পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

সংগীত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সংগীত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেন


ভরা বর্ষার মতো যেন তাঁর কণ্ঠসুধা। বর্ষায় নদীর পানি যেমনি উপচে উপচে পড়ে, তেমনিভাবে তাঁর গলায় আপ্লুত হয়েছে সুরের উচ্ছ্বাস। বাঁধনহীন হয়ে ছড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। আকাশে ভেসে ওঠেছে ইন্দ্রধনু। তাঁর গান কোথাও বাজলে চারপাশটা ঝলমল করে। ভরিয়ে দেয় সুরের ঝর্ণাধারায়। সমস্ত কিছুকে আড়াল করে দেয়। সুরের ঝংকারে সরগরম করে দেয় নিস্তব্ধ দুপুর কিংবা মায়াবী সন্ধ্যা। ধুপের মতো ভেসে ওঠে ছেঁড়া ছেঁড়া স্মৃতি।


হয়তো কিছুই নাহি পাবো

তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালোবেসে যাব

.........

ধুপ চিরদিন নীরবে জ্বলে যায়

প্রতিদান সে কি পায়

এভাবে আকুল হয়ে গাইতে থাকলে না পাওয়া সেই ভালোবাসা কি আনমনা করে দেয় না? স্মৃতিপটে মর্মরিত হয় ফেলে আসা দিনগুলো। আনন্দময় ক্ষণগুলোও বেদনা হয়ে আর বেদনার মুহূর্তগুলো আনন্দ হয়ে সৌরভ ছড়িয়ে দেয়। 


কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে

আরও কিছু কথা না হয় বলিতে মোরে


এই গান যখন শুনতে পাই, বুকের মধ্যে কেমন কেমন করতে থাকে। প্রিয় মানুষ ছাড়া এমনভাবে কে আর মিনতি করবে? হায়! হাল আমলে এমনভাবে কেউ আর নিবেদন করে না। সবটাই যেন স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। আর সেই স্মৃতি জাগিয়ে দেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়।

যেন কোনো সুদূরকাল থেকে বেজে চলেছে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানগুলো। চিরায়ত সব গান। এখন হয়তো তাঁর গান সেভাবে শোনা হয় না। কিন্তু কাছে বা দূরে কোথাও যখন বেজে ওঠে, কেড়ে নেয় যাবতীয় মনোযোগ। তখন হৃদয় দিয়ে শুনতেই হয়। তা যে মরমে গিয়ে পৌঁছায়। সুচিত্রা সেনের মায়াবী সৌন্দর্য আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠমাধুর্যের সম্মিলনে যেন রূপকথার জগতে নিয়ে যেত। সমবয়সী এই দুই শিল্পীর যোগসূত্রে বাংলা চলচ্চিত্র সন্ধান পেয়েছিল স্বর্ণযুগের। কালের নিয়মে এই জুটিটা অনেক আগেই টুটে গেছে, তারপরও তারা ছিলেন। সুচিত্রা সেন চলে গেছেন কয়েক বছর আগে। তখন আবেগময় কণ্ঠে সন্ধ্যা বলেছিলেন 'শরীর চলে গেল, কণ্ঠ পড়ে রইল'। এ থেকে দুজনের সম্পর্কের বুননটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এবার সন্ধ্যা পেরিয়ে পাড়ি দিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়। কণ্ঠও আর রইলো না। রইলো কেবল নস্টালজিয়া।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২

শুক্রবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সুরের ঈশ্বরী

 


'বাচপান কি মোহাব্বত কো দিল সে না জুদা কারনা.......' 

আমি ঠিক জানি না, কোন সুদূর থেকে বেজে উঠতো এই গান। গানের অর্থ বুঝতাম না। শিল্পী চিনতাম না। কোনো কিছুই জানতাম না। কিন্তু সুরের মায়াজালে বিভোর হয়ে যেতাম। বুকের মধ্যে কেমন যেন আবেশ ছড়িয়ে দিত। যেন মেঘ হয়ে ভেসে যেতাম। যেদিন এই গানটি প্রথম শুনেছি, সেদিন থেকে বুকের মধ্যে কেন যেন না পাওয়ার একটা বেদনা অনুভূত হয়। এ গানটি কুয়াশার মতো জড়িয়ে আছে স্মৃতির কুহকে। এ গান যেন জন্মান্তরের। কে যেন হৃদয়ের সবটুকু আকুতি দিয়ে মিনতি জানাচ্ছেন। সেটি হয়ে ওঠেছে সর্বজনীন, সর্বকালীন, সর্বসাধারণের । আজও এ গানটি যখন শুনি, তখনও বুকের মাঝে একই রকম অনুভূতি হয়। এ গান যেন চিরদিনের। চিরকালের। চিরজনমের।

তারপর তো জানতে পারি এ গানের শিল্পী লতা মঙ্গেশকর। এই গানের আগে ও পরে তাঁর রয়েছে কালজয়ী অসংখ্য গান। সেই গানগুলোও একইভাবে আপ্লুত করে। ছুঁয়ে যায় হৃদয়। তবে সত্যিকার অর্থে আমার হৃদয় দুলিয়ে দেয়, 'মন ডোলে মেরা তান ডোলে/মেরা দিল কা গয়া কারার রে/ইয়ে কোন বাজায় বাঁশুরিয়া'। তিনি তো গানের সমুদ্র। সব ছাপিয়ে কী কারণে যেন এ গানটির কথাই এই মুহুর্তে খুব বেশি বেশি মনে পড়ে যাচ্ছে। কোনো কারণ নেই। মানুষের সব কার্যকরণের কোনো হেতু থাকে না। অবশ্য এই গানে এমন একটা সম্মোহন আছে, তাতে সহজেই নেচে ওঠে মনপ্রাণ। আর সুর তো মোহগ্রস্ত করে রাখে। বীণ বাজিয়ে যেভাবে সম্মোহিত করা হয়, তাতে সাপ তো বটেই, মানুষের পক্ষে সুস্থির থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। জাদু, মায়া আর মুগ্ধতায় মাখামাখি হয়ে আচ্ছন্ন করে দেয়। তাঁর কণ্ঠ কখনও দানাদার মিছরির মতো মিষ্টতা ছড়িয়ে দেয়। আবার কখনও ধারালো ছুরির মতো হৃদয়ে বিদ্ধ করে। তবে গান মানেই কেন যেন মনে হয় লতা মঙ্গেশকরের কথা। তাঁর যে কণ্ঠমাধুর্য তা হয়ে ওঠেছে চিরকালীন এক নিদর্শন। 

তাঁর গাওয়া বাংলা গান তো বুকের মধ্যে জ্বালিয়ে দেয় ভালোবাসার ধুপ। একটা সময় তাঁর গান শুনে মন যে কোথায় হারিয়ে যেত, তার হদিস পেতাম না। 'প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে/আমারই এ দুয়ারও প্রান্তে/সে তো হায়, মৃদু পায়/এসেছিল পারি নি তো জানতে'। আসলেই কি এসেছিল? তা বুঝতে না পারাটা অনন্ত এক আক্ষেপ হয়ে আছে। 

সেই শৈশব থেকে লতা মঙ্গেশকরকে হৃদয়পটে স্থান দিয়েছি। ভালোবেসেছি তাঁর গান। নিখাদ সেই ভালোবাসা। তাঁকে কখনও আলাদা করে ভাবি নি। কী করে ভাববো? তিনি আমাদের সুরে সুরে যেভাবে কানায় কানায় ভরিয়ে দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না।

তিনি তো সুরের ঈশ্বরী। কত কত আগে থেকে তাঁর সুরের জাদু দিয়ে আমাদের সম্মোহিত করে রেখেছেন। এই ভুবনকে যাঁরা সুরময় করতে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। মন কেমন করা সেই গানগুলো মনে পড়ে যাচ্ছে। অনেক দুঃখের মুহুর্তে কোনো কোনো গান সান্ত্বনা দিয়েছে। লাঘব করে দিয়েছে কষ্টগুলোকে। আবার আনন্দময় মুহূর্তের সঙ্গী হয়েছে তাঁর গান। কত গান, কত শত গান, কত সহস্র গান। তাঁর সুরের সুরা পান করলে সেই নেশা কখনো ছেড়ে যায় না। এখনও চিরায়ত সেই গানগুলো শুনলে বুকের মধ্যে কেমন কেমন করে। 

হায়! থেমে গেছে সেই কিন্নরীকণ্ঠ। যেন মৃত্যু হয়েছে সুরের আত্মার। যেখান থেকে আর কোনো সুর ভেসে আসবে না। তবে যে সুর তিনি ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন, তা কখনও থেমে যাবে না।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

যাঁর গান বুকে কান্না হয়ে বাজে



একজন শিল্পী ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হতে পারেন। নাও হতে পারেন। না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তাতে কিছু যায় আসে না। একজন শ্রোতার কাছে প্রকৃত শিল্পী কখনও অপরিচিত থাকেন না। তাঁর গাওয়া গানই তাঁর পরিচয়। জানি, সাধারণত গানগুলো লেখেন গীতিকার। সুর করেন সুরকার। তারপরই কণ্ঠ দেন শিল্পী। কিন্তু গানগুলোকে শ্রোতার কাছে পৌছে দেন কণ্ঠশিল্পী। যে কারণে শ্রোতারা তাঁকেই চেনেন। জানেন। মনে রাখেন। 

আর একজন সুবীর নন্দী হলে তো কোনো কথাই নেই। তিনি তো আমাদের কাছের মানুষ। খুবই আপনারজন। যে সময়ে গান গেয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন একজন সুবীর নন্দী, সেই সময়টাতে আমাদের অনেকেরই বেড়ে ওঠা। আমাদের মন-মেজাজ, রুচিবোধ, স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনি। তাঁর সময়ে এ শহরে, এ দেশে এমনকি পরবাসেও যাঁদের বসবাস, তাঁকে তো এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তিনি গাইতেন হৃদয় দিয়ে। ভালোবাসা দিয়ে। দরদ দিয়ে। তাঁর গান শুনতে হয়েছে। মুগ্ধ হতে হয়েছে। তাঁকে ভালোবাসতে হয়েছে। তাঁর গান প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও বেজে চলেছে। বেতারে। টেলিভিশনে। ইউটিউবে। সর্বোপরি তাঁর গান বাজে হৃদয়ের নিভৃতে। 

একজন সুবীর নন্দী চলে যাওয়ার পর প্রিয় একজন মানুষের চলে যাওয়ার অনুভূতি হচ্ছে। তাঁর গান রয়ে গেলেও তাঁর চলে যাওয়াটায় কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। মায়াবী এ পৃথিবীতে জীবন যাপন করতে গিয়ে আমাদের প্রতিনিয়ত কত রকম অনুভব হয়। সেই অনুভব, সেই অনুভূতিগুলো সবার পক্ষে ব্যক্ত করা সম্ভব হয় না। অনুভূতিগুলোকে চমৎকারভাবে বাঙ্ময় করে তোলেন লেখক, চিত্রকর, শিল্পীরা। সবাইকে ভালো লাগায় ভরিয়ে দেন। ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে প্রলেপ লাগিয়ে দেন। 

সুবীর নন্দী তো তাঁদেরই একজন। তাঁর কণ্ঠ কী দারুণভাবে না ছুঁয়ে যায় সংগীত অনুরাগীদের। তাঁর অসংখ্য গান আমাদের আমোদিত করে। আবেগকে স্পর্শ করে। আক্ষেপ হয়ে ঝরে। কত কত মুহূর্তে তাঁর গান হয়েছে আনন্দ-বেদনার সঙ্গী। সম্পর্কের ক্ষেত্রে কত না উথাল-পাথাল হয়। কষ্টের, বিরহের, যন্ত্রণার। এ অনুভূতিগুলোর সার্থক রূপকারদের একজন সুবীর নন্দী। তাঁর গান আমাদের ভাবায়। কাঁদায়। হাসায়। ‘কেন ভালোবাসা হারিয়ে যায়/দুঃখ হারায় না/কেন স্বপ্ন ভেঙে যায়/মানুষ কথা দিয়ে রাখে না/আমি যারে আপন করি/সে হয় আমার পর/আমি যারে হৃদয় দেই...।’ এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পর বুকটা কেমন ভেঙে যেতে চায়। এ প্রশ্নের উত্তর যখন কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, প্রশ্ন হয়েই থেকে যায় নিরন্তর, তখন আত্মসমর্পণ করতে হয় এ গানের কাছে।   


বুকের মধ্যে ভালোবাসার রং ছড়িয়ে দিতে কিংবা ভালোবাসার মানুষকে যে কথা বলতে ইচ্ছে হয়, সে কথা বলার জন্য সুবীর নন্দীর গানগুলোর তুলনা হয় না। তাঁর গানের লাইনে লাইনে প্রকাশিত হয় হৃদয়ের অনেক না বলা কথা। শুধু কি হৃদয়ের কথা? জীবনের কত ক্ষেত্রেই তো তাঁর গান মিলে যায়। কখনও অনুপ্রাণিত করে। অনুতপ্ত করে। অনুস্মরণ করে। ‘কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো/সে কথা তুমি যদি জানতে/এ হৃদয় চিরে যদি দেখা যেত/আমি যে তোমার তুমি মানতে...।’ হৃদয় চিরে তো আর দেখানো যায় না। যে কারণে বোঝানো যায় না ভালোবাসার গভীরতা। 

তখন বুকের মধ্যে না পাওয়ার বেদনা নিয়ে বেজে উঠে, ‘হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে/একটা কথাই শুধু জেনেছি আমি/পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’। এমন নৈরাশ্যজনক ও নেতিবাচক মনোভাব হওয়ার পর কান্নাটাই মনে হতে পারে অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু ‘আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কাঁদতে শিখেছি/আমায় আর কান্নার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই...’। তারপরও কান্নাটাকে, কষ্টটাকে মনে হয় বিভ্রম, ‘পাহাড়ের কান্না দেখে/তোমরা তাকে ঝর্ণা বলো’। তখনই অন্তঃকরণে মর্মরিত হয়. ‘কারো বুকের দুঃখ নিয়ে কাব্য চলে না’। 

তারপর সময় বয়ে যায়। কিন্তু কথা দিয়ে কথা রাখার কষ্ট কি ভুলে থাকা যায়? ‘দিন যায় কথা থাকে/সে যে কথা দিয়ে রাখলো না/ভুলে যাবার আগে ভাবলো না’। কথা দিয়ে কথা না রাখার এ মনোবেদনা থাকলেও পাওয়া যায় বন্ধনে জড়ানোর সান্ত্বনা, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু/ বলে গণ্য হলাম/তবুও একটা কিছু হয়েছি যে/ তাতেই আমি ধন্য হলাম’।

প্রিয় কেউ যখন দূরে চলে যায়, একদমই ভালো লাগে না। তাকে কাছে পাওয়ার জন্য মনটা আকুলি-বিকুলি করে। ‘পাখিরে তুই/দূরে থাকলে কিছুই আমার ভালো লাগে না/পাখিরে তুই কাছে থাকলে/গানের সুরে পরান দোলে/হৃদয় নাচে সুরের তালে’। এ গানটি শুনলে জেগে উঠে একটা দুঃখবোধ। ‘যদি কোনো দিন আমার পাখি/আমায় ফেলে উড়ে চলে যায়/একা একা রব নিরালায়...’। হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে হাহাকার। একা একা থাকা ছাড়া কীইবা করার থাকে? আর একাকী থাকলেও প্রবোধের সুর হয়ে বাজেন সুবীর নন্দী। তিনিই পারেন কষ্ট থেকে, যন্ত্রণা থেকে, না পাওয়ার বেদনা থেকে সাময়িকভাবে হলেও মু্ক্তি দিতে। ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়/তবুও কেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায়’। কেন যায়? এর উত্তর এখন কোথায় পাবো? সুবীর নন্দী, আপনি চলে যাওয়ায় আমরা কাঁদবো না। আপনি সেটা কখনও চান নি। কিন্তু আপনার গানগুলোই তো বুকের মধ্যে কান্না হয়ে বাজছে।


৭ মে ২০১৯

রুপালি গিটারটা আছে, তিনি নেই


এটা তো জানা কথা, কেউ সুখী নয়। সুখী হওয়া কি এতই সহজ? তবুও কেন যে তা বুঝতে পারতাম না। নিজেকে অসুখী মনে করে একাকী কষ্ট পেতাম। তাঁর গান শোনার পর মনে হলো কেন আমি অকারণে কষ্ট পাই?  তাঁর গান যখন শুনি, বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সুখের মতো টুকরো টুকরো অনুরণন। তাতে কি লেগে থাকে বিষাদও। মনটা যেন কেমন কেমন করে। মনের কষ্ট আর গানের কষ্ট মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মাইনাসে মাইনাসে কি প্লাস হয়ে যায়? এমনটি কী কারণে মনে হয়, আমি ঠিক জানি না। তবে তাঁর গান শুনলে সুখী হতে না পারার কষ্টটা বেশ কিছু সময়ের জন্য আর থাকে না। তিনি তো গেয়েছেন, ‘সুখেরই পৃথিবী, সুখেরই অভিনয়, যত আড়ালে রাখো, আসলে কেউ সুখী নয়। নিজ ভুবনে চিরদুঃখী, আসলে কেউ সুখী নয়।’ চিরদুঃখী আমি তখন বুঝতে পারি, পৃথিবীতে দুঃখীর সংখ্যাই বোধকরি বেশি। তখন আর নিজেকে খুব একটা একলা মনে হয় না। তাঁর গানগুলো আমার সঙ্গী হয়ে যায়। আমাকে কাঁদায়। আমায় হাসায়। আমাকে ভালোবাসায়।    

আমরা যে সময়ে বেড়ে উঠেছি, সেই সময়ের যা কিছু আমাদের আনন্দিত করতো, আপ্লুত করতো, আবেগে ভাসিয়ে দিত, তাঁর রুপালি গিটারটা তার অন্যতম। এই গিটারটা যে কীভাবে আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো, তা বোঝানো যাবে না। তাঁর ইন্দ্রজালিক সুরমাধুর্য স্পর্শ করতো হৃদয়তন্ত্রীতে। তাঁর গায়নশৈলী অদ্ভুত এক মাদকতায় ভরিয়ে দিত। দোলায়িত হতাম সুরের মায়াবী এক জগতে। বুকের ভিতর জমে থাকা কষ্টগুলো গলে গলে যেত। আবার মন খারাপ থাকলে তিনি হতেন পরম এক বন্ধু। তাঁর গান দিয়ে তিনি টেনে নিতেন তাঁর বুকে। তাঁর গাওয়া গানগুলো কী যে আবেশ ছড়িয়ে দেয়। মনের কষ্টগুলোও অনেকটা লাঘব হয়ে যায়। তারা ভরা রাতে মনের মানুষ যখন মনের ব্যথা বুঝতে চায় না, তার চেয়ে বেদনার আর কী আছে? কে আর এমন সাবলীলভাবে গাইতে পারে, ‘সেই তারা ভরা রাতে, আমি পারি নি বোঝাতে, তোমাকে আমার মনের ব্যথা। তুমি তো বলেছো শুধু, তোমার সুখের কথা।’ হায়! এই জীবনে কেউ চিনলো না। বুঝলোও না। সেক্ষেত্রে তাঁর গানই হয়ে উঠে হৃদয়ের কথকতা। ‘বোঝে না কেউ তো চিনলো না, বোঝে না আমার কী ব্যথা, চেনার মতো কেউ চিনলো না, এই আমাকে।’

জীবনের হিসেব কখনও মেলাতে পারি নি। প্রিয় মানুষের সঙ্গেও তো মেলে নি। তাই কান্না আর বিচ্ছেদ হয়ে যায় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘কখনো ভাবি নি আমি, ব্যথা দিয়ে তুমি চলে যাবে, কি জানি কী ভুল ছিল আমার, আমাকে কেন গেলে কাঁদিয়ে, তাই আমি ফিরে আসি বারেবার।’ এ কারণে কত আশা নিয়ে কত কত দিন ছুটে গিয়েছি প্রিয় সেই মানুষের কাছে। ফিরতে হয়েছে নিরাশ হয়ে। তখন বুকের ভিতর বেজেছে, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি, তাই তোমার কাছে ছুটে আসি’। কষ্ট পেতে পেতে কত না কেঁদেছিও। চেয়েছি কত কিছুই করতে। তবে আকাশে উড়াল দেওয়ার কথা কখনও ভাবি নি। সেটা তিনি ভাবিয়েছেন, ‘আর কত এভাবে আমাকে কাঁদাবে, আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে, এই বুকে যন্ত্রণা বেশি সইতে পারি না, আর বেশি কাঁদালে উড়াল দেবো আকাশে।’ আকাশে উড়াল দিতে না পারলেও তা দিয়েছে সান্ত্বনার প্রলেপ।


যত কষ্টের, যত দুঃখের, যতই বেদনার গান তিনি গান গেয়ে থাকেন না কেন, তাঁর বুকভর্তি ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। এই ভালোবাসা দেখা যায় তাঁর সুরে, তাঁর সংগীতে, তাঁর জীবনে। তার প্রকাশ ঘটেছে এভাবে ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে, সেই আমি কেন তোমাকে দুঃখ দিলেম, কেমন করে এত অচেনা হলে তুমি...তুমি কেন বোঝো না তোমাকে ছাড়া আমি অসহায়, আমার সবটুকু ভালোবাসা তোমায় ঘিরে...কত রাত আমি কেঁদেছি, বুকের গভীরে কষ্ট নিয়ে, শূন্যতায় ডুবে গেছি আমি, আমাকে তুমি ফিরিয়ে নাও।...যতবার ভেবেছি ভুলে যাবো, তারও বেশি মনে পড়ে যায়, ফেলে আসা সেই সব দিনগুলো, ভুলে যেতে আমি পারি না।’ 

সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়। যেতেই তো হবেই। এটাকে তো আর অস্বীকার করা যাবে না। এ কারণে তিনি তো গেয়েছেন, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে, একদিন চলে যাবো অনেক দূরে, বহুদূরে’। তাঁর গানের কথা অনুযায়ী, তাঁর রুপালি গিটারটা আছে। তিনি চলে গেলেন। তিনি এবি। আইয়ুব বাচ্চু। কিন্তু এভাবে তো তাঁর চলে যাওয়ার কথা ছিল না। এমনভাবে হতভম্ব করে দিয়ে চলে যাবেন! এমনটি কেমন করে হয়! কত রাত কত দিন তিনি ক্লান্তিহীনভাবে আমাদের গান শুনিয়েছেন। এখনও হয়তো তাঁর গান শুনবো। কিন্তু নতুন কোনও গান আর শোনা হবে না। তিনি গেয়েছেন ‘ভাঙা মন নিয়ে তুমি আর কেঁদো না’। বললেই কি সব কথা মানা যায়? দু’ চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে বেদনার অশ্রু।


১৮ অক্টোবর ২০১৮

মঙ্গলবার, ২৫ এপ্রিল, ২০১৭

যাঁর গান প্রতিনিয়ত বুকের মধ্যে গুনগুন করে



সংগীতের ভুবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কত কত গান। সুর, লয়, ধ্বনির সম্মিলনে গড়ে ওঠেছে এক মায়াবী জগত। যা ধরা যায় না। ছোঁয়া যায় না। নাগালও পাওয়া যায় না। কেবলই অনুভব করা যায়। তবে গানের আছে প্রকারভেদ। কত রকমের যে বিভাজন। বিভিন্ন রাগের। বিভিন্ন অনুরাগের। কোনোটা আনন্দের। কোনোটা বেদনার। আবেগ আছে। আছে ব্যাকুলতাও। কখন কোন গান যে হৃদয়তন্ত্রী ছুঁয়ে যাবে, অনুভবে বেজে ওঠবে কোন সুর, কেউ বলতে পারে না। মন-মানসিকতা, মেজাজ-মর্জি, পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর করে ভালো লাগা, মন্দ লাগা। মানুষের মন তো বর্ষার আকাশের মতো। কখন কোন রূপ ধারণ করবে, নিজেও জানে না। প্রতিটি মুহুর্তেই বদলায়। বদলে যায়। এরসঙ্গে তাল মিলিয়ে গান লিখেছেন গীতিকাররা। সুর দিয়েছেন সুরকাররা। আর গেয়েছেন কণ্ঠশিল্পীরা। কোনো গান বা সুর যখন প্রচারিত হয়ে যায, সেটি হয়ে যায় সর্বজনীন। এটা যতটা না বাণিজ্যিকভাবে বিস্তৃতি লাভ করে, তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে শ্রোতাদের কণ্ঠে ও অনুভবে। তবে সব গান তো আর একই রকম জনপ্রিয়তা পায় না। প্রচারিত গানটি কারো ভালো লাগতে পারে। নাও লাগতে পারে। এটা শ্রোতার রুচি ও কানের ওপর নির্ভর করে। তবে একই রকম কিংবা একই মেজাজের গান সাধারণত সব সময় ভালো লাগে না।
মানুষ তো বৈচিত্র্যপিয়াসী। কখনো সফট, কখনো হার্ড পছন্দ করে। ভোরবেলায় এক রকম, অপরাহ্নে হয়তো আরেক রকম আবার গোধুলিলগ্নে একদমই ভিন্ন মেজাজের গান ভালো লাগতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে গান শোনা বা গাওয়ার ক্ষেত্রে পরিবেশ-পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর। রোমান্টিক মুহুর্তে যে গানটি শুনতে মন চায় কিংবা গাইতে ইচ্ছে করে, যখন মন খারাপ থাকে, তখন নিশ্চয়ই সে ধরনের গান ভালো লাগবে না। আর সব গান একসঙ্গে শোনা ও গাওয়া তো সম্ভব নয়। এ যাবৎ সৃষ্টি করা হয়েছে অঢেল গান। তা থেকে কখনো কখনো কোনো কোনো গান বেজে ওঠে হৃদয়ের গহিনে। ছুঁয়ে যায় বুকের অতল। স্পর্শ করে মর্ম। গান তো আর সবাই গাইতে পারেন না। গানকে মূলত বাঁচিয়ে রাখেন শ্রোতারা। পেশাদার শিল্পীর সংখ্যা তো সীমিত। স্বাভাবিক কারণেই সৌখিন শিল্পী কিংবা বাথরুম সিঙ্গারদের সংখ্যাই বেশি। তাঁদের অধিকাংশই কখনো একাকী, কখনো আত্মমগ্ন হয়ে, কখনো কখনো প্রিয়জনের সান্নিধ্যে নিজের অনুভবটুকু সুরে সুরে মেলে ধরেন। সেটা হতে পারে সুরে কিংবা বেসুরেও। বেশিরভাগ সময় আনমনে কিংবা অবচেতনায় কণ্ঠে ওঠে আসে গান। আর গুনগুন করেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুব বেশি নয়। একান্ত নিজস্ব মুহূর্তে গান যেভাবে বন্ধু হতে পারে, তার কোনো বিকল্প হয় না।
গানের প্রতি মুগ্ধতা সেই শৈশব থেকে। এ জীবনে কম গান তো শোনা হলো না। বাংলাদেশ বেতারের সম্প্রচার থেকে শুরু করে হালের ইউটিউব পর্যন্ত কত গানই তো হৃদয় পরিপূর্ণ করে দিয়েছে। সব গান তো আর স্মৃতির অ্যালবামে সাজানো নেই। কত গানই হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। প্রিয় শিল্পী, প্রিয় গানের সংখ্যাও নেহাত মন্দ নয়। কখনো কোথাও সেই গানগুলো বেজে ওঠলে বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে সুখের আবেশ। আবার ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় কষ্টের অনুভূতিও। কখনো কখনো টলমল করে চোখ। আসলে গানের কাছে নিজেকে যেভাবে সঁপে দেওয়া যায়, নিজেকে নিবেদন করা যায়, গান যেভাবে আবিষ্ট করে, আপ্লুত করে, অন্য কোনোভাবে সেটা সম্ভব হয় না। আমি গানের একদমই বোদ্ধা নই। স্রেফ ভালোবাসা থেকে গান পছন্দ করি। গান গাইতে না পারাটা জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট হয়ে আছে। তারপরও একান্ত নিভৃতে বুকের ভিতরটা যখন গুনগুন করে ওঠে, তখন কিন্তু অল্প কিছুই গানই বার বার ফিরে ফিরে আসে। আমার মতো অ-সুরের পক্ষে সবার গান গাইতে পারা সম্ভব হয় না। তাছাড়া মনেও রাখতে পারি না। মস্তিস্কের মেমোরি কার্ডের পরিসর এতই সীমিত, চাইলেও বেশি কিছু জমিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। অল্প যে ক’জন শিল্পী তাতে স্থান করে নিয়েছেন, তাঁদের অন্যতম হলেন লাকী আখান্দ।

আমার সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, অনুভব-অনুভূতিতে লাকী আখান্দ হয়ে আছেন পরম প্রশান্তির এক নাম। তাঁর গাওয়া, তাঁর সুর করা, তাঁর লেখা একাধিক গানই আমাকে সঙ্গ দেয়। আমাকে আমোদিত করে। আমাকে উৎফুল্ল করে। অন্তর্মুখী মনোভাবের কারণে এগিয়ে গিয়ে কাউকে কোনো কিছু বলতে পারি না। কারো কাজেও আসতে পারি না। তবে দূর থেকে সহানুভূতি বোধ করি। অনুভূতির প্রকাশটা ঘটে ভিতরে ভিতরে। সে ক্ষেত্রেও লাকী আখান্দের মতো শিল্পীরা এগিয়ে আসেন। তাঁদের গানগুলোই বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত। কোনো ‘নীলা’র মন খারাপ দেখলে বুকের মধ্যে বাজতে থাকে, ‘দিয়েছে কে তোমায় ও মনে ব্যথা/কাঁটা হয়ে হয়ে বিঁধেছে কি কারো কথা/কাছে এসো তুমি মেয়ে মুছে দেবো আঁখি পারা/চলে যাবে তখনই যত বেদনা’। যখন এক ধরনের শূন্যতা অনুভব করি, তখন হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, ‘আমায় ডেকো না, ফেরানো যাবে না/ফেরারি পাখিরা কুলায় ফেরে না’। প্রিয় কাউকে নীল মণিহার দেওয়া না হলেও মুহূর্তটুকু কল্পনা করতে ভালোই লাগে, ‘এই নীল মণিহার, এই স্বর্ণালী দিনে/ তোমায় দিয়ে গেলাম/ শুধু মনে রেখো’। আবার কখনো সান্ত¡না খুঁিজ, ‘দ্বীপজ্বালা রাত জানি আসবে আবার/কেটে যাবে জীবনের সকল আঁধার’।
লাকী আখান্দের সুর করা গানগুলোও বুকের মধ্যে ভাবাবেগ সৃষ্টি করে। উদ্বেলিত করে। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর গাওয়া ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে/মনে পড়লো তোমায়’ গানটি বৃষ্টির দিনে অকারণেই স্মৃতিকাতর করে দেয়। ফেরদৌস ওয়াহিদের ‘আগে যদি জানতাম তবে মন ফিরে চাইতাম/ এই জ্বালা আর প্রাণে সহে না’, কুমার বিশ্বজিৎ-এর ‘যেখানে সীমান্ত তোমার/ সেখানে বসন্ত আমার/ ভালোবাসা হৃদয় নিয়ে/আমি বার বার আসি ফিরে/ডাকি তোমায় কাছে’ কিংবা জেমসের ‘লিখতে পারি না কোনো গান আজ তুমি ছাড়া/ ভাবতে পারি না কোনো কিছু তুমি ছাড়া/কী যে যন্ত্রণা এই পথ চলা/বিরহ স্মৃতি তোমাকে ঘিরে তুমি জানো না’ ভিন্ন ভিন্ন আবেগ, অনুভূতি এনে দেয়। সামিনা চৌধুরীর ‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে/রাতের নির্জনে/ জোনাকীর আলো নেভে আর জ্বলে/শাল মহুয়ার বনে’ গানটি সৃষ্টি করে রোমান্টিক এক আবহ। যেন এমন কোনো দৃশ্যপটের প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার অপেক্ষায় আমিও।  
হ্যাপী আখান্দের গাওয়া ‘চলো না ঘুরে আসি অজানাতে/যেখানে নদী এসে থেমে গেছে/আবার এলো যে সন্ধ্যা শুধু দু’জনে/ঝাউবনে হাওয়াগুলো খেলছে/সাঁওতালি মেয়েগুলো চলছে/লাল লাল শাড়িগুলো উড়ছে/তার সাথে মন মোর দুলছে/ওই দূর আকাশের প্রান্তে/সাতরঙা মেঘগুলো উড়ছে’ আমার প্রিয় গানের একটি। মনটা ফুরফুরে থাকলেই এ গানটি প্রাণখুলে গাইতে ইচ্ছে করে। এমনকি সাধ জাগে ‘ঘুড্ডি’ ছবির রাইসুল ইসলাম আসাদ হতে। সব সময় গানে বর্ণিত অনুভূতি বা মেজাজ নিয়ে একইভাবে গানগুলো গাওয়া বা শোনা হয় না। অকারণেও গানগুলো বুকের মধ্যে গুঞ্জন তোলে। ভরিয়ে দেয় বুকের শূন্যতা। এটাও লাকী আখান্দের গানের মহিমা। তাঁর গানগুলোর আবেদন ফুরিয়ে যাওয়ার নয়।  
২০ জানুয়ারি ঢাকা ক্লাবে কয়েকজন ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে সম্মানিত করে লস অ্যাঞ্জেলস প্রবাসীদের একটি সংগঠন। সে অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মাননা দেওয়া হয় লাকী আখান্দকে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি এসেছিলেন। তাঁকে কেন্দ্র করে সেলফি তোলার হিড়িক পড়ে যায়। তাঁর পাশের টেবিলেই বসেছিলাম। খুবই ইচ্ছে হয়েছিল কাছে গিয়ে তাঁকে বলি, আপনার গান আমাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রাখে। মুখচোরা স্বভাবের কারণে প্রিয় কাউকে মনের একান্ত কথা মুখ ফুটে বলতে পারি না। সেদিন তাঁকেও বলতে পারি নি। আর কখনো বলতেও পারবো না।    

বৃহস্পতিবার, ১১ অক্টোবর, ২০১২

আদনান সামি কি হারিয়ে গেলেন?

অনেক দিন যাবৎ পাদপ্রদীপের আলোয় নেই জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী আদনান সামি। একটা সময় সংগীত জগত কাঁপিয়েছেন তিনি। উপমহাদেশের ঘরে ঘরে বেজেছে তার গান। অনেকেই তার অনুরাগী হয়ে ওঠেন। যে আমি উর্দু কিংবা হিন্দি বুঝি না, সেও তার গানে হয়ে যাই মাতোয়ারা। এখনও সেই গান হঠাৎ যখন শুনি, দুলিয়ে দেয় মন-প্রাণ। এখনও সক্রিয় আছেন সংগীত জগতে। অথচ নতুন কোনো গান দিয়ে তিনি সাড়া জাগাতে পারছেন না তিনি। তার সবটুকুই কি দেওয়া হয়ে গেছে? সে কি করে হয়? অসামান্য প্রতিভাবান এই শিল্পী। অল্প বয়সেই সাড়া জাগান। দ্রুতলয়ের কীবোর্ডিস্ট হিসেবে চমক দেখান। পিয়ানো বাজানোতে তার জুড়ি নেই। গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবেও তার সুখ্যাতি রয়েছে। নব্বই দশকের শুরুতে জন্মভূমি পাকিস্তানে তার গানের প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। এরপর চলচ্চিত্র জগতেও প্রবেশ করেন। প্রথম স্ত্রী জেবা বখতিয়ারের সঙ্গে একটি মাত্র চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। তবে গানই হয়ে ওঠে তার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা। ২০০০ সালে ভারতের খ্যাতিমান শিল্পী আশা ভোঁসলের সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রকাশ করেন রোমান্টিক গানের অ্যালবাম ‘কভি তো নজর মিলাও’। ব্যাস, তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যেন বিস্ফোরণ ঘটান তিনি। বিশেষ করে ‘কভি তো নজর মিলাও’ ‘ভিগি ভিগি রাতও মে’ ও ‘লিফট করা দে’ সবার মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তাকে নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যায়। উপমহাদেশের সংগীত জগতে তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথম অ্যালবামের রেশ ফুরাতে না ফুরাতেই ২০০২ সালে আসে ‘তেরে চেহরা’। এই অ্যালবামও বেশ সাড়া জাগায়। চারিদিকে শুধু আদনান সামি আর আদনান সামি। বাংলাদেশেও তখন তিনি তুমুল জনপ্রিয়।
২০০৩ সালে তাকে বাংলাদেশে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলে আলোড়ন পড়ে যায়। যে আমি পারতপক্ষে কোলাহল এড়িয়ে চলি, সেও তার গান শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠি। কিন্তু চাইলেই তো আর টিকিট পাওয়া যায় না। যাহোক, ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থায় আয়োজিত তার কনসার্টে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়। মোটাসোটা শরীর নিয়ে তিনি মাতিয়ে দেন। এমনিতেই ছিলাম তার গানের অনুরাগী, লাইভ কনসার্ট দেখার পর রীতিমতো তার ভক্ত বনে যাই। যে কারণে অন্তরের তাগিদ থেকেই তার খোঁজ-খবর কিছুটা রাখার চেষ্টা করি। এরমধ্যে অবশ্য মন খারাপ করার মতো অনেক ঘটনা তার জীবনে ঘটেছে। সাংসারিক বিপর্যয় তো ছিলই। শারীরিকভাবেও সুস্থ ছিলেন না। অস্বাভাবিক ওজন নিয়ে সুস্থ থাকাটা কঠিন বৈকি। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শে ডায়েট, এক্সারসাইজ ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ওজন কমিয়ে নিজেকে আধখানা আদনান সামি করে ফেলেন। বাড়তি মেদ ঝরালে একদমই বদলে যান তিনি। কিন্তু দাম্পত্য জীবনের কলহের কারণে তিনি বোধকরি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। আদালত অব্দি ছোটাছুটি করতে হয়। এরপর আর প্রকৃত আদনান সামিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বয়স ৪০ হওয়ার অনেক আগেই একপ্রকার হারিয়ে গেছেন প্রিয় এই শিল্পী। মেধাবীরা তো এত সহজে নিভে যেতে পারেন না। অবশ্য এটাও ঠিক, বেশি প্রতিভা নিয়ে জন্মালে কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দেয়। আদনান সামিরও কি তাই হলো? তবুও প্রতীক্ষায় আছি, আবার জ্বলে ওঠবেন আদনান সামি। গানে গানে মাত করে দেবেন চারদিক।

বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর, ২০১২

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় : সুরের আকাশে শুকতারা

গান যে অনুভবের তারে তারে কবে মর্মে পশেছিল, সেটা বলতে পারবো না। তবে সুর যেহেতু যে কারো হৃদয়ে সহজেই দোলা দিতে পারে, আমাকে নিশ্চয়ই দিয়েছিল, একদম শৈশবেই। তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে, অনুধাবন করার মতো উপলব্ধি হওয়ার পর থেকেই হৃদয়ে ঠাঁই করে নেন হেমন্ত-কিশোর অর্থাৎ বাংলা গানের অন্যতম দুই প্রবাদপুরুষ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও কিশোর কুমার। দু’জনের দুই রকম কণ্ঠমাধুর্য মন জয় করে নেয়। তবে হেমন্তকে কেন জানি খুব কাছের ও আপন মনে হয়। বাংলা গানের সোনালি যুগের একজন দিকপাল হয়েও তারমধ্যে কোনো গরিমা ছিল না। নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন একদমই তাই। অমায়িক ও অকপট। গানেই নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমর্পণ করেছিলেন।

তার উদাত্ত ভরাট কণ্ঠ হৃদয়ে অনায়াসেই দোলা দেয়। যে কারণে তার গাওয়া গানগুলো বুকের গভীরে স্থান করে নেয় চিরদিনের মতো। এখনও তার গান কোথাও বেজে ওঠলে চারপাশটা ভরে যায় ভালো লাগায়। নস্টালজিক হয়ে ওঠে মন। তার দরদমাখা কণ্ঠে প্রতিটি গানই হয়ে আছে দেদীপ্যমান। ‘তুমি এলে অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো’, ‘কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো’, ‘এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে নাতো মন’, ‘আমার জীবনের এত খুশি এত হাসি’, ‘আজ দু’জনার দু‘টি পথ’, ‘এই রাত তোমার আমার’, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘পথের ক্লান্তি ভুলে স্নেহ ভরা কোলে তব’, ‘ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে’, ‘আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি’, ‘ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না’, ‘পৃথিবীর গান আকাশ কি মনে রাখে’, ‘আজ রাতে ঘুমিয়ে পড়ো না তুমি’, ‘যাবার আগে কিছু বলে গেলে না’, ‘আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম’, ‘আয় খুকু আয়’, ‘সব কথা বলা হলো’, ‘তারপর, তার আর পর নেই’, ‘আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা’, ‘বনতল ফুলে ফুলে ঢাকা’, ‘মেঘ কালো আকাশ কালো’, ‘কত দিন পরে এলে একটু বসো’, ‘এক গোছা রজনীগন্ধা হাতে দিয়ে বললাম’, ‘শোনো বন্ধু শোনো’, ‘রানার ছুটেছে’, ‘যে বাঁশি ভেঙে গেছে’, ‘এই বালুকা বেলায় আমি লিখেছিনু’, ‘কোনো এক গাঁয়ের বধুর’, ‘সুরের আকাশে তুমি যে গো শুকতারা’, ‘মুছে যাওয়া দিনগুলো আমায় যে পিছু ডাকে’, ‘আমার গানের স্বরলিপি লেখা রবে’, ‘আমিও পথের মতো হারিয়ে যাবো’-র মতো চিরায়ত গানগুলো কি কখনো ভোলা যায়? অলৌকিক এক সৌন্দর্য রয়েছে গানগুলোর পরতে পরতে। এ কারণে গানগুলো শোনা হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তার আবেদন একটুও ম্লান হয়নি। হয়ে ওঠেছে কালজয়ী। সঙ্গত কারণে বাংলা গান বললেই অনায়াসে মনের মণিকোঠায় ভেসে ওঠেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। হিন্দি গান গেয়েও তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীতও পেয়েছে অন্য এক মাত্রা। সংগীত পরিচালক হিসেবেও ছিল তার সুখ্যাতি। কিংবদন্তি এই শিল্পীর গান শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠেছি। তাই তার গানগুলোকে মনে হয় আমার নিজেরই গান।
তবে তাকে কখনো কাছ থেকে দেখবো কিংবা সামনা-সামনি তার গান শুনবো, এমনটি কখনো ভাবিনি। অথচ কখনো কখনো স্বপ্নও সত্য হয়ে যায়। আমার জীবনেও এই স্বপ্নটি সত্য হয়েছিল। ১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বরে এই শিল্পী শেষ বারের মতো বাংলাদেশে আসেন। যদিও তখন তিনি অনেকটাই বেলা শেষের গান। আগের মতো আর গাইতে পারতেন না। শারীরিকভাবেও সুস্থ ছিলেন না। গান গাইতে খুবই কষ্ট হতো। তবুও অনুরোধের ঢেঁকি গিলে জাতীয় প্রেস ক্লাবেও এসেছিলেন গান গাইতে। বিখ্যাত শিল্পী হলেও তার মধ্যে কোনো অহমিকা ছিল না। একদমই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। পোশাক-আশাকেও ছিলেন অনাড়ম্বর। ক্লাবের দোতলার একটি কক্ষে ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে তার গানের আয়োজন করা হয়। তিনি সেখানেই হারমোনিয়াম বাজিয়ে স্বভাবজাত ভঙ্গিতে একে একে গাইতে থাকেন তার চিরকালীন ভালোলাগার গানগুলো। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। দেখেছিলামও বিমুগ্ধচিত্তে। সেদিন নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে হয়েছিল। সেই দিনটি এখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে স্মৃতিপটে। এই জীবনে একটি বড় পাওয়া কাছাকাছি বসে তার গান শোনা। তাকে কাছ থেকে দেখা। ১৯৮৯ সালের সে সফরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন কবি, লেখক ও অধ্যাপক আবু হেনা মোস্তফা কামাল। এই অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হওয়ার ক’দিন পরেই মৃত্যু আবু হেনা মোস্তফা কামালকে অকালেই ছিনিয়ে নিয়ে যায়। আমার কাছে কেন জানি বিস্ময়কর লেগেছে, এর মাত্র দু‘দিন পরই ২৬ সেপ্টেম্বর সংগীত জগতকে শূন্য করে দিয়ে চলে যান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।
তিনি চলে গেলেও স্রোতাদের কাছে এখনও তিনি জাগরূক আছেন। তাকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে কত জন যে শিল্পী হিসেবে জীবন গড়েছেন, কিন্তু তার স্থান কারো পক্ষে পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বাংলা গানের ইতিহাসে এ যাবৎ কত কত শিল্পী গান গেয়েছেন। কিন্তু তারমধ্যে স্ব-মহিমায় অনন্য হয়ে আছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। তিনি যে সুরের আকাশে শুকতারা।
 
(জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্মরণিকায় প্রকাশিত।)

সোমবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১২

সুরের ধারা ঝরে যেথায়............


বাংলাদেশে রবীন্দ্র চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন নন্দিত দু’জন নারী। উভয়ই প্রথিতযশা রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উদ্যোক্তা। একজন সন্জীদা খাতুন। আরেকজন তারই অনুসারী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। উভয়ই তাদের কণ্ঠমাধুর্য দিয়ে শ্রোতাদের হৃদয়ে আলাদা একটা স্থান করে নিয়েছেন। সংগত কারণেই রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী হিসেবে তাদের নাম আলাদা মর্যাদায় উচ্চারিত হয়। প্রবীণা সন্জীদা খাতুন এখন আর আগের মতো গাইতে পারেন না। তবে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা স্ব মহিমায় সমুজ্জ্বল। বাংলাদেশে তো বটেই, ভারতেও তাকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্র সংগীতের বড় কোনো আসরের কথা ভাবাই যায় না। বিশেষ করে, পশ্চিমবঙ্গের সংগীত চ্যানেল ‘তারা মিউজিক’য়ে প্রতিদিনই শোনা যায় তার সুরেলা আওয়াজ।
রবীন্দ্র সংগীতের শিল্পী হিসেবেই শুধু নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি সন্জীদা খাতুন আর রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। রবীন্দ্র সংগীতকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে এ দু’জনের অবদান বিস্ময়কর। বাংলা নববর্ষকে বাঙালির বুকে চিরস্থায়ীভাবে আসন করে দিচ্ছেন এই দুই সংগীত কিংবদন্তি। সন্জীদা খাতুন আর ছায়ানট তো একই মালায় গাঁথা। ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ছায়ানটের সাহসী ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় হয়ে আছে অমিলন। তারই অংশ হিসেবে বাংলা নববর্ষ উদযাপনে অবিচ্ছেদ্য অংশ ছায়ানট। আজও ছায়ানটের পয়েলা বৈশাখ বরণ করে নেয়াটা নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। ছায়ানটের গৌরবোজ্জ্বল অবদানের ক্ষেত্রে অন্যতম কা-ারি হলেন সন্জীদা খাতুন। এখনও বাংলাদেশের রবীন্দ্র চর্চার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ছায়ানট। রবীন্দ্র চেতনাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বয়সের ভারকে তুচ্ছ করে সন্জীদা খাতুন ছায়ানটের সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ। তার সময় ছায়ানটের ব্যাপ্তি ও কার্যক্রম অনেক বেড়েছে। নেয়া হচ্ছে নতুন নতুন পদক্ষেপ।
ছায়ানটের ছায়াতলে লালিত রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাও রবীন্দ্র চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। শান্তিনিকেতনের মেধাবী এই ছাত্রী ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সুরের ধারা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুৃর আর রবীন্দ্র সংগীতকে ভালোবেসে এবং তার মোহরদি‘র (রবীন্দ্র সংগীতের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়) পরামর্শে, অনুপ্রেরণা ও নির্দেশনায় অনেকটা একক উদ্যোগে তিনি গড়ে তোলেন এই প্রতিষ্ঠানটি। খুব নীরবে কাজ করে গেলেও আজ ‘সুরের ধারা’ একটি প্রতিষ্ঠিত নাম। লালমাটিয়া উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘সুরের ধারা’র মাধ্যমে প্রতি বছর অসংখ্য ছেলেমেয়ে রবীন্দ্র সংগীতে দীক্ষা নিয়ে চলেছেন। পাশাপাশি শেখানো হয় উচ্চাঙ্গসংগীত সহ মূলধারার অন্যান্য গান। এছাড়া গত প্রায় এক যুগ ধরে বাংলা বছরের শেষ দিনটিতে ‘সুরের ধারা’ নিয়মিতভাবে আয়োজন করে আসছে বর্ষশেষের সংগীতানুষ্ঠান। সেটিও হয়ে ওঠেছে নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। তবে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘সুরের ধারা’র অনুষ্ঠানমালা ছিল এককথায় অসাধারণ ও বিস্ময়কর। ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপি রবীন্দ্র উৎসব বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলে রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ছিল সেরা আয়োজন। দুই বাংলার খ্যাতিমান শিল্পী, লেখক, সংগঠকদের নিয়ে সংগীত, আবৃত্তি, নাটক, সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, চলচ্চিত্র, প্রদর্শনী এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সহস্র কণ্ঠে রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশনা সবাইকে মুগ্ধ করে দেয়। এই উৎসবে পাশ্চাত্যের যন্ত্রানুষঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করেন ১৭টি দেশের ৩৫ জন সদস্য নিয়ে গঠিত ‘গান্ধর্বলোক অর্কেস্ট্রা‘। রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানের ২২২২টি গান ডিভিডিতে ধারণ করা হয়। ২২টি ডিভিডিতে ধারণকৃত এই পুরো আয়োজনের নামকরণ করা হয় ‘শ্রুতি গীতবিতান’। ছোট্ট পরিসরের ‘সুরের ধারা’ এক লহমায় যেন ছাড়িয়ে যায় নিজেকে। রবীন্দ্র উৎসবের মাধ্যমে তাদের খ্যাতি যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে সাংগঠনিক শক্তি। এখন ‘সুরের ধারা’ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে কোনো বড় অনুষ্ঠান আয়োজন করার সামর্থ রাখে। তাই তাকে ঘিরে উড়ে প্রত্যাশার রঙধনু।


এ কারণে এবার প্রথম ‘সুরের ধারা’ বর্ষশেষের পাশাপাশি বর্ষবরণ করার জন্য বিশাল কলবরে আয়োজন করে দুই দিনব্যাপি অনুষ্ঠানমালার। আগে এটি হত একদিনেই। চৈত্রের শেষ দিনে বর্ষবিদায়ের পরের দিন ভোরে সহস্রকণ্ঠে বরণ করে নেয়া হয় বাংলা নববর্ষকে। লালমাটিয়ার নির্জনতা ছেড়ে এবার এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের উন্মুক্ত চত্বরে। এই আয়োজন এবার বিবেচিত হচ্ছে নতুন সংয়োজন হিসেবে। বিপুলসংখ্যক দর্শক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন মুগ্ধতা নিয়ে। ‘সুরের ধারা’র যাবতীয় কার্যক্রম আবর্তিত হয় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাকে কেন্দ্র করে। এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা তারই নেতৃত্বে যে কোনো অসাধ্য কাজ সম্পন্ন করার ব্যাপারে অনেক বেশি আন্তরিক ও একতাবদ্ধ। ‘সুরের ধারা’র তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী শামীমা আক্তার শাওন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমাদের সত্তায় মিশে আছেন। সেই শৈশবে তিনি স্থান করে নেন হৃদয়ে। তবে অল্প বয়সে আমার বিয়ে হয়ে যাওয়ায় ইচ্ছে থাকাসত্ত্বেও রবীন্দ্র সংগীত শেখা হয়নি। কিন্তু এখন এই সুযোগ এনে দিয়েছে আমার প্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘সুরের ধারা’। এখানে শুধু রবীন্দ্র সংগীতই বুকে ধারণ করছি না, সেইসঙ্গে সাংগঠনিক বিষয় সহ অনেক কিছু শিখতে পারছি। ‘সুরের ধারা’র পরিবেশটা একটি পরিবারের মতো। তাই যে কোনো আয়োজন নিজেদের মনে করে সেটা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য কারোই মোটেও কার্পণ্য থাকে না।‘ এটাই ‘সুরের ধারা’র এগিয়ে চলার অন্যতম মন্ত্র ও চালিকাশক্তি। ‘সুরের ধারা’র এই মন্ত্র ও শক্তি ‘হৃদয় মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে’।