু হয় জাতিসংঘের যাত্রা। জাতিসংঘের মূল টার্গেট আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানব কল্যাণের ক্ষেত্রে সমস্যাসমূহ সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। সেই সঙ্গে মানবাধিকার ও মানুষের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে শ্রদ্ধাবোধ জাগানো। তবে ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘের কার্যক্রম শুরু হয়। জাতিসংঘের মূল সংস্থার নাম সাধারণ পরিষদ। জাতিসংঘের সব সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ পরিষদ গঠিত হয়।

বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৫৯। এছাড়া জাতিসংঘের প্রধান পাঁচটি অঙ্গসংস্থা হলো নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বিচারালয়, অছি পরিষদ, সচিবালয় এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা নিরাপত্তা পরিষদের দায়িত্ব। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ১৫। এর মধ্যে আবার স্থায়ী সদস্যদের সংখ্যা ৫। এরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। এদের প্রত্যেকের ‘ভেটো’ ক্ষমতা রয়েছে। যে কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্র কোনো প্রস্তাবের বিপক্ষে কিংবা ভোটদান থেকে বিরত থাকলে সে সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না। ১৫ জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক আদালত সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ বা জাতিসংঘের অন্য কোনো সংস্থাকে আইন সম্পর্কিত ব্যাপারে উপদেশের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিরোধের আইনগত দিকটি দেখে থাকে। জাতিসংঘের হাতে অর্পিত আÍনিয়ন্ত্রণ অধিকারবঞ্চিত জাতিসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং তাদের স্বাধীনতা লাভের যোগ্য হতে সাহায্য করাই অছি পরিষদের কাজ। আন্তর্জাতিক বেসামরিক কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে জাতিসংঘের স্বার্থরক্ষা ও কাজ-কর্ম চালানোর জন্যই জাতিসংঘ সচিবালয়। মহাসচিব সচিবালয়ের প্রধান। নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদ মহাসচিব নিয়োগদান করে। মহাসচিব বেতনভোগী কর্মচারী হলেও তাঁর পদমর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, তিনিই দুনিয়ার একমাত্র ‘বৈধ শাসনকর্তা’। অবশ্য বাস্তবক্ষেত্রে শাসন কতটা করতে পারেন সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। ১৯৪৬ সালে জাতিসংঘের প্রথম অধিবেশনের শুরুতে নরওয়ের ট্রিগ্রভি লিকে পাঁচ বছরের জন্য জাতিসংঘের প্রথম মহাসচিব নিয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে এই মেয়াদ তিন বছরের জন্য বাড়ানো হয়। কিন্তু এর তীব্র সমালোচনা করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। যে কারণে লি ১৯৫২ সালে পদত্যাগ করেন। ১৯৫৩ সালে তাঁর উত্তরাধিকারী হয়ে আসেন সুইডেনের ড্যাগ হ্যামারশোল্ড। ১৯৫৭ সালে তিনি পুনরায় নির্বাচিত হন। তবে ১৯৬১ সালের সেপ্টেম্বরে রোডেশিয়ার উত্তরাঞ্চলে (বর্তমানে জাম্বিয়া) এক বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন তিনি। এ সময় মহাসচিব নিয়ে তুমুল বাদানুবাদ চলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রস্তাব রাখে, তিন সদস্যের কমিটি সচিবালয়ের দায়িত্বে থাকবে। তবে সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে বর্মার উ থান্ট সব পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হন। এ কারণে ১৯৬৬ সালের ডিসেম্বরে তিনি দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পুনরায় সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিত হন। ১৯৭১ সালের শেষ নাগাদ নির্বাচিত হন অস্ট্রিয়ার কুর্ট ওয়ার্ল্ডহেইম। তিনি দু’মেয়াদে কাজ করেন। তারপর ১৯৮২ সালে আসেন হাভিয়ার পেরেজ দ্য কোয়েয়ার। সবশেষে মিসরের বুয়েট্রেস ঘালি জাতিসংঘ মহাসচিব হিসেবে সবেমাত্র নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন পেয়েছেন।
মহাসচিব পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি জাতিসংঘের শুরু থেকেই। নিজেদের প্রভাব ও আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে মূল হাতিয়ার মহাসচিব। এই পদ নিয়ে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দীর্ঘদিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে আসছে। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতির ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সরে দাঁড়ানোর ফলে এবার মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ঝামেলা দেখা দেয়নি। অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের আশীর্বাদে ঘালি লোভনীয় পদটি বাগিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দারিদ্রপীড়িত, ক্ষুধার্ত ও নিরক্ষর জনগণের কল্যাণ সাধন করে বিশ্ব শান্তি সুসংহত করাই অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্থার কাজ। আর এ জন্য জাতিসংঘের বেশ কয়েকটি সংস্থা গঠন করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলো অনুন্নত দেশগুলোকে সাহায্য এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষাবিষয়ক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সহযোগিতা করে থাকে। এর মধ্যে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ‘ইউনেস্কো’, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ‘ফাও’, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ‘আইএলও’, শিশুদের আন্তর্জাতিক তহবিল ‘ইউনিসেফ’, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ‘আইএমএফ’ উল্লেখযোগ্য।
একটি মহৎ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জাতিসংঘ গড়ে উঠেছে। এখন জাতিসংঘের নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। জাতিসংঘ ভবিষ্যৎ বংশধরদের জীবন সুন্দর, মৌলিক মানবাধিকার ও মানুষের মর্যাদা, সব রাষ্ট্রের সমান অধিকার এবং বিশ্বের জাতিসমূহের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতি সাধনের জন্য কাজ করে আসছে। বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর কাছে জাতিসংঘ ‘আশার স্তম্ভ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসর দেশগুলোর পাশে জাতিসংঘ বন্ধুর মতো পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। যদিও সীমিত সাধ্য ও ‘পরনির্ভরশীল’ হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই জাতিসংঘ প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারে না। তবুও এর মাঝে তাদের কার্যক্রম প্রশংসার দাবি রাখে।

জাতিসংঘের ৪৬ বছরের ইতিহাসে সাফল্য যেমন আছে, তেমন ব্যর্থতাও অনেক। কেননা জাতিসংঘের হাত-পা এক জায়গায় বাঁধা। জাতিসংঘ পরিচালিত হয় সাধারণ পরিষদের সদস্যদের চাঁদায়। প্রতিটি রাষ্ট্রের সামর্থ্য ও সাধারণ অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে নির্ধারিত হয় চাঁদার হার। প্রতিটি দেশকেই কম-বেশি চাঁদা দিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের বৃহত্তম চাঁদাদাতা দেশ। শুরুতে জাতিসংঘের মোট বাজেটের ৪৯ শতাংশ আসতো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুরোধে তাদের চাঁদার হার ১৯৮২ সালে নামিয়ে আনা হয়। শেষ অবধি তা ২৫ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯৫৫ সালের পর থেকে জাতিসংঘের সদস্যপদ দ্রুত বাড়তে থাকায় জাতিসংঘের বাজেটে ঘাটতি পড়ে যায়। নতুন সদস্যদের অধিকাংশই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। সবাই জাতিসংঘের সাহায্যের জন্য উন্মুখ থাকে। সাহায্য প্রদানে সবার ক্ষেত্রে সমান নজর দেওয়া সম্ভব হয় না। এছাড়াও বৃহৎ শক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। বিশেষ করে মার্কিন প্রভাবাধীন দেশগুলো এক্ষেত্রে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছে। এর কারণ আগেই বলা হয়েছে। জাতিসংঘের আয়ের প্রধান উৎস যুক্তরাষ্ট্র। তাদেরকে চটিয়ে জাতিসংঘের পক্ষে কিছু করা কঠিন। এ যাবৎ জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীরা ছিলেন মার্কিন আজ্ঞাবহ। তাঁরা স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। মার্কিন স্বার্থকেই বরাবর অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের উদ্দেশ্য এ কারণে অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়ে পড়েছে। কেননা মার্কিন তাঁবেদার রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান হলে জাতিসংঘের ভূমিকা থাকে এক রকম। আবার মার্কিনবিরোধী দেশে অন্যরকম। এ অবস্থা থেকে জাতিসংঘের বের হওয়া কঠিন। ইউনেস্কো স্বাধীনভাবে একবার কাজ করতে গিয়ে সংকটে নিপতিত হয়। কেননা যুক্তরাষ্ট্র ইউনেস্কো থেকে বেরিয়ে আসে। তাছাড়া সুপার পাওয়ারের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ হয়ে পড়ায় তারা এখন এককভাবে খোলা মাঠে গোল দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া দাপটের কারণে জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘ নিজেদের মতো করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। দেশে দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ-হানাহানির ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকা অনেকটা অসহায় দর্শকের মতো। আদতে জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো শক্তি নেই। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের মনোভাব বুঝে তাকে অগ্রসর হতে হয়। কথায় বলে, ‘ঢাল নেই, তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার’। জাতিসংঘ হচ্ছে অবিকল তাই। তবে নানান সমস্যার মাঝে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে জাতিসংঘ ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতি বজায় রাখছে। অনেক বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে জাতিসংঘ। আজ বিশ্বে যে শান্তিময় পরিবেশ বিরাজ করছে তার মূলে জাতিসংঘেরও যথেষ্ট অবদান রয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘের ভূমিকাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।


দৈনিক বাংলার বাণী : ২৯ নভেম্বর ১৯৯১