পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

সমাজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমাজ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

মন কেন বুঝতে চায় না

 


কী অদ্ভুত এক জীবন! যে জীবন আমি চাইনি, সেই জীবন আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে। না মেনে তো উপায়ও নেই। মেনে নিয়েই একান্ত নিরুপায় হয়ে ঘরবন্দি থাকতে হচ্ছে। যদিও এখনও আমাকে সপ্তাহে তিন দিন বাসা থেকে বের হতে হয়। সেটাইবা কত দিন পারবো, কে জানে? যেভাবে আশপাশ ঘিরে ফেলেছে করোনা বাহিনী, কখন যে শমন জারি হয়? তারপরও নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ ভাবা যাচ্ছে না। কীভাবে ভাববো? যে আমাকে প্রায় সারাদিনই কাজের প্রয়োজনে বাইরে বাইরে থাকতে হয়, তার এভাবে স্বেচ্ছাবন্দি থাকাটাকে ‘দণ্ডকারণ্যে নির্বাসন’-এ পাঠানোর মতো মনে হচ্ছে। অথচ অফুরন্ত এই ‘ছুটি’কে আমার প্রাণভরে উপভোগ করার কথা। তা একদমই উপভোগ্য হয়ে ওঠছে না।

আমাকে যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন বা জানেন, তাঁদের অনেকেই আমার ওপর মাঝে-মধ্যে খুবই বিরক্ত হন। সেটা আমি সহজে বুঝতে পারি। এ বিরক্তিটা কোনো তিক্ততা থেকে নয়, বরং গভীর ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। আমার কাজ-কর্মের ধরন দেখে তাঁরাই ফেড-আপ হয়ে যান। নিজেকে সতেজ রাখার জন্য আমাকে তাঁরা মাঝে মাঝে বিশ্রাম বা ছুটি নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে বলেন। আমিও যৌক্তিক কারণেই সহমত পোষণ করি। ভাবি, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে, একটি শিশিরবিন্দু’। এমনকি পেশাগত কাজে গিয়ে আমার বন্ধু বা সহকর্মীরা যখন কোপাকাবানা সৈকতে সূর্যাস্ত উপভোগ করেন কিংবা বিলাসবহুল অন্য কোথাও গিয়ে উচ্ছ্বলতায় মেতে ওঠেন, আমারও তখন ইচ্ছে হয়, কাজের ফাঁকে হাতিরঝিলে কিংবা বছিলা ব্রিজে গিয়ে অন্তত দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে আসতে। এর বেশি সামর্থ্য তো আমার নেই। শেষ পর্যন্ত সে ইচ্ছেটাও অপূর্ণ রয়ে যায়। এ অপূর্ণতা নিয়েই জীবনের পরিধি ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

যদিও এই করোনাকালে কোথাও যাবার সুযোগ নেই, কিন্তু বাসায় বসে ছুটিটা অন্তত চুটিয়ে উপভোগ করা যায়। কেন যেন সেটাও পারছি না। আমার স্বভাবটা এমন, মিষ্টি হাসি দিয়ে আমার কাছ থেকে কঠিন কাজ যত সহজে আদায় করা যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য মনোভাব দেখিয়ে সহজ কাজটা করে নেওয়া ততটাই কিন্তু কঠিন। যে জন্য মুফতে ছুটি পেলেও এর সঙ্গে মোটেও মানিয়ে নিতে পারছি না। এমন ছুটি তো আমার কাঙ্খিত ছিল না। যে কারণে সব মিলিয়ে একটা অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটছে। কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছি না। মানসিক শান্তি যদি না থাকে, তাহলে কীসের ছুটি, কীসের বিশ্রাম আর কীসের প্রশান্তি?  

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, সেই স্কুল বয়স থেকে সংবাদপত্র পাঠ করাটা যে কোনও কারণেই হোক অভ্যাসে পরিণত হয়। আর কোনো অভ্যাস বোধকরি এত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এর কারণ কি জানি না। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি সংবাদবিহীন সরকার ও সরকারবিহীন সংবাদপত্রের একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে দ্বিতীয়টি বেছে নিতে আমি এক মুহুর্ত দ্বিধা করবো না’। যদিও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমার নেই, সঙ্গত কারণে এমন প্রশ্ন কেউ আমাকে করবেনও না। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাটা সহজাতভাবেই গড়ে ওঠেছে। সংবাদপত্রবিহীন একটি দিনও আমি কল্পনা করতে পারি না। আজ অব্দি এ অভ্যাসের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। হাসপাতালে অনেক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বাসায় ফিরে এসে না দেখা সংবাদপত্রে একবার অন্তত চোখ না বুলাতে পারলে অস্বস্তিটা কিছুতেই দূর হতে চায় না। মনে হয়, কোথায় যেন অসম্পূর্ণতা রয়ে গেল।

অথচ সেই আমি বেশ কয়েক দিন হলো, কী অদ্ভুতভাবে সংবাদপত্র ছাড়াই দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছি। সংবাদপত্র যেমন হাতের নাগালে পাচ্ছি না, তেমনিভাবে আমিও সেই তাগিদ অনুভব করছি না। আর কারো এমন মনোভাব হচ্ছে কিনা আমি জানি না। একজন নাগরিক মানুষ, যে নিজেও মিডিয়া ঘরানার, সে কিনা  সংবাদপত্রের সংস্পর্শে নেই! এটা কি সুস্থ জীবনবোধের লক্ষণ? অবশ্য সময়টাও তো সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর নয়। তার আবার জীবনবোধ!

এমনিতেই ভার্চুয়াল জগতের কারণে প্রিন্ট মিডিয়া তো বটেই, ইলেকট্রনিক মিডিয়াও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় করোনাভাইরাস প্রিন্ট মিডিয়ার ভবিষ্যতকে অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলবে বলে আমার মনে হচ্ছে। অনির্ণেয় এ রোগের কারণে বদলে যাচ্ছে মানুষের অভ্যাস, রুচি ও মন-মানসিকতা। কেবলই মিডিয়া নয়, করোনা পরবর্তী সময়ে বদলে যাবে অনেক কিছুরই খোলনলচে। তা কতটা ও কীভাবে যাবে, আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারছি না। 

না চাইলেও মনের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ হাহাকার করে উঠে, বদলে যাওয়া সেই অচিন সময়টাকে দেখার সুযোগ কি পাওয়া যাবে? এ ভাবনাটা সারাক্ষণ মাথার মধ্যে চেপে বসে আছে। কথায় বলে, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। এ শয়তানটা হরদম মাথার মধ্যে শুধু প্যাঁচ কষছে। ঘুমাতে যাবার আগে এবং ঘুম থেকে উঠার পর অনবরত নেতিবাচক ভাবনায় পেয়ে বসে। তা থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। এমন ভাবনা না ভাবার জন্য মনকে কত করে বোঝাই। ব্যাটা মন কিছুতেই বুঝতেই চায় না। অবশ্য মন কবেইবা আমাকে বুঝেছিল?

৮ এপ্রিল ২০২০

ভি ভ্যাকসিন কি দেওয়া হবে?

 


ইন্টারনেটের দুনিয়ায় পুরো পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। তারপরও কথা থেকে যায়, মুঠোটা কতটুকু উম্মুক্ত করা হয়েছে? অর্থাৎ আমাদের কতটা জানতে দেওয়া হয়? সহজাতভাবেই অনুধাবন করা যায়, পুরোপুরি নিশ্চয়ই নয়। যাঁরা এটা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের জানা-শোনার পরিধি স্বাভাবিক কারণেই অনেক বেশি। তাঁরা তো আর সব কিছু উম্মুক্ত করে দেবেন না। ব্যবসায়িক কারণে তাঁরা একটু একটু করে মুঠোটা আলগা করেন। আর নিরাপত্তা কিংবা অন্য কোনো কারণে অনেক কিছু হয়তো আড়াল রাখা কিংবা গোপনে নজরদারি করা হয়। সার্চ ইঞ্জিন গুগল কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক যা ক্ষমতা রাখে, তা তো রীতিমতো বিস্ময়কর। এটা মনে হতেই পারে, কারো কাছে যদি মোবাইল নাও থাকে, তাঁর অবস্থান তো খুবই মামুলি ব্যাপার, তিনি প্রতি মুহুর্তে কী করছেন, সেটা জানতে পারা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। এমনকি প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে তাঁর কার্যক্রমের ফুটেজ সংরক্ষণ করা যায়। যখন যাঁরটা প্রয়োজন হচ্ছে, তাঁরটা হয়তোবা নেওয়া হচ্ছে। গুগল দিয়ে যদি সারা দুনিয়া ঘুরে আসা যায়, তাহলে আরো কত কিছু করা সম্ভব, সেটা লেখার অপেক্ষা রাখে না। স্যাটেলাইট দিয়ে কত কত দূরকে কাছে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর কাছকে অর্থাৎ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের চলাচলকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা কী আর এমন কঠিন? যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা ‘নাসা’ এবং প্রযুক্তির আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত ‘সিলিকন ভ্যালি’তে নিত্য-নতুন কী কী সংযুক্ত হচ্ছে, আমরা তার কতটুকু জানি? তারা যতটুকু জানায়, তার বাইরে তো জানার সুযোগ নেই। আমরা যা কল্পনা করি, সেটা হয়তো তাদের কাছে বাস্তব।

ইন্টারনেট প্রযুক্তির বয়স খুব বেশি দিনের নয়। এখনই যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে মানবজাতিকে, আগামীতে কী হতে পারে, সেটা আমরা কল্পনাও করতে পারছি না। তখন তো ব্যক্তিগতভাবে এত প্রযুক্তিরও প্রয়োজন পড়বে বলে মনে হয় না। সব কিছু পরিচালিত হতে পারে ইশারা-ইঙ্গিতে। ভাষাগত কোনো সমস্যাই থাকবে না। নিয়ন্ত্রণ করবে দেহের ভিতর বা বাইরে থাকা এক চিলতে চিপস বা সফটওয়্যার। সেটাই হবে সব ক্ষমতার উৎস। 

তবে আমার কেন যেন মনে হয়, আমাদের ফেলে আসা জীবনের ‘ফুটেজ’ও পুনরুদ্ধার করাও অসম্ভব হবে না। এখন যেমন ইউটিউবে পছন্দমাফিক কত কিছু দেখা যায়। আগামীতে এমনও হতে পারে, হয়তো পূর্ব পুরুষদের কারো কোনো ফুটেজ দেখতে মন চাইলো, সহজেই তা দেখা যাবে। কী আলাপ করছেন, সেটাও শোনা যাবে। প্রত্মতাত্ত্বিক নিদর্শনের মাধ্যমে যেভাবে পৃথিবী বা মানবসভ্যতার ইতিহাস অনুসন্ধান করা হয়, তখন ফুটেজ দিয়ে তা সহজেই করা সম্ভব হতে পারে। যদিও ইউটিউবে ফুটেজ কাউকে না কাউকে আপলোড করতে হয়। কিন্তু আগামীতে যে ‘ফুটেজ’ পুনরুদ্ধার করা যাবে, তা হতে পারে ন্যাচারাল। তার আপলোডার তো প্রকৃতি স্বযং। বিষয়টা হয়তো অবাস্তব মনে হচ্ছে। এখন আমরা ইন্টারনেট, গুগল বা ফেসবুক যেভাবে ব্যবহার করছি, পঞ্চাশ বছর আগে এটা কি বাস্তব হিসেবে কেউ ভাবতে পেরেছিলেন?

আগামীতে এমনও হতে পারে, জন্মের পর সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে ভার্চুয়াল বা ভি. ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। এই টিকা দেওয়া হলে আলাদাভাবে কোনো কিছু সংরক্ষণের প্রয়োজন পড়বে না। খুবই ছোট দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, বিদেশে যেতে পাসপোর্ট তো দূরে থাক, বিদ্যমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হবে না। অফিস-আদালতের বিদ্যমান অবকাঠামো ও সিস্টেম একদমই থাকবে না। চিকিৎসকের কাছে যাবার প্রয়োজন পড়বে না। এই কার্যক্রম তো আমরা এখনই কিছুটা দেখতে পাচ্ছি। করোনা তো বটেই, যে কোনো ভাইরাস শরীরে অনুপ্রবেশ কিংবা দেহের কোথাও সামান্য গড়বড় করলে অনায়াসেই বুঝতে পারা যাবে। সব কিছু নিয়ন্ত্রিত হবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। প্রত্যেকের আইডি হিসেবে ব্যবহৃত হবে ভার্চুয়াল ভ্যাকসিন বা ভি.ভি. নাম্বার। টিকা দেওয়ার সময় এ নাম্বারটি সরবরাহ করা হবে। সেটা দিয়েই সারা যাবে যাবতীয় কাজ-কর্ম। 

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কতটা থাকবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। যদিও এখনই তো গোপনীয়তা প্রকাশ হয়ে যাচ্ছে। সবটাই তো জানতে পারছি না। কিছুটা পারছি। হাতে একটা মোবাইল থাকলে, ফেসবুক কিংবা কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সংযুক্ত এবং গুগল কিংবা কোনো সার্চ ইঞ্জিনে ঢুকলেই নজরদারির আওতায় চলে যেতে হয়। গুগল বা ফেসবুক তো এখনই মানুষকে চিনতে পারে। তাঁর মন পড়তে পারে। কণ্ঠ বুঝতে পারে। এখন যেমন গুগল, ফেসবুক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রত্যেক নাগরিকের অনেক গোপন তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, তখনও হয়তোবা তেমনটি হতে পারে। এ নিয়ন্ত্রণ থেকে পুরোপুরিভাবে মুক্তি পাওয়া সহজ হবে না। কিন্তু কেউ বিদেশে গেলে, চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ কিংবা অফিস-আদালত করলে সেক্ষেত্রে যেখানে যতটুকু তথ্য জানানোর প্রয়োজন হবে, ততটাই জানানোর ব্যবস্থা হয়তো থাকবে। সেভাবেই নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। সেটা করা হবে ব্যবসায়িক কারণেই। আর সব কিছু যদি উম্মুক্ত হয়ে যায়, তাহলে মানুষের গোপনীয়তা বলতে কিছুই থাকবে না। তা যদি না থাকে, সেটা হবে নতুন এক জগত। গোপনীয়তামুক্ত সেই জগত কেমন হতে পারে, তা নিয়ে অবশ্য নতুন করে ভাবতে হবে। তবে সেটাও নেহাত মন্দ নয়। এখন হয়তো কিছু মানুষ বেশিরভাগের গোপনীয়তা জানছেন। তখন সবাই সবারটা জেনে যাবেন।

সবাই মিলে সমস্বরে গাইতে পারবো,

আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার

রাজত্বে---

কিন্তু সেটা কি কোনো রাজা হতে দেবেন?

২২ এপ্রিল ২০২০

করোনাভাইরাস পরবর্তী দুনিয়া কেমন হবে

 

মানুষ তো বোধকরি প্রকৃতিরই সন্তান। তার অস্থায়ী আবাসভূমি এই বসুন্ধরা। এই প্রকৃতি, এই বসুন্ধরাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় জীবন ও জগত। সেই শুরু থেকেই মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতির কাছ থেকে অকৃপণভাবে গ্রহণ করে আসছে। একইসঙ্গে অপ্রয়োজনীয়ভাবে ধ্বংসও করছে। মানুষের সংখ্যা যেমন বেড়ে চলেছে, তেমনিভাবে আনুপাতিক হারে বাড়ছে চাহিদা ও ধ্বংসলীলা। এ চাহিদা যেন অন্তহীন। ধ্বংসলীলাও অপরিসীম। যদিও মানুষকে কোথায় থামতে হবে, তার হয়তো সুনির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা টানানো নেই। তবে সেই বিবেচনাবোধ থাকার কথা মানুষের অন্তরে। অনেক কাল পেরিয়ে আসার পর একটা পর্যায়ে মানুষ নিজেকে সভ্য হিসেবে দাবি করতে থাকে। সমাজ ও ধর্মের অনুশাসন তার সীমারেখার একটা মাপকাঠিও মোটামুটিভাবে শনাক্ত করে দেয়। সর্বোপরি জ্ঞান, বুদ্ধি, বিবেক, চিন্তাশক্তি দিয়ে সব কিছু অনুধাবন করতে পারার কথা। কিন্তু সেটা কি মানুষ পারছে? বরং মানবসভ্যতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্মমতার ইতিহাস।

আর এখন তো চারপাশে ভোগবাদিতার চরম উল্লাস। তার নিরন্তর হাতছানির পেছনে অবিরাম ছুটছে মানুষ। তাতে কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকছে না। জীবনে সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে উঠেছে ভোগবিলাস। একইসঙ্গে নিজের শক্তিমক্তা প্রমাণ করার জন্য কত না ধ্বংসাত্মক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে সৃষ্টির উৎসভূমি প্রকৃতি ও নিরীহ বসুন্ধরাকে। ইশপের বহু কথিত সেই গল্পের মতো। একটা রাজহাঁস সোনার ডিম পাড়তো। অনেকগুলো ডিম একসঙ্গে পাবার আশায় রাজহাঁসটাকে জবাই করে লোভী মালিক। এরপর আর ডিম পাওয়া যায়নি। লোভী রাজহাঁসের মালিকের মতো সোনার ডিম পাড়া প্রকৃতিকে আমরা ক্রমাগতভাবে রিক্ত ও নিঃস্ব করে দিতে চাইছি। এভাবে যে চলতে পারে না, এই বোধটুকু আমরা বোধকরি হারিয়ে ফেলেছি। এর অন্যতম কারণ, আমরা অনেক স্বার্থপর ও লোভী হয়ে ওঠেছি। সবাই বর্তমান ও নিজেকে নিয়ে এত বেশি বিভোর যে ভবিষ্যত সম্পর্কে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। এ কারণেই সম্ভবত আমাদের একটা ধাক্কা খাওয়া ও বোধোদয় হওয়া অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছিল। এখন তো সব কিছুই স্তব্ধ হয়ে গেছে। ঘরবন্দি হয়ে মানুষকে ভাবতে হচ্ছে তার পরিণতির কথা। জীবন বাঁচানোটাই হয়ে উঠেছে একমাত্র ধ্যান-জ্ঞ্যান-সাধনা। তবে বিপদ কেটে গেলে হয়তো কোনো কিছুই আমাদের মনে থাকবে না।

প্রকৃতি তো রহস্যের অপরিমেয় এক আধার। তার কতটুকুই আমরা জানি? হঠাৎ হঠাৎ প্রকৃতি তার ভাণ্ডার থেকে এমন সব অস্ত্র বের করে, তাতে বেসামাল হয়ে যায় মানবসভ্যতা। মাঝে-মধ্যে প্রধানত ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বকে অনেকাংশে সত্য প্রমাণ করে দিয়ে যায়। এছাড়াও বোধোদয়ের জন্য নানানভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে যায়। কিন্তু সেটা আমরা কখনও বুঝতে চাইনি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার সমগ্র ধরণী কাঁপিয়ে অনেক বেশি বুঝিয়ে দিচ্ছে তার অপরিসীম ক্ষমতার খানিকটা দাপট। দুনিয়াকে হাতের মুঠোয় নিয়ে করোনাভাইরাস যেভাবে কাঁদিয়ে ছাড়ছে মানবকুলকে, এর আগে এমন নজির নেই বললেই চলে। কোনো মানুষই নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারছেন না। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কী হতে পারে?


করোনাভাইরাস থেকে কবে মুক্তি পাবো, আমরা এখনও জানি না। আজতক তার দুর্জ্ঞেয় ও রহস্যময় মনোভাব বুঝতে পারা যায়নি। তবে হাবভাবে মনে হচ্ছে, বিদ্যমান ব্যবস্থাপনায় মোটেও সন্তুষ্ট নয়। মানুষের অপ্রয়োজনীয় ভোগবাদিতার প্রতি তার যথেষ্টই ক্ষোভ আছে। সেটা থাকা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। ‘সমাজতান্ত্রিক’ আদর্শের প্রতি তার এক ধরনের সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। যে কারণে কে প্রধানমন্ত্রী, কে কোটিপতি, কে প্রলেতারিয়েত সেটা বিবেচনা করছে না। বলা হচ্ছে, the virus does not discriminate - rich and poor alike, we are all in this together.  যদিও আপাতদৃষ্টিতে আমার মনে হচ্ছে, এখন পর্যন্ত চর্বিহীন গরীবদের প্রতি তার এক ধরনের পক্ষপাত দেখা যাচ্ছে। কত দিন এমনটা থাকবে, কে জানে? 

বিপরীতে মেদবহুল এ রোগটা বেশ ব্যয়বহুলও। অর্থবান না হলে তাকে সামাল দেওয়া খুবই কঠিন। এই অতিমারী মানুষকে বোঝাতে চাইছে, জীবন যাপনের জন্য খুব বেশি কিছুর তো প্রয়োজন নেই। যার যতটুকু প্রয়োজন, তাকে ততটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। প্রকৃতিকে ভাবতে হবে মায়ের মতো আপন। তাকে একদমই অবহেলা করা যাবে না। যুগে যুগে মহাপুরুষরাও আমাদের এ কথা বোঝাতে চেয়েছেন। আমরা তার গুরুত্ব দেইনি। তার প্রতিফল এখন আমরা পাচ্ছি। তাছাড়া এত এত মানুষের চাপে এই ভূপৃষ্ঠ বোধকরি খানিকটা অবসন্ন, ন্যুব্জ ও ভারাক্রান্ত। সে ক্ষেত্রে এই চাপ কমানোর কথাও মানুষকেই ভাবতে হবে। 

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে স্বেচ্ছাবন্দি হওয়ার পর্যাপ্ত জায়গা কোথায়? এ ইঙ্গিত কি যথেষ্ট নয়? হয়তো আগামীতে দেখতে পাওয়া যাবে ভিন্ন এক দুনিয়াকে। কেন যেন মনে হয়, একটা সুন্দর ও সুখী পৃথিবীর নিদান দিতেই সম্ভবত করোনাভাইরাসের এভাবে আসা। আর তেমন কিছু পেতে হলে কাউকে না কাউকে ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। 

কথা হলো, স্বপ্নের সেই পৃথিবী কি আদৌ গড়ে ওঠবে? উঠলেও সেখানে আমরা কে কে থাকবো?

৫ এপ্রিল ২০২০

ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্ম কি আমরা বুঝতে পারবো না?

 এই ব্যক্তি স্বাধীনতার যুগেও নিজের মতো করে জীবন যাপন করা খুবই কঠিন। কোনো কিছুর সঙ্গে জড়ালে তো কথাই নেই। আর না জড়ালেও রক্ষা নেই। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত না করা পর্যন্ত রেহাই দেওয়া হয় না। বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদের ক্ষেত্রেও এমনটি হচ্ছে। তিনি যেভাবে জীবন যাপন করতে চেয়েছিলেন, তেমনভাবেই করেছেন। জীবনটাকে তিনি উপভোগ করছেন নিজের মতো করে। এজন্য কাউকে তোয়াক্কা করার প্রয়োজন মনে করেননি। কোনো কিছুকে পাত্তা না দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর ছিল। সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে তিনি যা করতে চেয়েছেন, সেটাই করতে পেরেছেন। সফলও হয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর প্রধান শক্তি। 


কিন্তু তিনি চলে যেতে না যেতেই তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে চলছে নানা রকম দুঃখজনক প্রচারণা। এ থেকে তাঁর সাবেক স্ত্রী গুলতেকিনও রেহাই পাচ্ছেন না। ৩০ বছর সংসার করার পর বিবাহ বিচ্ছেদ হলে তিনি অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। তিনি তাঁর জীবন নিয়ে কখনোই কিছু বলেননি। নিজের মতো করেই আছেন। তারপরও তাঁকে নিয়ে অকারণে টানাটানি করা হচ্ছে। নানাভাবে বিব্রত করা হচ্ছে তাঁর তিন কন্যা নোভা, শীলা ও বিপাশাকে। স্ত্রী শাওনকে করা হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত।


নারী বলেই কি তাঁদের প্রতি এই নির্দয় মনোভাব? এটা করে হুমায়ূন আহমেদের প্রতি কী ধরনের শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হচ্ছে? জীবন তো আর অঙ্ক নয়, সব কিছু মেপে মেপে চলবে। জীবন চলার পথে কত কিছুই তো ঘটতে পারে। সেটাই স্বাভাবিক। এটা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাহলে অন্যের জীবন নিয়ে কেন এই টানহ্যাঁচড়া? এতে কার কী লাভ হয়? বিদেশে আমাদের দেশটাকে নিয়ে যে নেতিবাচক ইমেজ, সেটা তো আর এমনি এমনি হয়নি। আমাদের নঞর্থক মনোভাবেরই প্রতিফলন ঘটে জাতীয় জীবনে। আমরা কোনো কিছু সহজ ও স্বাভাবিকভাবে নিতে পারি না। সব কিছু তেরছা চোখে দেখাটা স্বভাবে পরিণত হয়েছে। অন্যের বিষয়ে আমাদের মাত্রাতিরিক্ত কৌতূহল ও বাড়াবাড়ি। একটু সুযোগ পেলে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়তে মোটেও দ্বিধা করি না। কোনো বোধ-বুদ্ধি, বিচার-বিবেচনাই আমাদের কাজ করে না। এই মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি খুবই ভয়ঙ্কর। এ থেকে কি পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না? ব্যক্তি স্বাধীনতার মর্ম কি আমরা বুঝতে পারবো না?

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

আমাদের গন্তব্য কোথায়?

অনেক দিন ধরেই বিষয়টা বুকের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কারো সঙ্গে শেয়ার করতে পারছিলাম না। অন্য কারো কি এমন মনে হয়, নাকি কেবল আমি একাই বিভ্রান্ত হচ্ছিলাম? সেটা বুঝতে পারছিলাম না। এমনও তো হতেই পারে, বয়সের কারণে আমার এমনটি মনে হচ্ছে। নিজের ফেলে আসা সময়কে সেরা মনে করার একটা প্রবণতা আমাদের আছে। আমারও কি তেমন মনে হচ্ছে? অবশ্য আমি যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময়ের মধ্যে আমিও বলতে গেলে তেমনভাবে পড়িও না। বিষয়টি হলো, গত শতাব্দীর শেষ দিক থেকে আমরা এমন একটা সময় অতিক্রম করছি, যাকে বন্ধ্যা সময় বললে অতুক্তি হবে না। 

সৃজনশীলতার বাগানে বলতে গেলে নতুন ফুল ফুটছে না। এই সময়ে সত্যিকার ফুলের তুলনায় প্ল্যাষ্টিক ফুলেরই কদর বেশি মনে হচ্ছে। তাহলে আমরা কি একটা মন্দা সময় অতিক্রম করছি? এটি আমাকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তোলে। আমার কেন যেন মনে হয়, সব ক্ষেত্রেই কেমন একটা স্থবিরতা চলছে। গতানুগতিকার বৃত্ত থেকে যেন আমরা বের হতে পারছি না। সব কিছুই যেন একঘেয়ে, ক্লান্তিকর, বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি..... কোথাও আশার আলো দেখছি না। 

কেন দেখছি না, সেটা কিছুটা হলেও বুঝতে পারলাম আজ প্রকাশিত একটি খবরে। তাতে মনে হলো, আমার ভাবনাটা বোধকরি একেবারে অবান্তর হয়। এর কিছুটা হলেও যৌক্তিকতা আছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, কয়েক দশক আগেও গড় বুদ্ধিমত্তার যে মাত্রা ছিল, এখন তা ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। প্রযুক্তির বুদ্ধিমত্তা যে হারে বাড়ছে, প্রযুক্তি নির্ভরতার কারণে সেই হারেই কমছে মানুষের বুদ্ধির মাত্রা। মানব মস্তিষ্ক বর্তমানে এর ধারণক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার করছে। যে কারণে বুদ্ধিমত্তার মাত্রা এর চেয়ে কখনই আর বাড়বে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কমতে পারে।

সম্ভবত এর লক্ষণগুলো প্রতিনিয়তই দেখতে পাচ্ছি। সব কিছুই কেমন যেন থমকে গেছে। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিতে দুনিয়াটাকে বদলে দেওয়ার মতো বড় মাপের কোনো ব্যক্তিত্ব উঠে আসছেন না। যাঁর দর্শন, যাঁর চিন্তা-ভাবনা, যাঁর নেতৃত্ব আমাদের উজ্জীবিত করবে, আলোকিত করবে, স্বপ্ন দেখাবে। আর কিছু না হোক, অন্ততপক্ষে নাড়িয়ে দেবে, তেমন কাউকেই তো দেখতে পাই না। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও একটা শূন্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। সেই মাপের একজন লেখক, একজন চলচ্চিত্রকার, একজন শিল্পী কোথায়? যে বা যিনি কাঁপিয়ে দেবেন এই পৃথিবীকে। তেমন কারো দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। সবচে বড় কথা, মৌলিক কাজ খুব একটা হচ্ছে না। বরং অতীতের সৃষ্টিশীল কাজগুলোকে ভেঙেচুরে তচনচ করে দেওয়া হচ্ছে। নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে ভালো লাগার অনুভূতিকে। 

যদিও এমন ঢালাও মন্তব্য করা সমীচিন হচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। কিন্তু দূরের দুনিয়ার কথা বাদ দিলেও আমি যে ছোট্ট জগতে বসবাস করি, তাকে তো কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারি। সেই জগতটা কেমন যেন ম্লান ও ম্রিয়মাণ মনে হয়। কোনো কিছুই আকৃষ্ট করতে পারছে না। ভাবনা উসকে দেওয়া বই, দর্শনীয় সিনেমা, হৃদয়ছোঁয়া গান কি আমরা খুব বেশি শুনতে পাই? বোধকরি পাচ্ছি না। যে কারণে ভার্চুয়াল দুনিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ার ঝোঁক ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি বুদ্ধিমত্তার মাত্রা কমে যাচ্ছে। বাড়ছে প্রযুক্তি নির্ভরতা। তাই নয় কি? তাহলে আমাদের গন্তব্য কোথায়?

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

এখন সময় টি-টুয়েন্টি ভালোবাসার




ফাগুনের তখন এত ঘনঘটা ছিল না। নির্ধারিত দিনক্ষণ ছিল না ভালোবাসারও। তাতে কি ফাগুন অনুভব করা যেত না? ভালোবাসা কি ছিল না? রাস্তার পাশে কৃষ্ণচুড়া যখন রাঙিয়ে দিয়েছে চারপাশ আর ভেসে এসেছে কোকিলের মধুর কণ্ঠ, তখন বুঝতে পারা গেছে ‘মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে’। আনুষ্ঠানিকভাবে বসন্ত বরণ করা না হলেও দেহ-মনে ছুঁয়ে যেত বাসন্তী হাওয়া। তাতে বুকের মধ্যে যেন কেমন কেমন করতো। হিল্লোলিত হতো সুরেলা আমেজ। প্রাণে প্রাণে বয়ে যেত খুশির নহর। আর ঢাক-ঢোল পিটিয়ে না থাকলেও ভালোবাসা তো চিরকালই ছিল। আছে। থাকবে।

প্রাণের অস্তিত্ব থাকলে ভালোবাসা না থাকার কোনো কারণ নেই। যুগে যুগে ফুটেছে ভালোবাসার গোলাপ। আবার না ফোটাও থেকে গেছে কত কত। ঝরে গেছে কুঁড়ি হয়ে। ভালোবাসায় কেউ সফল। কেউ ব্যর্থ। তাতে ভালোবাসার কোনো হেরফের হয় নি। যে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছে, তার কাছে ভালোবাসার প্রাপ্তিটা একরকম। আর যে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে নি, তার কাছে ভালোবাসার অপ্রাপ্তিটা অন্যরকম। এই বিপরীতধর্মীতাই ভালোবাসার সৌন্দর্য। পাওয়াটাই সবটুকু নয়, না পাওয়ার মধ্যেও ছিল ভালোবাসার অন্য রকম মাধুর্য।
 
কিন্তু ভালোবাসার অনুভব, অনুভূতি, অনুরণন তো সব কালে, সব যুগে, সব সময়ে একই রকম ছিল। তবে ভিন্নতা প্রকাশের। ভিন্নতা আবেগের। ভিন্নতা দৃষ্টিভঙ্গির। ভালোবাসা তো আবেগেরই রূপান্তর। কতভাবেই না ছড়িয়েছে ভালোবাসার রং। কতভাবেই না ভালোবাসা ছুঁয়েছে একে অপরের হৃদয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মতো ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে, কে কোথা ধরা পড়ে, কে জানে-।’ আমি যে সময়টার কথা বলছি, তখন ভালোবাসার গভীরতা, তীব্রতা ও স্পন্দন ছিল অন্য মাত্রার। আবেদন ছিল অন্য রকম।
অবশ্য নিজের সময়কে অনেকের কাছেই সেরা মনে হতেই পারে। তবে এটাও ঠিক, তাতে সব কিছুতেই অতীতের একটা ধারাবাহিকতা ছিল। যুগের পর যুগ এ ধারাটাই অনেকটাই বহমান ছিল। ভালোবাসায় আড়াল, গোপনীয়তা, সংশয়, দ্বিধা-দ্বন্ধ ও রহস্যময়তাই ছিল মুখ্য। এখন তো আগের সব কিছুই ভেঙেচুরে গেছে। তছনছ হয়ে গেছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমূল বদলে গেছে জীবনধারা। অতীতের সঙ্গে এখন কিছুই মেলে না।

তখন তো এত সহজে ভালোবাসা গড়ে ওঠতো না। দু’টি হৃদয় একীভূত হতে অনেক সময় লাগতো। ভাঙতেও। খুব সামান্যতেই ভালোবাসা হয়ে ওঠতো অসামান্য। কখনো চুড়ির একটুখানি রিনঝিন শব্দ শুনতে পেয়ে, কখনো এক পলক দেখতে পেয়ে, কখনো আয়ত চক্ষুতে মুগ্ধ হয়ে, কখনো মুক্ত ঝরানো হাসিতে অভিভূত হয়ে, কখনো একটি চিরকুট পেয়ে, কখনো একটু কথা বিনিময় হলে বুকের মধ্যে জ্বলে ওঠতো ভালোবাসার দীপাবলি। ঝগড়াঝাটি বা তিক্ততা থেকেও সূত্রপাত ঘটেছে ভালোবাসার। আসলে কার সঙ্গে কীভাবে গড়ে ওঠেছে ভালোবাসা, সেটার রকমারিতা, বিভিন্নতা ও বৈচিত্র্যতা ছিল অন্তহীন। কে কীভাবে, কোথায়, কখন ভালোবাসার মায়াডোরে বাঁধা পড়েছে, তা একমাত্র জানতেন প্রেমের দেবতা কিউপিড। তবে যেভাবেই যোগাযোগ বা সম্পর্ক গড়ে ওঠুক না কেন, সেটা ভালোবাসায় পরিণত হতে ঢের ঢের সময় লেগে যেত। এজন্য কত সময়, কত অনুনয়-বিনয়, কত জট-জটিলতা, কত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আসতে হয়েছে। অনেক সময় পেরিয়ে গেছে এক জীবন। তবুও অধরা হয়ে থেকেছে ভালোবাসা। দীর্ঘ দীর্ঘ প্রহর কেটেছে ব্যাকুলতা নিয়ে, মুখ ফুটে ভালোবাসার কথা বলাও হয় নি। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া গানের মতো, ‘আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি/আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি।’ এই দেখা, এই চেয়ে থাকা কিংবা মনে মনে ছবি এঁকে যাওয়াটাই ছিল ভালোবাসা।

অনেক অপেক্ষা, অনেক অস্থিরতা, অনেক দ্বিধা-দ্বন্ধ, অনেক যাতনা সয়ে বাইতে হতো ভালোবাসার তরি। সব সময় তরি তীরে ভিড়ানো সম্ভব হয়ে ওঠতো না। বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুয়ে দুয়ে চারও হতো না। দু’জনার দু’টি পথ দু’টি দিকে বেঁকেই যেত বেশি। তারপর কারো পথ হতো আলোয় ভরানো। আবার কারো পথ আঁধারে যেত ঢেকে। আঁধারে ঢেকে গেলেও ভালোবাসাটুকু একদমই উবে যেত না। না পাওয়ার সেই বেদনাটুকু বুকের মধ্যে থেকে যেত। মনের মধ্যে চিরকালীন একটা দাগ অন্তত কাটতো। পারতপক্ষে একজনকে হৃদয় দেওয়ার পর সেই হৃদয় অন্য কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করা সম্ভব হতো না।

সাধারণত এক জীবনে একাধিকবার ভালোবাসা জড়ানো হয়ে ওঠতো না। এটা ছিল আবেগগত ব্যাপার। কবি জসীমউদ্দীনের কলমে ফুটে ওঠেছে এই আবেগ, ‘মন সে তো নহে কুমড়ার ফালি/যাহারে তাহারে কাটিয়া বিলান যায়’। তখনকার সময়টাই ছিল এমন। হয়তো সামাজিক নিয়মে অন্য কারো সঙ্গে সংসার হয়েছে। জীবনও একরকম কেটে গেছে। কিন্তু প্রথম ভালোবাসার অনুভূতিটা হারিয়ে যায় নি। বিরহের রেশও থেকে গেছে। তা সযতনেই সাজানো থাকতো হৃদয়ের সিন্ধুকে। কখনো কখনো একান্তে নিভৃতে ভালোবাসার সেই অনুভূতি, সেই যাতনা হয়ে ওঠেছে যেন মধুময় ভিনটেজ। তাতে না পাওয়ার কষ্টটুকু যেমন থাকতো, তেমনিভাবে থাকতো ফেলে আসা সেই দিনগুলোর মৌতাত। কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, ‘প্রেম কি কখনও জীবনের পিছ ছাড়ে?’ নিখাদ ভালোবাসা আদপেই ছাড়তে পারে না। আবার এর রেশ কাটিয়ে ওঠতে না পেরে অনেকের জীবন হয়ে যেত এলোমেলো।
এখন তো বদলে গেছে ভালোবাসার ধরন। অবশ্য সময় তো সব কিছুই বদলে দেয়। ভালোবাসাইবা বদলাবে না কেন? এখন তো ভার্চুয়াল জগত। বিভিন্ন মাত্রিক এক দুনিয়া। ভালোবাসাও হয়ে ওঠেছে ভার্চুয়াল। কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার সামান্য হেরফের হলেই সৃষ্টি হয় বিভ্রম। ভালোবাসা গড়ে ওঠতে খুব বেশি সময় নেয় না। চোখে চোখ রাখার প্রয়োজন পড়ে না। কথাও বলতে হয় না। জানা-শোনাও লাগে না। গভীর-গোপন অনুভূতি না থাকলেও চলে। সব কিছুই এখন ঝটপট হয়ে যায়। ইনস্ট্যান্ট নুডলসের মতো।

ভালোবাসার মাধ্যম হয়ে ওঠেছে মূলত কী বোর্ড। ফেসবুকের চটকদার ছবি দেখে কিংবা একটুখানি চ্যাটিং হলেই হয়ে যায় রিলেশনশিপ বা লভ। অন্যভাবেও প্রপোজ করা হয়। তবে প্যাটার্নটা একই। তারপর পিজ্জা, কোক আর সেলফি। তাতে ছয়লাপ হয়ে যায় ফেসবুক। তা দেখলে এক একটা যুগলের মনোভাব এমন মনে হবে, ‘মোরা আর জনমে হংস-মিথুন ছিলাম/ছিলাম নদীর চরে/যুগলরূপে এসেছি গো আবার মাটির ঘরে’। কী উচ্ছ্বাস! কী উল্লাস! কী উদযাপন! অথচ কিছু দিন যাওয়ার পরই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রিলেশন ব্রেকÑআপ হতে সময় লাগে না। এমনকি সরাসরি নির্দ্বধায় মেসেজ দেওয়া হয়, ‘আই থিঙ্ক উই নিড টু ব্রেক আপ.....’। তা নিয়ে সাধারণত কারো কোনো কষ্ট বা মনোবেদনাও খুব একটা থাকে না। আর একান্তই যদি কারো একটু মন খারাপ হয়, তাহলে ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়া হয়, ‘ফিলিং ব্যাড’। এটাই যেন খুবই স্বাভাবিক।

সময়টা এখন এমন, কেউ আর দেবদাস হন না। বরং অপেক্ষার তালিকায় থাকেন অন্য কোনো পার্বতী। আর মেয়েদের জন্য তো ফ্রেন্ড লিস্টের সার বেধে থাকা রোমিওরা আছেনই। রিলেশনশিপ স্ট্যাটাসে ‘সিঙ্গেল’ সিলেক্ট করে দিলেই হলো। তারপর আঙুলের একটুখানি চাপাচাপিতে চোখের পলকেই গড়ে ওঠে সম্পর্ক। ক’দিন যাবার পর আবার সেই পুনরাবৃত্তি। ফেসবুক ভালোবাসা গড়ে ওঠতে যেমন খুব বেশি সময় লাগে না, তেমনিভাবে দূরে সরে যেতেও সময় নেয় না। এই রিলেশনশিপ বা ব্রেক-আপ যেন একটা মামুলি ব্যাপার। উপরন্তু কার হিসেবের খাতায় কতটা ‘রিলেশন’ বা ‘ক্রাশ’ যোগ হয়, সেটাই হয়ে ওঠে বড়াই করার মতো বিষয়। কেউ কেউ ভালোবাসার অন্তরঙ্গ ছবি বা ভিডিও চাউর করে দিতে একটুও দ্বিধা করেন না। তাতে যদি ‘লাইক’ বা কমেন্টস বেশি পাওয়া যায়, সেটাও বড় একটা অর্জন মনে করা হয়।
এখন তো টেস্ট ক্রিকেটের রোমান্টিকতার কদর নেই। এটা উপভোগ করার মতো সেই ধৈর্য নেই। সেই আবেগও নেই। ওয়ান ডে ক্রিকেটের উত্তেজনাও ক্রমশ যেন ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। সেই উত্তাপ নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। সেই উচ্ছ্বাসও থিতিয়ে এসেছে। সময়টা এখন টি-টুয়েন্টির। সময় কম। ব্যাপক বিনোদন। উত্তেজনাও বেশি। মূলত জীবনের সব ক্ষেত্রেই অনুসৃত হচ্ছে এই ধারা। ভালোবাসাইবা কেন ক্রিকেটের ক্ষুদ্র এই সংস্করণকে অনুসরণ করবে না? দ্রুতই যদি সব কিছু পাওয়া যায়, চট করে ঘটে যায় সমুদয়, কে আর অপেক্ষার প্রহর গোনে? টি-টুয়েন্টির মূলমন্ত্র, হয় ছক্কা না হয় অক্কা। এই মূলমন্ত্রকে অনুসরণ করা হচ্ছে হাল আমলের ভালোবাসায়। টইটুম্বুর ভালোবাসা মুহুর্তেই নেই হয়ে যেতে একদমই সময় লাগে না। অনেকটা হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো।

এখন ফাগুন আসে বিপুলভাবে উদযাপনের উপলক্ষ নিয়ে। ভ্যালেনটাইন ডে আসে ভরপুর ভালোবাসা নিয়ে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ভার্চুয়াল লভ। সব মিলিয়ে বসন্তের টি-টুয়েন্টি জম্পেশ ককটেল। তাতে থাকে ফেনিল মদিরতা। থাকে উৎসবের আমেজ। থাকে আনন্দময় কোলাহল। রঙদার হয়ে ওঠে চারপাশ। উদ্বেলিত হয়ে ওঠে পরিপার্শ্ব। ঢেউ খেলে যায় রোমান্টিকতার। অতি সুলভে জীবনকে রাঙানোর এমন সুযোগকে কে আর হাতছাড়া করতে চায়? সঙ্গত কারণে তাতে প্রতিধ্বনিত হয় তারুণ্য আর যৌবনের উচ্ছ্বাস, উল্লাস, উদ্দাম। তবে আমরা যারা বুকের মধ্যে টেস্ট ক্রিকেটের ভালোবাসার রোমান্টিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠেছি, তাদের কাছে টি-টুয়েন্টি ভালোবাসার রোমাঞ্চকে ঈশপের গল্পের মতো আঙুর ফলকে টক মনে হতেই পারে।            
           

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

মধ্যবিত্তের রূপান্তর এবং বাংলা নববর্ষের সর্বজনীনতা

১. আমার জন্ম গ্রামে নানী বাড়িতে, আঁতুরঘরে দাইয়ের হাতে। ষাট দশকের মাঝামাঝি, মধুমতি নদীর তীরে। জন্মের দেড়-দুই বছরের মধ্যে ঢাকা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস। শরীরে গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ লেগে থাকলেও বেড়ে ওঠা শহরের আলো-হাওয়ার পরশে। আমাকে নিঃসন্দেহে এ শহরের স্থায়ী বাসিন্দা বলা যেতে পারে। গত চার দশকেরও বেশি এ শহরের পরিবর্তনের ছোঁয়া কিছুটা হলেও অনুভব করতে পেরেছি। আমাদের শৈশব-কৈশোরে পরিবর্তন এলেও তার একটা ধারাবাহিকতা ছিল। কোনো কিছুই বড় কোনো ধামাকা হয়ে আসে নি। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সীমিত আয়। সীমিত ব্যয়। বাড়তি কোনো চাহিদার সুযোগ ছিল না। স্বাধীনতার আগে পুরানো ঢাকার শেখ সাহেব বাজার, সিদ্ধেশ্বরী, শাহজাহানপুর, মতিঝিল কলোনির ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও স্বাধীন বাংলাদেশে একদম শুরু থেকেই থিতু হই ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ খ্যাত শের-এ-বাংলা নগরের সরকারি কলোনিতে। শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে বসবাস করায় সে সময়কার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে খুব একটা বঞ্চিত ছিলাম না। যদিও জীবনযাপন মোটেও ঝলমলে ছিল না। তবে এলাকার সবার সঙ্গে সবার কম-বেশি যোগাযোগ ছিল। আত্মীক সম্পর্ক ছিল। বিপদে-আপদে সবাই এগিয়ে আসতেন। সেই সময় রেশন থেকে চাল-আটা-তেল-চিনি না তুলে চলার উপায় ছিল না। রেশনকার্ড দিয়ে সেটা তুলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। এই ঢাকা শহরেই ছোটবেলা মাদুর বা পিঁড়িতে বসে খাওয়া-দাওয়া করতাম। হাফ প্যান্ট দিয়ে শুরু হলেও একটু বড় হওয়ার পর লুঙ্গি হয়ে ওঠে আরামদায়ক বসন। পোশাক-পরিচ্ছদ খুব বেশি ফ্যাশনদুরস্ত ছিল না। ঈদ উপলক্ষে এক প্রস্তু নতুন জামা-কাপড় পরিধান করলেও এর বাইরে তেমন বায়না ছিল না। মা-খালাদের সুতি শাড়িতে কেটেছে দিনের পর দিন। সালোয়ার-কামিজ পরতে দেখি নি। ঈদের দিন ছাড়া অন্য সময় সচরাচর সেমাই-পোলাও-কোর্মার দেখা মিলতো না। সাজ-সজ্জার জন্য তিব্বত স্নো-পাউডার-কাজল-ভ্যাসলিনই ছিল প্রধান উপকরণ। উৎসব না এলে অন্তত ছেলেদের ক্ষেত্রে গায়ে দেওয়ার সাবান খুব একটা সুলভ ছিল না। কাপড় কাচার জন্য ছিল ৫৭০ সাবান আর জেট পাউডার। বাসার কাপড়ধোয়া, ঘরমোছা, ঝাড়– দেওয়ার কাজের জন্য পার্টটাইম বুয়া রাখা হতো। আঙ্গুলে পাউডার লাগিয়ে দাঁত মাজতাম। ঈদের দিন আতর মাখানোটাই ছিল একমাত্র সুগন্ধি ব্যবহার। জন্মদিন উদযাপনের কোনও রীতি ছিল না। পকেটমানির প্রশ্নই আসে না। সেটা নানা কৌশলে সংগ্রহ করতে হতো। অনেক দূরের স্কুলে যেতাম হেঁটে হেঁটে। প্রাইভেট টিউটর সুলভ ছিল না। অসুখ হলে সরকারি ডিসপেনসারিতে যেতে হতো। দেওয়া হতো নানা রঙের সিরাপ। বোতলে দাগ কাটা থাকতো। সেই অনুপাতে খেতে হতো। জ্বর হলে সাগু-বার্লি খাওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। আপেল-আঙ্গুর-কমলা তখন খানদানি ফল। সহসা তার নাগাল পাওয়া যেত না। হরলিক্সও ছিল পরম কাক্সিক্ষত।


সিগারেট প্যাকেট দিয়ে তাস খেলা, সাতচাড়া, ডাংগুলি, মার্বেল, ঘুড়ি উড়ানো ছিল প্রিয় খেলা। ফুটবল, ক্রিকেটও ছিল। তবে খেলার মাঠ, পার্ক ও আকাশ ছিল অবারিত। রোদেও পুড়েছি, বৃষ্টিতেও ভিজেছি। অনিয়মও করেছি। আমাদের নাগালের মধ্যে ছিল স্যাকারিন আর বরফ দিয়ে বানানো দুই পয়সার লাল-সবুজ আইসক্রিম, ঝালমুড়ি আর নানা পদের আচার। খাওয়া-দাওয়ায় খুব বেশি বৈচিত্র্য না থাকলেও তাতে অবশ্য ফরমালিন ছিল না। আর মাঝে-মধ্যে দেখা পাওয়া যেত বায়োস্কোপওয়ালার। এলাকায় টেলিভিশন ছিল দু’একটি বাসায়। কৃষি কলেজের মিলনায়তনে গিয়ে সাদা-কালো টেলিভিশন দেখতাম। তবে বাসায় ছিল রেডিও। সেটাই ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। তাতে অনুরোধের আসর, নাটক, সৈনিক ভাইদের জন্য ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’ শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হতো কালেভদ্রে। কমিউনিটি সেন্টারে পাঠাগার ছিল। নাটক আয়োজিত হতো। বেড়াতেও খুব একটা যাওয়া হতো না। বছরে এক-আধবার আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে বেবি ট্যাক্সি বা রিক্সাই ছিল প্রধান বাহন। বাসায় আত্মীয় কেউ এলে নিয়ে আসতেন নাবিস্কো বিস্কুট, চকলেট কিংবা গোলপাতায় রসের মিষ্টি। তবে স্কুলের ছুটিতে বছরে এক কি দু’বার গ্রামে বেড়াতে যেতাম। এ কারণে গ্রামের প্রতি একটা টান রয়েই গেছে। গাড়িওয়ালা কোনো আত্মীয় কারো বাসায় এলে সেটা ছিল এলাকার সাড়া জাগানো ঘটনা। কাছাকাছি কেউ বিদেশে গিয়েছে, সে সময় খুব একটা শোনা যেত না। ঈদ ছাড়া খুব একটা উৎসবের দেখা মিলতো না। আর সেটাও খুব বেশি ঝলমলে ছিল না। বাংলা নববর্ষ উদযাপন তো দূরে থাক, আমাদের এলাকায় জাতীয় কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়মিত চোখে পড়তো না। কাছাকাছি এলাকার মধ্যে আজিমপুরে বৈশাখী মেলার উত্তাপ পেতাম। বইমেলাও তখন জমে ওঠে নি। আর জাতীয় পর্যায়ে তো বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতোই। তা ছিল আমাদের নাগালের বাইরে।

২. আমার দুই পুত্রের জন্ম ঢাকার নার্সিং হোমে। দু’জনেই সিজারিয়ান। একজন মাধ্যমিকের গণ্ডি অতিক্রমের অপেক্ষায়। আরেকজন প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছে। যদিও মন-মেজাজে দু’জন দুই ভিন্ন মেরুর। তবুও তাদের বেড়ে ওঠা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার খুব একটা হেরফের নেই। এ শহরের ইট-বালু-সিমেন্টের সঙ্গেই তাদের মেলবন্ধন। সবুজের দেখা মেলে না। গ্রামের সঙ্গে একদমই যোগাযোগ নেই। যে এলাকায় থাকে, সেখানে খেলার মাঠ নেই। তাই সেখানে তাদের যাওয়ার সুযোগও নেই। ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ নেই। অনেকটাই বন্দি জীবনের মতো। এ কারণে প্রায়শই ছটফট করে। ডাইনিং টেবিলে খাওয়া ছাড়া এখন তো চিন্তাই করা যায় না। অবশ্য তারা ড্রয়িংরুমে রঙিন টেলিভিশন দেখতে দেখতে খেতে অভ্যস্ত। এলসিডি টেলিভিশন না হলে নাকি মজা পাওয়া যায় না। কম্পিউটার ছাড়া তো প্রতিদিনের জীবন চিন্তাই করা যায় না। সারাক্ষণই গেমস চলছে। অল্প বয়সেই একজনের চোখে চশমা। মোবাইল ফোনে গড়ে ওঠেছে নিজস্ব নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেটের কারণে দুনিয়াটা খুব একটা দূরের নয়। আড়ালে-আবডালে ব্যবহার করে ফেসবুক। নতুন নতুন মডেলের মোবাইলের প্রতি টান তো আছেই। তথ্যপ্রযুক্তিতে কিছুটা আগ্রহী। ঈদে একাধিক সেট পোশাক অবশ্যম্ভাবী। তার মধ্যে ব্র্যান্ডের পোশাক থাকতে হবে। এছাড়া সারা বছর নতুন নতুন ড্রেস লেগেই থাকে। রাতের পোশাক আলাদা। এখন তো নতুন নতুন উৎসব। তার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতেও নতুন ড্রেস না হলে চলে না। ড্রেসের সঙ্গে মানানসই কম্বিনেশন। পারফিউম, বডি স্প্রে তো থাকতেই হবে। প্রতিদিন গায়ে সাবান মাখতে হয়। টুথব্রাশের সাথে দামি পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজাটাই এখন প্রচলিত। চোখে পড়ার মতো হেয়ারস্টাইল, সানগ্লাস। মায়ের তো নিত্য-নতুন কেনাকাটা আছেই। বদলে যায় ঘরসজ্জা। মাঝে-মধ্যে বাইরের হাল-আমলের রেস্তোরাঁয় না খেলে স্ট্যাটাস থাকে না।


আর বন্ধুদের সঙ্গে পিজ্জা, বার্গার খেতে যেতে হয়। হাতখরচার একটা ব্যাপার আছে। অন্তত পারিবারিকভাবে জন্মদিন পালন করতে হয় ঘটা করে। কোনো উপলক্ষ ছাড়াই পোলাও-কোর্মার আব্দার রক্ষা করতে হয়। বাসায় একজন কাজের বুয়া দিয়ে চলে না। বুয়াদেরও কাজের রেট বেশ বেড়েছে। বেড়েছে স্ট্যাটাসও। এক এক কাজের জন্য এক এক রেট। এখন তো অসুখেরও কোনও লাগাম নেই। লেগেই থাকে। এজন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। তাছাড়া কথায় কথায় প্যারাসিটামলসজাতীয় বিভিন্ন ট্যাবলেট, ক্যাপসুল খাওয়াটা মামুলি একটা ব্যাপার। কেউ রোদে পুড়তে চায় না। চায় না বৃষ্টিতে ভিজতেও। আপেল-আঙ্গুর-কমলা খাওয়ার খুব একটা আগ্রহ নেই। মুচমুচে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন ফ্রাই পেলে আর কিছু না হলেও চলে। নাগালের মধ্যে পাঠাগার নেই। নাটক নেই। সিনেমা নেই। দৈনিক পত্রিকা, গল্পের বই-পত্র পড়ার খুব একটা আগ্রহও নেই। স্টেডিয়ামে গিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখার ঝোঁক আছে, কিন্তু সুযোগ হয় না। একজন প্রাইভেট টিউটর দিয়ে চলার প্রশ্নই আসে না। আছে বিভিন্ন কোচিং। বন্ধুদের অনেকেই নাকি এক একটা বিষয় এক একজন টিচারের কাছে পড়ার জন্য ছুটে যায়। এসএসসি’র সীমানা টপকানোর আগেই ব্যয়বহুল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরিকল্পনা। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ তো এখন ডালভাত। এর মধ্যে ঘটনাচক্রে একবার বিমানে প্রতিবেশী দেশে ঘুরে আসা হয়েছে। সেটাও খুব একটা মন রাঙাতে পারে নি। ইউরোপ-আমেরিকার প্রতি একটা টান আছে। দুই ফুফুই থাকে দেশের বাইরে। সেটাও অন্যতম আকর্ষণ। রাস্তা-ঘাটে একটুও হাঁটতে রাজি নয়। পিতা ক্যারিসমেটিক না হওয়ায় নিজস্ব ফ্ল্যাট নেই। গাড়ি নেই। এ কারণে আক্ষেপ আছে। মনস্তাপ আছে। অবশ্য পিতার সঙ্গে ছুটির দিন ছাড়া সন্তানদের দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়। তাছাড়া দুই প্রজন্মের মধ্যে কেন জানি অজানা একটা দূরত্ব রয়ে যায়। যে কারণে তাদের মনের একান্ত কথা খুব একটা জানা হয় না। সন্তানদের মনোভাব সম্পর্কে যেটুকু অনুভব করতে পারা যায়, সেটাই তুলে ধরা হলো।

৩. যদিও এখানে সীমিত পরিসরে দুই প্রজন্মের ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেটিও একটি এলাকাকেন্দ্রিক। তবে সবার অভিজ্ঞতা তো আর এক রকম হবে না। সেটা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এর আলোকে পরিবর্তনের একটা ছোঁয়া নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যায়। যেভাবেই হোক, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটছে। এ বিষয়ে গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ভারি কোনও প্রবন্ধ রচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে ধারণাটা গড়ে ওঠেছে, সেটা ব্যক্ত করাই এ লেখার উদ্দেশ্য। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই পরিবর্তনটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এমনিতেই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠছে হাইরাইজ বিল্ডিং। নিত্য-নতুন চোখ ধাঁধানো মার্কেট। ভিন্নধর্মী প্রলুব্ধকর রেস্তোরাঁ। পার্লার। আরও কত কি! এই শহরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্তের বসবাস ফ্ল্যাটে। সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করছে। সংখ্যাটা নেহাত মন্দ নয়। হাতে হাতে মোবাইল। কারো কারো কাছে একাধিক। লেটেস্ট মডেলের। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফেসবুকের কল্যাণে বদলে গেছে সম্পর্কের ধরন। নতুন নতুন দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরিধান করা হয়। বৈচিত্র্যময় ও স্মার্ট সব ড্রেস। বাইরে গিয়ে খাবারের স্বাদবদল নেওয়া হয়। প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে ফ্ল্যাইওভার। অনেকেই দেশে ও দেশের বাইরে ঘুরতে যায়। চাকচিক্যময় ও ঝলমলে জীবন। স্বাধীনতার বেশ পরেও এমন জীবন কল্পনা করা যেত না। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে মধ্যবিত্তের মানসিকতা, মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-, ভোগবিলাস, বিনোদনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। যদিও শহর এলাকার সঙ্গে গ্রামের তফাত রয়েই গেছে। তারপরও গ্রামীণ জীবনও কিন্তু কম বদলায় নি। সেখানেও এখন শহুরে আমেজ পাওয়া যায়। অর্থাৎ কম-বেশি সবকিছুতে পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, পোশাকে, শিক্ষায়, চিন্তা-ভাবনায়। আগের সেই মধ্যবিত্ত এখন আর নেই।


এমন একটা রূপান্তরিত সমাজ কাঠামোয় কেউ কেউ যখন বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের ঐতিহ্য নয়। অতীতে খুব বেশি ঘটা করে তা উদযাপন করা হয় নি। এখন কেন এই আদিখ্যেতা? এ ধরনের কথার কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না। বাংলা নববর্ষ অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। একদম অতীতের কথা বাদ দিলেও সেই বাদশাহ আকবরের আমল থেকে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। অতীতে হয়তো এখনকার মতো জমকালোভাবে উদযাপিত হয় নি। শুধু বাংলা নববর্ষ কেন, এই সেদিনও আমাদের কোন উৎসব অনেক বেশি জমজমাট ছিল? বলতে গেলে কোনোটাই ছিল না। আসলে সেই সামর্থ্য, সেই মনমানসিকতাই ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব বদলে যাওয়ায় উৎসবগুলো দিনে দিনে অনেক বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠছে। বাড়ছে বৈচিত্র্য। যোগ হচ্ছে নতুনত্ব। যে কোনও পর্যায়ের অনুষ্ঠানই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে। এমনকি বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচও হয়ে ওঠেছে উৎসবের উপলক্ষ। তবে জনসংখ্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। লোকসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎসবের ব্যাপ্তি ও বিশালত্ব। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাছাড়া অসাম্প্রদায়িক একটা চেতনা নিয়ে এই বাংলাদেশের জন্ম। সে কারণে সর্বজনীন উৎসব হয়ে ওঠার সব অনুষঙ্গই আছে বাংলা নববর্ষে। এ উৎসবের বিস্তার ও জাগরণ ঘটছে শুধু এই শহরেই নয়, পুরো দেশেই। এটি যত বেশি বিস্তৃত হবে, যত বেশি ঘটা করে উদযাপিত হবে, যত বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করবে, ততই এগিয়ে যাবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬

ঘুঙুরের কান্না

কী এক কারণে অনেক আগে থেকেই ভারতের লখনৌ শহরের প্রতি একটা অদৃশ্য টান অনুভব করি। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এ শহরে কখনও যাওয়া হয় নি। কখনও যাওয়া হবে কিনা তাও জানি না। কিন্তু শহরটিকে নিয়ে দীর্ঘ দিন যাবৎ বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে একটি শিরোনাম। যদি কোনও দিন সেখানে যাওয়া হয় এবং লেখার সুযোগ হয়, সে লেখার শিরোনাম হবে ‘ঘুঙুরের কান্না’। কেন এমন একটি শিরোনাম হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে, আমি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবো না। মানুষের জীবনে ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছুই ঘটে। এটাও কি তেমন কিছু? তবে এ শহরটি নিয়ে যখন কল্পনায় ছবি আঁকি, তখন দেখতে পাই, সুর আর সুরায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত রসিকজনেরা। আর তাঁদের তো মজিয়ে দিয়েছেন এ শহরের মশহুর আশেক মির্জা গালিব, ‘সুর আছে, ভেসে যাও সুরের স্রোতে; সুরা আছে, ভুলে যাও সব-কিছু। রূপসীর প্রেমে পাগল হয়ে যাও, সাধুতা থাক অন্যদের জন্য।’ স্বাভাবিক নিয়মে সন্ধ্যা নেমে এলেই গুলজার হয়ে ওঠতে থাকে বিভিন্ন মজলিশ। সরগরম হয়ে ওঠে গজলের মেহফিল, গানের জলসা আর বাঈজীদের জলসাঘর। কান পাতলেই শোনা যায় মীর তকি মীর, মির্জা গালিবের গজল। হাওয়ায় ভাসতে থাকে শের-শায়েরী। আর ঘুঙুরের ঝংকারের ভেঙে যায় রাতের নীরবতা। ‘ভুলভুলাইয়া’-র গোলকধাঁধায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে ভেসে আসে আশিক-আশিকীদের খিলখিল হাসি। চারপাশে আতরের সুঘ্রাণ। গোলাপের বাগিচা। হরেক পদের কাবাব ও বিরিয়ানির মৌ মৌ খুশবু।

নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ’র তারিফদারিতে মশগুল লখনৌর সংগীত, নৃত্য, নাটক, কবিতার আসর। শতরঞ্জ নিয়ে গভীরভাবে মগ্ন খিলাড়িরা। জীবনকে সুরভিত করার কত রকম উপাদানই না রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কেন যেন মনে হয়, নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ইংরেজরা বিতাড়িত করার পর শহরটিতে নেমে আসে থোকা থোকা বিষণ্নতা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির এমন একটি প্রাণবন্ত ও প্রাণোচ্ছ্বল শহর হয়ে পড়ে অনেকটা নিস্প্রাণ ও নির্জীব। সব রওশন হারিয়ে শহরটা কেমন যেন বিষণ্নতায় ভুগছে। কবিতায়, সংগীতে, নৃত্যে ছুঁয়ে যায় অন্তহীন বিষাদ। বাঈজীদের ঘুঙুরে বাজতে থাকে উচ্চকিত কান্না। এমনিতে বাঈজীদের জীবন ট্র্যাজেডির শেষ নেই। নবাবহীন লখনৌ শহরটায় তাঁদের সেই কদর কোথায়? আশাভঙ্গের খেদ নিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে ঘুঙুর। শহরটা যেন ধুঁকছে ক্ষয়িষ্ণু অবয়ব নিয়ে। আমার বুকের মধ্যে লখনৌ শহর এভাবেই জেগে আছে। এ শহরের ইদানিংকার হালহকিকত ঠিকমতো কল্পনায় আসে না। এ কি অতীতের প্রতি এক ধরনের হ্যাঙওভার? সেটাইবা হবে কেন? আমি তো এ শহরের কেউ না। তবে খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখন কি আগের মতো লখনৌ শহর চঞ্চল হয় কথক নৃত্যের ঘুঙুরে? ঠুমরির কি কদর আছে? বেগম আখতার কিংবা তাঁর পরের প্রজন্মের কারও কণ্ঠে কি শুনতে পাওয়া যায় তকি, গালিব বা ওয়াজিদ আলীর গজল? গজল, ঠুমরি, শায়েরী ছাড়া তো এ শহরটাকে একদমই মানবে না। এ শহর তো আলোকিত হওয়ার কথা হিন্দি চলচ্চিত্রের সুরের রাজা নৌশাদ আলী, জাভেদ আখতার, অনুপ জালোটা, কবি কাইফি আজমির মতো ব্যক্তিত্বদের রোশনগিরিতে। নতুন প্রজন্মের কী বোর্ডে ওঠে আসার কথা বিরহ ও বেদনার কবিতা। থাকার কথা আভিজাত্য, খানদানি ও বনেদিয়ানার ঐতিহ্য। আমি তো এ শহরের অতীত ও বর্তমান কিছুই জানি না। তারপরও কেন যেন অতীতের লখনৌ আমাকে আবিষ্ট করে রাখে। সেই মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। আমার স্বভাবের মধ্যে কি লুকিয়ে আছে ওয়াজেদ আলী শাহ’র লখনৌ শহরের কোনও নস্টালজিয়া?

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

আমাদের বদলে যাওয়া


পেছন ফিরে তাকালে অনুধাবন করা যায় বদলে যাচ্ছে আমাদের সমাজ, আমাদের সংসার। রূপান্তর ঘটছে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের। বদলটা মূলত হয়েছে মানচিত্র ও সময়কে কেন্দ্র করে। একাধিকবার বদলেছে এ অঞ্চলের মানচিত্র, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত। সেই ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশদের সংস্পর্শে এসে বদলেছে কিছু মানুষ। কেউ কেউ ব্রিটিশদের ফাই-ফরমাশ খেটে আর্থিকভাবে সচ্ছল হয়েছেন; আবার কেউ কেউ ব্রিটিশদের চুইয়ে পড়া শিক্ষার আলোকে পুঁজি করে বদলে নিয়েছেন নিজেদের ভাগ্য। প্রধানত গ্রামীণ জনপদ হিসেবে আবহমানকাল থেকে চলে আসা এ অঞ্চলের কিছু মানুষের মধ্যে এই পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ঘটে যায় সামাজিক বিভাজন। অবশ্য এর আগেও সামাজিক বিভাজন ছিল। তা ছিল সীমিত পরিসরে। একদিকে ছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ; অন্যদিকে নবাব বা জমিদার গোছের ব্যক্তিরা। নবাব বা জমিদারের সংখ্যা ক’জনই বা ছিল? তবে দু’শ বছরের ব্রিটিশ শাসনে উদ্ভব ঘটে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। পরবর্তীকালে এরাই হয়ে উঠেন এ অঞ্চলের ভাগ্য বিধাতা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে সবচেয়ে বড় সুবিধাবাদী হয়ে ওঠে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী। যদিও পাকিস্তানিরা বিভীষণ হয়ে দেখা দেয়, কিন্তু ব্রিটিশের অনুগ্রহভোগীরা ঠিকই তাদের অবস্থান আগের মতোই পাকাপোক্ত করে নেয়। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ-নির্যাতনে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেও ধর্মের নামে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী শ্রেণী তাদের ‘তৃণভোজী’ হয়ে ওঠে। এছাড়া ক্ষোভ-বিক্ষোভ-আন্দোলনের চাপে পাকিস্তানি শাসকরা কিছুটা ছাড় দিলে অল্প কিছু মানুষ এগিয়ে আসে শিক্ষা-দীক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে। শিক্ষকতা, ওকালতি, চিকিৎসা, কেরানিগিরিসহ বিভিন্ন পেশায় অনেকেই এগিয়ে আসে। ফলে সমাজে একটা পালাবদল অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। সুদূর আবহমানকাল থেকে এ দেশের মানুষ জীবনধারণ করে এসেছে কৃষিকাজ করে। হাজার বছর ধরে একই রকমভাবে চলে আসা জীবনযাত্রা আস্তে-ধীরে বদলে যেতে থাকে। ক্রমাগত শোষণ, নির্যাতন ও বঞ্চনায় আন্দোলন, সংগ্রাম ও স্বাধিকার চেতনাবোধ তীব্র ও তীক্ষন হয়ে ওঠায় পরিবর্তনের হাওয়াটা জোরালো হয়ে ওঠে। ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে নতুন একটি শ্রেণী। যদিও খুব বেশি জৌলুস ছিল না, তারপরও পরিবর্তনটা টের পাওয়া যাচ্ছিল। যারা শিক্ষার পাঠ নিয়েছেন, তারা নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের আশায় ছুটতে থাকেন ঢাকায়। ঢাকা শহরও তাদের আপন করে নেয়। শুরুতে গ্রামের বন্ধন কাটিয়ে এক/দু’জন করে শহরমুখো হতে থাকেন। বন্ধন কাটলেও নাড়ি কিন্তু পোঁতা থাকে গ্রামে। গ্রামের সঙ্গে বন্ধনটা কখনোই ছিন্ন হয়নি। ঢাকা শহরে জীবিকা জুটিয়ে নিলেও পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থাকে গ্রামে। চাকরির ছুটি-ছাটায় গ্রামে ফিরে যাওয়াটা হয়ে ওঠে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।


হাজার বছর ধরে চলে আসা যে গ্রামীণ জনপদ, তার যে জীবনধারা, তার সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক, তা সহজেই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয় না। টিনের, ছনের বা মাটির ঘরে বসবাস, ঢেঁকিতে চাল ভাঙ্গানো, মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া, মাটির হাঁড়িতে ভাত রাঁধা, নিজের হাতে গরু-ছাগলের দুধ দোয়ানো, নদী-পুকুর-খালে মাছ ধরা, যখন-তখন মুড়ি-মুড়কি-গুড়-পিঠা খাওয়া, আঁতুর ঘরে দাইয়ের হাতে সন্তান জন্ম, পিঁড়িতে বা মাদুরে বসে ভাত খাওয়া, তাল পাতার পাখায় বাতাস খাওয়া, হেঁটে বা নৌকায় কিংবা লঞ্চে যাতায়াত, পালকিতে চড়ে বিয়ে করা, রুমাল-চাদর-বালিশে সুতো দিয়ে মেয়েলি হাতের সূক্ষ্ম কারুকাজ, ফুল-পাখি আঁকা কিংবা গভীর ভালোবাসা নিয়ে লেখা ‘যাও পাখি বল তারে, সে যেন ভোলে না মোরে’, সরিষার তেল সারা শরীরে মেখে পুকুরে বা নদীতে গোসল করা, অবসরে পুঁথি পাঠ বা পল্লীগীতি শোনা, ছেলেরা লুঙ্গি, গেঞ্জি, ধুতি, পাজামা-পাঞ্জাবি; মেয়েরা শাড়ি পরিধান করা, শীতকালে নানা পিঠা-পুলি খাওয়ার ধুম লাগা, বিশেষ করে চুলার পাশে বসে ভাপা পিঠা খাওয়া, অসুখে-বিসুখে বিভিন্ন ঔষধি গাছ বা ফল ব্যবহার করা ইত্যাদি ছিল গ্রামীণ জীবনের চিরকালের অনুষঙ্গ। এই গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে নাগরিক মধ্যবিত্তের বেশ সময় লেগেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর আমূল বদলে যেতে থাকে বাংলাদেশ। সৃষ্টি হতে থাকে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত। হঠাৎ করে পাওয়া স্বাধীনতায় চাকরি, ব্যবসাসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করার জন্য গ্রাম থেকে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসতে থাকে শিক্ষিত, আধা-শিক্ষিত ব্যক্তিরা। গ্রামের বন্ধন ছিন্ন করে শহরে গড়ে উঠতে থাকে মধ্যবিত্ত। এই মধ্যবিত্তকে কেন্দ্র করে নতুন একটা ধারা গড়ে উঠতে থাকে।


একদিকে গ্রামের ফেলে আসা জীবনের প্রতি মোহ, অপরদিকে নাগরিক জীবনের আকর্ষণ- এই দোটানার মাঝে এগিয়ে যেতে থাকে উঠতি মধ্যবিত্ত। ইট-পাথর-সিমেন্টের বাসা, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের ব্যবহার, বাসে-ট্রেনে চলাচল, ছেলেরা শার্ট-প্যান্ট, মেয়েরা সালোয়ার-কামিজ, ঢাউস খোঁপা, চোখে কাজল, সস্তা প্রসাধনী ব্যবহার, রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে বিনোদনের খোরাক মেটানো, সিনেমা দেখতে যাওয়া, রোমান্টিক বাংলা গানে বিভোর হওয়া, চিড়িয়াখানায় যাওয়া, আত্মীয়-স্বজনের বাসায় বেড়াতে যাওয়া, সঙ্গে নাবিস্কো বিস্কুট কিংবা গোলপাতায় করে মিষ্টি নিয়ে যাওয়া, মেহমান এলে সাধ্যমত আপ্যায়ন করা, গানে-কবিতায় মেতে থাকা, ছবি আঁকা, পাড়ায় পাড়ায় নাটক করা, বিকেল বেলায় ছেলেমেয়েদের খেলাধুলায় মেতে থাকা, মার্বেল, সিগারেট প্যাকেট, ডাংগুলি খেলার পাশাপাশি ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন ছিল বাধ্যতামূলক। সন্তান প্রসবে নার্স-ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। আস্তে-ধীরে বদলে যেতে থাকে জীবনযাপনের স্টাইল। সবকিছু মিলিয়ে গ্রামের সহজ-সরল জীবনের ছাপ তবুও থেকে যায় নাগরিক জীবনে। তবে আশির দশক থেকে গ্রামের সঙ্গে গড়ে ওঠা শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্তের সম্পর্কের বন্ধন ক্রমশ শিথিল হতে থাকে। রাস্তা-ঘাট, বিদ্যুৎ পৌঁছে যাওয়ায় বদলে যেতে থাকে গ্রামীণ জীবন। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমের বাজার খুলে যাওয়ায় সরাসরি গ্রাম থেকে ছুটতে থাকে অনেক মানুষ। তাদের পাঠানো টাকা-পয়সায় কিছু কিছু গ্রামের ছুরত পাল্টে যেতে থাকে। পক্ষান্তরে ঢাকা শহরের ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। হঠাৎ করে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ ঘটে যায়। সাধারণ চাকরিজীবীর যে বৃত্ত, তা ভেঙ্গে নতুন নতুন কর্মজীবীর আবির্ভাব ঘটতে থাকে। মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা, কোটিপতি, ব্যবসায়ী, টাউট-বাটপারের সংখ্যা হঠাৎ করে বেড়ে যায়। যে কখনো যা ভাবেনি, স্বাধীনতার সুবাদে তাই পেয়ে যাওয়ায় সমাজে দ্রুত একটা পরিবর্তন ঘটে যায়। সে সঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানির নানারকম প্রলোভন বদলে দিতে থাকে প্রতিদিনের জীবনযাত্রা। এমনকি, বদলে যেতে থাকে নাম পর্যন্ত। রহিমুদ্দিন-করিমুদ্দিনের পরিবর্তে আধুনিক নামের বাহার লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষা-দীক্ষা, পোশাক-আশাক, খাদ্যাভ্যাস, মূল্যবোধের পাশাপাশি ঘটে যায় সামাজিক বিবর্তন। একই সঙ্গে লক্ষ্য করা যায় অবক্ষয় ও অধঃপতনের ধারা। রক্ষণশীলতার ব্যুহে আঘাত হানলেও মন-মানসিকতার দিক দিয়ে মধ্যবিত্তের পক্ষে খুব বেশি অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। যে কারণে পোশাক-আশাকে রূপান্তর ঘটলেও পশ্চাৎপদ মানসিকতার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি। রাজনৈতিক অঙ্গনে দুর্বৃত্তায়ন সমাজ কাঠামোকে ভেঙ্গে দিয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যে নীতি-নৈতিকতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ছিল, তা ভেঙ্গেচুরে একাকার হয়ে যায়। সাধারণ মানুষের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিবিদদের জন্য রাজনীতি করাটা জটিল হয়ে পড়ে। অসৎ, মাস্তান, টাউট, ধান্দাবাজরা রাজনৈতিক অঙ্গনে জেঁকে বসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারাই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে রাজনীতি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি হঠকারী, নিচু মন-মানসিকতাসম্পন্ন, মেধাহীনদের দখলে চলে যায়, তার চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে! যে কারণে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবক্ষয়, নৈরাজ্য ও অরাজকতার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ এখন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করার মনোবৃত্তি তার নেই। সবাই এখন আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর হয়ে উঠেছে। কত সহজে অর্থ উপার্জন করা যায় এবং কীভাবে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে ওপরে ওঠা যায়, সে চিন্তায় মশগুল। স্বার্থসিদ্ধির জন্য হেন কোনো পথ নেই, যা অবলম্বন করা হচ্ছে না। বোধ, বুদ্ধি, বিবেক ও বিবেচনা সর্বাংশে লোপ পেতে চলেছে। বিদেশি অনুদানের পাশাপাশি সরকারি সম্পত্তি লোপাট, ঘুষ, চোরাচালানিসহ যাবতীয় দুই নম্বরী পথ বেছে নিয়ে হঠাৎ করে কিছু লোক রমরমা হয়ে উঠেছে। হরদম বিদেশ যাচ্ছে। দামি হোটেলে খাচ্ছে। দেদারসে টাকা ওড়াচ্ছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি অংশ বিত্তবান হয়ে ওঠায় সমাজে নতুন একটি শ্রেণীর জন্ম নিয়েছে। এই শ্রেণীর আয় এবং ব্যয়ের কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। নানারকম রহস্যজনক কাজ-কারবারের পাশাপাশি নতুন একটা উপসর্গ দেখা দিয়েছে ব্যাংকের টাকা মেরে দেয়া। ঋণখেলাপি হিসেবে পরিচিত হলেও সমাজের চাবিকাঠি তাদের কাছে।


এ কারণে নব্বই দশকে পরিবর্তনের একটি জোয়ার আসে। রঙিন টেলিভিশন, ভিসিআর, ডিশ অ্যান্টেনা, এসি, জেনারেটর, ইউপিএস, কম্পিউটার, ওয়াশিং মেশিন, বাথটাব, দামি দামি অ্যাপার্টমেন্ট, মোবাইল, লেটেস্ট মডেলের পাজেরো, বিদেশি ফ্যাশনেবল ড্রেস, মেক-আপ, সিডি, ব্যান্ড সঙ্গীত, ফ্যাশন শো, বিউটি পার্লার, ম্যাসেজ পার্লার, সুপার মার্কেট, ওয়ান স্টপ মল, কমিউনিটি সেন্টারে বিয়ে, জন্মদিন পার্টি, স্যান্ডউইচ, বার্গার, স্যুপ, চাইনিজ, কোকাকোলা, আইসক্রিম খাওয়া, ঘন ঘন বিদেশ সফরসহ ইউরোপ-আমেরিকার সর্বশেষ ফ্যাশন ও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার সঙ্গতি অনেকেই অর্জন করেছেন। যে কোনো কিছুই এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। হেরোইন, নেশার দামি ট্যাবলেট, আল্টা মডার্ন নারী চোখের পলকেই হাতের মুঠোয় এসে যায়। একবিংশ শতাব্দী বিশ্বায়ন ও হাই-টেকের যুগ। সবকিছু এখন অবাধ হতে চলেছে। ২০০৫ সালের জানুয়ারি থেকে সারা দুনিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্যের সব বিধি-বিধান পরিচালিত করবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা। এ সংস্থার একক ও আধিপত্যবাদী বিধি-বিধানের ফলে দুনিয়াব্যাপী বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলোর শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। উন্নত বিশ্ব আর উন্নয়নশীল বিশ্ব এবং ধনী আর দরিদ্রের মাঝে সৃষ্টি হবে তীব্র বৈষম্য। একই সময় প্রবর্তিত পেটেন্ট রাইটসের নামে নিঃস্ব হয়ে যাবে এ দেশের কৃষক-শ্রমিক। এমনিতেই সমাজে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের সৃষ্টি হলেও কৃষক ও শ্রমিকদের ভাগ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। খেয়ে-না খেয়ে তারা চালিয়ে যাচ্ছে জীবন-সংগ্রাম। পেটেন্ট রাইটসের কারণে আমাদের দেশের হাজার বছরের কৃষক সম্প্রদায় দ্বারা আবিষ্কৃত ও লালিত বীজ, গাছ ও প্রাণ সম্পদকে বিভিন্ন কোম্পানির কাছে তুলে দেয়া হবে। বিপন্ন হয়ে পড়বে তাদের জীবন ও জীবিকা। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার খপ্পরে পাল্টে যাবে পৃথিবীর আর্থ-সামাজিক অবস্থান। পাল্টে যাবে আমাদের মূল্যবোধ ও জীবনযাপনের পদ্ধতি। আমাদের প্রথা, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতি নতুনভাবে বিন্যস্ত হওয়ায় আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের ধাক্কা লাগবে। আমাদের সমাজের গরিষ্ঠ অংশ এ পরিবর্তন সম্পর্কে কিছুই জানে না। একটা অপ্রস্তুত অবস্থায় তাদের এই পালাবদলের মুখোমুখি হতে হবে। এমনিতেই আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থা ভঙ্গুর, তার ওপর বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় আমাদের অবস্থা কী দাঁড়ায়, তা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। 

দৈনিক ভোরের কাগজ : ২৩ জুন ২০০৩