পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাহিত্য লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২২

সাগর সৈকতে

 


সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে 

তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো

ভাবি মনে মনে

আকাশের নীল থেকে তারার কান্তি এনে

তোমার নয়নে ছড়াবো গো 

ভাবি মনে মনে

সাগরের তীর থেকে...

প্রাণ-মন উজাড় করে কে গাইছে এই গান? যেন কেউ একজন আমাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছে প্রিয় এই গানটি। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় বুকের মধ্যে উথালপাথাল করতে থাকে। খালি গলায় গাইলেও কেমন একটা সম্মোহন সৃষ্টি করেছে কণ্ঠমাধুর্য। এমন পরিবেশে এই গান বোধকরি বুকের গভীর থেকে সহজাতভাবেই উঠে এসেছে। পূর্ণিমার প্রভাবে সাগরে যেমন প্রবলভাবে জোয়ার আসে, তেমনিভাবে কণ্ঠে সুর থাকলে গান তো সহজাতভাবে গাইতে ইচ্ছে করবেই। চারপাশটা কী মায়াময়। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চাঁদের আলো। সমুদ্রের ঢেউয়ে ঝিকমিক করছে আলোর রোশনাই। আলো আর আঁধারের সমন্বয়ে অলৌকিক এক আবহ। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন সংগত করে চলেছে সাগরের ঢেউ। সবুজ জলরাশির গম্ভীর সুরেলা কলধ্বনি। 

ক্রমান্বয়ে রাতের গভীরতা বেড়ে চলেছে। লোক চলাচল হ্রাস পেলেও পুরোপুরিভাবে নিরিবিলি বলা যাবে না। সমুদ্রের নির্জনতা একান্তভাবে অনুভব করার জন্য অনেকেই এসেছেন। সত্যি সত্যি মিষ্টি মিষ্টি হাওয়া এসে জুড়িয়ে দিতে থাকে অন্তঃকরণ। কেউ কেউ ছাতার নিচে আরামচেয়ারে বসে আছেন। সেখান থেকেই ভেসে আসছে সুরেলা গান। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে গানটা অনেকটা দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পষ্ট শোনা যেতে থাকে গানের কলি। কেমন আচ্ছন্ন করে দেয়। 

গানের কণ্ঠ খুবই পরিচিত মনে হতে থাকে। অবশ্য এই গান শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেলেও অনেকেই গেয়েছেন। সে কারণে চেনা চেনা মনে হতেই পারে। তারপরও কেন যেন অনেক বছর আগে একজনের কণ্ঠে এই গান শোনার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সেই গানের স্রোতা ছিলাম একমাত্র আমি। অবশ্য আরও ছিল গাছপালা, পাখপাখালি, ঝিরিঝিরি বাতাস আর বছিলা ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদী। নদীতে চলাচল করছিল যাত্রীবাহী নৌকা। হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায় মালামাল বহনকারী বার্জ বা কন্টেইনার। বিকেল গড়িয়ে গেলে ডুবতে থাকা সূর্য ছড়িয়ে দেয় তার অপরূপ মাধুর্য। পরিপার্শ্বটাকে মাখিয়ে দেয় সোনা রঙে। কী যে অদ্ভুত লাগে। 

ঢাকার সন্নিহিত গ্রামীণ এক দৃশ্যপট। আমার আর সুরভির পছন্দের একটা জায়গা। সুযোগ পেলেই সেখানে আমরা ছুটে যেতাম। সেদিন আমরা নৌকায় করে নদীর ওপারের দ্বীপের মতো এলাকায় অবস্থিত বিশাল ইটের ভাটায় যাই। জনবিরল সেই দ্বীপে আমরা প্রজাপতির মতো ইচ্ছেপাখি হয়ে ছোটাছুটি করি। তখন তো যা কিছু করি, তাই লাগে ভালো। কোনও ভয়ডর কাজ করতো না। আশেপাশে তেমন কেউ ছিল না। তারপরও আমার কানে কানে লাজুককণ্ঠে সুরভি বলে, তার খুব হিসি পেয়েছে। সেখানে তো আর ওয়াশরুম থাকার প্রশ্নই আসে না। কী করা যায়? 

এরআগে কখনও এমন সমস্যায় পড়ি নি। তাকিয়ে দেখি, চারপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ইটের পাঁজা। ভাবলাম, এরচেয়ে ভালো আড়াল হয় না। সুরভিকে তা বলতেই কিছুতেই রাজি হতে চায় না। কিন্তু এছাড়া তো উপায় নেই। গরজ বড় বালাই। অগত্যা সেই প্রাকৃতিক পরিবেশে ঠেকার কাজ চালাতে হয়। গার্ড হিসেবে আমাকে রাখতে হয় তীক্ষ্ণ নজরদারি। কল্লোলিত ঝর্ণাধারা ইউরিয়া সার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 


চাপমুক্তির একটা আলাদা আনন্দ আছে। নৌকায় ফেরার সময় আমার কাঁধে মাথা রেখে আপন মনে গান গাইতে থাকে সুরভি। সাগরের তীর থেকে...। নিবিড় সেই মুহূর্তে নদীটাকেই আমার কাছে সাগর মনে হতে থাকে। সেদিন মনে হয়েছিল, স্বর্গসুখ কি এমন হয়? তখন নেমে এসেছে অন্ধকার। জোনাকি হয়ে জ্বলতে থাকে দূরের আলো। আকাশে তারার মেলা। নিস্তব্ধতার মাঝে বৈঠা বাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কেমন যেন মাদকতাময় পরিবেশ। সব মিলিয়ে মনে হতে থাকে, যেন নন্দনকাননে কিন্নরীকণ্ঠে কেউ গান গাইছে। সেই থেকে গানটা আমার বুকের ভিতর চিরদিনের মতো স্থায়ী হয়ে যায়। 

সুরভির সঙ্গে আমার ছিল গভীর গোপন প্রেম। তার সবচেয়ে যা ভালো লাগতো, আমার পছন্দ-অপছন্দকে সে যথেষ্ট গুরুত্ব দিত। জীবনে যা কখনও করে নি, আমার কারণে তা করতে মোটেও কার্পণ্য করতো না। সেই সময় মূলত আমাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় তার জীবন। গানের প্রতি আমার আকর্ষণের কারণে গানের চর্চা শুরু করে। লালমাটিয়া গার্লস কলেজে রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সংগীতের স্কুল 'সুরের ধারা'য় ভর্তি হয়। যত সহজে বলা হলো, ব্যাপারটা তত সহজ ছিল না। পারিবারিক বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু আমার জন্য সে কোনো কিছুই পরোয়া করতো না। 'সুরের ধারা'য় কোর্স কমপ্লিট না করেই তালিম নেয় আধুনিক গানের। এর কারণ, আমি তা পছন্দ করতাম। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তার সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠা হয় নি। 

তার মধ্যে ছিল একটা খামখেয়ালিপনা। কখন কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগের মুহূর্তেও বুঝতে পারা যেত না। পথ চলতে চলতে হঠাৎ হারিয়ে যেত। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মোটেও সহজ ছিল না। আমি তাকে অসম্ভব ভালোবাসতাম। এ কারণে তার বায়নাক্কা মেনে নিতাম। তারপরও তার মন রক্ষা করা যায় নি। গান যেমন হুট করে ছেড়ে দিতে একটুও ভাবে নি, তেমনিভাবেই আমার সঙ্গে সম্পর্কটা কাট অফ করতে একদমই দ্বিধা হয় নি। কেন সম্পর্ক অটুট রাখে নি, তার কোনও কার্যকারণ জানি না। সেদিন উপলব্দি হয়, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়।

একটা পর্যায়ে তার হয়তো ইচ্ছে হয়, আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার। তার ইচ্ছে হবে, সেটা বাস্তবায়িত হবে না, তা তো হতে পারে না। ওয়ান ফাইন মর্নিং আমি আবিষ্কার করি, তার নামের পাশে সবুজ বাতি আর তো জ্বলে না। জ্বললেও আমি তা দেখতে পাই না। তার জীবন থেকে আমি একদমই নেই হয়ে যাই। কেন, কী কারণে আমাকে বাতিল করে দেওয়া হয়, তার জবাব আজও পাওয়া হয় নি। তবে অস্বীকার করবো না, তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। 

মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে থাকে, তেমনিভাবে আগলে রেখেছি তার সান্নিধ্যের মধুময় স্মৃতি। যখনই কোথাও তার মতো কাউকে কিংবা অবিকল তার ভঙ্গিমা দেখতে পাই, বুকটা কেমন উচাটন উচাটন করতে থাকে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবটাই হয়ে যায় মরীচিকা। আর কখনও তার নাগাল পাওয়া হয় নি। এই বিভ্রান্তি নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত খুঁজে চলি। তার কণ্ঠে শোনা গান হররোজ শুনি। কেউ যখন সেই গান গায়, আমি কান পেতে রই।

অনেক বছর পর কক্সবাজারে এসেছি। সব কেমন বদলে গেছে। সৈকত শহরের সেই বর্ণিলতা অনুভব করতে পারছি না। সবুজের গহীনতা নেই। শহরটি যেন রূপ নিয়েছে আবাসিক এলাকায়। হোটেল, মোটেল, রিসোর্টগুলোতে নান্দনিক সৌন্দর্যের বালাই নেই। অধিকাংশই গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ভবনের মতো করে। তা দেখে প্রাথমিক অবস্থায় বোঝার উপায় নেই এটি সৈকত শহর। কেবল সমুদ্রের কাছে গেলেই তা অনুধাবন করা যায়। দিনের বেলায় জনাকীর্ণ সৈকতে সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে আসার খুব একটা সুযোগ পাওয়া যায় না। এত এত মানুষের ভিড়ে সমুদ্র দূরের হয়ে থাকে। 


যতই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে থাকে, ততই যেন মায়াবিনী হয়ে ওঠে সমুদ্র। ধরা দেয় নানান রূপে। রহস্যময়তার চাদরে মুড়ে দেয় চারদিক। সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে দৃশ্যমান হয় অপার্থিব সৌন্দর্যের এক আধার। সেই সৌন্দর্যকে স্মৃতিময় করার জন্য  মুহুমুর্হু জ্বলতে থাকে মোবাইল বা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। কারও হাতে সূর্য। কারও আঙুলে সূর্য। কারও মাথায় সূর্য। নানান ভঙ্গিমায় সূর্যাস্তকে বন্দী করা হয়। কতভাবেই না গোধূলিকে ধরে রাখার কসরত চলতে থাকে। আমরাইবা পিছিয়ে থাকি কেন? আর সৈকতের পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ক্রমাগত তাগাদা তো আছেই। 

আগে সৈকতের ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে প্রিন্ট করে হোটেলে পৌঁছে দিত। সেই সিস্টেম আর নেই। এখন ছবি তোলার পর ডাটা কেবল কিংবা পেন ড্রাইভ দিয়ে ছবি মোবাইল ফোনে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়। বেশি টাকা পাওয়ার জন্য ঘন ঘন ক্যামেরার শাটার টিপে গাদা গাদা ছবি ধরিয়ে দেয়। একই ভঙ্গিমায় অনেক ছবি তোলা হয়। কার্যত কিছু করার থাকে না। অবশ্য প্রিন্ট কপি ছবির গুরুত্ব আগের মতো আর নেই। এখন ছবি তোলা হয় মূলত একবার দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করার জন্য। প্রতিনিয়ত জমা হয় হাজার হাজার ছবি। তার মধ্যে পুরনো ছবির তেমন আর কদর থাকে না।


ব্যস্ততার কারণে কক্সবাজারে তোলা অসংখ্য ছবি ঢাকায় ফিরে আসার আগে আর দেখার সুযোগ হয় নি। অনেক দিন পর ছবিগুলো দেখার সময় চমকে যাই। সেই ছবিগুলোর মধ্যে নানান ভঙ্গিমায় জ্বল জ্বল করতে থাকে সুরভি। কত দিন পর তাকে দেখলাম। ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরা থেকে ডাটা কেবল দিয়ে আমার মোবাইলে যে ছবিগুলো দেয়, তাতে শুধু আমাদের ছবি নয়, ভুল করে অন্য অনেকের ছবিও দিয়ে দিয়েছে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সৈকতে ভ্রমণরত সুরভি। তবে খুব কাছাকাছি হলেও ক্ষণিকের জন্য তার সঙ্গে সরাসরি দেখা হলো না। বুকের মধ্যে সুরের হাহাকার ছড়িয়ে দিতে থাকে তার কণ্ঠে গাওয়া গান, সাগরের তীর থেকে...

মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২২

ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না

 


জানো, ব্যাংকে কাজের এমন চাপ, অনেক সময় প্রস্রাব পর্যন্ত করতে যেতে পারি না।

তাই বুঝি? এ বিষয়ে আমার একটা পরামর্শ আছে। অবশ্য তুমি তো আর মার্কিন কণ্ঠশিল্পী সোফিয়া উরিস্তার মতো সাহসী হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তো তুমি তোমার পুরানো ফর্মুলা কাজে লাগাতে পারো।

সোফিয়া উরিস্তাটা আবার কে? সে কী করেছে? আর পুরানো ফর্মুলাইবা কোনটা?

সোফিয়া গান গাওয়ার সময় চাপ সইতে না পেরে এক ভক্তকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে তাঁর মুখে হিসি করেন। আর ফর্মুলার কথা মনে নেই তোমার? নেত্রকোনায় থাকতে বদনায় হিসি করে রেখে দিয়েছিলে না? ব্যাংকে তো বদনায় হবে না। একটা বালতি রাখতে পারো।

এই বয়সেও তোমার বদগিরি গেল না?

দেখ, বয়সের আর কী দোষ? মনের বয়স তো আর বাড়ে না। মন যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে বদগিরি যাবে কীভাবে? তাছাড়া তুমিও তো কম বদ ছিলে না। না হলে অন্যকে নাজেহাল করার জন্য কেউ কি বদনায় হিসি করে রাখে?

তুমি তো পুরানো কাসুন্দি ভুলতেই পারছো না। আমার তো সেসব স্মৃতি কিছু মনে নেই। তুমি মনে না করালে আর কখনও মনে পড়তো কিনা সন্দেহ। 

তুমি তো সব কিছু অনায়াসেই মুছে ফেলতে পারো। আমি চাইলেও পারি না। যেমন পারি নি তোমাকে ভুলে যেতে। তোমার সব কিছুই আমি পরম যত্মে সযতনে সাজিয়ে রেখেছি। হতে পারে কোনও স্মৃতি কিংবা ফ্রেমবন্দি কোনও মুহূর্ত। 

শোনো, যা চলে গেছে, তা তো গেছেই। আর কখনই ফিরে আসবে না। তাহলে সাজিয়ে রেখে কী লাভ? 

সে তুমি বুঝবে না। সেই অনুভূতি তোমার নেই।

বুঝলাম আমার নেই। তোমার বুঝি খুব অনুভূতি আছে?

দুঃখটাই তো এখানেই। তুমি সেটা বুঝতে পারলে না। আমি জানি না, আর কীভাবে তোমাকে বোঝানো যাবে?

কীভাবে তুমি বুঝিয়েছো যে আমি বুঝতে পারলাম না? ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে এঁকে বোঝালে না হয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারতাম।

তুমি যে আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য স্থান করে নিয়েছো, এটা কি তুমি বুঝতে পারো না?

মুখে মুখে বললেই বুঝি অনুভূতি হয়ে যায়? 

আমি তো হৃদয় দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি।

তাহলে এতগুলো বছর চলে গেল। কেন যোগাযোগ করো নি?

আমি তো বরারবই যোগাযোগ করতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি তো আমাকে কখনও সুযোগ দাও নি। একবারও আমার দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করো নি। তোমার গণ্ডি তো এখন অনেক বড়। কর্পোরেট জগতের মানুষ। অর্থে, বিত্তে ঝলমল করে তোমার চারপাশ। তাছাড়া এখন তোমার সঙ্গে যাদের চলাফেরা কিংবা তোমাকে যারা ঘিরে রেখেছে, তাদের ব্যুহ ভেদ করার সুযোগ কোথায়? তুমিই তো আবার সাবধানে থাকতে বলেছো। নতুবা বড় ধরনের কিছু ঘটে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছো। 

তাহলে পুরানো গীত গেয়ে এখন আর কী লাভ?

আমি আসলে তোমাকে কখনোই ভুলতে পারি নি। পারবোও না। আমার জীবনে সত্যিকার ভালোবাসা তুমি। যেভাবে হোক, আমাদের মধ্যে যে নিবিড় বন্ধন গড়ে উঠে, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। আমি অন্তত পারি না। প্রতি মুহূর্তে তুমি থাকো আমার হৃদয়জুড়ে।

হৃদয়জুড়ে কীভাবে আছি? তার কি কোনও চিহ্ন আছে?

তুমি তো বিষয়টাকে তামাশা মনে করছো। আমার কাছে আমাদের সম্পর্কটা অমলিন হয়ে আছে। তোমার সঙ্গে তো অনেক দিন যোগাযোগ নেই। দেখা করার উপায় নেই। কথাও হয় না। কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে দেখতে পাই। তোমাকে অনুভব করি। কল্পনায় তোমার সঙ্গে কথা বলি। আমি যা কিছুই লেখালেখি করি না কেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাক তুমি।

তাতে কী এমন মহা উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে? তুমি তো লেখালেখি করো আমাকে ঝামেলায় ফেলার জন্য। মনে করো, আমি কিছুই বুঝতে পারি না?

মোটেও না। তোমাকে কেন ঝামেলায় ফেলবো?

তোমার লেখায় সব কিছু খুব স্পষ্ঠ হয়ে ওঠে। তারপর লেখায় যেভাবে ছবি ব্যবহার করো, তাতে তো না বোঝার কোনও কারণ নেই। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে যে কেউই আমাকে চিনতে পারবে।  

আমি যা যা লেখালেখি করি, যেখানে যেখানে প্রকাশ করি, তোমার চেনাজানার গণ্ডির কারও চোখে পড়ার তেমন সুযোগ নেই। 

তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে?

সেটুকু তো অন্তত বুঝি। তারা যাতে না বুঝতে পারে, সেজন্য আমি নানান কৌশল অবলম্বন করি।

তুমি কি সবাইকে তোমার মতো বুদ্ধু মনে করো নাকি?

তা করবো কেন? অবশ্য কোনও কোনও লেখা আমার পরিচিতজনরাই পড়ে। তারা বোধহয় কেউ কেউ তোমাকে চিনতে পারে। 

মানে কী? কারা চিনতে পারে?

আমার কোনও একটা লেখা পড়ে বাসা থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, আমি তোমাকে ভুলতে পারি নি। আর এই কারণে নষ্ট হয়ে গেছে তার জীবন। 

কী বলছো তুমি?

আমি যে তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি, সেটা আমি মোটেও অস্বীকার করি না। করতে চাইও না। তা সবাইকে জানিয়ে দিতে আমার কোনও কার্পণ্য নেই। আমার লেখা পড়ে সেটা তোমার না বোঝার কারণ নেই। 

সেটা না হয় বুঝলাম। তার সঙ্গে জীবন নষ্ট হওয়ার কী সম্পর্ক? 

তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ দিন তার সঙ্গে আমার কথা বন্ধ থাকে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আমার কোনও রকম শারীরিক সম্পর্কও নেই। 

একদম বাজে কথা। এটা আমি বিশ্বাস করি না।

আর কিছু যা হোক, আমি পারতপক্ষে মিথ্যা বলি না। আর এই মিথ্যা বলে তো আমার কোনও লাভ নেই। তোমার যদি কোনো সুযোগ থাকে, তুমি যাচাই করে নিতে পারো।

তা কীভাবে হয়? তাহলে শারীরিক সম্পর্ক কীভাবে মিটাও?

তোমার মাধ্যমে।

আমার মাধ্যমে! হাউ ইট পসিবল?

অবশ্য তোমার তো তা বুঝতে পারার কথা নয়। তোমাকে তো কাছাকাছি পাই না। তাতে কী? সেক্ষেত্রে কল্পনায় তোমার সাহায্য নিতে হয়। তোমার সঙ্গে ফিজিক্যাল রিলেশন আর তোমার ছবিগুলো আমাকে উদ্দীপ্ত করে। 

তুমি আসলে অসভ্য একটা লোক। এখনও ভালো হলে না। কেন যে এমন করো?

তুমি আমার অস্তিত্ব জুড়ে যেভাবে মিশে আছো, তোমাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না। বছরের পর বছর তোমাতে উপগত হচ্ছি। উত্তেজনা অনুভব করি। অথচ তুমি একটুও অনুভব করতে পারো না। এরচেয়ে কষ্টের আর কী আছে? 

আমি কি স্বর্গের দেবী নাকি? তুমি কী করছো না করছো, আমি দূর থেকে তা কীভাবে অনুভব করবো? যত্ত সব আজগুবি কথা। আচ্ছা, তুমি না হয় নিজের ওপর নির্ভরশীল। আরেকজন কী করে? 

সে খোঁজখবর আমি রাখি না। জানিও না।

এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? 

বিশ্বাস করবে না অবিশ্বাস করবে, সেটা তোমার ওপর নির্ভর করে। আমি একবিন্দু বানিয়ে বলছি না।


এই শোনো, কী খাবে বলো? 

তুমি তোমার পছন্দসই অর্ডার দাও। 

অনেক দিন পর দেখা। কী খাও, কী খাও না, তা তো জানি না। আমার পছন্দের খাবার খেতে পারবে তো?

না পারার কী আছে? অবশ্য এটাও ঠিক, এখন অনেক কিছুই হিসাব-নিকাশ করেই খাওয়া উচিত। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা অন্য। একসময় তোমার শরীরের তিতকুটে পানীয় পর্যন্ত খেয়েছি। আর এখন পছন্দের খাবার খেতে পারবো না?

তোমার বদস্বভাব একদমই পাল্টায় নি। সব কিছু মনে করে রেখেছো!

রাখবো না! তা কী কখনও হয়? তোমাকে যতটা পেয়েছি, যেভাবে পেয়েছি, সেটাই ছিল আমার জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। তা কী করে ভুলবো বলো?

সব ঢঙের কথা। এইসব ফালতু কথা রাখো। বারবিকিউ চিকেন আর ফ্রাইড ভেজিটেবল অর্ডার দিচ্ছি। 

দিতে পারো। অর্ডারের ধরন দেখে বুঝতে পারছি, বেশ স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছো। কিন্তু এত দূর এলে কেন? 

বনানী কি খুব দূরে নাকি? 

আমার জন্য দূর তো বটেই। খুব একটা আসা হয় না। তবে তোমার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছি, তুমি এদিকে নিয়মিতই আসো।

অফিসের কারণে মাঝে-মধ্যে আসতেই হয়।

তোমার জগতটা অনেক বদলে গেছে। কত জায়গায় তোমাকে যেতে হয়। কত কিছুই না করতে হয়।

মানে কী?

কিছুই না। 

মনে হচ্ছে, তোমার কথার মধ্যে একটা অন্য রকম ইঙ্গিত আছে। 

তুমি এখন অনেকের হয়ে গেছো। কষ্টটা হলো, তুমি শুধু আমার নও। তোমার একটা ক্ষোভ ছিল, সম্পর্কের দিক দিয়ে আমি তোমার চেয়ে এক কদম এগিয়ে ছিলাম। এখন তোমার তো মাল্টিপল সম্পর্ক। আমাকে ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছ।

দেখ, উল্টোপাল্টা কথা বাদ দাও। এত বছর পর আমরা একত্রিত হয়েছি, দিনটা তিক্ততায় ভরিয়ে দিও না।

আসলে আমি এটা কোনোভাবেই মানতে পারি না। আমি তোমাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছি। তাহলে কেন আমাকে দূরে সরে যেতে হলো?

অতীত নিয়ে টানাটানি করে কোনো লাভ নেই। তাতে মন খারাপ হয়ে যায়। বরং বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করার চেষ্টা করো। 

সেটা যদি পারতাম, তাহলে তোমাকে কবেই ভুলে যেতাম। তোমার ভালোবাসা হৃদয়ে বহন করে নিয়ে জীবনটাকে ক্ষয়ে যেতে দিতাম না। 

ক্ষয়ে যেতে দিতে না, এর অর্থ কী? আমি কি তোমাকে বলেছি, আমাকে স্মরণ করে মৈথুন করে নিজেকে ক্ষয় করো। তুমি যা যা করো, সবই করো তোমার মেজাজ-মর্জি মতো। অকারণে আমাকে দোষারোপ করবে না।

মৈথুন করে ক্ষয় হওয়ার কথা তো বলি নি। সেটা করি নিজের শারীরিক চাহিদা পরিপূরণ করার পাশাপাশি তোমাকে নিবিড়  ভাবে অনুভব করার জন্য। তাতে কী ক্ষয় হয় বা হয় না, তা তো আমার জানা নেই। আসলে তোমার সান্নিধ্য না পাওয়াটাই আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তোমাকে ছাড়া কেমন যেন ছন্ন ছাড়া হয়ে গেছি। আর কোথাও মন বসে না। 

তোমার এসব মারফতি কথা বাদ দাও তো। 

মোটেও মারফতি কথা নয়। তোমাকে পেয়ে আমার জীবনটা হয়ে উঠে আনন্দময়। সেই আনন্দটুকু দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কিন্তু দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হই। আমি একদমই ভালো নেই। আমার মনের কথা বলার মতো কেউ নেই। আমি একদমই একা হয়ে গেছি। তোমাকে যেভাবে পেয়েছি, তেমনভাবে আর কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। 

এসব আবোল-তাবোল কথা বন্ধ করো তো৷ তোমার এই পুরানো প্যাঁচাল শুনতে ভালো লাগছে না।

তুমি কেন এত নির্দয় বলো তো? এতটা সহানুভূতিহীন হলে কী করে? জীবনের অনেকগুলো মূল্যবান দিন আমাদের হাসি-আনন্দে কেটেছে। আমার ধারণা, এমন দিন তোমার জীবনে আর কখনও আসে নি। সেই দিনগুলো তোমার কাছে কোনও গুরুত্ব নেই?  

যখন দিনগুলো ছিল, তখন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই দিনগুলো এখন অতীত হয়ে গেছে। তা নিয়ে জাবর কেটে কী আর হবে? জীবন কখনও থেমে থাকে না।

তা হয়তো থাকে না। জীবন যাদের কাছে প্রতিনিয়ত নতুন নতুনভাবে ধরা দেয়, তাদের কাছে জীবন গতিময়। অতীত তাদের স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু আমার জীবন তো তোমার কাছে থেমে আছে। সেখান থেকে আমি আর এগিয়ে যেতে পারি নি। পারার চেষ্টাও করি নি। 

সে তো তোমার সমস্যা। তাতে আমার কী করার আছে? 

তা ঠিক, তোমার কিছু করার নেই। তবে একটা জীবন যখন আরেকটা জীবনের কাছে বাঁধা হয়ে যায়, তখন কি সব কিছু এড়িয়ে থাকা যায়? 

তোমার কথাবার্তার মধ্যে কেমন একটা দার্শনিকসুলভ ভাব। দেখ, এখন আমাদের বয়স বেড়েছে। দুজনের সংসার আছে। সন্তান আছে। সন্তানরাও বড় হয়েছে। এখন কি আর আমাদের ফেলে আসা সম্পর্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক? 

এই কথা কি কেবল আমার জন্য প্রযোজ্য?

তা নয়। কিন্তু তুমি আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যেভাবে হাবুডুবু খাচ্ছ, তা কি ঠিক? 

ঠিক-বেঠিক বিবেচনা করে আমি কখনও জীবন যাপন করি নি। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে মন। তার নির্দেশনায় চলি। 

এখন মনটাকে থিতু করার চেষ্টা করো। 

আর যা কিছু পারি না কেন মনকে থিতু করার শক্তি আমার নেই। 

শোনো, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। 

জরুরি কথা!

দেখ, এখন আর আমাদের পাগলামি করার বয়স নেই। এই বয়সে এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে সবার কাছে হাসি-তামাশার পাত্র হই। তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি আমাকে ভুলে যাও। প্লিজ, আমাকে কথা দাও, আমাকে নিয়ে আর পাগলামি করবে না। 

এইজন্য বুঝি তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো?

এছাড়া তো উপায় ছিল না। আমাদের ভালোবাসার দোহাই লাগে, আমার মাথা ছুঁয়ে কথা দাও, তুমি আমাকে নিয়ে আর কিছু লিখবে না। 

ঠিক আছে, কথা দিলাম। 

সত্যি কথা দিলে তো? আমি জানি, কথা দিলে তুমি বরখেলাপ করবে না। 

তুমি বললে তাই কথা দিলাম। কিন্তু কথা রাখতে পারবো কিনা জানি না। কারণ, আমি আমার ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে পারবো না। তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই ভাবতেই পারি না।

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

কে ছিলেন বনলতা সেন?

এই বয়সেও এত মাধুর্য! 

কে ছিলেন তিনি?

খুব কাছের কেউ?

প্রিয়তমা কোনো নারী?

হঠাৎ ট্রেনে দেখা হওয়া কোনো অপরূপা?

বনেদি পরিবারের অল্প বয়সী সুন্দরী কোনো বিধবা? 

রাজবাড়ীতে আপ্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া কোনো রূপসী?

কোনো বারবণিতা? 

রাজবন্দি রমণী?

বিপ্লবী কন্যা?

সাহিত্যানুরাগী তরুণী? 

নাকি নিছক কল্পনা?

আজ অব্দি তাকে চেনা গেল না। কীভাবে যাবে? তাকে যিনি চিনতেন, তিনি তো পুরোপুরিভাবে খোলাসা করেননি। যদিও সেটা তো তার করার কথাও নয়। তারপরও সামান্য আভাস দিয়েছেন। তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তবে বোঝা যায়, কিছু বাস্তবতা আর কিছু কল্পনা করেই তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। তা হয়ে আছে চিরায়ত। চিরকালীন। সেটাই তো সৃষ্টির আনন্দ। কেন তাকে এভাবে মহিমান্বিত করেছেন, এজন্য তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত জবাবদিহি চাওয়া হয়। প্রশ্ন তোলা হয় তাঁর চরিত্র নিয়েও। তাঁকে অপমানিত করা হয়। কলঙ্কিত করা হয়। যে বা যারা তাঁকে অপমান করেন, কলঙ্কিত করেন, তারা তো জানেন, তিনি এসব গায়ে মাখবেন না। কষ্ট পাবেন। ভিতরে ভিতরে ক্ষত-বিক্ষত হবেন। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেবেন না। তিনি তো বরাবরই এমন। লাজুক। মুখচোরা। মিতভাষী। এড়িয়ে গেছেন জনতার কোলাহল। নিজেকে কোথাও মানিয়ে নিতে পারেননি। সংসারী হতে পারেননি। সন্ন্যাসীও হতে পারেননি। এ ধরনের মানুষকে পদে পদে ভুগতে হয়। জীবনে স্বস্তি পাননি। শান্তি পাননি। ভালোবাসা কি পেয়েছিলেন? মনে হয় না। কাউকে যে মুখ ফুটে মনের কথা বলবেন, ততটা সাহসী কি ছিলেন? মনে মনে অনেককে ভালোবেসেছেন। তাদের নিয়ে কল্পনা করেছেন। মনের মাধুরি দিয়ে তাদের কাব্যিক অবয়ব গড়ে তুলেছেন। তাঁর নির্মিত মানুষগুলোকে এখন সবাই চেনেন। জানেন। কিন্তু তারাও তো তাঁকে ভালোবাসেনি। তারা তাঁর কথা মানতো না। কোথাও যেতে কিংবা অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলতে কত বারণ করেছেন। তীব্র আকুতি নিয়ে বলেছেন,'.... ওইখানে যেওনাকো তুমি, বলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;....... কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে!' হায়! কে শোনে কার কথা? তাঁকে কেইবা পাত্তা দিয়েছে? তা নিয়ে মনস্তাপ থাকলেও জোর গলায় কিছু বলতে পারেননি। মীন রাশির জাতক তো। সব কিছু সইয়ে নিয়েছেন। তিনি সহজেই সম্পর্ক যেমন গড়তে পারেন না, তেমনিভাবে ভাঙতেও পারেন না। যে কারণে কাউকে ভুলতে পারেননি। বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ নিয়ে ভালোবাসার মানুষগুলোকে মহিমাণ্বিত করেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে বনলতা সেন। যতটা জানা যায়, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। নামটা শুনেই হৃদয়ে গেথে যায়। কে এই বনলতা সেন? তাকে নিয়ে কতনা জল্পনা-কল্পনা। 

কেউ বলেন, বনলতা সেন জীবনানন্দ দাশের খুড়তুতো বোন শোভনা দাশগুপ্ত। কাকা অতুলানন্দ দাশের মেয়ে। প্রথম গ্রন্থ 'ঝরাপালক' জীবনানন্দ তাঁকেই উৎসর্গ করেন। এ কারণেও কানাঘুষাটা পল্লবিত হয়।

নাটোরকেন্দ্রিক প্রচলিত কাহিনি হচ্ছে, জীবনানন্দ দাশ  একবারট্রেনে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। তখন নাটোর হয়ে যেতে হতো। (আসলেও কি তাই?)। নাটোর স্টেশন থেকে উঠেন বনেদি একটি পরিবারের ম্যানেজার ভুবন সেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধবা বোন বনলতা সেন। জীবনানন্দ দাশের খানিকটা আলাপ হওয়ার পর একসময় মেয়েটি নিজের গন্তব্যে নেমে যান। রেখে যান এক ঝলক ভালোলাগা। সেই ভালোলাগাই রূপান্তরিত হয় কবিতায়। 

দ্বিতীয় কাহিনি, নাটোরে বেড়াতে গিয়ে বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর বাড়িতে অতিথি হন জীবনানন্দ দাশ। এক দুপুরে আমন্ত্রিত হন সুকুল এস্টেটের ম্যানেজার ভুবন সেনের বাড়িতে। তাঁকে আপ্যায়িত করেন ভুবন সেনের অল্প বয়সী বিধবা বোন বনলতা সেন। তাঁর সৌন্দর্য দেখে তিনি অভিভূত হন। সেই সৌন্দর্যকে অমলিন করে রাখেন কবিতায়। 

তৃতীয় কাহিনি, একজন রাজার আমন্ত্রণে নাটোরের রাজবাড়ী বেড়াতে আসেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে আপ্যায়নের জন্য দুজন সুন্দরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার মধ্যে একজনকে তাঁর পছন্দ হয়। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে চাইলে লোকলজ্জার ভয়ে তিনি ভিন্ন নামে লিখতে বলেন।সেই নামটি হচ্ছে বনলতা সেন। উল্লেখিত তিনটি কাহিনিতে অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু কোনো কাহিনির সত্যতাই নিশ্চিত নয়। সবই উড়াধুরা। 

জীবনানন্দ দাশের জীবনীকার গােপালচন্দ্র রায় তাঁর 'জীবনানন্দ' বইয়ে লিখছেন, "একদিন সকালে গেছি! গেলে ঘরে বসিয়ে বললেন আমার 'বনলতা সেন' বইটা সিগনেট প্রেস বার করেছে। এই বলে তিনি আমার হাতে একখানা 'বনলতা সেন' দিয়ে বললেন—কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবই ভাল, কিন্তু কভারের ছবিটি আমার আদৌ পছন্দ হয়নি।

আমি বইটা খুলে দেখছি। সেই সময় তিনি আর একটা 'বনলতা সেন' নিয়ে আমার নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।

আমি বই হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম দাদা, বনলতা সেন কে? আপনি তাে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন। এ নামে সত্যিই আপনার পরিচিত কেউ ছিল নাকি? 

আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। কোনাে উত্তর দিলেন না। 

আমি আবার বললাম-—দাদা, এই রকম আর একটা কবিতা লিখুন। পারবেন না? এবারও তিনি হাসতে লাগলেন। কোনাে কথা বললেন না।"

ঢাকার সন্তান ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও লেখক অশোক মিত্র ২০১০ সালে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, 'এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এলাে; সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, নাকি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনাে জবাব পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন,সে-সমস্ত খবর বেরােত। হয়তাে ১৯৩২ সাল হবে, নয়তাে তার পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহি জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহি থেকে নাটোর তাে একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাকস্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহােত্তর পর্বে অন্য পদবী ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কিনা। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে ঢেকে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।' 

বনলতা সেন কবিতার স্রষ্টার কাছথেকে অশোক মিত্র এমন তথ্য অবহিত হওয়ার পরও কোনো কোনো গবেষক এমন সব তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা রীতিমতো বিভ্রান্তিকর।  

সাবেক সচিব ড. আকবর আলি খান ২০১১ সালে লিখেছেন, 'সরকারী চাকুরি সূত্রে রাজশাহীতে অবস্থানকালে নাটোরের প্রশাসকদের বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রশাসকদের দলিল দন্তাবেজ হতে দেখা যায় যে, এ শতাব্দীর প্রথম দিকে নাটোর শুধু কাঁচাগােল্লা বা জমিদারদের জন্য বিখ্যাত ছিল না, নাটোর ছিল উত্তর বঙ্গের রূপাজীবাদের সবচেয়ে বড়কেন্দ্র। আমার কাছে মনে হয়, নাটোর বনলতা সেনের শুধু ঠিকানা নয়। "নাটোর'' শব্দটির দ্বারা তার পেশা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে দেখলে বনলতা সেন নামটির তাৎপর্যও সহজে বােঝা যায়।সেন পদবী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সে ভদ্রবংশ উদ্ভূত। বনলতা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কোন সাধারণ নাম নয়। তার স্খলনের পর নিজের পরিচয় লুকানাের জন্য সে হয়ত ছদ্মনাম নিয়েছে।

বনলতার এ পরিচয় কবিতাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দ্যোতনা দেয়। এখন আমরা বুঝতে পারি, বনলতা সেন কেন কবিকে "দু দণ্ডের শান্তি'' দিয়েছিল, বুঝতে পারি কেন কবির অভিসার “নিশীথের অন্ধকারে” এবং “দূর অন্ধকারে"। এ পটভূমিতে দেখতে গেলে, “এতদিন কোথায়'' ছিলেন একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। বনলতা সেন যেন বলতে চাচ্ছে যে, সে ইচ্ছে করে রূপাজীবা বৃত্তি গ্রহণ করেনি, তার জীবনে অনেক ঝড়ঝঞা গেছে, সে দুঃসময়ে তার পাশে কেউ ছিল না। "এত দিন কোথায় ছিলেন" একটি সৌজন্যমূলক প্রশ্ন নয়, এ হচ্ছে বিপর্যস্ত নারীত্বের আর্তনাদ। বনলতার পরিচয় পেলেই আমরা বুঝতে পারি কবি কেন কবিতার শেষে বলছেন “সব পাখি ঘরে ফেরে''। বনলতাদের সাথে দুদণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) লাবণ্যপ্রভাদের (স্ত্রীদের) কাছে ফিরে আসতে হয়। বনলতাকে আলােকোজ্জ্বল পৃথিবীতে প্রকাশ্যে পাওয়ার কোন সুযােগ নেই। বনলতার কথা কাউকে বলারও উপায় নেই। বনলতাকে নীরবে নিভৃতে স্মরণ করতে হয় অপরাধবােধ নিয়ে। তাই কবি বলেছেন, থাকে শুধু অন্ধকার, মুখােমুখি বসিবার বনলতা সেন। এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার মানসিক।' 

এত দিন জানতাম, কল্পনা দিয়ে কবিতা লেখা যায়। কল্পনা দিয়ে যে নতুন তথ্য উদঘাটন করা যায়, এটা জানা ছিল না। এও এক নবতর দৃষ্টান্ত।

একজন বনলতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের। জীবনানন্দ দাশের বরাত দিয়ে অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯৩২ বা ১৯৩৩ সালে বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে ছিলেন। ১৯৩৭ সালে রাজশাহী জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তখনকার স্মৃতি নিয়ে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত 'জীবনযৌবন' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, 

'তখনকার বাংলা প্রদেশ ছিল ইংরেজিতে যাকে বলে যবধৎঃ-নৎবধশ যড়ঁংব. হিজলি জেল থেকে একটি মেয়ে আমাকে চিঠি লিখে আমার উপন্যাসের প্রশংসা জানায়।মেয়েটির নাম যতদূর মনে পড়ে বনলতা। আমার উত্তর নিশ্চয়ই সেন্সর করা হবে। খুব সাবধানে লিখি। তাও ইংরেজিতে। এইসব রাজবন্দিনীর প্রতি আমার স্নেহ ও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু সেটা কি প্রকাশ করতে পারি?'

হিজলিতে ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি ডিটেনশন ক্যাম্প। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়। তবে অন্নদাশঙ্কর রায় শুধু 'বনলতা' লেখায় একটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় দুজন বনলতার কথা জানা যায়। একজন বনলতা দাশগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। ১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নামহেমচন্দ্র দাশগুপ্ত ও মাতার নাম নির্মলাসুন্দরী দাশগুপ্ত। স্কুলের ছাত্রী অবস্থাতেই তিনি স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। যোগ দেন বিপ্লবী দলে। ১৯৩০ সালে বেশিরভাগ সদস্যই পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় দলটা ভেঙে যায়। লেখাপড়া ছাড়াও তিনি মােটরগাড়ি ও পিস্তল চালাতে পারতেন। কলেজ হােস্টেলে থাকাকালীন রিভলবার রাখার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতার লালবাজার লকআপে তাঁকে রেখে তিন দিন ধরে অমানুষিক অত্যাচার চালানাে হয়। এরপর প্রেসিডেন্সি জেলের অন্ধকার লকআপে একমাস রেখে দেওয়া হয়। তিনি কিছু দিন হিজলি জেলেও বন্দি ছিলেন। এই বনলতা জীবনানন্দ দাশের আত্মীয় হন নাতো? হলে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জীবনানন্দ দাশের আদি বাড়িতো বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত বিক্রমপুর থেকে বরিশালে নিবাস স্থানান্তরিত করেন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। কিন্তু বংশের অন্যান্যরা বিক্রমপুরে রয়ে যান। জীবনানন্দ তাঁর নাম থেকে গুপ্ত ছেঁটে দিয়ে শুধু দাশ নামে পরিচিত হন। ১৯৩৬ সালের ১ জুলাই বনলতা দাশগুপ্তের মৃত্যু হয়। তাঁকে নিয়ে কি কবিতা লেখা হয়েছে? অবশ্য তাঁর রাজশাহী জেলে থাকার কথা জানা যায় না। ১৯৩৭ সালে বনলতার চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তাহলে তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন কোন বনলতা?


যে বনলতা সেনকে নিয়ে এত কৌতূহল তাঁরও একটা ঠিকুজি পাওয়া যায়। তিনিও ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব। বৃহত্তর ফরিদপুরের কার্তিকপুর গ্রামে ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর জন্ম। (আচ্ছা, কার্তিকপুর কি কেউ চেনেন?) তাঁর পিতার নাম কালীপ্রসন্ন সেন ও মাতার নাম সরােজিনী দেবী। তাঁর পরিবার স্বদেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৩০ সালে তিনি অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৩-৩৫ সালের আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত থাকায় সম্ভবত তিনি কারারুদ্ধ হন। তখন কি তিনি রাজশাহী জেলে ছিলেন? ১৯৩৭ সালে বন্দি মুক্তি আন্দোলন, ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করলে তিনি তাঁর সঙ্গে যােগদেন। ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় মিছিলের পুরােভাগে থাকায় তিনি পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন এবং প্রেসিডেন্সি জেলে তিন বছর কারাবাস করেন। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি অর্থনীতি শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৫ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি অনুশীলন সমিতির কাল থেকে তাঁর সহকর্মী সরােজ কুমার চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যােগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় তিনি রিলিফের কাজ করেন। নানান স্থানে শ্রমিক আন্দোলন এবং মহিলাদের মাঝে কাজ গড়ে তােলার জন্য বিভিন্ন মহিলা সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ হওয়ার কথা জানিয়েছেন অশোক মিত্র। ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এই বনলতা কি অন্নদাশঙ্কর রায়কে চিঠি লিখেছিলেন? 

অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, যা এখন অব্দি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যও, সম্ভবত ফরিদপুরের এই বনলতা সেনকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তার মানে বনলতা সেনের বাড়ি নাটোর নয়। তাতে অবশ্য কিইবা আসে যায়? আমরা যেহেতু জীবনানন্দ দাশের মাধ্যমে বনলতা সেনকে চিনি, তাকে নাটোরের মেয়ে ভাবতেই ভালো লাগে। এই ভালোলাগার কারণে তিনি হয়ে আছেন আমার বা আমাদের প্রিয়তমা নারী। ১০৫ বছর বয়সেও তার মাধুর্য একটুখানি ম্লান হয়নি। বাংলা কবিতা যতদিন পঠিত হবে, ততদিন তার লাবণ্য, তার সৌন্দর্য আর আকর্ষণী ক্ষমতার কোনো কমতি হবে না। বয়স যতই হোক না কেন, তার প্রেমে যুগে যুগে হাবুডুবু খাবেন তাবৎ জীবনানন্দ অনুরাগী। তাই নয় কি?

তথ্যসূত্রঃ

১. জীবনানন্দ দাশঃ জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, আবদুল মান্নান সৈয়দ/আবুল হাসনাত সম্পাদিত, অবসর প্রকাশনা, ২০০৭

২. অশোক মিত্র, বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৪

৩. অন্নদাশঙ্কর রায়, জীবনযৌবন, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩

৪. আকবর আলি খান, পরার্থপরতার অর্থনীতি, ইউনিভার্সিটিপ্রেস লিমিটেড, ২০১৬

৫. আজিজুর রহমান খান, বনলতার সন্ধানে, কালি ও কলম, ২০১৫

৬. উইকিপিডিয়া

সোমবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২১

লন্ডন থেকে জবাব দিয়ে দেওয়ায় ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমিতে। এরপর শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা। মৃত্যুর অপেক্ষা তো আমরা সবাই করি। কিন্তু চিকিৎসকরা যখন অন্তিম কথা জানিয়ে দেন, তারপর তো আর কথা থাকে না। তবুও তো কিছু কথা রয়ে যায়। তাছাড়া অলৌকিক কিছু কি ঘটে না? দেশে ফিরে আসার পর যেভাবে একের পর এক সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, কথা বলছিলেন স্মার্টলি, তাতে মনে হয় নি জীবনবাদী এই ব্যক্তিত্ব এত তাড়াতাড়ি হুট করে চলে যাবেন। এ কারণেই তাঁর এভাবে চলে যাওয়াটা মন মেনে নিতে পারছে না। চেয়েছিলাম, তিনি আরো অনেক অনেক দিন
আমাদের মাঝে থাকুন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি যেভাবে সৃজনশীলতার বাগানে একের পর এক ফুল ফুটিয়ে যাচ্ছিলেন, তাতে আমরা তাঁর পাঠকরা দারুণভাবে আশাবাদী হয়ে ওঠছিলাম। কিন্তু সমস্ত আশার মৃত্যু ঘটিয়ে চলে গেলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। বাংলা ভাষাকে কেতাদুরস্তভাবে কীভাবে পরিবেশন করা যায়, সেটা তো তাঁর কাছেই শিখেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারালাম বাংলা ভাষার একজন শিক্ষককে। এ শূন্যতা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

অবিরাম বৃষ্টি ঝরে যায়


মেঘের 'পরে মেঘ জমেছে,

আঁধার করে আসে,

আমায় কেন বসিয়ে রাখ

একা দ্বারের পাশে৷

এই মুহূর্তে কেন যেন মনের গহিনে উচ্চারিত হতে থাকে রবীন্দ্রনাথ। জীবনের কিছু কিছু মুহূর্ত আসে, যখন মন হয়ে যায় উদাসী মেঘ। কোথায় যে ছুটে চলে, তার নাগাল পাওয়া যায় না। সম্ভবত এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতির খেয়াল। না হলে কেন এমন হয়? বোধকরি বৃষ্টির সঙ্গে মনের একটা গোপন লেনদেন আছে। অঝোরে বৃষ্টি হতে থাকলে মনটা যেন কোথায় হারিয়ে যায়। চারপাশে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। কি যে ঘন, কি যে নিবিড়, কি যে মায়াবী। ভিজিয়ে দিতে থাকে ভিতরটাকে। ধুয়ে যেতে থাকে বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্টগুলো। বারান্দায় একাকী বসে আছি। টবের গাছগুলো বৃষ্টির পানি পেয়ে খুশিতে আটখানা। মনের আনন্দে হেলছে, দুলছে। গানও কি গাইছে? গ্রিলের ফাঁক গলে গায়ে এসে লাগতে থাকে বৃষ্টির ছাঁট। দুষ্টু মেয়ের মতো আমাকে আদরে, ভালোবাসায় ভরিয়ে দিতে থাকে। স্মৃতির আরশিতে উঁকি মারে ফেলে আসা সেই দিনগুলো। 

রিকশায় ঘোরাঘুরি করাটা ছিল আমাদের কাছে পরম আনন্দ। সেদিন ছিল শাওন মাসের সকালবেলা। আকাশ ছিল নির্মেঘ। ঘণ্টা চুক্তিতে রিকশা নেই। সঙ্গে শুচিতা। ঢাকার উপান্ত ছুঁয়ে বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে যাই। আমাদের কোনো গন্তব্য ছিল না। উদ্দেশ্যহীনভাবে চলা। দুই পাশে গ্রামীণ আবহ। ছোট ছোট বাড়িঘর। গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা। কোনো কোনো বাড়ির আঙ্গিনায় টলটলে পুকুর। কত বছর আগের কথা। তখনও কেরানীগঞ্জে উন্নয়নের তেমনভাবে ছোঁয়া লাগেনি। রাজধানীর এত কাছে যে গ্রামীণ পরিবেশ, না এলে বোঝা যেত না। রাস্তা কোথাও কোথাও ভাঙাচুরা। ঝাঁকুনি খেতে হয়। কখনো কখনো রিকশা থেকে নেমে দাঁড়াতে হয়। তারপরও কোনো প্রতিবন্ধকতাই আমাদের উচ্ছ্বাসকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। তখন যে ভালোবাসার গভীর জলে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছিলাম। যা দেখি তা-ই লাগে ভালো। টিনের হোটেলের সস্তা দুধের চা, ঠাণ্ডা শিঙারা কিংবা মাছি পরিবেষ্টিত জিলাপি অমৃত মনে হয়েছে। 

কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ পথিমধ্যে শুরু হয় তুমুল বর্ষণ। যেন আকাশ ভেঙে পড়তে থাকে। এমন বর্ষণের মাঝে রিকশা চালানো একদমই অসম্ভব হয়ে পড়ে। রিকশায়ও বসে থাকাও কঠিন হয়ে যায়। যে কোনো সময়ে উল্টে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশেপাশে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা ছিল না। রিকশা থেকে নেমে একটু ভিতরের দিকে যাই। সামনে একটা গুদাম ঘরের মতো। কিন্তু দরজা-জানলা বন্ধ। আশপাশে বড় বড় গাছপালার ছাউনি। তার নিচে গিয়ে দাঁড়াই। আমরা ভিজে চুরচুর। তবে বৃষ্টির ধাক্কা সামলানোর জন্য বিকল্প আর কিছু ছিল না। চারপাশে শুনশান নীরবতা। কেবল একটানা বেজে চলে উচ্চাঙ্গ সংগীতের মতো বৃষ্টির ধুন। তার সঙ্গে সঙ্গত করে কোলাব্যাঙ। পরিবেশটা বেশ রোমান্টিক। যদিও দুজনেই তখন ঠাণ্ডা হাওয়ায় রীতিমতো কাঁপছি। শুচিতার অবস্থা খুবই কাহিল। তার জন্য মায়া হয়। কী করবো বুঝতে পারছিলাম না। মুখ মোছার জন্য আমার ভেজা রুমালটা বাড়িয়ে দেই। উষ্ণতা দেওয়ার জন্য তার হাত আমার হাতে নিয়ে ঘষতে থাকি। শুচিতার চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে চাপা খুশির আভা। কখন যেন একে অপরের ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট রাখি। আমরা যেন এমন কিছুর অপেক্ষায় ছিলাম। সেটাই ছিল আমাদের প্রথম চুম্বন। বৃষ্টি বেশ নাজেহাল করলেও স্মরণীয় হয়ে আছে রোমাঞ্চকর সেই স্মৃতি।

বৃষ্টি কমলে রিকশার কাছে যাওয়ার সময় যেন মাটি ফুঁড়ে এসে তিনজন লোক আমাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়। উল্টাপাল্টা কথা বলে। ভাবগতিক মোটেও ভালো মনে হয়নি। শুচিতার দিকে এমনভাবে নোংরা চোখে তাকায় মেজাজটা চড়ে যায়। শুচিতা বুঝতে পারে। আমার হাতে চাপ দিয়ে অশান্ত হতে বারণ করে। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করি। তারা শুচিতাকে জড়িয়ে অশালীন কথা বলে। এসব শুনে তার চোখে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। উটকো লোকদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করি। আমার কথা একদমই পাত্তা দেয় না। আমাকে একদিকে, শুচিতাকে অন্যদিকে নিতে সচেষ্ট হয়। ইতোমধ্যে আরও কয়েকজন লোক উপস্থিত হয়। আগের তিনজন বাকিদের বোঝানোর চেষ্টা করে, আমরা খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে এসেছি। পুরো বিষয়টি আমি তাদের অবহিত করি। পরিচয়পত্র বের করে দেখাই। প্রথম তিনজনের আপত্তি সত্ত্বেও অন্যরা আমাদের এভাবে বনে-বাদাড়ে না আসার পরামর্শ দিয়ে চলে যেতে বলেন। বড় ধরনের একটা বিপদ থেকে রক্ষা পাই। 


শুচিতাকে নিয়ে কত কত জায়গায় ঘুরতে গিয়েছি। কত রকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। যা আমার জীবনের পরম সম্পদ হয়ে আছে। একবার বিকেলবেলা বাদামতলী ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে ঘুরতে যাই। দুজনের কেউই সাঁতার জানতাম না। আসলে তখন কোনো ভয়ভীতি আমাদের মধ্যে কাজ করতো না। শুচিতার কোলে মাথা রেখে সূর্যাস্ত দেখেছিলাম। প্রকৃতি যে কত বড় চিত্রকর, তা পলে পলে অনুভব করেছি। আকাশের বুকে মেঘের শিল্পকর্ম চিরকালীন এক ভালো লাগার আবেশ ছড়িয়ে দেয়। মেঘের যে কত বিচিত্র রূপ, কত যে সৌন্দর্য, কত যে মাধুর্য তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছি। অবশ্য শুচিতার নিবিড় সান্নিধ্যের কারণে সবটাই আরো বেশি মনোমুগ্ধকর লেগেছে। সূর্য ডুবে গেলে ঝপ করে অন্ধকার নেমে আসে। মনে হয়েছে গভীর রাত। যাত্রাপথ থেকে আমরা অনেকটাই দূরে চলে যাই। হুট করে বইতে থাকে ঝড়ো হাওয়া। সঙ্গে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। নৌকার উথালপাথাল বুকের মধ্যে কেমন কাঁপন ধরিয়ে দেয়। শুচিতা ভয় পেয়ে যায়। আমার হাত ধরে নির্ভরতা খোঁজে। আমি মোটেও সাহসী নই। তবে ভয় পেলেও সেটা বুঝতে দেইনি। মনে হলো, ইচ্ছে করলে তো মাঝিও আমাদের বিপদে ফেলতে পারতো। কিছুই তো করার ছিল না। ভয় কাটাতে মাঝির সঙ্গে নিরন্তর কথা বলি। ধীরে ধীরে নৌকা বয়ে যায়। নদীর দুই পাশে আলোর মালা দেখে সাহস ফিরে পাই। ক্রমান্বয়ে দৃশ্যমান হয় অদ্ভুত এক মায়াবী জগত। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে যাত্রা করলে যে এমন দৃশ্যপট দেখা যায়, সেই অভিজ্ঞতা প্রথম হয়। নদীর পানিতে তখন ঢেউ হয়ে দুলছিল আলোছায়ার প্রতিফলন। উভয় পাড়ে ঝিকিমিকি আলোর নাচন। ঘাটে ফিরে আসার পর স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ি। প্রাণের স্পন্দন দেখে বুঝতে পারি, সবে সন্ধ্যা নামছে মৃদু মন্থরে।


বর্ষাকালেই আমরা বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করি। আমাদের বিয়ে তো আর যেমন-তেমনভাবে হতে পারে না। নারায়ণগঞ্জের পাগলায় মেরি অ্যান্ডারসনের একটি স্পিডবোটে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত হয়। তখন ছোটখাট চাকরি করি। যে কারণে শুচিতার অভিভাবকরা আমার সঙ্গে তাদের মেয়ের বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেনি। তাই বলে কি আমাদের ভালোবাসা মিথ্যে হয়ে যাবে? বাধ্য হয়ে আমরা নিজেরাই বিয়ের আয়োজন করি। বিয়ের আয়োজনের দায়িত্ব নেয় ঘনিষ্ঠ তিনজন বন্ধু। শুচিতা তার দুই বান্ধবীকে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে চলে আসবে। পাগলায় যাওয়ার পথে দেখতে পাই আকাশের মন খারাপ। কালো মেঘে ছেয়ে যায় চারপাশ। তারপর শুরু হয়ে যায় তুমুল বৃষ্টি। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে গন্তব্যে পৌঁছে যাই। আমার বন্ধুরাও বিয়ে পড়ানোর কাজী নিয়ে হাজির। সঙ্গে স্পিডবোট সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ। শুচিতা তখনও এসে পৌঁছতে পারেনি। ধরে নেই, বৃষ্টির কারণে আসতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে ফোনে শুচিতার সঙ্গে যোগাযোগও করা যাচ্ছিল না। কেমন টেনশন হতে থাকে। অবিরাম ধারায় ঝরতে থাকে বৃষ্টি। থামাথামির কোনও লক্ষ্মণই নেই। বয়ে যায় সময়। আমরা অপেক্ষায় থাকি। সেই অপেক্ষা যেন কিছুতেই ফুরাতেই চায় না। 

অ্যাই কী এমন ধ্যান করছো? কফি নেও। স্ত্রীর ঝাঁজালো কণ্ঠে বাস্তবে ফিরে আসতে হয়। তখনও বৃষ্টি ঝরতেই থাকে।

বনলতা সেনের অপেক্ষায়

কেমন আছে বনলতা সেন? কোথায় আছে? কত দিন ধরে খুঁজে চলেছি তারে। কিন্তু তার দেখাই মেলে না। দেখা না মেলাটা লেখা বোধকরি ঠিক হলো না। চলার পথে হয়তো কোথাও না কোথাও তার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। কাছে কিংবা দূরে। কর্মক্ষেত্রে, রেস্তোরাঁয়, সিনেপ্লেক্সে কিংবা অন্যত্র। এমনকি হতে পারে ফেসবুকের আড়াল থেকে হাসছে দুষ্টু দুষ্টু। কিংবা এমনও তো হতে পারে, দেখা হলেও তারে চিনতে পারছি না। চেনা কি সম্ভব? তার পরিপূর্ণ অবয়ব দেখা কিংবা তারে সামগ্রিকভাবে আজ অব্দি জানা হয়নি। জানবো কীভাবে? তার অন্ধকার বিদিশার নিশার মতো চুল, শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মতো মুখ ও পাখির নীড়ের মতো চোখটুকুই সম্বল। আর তার নিবাস নাটোর। এছাড়া তার আর কিছুই তো জানি না। চিনি না। এতটুকু দিয়ে কি এ মহাপৃথিবীতে তারে খুঁজে পাওয়া সম্ভব? তারপরও অন্বেষণ একদমই থেমে নেই। তবে ভরসা একটাই, বনলতা সেন তো একজনাই। তারে চিনে নিতে তো খুব একটা কষ্ট হওয়ার কথা নয়। এ কারণে নিরন্তর তারে খুঁজে চলেছি। তার প্রতি যে অনুভব, যে অনুরাগ, যে অনুভূতি তা তো একটুও ঠুনকো নয়। সেই কবে হৃদয়মন্দিরে তারে স্থান দিয়েছি। কখনও ভুলতে পারিনি। অকর্র্ষিত হৃদাকাশে যে চিরস্থায়ী ছাপ সে রেখেছে, তারে কি আর ভুলে যাওয়া সম্ভব? আমার মতো নাজুক মনের হলে তো প্রশ্নই আসে না। 

বনলতার সঙ্গে সম্পর্কটা হয়ে ওঠেছে ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়’-এর মতো। আমি কিন্তু অবিকল জীবনানন্দ দাশের কল্পনার বনলতা সেনকে খুঁজছি না। এ সময়ে তো আর সেই সময়ের বনলতা সেনকে পাওয়া যাবে না। সময় কত বদলে গেছে। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। পরিবর্তিত হয়েছে চেহারাছবিও। ‘তোমার মুখের মতন অবিকল’ কি আর পাওয়া যাবে? তার সঙ্গে অবশ্যই সাদৃশ্য থাকতে পারে। মনে, মননে, মেজাজে। নাহলে আর তারে খুঁজবো কেন? প্রশ্ন হতে পারে, কেমন ছিল তার মন? কেমন ছিল তার মনন? কেমন ছিল তার মেজাজ? তা তো আর স্পষ্ট করে জানা যায় না। যখন লেখা হয়, ‘আমারে দুদ- শান্তি দিয়েছিল’, তখন কিছুটা হলেও তারে বুঝতে পারা যায়। শান্তি কি আর সবাই দিতে পারে? লাবণ্য দাশ তো পারেনি। বনলতা যখন পেরেছে, বুঝতে পারা যায়, সে সময়ের প্রেক্ষাপটে সে মায়াবী এক নারী, যার অন্তঃকরণ কোমল, স্বভাব নম্র ও সহানুভূতিশীল অন্তর। কিন্তু আমি খুঁজে চলেছি একান্তই আমার বনলতা সেনকে। ‘যে আমাকে চিরদিন ভালোবেসেছে/অথচ যার মুখ আমি কোনো দিন দেখিনি/সেই নারীর মতো’। কেউ কি আমাকে নীরবে ভালোবেসেছে? সে কি বনলতা সেনের মতো? এটি তো অবিশ্বাস্য। যে আমাকে দেখেনি, সে কীভাবে আমাকে ভালোবাসবে? আমি তো আর জীবনানন্দ দাশ নই। বরং একটু ঘুরিয়ে বলা যেতে পারে, ‘যে আমি চিরদিন ভালোবেসেছি/অথচ যার মুখ আমি কোনো দিন দেখিনি/সেই নারীর মতো’। 

বনলতা সেন তো আমার কাছে হয়ে আছে আধেক শরীরী, আধেক অশরীরী। তারে তো আর অবিকল পাওয়া সম্ভব নয়। তার আবছায়া আদলের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটিয়ে চলেছি লাগামহীন কল্পনার। কল্পনা ছাড়া তো তারে পূর্ণাবয়ব দেওয়া সম্ভব নয়। চিত্রকর যেভাবে কল্পনা আর তুলির সংমিশ্রণে ফুটিয়ে তোলেন কোনো চিত্রপট, তেমনিভাবে কল্পনার তুলি দিয়ে একটু একটু করে গড়ে তুলি এই প্রিয়মুখ। আবার মুছেও যায় সেই অবয়ব। যেমনটি চাই, তা যেন অধরা রয়ে যায়। তারে যেন বাস্তবে পাওয়া যায় না। জীবনানন্দ দাশ অন্য এক কবিতায় যেমনটি লিখেছেন, ‘ডালিম ফুলের মতো ঠোঁট যার রাঙা, আপেলের মতো লাল যার গাল/চুল যার শাঙনের মেঘ, আর আঁখি গোধূলির মতো গোলাপী রঙিন/আমি দেখিয়াছি তারে ঘুমপথে, স্বপ্নে কত দিন’। বনলতা সেনকে কি এমনভাবে কল্পনা করা যায়? অবশ্য স্বপ্নে দেখা আর বাস্তবে দেখার মধ্যে তো ঢের ঢের তারতম্য। কল্পনায় কতভাবেই না ধরা দেয় বনলতা সেন। কবি ও দার্শনিক ওমর খৈয়াম প্রিয়ার চিবুকের একটি কালো তিলের বিনিময়ে দুই নগর সমরখন্দ আর বোখারা লিখে দিতে চেয়েছিলেন। তেমন একটি তিল বনলতার চিবুকে শোভা পেলে কেমন লাগবে? লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমনটি চেয়েছেন, ‘বেদনা মাধুর্যে গড়া তোমার শরীর’, তেমনটিও তো হতে পারে।   


এ সময়ে যে বনলতা সেনকে খুঁজছি, তারে তো অতীতের অবয়বে পাওয়া যাবে না। সে কর্মজীবী কিংবা গৃহিণী হতে পারে। হতে পারে ড্যাম স্মার্ট কিংবা একান্তই ঘরোয়া এক নারী। হতে পারে ‘পৃথিবীর রাঙা রাজকন্যাদের মতো’ কেউ। তার পরনে থাকতে পারে শাড়ি, সালোয়ার কামিজ, কুর্তি, স্কার্ফ কিংবা শার্ট-প্যান্ট। তার বিখ্যাত চোখ হয়তো ঢাকা পড়ে গেছে দামি ব্রান্ডের সানগ্লাসে। মেকআপের আড়ালে অচেনা হয়ে গেছে মুখ। চুলের ফ্যাশনেও পরিবর্তন আসতে পারে। দেখা না হলে তো নিশ্চিত করে বলতে পারছি না, কী রূপে তারে দেখতে পাওয়া যাবে? এমনও তো হতে পারে, সে আমার চেনা এক নারী। যেভাবেই দেখা হোক না কেন, আমি তো অপেক্ষায় আছি পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে কবে আমাকে বলবে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ বলবে কিনা কে জানে? যদি না বলে তখন কী আর করা যাবে, আমাকেই হয়তো বলতে হতে পারে। কিংবা কিছু তো নাও বলে চুপচাপ থাকতে পারি। আবার জীবনানন্দ দাশের মতো বদলে যেতে পারেন মন, ‘সুজাতাকে ভালোবাসতাম আমি/এখনও কি ভালোবাসি?’ 

কী এক দ্বিধা নিয়ে অপেক্ষায় থাকি তার।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

যার কবিতার অপেক্ষায় থাকতে হয়



তিনি কবি। কিন্তু তার নতুন কবিতা দেখা যায় কালেভদ্রে। বিরলপ্রজ লেখকদের একজন তিনি। অথচ তার কবিতার জন্য অপেক্ষায় থাকেন কত কত পাঠক। প্রসঙ্গ ভিন্ন হলেও কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতার মতো করে বলা যায়, ‘একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে লক্ষ লক্ষ উম্মক্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে’। কিন্তু তা নিয়ে তার কোনো উৎসাহ নেই! উত্তেজনা নেই! আগ্রহও নেই! নির্লিপ্ত ধ্যানীর মতো উপেক্ষা করেন সব কৌতূহল। আপাতদৃষ্টিতে শান্তসুবোধ মনে হলেও জীবন যাপনের ব্যাপারে তিনি কিন্তু ভীষণ অসংযমী ও অমিতব্যয়ী। জীবনটাকে খোলামকুচির মতো উড়িয়ে দিলেও কবিতা লেখার ব্যাপারে তিনি অসম্ভব সংযমী।

শব্দ ব্যবহার করেন মিতব্যয়ীর মতো। জীবনের আনন্দ-বেদনা ছেঁকে নির্মাণ করেন এক একটি কবিতা। পাঁচ দশকেরও বেশি কাব্যজীবনে সত্যিকার অর্থে একটিই তার কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। এরপর পেরিয়ে এসেছেন ৩৩ বছর। তারপর তিনি আর কবিতায় আগুন জ্বালাতে আগ্রহী হননি। অবশ্য তাঁর ‘কবিতা একাত্তর’ এবং ‘এক জীবনের জন্মজখম’কে পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ বলা যায় কিনা সেটা নিয়ে ঢের ঢের সংশয় রয়েছে। তাতে নতুন কবিতার সংখ্যা একদমই হাতেগোনা। তিনি নিজেও সংকলন দুটিকে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে নাকচ করে দিয়েছেন।

খুব বেশি না লিখলেও তার কবিতা লেখা কিন্তু থেমে নেই। কারণ, তার ‘মনে ও মগজে গুন গুন করে/প্রণয়ের মৌমাছি’। কাগজে যতটা না লেখেন, তারচেয়ে বেশি লেখেন হৃদয়ের চিরকুটে। মাঝে-মধ্যে রঙধনুর মতো টুকরো টুকরো লেখা কবিতার আকাশকে রাঙিয়ে দিলেও অপ্রকাশিত থেকে যায় অধিকাংশই। তবে তাঁর প্রতিটি কবিতাই সৌরভ ছড়িয়ে দেয় দুর্লভ কস্তুরীর ঘ্রাণের মতো। তার কবিতায় আগুন আছে। ভালোবাসা আছে। আছে বিরহকাতরতা। কবি মাত্রই কল্পনাবিলাসী। সেটি তো সাধারণত লেখালেখির ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়।

কিন্তু তার মতো কল্পনা-রঙিন জীবন যাপন কাউকে করতে দেখি নি। অনেকটা যাপন করেছেন ‘প্লেবয় জীবন’। তিনি হয়ে উঠেন কত কত নারীর জীবনের মনসিজ। বেহিসেবি সেই জীবনে আনন্দ, ফুর্তি ও ভালোবাসার কমতি ছিল না। অবশ্য বেদনাও ছিল বৈকি। অর্থনৈতিক কারণে অন্যের ওপরও নির্ভরশীল হতে হয়েছে। সেটিও বোধকরি স্বেচ্ছাক্রমে। তবে এমন বর্ণিল জীবন যাপন করার জন্য অনেকেরই স্বপ্ন থাকে, কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভবপর হয় উঠে না। এরজন্য যে জিগর লাগে, যে হিম্মত লাগে, যে অদম্য মানসিক শক্তি লাগে, সেটা দেখানোর বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।

আশির দশকে তাকে প্রথম দেখি। তার কর্মক্ষেত্র ছিল সেগুনবাগিচায় দৈনিক দেশ পত্রিকা। কী কারণে যেন সেই পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলাম। সেদিন প্রথম দেখা হলেও তার সঙ্গে কথা হয় নি। শারীরিক কাঠামোয় তাকে দেখতে অনেকটা ভিয়েতনামের বিপ্লবী নেতা হো চি মিনের মতো লেগেছিল। সব  মিলিয়ে তাকে মনে হয়েছিল একজন আধুনিক বাউল কবি। তখনও তিনি গ্রন্থবিহীন কবি। ইতি-উতি কবিতা লিখলেও গ্রন্থ প্রকাশের কোনো তাগিদ অনুভব করেন নি। গ্রন্থ প্রকাশিত না হলেও কবি হিসেবে সুখ্যাতি ও সমাদরের ক্ষেত্রে কোনো খামতি ছিল না। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার কবিতাগ্রন্থ। একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেই বাজিমাত করে দেন। হয়ে ওঠেন বাংলা কবিতার রোমান্টিক রাজকুমার। সে সময় পাঠকদের সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ না থাকলেও তার কবিতা পৌঁছে যায় তরুণ প্রজন্মের হৃদ মন্দিরে।

তখন তিনি ছিলেন আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের মতো। অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও সচরাচর তার দেখা পাওয়া যেত না। যে কারণে তাকে নিয়ে সৃষ্টি হয় একটা প্রহেলিকা। তাতে করে তার প্রতি আকর্ষণ আরো বেড়েছে। ১৯৮৯ সালের মার্চে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য হওয়ার পর তার সঙ্গে নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ হতে থাকে। তিনি যেন ক্লাবের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে ওঠেন। সেই থেকেই তাকে একই রকম দেখে আসছি। ধীর পদক্ষেপে ক্লাবে আসেন। কাঁধে ঝুলানো কাপড়ের ব্যাগ। নিরিবিলি বসার আসন খুঁজে নিয়ে কাঁধের ব্যাগটি যত্মসহকারে নামিয়ে রাখেন। তারপর বেসিনে হাতমুখ ধুয়ে ধীরেসুস্থে খাবারের অর্ডার দেন।

কথা বলেন গুছিয়ে এবং স্পষ্টভাবে। সবকিছুর মধ্যে থাকে একটা কাব্যিকতা, ছন্দবদ্ধতা ও পরিমিতিবোধ। প্রাতরাশ কিংবা মধ্যাহ্নের ভোজন শেষে সিঁড়ি বেয়ে চলে যেতেন দোতলার কার্ডরুমে। সেখানেই বিনিয়োগ করেন তাঁর অধিকাংশ সময়। এখন যেখানে ক্যান্টিন, সেটি ছিল টিভি রুম। টেলিভিশনের নিয়মিত দর্শক ছিলেন। লাইব্রেরিতেও তাঁকে হরহামেশা দেখা যায়। তাঁর এ রুটিনের খুব একটা ব্যত্যয় হতো না।


এখন অবশ্য তাতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। চোখে ভারী চশমা। অত্যল্প কেশরাশি। চলাফেরার গতি আরো মন্থর হয়েছে। বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেন তিন তলার কম্পিউটার রুমে। কবিতাকে কেন্দ্র করে ভার্চুয়াল জগতে তার যে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, সেখানেই তিনি সময় দেন। কখনো-সখনো ফেসবুকে উপহার দেন হিরের টুকরোর মতো এক একটি পঙ্ক্তি। অপার্থিব ভুবন নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকতেই এখন তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। একটা সময় নিভৃতচারী যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, সেখান থেকেই প্রকাশ্য হওয়ার পর ভক্ত-অনুরাগীরা প্রায়শই তাকে ঘিরে রাখেন। সেলফি কিংবা ছবি তোলার জন্য তাঁকে সময় দিতে হয়।

আর কোনো কবির সঙ্গে কি এত এত সেলফি তোলা হয়েছে? কারও কোনো আবদারই তিনি ফেলতে পারেন না। অবশ্য ভালোবাসার বায়না কীভাবেই দূরে ঠেলে দেবেন? এখন অবশ্য শরীরটা ভালো যায় না। প্রায়ই বেগড়বাই করে। এ কারণে অনেক বেশি শ্লথ হয়ে গেছেন। তবে জেল্লা এসেছে জীবনযাপনে। পরনে রঙদার পোশাক-আশাক। গলায় রুদ্রাক্ষমালা। হাতে ব্রেসলেট। সবটাই বান্ধবীদের পছন্দে ও পরামর্শে। অবশ্য বরাবরই তিনি উজ্জ্বল-উচ্ছল থাকতে ভালোবাসেন।

বুকের মধ্যে যেভাবে ভালোবাসা লালন করেন, তেমন প্রেমিক কেইবা হতে পেরেছে?

উষ্টা মেরে চলে যাওয়া প্রেমিকাকে যখন বলেন ‘বসো না লক্ষীটি/ক্ষমার রুমালে মুছে সজীব ক্ষতেই/এন্টিসেপটিক দুটো চুমু দিয়ে দেই’ কিংবা সব শুভ্রতা দেওয়ার অঙ্গীকার করে যখন ঘোষণা দেন, ‘আমি নিপুণ ব্লটিং পেপার/সব কালিমা, সকল ব্যথা ক্ষত শুষেই নেবো’-এমন সংবেদন কে হতে পেরেছেন? এক জীবনের সব হাহাকার বুকে নিয়েও তিনি অভিশাপ দেন, ‘তুমি সুখী হবে, খুব সুখী হবে’। এমনকি ভালোবেসে নীলকণ্ঠ হতেও তাঁর কোনো আপত্তি নেই, ‘মন না দিলে/ছোবল দিও তুলে বিষের ফণা।’ কিছু দেওয়ার বেলায়ও তার কোনো কার্পণ্য নেই, ‘কতোটুকু দিলে বলো মনে হবে দিয়েছি তোমায়/আপাতত তাই নাও যতোটুকু তোমাকে মানায়।’ কবিতায় এমনভাবে নিজেকে নিবেদন করার সক্ষমতা কজনই বা দেখাতে পেরেছেন? এ কারণেই তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা।


অকৃতদার জীবনে তাঁর ‘সংসার হলো না, সন্ন্যাস হলো না’। অনিকেত জীবনে বলতে গেলে জাতীয় প্রেস ক্লাবই তাঁর গৃহ, তার সংসার। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই লেখা প্রেস ক্লাব চত্বরে। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থের জন্য অনেক দিন যাবৎ তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। মনস্থির করতে না পারায় ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রসবের বেদনা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। মূলত এক ধরনের নার্সিসাস কমপ্লেক্সের কারণে প্রকৃতঅর্থে এখন অব্দি তাঁর একটির বেশি কাব্যগ্রন্থ হলো না। প্রথম কাব্যগ্রন্থের তুমুল জনপ্রিয়তা এবং সেই কবিতাগুলোর প্রতি নিজের মুগ্ধতার কারণে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করতে অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে।

অবশ্য আর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত না হলেও তাতে তাঁর খুব বেশি আসে যায় না। কত বিখ্যাত কবিই তো এক জীবনে কত কত কবিতা লিখেছেন। কিন্তু কজন কবি পাঠকদের কাছে এমন বিপুলভাবে সমাদৃত হতে পেরেছেন? কিন্তু অল্প কবিতা লিখলেও তাঁর অধিকাংশ কবিতাই পাঠকনন্দিত। কবিতাগুলোয় আছে কালজয়ী হয়ে থাকার উপাদান। বেদনা আর ভালোবাসায় মাখামাখি হয়ে তা দীর্ঘকাল উজ্জ্বলতা ছড়াবে। তাঁর কবিতার মতো, ‘আগামী, তোমার হাতে/আমার কবিতা যেন/থাকে দুধে ভাতে।’

শুভ জন্মদিন কবি ও প্রেমিক হেলাল হাফিজ।


৭ অক্টোবর ২০১৯

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২১

পদ্মা নদীতে তোলা সেলফি

 

দোস্ত, মেয়েটা কে রে?

মেয়েটা কে রে মানে!

এমন ভাব করছিস যেন কিছুই জানিস না।

কি যে বাজে বকিস না।

এখন আর সাধু সেজে কী হবে বন্ধু? সারা দুনিয়া তো জাইনা গেছে। আর তোর মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, যেন এইমাত্র জানলি। তোর এই ভাজা মাছ উল্টে খেতে না পারার স্বভাবটা গেল না।

এমনিতেই আজ ঘুমাতে দেরি হয়ে গেছে। দেরি হলে সহজে ঘুম আসতে চায় না। আর এই অসময়ে হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুর ফোন। তার ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে, অনর্থক গ্যাঁজানোই ওর উদ্দেশ্য। থাকে লন্ডনে। ওর ওখানে এখন সন্ধ্যা। অনেক দিন পর ফোন করেছে। ভদ্রতার খাতিরে তাকে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না।

তাই বিরক্তি চেপে রেখে বললাম, দোস্ত, কী মনে করে এত দিন পর ফোন করলি?

করলাম এই কারণে যে মেয়েটাকে তুই কিস করেছিস, সে কে? মেয়েটার সঙ্গে সম্পর্কটা কি এখনও আছে?

খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, বয়স হয়েছে। তবুও তোর উল্টাপাল্টা স্বভাব আজও বদলালো না।

খানিকটা রেগে গিয়ে বন্ধু পাল্টা জবাবে বললো, আমি না হয় উল্টোসিধা কথা বলি। আর তুই তো এই বয়সে স্ফূর্তি মেরে যাচ্ছিস। মজা তো ভালোই নিচ্ছিস। আর দোষ হলো আমার স্বভাবের!

মেজাজটা বেশ খারাপ হয়ে যায়। অথচ জোরেও কথা বলতে পারছি না। পাশের বিছানায় স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। আমি সোফায় বসে কথা বলছিলাম। তাছাড়া যে বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছে, তা তার কানে গেলে ঘুমের বারোটা বেজে যাবে। তাই নিজেকে সংযত করে বললাম, এই মধ্যরাতে কি আবোল-তাবোল বকছিস? তুই শালা বারে বসে নিশ্চয়ই মাল টানছিস। আর কাউকে না পেয়ে এখন আমাকে নিয়ে মজা মারছিস।

দোস্ত, মজা মারার সুযোগ তো তুমিই কইরা দিছ। খামোখা আমারে দোষারোপ করতাছো ক্যান?

অনুচ্চ কণ্ঠে বললাম, ভেবেছিলাম, এত রাতে যখন ফোন করেছিস, নিশ্চয়ই জরুরি আলাপ আছে। তুই যে এখন গাঁজাখুরি গল্প নিয়ে ফালতু বকবকানি করবি, সেটা তো বুঝতে পারিনি। দোস্ত, আমি এখন ঘুমাতে যাবো। আরেক দিন সময় নিয়ে কথা বলবো। এখন তাহলে রাখি। কিছু মনে করিস না।

ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার বইলা যা, মাইয়াটা কে?

কি যে বলিস না, এই রাতদুপুরে মাইয়া এলো কোথা থেকে?

জাস্ট আ মোমেন্ট স্যার। এই বলে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছবি পাঠায়। ছবিটি দেখার পর আমার সারা শরীরে যেন রীতিমতো ভূমিকম্প হয়ে যায়। দিশেহারা লাগতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে উদ্বিগ্ন হয়ে নিম্ন স্বরে তোয়াজের ভঙ্গিতে বন্ধুকে বললাম, দোস্ত, এই ছবি তুই পাইলি কই?

বন্ধু বললো, এখন তো ঠিকই লাইনে আইছো। এই ছবি তো পাইতে হয় না। সবার কাছেই পৌঁছে যাচ্ছে।

কী যে বলিস না। যার কোনও মাথামুণ্ডু নেই। এই ছবি সবার কাছে পৌঁছবে কীভাবে?

এখন তো সবার কাছে পৌঁছনোর সহজ উপায় একটাই।এই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হইছে। আমি ভেবেছি, তুই জানোস কিংবা তুই হয়তো দিছোস। আমার দোস্ত ভাইরাল হইছে, সেই খুশিতে তো তোরে ফোন দিলাম।

তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে বন্ধু, এই ছবি আমি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিতে যাবো কোন দুঃখে। এই ছবি তো আমি নিজেই এই প্রথম দেখলাম। তুই না দিলে তো জানতে পারতাম না।

কস কি? তারমানে এই ছবি কি অরজিনাল না? তবে কি সফটওয়্যার দিয়ে জোড়া লাগানো হয়েছে? এখন তো এসব অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ছবিটা দেখলে মনে হয় রিয়েল। বেশ কিছু দিন আগের ছবি মনে হচ্ছে। সবাই হয়তো নাও চিনতে পারে। কাছের মানুষদের চিনতে খুব একটা সমস্যা হবে না। দোস্ত, কিছু একটা গড়বড় তো আছে। নইলে এই ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আইলো ক্যামনে? তোকে নিয়ে কে এমন করলো? তুই কি কিছু আঁচ করতে পারছোস?

বন্ধুর প্রশ্নে নিরুত্তর থাকা ছাড়া সে মুহূর্তে কিছু করার ছিল না।

চলমান লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে সায়ন্তনীকে গভীরভাবে কিস করছি। পিছনে বিস্তৃত নদী আর গ্রামীণ দৃশ্যপট। কোন এক রোমান্টিক সিনেমার মেজাজটাকে অনুকরণ করার চেষ্টা যে আছে, তা বোঝা যায়। যদিও সেলফিতে তেমনটা ফুটে উঠেনি, তারপরও ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছে। দুজনের চোখ আবেশে বোজা থাকলেও কাউকে চিনতে তেমন একটা সমস্যা হচ্ছে না। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, যেন সেই সময়টা বাস্তবে ফিরে এসেছে। ফিরে এসেছে সেই আবেশ। সেই আবেগ। সেই অনুভূতি।

সায়ন্তনীর সঙ্গে সম্পর্কটা গভীর হওয়ার পর আমরা হালবিহীন নৌকার মতো ভেসেছি। আমাদের নির্দিষ্ট কোনও গন্তব্য ছিল না। কখনও উত্তর। কখনও দক্ষিণ। কখনও পূর্ব। কখনও পশ্চিম। সময়টাও ঘড়ির কাঁটায় বাধা ছিল না। কখনও সকাল। কখনও দুপুর। কখনও রাত। ইচ্ছের ঘোড়ায় চড়ে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে যাই। স্থলেই বেশি। মাঝে মধ্যে জলে। অন্তরীক্ষে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও কার্যকর করার সুযোগ হয়নি।

তারমানে এই নয় যে, আমাদের কোনও পারিবারিক, সামাজিক, সাংসারিক বন্ধন ছিল না। আমাদের দুজনেরই সংসার আছে। সন্তান আছে। পরিবার আছে। চাকরি আছে। দায়িত্ব আছে। দায়িত্ববোধ আছে। সব কিছুই ম্যানেজ করতে হয়েছে। সায়ন্তনীকে তার সংসারের সব কাজ-কর্ম একহাতে সামাল দিতে হয়েছে। আমাকেও নিয়মিত অফিসে যেতে হয়েছে। তারপরও কীভাবে দুজনের পক্ষে যখন-তখন উড়াল দেওয়া সম্ভব হয়েছে?

আসলে ভালোবাসার সম্পর্ক এমন এক ম্যাজিক, তা যদি দুজনের বুকের মধ্যে থাকে, তাহলে কোনও কিছুই অসম্ভব হয় না। সব কিছু যেন জাদুর মতো হয়ে যায়। কোনও কিছুই দমিয়ে রাখতে পারে না। আমাদের মধ্যে ম্যাজিকটা পুরো মাত্রায় ছিল। আর খামখেয়ালিপনার দিক দিয়ে সায়ন্তনী তো মাষ্টারপিস। এই জিনিষ দ্বিতীয়টি দেখা যায় না। এমনিতেই নাচুনি বুড়ি, তার ওপর ঢোলের বাড়ি পড়লে তো কথাই নেই। ঢোলের বাড়ি দিতে তো আমারও জুড়ি নেই। কথায় আছে না, রতনে রতন চিনে। আমাদের দুজনেরই সেই অবস্থা।

এরফলে অবশ্য মনে হতেই পারে, পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী৷ চলতি হাওয়ার পন্থী হলেও পথ কিন্তু কখনোই সুগম ছিল না। নানান রকম প্রতিবন্ধকতা আমাদের আটকে দিতে চেয়েছে। দমিয়ে দিতে চেয়েছে। সেটা যেভাবেই হোক ম্যানেজ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু খামখেয়ালি কোনও মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হলে তারচেয়ে সুখী আর কেউ নেই। আবার তারচেয়েও দুঃখীও কেউ নেই। আনন্দের পাশাপাশি জীবন তেজপাতা হতেও বেশি সময় সময় লাগে না। সায়ন্তনীর মধ্যে আছে বিপরীতমুখী দুই গুণের সমাহার। এই রোদ, এই বৃষ্টি। কখন যে কী মুড ধারণ করবে, তা বিধাতার পক্ষেও বোঝা মুশকিল।

আর আমি তো বিধাতার সৃষ্টি সামান্য একজন মানুষ। তারপরও যে সায়ন্তনীর মন-মেজাজের সঙ্গে দিনের পর দিন তাল মিলিয়ে চলেছি, সেটাকে মোটেও হালকা করে দেখার অবকাশ নেই। বুঝতে হবে আমার ধৈর্য, নিষ্ঠা, আন্তরিকতার কোনও খামতি ছিল না। না হলে তার মতো উড়নচণ্ডী একটা মেয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হতো না।

সায়ন্তনীর মেজাজ-মর্জি ভালো থাকলে আমরা প্রায় দিনই এলোমেলোভাবে কোথাও না কোথাও ছুট লাগাতাম। সেদিন আমরা সিএনজি রিজার্ভ করে পদ্মা নদী দেখার সিদ্ধান্ত নেই। আমাদের ভালোবাসা ছিল পদ্মা নদীর মতো বিস্তৃত। আর নদীর কাছে গেলে তো মনটা বড় হয়ে যায়। তখন পর্যন্ত পদ্মা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা হলেও কোনও কর্মযজ্ঞ শুরু হয়নি। সেখানে দেখার মতোও খুব একটা আকর্ষক কিছু ছিল না। তবে নদী মানেই তো ছন্দিত প্রাকৃতিক জলধারা। তার নৈসর্গিক আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনও তুলনা চলে না। আর পদ্মা নদী তার উদ্দামতা, তার উচ্ছ্বলতা, তার উচ্ছৃঙ্খলতা নিয়ে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। নদীর সান্নিধ্যে যাওয়াটাও কম আকর্ষণীয় ছিল না। পদ্মা নদীর তাজা ইলিশ দিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়া ছিল আমাদের অন্যতম একটি লক্ষ্য।


মাওয়া ঘাটে পৌঁছে দেখতে পাওয়া যায় কল্ললিত জনপদকে। বেশ জমজমাট। এই ঘাট দিয়ে অনেক লোক যাতায়াত করছে। ফেরি ছাড়াও লঞ্চ, স্পিডবোট, নৌকায় চলাচল করা যায়। নানান পেশার মানুষের আনাগোনা। আমরাও তাদের সঙ্গে মিশে যাই। মাথার মধ্যে ঘূর্ণিপোকা। পরিণাম নিয়ে কোনও ভাবাভাবি নেই। অকারণেই স্পিডবোটে মাদারীপুরে রওয়ানা হই। সাঁতার না জেনেও আমরা উত্তাল নদী পাড়ি দেই। নদীর স্পর্ধিত ঢেউ এসে আমাদের ভিজিয়ে দিতে থাকে। তাতে পাওয়া যায় ভালো লাগার অনুভূতি। কিন্তু স্পিডবোট উথালপাথাল করতে থাকলে বুকের ভিতর ভীতির সঞ্চার হয়। আমি ভয়ে সায়ন্তনীর হাত দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরি। তার কোনও হেলদোল নেই। ঢেউয়ের মতো উপচে পড়ে মুখভর্তি দুষ্টু দুষ্টু হাসি। পুরো বিষয়টি তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকে। যেন এমনভাবে নিয়মিত চলাচল করতে সে অভ্যস্ত। বরং আমাকে সে ভয় দেখানোর চেষ্টা করে।

আমি ভয় পেয়ে ফেরার সময় মন্থর গতির লঞ্চে ফিরি। সে সময় আমরা খুব মজা করি। নানান ভঙ্গিমায় সায়ন্তনীর কত যে ছবি তুলেছি। সমানতালে সেলফিও। তখনই দুজনের কিস করাসহ অন্তরঙ্গ কিছু ছবি তোলা হয়। আমাদের ঘনিষ্ঠতা দেখে লঞ্চযাত্রী গ্রামের মহিলারা সায়ন্তনীর কাছে জানতে চায়, আমরা স্বামী-স্ত্রী কিনা। সে এমনভাবে মাথা দোলায়, তাতে তারা কে কী বুঝেছেন, তারাই জানেন। আমি কিছু বুঝতে পারিনি।


মাওয়া ঘাটে ছিল সারি সারি খাবারের দোকান। রান্না করা ইলিশ মাছের ঘ্রাণ আমাদের প্রলুব্ধ করতে থাকে। প্রতিটি দোকানেই নানান পদের ইলিশের আইটেম। সঙ্গে নানান রকম ভর্তা। দোকানদাররা তাদের রান্নার ফিরিস্তি দিয়ে ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে থাকে। আমরা দ্বিধা-দ্বন্দে পড়ে যাই। সায়ন্তনীর সিদ্ধান্তে আমরা একটা রেস্তোরাঁ বেছে নেই। সিএনজির ড্রাইভারকেও ডেকে আমাদের সঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করাই। তার খাওয়ার বিল থেকে শুরু করে নানান বিষয়ে যথেষ্ট খাতির-যত্ন করা হয়। দূরের পথ। তাকে আস্থায় রাখার বিষয়টি মাথায় ঘুরপাক খায়। খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করি।

তারপর খোশ মেজাজে ঢাকায় ফিরি। সিএনজিতে টুকটাক আদর বিনিময় হয়। লুকিং গ্লাস দিয়ে লুকিয়ে-চুরিয়ে আমাদের প্রেম দেখে ড্রাইভার। তার চাহনির ভঙ্গি ভালো লাগেনি। যাহোক কোনও অঘটন ছাড়াই ঢাকায় ফিরে আসি। আগেই নির্ধারিত থাকায় সেই অনুযায়ী সিএনজি ড্রাইভারকে ভাড়া দেই। সে কোনও কারণ ছাড়াই ভাড়া নিয়ে খেচামেচি শুরু করে দেয়। সে যে এমনটা করবে, ভাবতেই পারিনি। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করায় সে যেন পেয়ে বসে। নাকি সুযোগের সদ্ব্যবহার করে। মেজাজ খুব খারাপ হয়ে যায়।

ঠিক সেই সময় উপস্থিত হয় পরিচিত এক ব্যক্তি। যা সায়ন্তনী ও আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর। ওই লোকের সায়ন্তনীদের বাসায় যাতায়াত আছে। আমি তাকে চিনি দূর থেকে। বুঝতে পারি, আমাদের দুজনকে এভাবে দেখে ফেলায় পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এমন একটা বিব্রতকর অবস্থায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে রাগ করে তাড়াহুড়ো করে সিএনজি থেকে নেমে যাই। সায়ন্তনী বাসায় চলে যায়। আমি আমার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই।

তখন হঠাৎ খেয়াল হয়, আরে, আমার মোবাইল ফোন কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি ফোনের একটা দোকান থেকে আমার নম্বরে কল করি। ফোনের সুইচড অফ। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ফোনটি চিরদিনের জন্য হাতছাড়া হয়ে গেছে। ফোন হারিয়েছে, তারজন্য যতটা না মন খারাপ হয়, তারচেয়েও বেশি খারাপ লাগে ছবিগুলোর জন্য। ওই সময়, ওই স্মৃতি, ওই মুহূর্তগুলো তো আর ফিরে পাওয়া যাবে না। ছবিগুলো থাকলে আমাদের জীবনের উজ্জ্বলতম সন্ধিক্ষণটুকু উদ্ভাসিত হয়ে থাকতো।

তারপর তো সায়ন্তনীর সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। ছাড়াছাড়ি শব্দটা যথার্থ প্রয়োগ হয়েছে বলা যাবে না। আমরা তো বিবাহিত ছিলাম না। বরং হাল আমলের ভাষায় বলা যায়, আমাদের ব্রেকআপ হয়ে যায়। এর কারণ, সেদিন যে লোকটা আমাদের একসঙ্গে দেখে, প্যাঁচটা সম্ভবত সে-ই লাগায়। সায়ন্তনীকে এমন ফাঁদে ফেলে, আমার সঙ্গে তার আর সম্পর্ক রাখা সম্ভব হয়নি। তখনই সেটা সায়ন্তনীর কথায় আঁচ করতে পেরেছিলাম। সায়ন্তনীর মঙ্গলের জন্য আমাকে সরে যেতে হয়। সে না হয় সম্পর্ক থাকলো না। তাই বলে সামান্য যোগাযোগ থাকবে না?

অনেক দিন সায়ন্তনীর খোঁজ-খবর আমি জানি না। তবে তাকে তো আমি কিছুটা হলেও বুঝতে পারি। আমার খবর রাখবে, সে তেমন রক্ত-মাংসের মেয়ে নয়। অদ্ভুত স্বভাবের এক মেয়ে। একজন মানুষ তার জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল, সেটা বোধকরি কখনোই তার মনেই পড়ে না। পড়ার কথাও না। যা তার জীবন থেকে অতীত হয়ে যায়, তার দিকে ফিরে তাকানোকে সে ডিসক্রেডিট মনে করে। সেটা তো এত দিনে বুঝে নিতে পেরেছি। এমন মেয়ের সঙ্গে যেচে যোগাযোগ করতে চাইলে অপমানিত হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

তাহলে সায়ন্তনীর সঙ্গে আমার কিস করার ছবি ভাইরাল হওয়ায় এখন কী হবে? সেই কবেকার কথা। মাওয়া ঘাট আর আগের মতো নেই। সেখানে এখন নির্মাণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে পদ্মা সেতু। এই সেতুকে কেন্দ্র করে বদলে গেছে সেখানকার জীবনধারা। বদলে গেছে আমাদের সম্পর্কও। ছবিতে আমাদের ভালোবাসা অম্লান হয়ে থাকলেও আমরা পরস্পরের কাছ থেকে অনেক দূরে চলে গেছি। কেউ কারও খবর রাখি না।

তাহলে এত দিন পর পর ছবিটা কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দিয়েছে? যে দিয়েছে, তার কী স্বার্থ? আমার যতটা মনে পড়ে, মোবাইল ফোনটা আমি সিএনজিতে ফেলে আসি। সেটা ড্রাইভারের হস্তগত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ফোন হারানোর অল্প সময়ের মধ্যে রিং করি। তখনই ফোন বন্ধ পেয়েছি। লং জার্নি করে এসে এত দ্রুত কি সে অন্য যাত্রী তুলেছে? ড্রাইভারের হাবেভাবে তেমনটা মনে হয়নি। সেক্ষেত্রে ড্রাইভার ছাড়া আর কারও কাছে ফোন যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ড্রাইভারই কি ছবিটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে? যদিও তার সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে। তার ভাবগতিকও খুব সুবিধার মনে হয়নি।

কিন্তু দিলেও এত দিন পর কেন দেবে? নাকি মোবাইল ফোন সে কারও কাছে বিক্রি করে দিয়েছে? কেউ যদি কিনে থাকে, সেইবা কেন এত দিন পর ছবি দেবে? দিলে হয়তো নিছক মজা করার জন্য দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ধরনের ছবির তো খুবই ডিমান্ড। লাইক বা ভাইরাল হওয়ার আশায় দিতেই পারে। সঙ্গত কারণেই এই হট ছবি ভাইরাল হতে সময় নেয়নি। সবই বুঝলাম, কিন্তু এত বছর পর কেন? এই হিসাব কিছুতেই মিলছে না।

ছবিটি দেখার পর আমার ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কী করবো বুঝতে পারছি না। রাত গভীরতর হতে চলেছে। ঘুমাচ্ছি না কেন স্ত্রী একবার জানতেও চেয়েছে। তারপর পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ফেসবুক তন্ন তন্ন করে আমাদের ছবিটা পাগলের মতো খুঁজতে থাকি। কেন জানি না আমার ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা সবার প্রোফাইলে একে একে ঢুঁ মারতে থাকি। সেও তো দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। একটা পর্যায়ে ক্লান্ত হয়ে মোবাইল ফোন আর লাইট বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিছুতেই ঘুম আসে না। এপাশ ওপাশ করতে থাকি। মাথার মধ্যে অনুভব করতে থাকি ভিমরুলের কামড়। ঘুমহীন কেটে যায় রাত।

সকালে বিছানা থেকে উঠে মোবাইল ওপেন করতেই বুকের মধ্যে প্যালপিটেশন হতে থাকে। ভাইরাল হওয়া ছবিটি পরিচিত কয়েকজন ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ আর মেসেঞ্জারে পাঠিয়েছে। সঙ্গে মন্তব্যসহ নানান রকম ইমোজি। বুঝতে পারলাম, পদ্মা নদীর পানি অনেক দূর গড়িয়েছে। শারীরিকভাবে অসুস্থতা অনুভব করতে থাকি। রাত জাগার ধকল নিয়ে তাড়াহুড়ো করে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাই। পথিমধ্যে একটা ওষুধের দোকানে গিয়ে প্রেসার চেক করাই। সেখানেও সুসংবাদ নেই। যে আমার সারা জীবন লো প্রেসার, প্রায়শই মাথা ঝিমঝিম করা নিয়ে ভুগতে হয়েছে, তার কিনা হাই প্রেসার! এক রাতের মধ্যে এতটা উত্থানপতন? তার মানে এই চাপ নিতে পারছি না। আসলে পারবো কীভাবে?

সামান্য যে কোনও বিষয় একবার ভাবনার মধ্যে ঢুকলে তা থেকে নিস্তার নেই। আর এটা তো তোলপাড় হওয়ার মতো ঘটনা। এমন ঘটনা সামাল দেওয়া কি আমার কর্ম? মাথার মধ্যে সারাক্ষণই কুট কুট করতে থাকে দুশ্চিন্তার ঘুণপোকা। সবাই জেনে গেলে কী হবে? বাসায় কী বলবো? আত্মীয় স্বজনদের? বন্ধু-বান্ধবদের? অফিসে? কোনও সমাধানই পাচ্ছি না। কার সঙ্গে বিষয়টি শেয়ার করা যায়? করলে কি এর কোনও সমাধান আছে? আচ্ছা, আমি কি একাই হয়রানি হচ্ছি? সায়ন্তনী কি এটা জানতে পেরেছে? জানলে তার কী প্রতিক্রিয়া হচ্ছে?

নানান রকম ভাবনায় দোল খাচ্ছিলাম, কোনও কূল-কিনারা পাচ্ছিলাম না। ঠিক তখনই সায়ন্তনী ফোন করে। এ যেন অনেকটা টেলিপ্যাথির মতো। দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী দীর্ঘ বরষ মাস পর। কোনও রকম বাতচিত ছাড়াই সরাসরি জানতে চাইলো, ছবিটা কি দেখেছো?

ভাবখানা এমন, যেন আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কণ্ঠে কোনও উচ্ছ্বাস নেই। উত্তাপ নেই। উদ্বেগ নেই। কোনও ভাবান্তর নেই। আর ছবিটা যে আমি দেখবো, এ বিষয়েও সে যেন এক প্রকার নিশ্চিত। আমি একবুক অস্থিরতা নিয়ে জবাব দিলাম, দেখেছি। তারপর স্বগতোক্তির মতো করে বিষণ্ণ কণ্ঠে বললাম, এত এত বছর পর কে আমাদের এমন বিপদে ফেলতে চাইছে?

সায়ন্তনী চট করে বললো, কারও স্বার্থ আছে বলেই এমনটা করেছে। তোমরা পুরুষরা তো স্বার্থ ছাড়া কিছু করো না।

একটু দমে গিয়ে বললাম, কার স্বার্থ থাকবে? স্বার্থ উদ্ধার করতে হলে তো আমাদের কারও না কারও সঙ্গে যোগাযোগ থাকতে হবে। যে ছবিটা দিয়েছে, মনে হয় না সে আমাদের চেনে। আর আমাদের সম্পর্কে কিছু জানারও প্রশ্নই আছে না।

নির্লিপ্ত কণ্ঠে সায়ন্তনী বললো, তুমি কী করে এতটা নিশ্চিত হলে আমাদের চেনে বা জানে না?

আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, আমাদের চেনে! তা কীভাবে সম্ভব? তুমি কি সেই সিএনজিওয়ালার কথা বলছো?

না, তার এত সাহস হওয়ার কথা নয়। আমরা যেদিন মাওয়া ঘাট থেকে ঘুরে আসি, সেদিন যে লোক আমাদের দেখে ফেলে, এটা তার কীর্তি।

আমি বললাম, তার কারণেই তো আমাদের সম্পর্কটা টিকলো না। কিন্তু সে এই ছবি পেলো কোথায়?

আমরা চলে যাওয়ার পর সে সিএনজির ড্রাইভারকে তার বাসায় নিয়ে যায়। ড্রাইভারের কাছে আমরা কোথায় কী করেছি, তার বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেয়। সে সময় ঘটনাচক্রে তার কাছে তোমার মোবাইল ফোন পেয়ে যায়। ড্রাইভারকে ভালো অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিদায় করে। তোমার মোবাইল ফোন থেকে ছবিগুলো উদ্ধার করে তারপর থেকে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে। নিজেকে তার কাছে সমর্পণ করা ছাড়া আমার উপায় ছিল না। এভাবে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছিল। আমিও আর পারছিলাম না। কদিন আগে আমার সঙ্গে তার বড় ধরনের একটা ঝামেলা সৃষ্টি হয়েছে। তার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তোমার-আমার ছবিটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ বিষয়টি আমি সামাল দিতে পারবো কিনা জানি না। তুমি যে সমস্যায় পড়বে, সেটা বুঝতে পেরে তোমাকে ফোন দিলাম। পুরো ঘটনাটি তোমাকে জানালাম। এখন তুমি কী করবে আমি জানি না। তবে এটা জেনে রাখ, লোকটি মোটেও সুবিধার নয়। তার হাত অনেক লম্বা। প্রয়োজন পড়লে চরম কিছু করতেও দ্বিধা করে না।

সায়ন্তনীকে নিয়ে আমার যে সংশয় ছিল, তা এখন পুরোপুরি কেটে গেছে। আমি ভেবেছিলাম, তার হৃদয়ে আমার কোনও স্থান নেই। দীর্ঘ দিনের মৌনতার পর ফোন করে এই ধারণাটি সে ভেঙে দিয়েছে। আমাকে যদি নাই ভালোবাসবে, তাহলে ফোন করার প্রশ্নই আসতো না। সে তো আমাকে ফোন না করলেও পারতো। বুঝতে পারছি, আমাকে এক রকম নির্ভরতা দেওয়ার জন্য ফোনটা করেছে।

ভাইরাল হওয়া ছবির পরিণতি নিয়ে এই মুহূর্তে আমি ভাবছি না। ভাবছি, আমাদের পুরানো সেই ভালোবাসা নিয়ে। দুজনের নিবিড় সম্পর্কটা এত দিন পর সর্বত্রই চাউর হয়েছে, সেটাতে তো আর আমাদের কিছু করার নেই। কিন্তু আমরা যে একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম, সেটা তো আর মিথ্যে ছিল না। সায়ন্তনীর ফোন আমাকে যেন সেই দিনগুলোকে ফিরিয়ে দিয়েছে।

অদ্ভুত সেই কণ্ঠসুধা


সংবাদপত্রের বার্তা বিভাগে কাজ করায় টেলিফোনকে একটা উপদ্রবের মতো মনে হয়। হবেই না কেন? পুরো নিউজ সেকশনে ফোন একটাই। রাজ্যের যত ফোন রিসিভ করতে হয় জুনিয়রদের। রীতিমতো টেলিফোন অপারেটরের কাজ করতে হয়। কত রকম যে ফোন কলের বাহার। রিসিভ করতে করতে ক্লান্তি লাগে। ঢাকার বাইরে থেকে রিপোর্টারদের পাঠানো রিপোর্ট লেখা তো আছেই, সেটা তো ডিউটির অন্তর্ভুক্ত। কোনো কোনো রিপোর্টার আছেন, তাদের থামতে ইচ্ছে করে না। যেন পুরো পত্রিকায় তার রিপোর্ট প্রকাশিত হবে। নিউজপ্রিন্টের কাগজে ইকোনো বলপেন দিয়ে লিখতে লিখতে হাতের আঙুল টনটন করে, সহজে রেহাই পাওয়া যায় না। 

এর বাইরে তিন তলা অফিসের যে যেখানে কর্মরত, তাদের খবর পাঠিয়ে ডেকে আনা, অফিসে উপস্থিত না থাকলে সংবাদ পৌঁছে দেওয়া, নানান জনের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবদিহি করাসহ আগড়ুম-বাগড়ুম লেগেই থাকে। এ কারণে অনেকেই পারতপক্ষে টেলিফোন থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। টেলিফোন বাজলে এ ওর মুখের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করেন। শিফট-ইনচার্জ হুঙ্কার ছাড়লে তখন বাধ্য হয়ে ধরতে হয়। সেক্ষত্রে বয়সের দিক দিয়ে কনিষ্ঠ হওয়ায় এড়ানোর সুযোগ থাকে না। 

একদিন বিকেলের শিফটে কাজ করছি। এই শিফটে কাজের চাপ অপেক্ষাকৃত কম। শিফট-ইনচার্জ ছাড়া সাধারণত একজনই থাকেন। সঙ্গত কারণেই ফোন আসার পর আমাকেই রিসিভ করতে হয়। বিরক্তি নিয়ে একটা ফোন রিসিভ করি। মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে যায় বিরক্তি। অদ্ভুত সুন্দর কণ্ঠের এক মেয়ের ফোন। এমন মায়াবী কণ্ঠের কোনো মেয়ের সঙ্গে আমি জীবনেও কথা বলিনি। তার কণ্ঠের মাধুর্যে আমি একরকম হিপটোনাইজ হয়ে যাই। তার কোনো কথাই আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। তার কণ্ঠসুধায় আমি যেন কোন অতলে ডুবে যেতে থাকি। কিছুটা সময় যাওয়ার পর ধাতস্থ হই। ততক্ষণে অপর প্রান্তে নিঃশব্দের হাহাকার। আমার সাড়া না পেয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। আমার বুকের ভিতর কেমন কষ্টকর অনুভূতি হতে থাকে। নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে করছে। কণ্ঠের সম্মোহনে এতটাই নিমজ্জিত হয়ে যাই, কোনো প্রতিত্তোর দিতে ভুলে যাই। 

কিছুক্ষণ কথা বলার তো সুযোগ ছিল। তাহলে ভালো লাগা নিয়ে কণ্ঠের নানান রূপান্তর অনুভব করতে পারতাম। মন খারাপ করে কাজে মনোযোগ দিতে সচেষ্ট হই। কিন্তু কণ্ঠটা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। কানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে সুরেলা আমেজ। মানুষের কণ্ঠ এত মিষ্টি হয়! ইশ্ আরেকবার যদি শুনতে পারতাম। এমন সময় আবার ফোন বাজে। আমি চট করেই ফোন রিসিভ করি। এত দ্রুত কখনো ফোন রিসিভ করেছি বলে মনে পড়ে না। শিফট-ইনচার্জ ওয়াহিদ ভাই আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকান। তখন কি আমার সে সব বিবেচনা করার বোধ আছে। আমি গদগদ কণ্ঠে বললাম, হ্যালো। ওপাশ থেকে কোনো উত্তর নেই। কেউ একজন ফোন ধরে আছে, সেটা বুঝতে পারছি। আমি হ্যালো হ্যালো করতেই থাকি। বিরক্ত হয়ে ওয়াহিদ ভাই ফোন রেখে দিতে বলেন। তবুও আমি রাখছি না। বেশ কিছুক্ষণ পর শুনতে পাই কাঁচের চুড়ি ভাঙ্গার মতো রিনঝিন হাসি। 

তারপর সেই মোহনীয় কণ্ঠে বললো, এখন কেমন লাগে?

একটু ভড়কে গিয়ে বললাম, কেমন লাগে মানে?

আপনি ফোন ধরে কোনো জবাব না দিয়ে তখন চুপ করে থাকলেন কেন? তাই আমি এবার শোধ নিলাম। বুঝলেন মিস্টার।

আমি ব্যাকফুটে খেলার মতো করে বললাম, দেখুন আমি তো আর ইচ্ছে করে নীরব হয়ে যাইনি। এরজন্য তো আপনি দায়ী। 

মেয়েটা অবাক হয়ে বললো, আমি দায়ী! আজিব কথা! 

ওয়াহিদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ একটু নিচুতে নামিয়ে বললাম, আমি তো ভেবেছি, স্বর্গ থেকে কোনো অপ্সরী আমার সঙ্গে কথা বলছেন। কণ্ঠের জাদুতে আমি এমনই মুগ্ধ হয়ে যাই, কথা বলতেই ভুলে যাই। কোনো মানবীর কণ্ঠ এত আবেদনময়ী হতে পারে, আমার অন্তত জানা ছিল না।

হাসির ঝরনাধারায় আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে মেয়েটি বললো, সত্যি বলতে কি আমার কণ্ঠ নিয়ে অনেক প্রশংসা শুনেছি। কিন্তু আপনি যেভাবে মুগ্ধতা প্রকাশ করলেন, এভাবে কেউ করেনি। আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন তো। 

বিস্ময় নিয়ে বললাম, আমি সুন্দর করে কথা বলি! এমন স্বীকৃতি জীবনে এই প্রথম পেলাম। ওয়াহিদ ভাই একটু পর পর আমার দিকে তাকাতে থাকেন। বুঝলাম, অকারণে এই কথা বলাটা তার পছন্দ হচ্ছে না। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেয়েটিকে বললাম, যাকগে, আপনি কীজন্য ফোন করেছিলেন? 

মেয়েটি বললো, আসলে ফোনটা রং নাম্বার হয়ে গেছে। তবে আপনার সঙ্গে কথা বলতে পেরে ভালো লাগছে। এটা কি আপনার বাসার নাম্বার? 

আমি বললাম, জি না। এটা একটা সংবাদপত্রের অফিস। 

খানিকটা উৎফুল্ল কণ্ঠে মেয়েটি বললো, তাই! আপনি কি সাংবাদিক? 

বললাম, হ্যাঁ।

চমৎকার তো। দীর্ঘ দিনের একটা ইচ্ছে পূরণ হলো। সংবাদপত্রের প্রতি আমার অপরিসীম কৌতূহল। কিন্তু কোনও সাংবাদিককে আমি জীবনেও দেখিনি। কথা বলারও সুযোগ হয়নি। দারুণ ব্যাপার না? 

মোটেও দারুণ ব্যাপার নয়। সাংবাদিকদেরও আপনার মতো দুই হাত দুই পা। আলাদা কিছু নয় ম্যাডাম।

দুষ্টুমি করে মেয়েটা বললো, তাই বুঝি! আমি তো ভেবেছিলাম, তাদের চার হাত চার পা। 

বললাম, ফাজলামো করেন?

কোনও উত্তর না দিয়ে মেয়েটা একটানা হাসতে থাকে। হাসি থামার পর বললো, পত্রিকার ফোন নাম্বারটা কি পাওয়া যাবে? 

বললাম, মাথা কি বিগড়ে গেল নাকি? আপনি তো পত্রিকার নাম্বারেই কথা বলছেন।

সেটা তো আপনার কাছে জানলাম। তবে আমি যে নাম্বারে কথা বলার জন্য ফোন করেছি, এটা তো সেই নাম্বার নয়। হয় ভুল করেছি নতুবা ভুল নাম্বারে চলে গেছে? তখন কেটে দিয়ে রিডায়াল করেছিলাম। আপনার নাম্বার তো আর জানি না। নাম্বার দিতে কি আপত্তি আছে? 

আরে না, আপত্তি কেন থাকবে? এটা গোপনীয় কিছু নয়। এই নাম্বার তো প্রতিদিনই পত্রিকায় ছাপা হয় ২ ৩ ৫ ৩ ৪ ১। 

আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আচ্ছা, আমি যদি এই নাম্বারে ফোন করি, তাহলে কি আপনার সঙ্গে কথা বলা যাবে? 

বললাম, তেমন সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ। 

মেয়েটা আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলো, কেন? কেন?

আমাদের ডিউটির তো নির্ধারিত সময় নেই। কোনও সপ্তাহে সকালে, কোনও সপ্তাহে বিকেলে, কোনও সপ্তাহে রাতে। আপনি আমাকে পাবেন কীভাবে? 

ভারি মজার চাকরি তো! তাহলে আপনাকে পাওয়ার উপায় কী? 

কেন বলুন তো?

মেয়েটা বললো, আপনার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগলো। তাই আবার কি কথা হতে পারে না?

বললাম, তা হতে পারে। সেক্ষেত্রে এই নাম্বার ছাড়া তো উপায় নেই। 

ইতোমধ্যে অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেছে। কাজ রেখে কথা চালিয়ে যাওয়ায় ওয়াহিদ ভাই ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। আমি বললাম, এখন তাহলে রাখি। এই বলে ফোন রেখে দেই।  

তারপর অনেক দিন পেরিয়ে যায়। মেয়েটির সঙ্গে আর কথা হয়নি। আমি মেয়েটার নাম জানি না। ফোন নাম্বারও জানি না। মেয়েটাও আমার নাম জানে না। ভেবেছি, ভোকাট্টা ঘুড়ির মতো ওড়ে চলে গেছে। বেশ কিছু দিন পর আবার বিকেলের শিফটে কাজ করছিলাম। একদিন সেই মেয়েটা ফোন করে আমাকে পেয়ে যায়। 

আমি রিসিভ করতেই কিছুটা রাগত স্বরে বলে, আপনি এমন কেন?

বললাম, কেমন?

সেদিন আপনি আপনার নামটা পর্যন্ত বলেননি।

অদ্ভুত কথা। আপনি জানতে না চাইলে আমি কি সেধে সেধে নাম বলবো? 

অভিমানের গলায় মেয়েটি বললো, এরমধ্যে আপনাকে আমি অনেক দিন ফোন করেছি। কিন্তু নাম না জানায় আপনার কথা কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারিনি। আমাকে কত হয়রান হতে হয়েছে। ভাগ্যিস এখন পেয়েছি। আপনার নামটা বলেন তো। আমি হেলেন।

মজা করে বললাম, বাহ্, হেলেন অব ট্রয়?

আপনার মুণ্ডু। বললাম, হেলেন। উনি চলে গেছেন গ্রিক পুরাণে। আগে আপনার নামটা বলেন তো। পরে খেয়াল থাকবে না। নইলে আবার ভোগান্তি পোহাতে হবে। 

নিজের নাম জানিয়ে বললাম, আপনি আমাকে এই ফোনে কখনও খোঁজ করবেন না।

হেলেন বললো, কেন খুঁজবো না?

আপনি আমাকে খোঁজ করলে সহকর্মীরা অন্য কিছু ভাবতে পারে। 

কী যে বলেন না। আপনাকে কি কেউ খুঁজতে পারে না?

তা অবশ্যই পারে। কিন্তু আপনার বিষয়টি ভিন্ন। 

কি অবাক করা কথা। সবাই খুঁজতে পারবে। আমি পারবো না। 

দেখুন, এটা আমার কর্মস্থল। আপনি যদি এভাবে খোঁজাখুঁজি করেন, আমার রেপুটেশন খারাপ হয়ে যাবে। 

হেলেন বললো, তাই বুঝি? ঠিক আছে, একটা শর্ত মানলে খুঁজবো না। শর্তটা রাখবেন কিনা বলেন? 

বললাম, শর্তটা আগে শুনি তো। তারপর না রাখারাখির প্রশ্ন। 

আমার ফোন নাম্বারটা রাখুন। এখন থেকে আপনি আমাকে ফোন করবেন।

দেখুন, এই ফোন দিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয়। অফিসের ফোন কোনোভাবেই এনগেজড করে রাখা যাবে না।

তাহলে আপনার সঙ্গে কথা হবে কী করে?

বললাম, কথা তো হয়েছেই। আর কী কথা?

আশ্চর্য মানুষ তো আপনি। আমার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন আর এখন আমি যেচে কথা বলতে চাইছি, আপনি আমাকে একদম পাত্তাই দিচ্ছেন না। ব্যাপারটা কী?

ব্যাপারটা আসলে কিছু না। যা কিছু ভালো লাগে, তার সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। না হলে মাধুর্যটুকু থাকে না।

তাহলে তো পৃথিবীতে ভালো লাগা থেকে কোনও সম্পর্কই স্থাপিত হতো না। সম্পর্ক হলে তিক্ত হতেও তো বেশি সময় লাগে না। নির্ভেজাল কোনও সম্পর্ক কি আছে? মানুষ তো এটা মেনে নিয়েই সম্পর্ক গড়ে। যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করে হেলেন। 

বললাম, আপনার কথা অস্বীকার করছি না। তবে সেটা তো আলাদা প্রসঙ্গ। 

কেন আলাদা প্রসঙ্গ?

আপনার কণ্ঠ আবেদনময়ী, তা শুনলে অভিভূত হতে হয়। কিন্তু আপনার সঙ্গে যদি নিয়মিত কথা হয়, তাহলে এই মুগ্ধতা থাকবে না। আমি এমনটা চাই না।

তার মানে আপনি আমার কণ্ঠ আর কখনও শুনতে চাইছেন না।

বললাম, আমি কি তাই বলেছি?

আপনার সঙ্গে যোগাযোগ না হলে তার অর্থ তো তাই দাঁড়ায়। 

মাঝে-মধ্যে তো কথা হতেই পারে। আপনি আজকে আমাকে যেভাবে যোগাযোগ করলেন, সেভাবেই না হয় কথা হবে।

এটা কীভাবে হয়? আমি অন্যদের কাছে আপনার ডিউটির সময় জেনে নিয়ে ফোন করবো, এটা কি শোভনীয় হবে? 

এছাড়া তো আমি বিকল্প দেখছি না। 

আপনি তো দেখি খুবই নিরস মানুষ। প্রথম দিন কথা বলে যা ভেবেছিলাম, এখন তেমন মনে হচ্ছে না। 

কেন, কী ভেবেছিলেন?

রেগেমেগে হেলেন বললো, ঘোড়ার ডিম ভেবেছি।

বললাম, রাগলেও তো আপনাকে বেশ ভালোই লাগে। একটা অনুরোধ কি করতে পারি?

হেলেন তাৎক্ষণিকভাবে খুশি হয়ে বললো, বলেন, কী অনুরোধ? 

আপনি আবৃত্তির চর্চা করেন কিনা জানি না। আপনি যদি আবৃত্তি করেন, তাহলে ক্যামেলিয়া মোস্তফা, প্রজ্ঞা লাবণীর মতো বিখ্যাত হতে পারবেন। আপনি কি আমার এই অনুরোধ রাখবেন? 

আপনি অনুরোধ করেছেন, সেটাই আমার কাছে অনেক বড় কিছু। কিন্তু আবৃত্তি কতটা কি করতে পারবো, জানি না। তবে চেষ্টা করে দেখবো। 

এরপর থেকে হেলেনের সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হয়। সে-ই ফোন করে৷ বিকেল ছাড়া অন্য সময় কথা বলার খুব একটা সুযোগ থাকে না। কাজের অনেক চাপ থাকে৷ তাকে বোঝাতে পারি না। দিনে দিনে সে অনেক ডেসপারেট হয়ে উঠতে থাকে। কোনও কিছুর তোয়াক্কা করে না। আমার অবস্থানটা একদমই বুঝতে চায় না। অফিসের সহকর্মীরা এই কথা বলার বিষয়টা নিয়ে সরস আলোচনা করে। দেখা হলে কেউ না কেউ মুচকি হাসি দিয়ে জানায়, আমাকে একটা মেয়ে খোঁজ করেছিল। বুঝতে পারি, তাদের অপার কৌতূহল। মুখে লেগে থাকা রহস্যময় হাসিতে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনুকূল মনে হয় না। বিব্রত বোধ করতে থাকি। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার সহজ উপায় খুঁজে পাই না। আমি একদিন বাধ্য হয়ে হেলেনকে বললাম, তুমি কি চাও, ততদিনে সম্পর্কটা তুমির পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, আমি চাকরি ছেড়ে দেই?

সে উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলো, কেন? কেন? 

আমি বললাম, পুরো অফিসে আমাকে নিয়ে কানাঘুষা চলছে। এভাবে তো আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব নয়। 

তাহলে আমি কী করবো? আমি তো তোমার সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারবো না।

তুমি তো শুধু কথা বলতে চাও, তাই তো? 

হেলেন বললো, হ্যাঁ।

তাহলে তোমাকে আমি একটা ফোন নাম্বার দিচ্ছি। এই নাম্বারে ফোন করলে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারবে। তবে শর্ত হলো, তুমি কখনও আমাকে অফিসে ফোন করতে পারবে না। এই শর্তে রাজি আছো?

তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারলেই হলো। আমি যে কোনও শর্তেই রাজি।

আমি সামাজিক একটা সংগঠনের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে। সেখানে প্রতিদিন একবার যেতে হয়। নিরূপায় হয়ে সেই সংগঠনের ফোন নাম্বারটি হেলেনকে দেই। ফোন করলে কথা চালিয়ে যেতে হয়। আর যা হোক অফিসের ফিসফাস থেকে তো মুক্তি পাওয়া যায়। এভাবে অনেকগুলো দিন চলে যায়। কিন্তু সম্পর্কটা শুধু কথা বলার মধ্যে সীমিত রাখতে চায় না হেলেন। কেমন একটা অন্তরঙ্গতার দিকে নিয়ে যেতে থাকে। আমি যতই আগল দেওয়ার চেষ্টা করি না কেন, তাকে আটকে রাখা যায় না। বুঝতে অসুবিধা হয় না, কী কারণে যেন আমাকে তার হৃদয়ে ঠাঁই দিয়ে ফেলেছে। আমার প্রতি বেশ মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। একটা পর্যায়ে দুজনের সম্পর্কটাকে স্থায়িত্ব দেওয়ার কথা বলতে থাকে। আমি তাকে নানাভাবে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনোভাবেই তার মনোভাব পরিবর্তন করা যায় না। 

বিয়ে-সংসার ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে একদিন আমি তাকে বললাম, আমার যা আয়-রোজগার তাতে সংসার চালিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। 

আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, তোমার চাকরি না করলেও চলবে। আমি আয় করে সংসার চালিয়ে নেব। 

আমি বললাম, এটা কী করে হয়?

সে দৃঢ়তার সঙ্গে বললো, ছেলেরা যদি উপার্জন করে সংসার চালাতে পারে, তাহলে মেয়েরা কেন পারবে না?

এর কোনও সদুত্তর আমার কাছে ছিল না। তাছাড়া এভাবে সংসার করার কথা বলায় অনেকটা হতভম্ব হয়ে যাই। তখন তাকে বাধ্য হয়ে বললাম, প্রথম থেকেই আমি তোমাকে এড়িয়ে যেতে চাইছি। তুমি বুঝেও বুঝতে পারছো না। আসলে আমার অন্য একটা মেয়ের সঙ্গে অ্যাফেয়ার আছে। 

সে রাগত স্বরে বললো, তুমি আমাকে এড়ানোর জন্য এই গাল-গল্প মারছো। আমি তা একদমই বিশ্বাস করি না।

বললাম, আমি একটুও মিথ্যা বলছি না। তোমাকে আমি কীভাবে বিশ্বাস করাবো? 

হেলেন বললো, আমি সেই মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে চাই। তুমি তার ফোন নাম্বার আমাকে দাও। 

বললাম, এটা তো মোটেও সম্ভব নয়। 

কেন সম্ভব নয়? আমি একবার তার সঙ্গে কথা বলে সম্পর্ক আছে কিনা সেটা যাচাই করতে চাই। যদি তেমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে না হয় অন্য চিন্তা করবো। 

তুমি চাইলেই তো হবে না। সেটা আরও জটিলতার সৃষ্টি করবে। তেমন ঝুঁকি আমার পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। 

হেলেন অভিমানী কণ্ঠে বললো, জটিলতা-তটিলটা বুঝি না। আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না। 

বললাম, এটা কেমন কথা? তুমি আমাকে কখনও দেখনি। আমার সম্পর্কে তেমন কিছুই জানো না। আর বলছো, আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না।  

কথাই তো একজন মানুষকে চিনতে পারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আমি তোমার সঙ্গে ফোনে কথা বলে যা বোঝার বুঝে নিয়েছি। তোমাকে আমার আর বুঝতে হবে না। 

এটা কী ধরনের পাগলামি? একজন মানুষকে না দেখে না জেনে সম্পর্ক গড়তে চাইছো, এটা হয় নাকি কখনও?

হেলেন বললো, মানুষের মন চিনতে হলে দেখা-সাক্ষাৎ খুব প্রয়োজনীয় নয়। প্রতিদিন কত বিয়ে-শাদি হচ্ছে, তাদের অনেকের মধ্যে তো কথা পর্যন্ত হয় না, বাসর রাতেই স্বামী-স্ত্রীর প্রথম দেখা হয়। আর তুমি চাইলে তো আমাদের যখন-তখন দেখা-সাক্ষাৎ হতেই পারে। চলো, আমরা দেখা করি।

আমি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বললাম, আরে না না। দেখা-সাক্ষাতের প্রয়োজন নেই। আমি আসলে এই সম্পর্কটা চাইছি না। কারণ, আমি তো আরেক জনকে কথা দিয়েছি। কথা দিয়ে আমি তার খেলাপ করতে পারবো না। 

আবেগময় কণ্ঠে হেলেন বলে, এটা তোমার মনগড়া কথা। আর জেনে রাখ, তুমি আমার জীবনে না এলে আমি এই জীবন রাখবো না।

আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম, এই সব কী বলছো তুমি? 

দৃঢ়তার সঙ্গে হেলেন বললো, আমি যা বলছি, তার কোনো নড়চড় হবে না। 

বললাম, তুমি এমনটা বলতে পারো না। সম্পর্ক কি জোর-জবরদস্তি করে হয়? আমি তো তোমাকে কখনও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ার কথা বলিনি। ভালোবাসার কথাও বলিনি। তুমি চেয়েছো বলে কথা বলি।

এত দিন যেভাবে কথা বলছি, তা থেকে কি তুমি কিছুই বুঝতে পারোনি?

বুঝতে পারা না পারার কিছু নেই। আমার সঙ্গে তোমার তো শুধু কথা বলার সম্পর্ক। এর চেয়ে বেশি কিছু ভাবার সুযোগ নেই। এখন বুঝতে পারছি, এভাবে কথা বলাটা আমার উচিৎ হয়নি। 

হেলেন বললো, সম্পর্ক কি এক জায়গায় থেমে থাকে? সম্পর্ক তো জলের মতো। গড়াতে থাকে। কথা বলা দিয়েই তো সম্পর্ক হয়। তারপর তা ঘনিষ্ঠতার দিকে গড়ায়। 

বললাম, তা তো হতেই পারে। সেটা তো দুজনের সম্মতির ভিত্তিতে হয়। তাই না? ঠিক আছে এখন রাখি। আমাকে অফিসে যেতে হবে। 

এরপর কিছু দিনের জন্য আমাকে হঠাৎ করে দেশের বাইরে যেতে হয়। যে কারণে হেলেনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। তাকে জানিয়েও যাওয়া হয়নি। দেশে ফেরার পর জানতে পারি, আমার খোঁজে সে অফিসে গিয়েছিল। কীভাবে কীভাবে ঠিকানা সংগ্রহ করে আমার সংগঠনের অফিসেও যায়। আমার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়ার চেষ্টা করে। অথচ সে কাউকেই চেনেও না। একটা মজার ঘটনাও ঘটে। সংগঠনের অফিসে গিয়ে একজন সদস্যের কাছে আমার ছবি দেখতে চায়। আমাদের সংগঠনের একজন প্রবীণ সদস্য আছেন, তাঁকে সবাই দুলা ভাই সম্বোধন করে ডাকেন। ওই সদস্য মনে করেন, বোধকরি সে বুঝি তার কথা বলছে। তিনি দেওয়ালে ঝুলানো বয়স্ক সেই সদস্যের ছবি দেখিয়ে দেন। তাতে করে হেলেন একটু হোঁচট খায়। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দোলায় দোল খেতে থাকে। 

তবে সে পণ করে এসেছিল, আমার সঙ্গে দেখা না করে ফিরবে না। আমি যে দেশে নেই, সে কথা জানতে পারেনি। কয়েক দিন নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে আমার দেখা না পেয়ে বিফল মনোরথে ফিরে যায়। কেউ কেউ তাকে নিয়ে হাসি-তামাশার মাধ্যমে মজা নেওয়ার চেষ্টা করে। এক ধরনের অপমানও করে। তাতে সে মনে বড় আঘাত পায়। আমি কিছু দিন টেলিফোন থেকে দূরে সরে থাকি। সবাইকে বলে রাখি, আমাকে কোনও মেয়ে খোঁজ করলে যেন বলে দেয়, আমি নেই। আমি জানি না এরমধ্যে হেলেন আমাকে আর খোঁজ করেছে কিনা। 

একটা সময় হেলেনের চ্যাপ্টারটা ক্লোজ হয়ে যায়। তবে মানুষের মন তো। ক্লোজ হলেও সহজেই তো ভুলে যাওয়া যায় না। তার জন্য ভিতরে ভিতরে একটা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা কাজ করতে থাকে। প্রতিদিন সংবাদপত্র হাতে নিয়ে সবার আগে নারায়ণগঞ্জের খবর তন্ন তন্ন করে খুঁজতাম। কোনও অঘটনের অপেক্ষা আমাকে অস্থির করে রাখতো। এইভাবে দিন-মাস-বছর গড়িয়ে যায়। জীবন থেকে হারিয়ে যায় হেলেন নামের সুকণ্ঠি সেই মেয়েটি। অথচ আমি সায় দিলে সেই মেয়েটি হতে পারতো আমার জীবনসঙ্গী। কিন্তু তার কোনও অস্তিত্ব আর আমার জীবনে নেই। 

অনেক বছর পর একটা অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমাকে যেতে হয় নারায়ণগঞ্জে। সেই অনুষ্ঠানে একটা মেয়ের আবৃত্তি শুনে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই। অনুষ্ঠান শেষে মেয়েটির কাছে গিয়ে তার কণ্ঠের প্রশংসা করি। তার কাছে জানতে পারি মায়ের উৎসাহে সে নিজেকে আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলছে। তার পাশে বসে ছিলেন এক ভদ্রমহিলা। মেয়েটি সেই ভদ্রমহিলাকে নিজের মা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। সে সময় মেয়েটাকে কেউ একজন ডেকে নিয়ে গেলে ভদ্রমহিলা ফ্যাসফ্যাসে গলায় আমাকে বলেন, কেমন আছেন? আপনাকে এই জীবনে কখনও দেখতে পারবো, এটা ভাবতেও পারি নি। এই দেখায় জীবন সার্থক না হলেও চোখের তৃষ্ণা অন্তত মিটলো।

অবাক হয়ে বললাম, আপনি আমাকে চেনেন! 

চিনতে পেরেছি বলেই তো এত কথা বলছি। অনুষ্ঠানে আপনাকে যেভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়, তাতে চিনতে সমস্যা হয়নি। আমি হেলেন। আপনার ভাষায় হেলেন অব ট্রয়।

তার কথায় আমি চমকে ওঠি। ধাতস্থ হয়ে বললাম, আপনার কণ্ঠের এই অবস্থা কেন?

সে আমার ভাগ্যের লিখন। আপনার সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। একগাদা ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করি। আমার সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। বেঁচে গেলেও হারিয়ে ফেলি আমার সেই কণ্ঠস্বর। তাতে অবশ্য আমার কোনও আফসোস নেই। যে আমার কণ্ঠ পছন্দ করতো, তাকেই যখন এই জীবনে পেলাম না, তাহলে আর তা থাকলো কি থাকলো না, সে নিয়ে মাথা ঘামাই নি। 

নিজের অপরাধ বোধটাকে আড়াল করার জন্য বললাম, আপনার মেয়ে তো অবিকল আপনার কণ্ঠ পেয়েছে। 

মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়ে হেলেন বলেন, এটাও বোধকরি সৃষ্টিকর্তার অপার মহিমা। আমার কণ্ঠ কেড়ে নিয়ে তা আমার মেয়ের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিয়েছে। সে কারণে আমার ভালোবাসার মানুষের একটা অনুরোধ আমি রক্ষা করতে না পারলেও মেয়েকে দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।

আমি নির্বাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। তার দুই চোখে টলমল করছে অশ্রু। তা কি দুঃখের নাকি সুখের, আমি ঠিক বুঝতে পারি না।