পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ভ্রমণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

রবি বাবুর শ্বশুরালয় এবং পূর্বপুরুষের ভিটা দর্শন


এক জীবনে কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন। বলতে গেলে হেন কোনো বিষয় নেই, যা তাঁর লেখার বিষয়বস্তু হয় নি। তাঁর লেখার পরিমাণ হয়ে আছে অনন্ত এক বিস্ময়। এক জীবনে একজন মানুষ এত লেখেন কী করে? এত এত লেখার পরও অনেক বিষয় রয়ে গেছে অনালোচিত। অনালোকিত। অনাবিষ্কৃত। ব্যক্তিগত অনেক কথাই তিনি ঊহ্য রেখে গেছেন। পারিবারিক জীবন নিয়ে খুব বেশি মুখ খোলেন নি। বিশেষ করে স্ত্রী আর শ্বশুরালয় নিয়ে বোধকরি তাঁর এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। ছিল নির্লিপ্ততাও। না হলে এ বিষয়ে তিনি কেন এত নিশ্চুপ ছিলেন? 

তাঁর লেখনি, তাঁর কর্মকাণ্ড ও তাঁর জীবন নিয়ে এন্তার লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে গবেষণাও তো কম হচ্ছে না। নিত্য-নতুনভাবে উম্মোচিত হচ্ছেন তিনি। কত কত বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে। তাঁর মন মজেছে, এমন নারীদের নিয়েও তো লেখার কমতি নেই। কিন্তু তাঁর শ্বশুর বাড়ির বিষয়ে খুব বেশি তথ্য বা লেখা পাওয়া যায় না।

অথচ শ্বশুর বাড়ি নিয়ে তাঁর অনেক স্মৃতি, অনেক মুগ্ধতা, অনেক নস্টালজিয়া থাকার কথা। সেটি তো শুধু শ্বশুরালয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের বংশের অনেক ইতিহাস, অনেক ঐতিহ্য, অনেক গৌরব। তাঁর শ্বশুর বাড়ি যে গ্রামে, সেই গ্রামটি তো তাঁর মাতুল বাড়িও। এ গ্রামের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন অনেক আগে থেকেই। এমনকি তাঁদের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী এ গ্রামের পতিত ব্রাহ্মণের ঘরে বিয়ে করার অপরাধে জাতচ্যুত হয়ে শ্বশুরালয়ে উঠেন এবং সেই সুবাদে এখানে দীর্ঘ দিন বসবাসও করেছেন। একটা সময় পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ জ্ঞাতি কলহে বিরক্ত হয়ে কলকাতা যান এবং সেখানেই থিতু হন। 

পরবর্তীকালে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা ঠাকুর পরিবার হিসেবেই বিখ্যাত হন। কিন্তু তার আগে যে গ্রামটিতে বসবাস, সেখানকার আলো-হাওয়া-জল-মাটি তো বংশানুক্রমে তাঁর দেহ-মনে প্রবাহিত হওয়ার কথা। আর কিছু না হোক, অন্তত মায়ের জন্মস্থান বলে কথা। মামা বাড়িতেও কতবারই এসেছেন। খেয়েছেন দুধ ভাত। সেই স্মৃতি কি তাঁকে উদ্বেলিত করে নি? তাহলে এ নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন? 

জরুরি এক কাজে একদিনের ঝটিকা সফরে খুলনা যাওয়ার পর সুযোগ পেয়ে ছুটে যাই দক্ষিণডিহি গ্রামে। খুলনার ফুলতলা উপজেলা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। যশোর জেলার সীমানা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। আলো ঝলমল সকালে ইজিবাইকে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে সেখানে যাই। শতাধিক বছর আগে এ পথ নিশ্চয়ই এমন সুগম ছিল না। দুই পাশে তরুসার। ছায়াময়। তার ফাঁকে ফাঁকে নয়নমনোহর গ্রামীণ দৃশ্যপট। সবুজ ধানখেত। পাখিদের কলকাকলি। 


দূর থেকেই দ্বিতল সাদা একটি বাড়ি দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে ব্রিটিশ ঘরানার বাড়িটির আভিজাত্য ও পরিপাট্য নজর না কেড়ে পারে না। নিচের তলায় চারটি ঘর। উপরের তলায় দুটি। সামনে বড় একটি খোলামেলা বারান্দা। তাতে মনের আনন্দে লুটাপুটি খেতে থাকে দুষ্টুমিষ্টি রোদ।   

বাড়িটি বেণীমাধব রায়চৌধুরীর। তিনি ছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের সেরেস্তাদার। তাঁর স্ত্রী দাক্ষায়ণী দেবী। তাঁদের একমাত্র কন্যা ভবতারিণীর জন্ম সম্ভবত ১৮৭৪ সালের ১ মার্চে। ফুলি নামেই কাছের মানুষদের কাছে পরিচিত ছিলেন। জোড়াসাঁকো পরিবারের প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণদিহি গ্রামের রামনারায়ণ চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীকে বিয়ে করেন। উভয় পরিবারই ছিলেন পিরালি বংশোদ্ভূত। এই দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন সাহিত্যে। 

সারদা দেবীর পিসি আদ্যাসুন্দরীর ঘটকালিতে ভবতারিণীকে বিয়ে করেন রবি। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্ম মতে বিয়ে হয়েছিল জোড়াসাঁকোর মহর্ষি ভবনে রবিদের পৈত্রিক নিবাসে। এটি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী এক ঘটনা। বিয়েতে কোনো আড়ম্বর ছিল না। এমনকি নিজের পৈত্রিক নামটিও হারিয়ে ফেলতে হয় ভবতারিণীকে। বিয়ের পর স্বামী তাঁর নামকরণ করেন মৃণালিনী। 

১৯ বছরের বিবাহিত জীবন ছিল আড়ম্বরহীন। তবে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সারল্য দিয়ে পরিবারের সবার হৃদয় জয় করতে সক্ষম হন তিনি। বিত্তবান পরিবারের পুত্রবধূ হয়েও তাঁর মধ্যে দেখানদারি ভাব একদমই ছিল না। পাঁচ সন্তানের জননী হন তিনি। তিন কন্যা ও দুই পুত্র মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা ও শমীন্দ্রনাথ। বিয়ের পরই একবার নিজ বাড়ি দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন ভবতারিণী। এরপর আর আসতে পারেন নি। 

রবি মামার বাড়ি এলেও শ্বশুরবাড়ি এসেছেন কিনা জানা যায় না। তবে বিয়ের আগে পাত্রী দেখার উছিলায় একবার বোধকরি ঘুরে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে নিজেদের এস্টেটের কর্মচারির মেয়েকে বিয়ে করায় বোধকরি একরকম অস্বস্তি ছিল। অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন হয়তো। রবির পিতৃব্য ও চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছেন, বিয়ের ব্যাপারে এক রকম চাপে পড়েই শেষ পর্যন্ত নিমরাজি হয়েছিলেন রবি। তাহলে তিনি কি অন্য কারও প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন? 

একটি সূত্রে জানা যায়, একটি মামলার কারণে খুলনা মহকুমা হাকিমের আদালতে তাঁকে হাজিরা দিতে হয়। সেই সুবাদে ১৯০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর শ্বশুরবাড়ি নাকি বেড়াতে আসেন। দক্ষিণডিহির কোথায় রবির মামাবাড়ির ভিটা, তা সঠিকভাবে জানা যায় নি। ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর ভবতারিণীর মৃত্যু হয়। 

ভবতারিণীর পরিবার অনেক আগেই কলকাতা চলে গেলেও সেখান থেকেই সম্পত্তির দেখভাল করা হতো। কিন্তু দেশভাগের পর এই সম্পত্তি আস্তে আস্তে বেদখল হতে থাকে। তারপরও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ক্ষীণ হলেও তাঁদের একটা যোগাযোগ ছিল। ক্রমান্বয়ে তা চলে যায় দখলদারদের কব্জায়। একপর্যায়ে এটি হয়ে পড়ে ঠিকানাবিহীন।

 পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হওয়ার কারণে ১৯৯৫ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়িটি উদ্ধার করা হয়। এটি এখন পরিচিত ‘দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ নামে। ১৯৯৯ সালের ১৯ নভেম্বর বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে এটি পরিচালনা করে আসছে প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর। 

প্রথমে বাড়িটি ছিল দোচালা টিনের। ভবতারিণীর সঙ্গে রবির বিয়ের পর সেখানে দ্বিতল পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাঠামোটি সে সময়ের। নিজেদের মর্যাদার খাতিরে ঠাকুর পরিবারই এটা নির্মাণ করে দেয়। এখন বাড়িটির অবয়ব আর আগের মতো নেই। খোলনলচে খানিকটা বদলে ফেলা হয়েছে। তবে বেড়েছে সীমানা। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মঞ্চ। ভবনটির অবকাঠামো ছাড়া অতীতের তেমন কিছু নেই। হাল আমলে সংযোজিত হয়েছে কিছু ফটোগ্রাফ।


দক্ষিণদিহি গ্রামটি এখন পরিচিত ‘পাঁপর‘ গ্রাম হিসেবে। দেখতে পেলাম, কমপ্লেক্সের বিরাট চত্বরে কার্তিকের রোদে শুকানো হচ্ছে মচমচে এই ভাজা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি কালের ধুলোয় একসময় হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু একটু একটু করে ফিরছে তার উজ্জ্বলতা। মচমচে ভাজার গ্রামটি ক্রমে ক্রমে পরিচিতি পাচ্ছে রবি বাবুর শ্বশুরালয় হিসেবে। অনেকের কাছে সেটাই হয়ে উঠেছে আকর্ষণ।  

দক্ষিণডিহি থেকে পিঠাভোগের দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। বহুকাল আগে ইতিহাসের পাতায় এই দুটি গ্রামের মধ্যে সৃষ্টি হয় আত্মীয়তার বন্ধন। এরফলে বদলে যায় ইতিহাসের ধারাক্রম। খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নম্বর ঘাটভোগ ইউনিয়নে অবস্থিত পিঠাভোগ গ্রাম। এ গ্রামের কুশারী বাড়িতে বসবাস করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষরা।


মিঠে বিকেলে ইঞ্জিন নৌকায় রূপসা নদী অতিক্রম করি। পড়ন্ত সূর্য নদীর বুকে এঁকে দিতে থাকে জলছবি। ইজি বাইকে অনেকটা পথ যাওয়ার পর ইঞ্জিন চালিত ভ্যানে পৌছে যাই ‘পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা’য়। সারি সারি গাছ-গাছালির মধ্যে দিয়ে পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে পাওয়া যায় মায়াবী পরশ। কোথাও একটুও হোঁচট খেতে হয় নি। প্রত্যন্ত এলাকায় দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় নবনির্মিত একটি ফটক। 

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের কারুকার্যখচিত আদি ভিটাবাড়ি ১৯৯৪ সালে ভেঙে ফেলা হয়। হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি অমূল্য নিদর্শন। এ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এই ভিটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। শূন্য ভিটায় নির্মাণ করা হয়েছে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। একতলা এই ভবন সংলগ্ন গড়ে তোলা হয়েছে উম্মুক্ত একটি মঞ্চ। আদি ভিটাবাড়ি না থাকলেও অনেকটাই অকৃত্রিম আছে এ এলাকার গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রকৃতি। যেন থমকে আছে আবহমানকালের নিস্তব্ধতা। অসংখ্য গাছগাছালি। পেছনে মস্ত একটি নির্জন পুকুর। গোধূলি চারপাশে ছড়িয়ে দিতে থাকে আবির।


পূর্বপুরুষের ভিটায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও এসেছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে ভিটা সংলগ্ন এলাকায় এখনও বসবাস করেন কুশারী পরিবারের বংশধররা। তাঁদের আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল মনে হলো না। তাঁরাই দেখভাল করেন সংগ্রহশালা। দর্শনার্থীরা এলে খুলে দেন ইতিহাসের সিংহদ্বার। তবে লতা-পাতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর হতে পেরেও তাঁরা গর্ব অনুভব করেন। যত দূরের সময়ের হোক না কেন, এই মাটিতে পোতা বীজের এক সন্তান আলোকিত করেন বিশ্ব সাহিত্যের ভুবন। এ গর্বটুকু আমাদেরও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।


১ নভেম্বর ২০১৮

মঙ্গলবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৬

রাজা নেই, রাজত্ব নেই, আছে শুধু রাজপ্রাসাদ



কোথায় যে ইতিহাসের কী উপাদান লুকিয়ে আছে, আমরা অনেকেই জানি না। না জানার কারণে আমাদের আড়ালে রয়ে যায় অমূল্য সব সম্পদ। অনেক সময় হারিয়েও যায়। ধসে যায়। বিলুপ্তও হয়ে যায়। প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদকে সব দেশেই যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়। তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়। এমনভাবে সংরক্ষণ করা হয়, যা হয়ে ওঠে দর্শনীয়। তা দেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে যান। সেখান থেকে তুলে আনেন অনেক হারিয়ে যাওয়া তথ্য ও ইতিহাস। আর কিছু না হোক, অন্তত চোখের দেখায় তো পরিতৃপ্ত হওয়া যায়। পাওয়া যায় গৌরবময় অনুভূতি। সেদিক থেকে আমরা বেশ পিছিয়ে আছি। আমাদের দেশেও রয়েছে অনেক প্রত্মতাত্ত্বিক সম্পদ। কিন্তু সংরক্ষণ ও পরিচর্যা না করায় অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। এখনও বিনষ্ট হচ্ছে। এমনটি চলতে থাকলে আমরা খুইয়ে ফেলবো আমাদের অনেক অমূল্য সম্পদ। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস। আমাদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য। পুঠিয়া রাজবাড়ি দেখার পর আমার মনে হয়েছে, প্রত্যন্ত একটি এলাকায় আড়াল পড়ে আছে ঐশ্বর্যময় ইতিহাসের অনেক মূল্যবান উপকরণ। যার গুরুত্ব হয়তো আমরা এখনও বুঝতে পারি নি। কবে যে পারবো?


ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে বাঁ দিকে ত্রিমোহিনী জামে মসজিদের পাশ দিয়ে কিছুটা পথ যাওয়ার পর রাজবাড়ি চিনতে খুব একটা অসুবিধা হয় না। ভবনগুলোর আকার আর আকৃতি দেখলে কেমন যেন রোমাঞ্চকর ও শিহরণজাগানো অনুভূতি হয়। বিরান প্রান্তরে সব দাঁড়িয়ে আছে একবুক হাহাকার নিয়ে। পুরাকীর্তির অধিকাংশই ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে। শত শত বছর আগের ভবনগুলো মলিন। বিধ্বস্ত। বিমর্ষ। বিষণ্ন। যেখানে রাজা নেই। রাজত্ব নেই। রাজস্ব নেই। নেই প্রাণের উত্তাপ। জায়গায় জায়গায় ফাঁটল ধরেছে। ভেঙে গেছে পাঁজর। খুলে খুলে যাচ্ছে ইট-সুরকি। বেআবরু হয়ে যাচ্ছে আস্তরগুলো। দিনের বেলায়ই কেমন যেন একটা অশরীরী পরিবেশ। গা ছমছম করে। আর রাতের বেলার অনুভূতি কেমন হবে, সেটা ভাবতেই পারছি না।
গাইডের পরিবেশিত তথ্যে একটু একটু করে উম্মোচিত হতে থাকে অজানা ইতিহাস। চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পুরাকীর্তির সব নিদর্শন। এত এত মূল্যবান স্থাপনা একই চত্বরে আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। যদিও সংরক্ষণ করা হচ্ছে রাজবাড়িসহ ১৪টি স্থাপনা। বাদবাকি নির্দশন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। অথচ কত আগের ঐতিহাসিক জনপদ। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় পুঠিয়া রাজবংশ। এর জমিদার ছিলেন বার ভুঁইয়াদের একজন। এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা পীতাম্বর। পীতাম্বরের মৃত্যুর পর তাঁরই অনুজ নীলাম্বর জমিদার হন। তিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে রাজা উপাধি লাভ করেন। এরপর বিভিন্ন জনের শাসনামলে নানা স্থাপনা, বেশিরভাগই মন্দির নির্মাণ করা হয়। ১৮৯৭ সালে ভয়াল ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুঠিয়া রাজবাড়ির অধিকাংশ অবকাঠামো।


পুঠিয়া রাজবাড়ির বর্তমান প্রাসাদ নির্মাণ করেন রাজবংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী মহারানি হেমন্তকুমারী দেবী। ১৯৪২ সালে তিনি পরলোকগমন করার পর রাজবাড়ির আকর্ষণ ও জৌলুশ ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর এই রাজবাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। এ কারণে অযত্ম আর অবহেলায় এর সৌন্দর্য অনেকখানি নষ্ট হয়ে যায়। বেহাত হয়ে যায় জমিদারদের ব্যবহার্য জিনিসপত্র।  
পুঠিয়া রাজবাড়ি চত্বরটি চতুর্ভুজ আকারের। এই সীমানার মধ্যে বেশ কয়েকটি ভবন ও মন্দির। পুরো এলাকার চারপাশে পরিখা। মূলত নিরাপত্তা বেষ্টনি হিসেবে এটি খনন করা হয়। প্রধান ভবন পুঠিয়া রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের অবকাঠামো ও স্থাপত্য সহজেই নজর কেড়ে নেয়। দ্বিতল বাড়ি হলেও বেশ উঁচু। সুউচ্চ ফটক। এটি পাঁচআনি জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। বড় বড় স্তম্ভের উপর ভবনটি বাইরে থেকে দেখলে চারতলার মতো মনে হয়। বিশাল এই ভবনে দু’একটি পুরানো ভারী সিন্দুক ছাড়া সরঞ্জামাদি কিছুই নেই। লুঠপাট করে পুরোপুরি শূন্য করে ফেলা হয়েছে। খাঁখাঁ করছে বড় বড় কক্ষগুলো। তবে সম্প্রতি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর পরিদর্শন করার পর ভবনের সংস্কার কাজ চলছে।

রাজবাড়ি সংলগ্ন গোবিন্দ মন্দিরটির বয়স চার শতাধিক বছর। একটু উঁচু বেদির উপর বর্গাকারে নির্মিত। মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে একট কক্ষ। চার কর্নারে চারটি ছোট কক্ষ। পোড়ামাটির চিত্রফলক দিয়ে সাজানো। মারাত্মক ভূমিকম্পেও এ মন্দিরটি রয়ে যায় অক্ষত। তাতে রয়েছে কয়েক শ’ বছর আগের টেরাকোটা কাজ। মন্দিরগাত্রে খোদাই করা সনাতন ধর্মের পৌরাণিক কাহিনী, যুদ্ধ, রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, হাতি, ঘোড়া, পালকি, তীর, ধনুক, শিকার দৃশ্য। আছে মোগল আমলের ক্যালিগ্রাফিও।
ছোট আহ্নিক মন্দিরে একাধিক খিলান দরজা। দোচালা আকৃতির ছাদ বাঁকানো। কার্নিশসমূহে পোড়ামাটির চিত্রফলক। শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা, লতাপাতা, জীবজন্তু।


ছোট শিব মন্দিরটি বর্গাকারে নির্মিত। ছোট আকৃতির এ মন্দিরের কার্নিশ বাঁকানো। দেয়ালে পোড়ামাটির চিত্রফলক।
শ্যামসাগর দীঘির পশ্চিম পাড়ে বড় আহ্নিক, ছোট গোবিন্দ গোপাল মন্দির নামে পাশাপাশি তিনটি মন্দির। এই মন্দিরগুলো চারআনি মন্দির নামে পরিচিত। বড় আহ্নিক মন্দিরে পাশাপাশি তিনটি কক্ষ। তাতে পোড়ামাটির চিত্রফলক। তাতে শোভা পাচ্ছে রামচন্দ্রের সঙ্গে রাবণের যুদ্ধের কাহিনী, মোগল যুদ্ধের সাঁজোয়া বাহিনীর চিত্র, হিন্দু দেব-দেবীর প্রতিকৃতি, শ্রীকৃষ্ণ ও রাধারানির সাথে গোপীগণের বৃন্দাবনলীলা।
একই চত্বরে ছোট গোবিন্দ মন্দির। আছে পোড়ামাটির চিত্রফলক। কার্নিশ ধনুকের ন্যায় বাঁকানো। চূড়া আকৃতির ছাদ।
গোপাল মন্দিরটি দোতলা। কোনো অলঙ্করণ নেই।  
দোল মন্দিরটি চার তলা বিশিষ্ট। গম্বুজাকৃতির চূড়া। পুঠিয়ার পাঁচআনি জমিদার ভূবেন্দ্রনারায়ণ রায় ১৭৭৮ সালে এটি নির্মাণ করেন। প্রবেশ পথ অনেক। খানিকটা গোলকধাঁধার মতো।


বড় শিব মন্দিরের সুপ্রশস্ত সিঁড়ি। চারপাশে টানা বারান্দা। পাঁচটি করে খিলান প্রবেশ পথ। উত্তর পাশে দীঘিতে নামার জন্য বাঁধানো ঘাট। প্রবেশ পথে বেলে পাথরের চৌকাঠ। চৌকাঠগুলো ফুল আকৃতির নকশা দিয়ে অলঙ্কৃত। পিরামিড আকৃতির চূড়া। পাঁচআনির জমিদার বাড়ি ১৮২৩ সালে রানি ভূবনমীয় দেবী নির্মাণ করেন। এ কারণে মন্দিরটি ভূবনেশ্বর মন্দির নামেও পরিচিত। ১৮৩০ সালে স্থাপন করা হয় বড় আকৃতির কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। ১৯৭১ সালে এটি ভেঙে ফেলার জন্য পাকিস্তানি সৈন্যরা সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে। কিন্তু বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েও সামান্য একটু আঁচড় কাটা ছাড়া তেমন কিছু করতে পারে নি। এখনও মন্দিরটিতে যথারীতি পূজা-অর্চনা করা হয়।
সামনে গোবিন্দ সরোবর। শানবাঁধানো ঘাটে বসে অবলোকন করা যায় চমৎকার প্রাকৃতিক দৃশ্য। শিব মন্দিরের চূড়ায় ওঠার কোনো সিঁড়ি নেই। তবে লোহার চেইন ঝুলানো আছে। সেটি বেয়ে ওঠা যায়। এর কারণ অবশ্য জানা যায় নি।   জগন্নাথ বা রথ মন্দির অষ্টকোণাকারে নির্মিত। চারপাশে টানা বারান্দা। ৮টি পিলার। জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ১৮৩০ সালে রানি ভূবনময়ী নির্মাণ করেন। রাজবাড়ির আঙ্গিনায় আছে দোতলা হাওয়া খানা। একটি পুকুরের মাঝখানে। অবকাশযাপন করার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। কৃষ্ণপুর মন্দির পোড়ামাটির ফলক দিয়ে নির্মিত। খিতিশ চন্দ্রের মঠ নামে পরিচিত হলেও সেটি আসলে শিব মন্দির। ছোট আকারের। কেষ্ট খেপার মঠ বর্গাকারে নির্মিত।


১৪টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ছাড়াও আছে হেমন্ত কুমারীর বাসভবন, রানির ঘাট, চারআনি বাড়ি, কাছারি বাড়ি। এছাড়া পাঁচ আনি রাজবাড়ির পূর্ব-উত্তর দিকে জমিদার আমলে নির্মিত বেশ কিছু ইমারত আছে। রাজ পরিবারের কর্মচারীদের আবাসন। জরাজীর্ণ এবং পরিত্যক্ত।
১৮৯৫ সালে নির্মিত হয় হেমন্ত কুমারীর বাসভবন। দেয়ালে লতাপাতার নকশা। বর্তমানে সরকারি দপ্তর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গোবিন্দ সরোবরের সঙ্গে সংযুক্ত বিশাল শান বাঁধানো রানির ঘাট। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা।
চারআনি রাজবাড়ি শ্যামসাগর দীঘির দক্ষিণ পাশে অবস্থিত। সেখানে আছে রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন অফিস ভবন, কর্মচারীদের আবাসস্থল, হাতিশাল, ঘোড়াশাল। সবই ধ্বংসের পথে। ১৯৭১ সালে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া অনেক স্থান দখল হয়ে গেছে।
সেই আমলে প্রত্যন্ত এলাকায় যে সব উপকরণ ও সরঞ্জাম দিয়ে এই রাজপ্রসাদ গড়ে তোলা হয়েছে, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। দূর-দূরান্ত থেকে তা বহন করে এনে দুর্গম অঞ্চলে রাজকীয় সৌধ গড়ে তোলাটা নিশ্চয়ই সহজ ছিল না। অবশ্য পাশ দিয়ে পদ্মা নদী প্রবাহিত হওয়ায় পরিবহন নিয়ে বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হয় নি। আর রাজা বা জমিদারের হুকুম প্রতিপালন করার জন্য দরিদ্র প্রজারা তো ছিলই। পুঠিয়া এলাকাটি যে বেশ সম্ভ্রান্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেটি সহজেই অনুধাবন করা যায়। রাজবংশের অনেক কিছু বিলীন হয়ে গেলেও এর গরিমা কিন্তু হারিয়ে যায় নি। এটিকে সংস্কার করা হলে এর জেল্লা, এর নান্দনিক সৌন্দর্য ও এর আকর্ষণ অনেকটাই পুনরুদ্ধার করা যায়। সেটি করা হলে পুঠিয়া রাজবাড়ি হতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম একটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র।
   

বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১৬

বনলতা সেনের বাড়িতে!

বনলতা সেনের জন্য আমার অপেক্ষা চিরকালের। সেই কবে যেন বুকের গভীরে ঠাঁই নিয়েছে রহস্যময়ী এই মানবী। তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। এবার যখন তার নিবাসে যাই, এখন তো আর তার দেখা পাওয়ার কথা নয়, তবুও কেন যেন সারাক্ষণই মনজুড়ে ছিলেন মোহময়ী এই নারী। ‘অন্ধকার বিদিশার নিশা’র মতো তার চুল আর ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-র মতো তার মুখ খুঁজেছি নিরন্তন। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, মানুষের মনে কত কিছু যে উদয় হয়, নাটোরের রাজবাড়ির সঙ্গে কোনোভাবে হয়তো তিনি সম্পৃত্ত ছিলেন। এমন মনে হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই, নাটোর যাওয়ার পর এ রকম খুব বেশি মনে হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশ কি কখনো নাটোরের রাজবাড়ি গিয়েছিলেন? সেখানে তাঁর সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল বনলতা সেনের? এ প্রশ্নটি মনের মধ্যে হরদম ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়তমা মানসীর জন্মস্থানে এবারই প্রথম পা দেওয়ার পর কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ আসলেই তো, কেন এত দিন পর এলাম?    
বগুড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের বাঁ পাশে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর থেকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দীঘাপতিয়া রাজবাড়ির সিংহদ্বার। কার্তিকের সকালেও ঝলসানো রোদ। রোদ একটু সইয়ে নেওয়ার পর ফটকের সাদা-হলুদ-লালচে রঙ, নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কেড়ে নেয়। চারতলা ফটকের কপালে টিপ হয়ে শোভাবর্ধন করছে পাথরের একটি ঘড়ি। ঘড়িটি এখনও সময় দিয়ে চলেছে। নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখলাম, একটুও হেরফের নেই। ঘড়িটি আনা হয় ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। ঘড়ির পাশে আছে একটি ঘণ্টা। একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি অনেক দূর থেকে শোনা যেত। এই তোরণে আছে প্রহরীদের থাকার সুব্যবস্থা। প্রবেশ দুয়ার দেখেই অনুধাবন করা যায় রাজপ্রাসাদের জেল্লা ও জৌলুশ।

নাটোরের রানি ভবানীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া দীঘাপতিয়া জমিদারীতে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন এ প্রাসাদ। বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে রাজত্ব। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই রাজবাড়ি অনেকটা ধসে পড়ে। এরপর প্রায় ৪২ একর জমির উপর এটি পুনঃনির্মাণ করেন রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায়। তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলেন রাজসিক বাগানবাড়ি। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিদেশি প্রকৌশলী, চিত্রশিল্পী আর দেশীয় মিস্ত্রিরা। সেই সময় তো বটেই, এই সময়েও তার নান্দনিক সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি। রাজবাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি। তবে তাতেও ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আচ্ছাদন। কেউ যাতে সহজে ভিতরে অনুপ্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। পাঁচিলের পাশে সারি সারি গাছ। এরপরই পুরো রাজবাড়ি এলাকা হ্রদ দিয়ে পরিবেষ্টিত। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজপ্রাসাদের ঢোকার মুখে রাস্তার দু’পাশে সুুউচ্চ পাম গাছের সারি। ডানে-বাঁয়ে পরিখা। তাতে টলমল করছে জল। ফুটে আছে পদ্মফুল।
ভিতরে ঢুকে সোজা পশ্চিম দিকে কিছুটা হাঁটার পর সবুজে ঘেরা প্রধান রাজবাড়ি। আছে রকমারি ফুলের বাহার। তারমাঝে নিশ্চল হয়ে আছে রাজা দয়ারামের আবক্ষ মূর্তি। মার্বেল পাথরের এই ভাস্কর্যটি সবাইকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য চুপচাপ বসে আছে। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ও সৌকর্যে প্রতিফলন ঘটে এর আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা। অলিন্দ ঘেরা একতলা বাড়ি। খোলামেলা। তিন দিকেই বারান্দা। তবে অনুমতি না থাকায় রাজবাড়ির একদম অন্দরমহলে যাওয়া যায় নি। তবে ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ভিতরটা কিছুটা হলেও দেখতে পাওয়া যায়। বড় একটি হল ঘর। এছাড়া আছে বেশ কয়েকটি কক্ষ। দামি আসবাব দিয়ে সাজানো। আবসবাবপত্র ইতালি থেকে আনা হয়। দক্ষিণে ঢাউস আকারের স্তম্ভযুক্ত বারান্দা। ছাদে ওঠার জন্য আছে পেঁচানো সিঁড়ি। তবে সিঁড়িটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না।

 
রাজবাড়ির পেছনেও কারুকার্যম-িত প্রশস্ত চাতাল। ফুলের টব দিয়ে সুসজ্জিত। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গেছে নিটোল হ্রদ। মুগ্ধকর এ জলাশয়ের পাড়ে সারি সারি পাম গাছ। তাতে তৈরি হয়েছে সবুজের নিবিড় বেষ্টনী। বারান্দা থেকে নেমে গেছে শানবাঁধানো সিঁড়ি। চাইলে টুপ করে হ্রদে নেমে জলকেলি করা যায়। জোছনা রাতে কিংবা বসন্তের মাতাল সমীরণে বারান্দার এমন পরিবেশে মনের মধ্যে কী রকম দোলা দিয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতা আমার হয় নি।


দক্ষিণ পাশে সুদৃশ্য ও মনোরম উদ্যান। এটি পরিচিত ‘ইতালিয়ান গার্ডেন’ নামে। সুসজ্জিত প্রাচীন ও দুর্লভ সব গাছগাছালি। কোনোটা ফলজ। কোনোটা ঔষধি বৃক্ষ। পারিজাত, কর্পূর, সৌরভী, এগপ্ল্যান্ট, হোয়াইট পয়েনসেত্তিয়া, হোয়াইট এলিসন, মালতীলতা, শঙ্কচক্র, গোদাপদ্ম, হরীতকী, হাপাবমালি, রাজ-অশোক, রঙ্গন, নাগেশ্বর চম্পা, সাইকাস পাম, যষ্ঠিমধু, মাধবী, তারাঝরা, নীলমণিলতা, হৈমন্তী ইত্যাদি। এর অধিকাংশ গাছই সচরাচর দেখা যায় না। বাহারি পাতা আর রঙিন ফুলের সৌরভে হয়ে ওঠেছে যেন নন্দনকানন। বাগানে আছে বসার বেঞ্চ। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন স্বর্গের মতো এ বাগানে আছে অত্যাধুনিক ¯œানাগার। কৃত্রিম ঝরনাধারা।

বাগানের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধারণ কিছু ভাস্কর্য। গ্রিক স্টাইলে নির্মিত। কিছু ভাস্কর্য কালো এবং লোহা দিয়ে তৈরি। ছিপ হাতে কালো রঙের মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যটি মন কেড়ে নেয়। শ্বেত পাথরে গড়া মা-সন্তান কিংবা সুন্দরীতমাদের অপরূপ সব ভঙ্গিমা। সব ইতালিয়ান মার্বেল পাথরে গড়া। হাত ভাঙা একটি স্থাপত্য দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। এটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের কীর্তি। বাগানের এক কোনায় আছে কাঠের ‘টি-হাউস’। বিকেলে সেখানে বসে রানি চা পান করতে করতে উপভোগ করতেন প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। রাজবাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কবিতার বীজ। আর সেখানে যদি ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় বনলতা সেনের সঙ্গে, তাহলে জীবনানন্দ দাশের মতো জাতকবি হলে অমর সব পংক্তি না লিখে কি পারা যায়?

রাজবাড়িতে আছে দোতলা ‘কুমার প্যালেস’। এটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিচ তলায় অন্ধ কুঠুরি। তাতে ছিল কারাগার ও টর্চার সেল। খাজাঞ্জিখানা, হোলিখেলা, দোলমঞ্চের আকর্ষণের কমতি নেই। আছে কাচারি ভবন, রান্নাঘর, ট্রেজারি বিল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, স্টাফ কোয়ার্টার, সেন্ট্রিবক্স ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন নামের পুকুর। সামনে শোভা হয়ে আছে ব্রিটিশদের নির্মিত একাধিক কামান। রাজপ্রসাদের সামনে বড় একটি শুভ্র রোয়াক। চারপাশে ডিজাইন করা দেয়াল। এ চত্বরে বসতো বৈকালীন আড্ডা। সেই কত কাল আগে নির্মিত রাজপ্রাসাদটিতে সংমিশ্রণ ঘটেছে রুচি, সৌন্দর্য আর অঢেল ঐশ্বর্যের। এ কারণে এটি এখনও অভিভূত করে পর্যটকদের।


সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, উন্নয়নমূলক কাজে নাটোরের রাজবাড়ির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় অবিভক্ত ভারতে ক্রিকেট খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ নাথ। কলকাতার বালিগঞ্জে ৪৫ বিঘা জমি কিনে সুরম্য বাগানবাড়ি ছাড়াও গড়ে তোলেন ক্রিকেট মাঠ ও প্যাভিলিয়ন। ১৯০১ সালে গঠন করেন ‘নাটোর ইলেভেন টিম’। শুধু ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এ দলের অধিনায়ক ছিলেন মহারাজা নিজে। দীঘাপতিয়ার শেষ রাজা ছিলেন প্রতিভানাথ রায়। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করলে ১৯৫২ সালে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান। ১৯৬৬ সালে রাজবাড়ি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এটির নামকরণ করা হয় ‘উত্তরা গণভবন’। বর্তমানে রাজবাড়িটি রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। রাজপ্রাসাদের পুরো সীমানায় আছে যত্ম ও পরিচর্যার ছাপ।
নাটোরে যাব, আর বিখ্যাত কাঁচা গোল্লার স্বাদ নেব না, তা কি হয়? এর সোয়াদ নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হতে থাকে, কোনো এক শীতার্ত সন্ধ্যায় এ রাজবাড়িতে অবস্থান করলে হয়তো অনুভব করা যাবে জীবনানন্দীয় অভিজ্ঞতা : ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত/সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;/পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী ফুরায় এ জীবনের লেনদেন;/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এমন এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য নাটোরের রাজবাড়ি যেন সাজিয়ে রেখেছে হরেক রকম পসরা। তবে অন্ধকারে মুখোমুখি বসার জন্য নেই কোনো বনলতা সেন।        

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

রাজশাহীর পদ্মার পাড়ে


পৌঁছতে পৌঁছতে একটুখানি দেরি হয়ে যায়। অস্তগামী সূর্যের কুসুম কুসুম পেলবতার দেখা পাওয়া হলো না। তাতে অবশ্য আক্ষেপটুকু রয়েই যায়। তারপরও মোহময় যে পরিবেশের দেখা পেলাম, তার কোনো তুলনা হয় না। যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট, তাতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের অপরূপ ছটা। প্রকৃতি যে কত বড় চিত্রকর, সেটা পলে পলে অনুভব করতে থাকি। তার তুলির আঁচড়ে খোলতাই হতে থাকে জগতের রূপমাধুরী। দিনমণি সবে ডুবে গেছে। রয়ে গেছে তার মায়াবী আবেশ। চলতে থাকে আলো-ছায়ার অদ্ভুত খেলা। একটু একটু করে চারপাশে জমতে থাকে রক্তিম আভা। যেন কেউ মাখিয়ে দিয়েছে মুঠো মুঠো আবির। গগনজুড়ে বাঙময় হয়ে ওঠে তার লালিমা, তার লালিত্য, তার লাবণ্য। একাকার হয়ে যায় আকাশ, নদী আর প্রকৃতি। এর সম্মিলনে সৃষ্টি হয় মোহনীয় পরিবেশ।

গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে কমনীয় অন্ধকার। বৃক্ষগুলো হয়ে ওঠে প্রকৃতির ক্যানভাসের অংশ। নদীর তীরে অপেক্ষমাণ ছায়া ছায়া নৌকা। দাঁড়িয়ে থাকা মানব-মানবী রূপায়িত হয় ধূসর অবয়বে। আছে থোকা থোকা বিষণœতাও। সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যপটটি রূপ নেয় জলছবিতে। আঁখিপুটে যেন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জলরঙের জাদুকর ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী যোষেফ উইলিয়াম টার্নারের এক একটি মাস্টারপিস। ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেও মনে হতে পারে কোনো চিত্রশিল্পীর ইজেলে আঁকা প্রকৃতির বিমূর্ত সব ছবি। তাতে আছে সুর-ছন্দ-কবিতার সংমিশ্রণ।
 

কাব্যিক এ দৃশ্যপটটি মিলিয়ে যেতে না যেতেই অন্ধকারে ফুটে ওঠে আলোর বর্ণময় ফুটকি। দূর থেকে মনে হতে থাকে যেন দীপালি উৎসব। নদীর পানিতে তার প্রতিবিম্ব। কাঁপা কাঁপা রঙিন বিচ্ছুরণ। বইতে থাকে ঝিরি ঝিরি মাতাল হাওয়া। অপরূপ সেই নৈসর্গিক দৃশ্য। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে নিভৃতে বসে আছেন কেউ কেউ। দূর থেকে ভেসে আসেন শ্রীকান্ত আচার্য : একা একা এই বেশ থাকা/আলো নেই কোথাও সব মেঘে ঢাকা/ছায়া ছায়া সব আবছায়া/যাকে খোঁজে মন তার নেই দেখা/আনমনে এই একা একা/সব মেঘে ঢাকা, সব মেঘে ঢাকা/আলো-ছায়া দিয়ে দিন চলে গেছে/আমাকে শূন্যতা দিয়ে গেছে/উতলা এক হাওয়া ভাসে/সে হাওয়ার সাথী/ শুধু নীরবতা, শুধু নীরবতা.........। সন্ধ্যা নেমে এলে এমন দৃশ্যপট প্রতিনিয়ত দেখা যায় রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধ বা টি-গ্রোয়েনে।


দিনের বেলায়ও পদ্মা নদীর তীরের ঔজ্জ্বল্য কম দীপ্তিময় নয়। পাঠানপাড়া, লালন শাহ পার্ক, বড়কুঠির পর্যটন কেন্দ্রে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালের মাধুর্য ও জৌলুশ বেশ উপভোগ্যময়। যদিও কার্তিকে গা বুলিয়ে দেওয়ার কথা মিঠের রোদের আমেজ। অথচ রোদের তেজের কারণে ঘেয়ে-নেয়ে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। তারপরও বিস্তীর্ণ নদীর পাড় ঘেঁষে কাশফুলের নান্দনিক সমাহার মনের মধ্যে এনে দেয় শুভ্র পালকের ছোঁয়া। পাঠানপাড়ায় পরিত্যক্ত আমবাগানে সদ্য গড়ে ওঠেছে ‘সীমান্ত অবকাশ’, ‘সীমান্ত নোঙর’ নামের ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। আছে সুশোভিত পার্ক। গাছের তলায় চমৎকার বসার ব্যবস্থা। নির্জন। নিরিবিলি। কে যেন গুন গুন করে গাইছে, ‘আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে তোমার কাছে এসে/শুধু তোমায় ভালোবেসে’। রোমান্টিক পরিবেশ। প্রেমপিয়াসীরা যাতে পাখির নীড়ের অনুভাব পেতে পারেন, সেজন্য পাকুড় গাছের উপর বেঁধে দেওয়া হয়েছে আচ্ছাদিত মাচা। এই ট্রি-হাউজে ‘নিভৃত নির্জন চারি ধার/দুজনে মুখোমুখি’ হয়ে ‘গভীর দুখে দুখি’ হওয়া যায় কিংবা হতে পারে ‘কেবল আঁখি দিয়ে/আঁখির সুধা পিয়ে’।
 

বড়কুঠিতে গড়ে তোলা হয়েছে মহানগর উম্মুক্ত নাট্যমঞ্চ। অনেকটা প্রাচীন গ্রিসের অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো। প্রাকৃতিক আলোয় হতে পারে নাটকের আলোক প্রক্ষেপণ। আছে ‘পদ্মা ফুড গার্ডেন’। রঙিন ছাতা। পদ্মা নদীর তীরে পার্ক ছাড়াও গড়ে তোলা হয়েছে টাইলস দিয়ে হাঁটার দীর্ঘ পথ। আছে বসার চমৎকার সুব্যবস্থা। তপ্ত দুপুরকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম। তবে স্কুল-কলেজ পালিয়ে আসা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা নদীর সুরতরঙ্গ। জুড়িয়ে দেয় মনপ্রাণ। চাইলে স্পিড বোট বা নৌকায় এক পাক ঘুরে আসা যায়। দূর থেকে দেখা যায় ভারতের মুর্শিদাবাদের প্রান্তরেখা। তবে খুব ভোরে কিংবা বিকেল হলে পদ্মা পাড়ের চেহারা আমূল বদলে যায়। সে সময় ঢল নামে মানুষের। জানা যায়, হাল আমলে পদ্মা নদীর তীরকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। অবশ্য সৌন্দর্যকরণের এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। 
 

বরেন্দ্রভূমির গলার হার হয়ে যুগে যুগে শোভা বর্ধন করছে পদ্মা নদী। যদিও একসময়ের উত্তাল পদ্মা নদী হারিয়েছে তার যৌবন। খুব বেশি দিন পানির ¯্রােত থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে বিশাল এলাকাজুড়ে চর পড়ে। তখন আর প্রমত্ত এই নদীকে চেনা যায় না। এই নদী অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে দিলেও এর টান কিন্তু এড়ানো যায় না। পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রকৃতির ছায়ায় মনোরম বাসভবন, সারদা পুলিশ একাডেমি, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মতো স্থাপনাগুলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
 

এই শহরে আছে গুরুত্বপূর্ণ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। বাংলাদেশের পুরানো জাদুঘরের একটি। প্রত্মতত্ত্ব সংগ্রহের দিক দিয়ে এটি বেশ সমৃদ্ধ। অনেক দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন আছে। আছে সিন্ধু সভ্যতার গৃহস্থালি তৈজসপত্র। যা পাওয়া যায় মহেঞ্জোদারোতে। শিক্ষাদীক্ষায় শহরটি এগিয়ে আছে। দেশের অন্যতম একটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৮ সালে। আছে বিস্তৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সিল্ক সিটি হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর গৌরব ‘রাজশাহী সিল্ক’। দেশ-বিদেশে এর দারুণ কদর। বিসিক শিল্প নগরীতে রেশমের বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি ও শোরুম আছে। সেখানে রেশম চাষ থেকে শুরু করে শাড়ির প্রস্তুতপ্রণালী দেখা যায়। চাহিদা অনুযায়ী রেশমের যে কোনো পণ্য ক্রয় করা যায়।
 
  
বাংলাদেশ ডাকবিভাগের রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক এস এম তারিক কচির আমন্ত্রণে এবারই প্রথম সেখানে পা দিয়ে অনেক দিক দিয়ে ব্যতিক্রম মনে হলো রাজশাহী শহরটিকে। অনেকটা অনাঘ্রাতা নারীর মতো। এখনও বিভাগীয় এই শহরটির ক্ষত-বিক্ষত হয় নি। ইট-বালু-সিমেন্টের আস্তরের কাছে নিজেকে বিসর্জন দেয় নি। যে কারণে বহুতল ভবন খুব একটা দেখা যায় না। দেখা যায় না ডিজেলচালিত যানবাহন। ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার প্রাধান্যই বেশি। গাড়িঘোড়ার দাপট দেখা যায় নি। লোকজনের চলাচলও খুব একটা চোখে পড়ে নি। তেমন ধুলোবালি নেই। দূষণ নেই। প্রবাহিত হয় নির্মল বায়ু। রাস্তাÑঘাটগুলো ঢাকার চেয়েও উন্নত। এমনকি গলির মধ্যে রাস্তায়ও ভাঙাচুরা নেই। শহরটা বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। চারপাশে সবুজ বেষ্টনী। অসংখ্য গাছগাছালি। সবুজ ঘাস। টলটলে পুকুর আর দীঘি। কোথাও কোথাও কৃত্রিম হ্রদ। তবে আবহাওয়া সাংঘাতিক উত্তপ্ত। হেমন্তের শুরুতেও হিমেল হাওয়ার দেখা পাওয়া যায় নি। দিনের বেলা ঘরের বাইরে এলে বিভাবসু শরীরের রস একদম নিংড়ে নেয়।

অথচ রাজশাহী অঞ্চল এমনিতে রসে টইটম্বুর। মিষ্টান্ন সামগ্রীর যথেষ্ট সুনাম আছে। তবে পুরো এলাকা ফলফলারি আর গাছগাছালিতে ভরপুর। কোথাও একটু বীজ র্পুঁতে দিলেই বেড়ে ওঠে রসালো ফল গাছ। তবে আম, লিচু, আখ, পেয়ারা, কলা গাছের উর্বরভূমি। রাজশাহী থেকে নাটোর যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে ফলফলারির বাগান। আছে ফল গবেষণাগার। দেখে মনে হয় সবুজের উপত্যকা। প্রাকৃতিক যে সম্পদ নিয়ে রাজশাহীর অবয়ব, সেটি অটুট রাখতে পারলে শহরটি যে কাউকেই বার বার কাছে টেনে নেবে। বাংলাদেশে এমন শহর ক্রমান্বয়ে দুর্লভ হয়ে ওঠছে।    

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে

যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চরণ বুকের মধ্যে গুঞ্জরণ তুলছিল। প্রেক্ষাপটটা তখন এমনই ছিল। আসি আসি করছে সন্ধ্যা। যদিও সংগীত কিন্তু তখনও থেমে যায় নি। বরং ভিন্ন ভিন্ন সুরের আলাপনে পরিবেশটা হয়ে ওঠে মাধুর্যময়। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কলকাকলি। নদীর মৃদু সুরধুনীধারা। মানুষের কলরোল। ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যিখানে শম্বুকগতিতে বয়ে চলেছে আমাদের নৌকা। কোথাও যাবার কোনো তাড়া নেই। সময়টাকে তারিয়ে


তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। দেখছিলাম চারপাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। চলমান স্বচ্ছ পানি। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। পাখিদের ক্লান্ত উড়াউড়ি। নদীতে পর্যটনশীল পালতোলা নৌকা। দুই পাশে সবুজের সমারোহ। ভ্রমণপিয়াসীদের ছোটাছুটি। কেউ কাশবনের খোঁজে। কেউবা ক্যামেরায় প্রিয় কোনো মুহুর্ত বা মনের রাখার মতো ফ্রেমের সন্ধানে। নদীর তীরে কত রকম কারুকাজ। প্রকৃতি নামক কুম্ভকার যেন সাজিয়ে দিয়েছে মাটির তৈরি তৈজসপত্র। মাটির আস্তরণ দেখে বোঝা যায়, পলি জমে জমে গড়ে ওঠেছে এই ভূখ-। একটুখানি ভিতরেই গ্রামীণ পরিবেশ। প্রকৃতির অবারিত সান্নিধ্য। উড়ছে প্রজাপতি। একটু একটু করে নিভে আসছিল আলো। নদীর পানিতে নানান রঙের খেলা। পরিবেশটা হয়ে ওঠে মায়াবী। আলো-আঁধারিতে হঠাৎ ভেসে আসে নারী কণ্ঠে সুরেলা আওয়াজ। নদীর এই নির্জনতায় নিজকে উজাড় করে দিয়ে কে গায় এমন গান? সুরটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। গানের কলিগুলো ধরি ধরি করেও ধরা যাচ্ছিল না। ঢেউ হয়ে দুলছিল। কানটাকে অনেক বেশি সজাগ করেও নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। গানটা একটু একটু দূরে সরে যেতে থাকে। শিল্পীকে এক পলক দেখার জন্য মনটা আকুলি-ব্যাকুলি করলেও ইচ্ছেটা অপূর্ণ রয়ে যায়। অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে ফিরতে হয় নদীতটে। কূলে ফিরে আসার পর সে এক অভাবিত দৃশ্য। জোছনায় প্লাবিত চারপাশ। কেমন মোহময় হয়ে ওঠেছে নদী, নদীর তীর আর জয়নুল উদ্যান। উদ্যানের বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে ঝরছে আলোর বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে থাকেন বিনোদনপিয়াসীরা। কেউ চাতালে বসে,


কেউ ঘাসে শুয়ে ¯œাত হচ্ছিলেন জোছনায়। জোছনাগ্রস্ত হওয়ার চমৎকার একটি পরিবেশ। সঙ্গে মাতাল সমীরণ। আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে নাচতে থাকে জোনাকি। ময়মনসিংহ শহরটা মনটাকে বেশ রাঙিয়ে দিয়েছে। শহরের রূপ আগের তুলনায় বেশ খোলতাই হয়েছে। বদলে গেছে দেশের অন্যতম পুরানো শহরটি। শহরে ঢুকলেই পরিবর্তনটা ভালোই চোখে পড়ে। শহরটিকে সাজিয়ে তোলার জন্য একটা সযতœ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে নান্দনিক স্থাপত্য। তাতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক
সময়ের নানান বিষয় স্থান করে নিয়েছে। ভাস্কর্যগুলো সহজেই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এমনিতেই এই শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির সুখ্যাতি রয়েছে। এক তসলিমা নাসরিনই তো কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরো দুনিয়া। শহরের বেশ কিছু স্থাপনাও মন কেড়ে নেয়। তাতে অনুুধাবন করা যায় পুরনো সময়কে। মনটা নস্টালজিক হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শশী লজ অর্থাৎ একসময়ের মহারাজ শশীকান্ত আচার্যের বাগানবাড়িটি আকৃষ্ট না করে পারে না। ৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত শতাধিক বছরের পুরানো এই বাড়িটি এখন তার আভিজাত্য ও জৌলুশ একটুও হারায় নি। বাড়িটি দেখলেই মনে হবে, এটি কোনো রাজা বা জমিদারের বাড়ি। মূল ফটকে আছে ১৬টি গম্বুজ। ভবনের সামনে রয়েছে বাগান। তাতে শোভা পাচ্ছে ফুল ও দুর্লভ সব গাছ-গাছালি। বাগানের অন্যতম আকর্ষণ শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। তার মাঝে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা ¯œানরতা মর্মর মূর্তি। এটি যেন ইউরোপীয় ঘরানার কোনো ভাস্কর্য। বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের আবেশ। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে যখন ভবনটিতে যাই, তখন কেউ আপ্যায়িত করার জন্য উপস্থিত ছিলেন না। যে কারণে বাড়ির একদম ভিতরেও প্রবেশাধিকার ছিল না।

বোধকরি মূল ভবনে সর্বজনকে এখন ঢুকতে দেওয়া হয় না। শশী লজ অবশ্য দীর্ঘ দিন মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাইরে থেকে বাড়িটাকে যতটা দেখা যায়, ততটাই অবলোকন করি। তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাই। অচিরেই এটি দর্শনীর বিনিময়ে উম্মুক্ত করা হবে বলে জানা যায়। ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ এলাকাটি বেশ জমজমাট। পুরো এলাকায় আছে বনেদিয়ানার ছোঁয়া। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও পুরানো দুই ক্লাব ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও পন্ডিতপাড়া ক্লাব সহ বিভিন্ন ক্লাবের অবস্থান সার্কিট হাউজ মাঠের লাগোয়া। এ এলাকাটিকে অভিহিত করা হয় ক্রীড়া পল্লী হিসেবে। এই মাঠ থেকেই ওঠে এসেছেন জাতীয় পর্যায়ের অনেক নামজাদা ক্রীড়াবিদ। উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার অভিলাষ ঘোষ, নগেন দে, রাখাল মজুমদার, পাখী সেন, মোশাররফ হোসেন কালা, রজব আলী, অহি গুহ রায়, জ্যোতিষ কর, জগজীবন দত্ত, গণেশ ঘোষ, পরেশ মুখার্জি, নিধু মজুমদার, খালিক, দেবীনাশ, হালিম, কিবরিয়া বাবুল, মিলু প্রমুখ। ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালা, বেলায়েত হোসেন বেলাল, আজহার হোসেন, অলোক চক্রবর্তী, হারুনুর রশিদ লিটন, সাইফুল ইসলাম, মাহববুল আলম সেলিম, শরীফুল হক প্লাবন, সানোয়ার হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, শুভাগত হোম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্যের নামে ১৯১৫ সালে প্রবর্তন করা হয় দেশের অন্যতম পুরানো টুর্নামেন্ট সূর্যকান্ত শিল্ড। দীর্ঘ দিন এই টুর্নামেন্টটি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এই মাঠে ফুটবল খেলেছে ব্রিটিশ ফুটবল দল ইসলিংটন কোরিন্থিয়ান, কলকাতা মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব সহ বিখ্যাত অনেক ক্লাব ও খেলোয়াড়রা। মহারাজা ট্রফি নামে আয়োজন করা হয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ক্রীড়া ঐতিহ্যের সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঠটি ক্রীড়াবিদদের পদচারণায় সরগরম থাকে। কেউ ফুটবল খেলছেন। কেউবা ক্রিকেট। পাশেই সাহেবিয়ানা নিয়েই আছে সাহেব কোয়ার্টার। সরকারি কর্মকর্তাদের এই আবাসিক এলাকাটিও তার অতীতের ঐতিহ্য অটুট রেখেছে। বিশাল চত্বর নিয়ে এক একটি বাসা। চারপাশে সবুজের আচ্ছাদন। নিরিবিলি পরিবেশ। যেন স্বর্গীয় কানন। সাহেব কোয়ার্টারের দৃষ্টিনন্দন পার্কটি এখন শহরের প্রধান আকর্ষণ। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই পার্কটি হয়ে ওঠেছে বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে পার্কটিকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যান’। কত যে গাছগাছালি। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তাতে আছে ফল গাছ। ঔষধি গাছ। জানা-অজানা রকমারি গাছ। ঢেকে দিয়েছে রোদেলা আকাশটাকে।

সবুজের এই মনোরম আচ্ছাদন পার্কটির শোভা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। আছে বিভিন্ন ডিজাইনের আধুনিক চাতাল। ছায়াতরু ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে শেড। ফোয়ারা। ব্যায়ামাগার। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড। অনায়াসেই যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছে এটি উপভোগ্য একটি স্থান। ভোরের আলো ফোটার আগেই পার্কটি জমজমাট হয়ে ওঠে। কেউ হাঁটছেন। কেউ দৌড়াচ্ছেন। কেউবা এক্সারসাইজ করছেন। বিশুদ্ধ হাওয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছেন বুক ভরে। কেউ কেউ সেরে নিচ্ছেন অভিসার। ধুমছে আড্ডাও চলছে। কাউকে কাউকে দেখলাম, বাসার কাজ দিব্যি পার্কে বসে সেরে নিচ্ছেন। বিকেল হলে তো রীতিমতো মেলা বসে যায়। কেউ নৌকায় ঘণ্টা চুক্তিতে নদীতে ঘুরতে ঘুরে বেড়ান। কেউ হাঁটতে আসেন। কেউ ¯্রফে ঘুরতেই আসেন। পার্কে চা-নাস্তা, চটপটি, ঝালমুড়ি সহ আছে হরেক খাবারের আয়োজন। নদীর তীরটি ব্লক দিয়ে বাঁধাই করা। তীর বেয়ে চলে গেছে সিমেন্টের দীর্ঘ হাঁটা পথ। সেই পথ বেয়ে অনেকটা পথ চলে যাওয়া যায়। পার্কে আয়োজন করা হয় পহেলা বৈশাখ সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। নদীর তীর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাওয়া যায়, গড়ে তোলা হয়েছে ‘বিপিন পার্ক’। পার্কটি বেশ আধুনিক। নির্মিত এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান বিপিন সেনের নামে। এই পার্কটিও সারাদিনমান মুখরিত থাকে। পুরানো ব্রহ্মপুত্রের নদের তীরে চার দশকের বেশি সময় আগে গড়ে তোলা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। গড়ে তোলার সময় জীবিত ছিলেন খ্যাতিমান এই চিত্রশিল্পী। এটি প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর অন্যতম একটি স্বপ্ন। তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের সন্তান। ব্রিটিশ আমলে গড়ে তোলা একটি দোতলা বাসভবনে গড়ে ওঠেছে এই সংগ্রহশালা। ছায়াবীথির মাঝে সংগ্রহশালাটি শিল্পরসিকদের প্রলুব্ধ করে থাকে। এখানে সংরক্ষিত আছে শিল্পীর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। এছাড়াও আছে শিল্পীর ব্যবহার্য কিছু নিদর্শন। অবশ্য চাইলে সংগ্রহশালাটি আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। হালে সংগ্রহশালার পারিপার্শ্বিক পরিবেশটি মনোরম করে তোলা হয়েছে। সংগ্রহশালার সামনেই স্থাপন করা হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ ভাস্কর্য। সামনের উদ্যানটি ঢেলে সাজানোর কারণে এর সৌন্দর্য অনেকখানি বেড়ে গেছে। শহরের কেন্দ্রে গাঙ্গিনারপাড় মোড়ের শাপলা স্কোয়ারটি সদা ব্যতিব্যস্ত থাকে। একই সারিতে প্রেস ক্লাব, বইয়ের দোকান, কফি হাউজ, ‘সারিন্দা’র মতো পশ খাবারের দোকান সহ কেনাকাটার জন্য এলাকাটি সারাক্ষণই জমজমাট। স্টেশন রোডের ‘কৃষ্ণা কেবিন’-এর মিষ্টির বেশ কদর আছে। চলার পথে অনেকের সঙ্গে কথায় কথায় জানা যায়, ময়মনসিংহ শহরটির সৌন্দর্য ও শোভা বর্ধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তরুণ মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু। এ ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে চলেছেন মহাপরিকল্পনা নিয়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একপাক ঘুরে না আসলে ময়মনসিংহ শহরটি অসম্পন্ন রয়ে যায়। বিশাল এই চত্বরটি কৃষি শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ একটি প্যাকেজ। এটিকে বলা যেতে পারে আধুনিক একটি গ্রাম। কী নেই? পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। আছে সবুজের বিস্তৃত অরণ্য। ফল-ফুল-গাছগাছালি-শাকসব্জি-মাছের পুকুর-ফসলের জমি। এসব নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আছে পাখির কলতান। এমনকি দেখা যায় বকও। রাতের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়টি যে নিঝুম গ্রাম হয়ে যায়, সেটা অনুমান করা যায়।


আছে রোমান্টিক নির্জনতা, যেখানে শহীদ কাদরীর কবিতার মতো ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে’। তবে হেঁটে হেঁটে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টি একদিনে পরিদর্শন করা সহজ কাজ নয়। সেক্ষেত্রে একটি অটোরিক্সা একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত ছুটিয়ে নিতে পারে। সেটি হতে পারে আনন্দময় এক ভ্রমণ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব খুব বেশি নয়। যাঁরা নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যপিয়াসী তাঁরা চাইলেই চট করে শহরটিতে ঘুরে আসতে পারেন। যতটা শুনেছি, সেই সত্তর দশকের শেষদিকে তো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে গিয়ে প্রেম করতেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে। অনুরূপভাবে তসলিমাও রুদ্র’র সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে আসতেন ঢাকায়। আর এখন তো অনেক উন্নতি ঘটেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার। যাতায়াতে খুব বেশি সময়ও লাগে না। সকালে গিয়ে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বিকেলেই ফিরে আসা যায়। বেড়ানোটা নেহাত মন্দ হবে না। ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে যেভাবে চিত্ত-বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, তা দেখে একরাশ আক্ষেপও হয়। আমরা আমাদের প্রধান একটি সম্পদ বুড়িগঙ্গা নদীটিকে ক্রমান্বয়ে রীতিমতো হত্যা করে চলেছি। অথচ এই নদীটিকে ঘিরে কত কিছুই না করা সম্ভব। এটি হতে পারে ঢাকা শহরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। ময়মনসিংহ যদি পারে, তাহলে রাজধানী হয়েও ঢাকা কেন পারবে না? ময়মনসিংহ ঘুরে আসার পর এ প্রশ্নটি মাথার মধ্যে অহর্নিশ ঘুরপাক খাচ্ছে।

সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৬

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি



এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা পালাই পালাই ভাব। কিন্তু কোথাও পালানো হয় না। চাইলেও এ শহর ছেড়ে যাওয়া হয় না। আসলে আলসেমির কারণে চেনা ছকের বাইরে কোথাও যেতেও ইচ্ছে করে না। তারপরও বেশ কিছু দিন ধরেই বুকের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে থাকে, ‘দূরে কোথায়....... দূরে..... দূরে...’। সব বন্ধন ছিন্ন করে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার জন্য মনটা ভীষণভাবে আইঢাই করছিল। আর বুকের মধ্যে যখন কোনো কিছু চেপে বসে, সেটা থেকে পরিত্রাণ না পেলে স্বস্তিও মেলে না। আর এই স্বস্তির জন্যই যেখানে মেঘ আছে, যেখানে বৃষ্টি আছে,
যেখানে পাহাড় আছে, আছে নদী-নালা, আছে জোছনা-জোনাকি, তেমন কোথাও যাওয়ার জন্য মন ছুটে যায়। ছুটে যাওয়া মনটাকে তো আর আটকে রাখা যায় না। আকাশে জোছনা উঁকি মারতে দেখে মনে হলো ঘুরে আসা যাক ‘জোছনা ধরার কারিগর‘ হুমায়ূন আহমেদ-এর জন্মভূমিতে। তাঁর লেখায় তো ফুটে ওঠেছে নেত্রকোনার মানুষের জীবনযাপন। তাতে সারল্য যেমন আছে, আছে গরলও। সেই মানুষদের কাছ থেকে দেখার একটা ইচ্ছে তো ছিলই। তাছাড়া নেত্রকোনারই কৃতী সন্তান ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী ’ কবি নির্মলেন্দু গুণ আর প্রেমের কবি হেলাল হাফিজ। এই মাটিতে এমন কী জাদু আছে? যে কারণে এই কবিরা এমন সব কবিতা লিখেছেন, যা কবিতা অনুরাগীদের মুখে মুখে ফেরে। সেটাও অনুধাবন করতে চেয়েছি। সব মিলিয়ে না দেখা ভাটির দেশটির প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করতে থাকি। যদিও তাল পাকা এই গরমে কোথাও ঘুরতে যাওয়া সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়। তারপরও সব পিছুটানকে উপেক্ষা করে ‘মন চলে যায় বন্ধুর দেশে’। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ যাওয়ার পর ভালোই হোঁচট খেতে হয়। বাস স্টেশন থেকে নির্বিকারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের গন্তব্য সুসং দুর্গাপুর অব্দি ইদানিং কোনো বাস চলাচল করে না। রাস্তার গতিক নাকি মোটেও সুবিধের নয়। যেতে হবে ভেঙে ভেঙে। বাধ্য হয়ে জারিয়া পর্যন্ত সিএনজি রিজার্ভ করতে হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, কত ধানে কত চাল।

এ রাস্তায় চলাচলের জন্য অদম্য সাহস আর ফিজিক্যাল ফিটনেস যে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার, সেটা আগে জানা ছিল না। ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে সিএনজি চলছিল, তাতে করে চালক মহাশয় একটু বেচঈন হলে যে কোনো অঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কখনও কখনও রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি কিনা সেটা নিয়ে বিভ্রম সৃষ্টি হয়। কোথাও ঢাউস ঢাউস গর্ত, কোথাও সংকীর্ণ পথ, কোথাও কোথাও বিমূর্ত চিত্রকলার মতো দুর্বোধ্য। সেটা বুঝতে গেলে হকচকিয়ে যেতে হয়। অবশ্য দিগন্তবিস্তৃত সবুজ, রকমারি গাছগাছালি, রোয়ানো আমন ধান, খাল-বিল-হাওর-পুকুর, বর্ষার জমে থাকা টলটলে পানি, শাপলা-শালুক, মাছ ধরার সরঞ্জামাদি, ঘাস খাওয়ায় মগ্ন গরুর পাল, উড়ে উড়ে যাওয়া মেঘের ভেলা চোখের জন্য ছিল আরামদায়ক। আর ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’ মনটাকে ক্ষণে ক্ষণে উদাস করে দিচ্ছিল। ঘণ্টা দুয়েক অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে পোঁছাই কংস নদের তীরে। ঘেয়ে-নেয়ে একদম একাকার অবস্থা। শরীরটা যেন ঝরনা হয়ে যায়। ঘামের সঙ্গে বালুর সংমিশ্রণে শরীর চিটচিট করছিল। পুরো এলাকায় উড়তে থাকে বালু। কংসকে এখন আর নদী বলে মনে হয় না। একসময়ের খরস্রোতা নদটি ভরাট হতে হতে নাব্যতা সংকটে ভুগছে। পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বালি আর পলি পড়ে পড়ে নদীটি তার গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে। জারিয়া-ঝানজাইল কংস নদে বাঁধ দিয়ে নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। আগেকার বেইলি ব্রিজটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর এ কারণে এ পথে স্বাভাবিক চলাচল থমকে গেছে। বালি পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারও ভালো অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। এ নিয়ে কাউকে খুব একটা বিচলিত মনে হলো না। 
 

নৌকায় কংস নদী পেরিয়ে ঝানজাইল বাজার যাওয়ার পর মনে হলো, যে পথটুকু পাড়ি দিয়ে এসেছি, সেটা তো ঢের ঢের ভালো ছিল। এখন দেখি, আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে মরণফাঁদ। সিএনজিতে ওঠার পর প্রতি মুহূর্তে ‘বিপথে’ যাওয়ার তীব্র হাতছানি। রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে বেহাল। একটুখানি এদিক-সেদিক হলেই ছিটকে পড়তে হবে। বালু আর কাদার সঙ্গে রীতিমতো লড়াই আর সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে করতে এগিয়ে যেতে হয়। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে সাইড দিতে গেলে হৃকম্পন শুরু হয়ে যায়। আর বৃষ্টির দিনে রাস্তাঘাটের হালত নাকি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অথচ পথিমধ্যে স্থানীয় একজন আদিবাসী ভদ্রলোক জানালেন, একসময় তিনি নাকি প্রতিদিন দুর্গাপুর থেকে ঢাকায় অফিস করতেন। তাঁর কথা শুনে বর্তমানে রাস্তাঘাটের হাল দেখে তাঁর দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দুর্গাপুরে ঢোকার মুখে সোমেশ্বরী নদীর উপর নির্মিত ব্রিজটিও দাঁড়িয়ে আছে হুমকি হয়ে। যাহোক, সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে পৌঁছে যাই ‘দুর্গম গিরি কান্তার’ দুর্গাপুরে। আগে থেকে নির্ধারিত জেলা পরিষদের বিবর্ণ ডাকবাংলায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই। এ এলাকার প্রধান বাহন মূলত সিএনজি, অটো রিক্সা আর মটর সাইকেল। একটি অটো রিক্সার সঙ্গে রফা করে অচেনা নেত্রকোনার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। চালকই আমাদের ফ্রেন্ড-ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। শুরুতেই নেত্রকোনা বুকের মধ্যে জাগিয়ে দেয় বিপ্লবের স্পন্দন।

তেভাগা টঙ্ক নানকার আন্দোলনের স্মৃতিরক্ষা কমিটির উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের নেতা ও স্থানীয় সন্তান কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে চল্লিশের দশকে এই আন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালিত হয়। সেই আন্দোলন কাঁপিয়ে দিয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। প্রতি বছর তাঁর স্মরণে আয়োজন করা হয় মণি সিংহ মেলা। নির্জন স্মৃতিস্তম্ভের পাশের পুকুরে বিশ্রাম নেওয়া হাঁসগুলো বাড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের খানিকটা ছটা। ফুটবল খেলা যে এখনও গ্রামের মানুষের প্রিয়, সামনের মাঠে স্থানীয় যুবকদের খেলতে দেখে সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। একসময় সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। দীর্ঘকাল এ এলাকা পর্যায়ক্রমে শাসন করেন সোমেশ্বর পাঠক ও তাঁর বংশধররা। সেই স্মৃতি বহন করছে উপজেলা রোডের সুসং দুর্গাপুর মহারাজার সবুজ পরিবেষ্টিত দু’আনি বাড়ি। এই বাড়ি এখন ‘দ্য চাইল্ড প্রিপারেটরি স্কুল’। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হওয়ার পর রাজবংশের সদস্যরা ভারতে চলে যান। তাঁরা না থাকলেও তাঁদের নির্মিত বাড়িগুলো এখনও নজর কেড়ে নেয়। এত রঙদার বাড়ি সাধারণত দেখা যায় না। এই রঙ কি হাল আমলে করা? টিনের চালা দেওয়া বাড়ি হলেও এর সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি।

চারপাশে গাছপালা আর ফুলের গাছ। দেওয়ালে টাঙানো হিন্দু দেব-দেবতাদের ছবি। মেঘালয়-নেত্রকোনা সীমান্ত সংলগ্ন গোপালপুর এলাকা। যেতে হয় সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে। সবুজের বাগিচার মধ্যে দিয়ে কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। পাশ দিয়ে পাহাড়ি ঝরনা থেকে নিঃসৃত জল নালি বেয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। চীনা মাটির পাহাড় বেয়ে ওঠলেই দেখা যায় ভারতীয় সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়া। তা দেখার জন্য বিকেল হলে দলে দলে মানুষ ছুটে আসেন। এ এলাকায় গারো ও হাজং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আধিপত্য। তাঁরা নিজেদের মতো করে বসবাস করছেন। অপ্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করেন বলে মনে হলো না। বিভিন্ন এনজিও এখানে বেশ সক্রিয়। আদিবাসী মেয়েরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য দূর-দূরান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটে যায়। কেউ ছাতা মাথায় হেঁটে হেঁটে। আবার কেউ কেউ সাইকেল চালিয়ে। সবাই লক্ষ্যে অবিচল। বিকেল বেলায় সোমেশ্বরী নদীর কাছাকাছি একটি গ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পাওয়া যায় গ্রামীণ দৃশ্যপট। এক কিশোরীর নৌকা বেয়ে চলা, দুটি গরুর শক্তির লড়াই, ভাসান জাল দিয়ে মাছ ধরা, নিজস্ব কায়দায় শিশুকোলে আদিবাসী তরুণীর হেঁটে চলার চিরায়ত প্রতিচ্ছবি। যেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠা জীবন্ত সব চিত্রকাব্য। সেইসঙ্গে দূরের পাহাড়ের হাতছানি।


যদিও মৃদু মন্থরে সন্ধ্যা নেমে আসায় বেশি দূর যাওয়া হয় নি। নেত্রকোনার আনন্দ ও গর্ব সোমেশ্বরী নদী। ভারতের মেঘালয়ের বৃষ্টি আর ঝরনাধারা থেকে এ নদীটির উৎপত্তি। এ নদীটি দু’হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে রেখেছে নেত্রকোনার অনেকখানি এলাকা। কোথাও কোথাও মিলেছে কংস নদের সঙ্গে। আটরাখালি ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কিছুটা দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায় শীর্ণকায় নদীটির বয়ে যাওয়া। দেখা যায় অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা। এ দৃশ্য দেখার জন্য ব্রিজে ভিড় বাড়তে থাকে। বৈকালীন আড্ডার জন্য জায়গাটি অনেকের কাছেই প্রিয়। তবে নদীটিতে পানির একদমই প্রবাহ নেই। শাওন মাসেই কেবল নদীটি ফিরে পায় তার যৌবনজোয়ার। দুর্গাপুরের পরিচিত একটি স্থান বিরিশিরি। এখানে উপজাতীয় সংস্কৃতি চর্চার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি। আলো-আঁধারিতে এই একাডেমিতে যাই। কিন্তু রাতে এর কোনো কার্যক্রম ছিল না। ধবধবে জোছনায় বিরিশিরিকে মনে হতে থাকে মায়াপুরী। একটু অন্ধকার হলেই জোছনায় মাখামাখি হয়ে যায় পুরো সুসং দুর্গাপুর। কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মতো ‘আমি ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া/জোছনা ধরতে যাই/হাত ভর্তি চান্দের আলো/ধরতে গেলে নাই।’ জোছনায় অবগাহন করার জন্য রিক্সা নিয়ে ছুটে যাই সোমেশ্বরের কূলে আটরাখালি ব্রিজে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ। নদীর চরে ঝিকিয়ে ওঠছিল আলোকরশ্মি। কিন্তু মটর সাইকেলের হর্ন আর ক্ষণে ক্ষণে উটকো আলোর কারণে ধ্যানস্থ হয়ে জোছনার সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছিল না। ফিরে আসি আমাদের আবাসস্থলে। ঈদগাহের পাশ দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে চলে গেছে পিচঢালা অপ্রশস্ত পৌরসভা সড়ক। চারপাশ নির্জন। নিরিবিলি। নিঃশব্দ। মাথার উপর কেবল চাঁদের বাঁধ ভাঙা হাসি। ঝরনাধারার মতো সেই হাসিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে হৃদয়। রাস্তার পাশের ঝোঁপের আড়ালে দেখতে পাওয়া যায় জোনাকিও। মনের আনন্দে ছোটাছুটি করছে। জোছনা আর জোনাকির মধ্যে দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেঁটে যেতে থাকি। কী যে মোহময়। কী যে মায়াময়। কী যে মুগ্ধকর। সঙ্গী সুধীর কৈবর্ত দাসের সুরেলা কণ্ঠে পরিবেশিত হতে থাকে একটির পর একটি মন কেমন করা গান। পরিবেশটি আরো বেশি মাদকতাময় হয়ে ওঠে। রাত যত গভীর হচ্ছিল, আমরা ততই যেন জোছনাগ্রস্ত হচ্ছিলাম। ছুটতে থাকি আলেয়ার পিছনে। কিন্তু অনেক দূর যাওয়ার পর আমাদের হুস হয়। আরে! আমরা তো অনেকটা পথ চলে এসেছি। অথচ এ পথ চিনি না। এর গন্তব্যও জানি না। এই শহরে আমরা নবাগত। এসেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। এতটা ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হলো? এমন প্রশ্ন মনে উদয় হতেই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়। তাতে অবশ্য খুব একটা আক্ষেপ ছিল না। আমরা যতটা পারি জোছনায় ভিজেছি। উপভোগ করেছি জোছনার সান্নিধ্য।

পরের দিন সকালে তেরী বাজার থেকে নৌকায় সোমেশ্বরী নদী পাড়ি দেই। এ সময় নদীটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। স্রোতহীন নদী। বর্ষাকালে নদীটি ভরাট থাকলেও এরপর নদীটিতে টান পড়ে। তখন হারিয়ে যায় এর রূপ-রস-গন্ধ। নদী থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ভেসে আসা কয়লা, নুড়িপাথর ও বালি। কয়লা আর বালি এ এলাকার প্রধান সম্পদ হয়ে ওঠেছে। নদী পেরিয়ে অপর পাড়ের শিবগঞ্জ বাজারে যেতে হলে হাঁটু পানিতে নেমে পড়তে হয়। জুতা খুলে আর প্যান্ট গুটিয়ে নেমে পড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জলধারায়। তীব্র তাপদাহেও শীতল অনুভূতি হয়। জুড়িয়ে যায় মনপ্রাণ। মনে পড়ে যায় শৈশবে পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’ : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে/পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি/দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি/চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা।’ বাস্তবিকই এই কবিতার সঙ্গে ভাদ্রের সোমেশ্বরী নদীর একটুও অমিল নেই। শিবগঞ্জ বাজারে যেন আমাদের অপেক্ষায় মটর সাইকেল নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। যাওয়ামাত্র আমাদের নিয়ে ছুটে চলার জন্য তর সইছে না। দরাদরি করে চেপে বসি মটর সাইকেলে। নেত্রকোনার অন্যতম আকর্ষণ সাদা মাটির পাহাড়। মেঠোপথ দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে আমাদের বাহন।

দুর্গাপুর উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বিজয়পুর গ্রামে ব্যতিক্রমধর্মী এই পাহাড়। যেন বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই একবুক দুঃখ নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। নীরবে করে চলেছে অশ্রুপাত। এ অশ্রু থেকেই যেন সৃষ্টি হয়েছে জলাশয়ের। সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্তশিষ্ট নীল পানির আধারটি মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। শীতকালে এই পানির রঙ হয়ে ওঠে নীলনয়না নারীর মতো। তখন নাকি একদমই চোখ ফেরানো যায় না। পাহাড়ে রয়েছে অনেক অবগুণ্ঠিত গুহা। রহস্যময়তার কারণে সেদিকে কেউ পা মাড়ান না। সাদা মাটি সিরামিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে এর চাহিদা অনেক। তাই কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই পাহাড় ও টিলা কেটে কেটে সংগ্রহ করা হয় এই মাটি। এমনকি মাটি কেটে নিয়ে অকারণেই রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্যের এই আকরখনি। মানা হচ্ছে না আদালতের নির্দেশনাও। যা কিছু অমূল্য সম্পদ, তা নিষ্ঠুরভাবে সংহার করার জন্য আমরা যেন মুখিয়ে থাকি। বিজয়পুরে ঢোকার মুখে বহেড়াতলীতে স্থাপন করা হয়েছে টঙ্ক ও কৃষক আন্দোলনের নেত্রী হাজংমাতা শহীদ রাশিমণির স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিরোধ আন্দোলনে সৈন্যদের গুলিতে নিহত হন রাশিমণি ও তাঁর সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজং। তাঁদের স্মরণে প্রতি বছর স্মৃতি সৌধ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় রাশিমণি স্মৃতি মেলা। এ মেলায় ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকেও অনেকেই যোগ দেন। মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কমলা পাহাড় নামে পরিচিত স্থানে শীতকালে কমলার ফলন হয়। উঁচু এই পাহাড়ে উঠতে বেশ ঘাম ঝরাতে হয়। পাহাড়ের উপর স্থাপন করা হয়েছে বড় একটি টাওয়ার। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যায় মেঘালয়ের আকাশ। অনেকটা ভিতরের দিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়ে তোলা পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় রাণীখং ক্যাথলিক চার্চ। ঢোকার মুখে ডান পাশে রাণীখং উচ্চ বিদ্যালয় ও ডাকঘর।


পাহাড়ের উপর ১৯১২ সালে গড়ে তোলা সাধু যোষেফের ধর্মপল্লীতে স্বাগত জানায় যিশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য। তাঁর কোলে একটি শিশু। চারপাশে ছড়ানো খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন স্থাপনা। আছে ধর্মপাল বিশপ হার্জ আর পাঁচ গারো হাজং আদিবাসীর ভাস্কর্য, কারুকার্যম-িত ক্যাথলিক গির্জা, সাধু যোষেফের ভাস্কর্য, মিশন পরিচালিত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল। গাছ-গাছালি আর ফুলের বাগান দিয়ে পুরো চত্বরটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে এটি হয়ে ওঠেছে ভাস্কর্যের নন্দনকানন। রোদে পুড়ে পাহাড়ের নির্জনতায় শান্তি কুটির বিশ্রামাগারে গিয়ে শরীর জুড়িয়ে যায়। সেইসঙ্গে চোখও। পেছনের গরাদে দিয়ে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় সৌন্দর্যের রাশি রাশি প্রাচুর্য। পাশ দিয়ে মন্থর গতিতে বয়ে চলেছে সোমেশ্বরী নদী। তাতে সারি সারি ডিঙি নৌকা। কয়লার সন্ধানে মগ্ন জীবিকাজীবীরা। ভারতীয় সীমানার দিকে তাকালে বুকের মধ্যে বেজে ওঠে কানন দেবীর গাওয়া কাজী নজরুল ইসলামের অমর সেই গান, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’। (ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফ একটু সদয় হলে কিছু পাহাড় হাতের নাগালেই পাওয়া যেত।) রৌদ্রকরোজ্বল আকাশের নিচে এক একটি মুহুর্ত যেন জলরঙে আঁকা দুর্লভ সব ছবি। একটুক্ষণের জন্যও চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, পুরোটাই সাজিয়ে রাখি হৃদয়ের গ্যালারিতে। এমন সঞ্চয়ের জন্য এ স্থানে ফিরে ফিরে আসতে হয়।

রবিবার, ৮ মে, ২০১৬

গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতনে উৎসবের কোনো কমতি নেই। বলা যায়, পুরো বছরই উৎসবমুখর থাকে। রবীন্দ্র জন্মোৎসব ও তিরোধান বা বৃক্ষরোপণ দিবস, পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব সহ বিভিন্ন ঋতুগুলো বেশ ঘটা করে উদযাপন করা হয়। এর বাইরেও আছে রকমারি উৎসব। এসবকে কেন্দ্র করে সংগীত, নৃত্য, নাটক, আবৃত্তি সহ নানামুখী কর্মকা-ে বছরভর মুখর থাকে এ আশ্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র। শান্তিনিকেতনে যাঁরা যেতে চান, তাঁরা সাধারণত কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করেই বোলপুরে রওয়ানা হন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরুতে আমরা যখন আশ্রমে পোঁছাই, সেখানে কোনো উৎসব ছিল না। আনন্দ ছিল না। খুব বেশি জনসমাগমও ছিল না। বরং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংরক্ষণ প্রথা তুলে দেওয়ায় চলছিল কঠিন ধর্মঘট। যে কারণে সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছিল না। এমনিতেই উৎসববিহীন শান্তিনিকেতন, তার ওপর ধর্মঘট, এমন অবস্থায় অনেক দূর থেকে সেখানে যেয়ে যে কারোই মুষড়ে পড়ার কথা। তবে আমরা মোটেও হতোদ্যম হই নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শান্তিনিকেতন আমাদের জীবনে অন্য রকম ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। তারপ্রতি আবেগময় এক আকর্ষণ অনুভব করি। সংগত কারণে জীবনে প্রথমবার শান্তিনিকেতন যাওয়াটাই ছিল আমাদের কাছে বড় উৎসব। অন্য কিছু সেই উৎসবকে ম্লান করতে পারে নি। হাওড়া স্টেশন থেকে যখন ‘শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস’-এ ওঠি, তখন থেকেই বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।

এটি আরো বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠে, একজন স্মার্ট অন্ধ ভিক্ষুক গায়কের কল্যাণে। অনেকটা পথ তিনি একটির পর একটি রবীন্দ্র সংগীত গাইতে থাকেন। ট্রেনের দোলন আর সুরে সুরে মজে যাই। এছাড়া পথের দুই পাশ দেখছিলাম বুভুক্ষু নয়নে। এ পথ দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত কতবার যাতায়াত করেছেন। আশপাশের বাড়িÑঘর, গাছ-গাছালি, আলো-হাওয়া, জীবনযাত্রা তাঁর মনকে নিশ্চয়ই প্রভাবিত করেছিল। তা থেকে মেতেছেন সৃষ্টির আনন্দে। মনের চোখে সেটা অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। সেটা অনুভব করতে করতে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের জার্নি কখন যেন ফুরিয়ে যায়। তখনও মাঘ মাস পুরোপুরিভাবে শেষ না হলেও কড়া রোদ আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। তারপরও এককালের ভুবনডাঙার লালমাটি স্পর্শ করার পর মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। নামার পরই মনে হচ্ছিল চারদিকে যেন ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিশ্বাস-প্রশ্বাস। সেখান থেকে টেম্পোতে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দিতে পাচ্ছিলাম লালমাটি আর সবুজের হাতছানি। মুগ্ধতার আবেশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম গন্তব্যে। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠেছে শান্তিনিকেতন। সেখানে পৌঁছানোর পর একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। সবটাই মনে হতে থাকে অনেক দিনের চেনা। চাক্ষুষ হয়তো কখনো দেখি নি (টেলিভিশন, বইপত্র-এ দেখার কথা বাদই দিলাম), তবে মনের চোখে তো কম দেখা হয় নি। তারসঙ্গে একটু একটু করে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। পেশাদার গাইড সঙ্গে থাকায় বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাই। ভদ্রলোকের এটা রুটি-রুজি হলেও যেভাবে হৃদয়গ্রাহীভাবে সব কিছু তুলে ধরছিলেন, তাতে বুঝতে পারা যায়, তাঁর হৃদয়জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৬২ সালে রায়পুরের জমিদারের আমন্ত্রণে রবি ঠাকুরের পিতা ব্রাহ্মè সমাজের নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দু’টি ছাতিম গাছ দেখে সেই গাছের তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এখানেই তিনি ‘আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’ পেয়েছিলেন।

 জায়গাটা তাঁর এত ভালো লেগে যায় যে রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে গ্রহণ করেন ২০ বিঘা জমি। সেই জমিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন উপাসনার জন্য দোতলা একটি বাড়ি। তাঁর নামকরণ করেন ‘শান্তিনিকেতন’। পর্যায়ক্রমে পুরো এলাকাই পরিচিত হয়ে ওঠে এ নামে। ১৮৭৩ সালে ১২ বছর বয়সে এখানে প্রথম আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর থেকেই তাঁর ছিল নিয়মিত যাওয়া-আসা। ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর গড়ে তোলেন ব্রহ্ম বিদ্যালয়। সেই সময় থেকে জীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটে যায় যায় শান্তিনিকেতনে। সবাইকে আমন্ত্রণ জানান এই তীর্থকেন্দ্রে, ‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে/এসো করো স্মান নবধারাজলে’। ‘প্রাণের মধ্যে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা’র লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যালয়টি রূপান্তরিত করে ১৯১৯ সালে ১৮ জুলাই গড়ে তোলা হয় ‘বিশ্বভারতী’। রবীন্দ্রনাথের ভারত ভাবনা ও বিশ্ব ভাবনার মিলিত রূপই এই বিশ্বতীর্থ। এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন ঃ ‘এখানে বিদ্যা আহরণ ও জ্ঞানচর্চার জন্য বিচিত্র মানব আসিয়া একটি নীড় বাঁধিবে’। পরবর্তীতে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এখানকার জীবনদর্শন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কারজয়ী চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ। এছাড়া কত কত বিখ্যাত জনের পদস্পর্শ লেগে আছে এখানকার মাটিতে। সেইসঙ্গে শান্তিনিকেতন থেকেই একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে উনিশ শতকের নবজাগরণের আলো। শান্তিনিকেতনের ছায়াবীথিতলে একে একে পরিচিত হই ছাতিমতলা, বকুলবীথি, শান্তিনিকেতনের বাড়ি, উপাসনাগৃহ বা মন্দির, তালধ্বজ বাড়ি, তিনপাহাড়, আ¤্রকুঞ্জ, দেহলি, গৌরপ্রাঙ্গণ ও ঘণ্টাতলা, গৌরমঞ্চ, শমীন্দ্র শিশু পাঠাগার, পাঠভবনের অফিস, চৈতি, ছাত্রী নিবাস, ব্ল্যাক হাউজ, সংগীত ভবন, কলাভবন, মালঞ্চ বাড়ি, নাট্যঘর, নন্দন ইত্যাদির। এছাড়া দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবাসস্থল উদয়ন, কোণার্ক, উদীচী, বেনুকুঞ্জ, দিনন্তিকা চা চক্র, সন্তোষালয়, চীনাভবন, হিন্দিভবন, দ্বিজবিরাম। দেখতে দেখতে মনের মধ্যে বাজতে থাকে, ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’।

হায়! ঠাকুর তো নেই। কে খুলে দেবেন ঘরের দরজা? প্রতিটি ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। ধর্মঘটের কারণে রবীন্দ্র মিউজিয়ামে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সময় না থাকায় যেতে পারি নি ডিয়ার পার্ক, আমার কুঠির, শ্রীনিকেতন, খোয়াই এর মতো দর্শনীয় স্থানে। ‘সেই নিভৃতে, সেই নির্জনে, সেই বনের মর্মরে, সেই পাখির কূজনে, সেই উদার আলোকে, সেই নিবিড় ছায়ায়’ ক্ষণিকের অতিথি হয়ে শান্তিনিকেতনের বিশ্বপ্রকৃতির সুর আর মানবাত্মার সুর অনুধাবন করা মোটেও সহজ নয়। সেই চেষ্টাও করি নি। কেবল অবলোকন করেছি তাঁর কীর্তি, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর স্বপ্নকে। চোখের আলোয় যেটুকু দেখা, সেটুকুই অন্তরে গেঁথে নিয়ে এসেছি। যদিও মনটা সেখান থেকে সরে আসতে চাইছিল না। ফেরার সময় বুকের মধ্যে গুঞ্জরিত হচ্ছিল, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন, মন রে আমার’। মনটা ফেলে এলেও ফিরে এসেছি রবির ভুবনভরা আলোর ছোঁয়া নিয়ে।

শনিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৬

জীবন যেখানে থমকে থাকে


অনেক দিন পর যেতে হলো পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে। একটা সময় সদরঘাট লঞ্চ ঘাট এবং পরবর্তীতে আরিচা ফেরি ঘাটই ছিল যাতায়াতের প্রধান দুই প্রাণকেন্দ্র। সে সময় এত বেশি যানবাহন ছিল না। নদীপথ ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে এ দুই ঘাট দেশের মানুষের কাছে ছিল একরকম তীর্থকেন্দ্র। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চল, পশ্চিমাঞ্চল আর উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের এরচেয়ে ভালো তেমন কোনও বিকল্প ছিল না। কত কত মানুষের কোলাহলে সরগরম হয়ে ওঠতো। মনে হতো, এ যেন মানুষের মিলন মেলা। কেউ হন্য হয়ে ছুটছেন। কেউ অনন্ত এক অপেক্ষা নিয়ে বসে আছেন। আর কিছু মানুষ অকারণেই মনের আনন্দে ঘোরাঘুরি করছেন। হরেক পণ্যের পসার নিয়ে হকার ও ফেরিওয়ালাদের দাপট তো ছিলই। ছিল ভিক্ষুকরাও। কত রকম বিচিত্র অভিজ্ঞতা যে সঞ্চয় হতো। এ যেন এক জ্যান্ত রঙ্গমঞ্চ। যেখানে প্রতিনিয়ত অভিনীত হয় নিত্য-নতুন নাটক। কোনোটা হাসির। কোনোটা বেদনার। হোটেল ও বোর্ডিংয়ের ব্যবসাও ছিল রমরমা। সদরঘাটে এখন একদমই যাওয়া হয় না। সর্বশেষ অনেক আগে একবার বুড়িগঙ্গায় নৌকাভ্রমণ করার সময় পারিপার্শ্বিক ও নদীর পানির অবস্থা দেখে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। তবে সদরঘাটে আগের মতো সেই ব্যস্ততাও নেই। লঞ্চ-স্টিমারের কদরও তো আর আগের মতো নেই। যে কারণে একটু যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। আর আরিচা ঘাট তো কবেই পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। তার পরিবর্তে স্থান করে নিয়েছে পাটুরিয়া ঘাট। সেখানে যাওয়ার পর ভেবাচেকা খেয়ে যেতে হয়। জীবনানন্দ দাশের ভাষায়, ‘জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি কুড়ি বছরের পার’। কিন্তু পাটুরিয়া ঘাটে গিয়ে সেটা একদমই মনে হয়নি। ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার পথ। জীবন যেন এখানে থমকে আছে। খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। অতীতের দিনগুলো যেন ফিরে ফিরে আসে। প্রয়োজনের তুলনায় রাস্তা যথেষ্ট চওড়া নয়।


তদুপরি রাস্তার একপাশে মালবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি। যেন পারাপারের জন্য যুগ যুগ ধরে অপেক্ষায়। অন্য পাশ দিয়ে গায়ে গা লাগিয়ে ঢিমেতালে যানবাহন চলাচল করে। ফেরি সার্ভিসকে খুব বেশি তৎপর মনে হয়নি। আমি যেদিন যাই, সেদিন চৈত্রের তপ্ত দুপুরে বাসের মধ্যে ফেরির অপেক্ষায় থাকতে হয় প্রায় দেড় ঘণ্টা। প্রচণ্ড গরম। কোথাও কোনো স্বস্তি নেই। বালুর চাদর বিছানো। উড়ছে আপন মনে। একটা পরিবর্তন অবশ্য হয়েছে। গাছগাছালির সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। কোথাও ছায়া নেই। এ পথের যানবাহনও খুব একটা জুতের মনে হয়নি। সর্বত্র জীবন গতিশীল হলেও এ ফেরি ঘাটে কেবল ব্যতিক্রম মনে হলো। পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে ফিরে পেয়েছিলাম আমার অতীতকে। যখন স্কুলের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি যেতাম, তখন সদরঘাট ও পরবর্তীতে আরিচাঘাটে যে অভিজ্ঞতা হতো, সেটি যেন একের পর এক রিউয়িন্ড হয়ে চলেছে। দুনিয়া কোথায় চলে গেছে, আর পাটুরিয়া ফেরি ঘাটের পরিবেশ রয়ে গেছে আগের মতো। নাগরিক জীবন থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন। বাস থেমে থাকলেও থেমে থাকেনি ফেরিওয়ালাদের বিরামহীন তৎপরতা। একটু পর পর বাসে ওঠে সুরে সুরে তাঁদের নিবেদন। কত বিচিত্র ভঙ্গি। বিচিত্র ঢঙ। বিচিত্র পরিবেশনা। বেশ মজাই লাগে। কারও না কারও আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারা যায় না। আর আমি তো এমন ডাকের অপেক্ষায় থাকি। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কোনও বাধা-নিষেধ মানতে ইচ্ছে করে না। না হয় আয়ু থেকে কিছুটা সময় ক্ষয়েই গেল। তাই বলে এমন সুস্বাদ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে মন চায় না। যে জীবন ফেলে এসেছি, তার সঙ্গে রয়েছে এর নিবিড় সম্পর্ক। তাই চাইলেও এ ডাক এড়াতে পারি না। একের পর এক আসতে থাকে ঘনিষ্ট আমন্ত্রণ। এই ডিম খান ডিম। ডিম আছে ডিম। গরম ডিম। ঝালমুড়ি, শুধু খাইতে মন চাইবে। মশলা দিয়ে। লেবু দিয়ে। শশা। তাজা শশা। জালি শশা। খাইলে দিল ঠাণ্ডা। তিলের খাজা। নারিকেলের খাজা। বাড়িতে নিয়ে যান। না নিলে পস্তাইবেন। শ-ন পা-প-ড়ি। চা-না-চু-র। মাখানো চানাচুর। টেস্টি। চকলেট। ঝাল মশলা দিয়ে বাদাম-বুট। পপকর্ণ ভাজা। ঠাণ্ডা আইসক্রিম। গরমে ঠাণ্ডা। ফ্রিজের ঠাণ্ডা। চকবার। ঝাল-লবণ দিয়ে আমড়া। ভাজা মচমচে ভাজা। কড়া ভাজা। টাটকা। এই সিঙ্গাড়া গরম। মজার প্যাকেট বরই। টক-ঝাল-মিষ্টি। এই যে মিষ্টি কমলা। মজার খাবার পিঁয়াজু। আমি গেলে আর পাইবেন না। পানি। ঠাণ্ডা পানি। হাদিসের বই। বাচ্চাদের বই। ছোটদের বই। গল্পের বই। সুন্দর কলম। চিরুনি। টুথব্রাশ। আরও যে কত কি। এই হাঁকডাক, দরাদরি আর এ সংক্রান্ত কথপোকথন কম মজাদার নয়। আর্থিক সাহায্যের জন্যও বিভিন্ন কায়দায় আবেদন-নিবেদন করা হয়। আল্লার ঘরে দান করে যান। এ দান বৃথা যাবে না। মসজিদ-মাদ্রাসা-এতিমদের জন্য কিছু দিয়ে যান। চলার পথে বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদে থাকুন। কত রকম ভিক্ষুক। কারও চোখ নেই। কারও হাত নেই। কেউ কথা বলতে পারেন না। কেউ চিকিৎসার জন্য আকুতি জানিয়ে সাহায্য কামনা করেন। কেউ সুরেলা কণ্ঠে, কেউ কেউ তীব্র চিৎকারে তাঁদের নিবেদন পেশ করেন। রাস্তার দু’পাশে হরেক রকম দোকান। তাতে সাজানো নানা কিসিমের পণ্য। আছে ডাব, আনারস, কমলা, আপেল সহ নানা ফল-ফলারি। রাস্তার ধারে রেকর্ডকৃত কণ্ঠে টানা বেজে চলছে স্বপ্নদোষের ব্যাখ্যা। পাতলা ধাতুর অপকারিতা। ইত্যাদি। ইত্যাদি। শুনলে কান গরম হয়ে যায়। এসব নিদানের জন্য আছে অষ্টধাতুর মাদুলি, তাবীয, হারবাল টনিক আর কত কি। এসব নিলে নাকি জাদুর মতো ফল পাওয়া যাবে। এ রাজধানীর বুকে এখন যে জীবনের দেখা মিলবে না, তেমন একটি ভিন্ন জীবনের সন্ধান মিলবে পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে। জীবন নাকি থেমে থাকে না। তাহলে পাটুরিয়া ফেরি ঘাটে এ কোন জীবন?

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৩

ট্রাঙ অ্যান : গোপন সৌন্দর্যের আধার


কোনো জায়গা সম্পর্কে আগে থেকে জানা-শোনা থাকলে সেখানে যাওয়ার মজা খানিকটা হলেও কমে যায়। একদমই অচেনা কিংবা অজানাকে চেনা বা জানার মজাই আলাদা। তেমন কোথাও যদি যাওয়া যায় এবং যাওয়ার পর যদি দেখা যায়, সেটি প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর, তার সৌন্দর্য ও মুগ্ধতা হৃদয়ে অন্য রকম দোলা দেয়। আর তাতে পাওয়া যায় নতুন কিছু আবিষ্কারের আনন্দও। ভিয়েতনামকে চিনতাম বিপ্লবের পূণ্যভূমি হিসেবে। সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সম্পর্কে বলতে গেলে তেমন কোনো রকম ধারণাই ছিল না। বরং ভেবেছি, আমেরিকানরা যেহেতু দেশটিকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে, সেখানে ধ্বংসলীলা ছাড়া দেখার মতো আর কিইবা থাকতে পারে? ধারণাটা যে কত বড় ভুল, সেটা সেখানে যাওয়ার পর পলে পলে অনুভব করেছি। ভিয়েতনাম দেশটাই বদলে গেছে অনেক। উন্নয়নের সোপান বেয়ে এগিয়ে চলেছে দ্রুত। আর তার যে প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্যের আকরখনি, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাসযোগ্য মনে হবে না। অল্প সময়ের মধ্যে যা কিছু দেখেছি, তা-ই ধরা দিয়েছে অনন্ত এক বিস্ময় হয়ে। তবে প্রকৃতঅর্থেই বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছিল ভিয়েতনামের পর্যটন কেন্দ্রগুলো। এরমধ্যে মন ছুঁয়ে যায় বুনো সৌন্দর্যের কেন্দ্রস্থল ‘ট্রাঙ অ্যান’। হ্যানয় থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে। মাইক্রোবাসে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। এই স্থানটির প্রচার-প্রচারণা খুব একটা না হওয়ায়, তা অনেকটাই ভ্রমণপিয়াসীদের চোখের আড়ালে পড়ে আছে। তবে আস্তে-ধীরে খুলছে এর অবগুণ্ঠন। বাড়ছে পর্যটকদের সংখ্যাও। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট করার জন্যও চেষ্টা চালানো হচ্ছে। 
 

প্রকৃতির গোপন সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে ট্রাঙ অ্যানে। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা মসৃণ জলপথ, সবুজ টল টলে পানির বিস্তীর্ণ হ্রদ, চুনাপাথরের নানান আকারের নিস্তব্ধ পাহাড়, বয়ে চলা রঙিন নৌকা, রহস্যময় গুহা, অজানা ফাঁদ, ঐতিহ্যময় রেস্তোরাঁ আর নানান রকম গাছ-গাছালি দিয়ে যেন কোনো চিত্রকর পুরো এলাকাটি সাজিয়ে রেখেছেন। আছে পুরনো মন্দিরও। কোথাও যেন একরত্তি কমতি নেই। সবটাই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যে ভরপুর। আর প্রকৃতির এই ছোঁয়া পেতে হলে নৌকায় করে না ঘুরলে তা অনুভব করতে পারা যায় না। আমি যখন সেখানে ঘুরতে যাই, তখন ছিল বর্ষাকাল। সারা দিনই লেগে ছিল বৃষ্টির উপদ্রব। সাধারণত এই পর্যটনকেন্দ্রটি রূপের পসরা সাজিয়ে খোলতাই হয় শীত ও বসন্তকালে। তখন সেখানে বসে যায় উৎসবের হাট। আমার সেখানে যাওয়া বলা যায় একটু অসময়ে। তারপরও তার রূপমাধুরী আমাকে কম বিহ্বল করেনি। মধ্যা‎হ্ণ ভোজ সেরে নৌকা ভ্রমণে বের হওয়ার সময় প্রচণ্ড গরমে ঘামছিলাম। মাঝে মাঝে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রার মোটেও কমতি ছিল না।


নৌকায় ওঠার পর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটি রঙধনু ছাতা, একটি মনোরম পাখা আর রূপবতী একজন গাইড। নৌকার চালকও ছিলেন একজন নারী। তাঁর মাথায় ছিল ভিয়েতনামিস কৃষকদের চির পরিচিত মাথাল। আর মেঘের লুকোচুরি খেলা তো ছিলই। কখনো বৃষ্টি। কখনো রোদ। বেশ একটা রোমান্টিক পরিবেশ। নৌকা ছাড়ার পর দেখতে পেলাম, সারিবদ্ধভাবে বয়ে চলেছে পর্যটকদের অসংখ্য ছোটো ছোটো নৌকার বহর। এতে যে দৃশ্যপট তৈরি হয়, তাতে জুড়িয়ে যায় চোখ। যতই এগিয়ে যেতে থাকি, ততই অবাক হচ্ছিলাম। প্রকৃতির খেয়ালিপনার চমৎকার নিদর্শন উন্মোচিত হচ্ছিল একে একে। পাহাড়ের নিচ দিয়ে সহজাতভাবে গড়ে ওঠেছে টানেলের মতো বিচিত্র সব গুহা। এই ওয়াটার-কেভ-এর উচ্চতা খুব বেশি নয়। একটুখানি অসতর্ক হলেই যে কোনো সময়ই বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। এ কারণে গুহায় প্রবেশের আগেই নৌকার মাঝি ও গাইড সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য সতর্ক করে দেন।


মাথা নিচু করে গুহা অতিক্রম করতে হয়। তখন সারা দেহ-মনে কেমন যেন রোমাঞ্চকর স্পন্দন হতে থাকে। জীবনে এমন অভিজ্ঞতা খুবই কম এসেছে। অবাক করা এমন বিস্ময়ের সামনে কতক্ষণ আর মাথা নত করে থাকা যায়! একটুখানি সাহস দেখাতে গিয়ে পাহাড়ের পাথরের সঙ্গে ঠোকর খেয়ে একটু-আধটু ভুগতেও হয়েছে। সেটাকে ‘ভালোবাসার ব্যথা’ মনে করা যেতে পারে। তবে গহিন অন্ধকারে কোথাও কোথাও টিম টিম করে জ্বালিয়ে রাখা হয়েছে হ্যারিকেনের মতো আলো। এক একটি গুহা যেন অপরটিকে হারিয়ে দেওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ। গুহার ভিতর ঢুকলে পাওয়া যায় আদিম যুগের অনুভূতি। কেমন যেন গা ছম ছম করে। একাকী কিংবা দিনের আলো নিভে এলে, সেখানে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।


দিনের বেলায়ই যেমন ভৌতিক পরিবেশ, রাতের বেলা কেমন হয়, কে জানে? নানান রকম ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পড়া পানি ভিজিয়ে দিতে থাকে। অবশ্য গরমের মধ্যে শীতল পানির পরশে জুড়িয়ে যায় শরীর। পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ভিয়েতনামের সরকারের উদ্যোগের কমতি নেই। সমাজতান্ত্রিক দেশ হলেও বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের উদারতা লক্ষ্য করা যায়। পর্যটকদের মোহিত করার জন্য তাদের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি নেই। আর এই উদারতার ভাগিদার হই আমিও। চেরি নামে তরুণী গাইড পাশে থাকায় নৌকাভ্রমণটা হয়ে ওঠে আরো বেশি আনন্দদায়ক। মেয়েটির কর্মক্ষেত্র পর্যটন কর্পোরেশনে। বেশ স্মার্ট। ইংরেজি ভাষাতে বেশ সাবলীল। প্রায় প্রতিদিনই তাঁকে অতিথি পর্যটকদের সঙ্গে নৌকাভ্রমণ করতে হয়। হাস্যোজ্জ্বল এই মেয়েটি পাশে বসে যেভাবে পাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকে, তাতে মনে হয়, আমি যেন তাঁর কত আপনজন। মাঝে-মধ্যে জানাতে থাকে টুকরো টুকরো মজার তথ্য। তাঁর খুনসুটিতে পাওয়া যায় মিষ্টি প্রেমের আমেজ। যদিও ক্ষণিকের জন্য, তারপরও সেই সময়টাতে মনটা কেমন জানি উচাটন করতে থাকে। ইচ্ছে হয় প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করতে। পুরো এলাকাটি ঘুরতে হলে হাতে বেশ সময় নিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া বর্ষার কারণে অনেক স্থানে যাওয়াও খুবই বিপজ্জনক। পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ওয়াটার-কেভে যাওয়া যায় না। তবে ট্রাঙ অ্যানের রহস্য এখনও পুরোপুরিভাবে আবিস্কার করা যায়নি। কুমারী তরুণীর মতো অনাঘৃত রয়েছে তার গোপন অনেক সৌন্দর্য। ‘নিউ সেভেন ওয়ান্ডারার্স অব ন্যাচার’-এর অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র হা লঙ বে’র পর ভিয়েতনামিজরা গর্ব করেন ‘ট্রাঙ অ্যান’কে নিয়ে। হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সেখানে যেন মিলেছে একই বন্ধনে।


নিন বিন প্রদেশের হোয়া লু জেলার বিস্ময়কর এই ভূদৃশ্যসমৃদ্ধ এলাকাটি গড়ে ওঠেছে ২১৬৮ একর জমি নিয়ে। ইকোট্যুরিজম এই এলাকাটি পরিবেষ্টিত চুনাপাথরের পাহাড়, হ্রদ, গুহা আর শত শত ভিন্ন প্রজাতির সমৃদ্ধ ইকোসিস্টেম দিয়ে। বিজ্ঞানীরা এই এলাকাটিকে ‘আউটডোর ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। আর এই জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে আশ্চর্য সব বিষয়। এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া গেছে ৩১টি উপত্যকা, ৫০টি ক্রস-ওয়াটার গুহা, ৬০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ও ২০০ রকমের প্রাণী। আছে হরেক রকম পাথর। যা দিয়ে গবেষকরা নিচ্ছেন প্রাকৃতিক ইতিহাসের পাঠ। প্রতিনিয়তই উদঘাটিত হচ্ছে নতুন নতুন সৌন্দর্য। প্রকৃতির এই নন্দনকানন থেকে পড়ন্ত বিকেলে ফিরে আসার সময় দেখতে পাচ্ছিলাম আলো-ছায়ার মায়াবী এক জগতকে। বুকের মধ্যে দুই রকম অনুভূতি হচ্ছিল। একদিকে ভালো লাগার আবেশে বিভোর হয়েছিলাম। অন্যদিকে আর কখনো এখানে আসা হবে কিনা, সে কারণে ছুঁয়ে যাচ্ছিল একটা কষ্টবোধ। সেইসঙ্গে চেরি ফুলের সুরভি তো ছিলই। সব মিলিয়ে বার বার পিছু ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিলাম।