পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

যাত্রীরা জিম্মি, ফুটপাত দখল এবং...


এমনিতেই মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। জীবনযাত্রার মান যেভাবে বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে যেয়ে যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে চলাফেরা করাটা একটা বড় ধরনের দায় হয়ে উঠেছে। শহরের মানুষের দীর্ঘদিনের চলাচলের বাহন রিকশা। বোধকরি অসংখ্য মানুষের প্রিয় বাহনও। পরিবেশবান্ধব রিকশায় চড়ে যেখানে খুশি, সেখানে অনায়াসে যাওয়া যায়। খুব বেশি ঝঞ্ঝাটও নেই। রিকশায় চড়ার মধ্যে এক ধরনের রোমান্টিকতা জড়িয়ে আছে। মিঠে রোদে বা বৃষ্টিতে রিকশায় চড়ার মজাই আলাদা। বিশেষ করে সদ্য বিবাহিত দম্পতি কিংবা প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছে রিকশার কদরই অন্যরকম। পাকিস্তান আমলে রিকশার প্রচলন হলেও এখন নাগরিক জীবনের সঙ্গে দারুণভাবে জড়িয়ে পড়েছে রিকশা। কিন্তু জনসংখ্যার চাপ, আর্থিক অসচ্ছলতা আর বেআইনিভাবে রিকশার সংখ্যা খুব দ্রুত এত বেড়ে যায় যে, তা নাগরিক বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিনের যানজটের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে রিকশা। যে কারণে এরশাদ সরকারের আমল থেকে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে রিকশা চলাচল ক্রমান¦য়ে সীমিত, তারপর বন্ধ করে দেয়া হতে থাকে। বর্তমানে অধিকাংশ রাস্তায় রিকশা চলাচল করতে দেয়া হয় না। একই সঙ্গে পরিবেশ দূষণের কারণে বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দেয়া হয়েছে। রিকশা চলাচল সীমিত ও বেবিট্যাক্সি নিষিদ্ধ করায় রাজধানীবাসীর চলাচলের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। যদিও এই সংকট দূর করার জন্য নানা রঙের ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি ও মিশুক চালু করা হয়েছে। কিন্তু জনচাহিদার অনুপাতে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয়। সব মিলিয়ে ঢাকা মহানগরে ১৮ হাজার ক্যাব, সিএনজি, অটো ও মিশুক চলাচল করে। এর মধ্যে বেশকিছু যান থাকে চলাচলের অনুপযোগী। ফলে নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একে তো রিকশা ও বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দেয়ায় চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে; তদুপরি আগে যেখানে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকায় যে কোনো এলাকায় যাওয়া যেতো, এখন সেখানে ৩০ টাকার নিচে কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তা ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছে। অবশ্য শুরুতে ট্যাক্সি ক্যাবের সার্ভিস ছিল চমৎকার। ফোনে কল করলে কিংবা রাস্তায় থামিয়ে ইচ্ছে অনুসারে নির্ধারিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া যেতো। মিটারে যে বিল উঠতো, তাই পরিশোধ করলে চলতো।

বাড়তি কোনো অর্থ দিতে হতো না। আর এখন ট্যাক্সি ক্যাব, সিএনজি চালিত ফোর স্ট্রোক অটোরিকশা ও মিশুকে যে কোনো গন্তব্যে যেতে চাওয়াটা স্বপ্ন হয়ে উঠেছে। চালকরা অল্প দূরত্বে যেতে চাওয়া তো দূরের কথা, কোথাও যেতে চাওয়াটা নির্ভর করে তাদের মেজাজ-মর্জি ও নানা শর্তের ওপর। তারপর কোথাও যেতে চাইলে মিটারের সাথে বাড়তি টাকা চাওয়াটা রীতিমত নিয়মে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর তারা কোথাও যেতে চায় না। ট্যাক্সি ক্যাব ও সিএনজি চালকদের বক্তব্য হচ্ছে, প্রতিদিন সিএনজি নিতে তাদের ২/৩ ঘণ্টা লেগে যায়। যে কারণে নির্ধারিত ভাড়ায় তাদের পোষায় না। অথচ ট্যাক্সি ক্যাব সার্ভিস নীতিমালা ১৯৯৮-এর শর্তানুসারে, শুধুমাত্র সংযোজিত মিটারের মাধ্যমে ভাড়ায় ট্যাক্সি ক্যাব চলাচল করবে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা যাত্রীদের চাওয়া মাত্র চালক দেখাতে বাধ্য থাকবে। নির্ধারিত স্ট্যান্ডে অবস্থানকালে কোনো ক্যাব চালকই প্রকৃত যাত্রী বহনে অস্বীকৃতি জানাতে পারবে না। এসব শর্ত চালকরা মানছে না। প্রতিটি ট্যাক্সি ক্যাবের সঙ্গে পুলিশ কন্ট্রোল রুমের ফোন নম্বর দেয়া হয়েছে। কোনো ট্যাক্সি ক্যাব কোথাও যেতে না চাইলে, বাড়তি ভাড়া চাইলে কিংবা অন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি করলে যাত্রীরা টেলিফোনে অভিযোগ করলেই পাঁচ মিনিটের মধ্যে সার্জেন্ট নির্দিষ্ট স্থানে হাজির হবেন। তাছাড়া যাত্রীদের লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কথা। কিন্তু অধিকাংশ যাত্রীর তাৎক্ষণিকভাবে ফোন করার সুযোগ থাকে না। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার ঝক্কি-ঝামেলা এবং জরুরি প্রয়োজন থাকলে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। পুলিশকে ফোন করে সহসা সাড়াও পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে রাজধানী ঢাকায় চলাচল করাটা বিড়ম্বনাময় ও ভোগান্তিকর হয়ে উঠেছে। একদিকে আর্থিক সংকট, অন্যদিকে পর্যাপ্ত যানবাহন না থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া মধ্যবিত্ত ও নিুবিত্তের অন্যতম অবলম্বন বিআরটিসি বাস দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এমনিতেই বিআরটিসি বাসের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে, তারপরও যে ক’টি বাস এখনও চলাচল করে, তা যাতে না চলাচল করতে পারে, সে জন্য নানা রকম কলা-কৌশল ও ফন্দি-ফিকির করা হয়। এমনিতেই সাধারণ মানুষ নানা সমস্যায় জর্জরিত, তার মধ্যে পথচলা অন্যতম সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যানবাহন সংকটের কারণে অপচয় হচ্ছে অর্থ ও সময়ের। আমাদের জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ বেকার। এর সাথে যারা বিভিন্ন পেশায় কর্মরত, তাদের বড় অংশই বসবাস করে রাজধানী ঢাকায়। কর্মরত জনসংখ্যার বড় একটি অংশ যানবাহন সমস্যার কারণে সময়মত কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় নষ্ট হচ্ছে অসংখ্য শ্রমঘণ্টা। অপচয় হচ্ছে শ্রমমুখী মানব সম্পদের। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। তাছাড়া রিকশা ও বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দিয়েও ট্রাফিক জ্যাম নিরসন করা যায়নি। কেননা, বিপুল জনসংখ্যার এই রাজধানীতে ছোট ছোট যানবাহন চলাচলের ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটেও অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে নতুন গাড়ি ক্রয়ের সুবিধার্থে নতুন গাড়ির ক্ষেত্রে করভার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস করায় প্রাইভেট কারের সংখ্যা আরো বেড়ে যাবে। এতে করে ট্রাফিক জ্যাম আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।


 ছোট ছোট যান চলাচলে নিরুৎসাহিত করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে একতলা ও দোতলা বাসের সংখ্যা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হলে সাধারণ মানুষের উপকারের পাশাপাশি ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস পেতে পারতো। শিল্পোন্নত দেশেও সাধারণ যাত্রী চলাচলের সুবিধার্থে পর্যাপ্তসংখ্যক বাস চলাচলের ব্যবস্থা রয়েছে। বাসগুলো চলাচল করে ঘড়ির কাঁটা মেপে। কিন্তু আমাদের দেশ প্রতিবছরই বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে এবং প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা কাটছাঁট করে বিত্তবানদের জন্য সুবিধার দুয়ার খুলে দেয়া হয়। পরিবহন খাতে সুষ্ঠু কোনো নীতিমালা না থাকায় ঢাকায় হরেক রকম যানবাহন চলাচল করছে এবং এ কারণে ঢাকা পরিণত হয়েছে যানজটের শহরে। বাজেটে পরিবহন খাতে যতই অর্থ বরাদ্দ করা হোক না কেন, সুষ্ঠু নীতিমালা প্রণয়ন করা না হলে যান চলাচলের ক্ষেত্রে যে বিশৃংখল অবস্থা বিরাজ করছে, তা দূর করা যাবে না। যানজট, অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য সচেতনতাসহ নানা কারণে সাধারণ মানুষ অন্তত কাছাকাছি দূরত্বের পথ হেঁটে অতিক্রম করতে চায়। কিন্তু ঢাকা শহরে হেঁটে চলাচল করাটা এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ ফুটপাতই বেদখল হয়ে গেছে। এমনিতেই ঢাকায় পর্যাপ্ত রাস্তা নেই। যা রাস্তা আছে, তার সর্বত্র দু’পাশে ফুটপাত নেই। রাজধানীতে প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। সে অনুপাতে ফুটপাত নেই বললেই চলে। যে কারণে যানজটের পাশাপাশি এখন মানুষজটও স্বাভাবিক ঘটনা। ঢাকায় এমন কোনো ফুটপাত খুঁজে পাওয়া মুশকিল, যেখান দিয়ে খুব সহজে ও স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটে যাওয়া যায়। স্থায়ী দোকান, ভাসমান হকার, গ্যারেজ, ডাস্টবিন ইত্যাদি কারণে ফুটপাত দিয়ে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ ফুটপাতই ভেঙ্গেচুরে একাকার অবস্থা। একটুখানি অসতর্ক বা অসচেতন হয়ে হাঁটলে দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। মাঝে মাঝে পুলিশ অ্যাকশনে নেমে গুরুত্বপূর্ণ কিছু স্থানের ফুটপাত খালি করে দিলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি দাঁড়ায় যথা পূর্বং তথা পরম। এমনিতে ঢাকা শহরে পর্যাপ্ত মাঠ, খোলা জায়গা, পার্ক নেই। অথচ দেশে হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিসসহ মারাত্মক রোগের রোগীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। যে কোনো হাসপাতাল ও ক্লিনিকে রোগীদের লাইন লেগেই থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রোগীদের পথ্য দেয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের পরামর্শ হচ্ছে : প্রতিদিনই কিছু সময়ের জন্য হাঁটুন। কিন্তু হাঁটার মতো জায়গা কোথায়? রমনা পার্ক, সংসদ ভবন, ধানমন্ডি লেকে সকালে বা বিকালে মানুষের ভিড় লেগে যায়। তাছাড়া সবার পক্ষে নির্ধারিত সময়ে হাঁটার অবকাশ হয় না। এ জন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে অথবা কাছাকাছি কোথাও যেতে হলে হেঁটে হেঁটে প্রয়োজনটুকু সারা হয়, একই সঙ্গে হাঁটার কাজটুকুও হয়ে যায়। এ রকম লোকের সংখ্যাই বেশি। শারীরিক এক্সারসাইজের জন্য সাঁতার ও সাইকেল চালানো চমৎকার ব্যায়াম। কিন্তু ঢাকা শহরে সাঁতার কাটার কোনো ব্যবস্থা নেই। পাঁচ তারকা হোটেল কিংবা অভিজাত পাড়ায় যেসব সুইমিংপুল আছে, সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য খুবই কম লোকের আছে।


এছাড়া ঢাকা শহরে সাইকেল চালানো অনেকটা নিজের জীবনকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়ার শামিল। ব্যস্ত নগরী যানজটের ভিড়ে সাইকেল চালানোর সুযোগ কোথায়? যে জন্য রাজধানী ঢাকায় সাইকেল এখন দুর্লভ হয়ে উঠেছে। এসব সমস্যার কারণে হাঁটাহাঁটি করাটা যেখানে শরীর সুস্থ ও শারীরিক ফিটনেস বজায় রাখার একমাত্র ভরসা, সেটাও এখন মেনে চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। নানা প্রতিকূলতাকে ডিঙ্গিয়ে শীতকালে যা হোক কিছুটা হলেও হাঁটাহাঁটি বা পদচারণা করা যায়। কিন্তু বর্ষাকালে অবস্থা দাঁড়ায় ভয়াবহ। একটুখানি বৃষ্টি হলেই রাজধানীর নিচু এলাকা ডুবে যায়। আর ভারি বর্ষণ হলে তো কথাই নেই। কি অভিজাত, কি বাণিজ্যিক, কি আবাসিক- সব এলাকায় থৈ থৈ করে পানি। নগরীর পথঘাট, অলি-গলিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এমনিতে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভাঙ্গা-চোরা ও খানা-খন্দকে পরিপূর্ণ। যানবাহনে চলাচল করাই ঝুঁকিপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে পদব্রজে চলাচল করা একদম অসম্ভব হয়ে পড়ে। চিকিৎসকের পরামর্শে কিংবা নিজের তাগিদে হাঁটাহাঁটি যাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে, তাদের জন্য বর্ষাকালটা একটা অভিশাপ হয়ে নেমে আসে। 

দৈনিক সংবাদ : ২৫ জুন ২০০৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন