এই বয়সেও এত মাধুর্য!
কে ছিলেন তিনি?
খুব কাছের কেউ?
প্রিয়তমা কোনো নারী?
হঠাৎ ট্রেনে দেখা হওয়া কোনো অপরূপা?
বনেদি পরিবারের অল্প বয়সী সুন্দরী কোনো বিধবা?
রাজবাড়ীতে আপ্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া কোনো রূপসী?
কোনো বারবণিতা?
রাজবন্দি রমণী?
বিপ্লবী কন্যা?
সাহিত্যানুরাগী তরুণী?
নাকি নিছক কল্পনা?
আজ অব্দি তাকে চেনা গেল না। কীভাবে যাবে? তাকে যিনি চিনতেন, তিনি তো পুরোপুরিভাবে খোলাসা করেননি। যদিও সেটা তো তার করার কথাও নয়। তারপরও সামান্য আভাস দিয়েছেন। তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তবে বোঝা যায়, কিছু বাস্তবতা আর কিছু কল্পনা করেই তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। তা হয়ে আছে চিরায়ত। চিরকালীন। সেটাই তো সৃষ্টির আনন্দ। কেন তাকে এভাবে মহিমান্বিত করেছেন, এজন্য তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত জবাবদিহি চাওয়া হয়। প্রশ্ন তোলা হয় তাঁর চরিত্র নিয়েও। তাঁকে অপমানিত করা হয়। কলঙ্কিত করা হয়। যে বা যারা তাঁকে অপমান করেন, কলঙ্কিত করেন, তারা তো জানেন, তিনি এসব গায়ে মাখবেন না। কষ্ট পাবেন। ভিতরে ভিতরে ক্ষত-বিক্ষত হবেন। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেবেন না। তিনি তো বরাবরই এমন। লাজুক। মুখচোরা। মিতভাষী। এড়িয়ে গেছেন জনতার কোলাহল। নিজেকে কোথাও মানিয়ে নিতে পারেননি। সংসারী হতে পারেননি। সন্ন্যাসীও হতে পারেননি। এ ধরনের মানুষকে পদে পদে ভুগতে হয়। জীবনে স্বস্তি পাননি। শান্তি পাননি। ভালোবাসা কি পেয়েছিলেন? মনে হয় না। কাউকে যে মুখ ফুটে মনের কথা বলবেন, ততটা সাহসী কি ছিলেন? মনে মনে অনেককে ভালোবেসেছেন। তাদের নিয়ে কল্পনা করেছেন। মনের মাধুরি দিয়ে তাদের কাব্যিক অবয়ব গড়ে তুলেছেন। তাঁর নির্মিত মানুষগুলোকে এখন সবাই চেনেন। জানেন। কিন্তু তারাও তো তাঁকে ভালোবাসেনি। তারা তাঁর কথা মানতো না। কোথাও যেতে কিংবা অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলতে কত বারণ করেছেন। তীব্র আকুতি নিয়ে বলেছেন,'.... ওইখানে যেওনাকো তুমি, বলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;....... কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে!' হায়! কে শোনে কার কথা? তাঁকে কেইবা পাত্তা দিয়েছে? তা নিয়ে মনস্তাপ থাকলেও জোর গলায় কিছু বলতে পারেননি। মীন রাশির জাতক তো। সব কিছু সইয়ে নিয়েছেন। তিনি সহজেই সম্পর্ক যেমন গড়তে পারেন না, তেমনিভাবে ভাঙতেও পারেন না। যে কারণে কাউকে ভুলতে পারেননি। বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ নিয়ে ভালোবাসার মানুষগুলোকে মহিমাণ্বিত করেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে বনলতা সেন। যতটা জানা যায়, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। নামটা শুনেই হৃদয়ে গেথে যায়। কে এই বনলতা সেন? তাকে নিয়ে কতনা জল্পনা-কল্পনা।কেউ বলেন, বনলতা সেন জীবনানন্দ দাশের খুড়তুতো বোন শোভনা দাশগুপ্ত। কাকা অতুলানন্দ দাশের মেয়ে। প্রথম গ্রন্থ 'ঝরাপালক' জীবনানন্দ তাঁকেই উৎসর্গ করেন। এ কারণেও কানাঘুষাটা পল্লবিত হয়।
নাটোরকেন্দ্রিক প্রচলিত কাহিনি হচ্ছে, জীবনানন্দ দাশ একবারট্রেনে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। তখন নাটোর হয়ে যেতে হতো। (আসলেও কি তাই?)। নাটোর স্টেশন থেকে উঠেন বনেদি একটি পরিবারের ম্যানেজার ভুবন সেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধবা বোন বনলতা সেন। জীবনানন্দ দাশের খানিকটা আলাপ হওয়ার পর একসময় মেয়েটি নিজের গন্তব্যে নেমে যান। রেখে যান এক ঝলক ভালোলাগা। সেই ভালোলাগাই রূপান্তরিত হয় কবিতায়।
দ্বিতীয় কাহিনি, নাটোরে বেড়াতে গিয়ে বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর বাড়িতে অতিথি হন জীবনানন্দ দাশ। এক দুপুরে আমন্ত্রিত হন সুকুল এস্টেটের ম্যানেজার ভুবন সেনের বাড়িতে। তাঁকে আপ্যায়িত করেন ভুবন সেনের অল্প বয়সী বিধবা বোন বনলতা সেন। তাঁর সৌন্দর্য দেখে তিনি অভিভূত হন। সেই সৌন্দর্যকে অমলিন করে রাখেন কবিতায়।
তৃতীয় কাহিনি, একজন রাজার আমন্ত্রণে নাটোরের রাজবাড়ী বেড়াতে আসেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে আপ্যায়নের জন্য দুজন সুন্দরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার মধ্যে একজনকে তাঁর পছন্দ হয়। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে চাইলে লোকলজ্জার ভয়ে তিনি ভিন্ন নামে লিখতে বলেন।সেই নামটি হচ্ছে বনলতা সেন। উল্লেখিত তিনটি কাহিনিতে অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু কোনো কাহিনির সত্যতাই নিশ্চিত নয়। সবই উড়াধুরা।
জীবনানন্দ দাশের জীবনীকার গােপালচন্দ্র রায় তাঁর 'জীবনানন্দ' বইয়ে লিখছেন, "একদিন সকালে গেছি! গেলে ঘরে বসিয়ে বললেন আমার 'বনলতা সেন' বইটা সিগনেট প্রেস বার করেছে। এই বলে তিনি আমার হাতে একখানা 'বনলতা সেন' দিয়ে বললেন—কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবই ভাল, কিন্তু কভারের ছবিটি আমার আদৌ পছন্দ হয়নি।
আমি বইটা খুলে দেখছি। সেই সময় তিনি আর একটা 'বনলতা সেন' নিয়ে আমার নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।
আমি বই হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম দাদা, বনলতা সেন কে? আপনি তাে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন। এ নামে সত্যিই আপনার পরিচিত কেউ ছিল নাকি?
আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। কোনাে উত্তর দিলেন না।
আমি আবার বললাম-—দাদা, এই রকম আর একটা কবিতা লিখুন। পারবেন না? এবারও তিনি হাসতে লাগলেন। কোনাে কথা বললেন না।"
ঢাকার সন্তান ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও লেখক অশোক মিত্র ২০১০ সালে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, 'এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এলাে; সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, নাকি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনাে জবাব পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন,সে-সমস্ত খবর বেরােত। হয়তাে ১৯৩২ সাল হবে, নয়তাে তার পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহি জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহি থেকে নাটোর তাে একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাকস্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহােত্তর পর্বে অন্য পদবী ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কিনা। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে ঢেকে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।'
বনলতা সেন কবিতার স্রষ্টার কাছথেকে অশোক মিত্র এমন তথ্য অবহিত হওয়ার পরও কোনো কোনো গবেষক এমন সব তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা রীতিমতো বিভ্রান্তিকর।
সাবেক সচিব ড. আকবর আলি খান ২০১১ সালে লিখেছেন, 'সরকারী চাকুরি সূত্রে রাজশাহীতে অবস্থানকালে নাটোরের প্রশাসকদের বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রশাসকদের দলিল দন্তাবেজ হতে দেখা যায় যে, এ শতাব্দীর প্রথম দিকে নাটোর শুধু কাঁচাগােল্লা বা জমিদারদের জন্য বিখ্যাত ছিল না, নাটোর ছিল উত্তর বঙ্গের রূপাজীবাদের সবচেয়ে বড়কেন্দ্র। আমার কাছে মনে হয়, নাটোর বনলতা সেনের শুধু ঠিকানা নয়। "নাটোর'' শব্দটির দ্বারা তার পেশা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে দেখলে বনলতা সেন নামটির তাৎপর্যও সহজে বােঝা যায়।সেন পদবী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সে ভদ্রবংশ উদ্ভূত। বনলতা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কোন সাধারণ নাম নয়। তার স্খলনের পর নিজের পরিচয় লুকানাের জন্য সে হয়ত ছদ্মনাম নিয়েছে।
বনলতার এ পরিচয় কবিতাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দ্যোতনা দেয়। এখন আমরা বুঝতে পারি, বনলতা সেন কেন কবিকে "দু দণ্ডের শান্তি'' দিয়েছিল, বুঝতে পারি কেন কবির অভিসার “নিশীথের অন্ধকারে” এবং “দূর অন্ধকারে"। এ পটভূমিতে দেখতে গেলে, “এতদিন কোথায়'' ছিলেন একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। বনলতা সেন যেন বলতে চাচ্ছে যে, সে ইচ্ছে করে রূপাজীবা বৃত্তি গ্রহণ করেনি, তার জীবনে অনেক ঝড়ঝঞা গেছে, সে দুঃসময়ে তার পাশে কেউ ছিল না। "এত দিন কোথায় ছিলেন" একটি সৌজন্যমূলক প্রশ্ন নয়, এ হচ্ছে বিপর্যস্ত নারীত্বের আর্তনাদ। বনলতার পরিচয় পেলেই আমরা বুঝতে পারি কবি কেন কবিতার শেষে বলছেন “সব পাখি ঘরে ফেরে''। বনলতাদের সাথে দুদণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) লাবণ্যপ্রভাদের (স্ত্রীদের) কাছে ফিরে আসতে হয়। বনলতাকে আলােকোজ্জ্বল পৃথিবীতে প্রকাশ্যে পাওয়ার কোন সুযােগ নেই। বনলতার কথা কাউকে বলারও উপায় নেই। বনলতাকে নীরবে নিভৃতে স্মরণ করতে হয় অপরাধবােধ নিয়ে। তাই কবি বলেছেন, থাকে শুধু অন্ধকার, মুখােমুখি বসিবার বনলতা সেন। এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার মানসিক।'
এত দিন জানতাম, কল্পনা দিয়ে কবিতা লেখা যায়। কল্পনা দিয়ে যে নতুন তথ্য উদঘাটন করা যায়, এটা জানা ছিল না। এও এক নবতর দৃষ্টান্ত।
একজন বনলতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের। জীবনানন্দ দাশের বরাত দিয়ে অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯৩২ বা ১৯৩৩ সালে বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে ছিলেন। ১৯৩৭ সালে রাজশাহী জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তখনকার স্মৃতি নিয়ে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত 'জীবনযৌবন' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন,
'তখনকার বাংলা প্রদেশ ছিল ইংরেজিতে যাকে বলে যবধৎঃ-নৎবধশ যড়ঁংব. হিজলি জেল থেকে একটি মেয়ে আমাকে চিঠি লিখে আমার উপন্যাসের প্রশংসা জানায়।মেয়েটির নাম যতদূর মনে পড়ে বনলতা। আমার উত্তর নিশ্চয়ই সেন্সর করা হবে। খুব সাবধানে লিখি। তাও ইংরেজিতে। এইসব রাজবন্দিনীর প্রতি আমার স্নেহ ও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু সেটা কি প্রকাশ করতে পারি?'
হিজলিতে ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি ডিটেনশন ক্যাম্প। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়। তবে অন্নদাশঙ্কর রায় শুধু 'বনলতা' লেখায় একটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় দুজন বনলতার কথা জানা যায়। একজন বনলতা দাশগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। ১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নামহেমচন্দ্র দাশগুপ্ত ও মাতার নাম নির্মলাসুন্দরী দাশগুপ্ত। স্কুলের ছাত্রী অবস্থাতেই তিনি স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। যোগ দেন বিপ্লবী দলে। ১৯৩০ সালে বেশিরভাগ সদস্যই পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় দলটা ভেঙে যায়। লেখাপড়া ছাড়াও তিনি মােটরগাড়ি ও পিস্তল চালাতে পারতেন। কলেজ হােস্টেলে থাকাকালীন রিভলবার রাখার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতার লালবাজার লকআপে তাঁকে রেখে তিন দিন ধরে অমানুষিক অত্যাচার চালানাে হয়। এরপর প্রেসিডেন্সি জেলের অন্ধকার লকআপে একমাস রেখে দেওয়া হয়। তিনি কিছু দিন হিজলি জেলেও বন্দি ছিলেন। এই বনলতা জীবনানন্দ দাশের আত্মীয় হন নাতো? হলে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জীবনানন্দ দাশের আদি বাড়িতো বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত বিক্রমপুর থেকে বরিশালে নিবাস স্থানান্তরিত করেন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। কিন্তু বংশের অন্যান্যরা বিক্রমপুরে রয়ে যান। জীবনানন্দ তাঁর নাম থেকে গুপ্ত ছেঁটে দিয়ে শুধু দাশ নামে পরিচিত হন। ১৯৩৬ সালের ১ জুলাই বনলতা দাশগুপ্তের মৃত্যু হয়। তাঁকে নিয়ে কি কবিতা লেখা হয়েছে? অবশ্য তাঁর রাজশাহী জেলে থাকার কথা জানা যায় না। ১৯৩৭ সালে বনলতার চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তাহলে তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন কোন বনলতা?
যে বনলতা সেনকে নিয়ে এত কৌতূহল তাঁরও একটা ঠিকুজি পাওয়া যায়। তিনিও ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব। বৃহত্তর ফরিদপুরের কার্তিকপুর গ্রামে ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর জন্ম। (আচ্ছা, কার্তিকপুর কি কেউ চেনেন?) তাঁর পিতার নাম কালীপ্রসন্ন সেন ও মাতার নাম সরােজিনী দেবী। তাঁর পরিবার স্বদেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৩০ সালে তিনি অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৩-৩৫ সালের আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত থাকায় সম্ভবত তিনি কারারুদ্ধ হন। তখন কি তিনি রাজশাহী জেলে ছিলেন? ১৯৩৭ সালে বন্দি মুক্তি আন্দোলন, ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করলে তিনি তাঁর সঙ্গে যােগদেন। ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় মিছিলের পুরােভাগে থাকায় তিনি পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন এবং প্রেসিডেন্সি জেলে তিন বছর কারাবাস করেন। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি অর্থনীতি শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৫ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি অনুশীলন সমিতির কাল থেকে তাঁর সহকর্মী সরােজ কুমার চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যােগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় তিনি রিলিফের কাজ করেন। নানান স্থানে শ্রমিক আন্দোলন এবং মহিলাদের মাঝে কাজ গড়ে তােলার জন্য বিভিন্ন মহিলা সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ হওয়ার কথা জানিয়েছেন অশোক মিত্র। ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এই বনলতা কি অন্নদাশঙ্কর রায়কে চিঠি লিখেছিলেন?
অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, যা এখন অব্দি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যও, সম্ভবত ফরিদপুরের এই বনলতা সেনকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তার মানে বনলতা সেনের বাড়ি নাটোর নয়। তাতে অবশ্য কিইবা আসে যায়? আমরা যেহেতু জীবনানন্দ দাশের মাধ্যমে বনলতা সেনকে চিনি, তাকে নাটোরের মেয়ে ভাবতেই ভালো লাগে। এই ভালোলাগার কারণে তিনি হয়ে আছেন আমার বা আমাদের প্রিয়তমা নারী। ১০৫ বছর বয়সেও তার মাধুর্য একটুখানি ম্লান হয়নি। বাংলা কবিতা যতদিন পঠিত হবে, ততদিন তার লাবণ্য, তার সৌন্দর্য আর আকর্ষণী ক্ষমতার কোনো কমতি হবে না। বয়স যতই হোক না কেন, তার প্রেমে যুগে যুগে হাবুডুবু খাবেন তাবৎ জীবনানন্দ অনুরাগী। তাই নয় কি?
তথ্যসূত্রঃ
১. জীবনানন্দ দাশঃ জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, আবদুল মান্নান সৈয়দ/আবুল হাসনাত সম্পাদিত, অবসর প্রকাশনা, ২০০৭
২. অশোক মিত্র, বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৪
৩. অন্নদাশঙ্কর রায়, জীবনযৌবন, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩
৪. আকবর আলি খান, পরার্থপরতার অর্থনীতি, ইউনিভার্সিটিপ্রেস লিমিটেড, ২০১৬
৫. আজিজুর রহমান খান, বনলতার সন্ধানে, কালি ও কলম, ২০১৫
৬. উইকিপিডিয়া


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন