মুশকিল হচ্ছে, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতিকে গুলিয়ে ফেললে না হয় রাজনীতি চর্চা, না হয় ধর্ম পালন। এ ক্ষেত্রে কাজ করে মতলবি স্বার্থ। নিজেদের স্বার্থের অনুকূল হলে যে কোনো কর্মকাণ্ডকে তখন ধর্মের দোহাই দিয়ে হাসিল করার চেষ্টা করা হয়। এমন একটা দ্ব্যর্থক মনোভাব থেকেই পাকিস্তানের জন্ম। কবি মুহাম্মদ আল্লামা ইকবাল মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন দেখেছিলেন ১৯৩০ সালে। তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। এ কারণে প্রথম অবস্থায় এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ ছিল যথেষ্ট। এমন বিমূর্ত ধারণা কবির কল্পনা বলে সবাই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রমাণ মেলে লন্ডনের ওয়ালডর্ফ হোটেলের এক নৈশভোজে। প্রস্তাবিত মুসলমান রাষ্ট্রের ধারণা মুসলমান নেতারা একে ‘অবাস্তব ও মরীচিকাময়’ বলে এক কথায় নাকচ করে দেন। বিষয়টির সেখানেই অংকুরেই বিনাশ ঘটতো। কিন্তু একদল হিসেবি লোক নিজেদের রাজনৈতিক উচ্চাকাক্ষা চরিতার্থ করার অভিপ্রায়ে এ নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকেন ভেতরে ভেতরে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪০ সালের লাহোর সম্মেলনে। কবি ইকবালের এই দ্বিজাতিতত্ত্বকে ‘সর্বরোগহরিহর’ হিসেবে গ্রহণ করে মুসলিম লিগ। যে দলটির নেতৃত্বে সমাসীন ছিলেন অভিজাত মুসলমানরা। যাদের জীবনে ধর্মের কোনো প্রভাব ছিল না। এক হাতে হুইস্কি এবং আরেক হাতে শূকর মাংসের স্যান্ডউইচ নিয়ে যার দিনের অধিকাংশ সময় কেটেছে, সেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। অথচ এই জিন্নাহ ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি অব্দি ধর্মের সঙ্গে রাজনীতির সংমিশ্রণের প্রবল বিরোধী ছিলেন। কিন্তু স্বার্থগত টানাপড়েন ও রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে আদর্শচ্যুত হতে দ্বিধা করেননি তিনি। ‘মোল্লা’ আর মুসলমান ভূস্বামীদের স্বার্থ ও আবেগকে পুঁজি করে পাকিস্তানের স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন ব্যারিস্টার জিন্নাহ। ‘ইসলাম বিপন্ন’ ধ্বনি দিয়ে তিনি দর-কষাকষি শুরু করেন। তাঁর এই দর-কষাকষির খেলায় তাঁর ‘হাতের পুতুল’ হয়ে ওঠেন ধর্মভীরু লাখ লাখ মুসলমান। তাঁদেরকে সামনে রেখে দ্বিজাতিতত্ত্বকে ভিত্তি করে ১৯৪৭ সালে সৃষ্টি হয় মুসলমানদের ‘স্বপ্নভূমি’ পাকিস্তান।
‘সিজারিয়ান অপারেশন’-এর মাধ্যমে গঠিত পাকিস্তান শুরুতেই সৃষ্টি করে অনেক সংশয় ও প্রশ্ন। যেসব মুসলমান ছিলেন সাচ্চা পাকিস্তানপন্থী, দেশ ভাগের পর তাঁরা পাকিস্তান থেকে দূরে সরে যান। কেননা তাঁদের অধিকাংশেরই জায়গা-জমি ভারতীয় সীমান্তে পড়ে যায়। এদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ‘প্রিয় পাকভূমি’তে চলে গেলেও ভারতেই বেশিরভাগ মুসলমান রয়ে যান। সাধের পাকিস্তান তাঁদের কাছে হয়ে যায় মরীচিকা। তাছাড়া চোখে একরাশ স্বপ্ন ও বুকে অপরিমেয় প্রত্যাশা নিয়ে যাঁরা চৌদ্দপুরুষের ভিটে-মাটি ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমান, তারাও স্বপ্ন ভঙের বেদনায় মুষড়ে পড়েন। অন্যদিকে দেড় হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত দু’টি প্রদেশ নিয়ে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র গড়ে তোলা হলেও তার মধ্যে দুস্তর ফারাক থেকে যায়। ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও ভাষাগত সমস্যা ছাড়াও উভয়ের মধ্যে স্বার্থের প্রশ্নে তিক্ত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ অবস্থার সূত্রপাত ঘটে ‘পাকিস্তানের জনক’ মোহাম্মদ আলীর জীবদ্দশায়। তবে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম সভায় জিন্নাহ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয়ভাবে পাকিস্তানে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান, পার্সি বলে কেউ থাকবেন না। সবাই পাকিস্তানি।’ তাঁর এই বক্তব্যে অবশ্য প্রতীয়মান হয়, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য তিনি পাকিস্তানকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবেন। কিন্তু পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেলের কথার সঙ্গে কাজের সামঞ্জস্য ছিল না। শুরুতেই তিনি একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী স্বার্থের ‘ক্রীড়নক’ হয়ে ওঠেন। এর কারণ সম্ভবত তাঁর উত্থান ঘটে ‘মোল্লা’ ও অভিজাতদের ক্ষমতাবলয়কে কেন্দ্র করে। তাঁদের চটিয়ে জিন্নাহ’র পক্ষে সম্ভব ছিল না কিছু করা। ১৯৪৮ সালে ঢাকায় তঁর বলা ‘উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ সবাইকে সন্দিহান করে তোলে। প্রশ্নের সম্মুখীন হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন। তথাপি তখন পর্যন্ত সব মুসলমানের প্রতিনিধিত্বশীল নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির ১৩ মাসের মাথায় তাঁর মৃত্যু এবং পরবর্তীতে তাঁর অন্যতম অনুসারী লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যায়। পাকিস্তানে একে একে নানা সমস্যার উদ্ভব ঘটতে থাকে। জিন্নাহ’র ‘বিশ্বাস, আশা ও ঐক্যের’ স্লোগান ক্রমশ শূন্যে মিলিয়ে যেতে থাকে। বিশেষ করে ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জিন্নাহর গণতান্ত্রিক পাকিস্তানের স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়।
পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শাসকগোষ্ঠীর অনমনীয় মনোভাব, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বর্বরোচিত নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ড তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের পাক-শাসকদের প্রতি তাঁদের বিশ্বাসকে টলিয়ে দেয়। সেই থেকে বাঙালি মুসলমানদের স্বপ্ন ভঙের যাতনা শুরু হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। ধারণা করা হয়েছিল, সেটাই ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের কফিনে শেষ পেরেক। কিন্তু জন্মের ৪৪ বছর পরও পাকিস্তানের অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে অমীমাংসিত। যা ধীরে ধীরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। যেসব ‘ভারতীয় মুসলমান’ জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানের জন্য লড়েছেন এবং ভারত ছেড়ে চলে এসে নাম পেয়েছেন ‘মোহাজির’, তাঁরা এখন জাতি-দাঙ্গার শিকার। জীবনযাপন করছেন প্রবাসীদের মতো। বেঁচে থাকার জন্য, জীবন ধারণের জন্য তাঁদের সংগ্রাম নিত্যকার। স্বপ্নের আবাসভূমি পেয়েও মুসলমানরা আজ একে অপরকে দেখছে সন্দেহের চোখে। বর্তমানে ২২টি ভাষা-ভাষীর এই দেশ অভ্যন্তরীণ কোন্দলে লিপ্ত। প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে। জীবনহানি ঘটছে। দেশের বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাব নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে মশগুল। ‘বড় ভাইসুলভ’ মনোভাব ছাড় দিতে রাজি নয়।
সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, কাশ্মীর কোথাও শান্তি নেই। কোনো প্রদেশের সঙ্গে ভাষা, সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের কোনও যোগসূত্র নেই। পাকিস্তানের মানুষ নিজেদের প্রথমত সিন্ধি, বালুচ, পাঠান বা পাঞ্জাবি, দ্বিতীয়ত মুসলমান এবং সবশেষে পাকিস্তানি বলে মনে করে। আত্ম পরিচয়ের এই ধারাক্রম কবি ইকবালের দ্বিজাতিতত্ত্বের সঙ্গে এক বিন্দুও মিল খায় না। এ কারণেই নিজেদের সংকটকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি প্রতিটি শাসককেই কূট-কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। সেটা জিয়ার জঙ্গি শাসন হোক কিংবা ভুট্টোর গণতান্ত্রিক শাসন হোক। একটা জুজুর ভয় সবসময় খাড়া করে রাখা হয়। ধর্মটাই এ ক্ষেত্রে উত্তম পন্থা। একই পথ ধরে ভারতবিরোধী প্রচারণা চালানো হয় ছলে, বলে, কৌশলে। আর ভারতের সঙ্গে বিরোধের ‘কমন’ বিষয় রেডিমেট তৈরি হয়ে আছে অবধারিতভাবে, সেটা কাশ্মীর। কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক মুসলমান হওয়ায় পাকিস্তান শাসকরা সর্বদা বাড়তি একটা ফায়দা লুটতে সক্ষম হন। কাশ্মীরকে নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে রশি টানাটানি চললেও বর্তমানে পাক-ভারত শাসিত কাশ্মীরী জনগণের মাঝে নতুন চেতনা গড়ে উঠেছে। সেক্ষেত্রে তাঁরা কারো অভিভাবকত্বে না থেকে স্বাধীন কাশ্মীর গড়ার স্বপ্ন দেখছে। এটা কোনো অলৌকিক স্বপ্ন নয়। এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হলে পাকিস্তানের অন্যতম একটি ‘ট্রাম্প কার্ড’ হাতছাড়া হয়ে যাবে। এদিকে আরেক দল মৌলবাদী মুসলমান পাকিস্তানের হালের সমস্যা ও সংকট কাটিয়ে ওঠার জন্য অতীতের বিশুদ্ধ ইসলামের যুগে ফিরে যাবার নসিহত করছে। যার অর্থ দাঁড়াবে পেছন দিকে ঘুরে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ইংরেজি শিক্ষা ও আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুশীলন বন্ধ করে দিয়ে অন্ধকারে ডুব দেওয়া। অনেকদিন ধরে এমন ধরনের প্রচ্ছন্ন মনোভাব চলে আসায় প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে পাকিস্তান এমনিতেই পিছিয়ে পড়ছে। এরপর ঘোষণা দিয়ে বিশুদ্ধ ইসলামকে আঁকড়ে ধরার মানে দাঁড়াবে, জাহেলিয়া যুগে পাকিস্তানের ফিরে যাওয়া।
যে স্বপ্ন, যে আকাক্সক্ষা নিয়ে পাকিস্তান নামক দেশটি গড়ে তোলা হয়, সময়ের পরিক্রমায় তা ক্রমান্বয়ে থিতিয়ে আসছে। প্রাদেশিক উগ্রতা, প্রগতিবিমুখ মৌলবাদী মোল্লাদের প্রভাব এবং মুসলমান ভূস্বামীদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীর একরতফা আনুকূল্য পাকিস্তানকে ক্রমশ আরো বিচ্ছিন্নতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যা কবি আল্লামা ইকবালের স্বপ্নকেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে না, স্বপ্ন ভঙ হবে ইতিহাসেরও।
দৈনিক বাংলার বাণী : ২২ নভেম্বর ১৯৯১


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন