পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজনীতি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

কেন রাজনীতি নয়

পলিটিক্স মানে রাজনীতি নয়,
পলিটিক্স মানে ভাঁওতা
পলিটিশিয়ান ডিম পেড়ে বলে
দুই চোখ বুজে দাও তা’।
আমরাও তাই দিলাম
তাইতো আমার ঘটি-বাটি
সব হয়েছে নিলাম।

 ১৯৮৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত সাহিত্য সংকলন ‘আবাহন’-এ বর্তমানে কানাডা প্রবাসী বিশিষ্ট ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন ‘পলিটিক্স’ শিরোনামে এ ছড়াটি লিখেছিলেন। প্রায় দু’দশক আগে লেখা এ ছড়ার ছত্রে ছত্রে রাজনীতির প্রতি অনাস্থা ও অবজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছিল। অবশ্য পরবর্তীকালেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরং পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। ইদানীং রাজনীতির কথা শুনলে অনেকেই নাক সিঁটকে ওঠেন। সবাই রাজনীতিবিদদের সন্দেহের চোখে দেখেন। সবার মনোভাবটা এমন, এ দেশের সর্বনাশ করছে রাজনীতিবিদরা। রাজনীতিবিদরা যে ধোয়া তুলশি পাতা- এ কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়। সে দায়ও আমার নয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা দূরের কোনো গ্রহের বাসিন্দা নন। তারা আমাদেরই নিকটজন। কিন্তু তাদের সঙ্গে সমাজের অন্যান্য মানুষের মধ্যে একটা ব্যবধান গড়ে উঠেছে। নেতিবাচক কর্মকােণ্ডর কারণে তাদের ভাবমূর্তি আজ তলানিতে ঠেকেছে। অধিকাংশই মানুষ তাদের বিশ্বাস করেন না। তাদের কাছে কিছু প্রত্যাশাও করেন না। কিন্তু কেন? দেশের নিয়ন্তা তো রাজনীতিবিদরা। দেশ কীভাবে চলবে, কোথায় যাবে- তার দায়ভার রাজনীতিবিদদের। সঠিক নেতৃত্ব, সঠিক নির্দেশনা দেবেন রাজনীতিবিদরা। রাজনীতিকরা ছাড়া দেশ পরিচালনা কি সম্ভব? তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে কেন রাজনীতি থেকে আমরা দূরে সরে যাচ্ছি? রাজনীতি তো করবেন দেশের মেধাবী, ত্যাগী, নিঃস্বার্থ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিরা। কিন্তু আমরা তো উল্টোটাই দেখতে পাচ্ছি। যাদের রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কথা, তারা না হয়ে যারা রাজনীতির জঞ্জাল হিসেবে পরিচিত, তারাই এখন রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন। কেন এমন হচ্ছে? একজন রাজনীতিবিদকে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা-শ্রম-মেধা-আত্মত্যাগ করে রাজনীতির পথে হাঁটতে হয়। যিনি রাজনীতিবিদ হবেন, তাকে আজীবন ত্যাগী হতে হয়। গরিবদের দুঃখ-দুর্দশায় বেদনার্ত এবং দেশ ও আর্তের সেবায় মন-প্রাণ সঁপে দিতে হয়। সবরকম সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন এড়িয়ে চলতে হয়। সৎ ও সত্যের পথে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতে হয়। তাকে পথভ্রষ্ট করার জন্য কিংবা প্রশাসনিকভাবে হয়রানি, জেল-জুলুম ও নির্যাতন সইতে হয়। অর্থাৎ কিছু পাওয়ার আশা না করে জীবনভর কষ্টকর জীবনযাপন করতে হয়। থাকতে হয় আশ্চর্য আত্মত্যাগ, দৃঢ়চেতা মনোবল ও বীরত্ব। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে আমরা দেখেছি, রাজনীতিবিদদের ত্যাগ-তিতিক্ষা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, ভালোবাসা। না খেয়ে, না ঘুমিয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের সমস্যা-সংকটে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। সহজেই তাদের মন জয় করে নিয়েছেন। বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। দ্বীপান্তরিত হয়েছেন। অনশন করেছেন। দেশের মানুষের মুক্তির ব্রত নিয়ে হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন। যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট সয়েছেন। নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। এমনকি জমিদার নন্দনরাও নিশ্চিত সুখ-শান্তিকে বিসর্জন দিয়ে রাজনীতির পিচ্ছিল পথকে অনায়াসে স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছেন। কেউ ব্যারিস্টারি পড়ে, কেউবা মাঝ পথে ব্যারিস্টারি পড়া ছেড়ে দিয়ে কিংবা আরাম-আয়েশের জীবন পরিত্যাগ করে দুঃখ-কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছেন। কোনো পিছুটান তাদের রুখতে পারেনি। জীবনভর গেয়েছেন মানবতার গান। যাপন করেছেন কঠিন ও কষ্টকর জীবন। কখনো-সখনো মুষড়ে পড়েছেন; কিন্তু ভেঙে পড়েননি। আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্ন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার নয়। সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন। সাহসী, বলিষ্ঠ, প্রতিবাদী ও মেধাবীরা রাজনীতির মঞ্চে এগিয়ে এসেছেন। যেখানে কোনো অন্যায়, অবিচার, অসত্য, জুলুম ও আইনের লঙ্ঘন দেখেছেন, তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে ছুটে গেছেন। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রতিবাদ করেছেন। আন্দোলন করেছেন। মিছিলের পুরোভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষের আশা-আকাক্ষা-আন্দোলনের প্রতীক। সমাজের সম্মানজনক ব্যক্তিরা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। সব রাজনীতিবিদই যে ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে থেকেছেন, এমনটি হয়তো নয়। কিন্তু তাদের সংখ্যা ছিল সীমিত। সাধারণ মানুষ তাদের বাঁকা দৃষ্টিতে দেখতে। কিন্তু সত্যিকার রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের ভালবাসা ছিল অপরিসীম। রাজনীতিবিদদের কথায় নিজের জীবনকে তুচ্ছ ভেবে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। প্রয়োজনে প্রাণ বিসর্জনও দিয়েছেন। দেশ ও দশের মঙ্গলের জন্য যা করা প্রয়োজন, তা করতে রাজনীতিবদরা মোটেও পিছপা হননি। সেই ব্রিটিশ আমলের পরাধীনতা থেকে শুরু করে আজ অবধি প্রকৃত রাজনীতিবিদদের মানুষের ব্যথা-বেদনায় এগিয়ে যেতে দেখেছি। কখনো-সখনো কিছু করতে না পারার যন্ত্রণায় তারা মর্মযাতনা অনুভব করেছেন। নীরবে চোখের অশ্রু ফেলেছেন। তবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ত্যাগী ও নিঃস্বার্থ রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। প্রলোভনের নানা ফাঁদ থাকা সত্ত্বেও তারা পরাধীনতার শৃংখল ভাঙ্গার জন্য জীবনপণ করে লড়েছেন। এর মাঝে কেউ কেউ ব্রিটিশের গোলামি করে সুযোগ-সুবিধার পথ বেছে নিয়েছেন, খেতাব কুড়িয়েছেন। কিন্তু তারা হারিয়ে গেছেন কালের অতল গহ্বরে। কিন্তু যেসব বিপ্লবী সীমিত সাধ্যের মাঝেও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম করেছেন এবং ব্রিটিশদের দেশত্যাগে বাধ্য করেছেন, তারা ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। সত্য ও ন্যায়ের পথে তাদের যে সংগ্রাম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা, তা তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত ও উজ্জীবিত করেছে। অন্তত তাদের আদর্শকে অনুসরণ করা সম্ভব না হলেও বুকের মাঝে অনির্বাণ হয়ে জ্বলেছে আদর্শের আলোকবর্তিকা। যে কারণে অন্যায় ও অসত্যের মাঝে কখনোই তলিয়ে যায়নি আদর্শের নিরন্তর পতাকা। ব্রিটিশের জিঞ্জির ছিন্ন করার ব্রত নিয়ে আর অত্যাচার, বেয়নেট, গুলিকে তুচ্ছ করে কত শত প্রাণ যে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য উৎসর্গ করেছেন, তার কোনো হিসাব নেই।


১৭৬০ সালে স্বাধীনচেতা নবাব মীর কাশিম প্রতিরোধের প্রথম যে মশাল জ্বালান, তারই পথ বেয়ে ১৭৯৯ সালে মহীশুরের স্বাধীন নবাব টিপু সুলতানের বীরত্বসূচক আÍত্যাগ, ১৮৩১ সালে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ গোরাদের কামানের গোলায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও জীবনের প্রতি বিন্দুমাত্র মায়া তারা করেননি। আত্মত্যাগ ও বীরত্বে মহিমান্বিত হয়ে আছেন তারা ইতিহাসের পাতায়। প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর সৈনিক, তাদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী, শ্রী অরবিন্দ, বারীন্দ্র ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, ভগৎ সিং, রাসবিহারী বসু, বাঘা যতীন, মাস্টার দা সূর্যসেন, বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত, দীনেশ গুপ্ত, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, অশ্বিনীকুমার দত্ত, সুভাষ বোস, মাতঙ্গিনী হাজরা, চট্টগ্রামের বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার প্রমুখ এক ঝাঁক সাহসী সন্তান। এরা ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধীনতা সংগ্রামে। পরাধীন জাতির বেদনা অন্তর দিয়ে অনুভব করে তারা উৎসর্গ করেন নিজেদের জীবন। এদের মধ্যে কারো ফাঁসি হয়, কেউ কারাবন্দি হওয়ার পরিবর্তে নিজের পিস্তলে আত্মহত্যা করেছেন, কেউ দীর্ঘ অনশন করে আত্মহুতির পথ বেছে নিয়েছেন, কেউ লড়াই করে প্রাণ দিয়েছেন, নির্মম অত্যাচারে অকালে নিভে গেছে কারো কারো প্রাণ প্রদীপ, কেউবা কারাবরণ কিংবা দ্বীপান্তরিত হয়েছেন। এরা দেশকে পরাধীনতার শৃ´খল থেকে মুক্ত করার জন্য রাজনীতি করেছেন। রাজনৈতিক কারণে তারা জীবনের শুরুতে, তারুণ্যে বা যৌবনে এমন এক কঠিন ও দুরূহ পথে আÍনিবেদন করেন, অনেক ক্ষেত্রেই সে পথ থেকে আর ফিরে আসার কোনো সুযোগ ছিল না। অথচ ব্রিটিশরা এসব বিপ্লবীকে নানারকম সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাজনীতির পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া এবং রাজনীতির নামে সুবিধাবাদী করে তোলার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েও সফল হননি। কেননা, যার অন্তরে একবার দেশপ্রেমের অনির্বাণ শিখা জ্বলে ওঠে, তাকে কখনোই প্রলোভনের ফাঁদ পাতা ভুবনে আটকে ফেলা যায় না। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর ব্রিটিশদের শাসন-শোষণ-নির্যাতনের অবসান ঘটলেও পাকিস্তান নামক দেশটিতে শুরু হয়ে যায় তারই ধারাবাহিকতা। কিছুদিন যেতে না যেতেই ভেঙ্গে যায় পূর্ববঙ্গের মানুষের সুখস্বপ্ন। তৎকালীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয় বিজাতীয় ভাষা উর্দু। শুরু হয়ে যায় ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনকে নির্মমভাবে দমিয়ে রাখার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানিরা বেছে নেয় অবর্ণনীয় নৃশংস অত্যাচার, নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ড। ১৯৪৮ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবি, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষার জন্য জীবন দেন রফিক, শফিক, ছালাম, বরকতসহ নাম না-জানা অসংখ্য ভাষা সৈনিক। নির্যাতন ও নির্বিচারে গ্রেফতারের শিকার হন হাজার হাজার ভাষা আন্দোলনকারী।


ভাষা আন্দোলনের পথ বেয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হয়ে যায় শাসন-শোষণ-নির্যাতন। ১৯৫০ সালে নাচোল বিদ্রোহের সময় ইলা মিত্রের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন, ১৯৬২ সালে হামুদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বাতিলের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৬৬ সালে ৬ দফার আন্দোলন, ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি পুলিশের গুলিতে কৃষক নেতা আসাদুজ্জামান নিহত হলে জনতা গর্জে উঠলে তা রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। ২৪ জানুয়ারি বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর গুলি চালালে নিহত হয় নবকুমার স্কুলের নবম শ্রেণীর ছাত্র মতিয়ুর রহমান। ১৫ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হককে, ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহাকে নির্মমভাবে হত্যার পর এগিয়ে যেতে থাকে স্বাধীনতার সংগ্রাম। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তির সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষের আত্মহুতি ও ২ লাখ মা-বোনের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় বাংলাদেশ। তবে এ ২৪ বছরে পাকিস্তানি বাহিনী ও বিহারিরা নির্যাতনের যে ইতিহাস গড়েছে, তার নজির পৃথিবীতে খুবই কম আছে। বিশেষ করে যারা ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং সর্বোপরি এ দেশের মানুষের সব রকম মুক্তির আন্দোলনে অংশ নিয়ে জনগণের জন্মগত অধিকার, গণতান্ত্রিক ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন, তারা সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন। তবে পাকিস্তানের ২৪ বছরের আন্দোলনে যত লোক ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেছেন, আত্মত্যাগ ও বীরত্ব দেখিয়েছেন এবং জীবন উৎসর্গ করেছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। দেশ ও আর্তের সেবায় যেভাবে নিজের জীবন বিলীন করে দিয়েছেন, তার বিনিময়ে তারা শুধু চেয়েছেন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ। অনেক স্বেদ-ঘাম-রক্ত ঝরিয়ে পেয়েছেন লাল-সবুজের বাংলাদেশ। অথচ এ দেশেরই অনেক লোক চায়নি বাংলাদেশের স্বাধীনতা। চাননি মানুষের মুক্তি। বরং স্বাধীনতার বিরোধিতা করে ইহজীবনে ফায়দা লুটেছে। কিন্তু ইতিহাসের কাছে তারা চিরদিন ঘৃণিত হয়ে থাকবে। পাকিস্তান আমলে যারা দেশের জন্য রাজনীতি করেছেন, আত্মত্যাগ করেছেন, জীবন উৎসর্গ করেছেন- তাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম। তাদের জীবন, সংগ্রাম থেকে যে দীক্ষা তারা নিয়েছিলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে আন্দোলনে, সংগ্রামে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বদলে যেতে থাকে রাজনীতির ধারা। ধীরে ধীরে কলুষিত হতে থাকে রাজনৈতিক পরিবেশ। সমাজবিজ্ঞানীরা নিশ্চয়ই এর কারণ খুঁজে বের করবেন। কেন বাংলাদেশের রাজনীতি আজ নষ্ট ও পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে- তার অনেক কারণ রয়েছে। তবে একটি মহল রাজনীতিকে কলুষিত করার জন্য ভেতরে-বাইরে অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। বিশেষ করে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং এর ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটানোর কারণে রাজনীতির প্রতি সেই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ, অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে নিঃস্বার্থ সংগ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে। রাজনীতির বিপক্ষ শক্তি অবৈধভাবে ঢালাও অর্থের ব্যবহার করে প্রকৃত রাজনৈতিক অঙ্গনকে নষ্ট, রাজনীতিবিদদের বিভ্রান্ত এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনীতির আঙ্গিনায় টেনে আনায় রাজনীতির স্বাভাবিক ধারা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। যে কারণে এখন মানুষ রাজনীতির কথা শুনলেও আঁতকে ওঠেন। কিছু দুর্বৃত্ত মানুষের জন্য বলি হচ্ছে রাজনীতি। প্রতি বছর হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়। এদের মধ্যে যারা মেধাবী অর্থাৎ মেধা তালিকায় শীর্ষে থাকে, তাদের সম্পর্কে পত্র-পত্রিকায় দেদারছে ছাপা হয়। তাদের সাফল্যের নেপথ্য কাহিনী, পছন্দ-অপছন্দ, ভবিষ্যতে কী হতে চায় ইত্যাদি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, যখন থেকে পত্র-পত্রিকায় মেধাবীদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়ে আসছে, তখন থেকেই লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের সবাই প্রকৌশলী, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসায়ী, সামরিক কর্মকর্তা, সরকারি কর্মকর্তা প্রভৃতি হতে চাইলেও রাজনীতিবিদ হতে চেয়েছে- এমনটি চোখে পড়েনি। যদিও দু’একজন হতে চেয়েও থাকে, তার সংখ্যা এত নগণ্য যে, তা হিসাবের খাতায় ফেলা যায় না। রাজনীতিবিদ তো হতেই চায়নি; বরং তাদের বক্তব্যে রাজনীতির প্রতি এক ধরনের অনীহা, অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেয়েছে। যেন রাজনীতি করাটা একটা অন্যায় ও গর্হিত কাজ। এই যদি হয় দেশের সেরা মেধাবী ছাত্রদের চিন্তা-ভাবনা, তাহলে এ দেশের ভবিষ্যৎ কী? কেননা, রাজনীতিবিদরা হলেন দেশের নীতি-নির্ধারক। তাদের কথামত দেশ চলবে। যেসব মেধাবী ছাত্র শিক্ষা জীবন শেষে কর্মজীবনে বিভিন্ন পেশায় থেকে দেশের কাজ করবে, দেশকে এগিয়ে নেবে, তাদের তো রাজনীতিবিদদের নির্দেশ অনুসারে চলতে হয়। সে ক্ষেত্রে রাজনীতি যদি মেধাহীনদের হাতে চলে যায়, তাহলে তারা মেধাবীদের নেতৃত্ব দেবেন কীভাবে? এই যে রাজনীতির ক্ষেত্রে ক্রমশ মেধাবীদের না আসার ফলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে, এ জন্য তো আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় দারুণভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। রাজনীতি চলে যাচ্ছে অমেধাবীদের হাতে। সে ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আমরা কতটুকুইবা আশা করতে পারি? রাজনীতির প্রতি অনীহার কারণ শুধু যে রাজনৈতিক নোংরামি বা কারো না কারো প্রতিপক্ষ হয়ে যাওয়ার শংকাই নয়। আসলে এখন মানুষের মন-মানসিকতা ও মূল্যবোধ পাল্টে গেছে। এখন আর কেউ ত্যাগ স্বীকার করতে চান না। রাজনীতি করতে হলে মানুষের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ও নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে সেবা করার আন্তরিকতাটুকু থাকতে হবে; কিন্তু আজকের দিনে তা নেই বললেই চলে। মানুষ এখন স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। নিজের সুখের প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। সুখ, শান্তিময় ও নিশ্চিত জীবনকে বেছে নিয়েছে। কীভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় এবং বৈধ-অবৈধভাবে অর্থ-কড়ির মালিক-মোক্তার হওয়া যায়- এ ভাবনাটা সবাইকে পেয়ে বসেছে। তাই কেইবা জেনে-শুনে রাজনীতির কঠিন ও জটিল পথে হাঁটতে চায়? আর এ কারণে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটা মারাÍক শূন্যতার সৃষ্টি হচ্ছে। রাজনীতি এখন টাউট-বাটপার, মাস্তান, অর্থলোভীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনে আমরা এখন আর আদর্শবান ব্যক্তিত্বদের তেমনভাবে দেখতে পাই না। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনে সৎ ও যোগ্য প্রার্থী নেই বললেই চলে। কেননা, অর্থ ও অস্ত্রের বলি হয়ে তারা একে একে ঝরে পড়ছেন। এমনকি যারা দেশে আইনের শাসন কায়েম করবেন, দেশের সর্বোচ্চ আইনের প্রতিষ্ঠান পার্লামেন্টে যোগ্য রাজনীতিবিদদের সংখ্যা দিনে দিনে লোপ পাচ্ছে। অবৈধ উপায়ে অর্থশালী ও বিত্তশালী এবং ব্যবসায়ীরা এখন পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করছে। এক সমীক্ষায় জানা যায়, জাতীয় সংসদের প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবসায়ী। এদের অনেকেই অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে জাতীয় নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে পার্লামেন্টারিয়ান হয়েছেন। এই যদি হয় জাতীয় সংসদের অবস্থা, তাহলে দেশ কাদের নেতৃত্বে, কোন্ পথে এগোবে? যারা সারা জীবন ত্যাগ-তিতিক্ষা ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ করে রাজনীতি করেছেন, ব্রিটিশ আমলে নির্যাতিত হয়েছেন, পাকিস্তান আমলে নিপীড়িত হয়েছেন এবং বাংলাদেশ আমলেও খুব বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন না অর্থাৎ রাজনীতির প্রতি নিবেদিত থেকেও অনাহারে, অবহেলায় জীবনযাপন করেছেন, তা নিয়ে তারা কখনো আক্ষেপ করেননি। কিন্তু এসব আত্মত্যাগী, অন্যায় ও অসত্যের প্রতিবাদকারী, মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গকারী উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা যখন চুপিসারে পৃথিবী থেকে চলে যান, তখন তাদের কথা কেউ মনে রাখে না। মিডিয়াও তাদের গুরুত্ব প্রদান করে না। পত্রিকার ভেতরের পৃষ্ঠায় এমনভাবে কভারেজ দেয়া হয়, যা খুব একটা চোখে পড়ে না। যারা সারাটা জীবনে মানুষের সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের কথা যদি ফলাও করে প্রচার না করা হয়, তাহলে মানুষ কোন্ আদর্শে অনুপ্রাণিত হবে? অথচ সমাজবিরোধী লোকদের নিয়ে যেভাবে মিডিয়ায় ব্যাপক কভারেজ দেয়া হয়, তারাই হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের কাছে হিরো বা বীর। যে কারণে সমাজবিরোধী লোক, মাস্তানরা অবৈধ অর্থ ও অস্ত্রের জোরে সমাজসেবক ও ক্রমান¦য়ে সমাজের নেতা হয়ে ওঠে। এখন তো অর্থ ও অস্ত্রের জোর না থাকলে যে কোনো নির্বাচনে নির্বাচিত হওয়া বা জনপ্রতিনিধি হওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অবক্ষয়ের ধস নেমেছে এবং মন্দ লোকের উপস্থিতি বেড়েছে- তা দীর্ঘ একটি প্রক্রিয়ার ফসল। তবে রাজনীতির এই নৈতিক অবক্ষয়ের যুগে যারা সত্যিকার দেশ ও আর্তের প্রতি আন্তরিক এবং অকৃত্রিম, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। কেননা, কোনো কিছুর পথই কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আর রাজনীতির পথ তো আরো কঠিন ও জটিল। এ পথে হাঁটতে হলে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকা প্রয়োজন। সে ধরনের আবেগ-অনুভূতি না থাকলে রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। সঠিক নেতৃত্ব ও সঠিক নির্দেশনা পেতে হলে মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা প্রয়োজন। দেশের মাথা হলো রাজনীতিবিদরা। মাথায় যদি পচন ধরে, তাহলে সে দেশের পচন ধরতে বাকি থাকে না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের নিয়ে যে বিভ্রান্তি, তা দূর করতে হলে সত্যিকার ত্যাগী ও মেধাবী ব্যক্তিদের রাজনীতিতে এগিয়ে আসার পথ সুগম করতে হবে। অবশ্য রাজনীতির পথ এতটা মসৃণ নয় যে কেউ পথ করে দেবে; সেক্ষেত্রে নিজের জায়গা নিজেই করে নিতে হবে। যদি সৎ ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিরা রাজনৈতিক অঙ্গনে এগিয়ে আসেন, তাহলে এ দেশের রাজনীতি একদিন সুন্দর হয়ে উঠবে। তাই রাজনীতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি না করে কীভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করা যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং সবাইকে সচেতন করতে হবে।

রচনা কাল : জানুয়ারি ২০০৪

তবে কী আমরা পরাধীন হয়ে গেলাম!


যা কিছু সুন্দর, তার প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন, সুন্দর কিংবা আকর্ষণীয় কিছু দেখলে মানুষ মুগ্ধ হয়। ইরাককে নিয়ে অনুভূতিপ্রবণ কিংবা সৌন্দর্যপিয়াসী যে কোনো মানুষই আবেগাক্রান্ত হয়ে যান। সভ্যতার সূতিকাগার এককালের মেসোপটেমিয়ার জলে-স্থলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে সভ্যতা ও ইতিহাসের নানা নিদর্শন। দজলা ও ফোরাত নদের তীরে পৃথিবীর প্রথম সভ্যতার উন্মেষ ঘটায় তার কালস্রোত এখনো আমাদের উন্মনা করে দেয়। ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের সুরভি কিংবা বসরার গোলাপের সুগন্ধী আমাদের নাকে এসে লাগে ও চোখে ধরা দেয় অধরা স্বপ্ন হয়ে। ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ বাহিনীর আগ্রাসনে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন- ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোর কথা ভেবে মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। হালাকু খানরা যেভাবে ধ্বংস করেছিল বাগদাদ, তৈমুর লঙরা যেভাবে ইরাকিদের রক্তে লাল করেছিল দজলা নদীর পানি, তেমনিভাবে তাদের উত্তরসূরি জর্জ বুশ, টনি ব্লেয়াররা কী শেষ করে দেবে ইতিহাস ও সভ্যতার সব নিদর্শন? এমনটি যাতে না হয়, কায়মনোবাক্যে সে প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের আঘাতে যখন একের পর এক উড়ে যেতে থাকে কোনো শিশুর হাত, পা, চোখ কিংবা মাথা, তখন কীইবা মূল্য থাকে বসরার লাল গোলাপের, ব্যাবিলনের শূন্যোদ্যানের কিংবা সভ্যতার নিদর্শনের? জ্ঞান-বিজ্ঞানে, সভ্যতায় পৃথিবী অনেক দূর এগিয়েছে বলে দাবি করা হয়। ঠিক তখন সব নিয়ম-নীতি লংঘন করে, আসরিক শক্তি প্রয়োগ করে যখন জবর দখল করা হয় একটি দেশ, তখন শুধু সেই দেশ বা দেশের জনগণই পরাধীন হয়ে যায় না, পরাধীন হয়ে যায় দুনিয়ার তাবৎ শান্তিকামী মানুষ। পৃথিবীর সবচেয়ে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত, ভয়ংকর ও বলদর্পী যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সাঙ্গাত এককালের ঔপনিবেশিক শক্তি যুক্তরাজ্য মধ্যযুগীয় আমলের রাজ্য দখলের মতো আমাদের সবার চোখের সামনে বলে-ক’য়ে ইরাকের ওপর অনৈতিক ও বীভৎস যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে মেতে ওঠে হত্যা ও ধ্বংসের উৎসবে। আমরা যারা দুর্বল ও অসহায়, তাদের ক্ষীণ কণ্ঠের প্রতিবাদ এবং দুর্বলের আরো দুর্বলতর প্রতিষ্ঠান ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’ জাতিসংঘকে উপেক্ষা করে তারা ইরাকি জনগণের ‘মুক্তিদাতা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এ কেমন মুক্তিদাতা? যারা নির্বিচারে হত্যা করছে মানুষ, ধ্বংস করছে যাবতীয় অবকাঠামো, নষ্ট করছে সভ্যতার নিদর্শনগুলো। ইরাকি পতাকা নামিয়ে উত্তোলন করছে মার্কিন পতাকা। মার্কিন পতাকা কী ইরাকি জনগণের ‘স্বাধীনতার’ প্রতীক? ইরাক দখলের আগে জর্জ বুশ ও টনি ব্লেয়াররা বলেছিলেন, ইরাকি জনগণ মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনীকে ফুল ও মালা দিয়ে বরণ করে নেবেন। তেমনটি কি তিন সপ্তাহের যুদ্ধে কখনোই ঘটেছে? আধুনিক মারণাস্ত্রের বিপক্ষে দেশপ্রেমে বলীয়ান হয়ে জীবনবাজি রেখে লড়াই করে ইরাকী জনগণ বুঝিয়ে দিয়েছে- পরাধীনতাকে তারা কখনো মেনে নেবে না। মেনে নেয়ওনি। এ কারণে বিক্ষিপ্তভাবে হলেও তাদের প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহত আছে। মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনীকে তারা একটুও স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। বরং প্রতিরোধ সংগ্রামের তীব্রতা দিনে দিনে বাড়ছে। ইরাকিদের মনের কথাগুলো চমৎকার ভাষায় ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো ট্রিবিউন পত্রিকার কলামিস্ট স্টিভ চ্যাপম্যান : ‘গণতন্ত্রের মর্মবাণী যদি হয়ে থাকে শাসকের কর্মকা- নিয়ন্ত্রণে সাধারণ জনগণের অধিকার, তবে জাতীয়তাবাদের মর্মবাণী হচ্ছে নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণে জনগণের অধিকার। বাইরের কারো খবরদারি এতে চলবে না। ইরাকি জনগণের মধ্যে গণতন্ত্রের বাসনার চেয়ে জাতীয়তাবাদের তাড়না বেশি শক্তিশালী হওয়ায় বিদেশিদের উপনিবেশে পরিণত হওয়ার চেয়ে তারা বরং স্বদেশী অপশাসনের খপ্পরে পড়ে থাকার ভাগ্যবরণ করাই শ্রেয় মনে করে।’ সব আন্তর্জাতিক আইন, সভ্যতা আর মানবতাকে পায়ে দলে মার্কিন-ব্রিটিশ বাহিনী শুধু ইরাককে পরাধীনই করেনি, এর মাধ্যমে জর্জ বুশ ‘নয়া বিশ্ব ব্যবস্থা’র নামে পৃথিবীব্যাপী গড়ে তুলছে ‘গণতান্ত্রিক উপনিবেশবাদ’। বুশের আগ্রাসী মনোভাবের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী শান্তিকামী মানুষ নানাভাবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ করলেও তা একদমই পাত্তা পায়নি। কেননা, খুব কমসংখ্যক দেশের সরকারই ইরাকে আগ্রাসনের প্রতিবাদ করেছে। যারা করেছে, তাদেরও কণ্ঠ ছিল খুবই ম্রিয়মান। রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো একসময়ের শক্তিমান দেশগুলো ইরাকে যুদ্ধের প্রতিবাদে সোচ্চার হলেও এক পর্যায়ে তাদের কণ্ঠও স্তিমিত হয়ে যায়। সবাই কম-বেশি নতজানু হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। ইরাকের ওপর জাতিসংঘ আরোপিত দীর্ঘ ১৩ বছর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের সংশোধিত প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদন পেয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হওয়ায় ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ইরাকি তেলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক বৈধতা পায়। এর মধ্য দিয়ে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনকেই বৈধতা দেয়া হয়েছে। একটি রাষ্ট্র হিসেবে টিম টিম করে আশার পিদিম হয়ে যেটুকু জ্বলছিল, তাও যেন শেষ হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের কাছে রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সের মতো দেশগুলো এভাবে আত্মসমর্পণ করবে, তা মোটেও ভাবা যায়নি। তাহলে আর ভরসার স্থল থাকে কোথায়? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে পৃথিবীতে একক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সে থেকে তাদের দোর্দ- দাপটে অসহায় হয়ে পড়েছে প্রতিটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ। দেশে দেশে মার্কিন রাষ্ট্রদূতরা অলিখিতভাবে পালন করছে ‘দখলদার গভর্নর’-এর ভূমিকা। অভ্যন্তরীণ যে কোনো বিষয়ে তারা নাক গলায় অবলীলায়। কোনো কোনো দেশ তো নিয়ন্ত্রিত হয় সরাসরি তাদের তত্ত্বাবধানে। যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একসময় সূর্য অস্ত যেতো না, সেই ব্রিটিশের প্রধানমন্ত্রী বলা যায় এখন জর্জ বুশের ‘ফরেন সেক্রেটারি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ইরাক দখল হয়ে যাওয়ায় বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। সবার প্রশ্ন- এর পরের টার্গেট কে? যে ক’জন সরকার প্রধান ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ আগ্রাসনের খোলস উন্মোচন করে ধিক্কার জানিয়েছেন, তাদের অন্যতম হলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ। বেশ কিছুদিন আগে তিনি বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের প্রতি হুমকি- এমন কোনো দেশকে শেষ করার মিশন নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা চাইছে ইরাকের তেলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিতে। যুক্তরাষ্ট্র ইরাক যুদ্ধে জয়লাভ করলে অন্যান্য দেশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী টার্গেট সিরিয়া, পাকিস্তান ও ইরান।’ মাহাথির মোহাম্মদের বক্তব্যে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থে কাউকেই স্বস্তিতে থাকতে দেবে না। একের পর এক তারা তাদের টার্গেট পূরণে এগিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনকে যদি নীরবে মেনে নেয়া হয়, তাহলে সবাই কি এক ধরনের পরাধীন নয়? তাছাড়া পরাশক্তির কর্ণধার জর্জ বুশ হুংকার দিয়ে যখন বলে, ‘হয় আমাদের পক্ষে থাক, নতুবা বিপক্ষে যাও’; তখন যারা শক্তিহীন, তারা এক ধরনের অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে থাকে পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে। যদিও পরাধীনতার নাগপাশে বন্দি হয়ে অক্ষম মানুষের মতো বুকের মাঝে জ্বলতে থাকে ক্রোধ আর ক্ষোভের আগুন। আমাদের মতো দেশ ও দেশের মানুষ না হয় পরাধীনতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কিন্তু মার্কিন ও ব্রিটিশ জনগণ কি স্বাধীন? ইরাকি যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এ প্রশ্নটি তীব্রতর হয়ে উঠেছে। আমরা বাক-স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মূল্যবোধহীনতায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও মার্কিন ও ব্রিটিশ জনগণের জীবনে উদারতা, গণতান্ত্রিকতা ও মানবতার প্রতিফলন দেখতে পেয়ে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। ভেবেছি, সভ্যতার অর্জনগুলো কোথাও না কোথাও কার্যকর হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে আমরা পাঠ নিচ্ছি সাম্য, মৈত্রী ও গণতন্ত্রের। বুঝতে শিখছি সভ্যতার মাপকাঠি। কিন্তু ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ বাহিনীর আগ্রাসনে যেন ধস নেমেছে যাবতীয় মূল্যবোধে। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ব্রিটিশ এমপি জর্জ গ্যালাওয়ে যখন তীব্র ও ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইরাকে বাক-স্বাধীনতা চান, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে চান না’, তখন কেঁপে ওঠে সভ্যতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। ব্রিটিশ ও মার্কিন কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বাক-স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বিষয়টি বরাবরই সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। তাদের প্রতিবাদে কেঁপেছে সরকার ও রাষ্ট্র। আর এখন যুদ্ধ বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ব্রিটিশ মন্ত্রিসভা ও হাউস অব কমন্সের নেতা শ্রদ্ধাভাজন রাজনীতিক রবিন কুক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফিলিপ হান্ট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র মন্ত্রী জর্জ ডেনাস, এমপি জর্জ গ্যালাওয়ের মতো ব্যক্তিত্বরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিগৃহীত হয়েছেন, সত্য কথা বলায় চাকরিচ্যুত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এনবিসি টেলিভিশনের পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়া সাংবাদিক পিটার আর্নেট, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় নাজেহাল হতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সঙ্গীত শিল্পীকে। যে বিবিসি, সিএনএন-এর মতো আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম সবার কাছে ছিল আস্থা ও বিশ্বাসের অবলম্বন, তাতেও এখন দারুণভাবে চিড় ধরেছে। ইরাকে মার্কিন-ব্রিটিশ আগ্রাসনে মানুষের যা কিছু অর্জন, তা যে এভাবে ভেঙ্গে পড়বে- তা ছিল সত্যিই অভাবনীয়। বিশ্বখ্যাত জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাস পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘অবাক লাগে এটা কী সেই আমেরিকা, যাকে আমরা সন্তুষ্ট চিত্তেই অনেক বিষয়ে প্রাধান্য দিয়েছি?’ তার মানে কি এই নয় যে, পরাধীনতার শিকলে আটকা পড়েছে বোধ, বুদ্ধি ও বিবেচনাসম্পন্ন মানুষও। যা কিছু ভালো, তার পক্ষে বলা এবং যা কিছু মন্দ, তার নিন্দা জানানো যদি অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে তো সব মানুষই পরাধীন হয়ে যায়। ছোট কিংবা বড়- যে কোনো দেশের অধিবাসী যেভাবেই হোক না কেন, সবাই এখন এক পরাধীন বিশ্বের নাগরিক।

দৈনিক বাংলাবাজার : ১৪ জুলাই ২০০৩

রবিবার, ৩ নভেম্বর, ২০১৩

পাকিস্তান : ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ


মুশকিল হচ্ছে, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেললে না হয় রাজনীতি চর্চা, না হয় ধর্ম পালন। এ ক্ষেত্রে কাজ করে মতলবি স্বার্থ। নিজেদের স্বার্থের অনুকূল হলে যে কোনো কর্মকাণ্ডকে তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে হাসিল করার চেষ্টা করা হয়। এমন একটা দ্ব্যর্থক মনোভাব থেকেই পাকিস্তানের জন্ম। কবি মুহাম্মদ আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছিলেন ১৯৩০ সালে। তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এ কারণে প্রথম অবস্থায় এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ ছিল যথেষ্ট। এমন বিমূর্ত ধারণা কবির কল্পনা বলে সবাই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রমাণ মেলে লন্ডনের ওয়ালডর্ফ হোটেলের এক নৈশভোজে। প্রস্তাবিত মুসলমান রাষ্ট্রের ধারণা মুসলমান নেতারা একে ‘অবাস্তব ও মরীচিকাময়’ বলে এক কথায় নাকচ করে দেন। বিষয়টির সেখানেই অংকুরেই বিনাশ ঘটতো। কিন্তু একদল হিসেবি লোক নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্ষা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে এ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকেন ভেতরে ভেতরে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪০ সালের লাহোর সম্মেলনে। কবি ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে ‘সর্বরোগহরিহর’ হিসেবে গ্রহণ করে মুসলিম লিগ। যে দলটির নেতৃত্বে সমাসীন ছিলেন অভিজাত মুসলমানরা। যাদের জীবনে ধর্মের কোনো প্রভাব ছিল না। এক হাতে হুইস্কি এবং আরেক হাতে শূকর মাংসের স্যান্ডউইচ নিয়ে যার দিনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, সেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। অথচ এই জিন্নাহ ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি অব্দি ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সংমিশ্রণের প্রবল বিরোধী ছিলেন। কিন্তু স্বার্থগত টানাপড়েন ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে আদর্শচ্যুত হতে দ্বিধা করেননি তিনি। ‘মোল্লা’ আর মুসলমান ভূস্বামীদের স্বার্থ ও আবেগকে পুঁজি করে পাকিস্তানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন ব্যারিস্টার জিন্নাহ। ‘ইসলাম বিপন্ন’ ধ্বনি দিয়ে তিনি দর-কষাকষি শুরু করেন। তাঁর এই দর-কষাকষির খেলায় তাঁর ‘হাতের পুতুল’ হয়ে ওঠেন ধর্মভীরু লাখ লাখ মুসলমান। তাঁদেরকে সামনে রেখে দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয় মুসলমানদের ‘স্বপ্নভূমি’ পাকিস্তান।

‘সিজারিয়ান অপারেশন’-এর মাধ্যমে গঠিত পাকিস্তান শুরুতেই সৃষ্টি করে অনেক সংশয় ও প্রশ্ন। যেসব মুসলমান ছিলেন সাচ্চা পাকিস্তানপন্থী, দেশ ভাগের পর তাঁরা পাকিস্তান থেকে দূরে সরে যান। কেননা তাঁদের অধিকাংশেরই জায়গা-জমি ভারতীয় সীমান্তে পড়ে যায়। এদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ‘প্রিয় পাকভূমি’তে চলে গেলেও ভারতেই বেশিরভাগ মুসলমান রয়ে যান। সাধের পাকিস্তান তাঁদের কাছে হয়ে যায় মরীচিকা। তাছাড়া চোখে একরাশ স্বপ্ন ও বুকে অপরিমেয় প্রত্যাশা নিয়ে যাঁরা চৌদ্দপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমান, তারাও স্বপ্ন ভঙের বেদনায় মুষড়ে পড়েন। অন্যদিকে দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দু’টি প্রদেশ নিয়ে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র গড়ে তোলা হলেও তার মধ্যে দুস্তর ফারাক থেকে যায়। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষাগত সমস্যা ছাড়াও উভয়ের মধ্যে স্বার্থের প্রশ্নে তিক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ অবস্থার সূত্রপাত ঘটে ‘পাকিস্তানের জনক’ মোহাম্মদ আলীর জীবদ্দশায়। তবে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় জিন্নাহ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, পার্সি বলে কেউ থাকবেন না। সবাই পাকিস্তানি।’ তাঁর এই বক্তব্যে অবশ্য প্রতীয়মান হয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তিনি পাকিস্তানকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেলের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য ছিল না। শুরুতেই তিনি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থের ‘ক্রীড়নক’ হয়ে ওঠেন। এর কারণ সম্ভবত তাঁর উত্থান ঘটে ‘মোল্লা’ ও অভিজাতদের ক্ষমতাবলয়কে কেন্দ্র করে। তাঁদের চটিয়ে জিন্নাহ’র পক্ষে সম্ভব ছিল না কিছু করা। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় তঁর বলা ‘উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ সবাইকে সন্দিহান করে তোলে। প্রশ্নের সম্মুখীন হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। তথাপি তখন পর্যন্ত সব মুসলমানের প্রতিনিধিত্বশীল নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির ১৩ মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে তাঁর অন্যতম অনুসারী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পাকিস্তানে একে একে নানা সমস্যার উদ্ভব ঘটতে থাকে। জিন্নাহ’র ‘বিশ্বাস, আশা ও ঐক্যের’ স্লোগান ক্রমশ শূন্যে মিলিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জিন্নাহর গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়।


পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শাসকগোষ্ঠীর অনমনীয় মনোভাব, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বর্বরোচিত নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ড তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের পাক-শাসকদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাসকে টলিয়ে দেয়। সেই থেকে বাঙালি মুসলমানদের স্বপ্ন ভঙের যাতনা শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ধারণা করা হয়েছিল, সেটাই ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক। কিন্তু জন্মের ৪৪ বছর পরও পাকিস্তানের অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে অমীমাংসিত। যা ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যেসব ‘ভারতীয় মুসলমান’ জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের জন্য লড়েছেন এবং ভারত ছেড়ে চলে এসে নাম পেয়েছেন ‘মোহাজির’, তাঁরা এখন জাতি-দাঙ্গার শিকার। জীবনযাপন করছেন প্রবাসীদের মতো। বেঁচে থাকার জন্য, জীবন ধারণের জন্য তাঁদের সংগ্রাম নিত্যকার। স্বপ্নের আবাসভূমি পেয়েও মুসলমানরা আজ একে অপরকে দেখছে সন্দেহের চোখে। বর্তমানে ২২টি ভাষা-ভাষীর এই দেশ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে লিপ্ত। প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে। জীবনহানি ঘটছে। দেশের বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাব নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মশগুল। ‘বড় ভাইসুলভ’ মনোভাব ছাড় দিতে রাজি নয়।
সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর কোথাও শান্তি নেই। কোনো প্রদেশের সঙ্গে ভাষা, সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের কোনও যোগসূত্র নেই। পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের প্রথমত সিন্ধি, বালুচ, পাঠান বা পাঞ্জাবি, দ্বিতীয়ত মুসলমান এবং সবশেষে পাকিস্তানি বলে মনে করে। আত্ম পরিচয়ের এই ধারাক্রম কবি ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গে এক বিন্দুও মিল খায় না। এ কারণেই নিজেদের সংকটকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি প্রতিটি শাসককেই কূট-কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। সেটা জিয়ার জঙ্গি শাসন হোক কিংবা ভুট্টোর গণতান্ত্রিক শাসন হোক। একটা জুজুর ভয় সবসময় খাড়া করে রাখা হয়। ধর্মটাই এ ক্ষেত্রে উত্তম পন্থা। একই পথ ধরে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালানো হয় ছলে, বলে, কৌশলে। আর ভারতের সঙ্গে বিরোধের ‘কমন’ বিষয় রেডিমেট তৈরি হয়ে আছে অবধারিতভাবে, সেটা কাশ্মীর। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলমান হওয়ায় পাকিস্তান শাসকরা সর্বদা বাড়তি একটা ফায়দা লুটতে সক্ষম হন। কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রশি টানাটানি চললেও বর্তমানে পাক-ভারত শাসিত কাশ্মীরী জনগণের মাঝে নতুন চেতনা গড়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে তাঁরা কারো অভিভাবকত্বে না থেকে স্বাধীন কাশ্মীর গড়ার স্বপ্ন দেখছে। এটা কোনো অলৌকিক স্বপ্ন নয়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের অন্যতম একটি ‘ট্রাম্প কার্ড’ হাতছাড়া হয়ে যাবে। এদিকে আরেক দল মৌলবাদী মুসলমান পাকিস্তানের হালের সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য অতীতের বিশুদ্ধ ইসলামের যুগে ফিরে যাবার নসিহত করছে। যার অর্থ দাঁড়াবে পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুশীলন বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারে ডুব দেওয়া। অনেকদিন ধরে এমন ধরনের প্রচ্ছন্ন মনোভাব চলে আসায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে পাকিস্তান এমনিতেই পিছিয়ে পড়ছে। এরপর ঘোষণা দিয়ে বিশুদ্ধ ইসলামকে আঁকড়ে ধরার মানে দাঁড়াবে, জাহেলিয়া যুগে পাকিস্তানের ফিরে যাওয়া।
যে স্বপ্ন, যে আকাক্সক্ষা নিয়ে পাকিস্তান নামক দেশটি গড়ে তোলা হয়, সময়ের পরিক্রমায় তা ক্রমান্বয়ে থিতিয়ে আসছে। প্রাদেশিক উগ্রতা, প্রগতিবিমুখ মৌলবাদী মোল্লাদের প্রভাব এবং মুসলমান ভূস্বামীদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর একরতফা আনুকূল্য পাকিস্তানকে ক্রমশ আরো বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা কবি আল্লামা ইকবালের স্বপ্নকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে না, স্বপ্ন ভঙ হবে ইতিহাসেরও।

দৈনিক বাংলার বাণী : ২২ নভেম্বর ১৯৯১