পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

অভিমত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অভিমত লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

এক খণ্ড উপলব্ধি

‘এভাবে জীবন আমি চাইনি

জীবনের মানে খুঁজে পাইনি।’


নিজেকে আজও বুঝতে পারলাম না। কীভাবে জীবন যাপন করলে শুদ্ধতার মাপকাঠি হতে পারে, সেটা না বুঝেই পেরিয়ে এলাম কত দিন, কত মাস, কত বছর। পেছন ফিরে তাকালে ফুটে উঠে কেবলই নিরাশার ছবি। মানুষ হিসেবে আমার যে অনেক খামতি, সেটা আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে? এ জীবনে সেই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠা আমার পক্ষে আর সম্ভব হলো না। অন্তর্মুখী স্বভাব, গুছিয়ে কথা বলতে না পারা আর উচ্চাভিলাষ না থাকাটা আমার অনেক অপূর্ণতার জন্য দায়ী। তা নিয়ে তো আক্ষেপ করে লাভ নেই। আমার যা কিছু খামতি, যা কিছু অপূর্ণতা, যা কিছু অপারগতা তা একান্তই আমার। সেটাকে তো মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। 

তারপরও হঠাৎ হঠাৎ নিজেকে প্রশ্ন করি, এ কেমন আমি? একটা বলয়ের মধ্যে কেমন বেখাপ্পাভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছি। সবার সঙ্গে অন্তরঙ্গভাবে মিশতে পারি না। মন খুলে সবার সঙ্গে কথা বলতে পারি না। সবার মন জুগিয়ে চলতে পারি না। আমার এ অক্ষমতা আমাকে করে তুলেছে অনালাপী, অমিশুক ও অসামাজিক। এ জীবনে কোনো অবস্থান্তর নেই। কোনো বৈচিত্র্য নেই। কোনো রূপান্তরও নেই। খুবই সাদামাটা, ম্লান ও বিষণ্ন জীবনযাপন। সে নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপও নেই। আমি যার যোগ্য নই, সেটা কেন আমি পেতে চাইবো? 

তবে ভালো কি মন্দ জানি না, আমার একটা দুর্বলতা আছে। যাঁদের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করি, কথা বলি, তাঁদের বেশির ভাগেরই প্রতি আমার এক ধরনের সফটকর্নার তৈরি হয়ে যায়। আমার গণ্ডি যেহেতু খুব বড় নয়, সীমিত পরিধির এই মানুষগুলোকে আমার একান্তই আপন মনে হয়। এ মানুষগুলোই প্রতিনিয়ত আমার ভাবনার খোরাক হয়ে আসে। তাঁদের ভালো-মন্দ আমাকে উদ্বেলিত করে। আমি হয়তো যথাযথভাবে তা প্রকাশ করতে পারি না। কিন্তু হৃদয় দিয়ে অনুভব করি। সেটা কেউ হয়তো বুঝতে পারে না। বুঝতে দিতে চাওয়াটাও আমার অভিপ্রায় নয়। জেনে-শুনে কারো ক্ষতি করা কিংবা অনিষ্টর কারণ হওয়ার প্রশ্ন আসে না। আর কখনো-সখনো কোনো কারণে কারো সমালোচনা করলেও গিবত বা কুৎসা রটানো কখনোই আমার পছন্দের বিষয় নয়। তারপরও কখনও যদি এ মানুষগুলোর ভুল বোঝাবুঝির কারণ হয়ে দাঁড়াই, সেটা আমাকে দারুণভাবে আহত করে। ব্যথিত করে। নিদারুণ কষ্ট দেয়। 

পরিচিত কিংবা অপরিচিত যে কেউ হোক না কেন, আমাকে দিয়ে যদি তাঁদের কোনো উপকার বা কাজ হয়, যদি আমার সামর্থ্যে কুলোয়, তাহলে আন্তরিকভাবে তা করার চেষ্টা করি। অনেক সময় নিজের কাজটাকে স্থগিত রেখেও করে দেই। বলে রাখা ভালো, আমি এমন কেউকেটা নই যে, কারো বড় কোনো কাজ করে দেওয়ার সামর্থ্য রাখি। আমার সেই ক্ষমতা বা সক্ষমতা নেই। আর তদবির করতে না পারাটা আমার একটা অক্ষমতা। সেটা পারি না বলে অনেক কিছু না পাওয়া রয়ে যায়। আমার চৌহদ্দির মধ্যে যতটা পারি, কাজ করে দেওয়ার চেষ্টা করি। তাতে পারতপক্ষে আমার কোনো কসুর থাকে না। তারপরও যেটুকু ঘাটতি থেকে যায়, তা একান্তই অনিচ্ছাকৃত। আন্তরিকতার ঘাটতি না থাকলেও তারপরও কেন যেন দূরত্বটা রয়ে যায়! নৈকট্যের বন্ধনটা তেমনভাবে গড়ে উঠে না। সম্পর্কটা হয়ে থাকে তেল-জলের মতো।              

একদম নিঃস্বার্থ মানুষ হওয়া অনেক সাধনার ব্যাপার। সমাজ-সংসারে বসবাস করে তেমনটি কার্যত পারা যায় না। আমিও কোনো সাধক পুরুষ নই। আমারও ইচ্ছে আছে। অনিচ্ছে আছে। চাওয়া-পাওয়া আছে। সেটা না থাকাটা খুবই অস্বাভাবিক। আমার যেহেতু বড় কোনো কাজ করে দেওয়ার ক্ষমতা নেই, সঙ্গত কারণেই কারো কাছে খুব বড় কিছু চাওয়ার সাহসও হয় না। তাছাড়া মুখ ফুটে কারও কাছে কিছু চাওয়া, আমার কাছে জগতের কঠিনতম কাজের একটি মনে হয়। আমার চাওয়াগুলো সাধারণত খুবই ছোট ছোট। এমনকি সেগুলোকে কারো কাছে চাওয়ার মতো কিছু মনে নাও হতে পারে। মজার ব্যাপার, আমার ছোট ছোট এ চাওয়াগুলোও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপূরণীয় রয়ে যায়। যা খুব সহজেই হয়ে যাওয়ার কথা, আমার ক্ষেত্রে তা কেন যেন হয় না। কোথায় যেন একটা বাধা-বিপত্তি এসে পথরোধ করে দাঁড়ায়। বার বার ধাক্কা খেতে খেতে এখন কারও কাছে কিছু অনুরোধ করতেও ভয় লাগে। প্রত্যাখ্যানটা বুকের মধ্যে বড় বেশি ব্যথা হয়ে বাজে। আর যা হোক, উপেক্ষা একদমই সইতে পারি না। 

অনেককে খুবই আপন মনে হয়। কিন্তু যে কারণেই হোক, আমি তাদের আপন হয়ে উঠতে পারি না। তাদের কারো কারো মিষ্টি হাসি, মিঠা মিঠা মন রাখা কথা ও ‘আন্তরিক’ ব্যবহারে আমি সহজেই পটে যাই। মনে হয়, এঁরা আমার কত কাছের। আমার আপদে, বিপদে নিশ্চয়ই এ মানুষগুলো বাড়িয়ে দেবেন সহযোগিতার নির্ভরযোগ্য হাত। যদিও এমন প্রত্যাশা আমার সঙ্গে খাপ খায় না। তবে আর কিছু না হলেও আন্তরিক সহানুভূতিটুকু পাওয়ার আশা তো করতেই পারি। কিন্তু ঘটনাচক্রে তাদের নেতিবাচক মনোভাবটা যখন টের পেয়ে যাই, তখন কী যে কষ্ট হয়, বোঝাতে পারবো না। মুখে এক, অন্তরে আরেক, এমন দ্বিচারিতা আমি একদমই মেনে নিতে পারি না। মিথ্যের কুহক দিয়ে কেউ যখন আমাকে ভোলাতে চায়, তখনও খুব করুণা হয়। আমার বোধ-বুদ্ধি মোটেও শাণিত নয়, এটা স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই। কিন্তু যখন কেউ আমাকে ‘শিশু’ মনে করে অনেক বেশি চালাকি করেন, তখন নিজেই লজ্জা পেয়ে যাই। কারো কাছে আমার খুব বেশি চাওয়ার নেই। তবে কেউ ভালো না বাসুক, অন্তত বিনা কারণে আমাকে যেন অবহেলা না করেন, এটা আমার চিরদিনের চাওয়া। সেই চাওয়ার হিসেব কেন যেন মেলে না। 

তবে এটাও তো ঠিক, অযাচিতভাবে কারো কারো সহানুভূতি ও সহযোগিতা পেয়েছি। সেই পাওয়াগুলো আমার সঞ্চয়ের খাতায় মূল্যবান সম্পদ হয়ে আছে। এ ঋণ আমি কখনো শোধ করতে পারবো না। তবে তেমনটা হয়ে থাকে কালেভদ্রে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লোক দেখানো সহানুভূতি পেলেও আনুকূল্য ও সহযোগিতা পাওয়া হয় না। এমনকি অকারণে ভিতরে ভিতরে একটা অনাদর, এক রকম অবহেলা, এক ধরনের তাচ্ছিল্য অনুধাবন করতে পারি। কেন এমনটি হয়, সেটার যৌক্তিক কোনো কারণ খুঁজে পাই না। 

ঠিক বুঝতে পারি না, আমি কেন সবার আপন হতে পারি না? নাকি আমাকে কেউ আপন ভাবতে পারেন না। কেন পারি না বা কেন পারে না, সে রহস্য আজও উদ্ঘাটন করতে পারলাম না। কোথায় যে আমার অপূর্ণাঙ্গতা ও অসম্পূর্ণতা এটা খুবই জানতে ইচ্ছে করে। জানতে পারলে জীবনের ভুলগুলি শুধরে নেওয়ার অন্তত চেষ্টা তো করতে পারতাম। 

আচ্ছা, সবার সঙ্গে আপন হতে না পারার যে অক্ষমতা, তারসঙ্গে ২৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণের কি কোনো সম্পর্ক আছে?

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০



আমরা কি পাশ ফিরে শুয়ে থাকবো?

লেখক ও চিন্তাবিদ নীরদচন্দ্র চৌধুরী তাঁর অভিজ্ঞতার নির্যাস থেকে যথার্থ কারণেই বাঙালিকে অভিহিত করেন ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ হিসেবে। এমনটি বলার ঢের ঢের কারণ রয়েছে। এক ধরনের পাখি আছে, নির্দিষ্ট একটা সময়ে আত্মহত্যা করার জন্য উম্মাদ হয়ে যায়। কেন যায়, এর সঠিক কোনো ব্যাখ্যা জানা নেই। জাতি হিসেবে আমরাও কি তেমনি আত্মবিনাশী হয়ে পড়েছি? নতুবা চারপাশে আমরা কেন গড়ে তুলছি মৃত্যুর ভয়াল সব ফাঁদ? প্রতিদিনই এ ফাঁদে কাউকে না কাউকে অকালে জীবন দিতে হচ্ছে। 

আমরা কি ‘জেনে শুনে বিষ করেছি পান’? বড় কোনো অভিঘাতেও আমাদের কোনো বোধোদয় হয় না। যে কোনো দুর্ঘটনায় সাময়িকভাবে একটু উচাটন হলেও তারপর ‘ঝাঁকের কৈ ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি’। সব কিছুই যেন আমাদের গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে। নিজের জীবনকে কত তুচ্ছভাবেই না বিসর্জন দেওয়ার জন্য আমরা বরণডালা সাজিয়ে বসে আছি। এমন আত্মঘাতীপ্রবণ জাতি আর কোথাও কি দেখা যায়?  

এ শহরটাকে আমরা একটি অভিশপ্ত জনপদে পরিণত করে চলেছি। এখন এখানে সবুজ খুব একটা দৃশ্যমান নয়। পাখি গান গায় না। নদীও আপন গতিতে বয়ে চলে না। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, এসব হয়তো একদিন প্রত্মতাত্ত্বিক জাদুঘরে দেখা যাবে। আমরা প্রকৃতির বুকে নিষ্ঠুরভাবে কুঠারাঘাত করছি। বিহঙ্গকে তীরবিদ্ধ করছি। রুদ্ধ করে দিচ্ছি নদীর প্রবাহিণী গতিকে। এর ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আমাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। 

আমাদের অভীষ্ট লক্ষ্য যেন বিরান এক লোকালয় গড়ে তোলা। যেখানে অরণ্য থাকবে না। খোলা প্রান্তর থাকবে না। ফুল ফুটবে না। স্বাভাবিক নিঃশ্বাসও নেওয়া যাবে না। থাকবে কংক্রিটের মস্ত মস্ত জঙ্গল। একটু একটু করে অনৈসর্গিক পরিবেশের দিকে কি এগিয়ে যাচ্ছি না? যেদিকে চোখ যায়, শুধু ইট-পাথর-সিমেন্টের সুষমাহীন অরণ্য।   

আমাদের এ নগরকে গড়ে তুলছি ‘মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে। মৃত্যুর কত পসরাই না সাজিয়ে রেখেছি। বেপরোয়া গাড়িকে আমরা একদমই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। ট্র্যাফিক আইনের পরোয়া করছি না। যে কারণে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল একদমই থামছে না। এটা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ নিয়ে কারও কোনো হেলদোল নেই। 

আমরা নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করতে চাই না। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বড় ধরনের ক্ষতিকর যে কোনো কাজ করতে আমাদের বিবেক একটুও কাঁপে না। অট্রালিকায় অট্রালিকায় এ শহরের অবয়ব ঢেকে ফেলছি। ভবন নির্মাণের কোনো নিয়ম-কানুনই মানতে চাইছি না। যে কারণে আগুনে জ্বলছি। পুড়ে মরছি। ধসে পড়ছি।  


গণ আত্মহত্যার নতুন এক পথ খুলে দিয়েছে গ্যাস সিলিন্ডার। গ্যাস সিলিন্ডার বলা হলেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটিকে ‘চলন্ত বোমা’ হিসেবে অভিহিত করা যায়। সুলভ জ্বালানি হিসেবে কমপ্রেসড ন্যাচারাল গ্যাস (সিএনজি) যানবাহনে এবং লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে ব্যবহার করতে হয় গ্যাস সিলিন্ডার। সব ধরনের নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেওয়ার পর এলপিজি ও সিএনজি গ্যাসের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একইসঙ্গে খরচের সাশ্রয় হওয়ায় গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সেই অনুপাতে বাড়ছে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ। বিস্ফোরণের প্রধান কারণ, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিয়ম-কানুন না মানা, উন্নতমানের সিলিন্ডার ব্যবহার না করা, অন্ততপক্ষে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা না করা এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার করা। গ্যাস সিলিন্ডার খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়। সামান্য খুঁত থাকলে কিংবা সেফটি ক্যাপ না লাগালে যে কোনো সময় জীবনমৃত্যুর দোলায় দুলতে হবে। বেঁচে গেলেও সারা জীবনের যে ক্ষত বয়ে নিয়ে বেড়াতে হয়, তাতে সুস্থ-সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবন অতিবাহিত করা সম্ভব হয় না। 

তারপরও কেন জানি এ বিষয়টিকে আমরা একদমই গুরুত্ব দিচ্ছি না। এটা যে কী ভয়াবহ, সেটা কি আমরা অনুধাবন করতে পারছি না? না হলে এ ব্যাপারে আমরা উদাসীন ও নির্বিকার থাকি কীভাবে? গ্যাস সিলিন্ডার শুধু কোনো নির্দিষ্ট বাসায় বসবাসকারী কিংবা নির্দিষ্ট গাড়ির আরোহীর মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে আসে না, আশেপাশে যাঁরা থাকবেন, তাঁরা কেউই কিন্তু নিরাপদ নয়। ঘরে যেমন নিরাপদ নয়, বাইরেও নয়। মৃত্যু তো যে কোনো মুহূর্তেই হতে পারে, এটা তো খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের পিছে পিছে ধাওয়া করছে মৃত্যুর জ্বলজ্যান্ত হুমকি। এমন হুমকি নিয়ে কীভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন সম্ভব? 

এখনও সীমিত পরিসরে দুর্ঘটনা ঘটলেও আগামীতে এ ক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয় সৃষ্টির সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। গ্যাস সিলিন্ডারের চাহিদা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিক মুনাফার জন্য সিলিন্ডার ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য যন্ত্রাংশ যথাযথ নিয়ম না মেনে নির্মাণ ও সংযোজন করা হচ্ছে। নিম্নমানের সিলিন্ডার ব্যবহার হচ্ছে। পুনঃপরীক্ষা করা হচ্ছে না। অথচ একটুখানি হেরফের হলে বিস্ফোরণ ঘটতে মোটেও সময় লাগে না। সিলিন্ডার ব্যবহারের মেয়াদ যতই বাড়ছে, ততই বাড়ছে দুর্ঘটনার হুমকি। অরক্ষিত সবার জীবন। তবুও আমাদের ঘুম ভাঙছে না।      

দুই অলসের বিখ্যাত সেই গল্পের কথা মনে পড়ছে। ঘরে আগুন লেগেছে। শুয়ে থাকা দুজন কুঁড়ে কিছুতেই উঠবে না। এমনকি কথা বলতেও তাদের রাজ্যির আলস্য। একজন আরেকজনকে সংক্ষেপে বলছে, পি. পু.। মানে পিঠ পুড়ছে। এ কথা শুনে তাঁর সাগরেদ বলছে, ফি. শু.। অর্থাৎ ফিরে শুই। আমরা সবাই যেন পাশ ফিরে শুয়ে থাকছি। পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে চাইছি না। আমাদের কি কখনই চৈতন্যোদয় হবে না?

২৭ জুন ২০১৯

মঙ্গলবার, ৭ মার্চ, ২০১৭

আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন?


সময় যে চলে যাচ্ছে, না বললেও চলে। এমনিতেই বুঝতে পারা যায়। আয়নার সামনে দাঁড়ালেই আরো ভালোভাবে টের পাওয়া যায়। পাতলা চুল, ক্লান্ত চোখ আর বিষণœ মুখ যেন বয়ঃক্রমের মানচিত্র। স্বাভাবিক নিয়মেই হ্রাস পেয়েছে শারীরিক শক্তি, সামর্থ্য ও ক্ষিপ্রতা। লিভারে মেদ জমেছে। কিডনিতে খনিজ জমেছে। ক্লেদ জমেছে হৃদয়েও। সংগত করার জন্য আছে আনুষঙ্গিক আরো কিছু ব্যাধি। এ ধরনের কঠিন কঠিন সব ব্যাধিতে কখনও কখনও বিপন্ন হয়ে পড়ে জীবন। নিভে যেতে যেতে ফের যেন জ্বলে ওঠে জীবনসলতে। চলার পথে সম্বোধন তো অনেক আগেই বদলে গেছে। এ বদল যতই এড়িয়ে যেতে চাই না কেন, জীবন ও সময়কে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। সে তার হিসেব বুঝে নিতে একটুও কার্পণ্য করে না। এ ক্ষেত্রে তার একদমই ঢিলেমি নেই। যতই ভেষজ কিংবা উন্নতমানের চিকিৎসা করা হোক না কেন, খুব একটা কাজে আসে বলে মনে হয় না। ওপর ওপর ঝকমক করলেও ভেতরটা ঠিকই ক্ষয়ে যেতে থাকে। বিজ্ঞানীরা বয়সকে আটকে রাখার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আশার আলো দেখাতে পারেন নি। শেষ অব্দি অপেক্ষায় থাকতে হয় মৃত্যুর। বুকের মধ্যে যতই কাঁপন ধরুক না কেন, নিয়তির এই বিধানকে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। 

নিজেকে ফিটফাট রাখার ব্যাপারে আমার তেমন তৎপরতা নেই বললেই চলে। আড়ালে-আবডালে কেউ কেউ ল্যাবেনডিস হিসেবেও অভিহিত করেন। অনেক সময় চুলটাও ঠিকমতো আঁচড়ানো হয় না। প্রায়শই ভুল জায়গায় ভুল বোতাম লাগিয়েছি। কত দিন উল্টো জ্যাকেট পরে সারাদিন টইটই করে ঘুরেছি। যুগিয়েছি হাসির খোরাক। নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখার ব্যাপারে কখনই মনোযোগ ছিল না। এমনিতেই সুদর্শন নই। হ্যান্ডসাম নই। নই স্মার্টও। কথাও ঠিকমতো গুছিয়ে বলতে পারি না। তার ওপর পোশাক-আশাকেও কেতাদুরস্ত নই। অগোছালো এমন মানুষকে তো সময়ের আগেই বুড়িয়ে যাওয়ার মতোই লাগে। ভাব-ভঙ্গিতে তেমনই প্রকাশ ঘটে। এরসঙ্গে তাল মিলিয়ে মনটা বুড়াটে হওয়ার কথা। চাল-চলনে পরিপাটিহীন ও বয়সী হয়েও মনটার বয়স কেন যে বাড়ে না?  

শারীরিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে মনের সতেজতা ও সজীবতা। তাতে ছাপ পড়ে বয়সী ভাবনারও। সেটাই তো স্বাভাবিক। বয়সের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনটাও অভিজ্ঞ ও পরিণত হয়ে ওঠে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ঢের ঢের পিছিয়ে আছি। শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যটা এখনও কাটিয়ে ওঠতে পারি নি। সেই বয়স, সেই মন, সেই জীবনধারা এখনও আমার পিছ ছাড়ছে না। বয়স বাড়লেও মনটা আজও অপরিণত হয়ে আছে। যে কারণে সামাজিক দৃষ্টিতে এই বয়সে যেটা মানানসই নয়, সেটা করার জন্য মনটা কেমন যেন উসখুস করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তো প্রলোভন এড়াতেও পারি না। আচরণ করি দুষ্টু বালকের মতো। কেন যে এ মনোভাব এড়াতে পারি না?


 আমাকে এই বয়সেও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় শৈশব-কৈশোরের দিনগুলো। স্কুলে পড়ার সময় কত না মার্বেল খেলেছি। মনের আনন্দে নীল আকাশে ওড়িয়েছি ঘুড়ি। এখনও ইচ্ছে করে মার্বেল নিয়ে নেমে পড়তে। ইচ্ছে করে ঘুড়ি দিয়ে আকাশের মেঘ স্পর্শ করতে। ইচ্ছে করলেও উপায় নেই। এখন আর এই শহরে কেউ মার্বেল খেলে না। আর ঘুড়ি ওড়ানোর মতো আকাশ কোথায়? চাইলেই কি এ বয়সে সেটা সম্ভব? যেটা সম্ভব, সেটাও তো পারি না। ব্যাডমিন্টন খেলতে এত ভালোবাসতাম, ফ্রোজেন শোল্ডারের কারণে খেলা হয় না। কোথাও খেলা হলে মনটা আঁক-বাঁকু করে। এই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ না থাকলেও মনটাকে বুঝ দিতে পারি না।


এই জীবনে কত না ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি, আইসক্রিম, আচার, ঝুরিভাজা, হজমি হজম করেছি। আমার শরীরের বেশিরভাগ গড়ে ওঠেছে এ গুলোরই সমন্বয়ে। যেজন্য শারীরিক গড়নটা শক্তপোক্ত নয়। আর এখন বাস্তবিক কারণেই এগুলো থেকে দূরে থাকতে বলা হয়। বললেই কি মেনে নেওয়া যায়? পথের পাশে ধুলোমাখা চটকদার এই খাদ্যগুলো আমাকে এখনও চুম্বকের মতো টানে। যতই বিধি-নিষেধ থাকুক, এর প্রলোভন মোটেও এড়াতে পারি না। এটা কি সম্ভব? চটপটি-ফুচকাÑআইসক্রিম ছাড়া জীবনটা কেমন যেন আলুনি আলুনি লাগে। হাওয়াই মিঠাই দেখলে বালক বয়সের মতো চাতক চোখে চেয়ে থাকি। এই বয়সে যখন একাকী হাওয়াই মিঠাই দিয়ে ঠোঁট লাল করি, অনেকেই তির্যকভাবে তাকিয়ে থাকেন। অস্বস্তি লাগলেও কিছু করার থাকে না। বয়স বাড়লেও ছেলেমানুষিটা যেন আজও কাটিয়ে ওঠতে পারি নি। আজও ল্যাবেনচুসের জন্য মনটা আইঢাই করে।  
ইঞ্জেকশন বা টিকা দেওয়ার ভয়ে স্কুল থেকে কত না পালিয়ে গেছি। অথচ সুইয়ের খোঁচায় এ জীবনে কত না ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি। এমনকি দু’হাতে সুই ফুটানোর জন্য শিরা না পেয়ে পায়েও দিতে হয়েছে। এত এত দিনে তো সুইয়ে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বালক বয়সের সেই ভীতি আজও আমায় ছেড়ে যায় নি। সুইয়ের ভয়ে আজও চোখ বন্ধ করে রাখি।
  
এখনও শুনতে ভালো লাগে রোমান্টিক গান। এ ব্যাপারে আমার কোনো ছুতমার্গ নেই। এ প্রজন্মের কোনো শিল্পীর মন ছুঁয়ে যাওয়া গানও আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এমনও হয়, একটি গান শুনলে সেটি যদি ভালো লেগে যায়, সেই গানটিই বার বার শুনি। সেই তরুণ বয়সে শোনা ‘একডালি ফুল/তোমার হাতে দিয়ে আমি/বলেছিলাম ভালোবাসি/ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি/শুধু তোমাকে শুধু তোমাকে শুধু তোমাকে’-এমন হালকা মেজাজের গানও এ বয়সে শুনতে ইচ্ছে করে। এমনকি কাউকে শোনাতেও ইচ্ছে করে। অথচ এটা কি আমার জন্য মানানসই? অথচ বয়সটাতো এখন এমন, আনমনে বুকের মধ্যে চিনচিন ব্যথা হয়ে বাজবে, ‘এখন আমার বেলা নাহি আর, বহিব একাকী বিরহের ভার’। কিন্তু মন কিছুতেই মানতে তা চায় না।


আর প্রেমের কবিতা ও ভালোবাসার উপন্যাস আমাকে গভীরভাবে আপ্লুত করে। বিভোর করে দেয়। একটি উপন্যাস হৃদয় ছুঁয়ে গেলে তা শেষ করার পর তাৎক্ষণিকভাবে তা আমাকে ভীষণ ঘোরের মধ্যে রাখে। তার হ্যাংওভার কিছুতেই কাটিয়ে ওঠতে পারি না। একজন বনলতা সেন (বনলতা সেন/জীবনানন্দ দাশ), একজন মৃম্ময়ী (সমাপ্তি/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর) কিংবা নিদেনপক্ষে একজন ময়ূরাক্ষী (ময়ূরাক্ষী, তুমি দিলে/হর্ষ দত্ত) বুকের গভীরে যে সম্মোহন ছড়িয়ে দিয়েছে, সেই সম্মোহন আজও কাটিয়ে ওঠা গেল না, এ কারণে এমন চরিত্রের সঙ্গে মানানসই কাউকে দেখলে এখনও মনটা কেমন উচাটন উচাটন করে। কেউ জানলে কী ভাববে?


জোছনা রাতে বুকের মধ্যে তরুণ বয়সের মতো কেমন আকুলিবিকুলি করে। মনে হয়, নির্জন কোনো প্রান্তে দু’ হাত ভরে জোছনা মাখামাখি করি। লুটাপুটি করি। ইচ্ছে করে কারও হাত ধরে হেঁটে বেড়াই সবুজ ঘাসে। প্যান্টে লেগে যাক দুষ্টু চোরকাঁটা। কেউ একজন ঘনিষ্টভাবে পাশে বসে ভালোবেসে তুলে দিক এই চোরপুষ্পী। অকারণেই লজ্জাবতী গাছকে ছুঁইয়ে দিতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে খুব ভোরে শিশিরে সিক্ত করতে পা। ধুম বৃষ্টিতে ভীষণ ভিজতে ইচ্ছে করে। উড়ে যাওয়া প্রজাপতির পিছে পিছে ছুটে যেতে যায় অভিলাষী মন। ইচ্ছে করে রিক্সায় এলোমেলো ঘোরাঘুরি করি অচেনা পথে। বাসনা জাগে, কোনো ক্যাফেতে বসে থাকি প্রিয় কারও মুখোমুখি। গরম কফিতে চুমক দিতে দিতে খুনসুটি করি। এমন ইচ্ছে কি এই বয়সে শোভা পায়? আর মন যা চায়, তা কি বাস্তবে করা যায়? কে বোঝাবে অবুঝ মনকে? 


সুন্দরের প্রতি মুগ্ধতা আজও কাটলো না। এখনও অপোজিট সেক্সের কারো প্রতি সাবলীলভাবে তাকাতে পারি না। তারপরও ভিজাবিড়ালের স্বভাবটা যায় নি। যখন হঠাৎ চোখে পড়ে যায় সুচিত্রা সেনের মতো কোনো মুখ, মোনালিসার মতো এক টুকরো হাসি কিংবা নজর কাড়ার মতো কোনো সৌন্দর্য, তা না দেখে কি মুখ ফিরিয়ে নেওয়া যায়? এতটা ভদ্রলোক আমি কখনই ছিলাম না। চোরা চোখে হলেও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে হয়। বুকের মধ্যে তার রেশ দুলতে থাকে দুরন্ত ঢেউ হয়ে। অথচ বয়স তো এটা পারমিট করে না। এটাকে কি বলা যায় বুড়ো বয়সের ভীমরতি? 

এতগুলো বছর পেরিয়ে এলেও আজও চালাক-চতুর হতে পারলাম না। এটা তো বুঝতে পারি, যখন কেউ কেউ আমাকে বোকা ঠাওরায়। মনে করে, একে যা বলা হবে তাই বিশ্বাস করবে। সেটাই হয়ে আসছে। আজও কাউকে অবিশ্বাস করতে পারি না। বিশ্বাস করতে গিয়ে প্রতারিত হই। কতভাবেই না ধাক্কা খাই। তারপরও শিক্ষা নেওয়া হয় না। যে কারও কথায় সহজেই পটে যাই। যে কারও প্রতি সহজাতভাবে সহযোগিতার হাতটা বাড়িয়ে দিতে দ্বিধা করি না। প্রতিদানে সইতে হয় প্রত্যাখ্যান। হজম করতে হয় অপমান। এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট। অপমানটা একদমই মেনে নিতে পারি না। যা আমাকে রীতিমতো ক্ষত-বিক্ষত করে দেয়। বিমূঢ়, বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত করে দেয়। তারপরও বালকোচিত মনটাকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি না। পারি না বলেই কাউকে কিছু বলতে পারি না। পারি না প্রতিবাদী হয়ে ওঠতে। অল্প বয়সী বালকের মতো বুকের মধ্যে বয়ে বেড়াই অভিমান আর কষ্ট।
  
হম্বিতম্বি করতে না পারলে কোথাও নিজের অবস্থান সংহত করা যায় না। দুর্বিনীত হতে না পারলে, দুর্ব্যবহার করতে না পারলে, অসৎ না হতে পারায় গুরুত্ব, মর্যাদা ও সম্মান পাওয়া যায় না। উদ্ধত, অশিষ্ট ও অবিনয়ী হতে না পারায় কারও কাছেই পাত্তা পাওয়া যায় না। প্রতিবাদ করবো না জেনে অনেকেই মিথ্যা কথার ফুলঝুরি ছোটায়। মিথ্যা আশ্বাস দেয়। তথাকথিত ভদ্রতার খাতিরে সেটাই মেনে নিতে হয়। সেই শৈশবেই ভদ্রতার যে সবক পেয়েছি, সেটিকেই মনে করে এসেছি সারা জীবনের শিক্ষা। সেই শিক্ষাটা আমাকে নানাভাবে ভুগালেও তা পরিত্যাগ পারি না।

মনটা এখনও যে পেকে ওঠে নি, এটা গর্ব করে বলার মতো কিছু না। বরং আমার কাছে মনে হয়েছে, এটা ব্যর্থ জীবনের হাহাকার। নিজেকে দিয়ে এটা আমি ভালোভাবেই বুঝতে পারি। জন্মের পর এই ঢাকা শহরের বেড়ে ওঠা। আমাকে ঢাকার সন্তান বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। অথচ এত দিন বসবাস করার পরও ঢাকায় নিজস্ব কোনো ঠিকানা নেই। নিজস্ব বাহন নেই। এখনও দৌঁড়ে দৌঁড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওঠতে হয় ভাঙা বাস কিংবা মেজাজী রিক্সায়। আরো অনেক কিছুই নেই। বৈষয়িক পাওয়া না পাওয়ার সঙ্গে মনের কী সম্পর্ক, এমন প্রশ্ন ওঠতেই পারে। সম্পর্ক অবশ্যই আছে। বয়স বাড়লে, মনটা পরিপক্ক হয়ে ওঠলে, স্বার্থগত অর্থাৎ বৈষয়িক বুদ্ধিও সমানতালে বেড়ে যায়। বাড়ে সহায়-সম্পত্তি। অথচ সেই বালক বয়স না বাড়ার কারণে এই ঢাকা শহরে আজও অনিকেত হয়ে আছি। নিজের বুঝ নাকি পাগলেও বোঝে। সেই বুঝটুকু না হওয়াতে কিছুই করা হলো না। আর হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই।


এটা তো চোখের সামনে দিব্যি দেখতে পাচ্ছি, যার বাড়ি আছে, গাড়ি আছে, কথার ফুলঝুরি আছে, ক্ষমতার দাপট আছে, তাদেরই সমাদার বেশি। আর সমাদার কে না চায়? কিন্তু চাইলেও হবে না। কেউ তো আর হাত বাড়িয়ে কিছু দেবে না? তেমন আগ্রহও নেই। যদিও রাশির প্রতি আমার কোনো বিশ্বাস নেই। তবে রাশির কিছু কিছু পর্যবেক্ষণ জীবনের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমার রাশি নিয়ে লেখায় দেখতে পাই, ‘নেপচুনশাসিত মানুষগুলোর মধ্যে পার্থিব আকাঙ্খা তেমন একটা নেই। তাদের অধিকাংশের মধ্যেই পদবী, ক্ষমতা, নেতৃত্ব বা ধন-সম্পদের প্রতি তেমন কোনো আগ্রহ দেখতে পাবেন না। বিয়ের সূত্রে কিংবা উত্তরাধিকার সূত্রে না পেলে মীনদের মধ্যে কাড়ি কাড়ি টাকাওয়ালা মানুষ তেমন একটা নেই।’ রাশি অনুযায়ী ভাগ্য তো আমাকে এমনিতেই প্রবঞ্চিত করে রেখেছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধান্দা বাড়ার কথা থাকলেও সেটাও হয়ে ওঠে নি। তাহলে কীভাবে পাবো বিলাস-ব্যসনের চাবিকাঠি?

কিছু কিছু ইচ্ছে আছে, যা কখনও পূরণ হয় না। এই বয়সে হওয়ার কথাও নয়। তারপরও সেই ইচ্ছের দাস হয়ে আছি। ইচ্ছে করে প্রিয় কাউকে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে চিঠি লিখতে। আকাশী-নীল কাগজে মনের একান্ত কথা লিখে সব চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই চিঠি গোপনে পৌঁছে দিতে। পেতে ইচ্ছে করে প্রিয়জনের লিপস্টিক মাখানো গভীর-গোপন প্রণয়পত্র। সেটা কি আর সম্ভব? তা তো ঠাঁই নিয়েছে স্মৃতির পাতায়। স্মৃতিকে কি আর ফিরিয়ে আনা যায়? তবুও বোকা মন মানতে চায় না।


সাম্প্রতিককালের ফেসবুকে চ্যাটিং করে তো অন্তত দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যায়। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেকেও স্মার্ট ভাবতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে গভীরভাবে কারও প্রেমে পড়তে। যেভাবে প্রেমে পড়েছে উইলিয়ামের শেকসপিয়রের রোমিও-জুলিয়েট, এরিখ সেগালের লেখা ‘লাভ স্টোরি’ অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্রের রায়ান ও’নিল-অ্যালি ম্যাকগ্রা, ‘টাইটানিক’ ফিল্মের জ্যাক ডাওসন (লিওনার্দো ডি ক্যাপ্রিও)-রোজ ডেউইট বুকাতার (কেইট উইন্সলেট) কিংবা বলিউডের ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’-এর রাজ মালহোত্রা (শাহরুখ খান)-সিমরান সিং (কাজল)। এভাবে কি আমার পক্ষে প্রেমে পড়া সম্ভব? তাছাড়া আমি তো আমার হৃদয়টাকে জানি। কাউকে ভালোবাসলে বা কারও প্রেমে পড়লে তার মোহাচ্ছন্নতা কখনও কাটিয়ে ওঠতে পারবো না। এমন দুর্বল মন নিয়ে কারও প্রতি ঝুঁকে পড়লে সেটা কি সামাল দিতে পারবো? মোটেও না। হাল আমলের একটি কবিতার মতো,
‘আমি একবার কারও প্রেমে পড়লে সারাজীবন আর/
উঠতেই পারি না। সকলে কী সুন্দর উঠে পড়ে জামাটামা/
বদলিয়ে একেবারে হাতটাত মুছে...আমি সেই পড়ে/
থাকি!’ (প্রেমিক/সম্রাজ্ঞী বন্দ্যোপাধ্যায়)।

এমন মনোভাবাপন্ন হলে তো কষ্ট পেতেই হবে। তারপরও প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করে। নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের মতো যা যা ইচ্ছে করে, তা তা করতে চাই। কোনো কিছুই বাদ দিতে চাই না। এটা কি বয়সী কোনো মানুষের কথা হতে পারে? এমন মনোভাবের কথা জানলে যে কেউ বাঁকা হাসি হাসবেন। খারাপ ভাববেন। বকাও হয়তো দেবেন। তারপরও আমি নিরুপায়। আসলে মনের বয়স না বাড়লে আমি কী করতে পারি? মনটাকে তো বেঁধে রাখা যায় না। ইচ্ছেটাকেও তো আগল দিয়েও রাখার উপায় নেই। কেন জানি না, বয়স বাড়লেও আজও সাবালক হতে পারি নি। এই না পারাটা এই বয়সের সঙ্গে একদমই মানানসই নয়। কিন্তু আমি কী করতে পারি? তাই আক্ষেপ নিয়ে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো বলতে পারি, ‘সবার বয়স হয় আমার বালক-বয়স বাড়ে না কেন?’
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭


  

রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৬

যখন এ মনে প্রশ্নের ঝড়

শব্দ কিংবা বাক্যরা কখনো কি বুকের মধ্যে বরফের মতো জমাট বেঁধে যায়? অনুভূতি কি শূন্য হয়ে যায়? অনুভবের তার কি বাজে বেসুরো হয়ে? আমি ঠিক বুঝতে পারি না। এমন হচ্ছে কেন? কেমন যেন শব্দহীন, বাক্যহীন, অনুভূতিহীন, অনুভবহীন হয়ে পড়েছি। কিছুই যেন আমাকে স্পর্শ করছে না। সব কিছু কেমন যেন নিশ্চল, নিস্তব্ধ, নিস্তরঙ্গ হয়ে পড়েছে। চারপাশটা একদমই এলোমেলো হয়ে গেছে। এ জীবনে কত কত ঘটনা ঘটেছে। কাছের মানুষরা আঘাত দিয়েছেন। ভালোবাসার মানুষ অকারণেই দূরে সরে গিয়েছেন। প্রিয়জনরা অকালেই চলে গেছেন। সেই কষ্ট, সেই আঘাত, সেই শূন্যতা কখনোই কাটিয়ে ওঠা যায় নি। এখনও তার রেশ রয়ে গেছে। কিন্তু মনেরদুনিয়া এভাবে কখনও টালমাটাল হয় নি। এভাবে আমূল কেঁপেও ওঠি নি। যেন ভূমিকম্পে উলট-পালট হয়ে গেছে ভিতরভূমি। এটা কি মানবিক ভূমিকম্প? যে কারণে বদলে গেছে মনোজগত। বদলে গেছে চিন্তা-ভাবনা। বদলে গেছে জীবন। যদিও ঠিক সময়ে ঘুম থেকে ওঠছি, নির্ধারিত সময়ে অফিস যাচ্ছি, কাজও করছি। তারপরও নিজেকে খুঁজে পাচ্ছি না। নিজের কাছে নিজেকেই অচেনা মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেমন যেন শিকড়হীন হয়ে পড়েছি। কোনো কিছু গুছিয়ে ভাবতে পারছি না। লিখতে পারছি না। কী বোর্ডের সঙ্গে মস্তিস্কের সংযোগ ঘটাতেও পারছি না। অনেকগুলো দিন পেরিয়ে এসেছি। তারপরও যেন নিরালোক থেকেও বের হতে পারছি না। ‘নাইন ইলেভেন’ যেভাবে পাল্টে দিয়েছে দুনিয়াকে, তেমনিভাবে ‘সেভেন ওয়ান’ বাংলাদেশের মনোজগতে এঁকে দিয়েছে একটা বিভাজন রেখা। এই বাংলাদেশ যেন আর সেই বাংলাদেশে নেই।

মনের মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে নিরন্তর প্রশ্ন। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দোল খেতে হচ্ছে। সংশয় দেখা দিয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে। কাউকে যেন আর দ্বিধাহীনভাবে গ্রহণ করার সুযোগ নেই। দূরের মানুষরা তো বটেই, কাছের মানুষরাও বোধকরি এখন দূরের হয়ে গেছেন। বুকের মধ্যে কুরে কুরে খাচ্ছে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। ভয়ের একটা চোরাস্রোত সংগোপনে বয়ে চলেছে। পারিবারিক বন্ধনের ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছে দ্বিধা-দ্বন্ধ। পিতা, মাতা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী, পুত্র, কন্যার মধ্যে একটা ব্যবধান তৈরি করে দিয়েছে। একে অপরকে দেখছেন গোয়েন্দার দৃষ্টিতে। সবার নিভৃত জগতটা প্রশ্নহীনভাবে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। দায়, দায়িত্ব আর জবাবদিহির প্রশ্নে পাশ কাটিয়েও যাওয়া যাবে না। এ কেমন জীবনের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে?

সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে এত বড়  ফাটল দেখা দিয়েছে, সেটা এরআগে এতটা নগ্নভাবে বুঝতে পারা যায় নি। এটা তো আমরা অনুধাবন করতে পারছিলাম, ইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডয়ের কারণে নাগরিক জীবনে একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা আর বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়ছে। বাড়ছেও পারস্পরিক দূরত্বও। কিন্তু রক্ত সম্পর্কীয়রা যে এত অচেনা, এত দুর্বোধ্য, এত দূরে চলে গেছেন, সেটা যেন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে গুলশানে জঙ্গি হামলা। এমন হামলা হয়তো অপ্রত্যাশিত নয়। কারণ ইতোপূর্বে অনেক নৃশংস হামলাই আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু ১ জুলাই যেভাবে হামলা চালানো হয়, যেভাবে হত্যাকা- সম্পন্ন করা হয়, সর্বোপরি যাঁরা এই হামলায় অংশ নেন, পুরো প্যাকেজটি আমাদের চেনা ছকের একদমই বাইরে। প্রকৃতঅর্থেই দারুণভাবে চমকে দিয়েছে। ঘাবড়ে দিয়েছে। কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। এটি ছিল অভাবনীয়, অচিন্তনীয়, অবিশ্বাস্য। এত দিন দূরের পৃথিবীতে এমনটি হতে দেখেছি। সেটি যে নিজের সীমানায় এমনভাবে বিস্ফোরণ ঘটাবে, তারজন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আসলে বিশ্বায়নের এই যুগে কোনো কিছুকে দূরের ভাবার সুযোগ নেই। এড়িয়ে যাওয়াও যাবে না।

সুযোগ নেই গুলশান হামলাকেও এড়িয়ে যাবার। এটি বুঝিয়ে দিয়েছে আমরা কেউই আর নিরাপদ নই। সেটা ঘরের বাইরে তো বটেই। ঘরের ভিতরেও।
ঘরের বাইরে পা ফেলার সময় যেমন সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে, তেমনিভাবে ঘরের ভিতরেও অনুসন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তাকাতে হচ্ছে। এমনটি কখনো কল্পনা করা যায় নি। অবিশ্বাস, সন্দেহ আর সংশয়ের যে ভ্রুণ বুকের মধ্যে বেড়ে ওঠছে, তার থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী?
(১৩ জুলােই ২০১৬)।       

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

অলৌকিক নয়, চাই লৌকিক ক্ষমতা


ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ বাহিনীর আগ্রাসন ও দখলদারিত্বে আমাদের একরৈখিক চিন্তার পুকুরে যেন আচানক ঢিল পড়েছে। তরঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়েছে চিন্তাস্রোত। এতদিন যুক্তিহীনভাবে যে আস্থা ও বিশ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠেছি, তা যেন হঠাৎ আমাদের মর্মমূল আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছে। আমরা যে সত্যকে পরম নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় বুকের মাঝে লালন করে এসেছি, তা যে এভাবে মিথ্যে হয়ে যাবে, তার জন্য আমরা অনেকেই মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। শুধু সমৃদ্ধ সভ্যতার কারণেই নয়, আধ্যাÍিকতার দিক দিয়েও পুণ্যভূমি ইরাক। এককালের মেসোপটেমিয়ায় শায়িত আছেন যারা মনুষ্যত্বের গান গেয়েছেন, মানব জীবনের মহিমা ও মানুষের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়েছেন এবং সত্য ও ন্যায়ের পথে পথ-প্রদর্শক হয়েছেন- সেসব আধ্যািত্মক, বুজুর্গ ও বরেণ্য ব্যক্তিত্বরা। এই মহামানবদের কেউ কেউ অপরিসীম জ্ঞান, সমুচ্চ মর্যাদা, দূরদৃষ্টি, সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তি, উন্নত মানবতাবোধ, সাহস, ধৈর্যশক্তি, অতুলনীয় শারীরিক বল, অফুরন্ত মনোবল, রণ-নিপুণতা এবং কখনো-সখনো আধ্যািত্মক ও অলৌকিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের হৃদয়-মন জয় করার পাশাপাশি এমন সব অসম্ভব কীর্তি দিয়ে সবাইকে বিস্ময়াভিভূত করেছেন, যে কারণে তারা চিরস্মরণীয় ও কিংবদন্তী হয়ে আছেন। মুসলমানদের পুণ্যতীর্থ এবং বিশ্বের তাবৎ মানুষের কাছে সভ্যতার পাদপীঠ হিসেবে বিবেচিত ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ বাহিনী যখন আগ্রাসন চালানোর হুমকি-ধমকি দিতে থাকে, তখন বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিম ধর্মানুরাগীরা এক প্রকার ধরেই নেন, আগ্রাসী শক্তির পক্ষে ইরাকে নাক গলানো সম্ভব হবে না। সব নিয়ম-নীতি লংঘন করে যৌথ বাহিনী ইরাকের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেও ধর্মানুরাগীদের অটল বিশ্বাসে একটুও টাল খায়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য শক্তির দিক দিয়ে যতই অপ্রতিদ্বন্দ¡ী হোক না কেন, সবার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আগ্রাসী বাহিনীর পক্ষে ইরাককে কাবু করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাদের বিশ্বাসের ভিত্তিমূল ছিল, ইরাকি জনগণের জিহাদি মনোবল, আধ্যাÍিক চেতনা এবং অতীতের সেইসব অলৌকিক কাহিনী- যা বুকের মাঝে অটল পর্বতের মতো চিরঞ্জীব হয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে শিক্ষিত-অশিক্ষিত অধিকাংশ মানুষের মনে এমন একটা ধারণা বা বিশ্বাস গেড়ে বসে আছে- আরব ভূমিতে আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব করতে আসলে হামলাকারীরা হার মানবে আধ্যাÍিক ও অলৌকিক শক্তির কাছে। এমন একটা বিশ্বাস থেকে তাদের মনে এই প্রতীতী সৃষ্টি হয় যে, ইরাককে কখনোই পরাধীন করা যাবে না। এ কারণে যুদ্ধের শুরু থেকেই অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অধিকাংশ পত্র-পত্রিকা মানুষের সস্তা আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিভ্রান্ত করার পথ বেছে নেয়। এতে হয়তো পত্র-পত্রিকার কাটতি বেড়েছে; কিন্তু নষ্ট হয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতা। বিবিসি, সিএনএনসহ পাশ্চাত্য মিডিয়ার একতরফা প্রচারণায় তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও অনেকখানি ম্লান হয়ে যায়। মিডিয়ার তথ্য পরিবেশনের মূল কথা হচ্ছে- বস্তুনিষ্ঠতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। কারো পক্ষাবলম্বন না করে উভয় পক্ষের ঘটনা ও বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরা। এমনটি না করায় পাশ্চাত্য মিডিয়া তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও ভাবমূর্তি হারিয়েছে। যে কারণে কিছু কিছু ঘটনা অতিরঞ্জনের পাশাপাশি অনেক সত্য ঘটনা তুলে ধরলেও তা দর্শক ও পাঠকদের আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে পাশ্চাত্য মিডিয়ার একপেশে ভূমিকায় ক্ষোভ ও বিক্ষোভ- দুই-ই হয়েছে। কিন্তু তাদের কাউন্টার করতে যেয়ে বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলোর ভূমিকাটাইবা কেমন ছিল? এ প্রশ্নটি সঙ্গত কারণে ওঠাই স্বাভাবিক। মার্কিন-ব্রিটিশ আগ্রাসনের শুরু থেকেই বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকাগুলো এমন একটা ধারণা দিতে থাকে যেন ইরাকের মাটি দুর্জয় ঘাঁটি বুঝে নেবে দুর্বৃত্ত। আট কলাম শিরোনামে যেসব ব্যানার হেডিং করা হয়েছে, তাতে ইরাকের ছোট-খাট সাফল্যকে এমনভাবে তুলে ধরা হয়েছে, তাতে মনে হয়েছে মার্কিন বাহিনী মোটেও সুবিধা করতে পারছে না। তারা ক্রমাগত পিছু হটছে। আতংকে ভুগছে। অস্ত্র ফুরিয়ে বিপদে আছে- ইত্যাদি। এমনকি কিছু কিছু ঘটনায় কাল্পনিক, আধা-কাল্পনিক, আধ্যাÍিক ও অলৌকিকতার মিশেল দিয়ে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, মানুষ তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। ভেবেছে ইরাকের মাটি বুঝিবা সত্যি সত্যি দুর্জয় ঘাঁটি।


যুদ্ধকালীন সময় ‘মরুঝড়’ শুরু হলে তাকে কেন্দ্র করে এমনভাবে মহিমা প্রচার করা হয়, মরুঝড়কে সবাই অলৌকিক শক্তির আধার হিসেবে মনে করতে থাকে। এই রোমাঞ্চকর ও জিহাদি জোশে সংবাদ পরিবেশনে বাংলাদেশের পাঠকরা আকৃষ্ট ও টগবগিয়ে ফুটলেও ইরাকিদের বিন্দুমাত্র লাভ হয়নি। বরং বলা যায়, তেমন কোনো শক্তিশালী প্রতিরোধ ছাড়াই মাত্র ২০ দিনে ইরাক আগ্রাসী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তারা এখন জুলুম ও জবরদস্তি চালাচ্ছে, তাতে বিশ্ব বিবেক কেঁপে উঠলেও এ জন্য তাদের বিন্দুমাত্র কৈফিয়ৎও দিতে হচ্ছে না। মানুষ যে অলৌকিক আশা নিয়ে প্রহর গুনেছিল, তা আর সত্য হয়নি। এতে কি পত্র-পত্রিকা বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা হারায়নি? আসলে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম দেশের মানুষকে এখনো আবেগাক্রান্ত করে ইয়েমেনের অমুসলিম বাদশাহ আব্রাহামের হস্তি বাহিনী দিয়ে পবিত্র কাবা শরীফ দখল করতে এসে ঝাঁকে ঝাঁকে আবাবিল পাখির ছোট ছোট প্রস্তরখণ্ডে বিপর্যস্ত ও পরাজিত হওয়া, মিসরের বাদশাহ ফেরাউনকে লোহিত সাগরে অলৌকিকভাবে ডুবিয়ে মারা ইত্যাদি। আসলে ইতিহাসের সেসব অলৌকিক ঘটনা আমাদের পথ দেখালেও এর কী তাৎপর্য- তা সঠিকভাবে অনুধাবন না করে শুধু শুধু কল্পনায় অসাধ্য সাধন করার কোনো মানে হয় না। তাতে কোনো লাভ হয় না অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে গুলিয়ে ফেললে। দশক, শতক কিংবা সহস্র বছর আগে যে ঘটনা বা প্রেক্ষাপট বিরাজ করেছে, বর্তমানে বিশ্ব ব্যবস্থায় তার কতটুকুইবা তাৎপর্য আছে? সত্য কথা বলতে কী আধ্যাÍিকতা বা অলৌকিকত্ব দিয়ে কিছু অর্জন করা আদৌ সম্ভব কিনা- সে প্রশ্নটি কাল থেকে কালান্তরে মানুষের মনে অন্তহীন কৌতূহল হয়ে আছে। তাছাড়া ইরাকের জন্য বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা ও শুভ কামনায় একটুও কি টলেছে বুশ ও ব্লেয়ারের কঠিন হৃদয়? যদি তাই হতো তাহলে ইরাককে এভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে হয় না। দেখতে হয় না আগ্রাসী বাহিনীর বিকৃত উল্লাস। আরব বা ইসলামের ইতিহাস শুধু আধ্যাÍিকতা ও অলৌকিকত্ব প্রদর্শনের ইতিহাস নয়। কেউ কেউ যুগে যুগে আধ্যাÍিকতা ও অলৌকিকত্ব নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এর মহিমা প্রচার করে এসেছেন। মানুষকে সহজ প্রলোভনে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। এতে কার কি লাভ হয়েছে জানি না, তবে আড়ালে পড়ে গেছে আরব ও মুসলমানদের জ্ঞান চর্চার বিকাশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, অধ্যয়ন, গবেষণা, দর্শন, বিচক্ষণ, দূরদর্শিতা, বীরত্ব ও সাহসিকতা। আজকের নতুন বিশ্ব ব্যবস্থায় ও বিশ্ব বাস্তবতায় যারা দুর্বল, নির্যাতিত ও পরাধীন, তাদের ভাবনার দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চয়ই পাল্টে যাবে। আত্মরক্ষা ও আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে কারো অনুগ্রহ ও আশ্রিত হয়ে স্বাধীনভাবে বসবাস করা যাবে না। এ জন্য জ্ঞান-গরিমায়, মেধায়-পা-িত্যে এগিয়ে আসতে হবে। সময় তো কখনো থমকে থাকে না। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। এক সময় মুসলমানদের প্রবল দাপট ছিল। তা নিশ্চয়ই শুধু আধ্যাÍিকতা ও অলৌকিকত্ব দিয়ে অর্জিত হয়নি। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-গরীমায়, শক্তি-সামর্থ্য, কৌশল-কূটনীতি দিয়ে তারা শাসন করেছে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর আবির্ভাবের ফলে আরবের বুকে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিল, তার অভিব্যক্তি এভাবে ব্যক্ত করেছেন মনীষী টমাস কার্লাইল : কমর্ দণ ইরটঠ ভর্টধমভ র্ধ ষট্র ট ঠধর্রদ তরমব ঢটরপভণ্র্র ধর্ভম ফধথর্দ, ইরটঠধট তর্ধর্র ঠণডটবণ টফধশণ ঠহ বণটভ্র মত র্ধ. এই যে অন্ধকার থেকে আলোকের রাজ্যে উত্তরণ তা তো এমনি এমনি হয়নি। তিনি মানবিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, অহিংসা, সাহস ও ভালোবাসা দিয়ে মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি, ভালোবাসা ও আনুগত্য অর্জন করেছিলেন। তারপরের ইতিহাস ইসলামের এগিয়ে চলার ইতিহাস। সব সময় চলার পথ যে মসৃণ ছিল তা নয়। স্বার্থের হীন ষড়যন্ত্র, কায়েমী স্বার্থের চক্রান্ত বা নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকের মাঝেও ইসলামের শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবতার পতাকা উড়িয়েছেন হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত ওমর (রাঃ), হযরত উসমান (রাঃ), হযরত আলী (রাঃ), উমাইয়া বংশ এবং ইসলামের গৌরব ফলে-ফুলে আরো বিকশিত হয়ে ওঠে স্পেনে। সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞানের অগ্রগতি বিশ্বকে মুগ্ধ করে রেখেছিল। এ কারণে স্পেনকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ইউরোপ জয় ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে। শৌর্য-বীর্যে একসময় আরবরা ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। স্পেনে মুসলমানরা প্রায় ৭৫০ বছর রাজত্ব এবং আধুনিক ইউরোপের বিকাশ ঘটান। গ্রিক ও রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর মুসলিম অধ্যুষিত স্পেন ছিল গোটা ইউরোপের প্রাণকেন্দ্র। স্পেনে মুসলমানরা যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোক-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, তা-ই কালের প্রবাহে উন্নত হয়ে ইউরোপীয় মনীষীগণকে জগতসভায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। এ সময় আরব ও ইউরোপীয় সভ্যতার সংযোগে এক উন্নত সভ্যতার সৃষ্টি হয়। স্পেনে দরিদ্র ও দুর্দশাগ্রস্ত নাগরিক, হতভাগ্য ক্রীতদাস, দৈন্য-প্রপীড়িত ভূমিদাস এবং উৎপীড়িত ও অত্যাচারিত সবাই মুক্তির অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। এ সময় মুসা ইবনে নাসের আফ্রিকা শাসন করছিলেন। স্পেন ও পর্তুগালের সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন রডারিক। রডারিকের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে স্পেনবাসী আফ্রিকান শাসক মুসার শরণাপন্ন হন। দামেশকে খলিফা ওয়ালিদের রাজত্বকালে ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আফ্রিকায় গভর্নর মুসা ইবনে নাসেরের অধীনস্থ সেনাপতি মহাবীর তারিক ইবনে জায়াদ একদল আরবি ও নবদীক্ষিত ফৌজসহ দক্ষিণ স্পেনের একটি অংশ আক্রমণ করেন। যুদ্ধে জয়লাভ করে তারিক স্পেনের শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। এই বাহিনী আরো অগ্রসর হয়ে ফ্রান্স পর্যন্ত অগ্রসর হয়। তবে ফ্রান্স জয় করা সম্ভব হয়নি। ৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের রাজধানী কর্ডোভা দখল করে স্বাধীন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমান আফ্রিকা ও ইউরোপ মহাদেশের বিরাট এলাকাজুড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটান। তার বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বত্র ছিল শান্তি এবং প্রজাদের বিভিন্ন উন্নতি হয়েছিল। তার রাজধানী কর্ডোভা ছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতিসমৃদ্ধ এবং ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ নগরী। ইউরোপীয় জাতিগুলোর নব-জাগরণের জন্য তিনিই প্রথম দরজা খুলে দেন। তবে আব্দুর রহমানের পর বংশানুক্রমে হিশাম, হাকাম ও দ্বিতীয় আব্দুর রহমান সিংহাসনে আরোহণ করেন। দ্বিতীয় আব্দুর রহমানের রাজত্বকালে স্পেনের প্রভূত উন্নতি, রাজধানী কর্ডোভা অপরূপ সৌন্দর্য লাভ করে। রাজ্যের সর্বত্র সুন্দর সুন্দর বাগান, সুপ্রশস্ত রাস্তা, সুদৃশ্য ইমারত গড়ে উঠেছিল। কর্ডোভার রাজ-দরবার ছিল তৎকালীন ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান-কেন্দ্র, উন্নত ও মার্জিত সভ্যতা, আদব-কায়দা এবং রীতি-নীতির মিলনস্থল। খলিফা তৃতীয় আব্দুর রহমানের সময় সেখানে মুসলিম শক্তি অত্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং ইউরোপে মুসলমানদের প্রভাব বেড়ে যায়। কনস্ট্যান্টিপোল, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির সম্রাটগণ তার দরবারে দূত প্রেরণ করে সখ্য স্থাপন করেন। তিনি যেমন সামরিক শক্তিতে গরীয়ান ছিলেন, তেমনি বিদ্যাবত্তা ও গুণ-গরিমার কদর করতেন। তার আমলেই স্পেন সর্বাপেক্ষা সৌন্দর্যম-িত হয়ে ওঠে। অতুলনীয় শোভামণ্ডিত প্রাসাদ নির্মাণসহ অসংখ্য অবকাঠামো গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে দুর্বল শাসকদের কারণে স্পেনে অনেকগুলো স্বাধীন ক্ষুদ্র রাজ্য সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে গ্রানাডা ছিল সর্বোত্তম। কিন্তু অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দুর্বল শাসন ব্যবস্থা ও অদূরদর্শিতার কারণে ইউরোপ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায়। এমনকি আটশত বছরে তারা যেসব কীর্তি গড়েছিলেন, তার নাম-নিশানা একে একে সবই মুছে ফেলা হয়। স্পেন থেকে বিতাড়িত হয়ে মুসলিম সভ্যতার শেষ আশ্রয় হয় গ্রানাডায়। মুসলমানরা গ্রানাডায় দু’শ বছর রাজত্ব করেছিলেন। এ সময় তিলে তিলে গড়ে তোলা হয় গ্রানাডাকে। প্রস্রবন, কুঞ্জবন ও পুষ্পরাজি সমম্বিত একটি বিস্ময়কর সৌন্দর্য ও বিলাস-ব্যসন ছাড়াও সব দিক দিয়েই গ্রানাডা ছিল পরিপূর্ণ। গ্রানাডার বিপরীত দিকে একটি পর্বত চূড়ায় চল্লিশ হাজার লোকের বসবাসের জন্য যে দুর্গ বা নগরী নির্মাণ করা হয়েছিল, বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিত সৈয়দ আমীর আলী তার ‘আরব জাতির ইতিহাস গ্রন্থে’ যে বর্ণনা দিয়েছেন- তা হলো এমন : সুউচ্চ চূড়া, দুর্গ ও প্রাসাদ, সূক্ষ্ম ও সুশ্রী স্থাপত্য, মনোরম বারান্দা ও স্তম্ভ, চাকচিক্যময় বিভিন্ন বর্ণের গম্বুজ ও ছাদ- যার প্রাথমিক চাকচিক্য এতটুকু নষ্ট হয়নি, পার্শ্ববর্তী উদ্যানের সুগন্ধি আসতে পারে- এরূপভাবে প্রস্তুত বাতাস ভরা হলঘরগুলো; এর অসংখ্য ঝর্নাধারা, পানিকে ইচ্ছানুরূপ উচ্চ বা নিচ, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, কখনো বাতাসে নিক্ষিপ্ত, আবার কখনো এমনভাবে বৃহৎ লম্বালম্বি খণ্ডে বিস্তৃত করা যেত যে এতে দালান, ঝরণা ও পরিষ্কার নীল আকাশ প্রতিফলিত হতো- মনোরম আরবি লতাপাতা, চিত্রকলা ও পাথরের কারুকার্য এমন যত্ম ও নির্ভুলভাবে সম্পাদিত ও ক্ষুদ্রতম প্রকোষ্ঠটিও মনোমুগ্ধকর এবং সোনালী, প্যাস্টল, হালকা নীল ও কৃষ্ণাভ বেগুনী প্রভৃতি বর্ণে আলোকিত হতো, বিভিন্ন প্রতিকৃতি ও বর্ণের চীনা কারুকার্যবিশিষ্ট দেয়ালে মনোরম নিম্নাংশ, সুন্দর সিংহপ্রসাদ ও এর ১২৮টি সরু ও সুচারু স্তম্ভবিশিষ্ট নিভৃত প্রকোষ্ঠ, এর নীল-সাদা শানে, লাল, নীল ও সোনালী রংয়ের সমন¦য়, কাশ্মীরী শালের নকশার ন্যায় উজ্জ্বল বর্ণের আরবি লতা-পাতা, এর খিলানের ওপর মনোরম মার্বেল পাথরের কারুকার্য, এর সুরম্য গম্বুজগুলো, এর মধ্যস্থলে অবস্থিত বিখ্যাত শ্বেত প্রস্তরের বাটি, মনবিমোহিনী সঙ্গীত প্রকোষ্ঠ- যেখানে দরবারে বসে ওপরের মঞ্চস্থ গায়কদের সঙ্গীত শ্রবণ করা হতো, মনোরম অন্তঃপুর এবং এর সূক্ষ্ম ও সুশ্রী পিতলের জাফরি কারুকার্য, অপূর্ব সুন্দর ছাদ এবং বৃহদাকার কামরাগুলো চুনের কাজের ও ক্ষুদ্রকায় প্রকোষ্ঠের মোচাকৃতি রেখার চমৎকার বর্ণ। শুধু শৌর্য-বীর্য, বীরত্বে-সাহসিকতায় মুসলমানরা সাফল্যের পরিচয় দেয়নি। একই সঙ্গে রসায়ন ও দর্শন, জ্যোতিষ, চিকিৎসা, কাব্যচর্চা, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্থাপত্য, অংক শাস্ত্রসহ সভ্যতার নানা দিকে আলোর মশাল জ্বালিয়েছেন। ইরাক, মিসর, তুরস্কের সভ্যতার যে উজ্জ্বল নিদর্শনের পাশাপাশি লিপি আবিষ্কার, সাংকেতিক অংক চিহ্ন, সাল গণনা করার পদ্ধতি অথবা মাস নির্ধারণ করার উপায় বের করা হয়। সুমেরীয় সভ্যতায় রাজা হামবুরি যে আইন প্রণয়ন করেন, তা ছিল কঠোর; তবে উন্নত সভ্যতার পরিচায়ক। শক্তিশালী রাজ্য নেব্যুক্যাডনেজার ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যান তৈরি করেন। নীল নদের অববাহিকায় গড়ে ওঠে মিসরীয় সভ্যতা। মিসরীয়রা মনের কথা ব্যক্ত করার জন্য হাইয়ারোগ্লিফ আবিষ্কার করে। এক এক রকম সাংকেতিক লিপি। লেখার জন্য বিদেশি কালিও তারা তৈরি করেছিল। জমিতে পানি দেয়ার জন্য খাল কেটে চাষের ব্যবস্থা করা হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগের শহর বাগদাদ বেড়ে উঠেছিল দজলা নদীর তীরে। দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আল মনসুরের শাসনামলে বাগদাদ হয়ে ওঠে মুসলিম বিশ্বের বাণিজ্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। মুসলিম বিশ্বের হাজার হাজার স্থাপত্যবিদ, দক্ষ কারিগরকে লাগানো হয় শহরটির জাঁকালো প্রাসাদ, প্রসিদ্ধ মসজিদ ও রূপকথার বাগানগুলো গড়ে তোলার কাজে। সব দিক দিয়ে সমৃদ্ধির উৎকর্ষ অর্জন করে বাগদাদ। যে ইসলামী পণ্ডিত সভ্যতা ও জ্ঞানের মশাল জ্বালিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- আল বিরুনী, আল ফারাবী, ঈমাম গাজ্জালী, ইবনে সিনা, ইবনে রুশদ, ইবনে খালদুন, ওমর খৈয়াম, জালালউদ্দিন রুমী, জাকারিয়া আল রাজী প্রমুখ। ইতিহাসের পেছনে ফিরে তাকানোর উদ্দেশ্য হলো, একসময় যে দেশগুলো সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, বীরত্বে বিশ্বের সেরা দেশে পরিণত হয়েছিল, ইউরোপে নিয়ে এসেছিল রেঁনেসা, সে দেশগুলো এখন ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে আরব দেশগুলো এখন পাশ্চাত্যের অলিখিত উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্প-সাহিত্যে, স্থাপত্যে, এমনকি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিক দিয়েও তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নিজেদের সম্পদের ব্যবহার করার মতো যোগ্যতা ও ক্ষমতা নেই বললেই চলে। যে তেল সম্পদের ওপর আরব দেশগুলোর চাকচিক্য ও জেল্লা, তার নিয়ন্ত্রণ ক্রমান্বয়ে পশ্চিমাদের হাতে চলে যাচ্ছে। যে জন্য লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে গেলেও তাদের কোনো বোধোদয় হচ্ছে না। কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও স্বৈরশাসন কায়েম করে জনগণকে ধর্মের আফিম গিলিয়ে রাখা হয়েছে। ক্রমান¦য়ে তারা পরাধীন হয়ে যাচ্ছে।


সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন সেনারা ঘাঁটি গেড়েছে। আরব জাতি আজ দ্বিধা-বিভক্ত। আর এ সুযোগেই ইরাক দখল করে নেয়া হয়েছে। অথচ এ নিয়ে কোনো আরব বা মুসলিম দেশের কোনো ক্ষোভ বা বিকার আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। সবকিছুতেই ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। আরবরা তো বটেই, এমনকি বিশ্বের প্রতিটি ইসলামী দেশের চিন্তা-ভাবনাটা এমন : একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তারা যেন অলৌকিক কিছুর আশায় বসে আছে। অথচ ইউরোপীয় দেশগুলো ক্রমশ ধাপে ধাপে সর্বোচ্চ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য আগ্রাসন, জবর দখল ও অস্থিতিশীল করার নেপথ্যে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর তেল সম্পদ করায়ত্ত করাটাই একমাত্র অন্যতম লক্ষ্য নয়। ইসরাইল নামক যে বিষফোঁড়া তারা তৈরি করেছে তাকে আরো হৃষ্টপুষ্ট করাটাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। যেসব দেশকে পরাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার মধ্যে ইসরাইলের বিষয়টি আড়াল করে রাখা হয়। অথচ গোপনে গোপনে ইসরাইল ইতোমধ্যে পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা জাতিসংঘের সব নির্দেশ অমান্য করা ছাড়াও যেভাবে মারণাস্ত্র ও পারমাণবিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে উঠেছে, তাদের মুখোমুখি হওয়া যে কোনো দেশের জন্য এখন রীতিমত দুঃস্বপ্ন। আরব দেশগুলো এতদিনে এ বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। তারা জানে, ইসরাইলকে রুখতে না পারলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। এ কারণে আরব দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে ব্যাপক মারণাস্ত্র অস্ত্র বিধ্বংসী অঞ্চল ঘোষণা করতে জাতিসংঘে প্রস্তাব আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিরিয়ার উত্থাপিত এ প্রস্তাবটি নিঃসন্দেহে একটি চমৎকার কৌশল। কেননা, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হলে ইসরাইলকে তার যাবতীয় বিধ্বংসী অস্ত্র ধ্বংস করতে হবে। যদিও এ প্রস্তাব কার্যকর সম্ভব হবে না; কিন্তু কূটনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে এমন একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারাটায় বোঝা যায় আরব জাতির জ্ঞানের ভাণ্ডার একদমই শূন্য হয়ে যায়নি। আরব ও মুসলমানদের ঐতিহ্যের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ফিরিয়ে আনতে হলে অলৌকিক কিছুর আশায় বসে থাকলে চলবে না। এ জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিক্ষা-দীক্ষায়, সভ্যতায়, আত্মসম্মানে গরীয়ান হতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য এখন থেকেই নিজেদের তৈরি করা প্রয়োজন। যেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নামক ড্রাগনের খপ্পরে পড়ে সবকিছু বিলীন হয়ে যাচ্ছে, তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এ জন্য নিজেদের সীমিত সামর্থ্যরে পাশাপাশি কৌশল প্রয়োগ করে আস্তে-ধীরে এগিয়ে যেতে হবে। দেশের মাটিতে মেধা ও প্রতিভার সর্বোচ্চ বিকাশ সম্ভব না হলে প্রয়োজনে পাশ্চাত্যের শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করে নিজের দেশের জন্য উৎসর্গীত-প্রাণ হতে হবে। এখন শুধু মারণাস্ত্রের সামনে বৃথাই জীবন দিয়ে ‘শহীদ’ হওয়ার চেয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানে, বীরত্বে ও সাহসিকতায় এগিয়ে যেতে হবে। গোপনে গোপনে পারমাণবিক অস্ত্রে সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে উত্তর কোরিয়াকে ঘাঁটাতে যুক্তরাষ্ট্রকে হাজারবার চিন্তা করতে হচ্ছে। কেননা,উত্তর কোরিয়া সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্র নয়। অনুন্নত দেশগুলোকে উত্তর কোরিয়ার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান ও সামরিক শক্তিতে স্বনির্ভরশীল হয়ে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে হবে। তাহলেই কেবল মাথা উঁচু করে আÍসম্মান নিয়ে পৃথিবীতে বসবাস করা যাবে। নতুবা বেছে নিতে হবে গোলামির জীবন- যে জীবন ‘মৃত’ ও অভিশপ্ত।

দৈনিক বাংলাবাজার : ৮ জুলাই ২০০৩

শিক্ষা কি কেবল এলিট শ্রেণীর জন্য?


কোনো তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে না গিয়েও বলা যায়, বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা দুটি শ্রেণীতে বিভক্ত। একদিকে নিম্নবিত্ত, অন্যদিকে বিত্তশালীরা। অবশ্য কোনো সমাজ ব্যবস্থাই একক কোনো কাঠামোর উপর দাঁড়িয়ে নেই। একটা ব্যবধান সব সময়ই বিরাজমান। কিন্তু বাংলাদেশের মতো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যে তীব্র ফারাক গড়ে উঠছে, তা অবশ্যই আশঙ্কাজনক। যারা গরিব, তারা আরো গরিব হচ্ছে, আর ধনীরা অর্থ-বিত্তে আরো ফুলে-ফেঁপে উঠছে। শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা অনেকটা কাঁঠালের আমসত্ত্ব হলেও ভারসাম্যহীনতা ও ব্যবধান ক্রমশ বাড়তে থাকলে সে সমাজ কাঠামো কখনো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোয় যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে, তার অন্যতম কারণ এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। শুরু থেকেই এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি গলদ রয়ে গেছে। সময় সময় শিক্ষা কাঠামো বদলেছে। বদলটা হয়েছে উপরি কাঠামোয়। সত্যিকার অর্থে কোনো বদল হয়নি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থাটা প্রধানত সচ্ছল শ্রেণীর আওতাভুক্ত। ব্রিটিশরা এ দেশে যে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে, তার সুফল পেয়েছে এ দেশে বসবাসরত ব্রিটিশ পরিবারের সন্তান, নবাব পরিবার এবং ব্রিটিশদের সঙ্গে সম্পৃৃক্ত এক শ্রেণীর পরগাছা। দেশভাগের পর পাকিস্তান আমলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকদের বিবেচনা করা হয় দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে। এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে উপেক্ষা করার মাধ্যমে দারুণভাবে অবহেলা দেখানো হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন হলেও শিক্ষা-দীক্ষায় খুব বেশি এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে মাছিমারা কেরানি গোষ্ঠী। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষাক্ষেত্রে পরিবর্তনের তেমন হাওয়া লাগেনি। বরং ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ককটেল তৈরি হয়ে একটা আজব কিসিমের শিক্ষা ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে। যুগোপযোগী কোনো শিক্ষানীতি না থাকায় বিশ্ব ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা ক্রমান¦য়ে পিছিয়ে পড়ছি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে একটা বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। আর এ বৈষম্যের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিন ভাগে বিভক্ত : ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা মিডিয়াম ও মাদ্রাসা শিক্ষা। ইংরেজি মিডিয়াম শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ালেখা করে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়ালেখা করে বাংলা মিডিয়ামে। তবে এক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের মধ্যেও পার্থক্য বিদ্যমান। নিম্নবিত্তদের প্রধান অবলম্বন মাদ্রাসা শিক্ষা। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি, বেসরকারি, ধর্মীয়সহ বিভিন্ন ধরনের যে ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, তা শ্রেণীগত ব্যবধান ও বৈষম্যকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েরাও অনেক পিছিয়ে আছে। পুরনো ঐতিহ্য ও পশ্চাৎপদ মন-মানসিকতার কারণে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে ব্যবধান গড়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে শিক্ষার খাত খুব বেশি উন্নত নয়। বাংলাদেশের শিক্ষার আনুমানিক হার ৩৫ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষ ৫২ শতাংশ এবং মহিলা ২৯ শতাংশ। অন্যান্য নিম্ন আয়ের দেশের তুলনায় এ হার খুবই কম। অন্যত্র এই হার ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশে জিএনপির ২ দশমিক ২ শতাংশ ব্যয় হয় শিক্ষা খাতে। গড়পড়তা আয়ের দেশগুলো এ খাতে ব্যয় করে ৩ দশমিক ২ শতাংশ। উচ্চ আয়ের দেশগুলো শিক্ষা খাতে ৬ শতাংশ ব্যয় করে। বাংলাদেশের গ্রামীণ এলাকার ৪০ শতাংশ শিশু কখনোই স্কুলে যায় না। যারা যায়, তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশ প্রাথমিক স্কুলের গ-ি অতিক্রম করে। মাত্র ৭ শতাংশ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। দেশের অধিকাংশ প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেহাল অবস্থা। ছাত্র-ছাত্রীদের বসার মতো পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। শিক্ষা উপকরণের দারুণ সংকট। ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক স্কুলে ক্লাস করা সম্ভব হয় না। বর্ষাকালে তো অনেক স্কুল ডুবে যায়। খেলার মাঠ অল্প কিছু স্কুলে নামকাওয়াস্তে থাকলেও পাঠাগারের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। দেশের প্রায় ৫৫ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও জেলা শহরের স্কুলগুলোকে বাদ দিলে অধিকাংশের অবস্থাই শোচনীয়। সর্বজনীন ও মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা এখন অবধি নিশ্চিত করা যায়নি। শিক্ষার প্রাথমিক ভিতটা গড়ে ওঠে নিচের পর্যায়ে। প্রাথমিক অবস্থা যেখানে মোটেও আশানুরূপ নয়, সেখানে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অবস্থা খুব বেশি আশাব্যঞ্জক হওয়ার কথা নয়। প্রায় ১২ হাজার মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হালও সুবিধাজনক নয়। স্মাতক পর্যায়ের কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। চলতি শিক্ষা বছরে শিক্ষার্থীর অভাবে স্মাতক ও স্মাতকোত্তর পর্যায়ের কলেজগুলোতে প্রায় সোয়া লাখ আসন শূন্য থাকবে। একজন ছাত্র নিয়েও কোনো কোনো কলেজ চলছে। গ্রামাঞ্চলে এ চিত্র বেশি দেখা যায়। শিক্ষা পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে এখন ১০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, ৪২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৫০টি স্মাতক (সম্মান) পর্যায়ের কলেজ রয়েছে। এছাড়া রয়েছে ১১৬০টি কলেজ, ১৩টি সরকারি মেডিকেল কলেজ, ৪টি বিআইটি কলেজে। সব মিলিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসনের সংখ্যা ২ লাখ ৬০ হাজার। গতবছর ভর্তির যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৮১৮ জন। ৫ হাজার শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে যায়। চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংখ্যা শূন্য থাকবে ১ লাখ ১৪ হাজার ২৮২টি। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, ছাত্র-ছাত্রী না থাকলেও স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি ও রাজনৈতিক কারণে নামমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। এতে অপচয় হচ্ছে সরকারি অর্থের। সরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার মান দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। জবাবদিহিতার অভাব, বিনিয়োগে ভারসাম্যহীনতা, মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব এবং শিক্ষা খাতে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ এর অন্যতম কারণ। যদিও বাৎসরিক জাতীয় বাজেটে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ বেশি দেখানো হয়। এই বাজেট নানাভাগে ভাগ হয়ে যায়। প্রকৃত অর্থে শিক্ষার জন্য তেমন ব্যয় হয় না। কাটছাঁট করার পর যেটুকু বাজেট বরাদ্দ থাকে, তার সিংহভাগই ব্যয় হয় দালান নির্মাণ, শিক্ষকদের বেতন আর বিশেষ বিশেষ শ্রেণীর সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য। দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। একসময় ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র আবাসিক সংকট বিদ্যমান। পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিল নেই। বিছানা পেতে ঘুমানোর জায়গা নেই। ৪ জনের জায়গায় ১৪ জনকে ঠাসাঠাসি করে থাকতে হয়। এমনকি কমনরুম ও ডাইনিং রুমে ছাত্র-ছাত্রীরা গাদাগাদি করে থাকে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়াটা সহজ ব্যাপার নয়। ভর্তি হতে ইচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে শতকরা ১৫ জন ভর্তি হতে পারে। তাছাড়া রাজনৈতিক দল ও তাদের ছাত্র সংগঠনের প্রভাবে দলীয়মনা ছাত্রদের ভর্তি করতে হয়। ফলে মেধাবী ছাত্রদের ভর্তির সংখ্যা আরো হ্রাস পায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলত শহরের অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা সুযোগ পায়। দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তেমন সুযোগ-সুবিধা পায় না। প্রতি বছর টিউশন ও ফি দেয়ার মতো সামর্থ্য অনেক মেধাবী ছাত্রের নেই। অধিকাংশ শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে মোটেও আগ্রহী নন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ১৯৭৩ লঙ্ঘন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকশ’ শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও, বেসরকারি কলেজ, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, কোচিং সেন্টারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে সমান্তরালভাবে কাজ করছেন। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২০০ শিক্ষকের মধ্যে ৪২৫ জন বিনানুমতিতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও একই রকম। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘স্বায়ত্তশাসনের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন অমান্য করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আর্থিক সংকট লেগেই আছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান দিন দিন কমছে। ছাত্র-ছাত্রীরা লেখাপড়া করে না। তাদের মধ্যে ‘ফটোকপি কালচার’ গড়ে উঠেছে। শিক্ষকদের মধ্যে উদাসীনতা ও ভোগবাদিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।’ সর্বস্তরে শিক্ষার সমান অধিকারের কথা বলা হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে সংকট ও বৈষম্য বেড়েই চলেছে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে প্রথম প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি দেয়ার পর শিক্ষা খাতে বৈষম্য নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয়বহুল ও মূলত এলিটদের জন্য। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ও ফি কমপক্ষে ৩৫০০ ডলার। যা খুব কম ছাত্রের পক্ষে বহন করা সম্ভব। অবশ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষাবলম্বনকারীদের অভিমত হচ্ছে : প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা আগামীতে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। তাছাড়া ১৯৯২ সালে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট অনুযায়ী ৫ শতাংশ দরিদ্র ছাত্র বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়ারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে না যাওয়ায় সাধারণত: অপেক্ষাকৃত গরিব ছাত্ররা পড়ালেখার সুযোগ পেয়ে থাকে। কিন্তু ভিন্ন মতাবলম্বীরা বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের সঙ্গে অন্যদের একটা ব্যবধান গড়ে উঠেছে। এ দেশের মাটির সঙ্গে তাদের তেমন সম্পর্ক নেই। দেশ ও দেশের মানুষ তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না। যে কারণে দেশের উন্নতি ও অগ্রগতি নিয়ে তারা ভাবেনও না। তাছাড়া প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা কারোই যাচাই করার সুযোগ নেই। তাদের কার্যক্রমও স্পষ্ট নয়। এ কারণে রাষ্ট্রপতি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছেন : ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা রাখা প্রয়োজন। সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা ব্যয় অনেক বেশি।


স্বল্পসংখ্যক ধনী পরিবারের সন্তানই এগুলোতে পড়ালেখার সুযোগ পায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখে কেউ যেন না ভাবে- এগুলো প্রতিষ্ঠা হয়েছে কেবল কিছুসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর কথা মাথায় রেখে, যাদের অভিভাবকরা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল।’ সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শিক্ষা ও বুদ্ধিভিত্তিক চর্চাটা অপরিহার্য। শিক্ষার আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত মানুষেরা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাই উপলব্ধি করতে পারে না। উন্নয়নশীল দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষা ন্যায়বান সমাজ গঠনের শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সাহায্য ছাড়া নিুবিত্ত ছাত্রদের পক্ষে উচ্চ শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। নিুবিত্ত ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া মেধাবী ছাত্রদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমান সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে সমাজে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতা নিয়ে আসতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জনগণ যে ভর্তুকি দেয়, তাতে সমাজের বিদ্যমান অসাম্য দূর হচ্ছে না। এ জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো, বাস্তবধর্মী ফি কাঠামো, উচ্চ শিক্ষার জন্য গরিব ছাত্রদের ঋণ দেয়া, সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত তরুণদের বিশেষ ভর্তি কর্মসূচি, সমাজের বাস্তব চাহিদা ও শিক্ষার কারিকুলামের মধ্যে ব্যবধান, পরীক্ষা পাসের হার বাড়ানো এবং পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য দূর করা প্রয়োজন। যদিও শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘১৫/২০ টাকা দিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো সম্ভব নয়।’ তবে এটা তো ঠিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিপণন কেন্দ্র নয়। শিক্ষা কেনা-বেচার পণ্যও নয়- এটা জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্র। তাছাড়া শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। শিক্ষা খাতে মৌলিক সুযোগ-সুবিধা দেয়া না হলে শিক্ষা চলে যাবে উচ্চবিত্তদের হাতে। সমাজে বৈষম্য বাড়বে। বাড়বে অস্থিরতা। এমনিতেই শহর ও গ্রামের শিক্ষার মান এক নয় এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যবধান গড়ে ওঠায় বৈষম্য বাড়ছে বিত্তবান ও বিত্তহীনদের মধ্যে। বিদ্যমান বৈষম্য দূর করাই যেখানে কঠিন, সেখানে নতুন করে যাতে বৈষম্য সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। আর এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোই উত্তম পন্থা।

দৈনিক সংবাদ : ১৫ জুন ২০০৩

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

নৌ-দুর্ঘটনা কি ‘বাৎসরিক পার্বণ’?


পয়লা বৈশাখ বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসব ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ-উৎসবের মধ্য দিয়ে প্রতি বছর আমরা দিনটি উদযাপন করি। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটি বাঙালির চিরায়ত উৎসবের দিন। আনন্দের দিন। এই দিনটিকে বরণ করে নেয়ার জন্য প্রতিটি বাঙালির প্রাণে প্রাণে বেজে ওঠে উৎসবের মাদল। কণ্ঠে কণ্ঠে অনুরণিত হয় : ‘মুছে যাক গ্লানি/ঘুচে যাক জরা/অগ্নিøানে সূচি হোক ধরা’। অন্তরে অন্তরে মূর্ত হয়ে ওঠে মঙ্গলাকাক্সক্ষা। নববর্ষ আবাহন ও বর্ষবরণের উৎসবের পাশাপাশি রুদ্র বৈশাখ আমাদের জীবনে নিয়ে আসে প্রতিকূলতার মুখে দাঁড়িয়ে সংগ্রামী ও লড়াকু জীবনের দৃঢ়তা। কেননা, কালবৈশাখীর তা-বে ল-ভ- হয়ে যায় আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। হঠাৎ দমকা ঝড়ের দাপটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে নাগরিক ও গ্রামীণ জীবন। প্রকৃতির এই খেয়ালিপনার সামনে আমরা কেন, পৃথিবীর সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী দেশগুলোও অসহায় হয়ে পড়ে। তবে তারা যত দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নিতে পারে কিংবা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পারে, আমাদের পক্ষে সেটি সম্ভব হয় না। আমাদের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক অবস্থান তেমন সুদৃঢ় নয়। এ কারণে কালবৈশাখীর হিংস্র ও নৃশংস থাবায় যে ক্ষয়ক্ষতি হয়, তা আমরা স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেই। কালবৈশাখীর রুদ্ররূপ, ঘূর্ণিঝড়, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। ষড়ঋতুর এ দেশে প্রকৃতির ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়াটা কখনো কখনো চরম ভোগান্তি নিয়ে আসলেও কখনো-সখনো আশীর্বাদ হয়েও দেখা দেয়। আর এটাই সবুজ-শ্যামল বাংলাদেশের বৈচিত্র্য। যে কারণে কবি আপ্লুত হয়ে লিখতে পারেন : ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাক তুমি/সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি’। কালবৈশাখীর রুদ্রমূর্তির কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আমরা রুখতে না পারলেও আমরা যদি সতর্কতা ও সাবধানতা অবলম্বন করি, তাহলে বড় বড় দুর্ঘটনা সহজেই এড়াতে পারি। কিন্তু ঋতুচক্র অনুযায়ী প্রতি বছর নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি অনেকটা বর্ষপঞ্জির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রমত্ত কালবৈশাখীর ঝড়ের কবলে পড়ে লঞ্চডুবির ঘটনা। প্রতি বছর লঞ্চডুবিতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার মানুষ। এবারো অল্প ক’দিন আগে একই দিনে নারায়ণগঞ্জের পাগলার অদূরে বুড়িগঙ্গায় এবং ভৈরব উপজেলার কাছে মেঘনা নদীতে দুটি লঞ্চডুবিতে মর্মান্তিকভাবে জীবন দিয়েছে প্রায় দু’শর কাছাকাছি লোক। এ ঘটনার পরও লঞ্চ, কার্গো ও ট্রলারডুবি থেমে নেই। সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা। আবহাওয়ার যে ধরন-ধারণ, তাতে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পত্রিকার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৬/২৭ বছরে ছোট-বড় প্রায় পাঁচ শ’র কাছাকাছি নৌ-দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। যে মানুষগুলো প্রাণ হারাচ্ছে, তারাই শুধু পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছে না, এতিম করে দিয়ে যাচ্ছে তাদের পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনকে। দরিদ্র দেশ হিসেবে আমরা শুধু অসংখ্য মূল্যবান জীবনই হারাচ্ছি না, পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদও। এ মৃত্যু কি আমরা এড়াতে পারি না? যে দুর্ঘটনাগুলো প্রতি বর্ষপঞ্জিতে একইভাবে ঘটে চলেছে, তার কাছে কেন আমরা অসহায় আত্মসমর্পণ করছি? এ থেকে কি আমাদের শিক্ষণীয় কিছু নেই? অবশ্য প্রতি বছর দুর্ঘটনার পরপরই গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। এ পর্যন্ত প্রায় হাজারখানেক তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আলোর মুখ দেখেনি, আর যেগুলোর রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তবে অধিকাংশ লঞ্চ দুর্ঘটনা যতটা না প্রকৃতির খেয়ালে ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি ঘটেছে মানুষের বেখেয়ালে। অতি অল্পতেই মুনাফার পাহাড় গড়ার আশায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চলাচলের অনুপযোগী নৌযান রেজিস্ট্রেশনবিহীন অবস্থায় চলাচল, ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী ও মালামাল বোঝাই, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সতর্ক সংকেত উপেক্ষা করে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ চালানো, অদক্ষ মাস্টার, সারেং ও সুকানি দিয়ে লঞ্চ চালানো, লাইফ-জ্যাকেটসহ জীবন রক্ষাকারী প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকায় একদিকে যেমন নৌ-দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে, অন্যদিকে সে অনুপাতে বাড়ছে জীবন ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। অথচ যাত্রীবাহী প্রতিটি লঞ্চের ফিটনেস সার্টিফিকেট, রুট পারমিট ও চালকের লাইসেন্স পরীক্ষা, লঞ্চের ডিজাইন ও নির্মাণ পদ্ধতির ত্রুটি নির্ণয় এবং যাত্রী নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ যাবতীয় বিষয়াদি লঞ্চ ছাড়ার আগেই পরীক্ষা করার কথা। আর এ জন্য রয়েছে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ও অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থাসহ নানা বিভাগ। কিন্তু আইনের ফাঁক-ফোঁকর গলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিবন্ধন ছাড়াই চলাচল করছে হাজার হাজার নৌযান। সঙ্গত কারণে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। মুনাফালোভী নৌ-মালিকদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কোনোভাবেই হোকÑ অর্থোপার্জন। আমাদের দেশের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌ-পরিবহন। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের যাতায়াতের প্রধান অবলম্বন এটি। বিশেষ করে নিুবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের চলাচলের জন্য সস্তায় ও সহজে এর চেয়ে ভালো বিকল্প ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিন প্রায় ১০ লাখ লোক নৌপথে চলাচল করে। ঝড়-বৃষ্টি-রোদ যাই হোক না কেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রুটি-রুজি, জীবন-জীবিকার তাগিদে নৌপথে তাদের চলাচল করতে হয়। বছরের পর বছর নৌ-দুর্ঘটনায় তারা জীবন দিচ্ছে। কিন্তু এর কোনো বিহিত হচ্ছে না। এমনকি জীবনের নিরাপত্তা তো দূরে থাক, মৃত্যুর পরও তাদের পরিবার-পরিজনকে কোনো রকম ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। নৌপথে মানুষের জীবন ঝরা পাতার মতো অকালে ঝরে গেলেও এ নিয়ে তাৎক্ষণিক হৈ-হুল্লোড় হলেও তারপর পরিস্থিতি দ্রুত থিতিয়ে যায়। এবারও উপর্যুপরি নৌ-দুর্ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়ে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য সরকার ঝড়ের মৌসুমে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ঝড়ের মৌসুমে বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে সাধারণত বেশি ঝড় হয় বলে চৈত্র মাসের ১৫ তারিখ থেকে বৈশাখ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে এ সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। তবে একটা প্রক্রিয়া অন্তত শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তা ভালো কি মন্দ, সেটা অনুধাবন করার আগেই লঞ্চ মালিকদের সংগঠন অভ্যন্তরীণ নৌচলাচল (যাত্রী পরিবহন) সংস্থা সারাদেশে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেয়। সরকারের এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লঞ্চ চালালে তাদের লোকসান হবে, তাই এ দু’মাস তারা লঞ্চ চালাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়। লঞ্চ মালিকদের এ সিদ্ধান্তে লঞ্চ যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যাত্রীদের এভাবে জিম্মি করাটা কতটা যৌক্তিক, এটা ভেবে দেখা হয়নি। শেষ অবধি লঞ্চ মালিকদের চাপে এবং আলোচনার প্রেক্ষিতে ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। লঞ্চ মালিকদের নিশ্চয়ই তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নিজস্ব বক্তব্য আছে। কিন্তু তারা কখনো যাত্রীসেবা কিংবা যাত্রীদের মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার জন্য খুব বেশি ভাবে বলে প্রতীয়মান হয় না। তারা যেহেতু ব্যবসায়ী, তারা ব্যবসা করবেন, এটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু যাত্রীদের প্রতি তারা মোটেও সহানুভূতিশীল নন। এ ক্ষেত্রে সব লঞ্চ মালিকই যে একই পথের যাত্রী, সেটা বলছি না। কিন্তু অধিকাংশ মালিকই আইনকে ফাঁকি দিয়ে নৌ-চলাচল ব্যবসা করছে। সরকার যখন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার প্রতিবাদে লঞ্চ মালিকরা ধর্মঘট আহ্বান করলেও তাদের সহযোগীরা যে যাত্রীদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। অবশ্যই শুধু লঞ্চ মালিকরা যে নিয়ম ভঙ্গ করছে, তা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও আইনের কার্যকর প্রয়োগ করছে না বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় অভিযোগ করা হয়েছে। যারা সাধারণ যাত্রী, যাদের জীবন হাতে নিয়ে নৌপথে চলাচল করতে হয়, তারা এখন নিজেদের ভাগ্যকে সঁপে দিয়েছেন অদৃষ্টের হাতে। তারা ধরে নিয়েছেন, লঞ্চ দুর্ঘটনা একটি ‘বাৎসরিক পার্বণ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। আর এই ‘পার্বণে’ যাত্রীরা জীবন উৎসর্গ করবেন আর লঞ্চ মালিক ও সংশ্লিষ্ট মহল বসে বসে তা উপভোগ করবেন! 

দৈনিক বাংলাবাজার : ১১ জুন ২০০৩