মগ্ন হয়ে গান শুনছিলাম। একমাত্র সংগীতেই নিজেকে পুরোপুরিভাবে সমর্পণ করা যায়। সময় পেলেই গান শোনাটা পরিণত হয়েছে অভ্যাসে। জীবনের আনন্দ-বেদনার সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছি সুরকে। যখন খুব মন খারাপ হয়ে যায়, তখন গানেই খুঁজে পাওয়া যায় পরম আশ্রয়। এরচেয়ে নিভৃত বন্ধু আর কেউ নেই। দুঃখের জমাটবাধা বরফের চাঁইকে একটু একটু করে গলিয়ে দেয়। আবার বুকের ভিতরে যখন বয়ে যায় সুখের প্লাবন, তখনও ইচ্ছে করে গান শুনতে। বনানীর এই মিউজিক ক্যাফেটা একটু অন্য রকম। ইনটেরিয়র ডেকোরেশনটা সহজেই মন কেড়ে নেয়। চারপাশে সবুজের আচ্ছাদন। আনকমন সব গাছগাছালি। দামি আসবাব দিয়ে সাজানো। মায়াবী আলো-আঁধারি। মোহনীয় পরিবেশ। একা একা বসে থাকা যায়। যেখানে বসে আছি সেখান থেকেও দেখা যায় ভিতরের দৃশ্যপট। নজর রাখা যায় বাইরের দিকেও। খুব মনোযোগ না দিয়ে দেখলে বাইরে থেকে আমাকে দেখার সুযোগ নেই। এমন একটি নিরিবিলি বসার আসন পেয়ে মনটা হয়ে উঠে খুশি খুশি।
ক্যাফের ভিতরে সবাই বসে আছেন জোড়ায় জোড়ায়। সুবেশি। উজ্জ্বল। উচ্ছ্বল। ওই পরিবেশে নিজেকে মোটেও মানানসই মনে হচ্ছিল না। ভাগ্যক্রমে সুযোগ পেয়েছি অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করে বসার। অনেকক্ষণ বসে আছি। বিয়ারের গ্লাসে ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছিলাম। উপভোগ করছিলাম লাইফ মিউজিক। কোনও কোনও গান ছুঁয়ে যাচ্ছিল হৃদয়। অচেনা শিল্পীরা একটির পর একটি গাইছিলেন পরিচিত সব গান। আমার একটা অভ্যাস, যা ভালো লাগে, তার মোহ এড়াতে পারি না। কোনো গান যদি স্পর্শ করে, সেই গানটি বার বার শুনতে থাকি। তাতে ক্লান্ত হই না। বিরক্ত হই না। বরং এক ধরনের নেশায় পেয়ে বসে। সে মুহূর্তে ভালো লাগার একটি গান বাজছিল। নচিকেতার ‘তুমি আসবে বলেই আকাশ মেঘলা বৃষ্টি এখনও হয় নি/তুমি আসবে বলে বলেই কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো ঝরে যায় নি’। নিজেও গুন গুন করছিলাম, ‘তুমি আসবে বলে আমার দ্বিধারা উত্তর খুঁজে পায় নি’।
আজকের দিনটি আমার জীবনের বিশেষ একটি দিন। প্রতি বছর এ দিনটি নিজে নিজেই সেলিব্রেট করি। অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা যায় না। যার সঙ্গে শেয়ার করা যেত, সে তো হারিয়ে গেছে জীবন থেকে। তাই যতই কাজ থাকুক না কেন, এ দিনটিতে পরিচিত পরিমণ্ডলের বাইরে চলে আসি। যেখানে হট্টগোল থাকে না। চেনা মুখের ভিড় থাকে না। শুধু থাকে একান্ত অনুভবটুকু। এবার কী মনে করে যেন অভিজাত এ এলাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এই ক্যাফেতে ঢুকে পড়ি। হতে পারে গানের টানে। গানে আর পানে যদি দিনটি উদযাপন করা যায়, এমন একটা মনোভাব হয়তো উদ্বুদ্ধ করে থাকতে পারে।
সন্ধ্যা প্রগাঢ় হতে থাকলে হাস্যোজ্জ্বল যুগলরা আসতে থাকেন। দেখতে ভালোই লাগছিল। ঝকমকে, ঝলমলে জীবন। যে যার মতো জীবনের আনন্দটুকু সম্ভোগ করে নিচ্ছিল। একটি জুটি আলাদাভাবে চোখে পড়ে। সিলভার কালারের টয়োটা প্রিমিও থেকে নেমে আসার সময়ই নজর কেড়ে নেয়। পুরুষটির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। সুদর্শন ও স্মার্ট। বেশ লম্বা। ফর্সা। স্যুটেডবুটেড। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির বড় কর্তার মতো ভাবভঙ্গি। তার বাহুলগ্না হয়ে থাকা নারীটির বয়স অনুমান করতে পারছিলাম না। মেয়েদের বয়স এমনিতেই বুঝতে পারি না। সাজসজ্জায় মেয়েটি নিজেকে এমনই পাল্টে ফেলেছে, প্রকৃত বয়স একদমই বোঝা যাচ্ছে না। রঙিন সানগ্লাশে মুখের অর্ধেকটাই আড়াল হয়ে আছে। কপালের অনেকখানি জুড়ে ছেয়ে আছে শ্যাম্পু করা ছটফটে চুল। অনুমান করা যায়, ত্রিশ পেরিয়েছে কিছু আগে। দেখতে অনেকটা হলিউড অভিনেত্রী সেলেনা গোমেজের মতো। একইরকম মুখাবয়ব। হেয়ারস্টাইলটা অবিকল একই। এটাকে কি মেসি হেয়ারস্টাইল বলে? মেয়েটির কপালে জ্বলজ্বল করছে বড় একটি টিপ। নাকে নাকছাবি। ঠোঁট রঞ্জিত গাঢ় লাল লিপস্টিকে। গলায় ঝিকমিক করছে সোনার চেইন। দুই আঙুলের আংটি থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে সোনারোদ। আর পরনে কারুকাজ করা সিল্কের গর্জিয়াস কালো শাড়ি। রোদেলা আকাশে ভেসে থাকা রঙধনুর মতো চারপাশটা যেন হেসে ওঠে।
ক্যাফের ভিতরে যে জায়গাটায় সদ্য আসা এই যুগল উপবেশন করে, সেখান থেকে মেয়েটিকে দেখতে পারছিলাম। মেয়েটি বোধকরি আমাকে দেখতে পাচ্ছিল না। না পাওয়ারই কথা। তাছাড়া আমার সামনে শোভা পাচ্ছে নৃত্যের ভঙ্গিমায় একটি জাপানি বনসাই। গানে গানে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছিল। হঠাৎ হঠাৎ দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল মেয়েটির দিকে। এভাবে নির্লজ্জের মতো সাধারণত কারও দিকে তাকানো হয় না। তারপরও কেন জানি ওদিকেই বার বার চোখ চলে যাচ্ছিল। কী কথায় যেন অপরূপভাবে হেসে উঠে মেয়েটি। তাতে দীপ্তি ছড়ায় তার গুপ্ত গজদাঁতটিও। চমকে উঠে ভিতরটা। আরে! এ হাসি, এ গজদাঁত তো অনেক চেনা। এমনটি তো দ্বিতীয় আর কারও হওয়ার কথা নয়। অনেকক্ষণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর তলিয়ে যেতে থাকি নস্টালজিয়ায়।
আমার অনেক অক্ষমতা আছে। পারতপক্ষে কারো সঙ্গে মিশতে পারি না। আমার চেনাজানার গণ্ডি খুবই সীমিত। তবে একবার যদি মনের মিল হয়ে যায়, তাহলে আর সরে আসতে পারি না। ওপরে ওপরে শান্তশিষ্ট মনে হলেও ভিতরে ভিতরে আমি দারুণ অস্থির। সারাক্ষণ কল্পনার সমুদ্রে সাঁতার কাটতে থাকি। এমন সব কল্পনা, যার কোনো মাথামুণ্ডু নেই। বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকার প্রশ্নই আসে না। যা কারো সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায় না। এ কারণে সবার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারি না। নেটে নেটে কীভাবে কীভাবে যেন শামীমার সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায়। কিছু দিন চ্যাট করার পর মনে হলো, এত দিনে ঠিক ঠিক জহুরি খুঁজে পেয়েছি। বুকের মধ্যে গুনগুনিয়ে উঠেন কাজী নজরুল ইসলাম, ‘এত দিনে পেয়েছি তারে আমি যারে খুঁজেছি’। শামীমাও অনেকটা আমার মতো কল্পনাবিলাসী। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার চেয়েও এক ধাপ এগিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই একই মোহনায় মিলে যায় দু’জনের চিন্তা-ভাবনা। তারপর তো তারে তারে কত না কথা। ভাবের আদান-প্রদান। একে অপরের কাছে সবটুকু উজাড় করে দেওয়া। প্রথম যেদিন দেখা হয়, সেদিন শামীমার হাসি আর গজদাঁত আমাকে বিভোল করে দেয়। সে কথা বলতেই আলোকিত হয়ে উঠে তার মুখচ্ছবি। তাকে বলি, তুমি যদি কখনও হারিয়ে যাও, তোমার হাসি আর গজদাঁত হারিয়ে যাবে না। এটা কখনও ভুলতে পারবো না। ওর চুলগুলো ছিল দেখার মতো। হাঁটুর নিচে নেমে যাওয়া চুলগুলো দিয়ে পুরো শরীর ঢেকে রাখতে পারতো। খুব একটা ফ্যাশনেবল মেয়ে নয়। সাদামাটা। সহজ-সরল।
তারপর তো সম্পর্কটা নিবিড়তর হয়ে উঠতে থাকে। আমার সংস্পর্শে আসার পর বদলে যেতে থাকে একটু একটু করে। ওর ভিতরে ঘুমিয়ে থাকা বাঘিনীটাও যেন জেগে উঠতে থাকে। ওর সাহস দেখে আমিও অবাক হয়ে যাই। ভিতু এই আমিও বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকি। দুজন দুজনকে ছাড়া কল্পনা করা যাচ্ছিল না। যদিও মনের মিল থাকলে আর কিছুর প্রয়োজন পড়ে না। তারপরও দুজনের সম্পর্কটাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর জন্য আমরা একমত হই। যেটা হবে আমাদের ভালোবাসার প্রতীক। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? আমরা উভয়ই বিবাহিত। সন্তানের জনক-জননী। আইনকানুন, সামাজিক রীতিনীতি অনুসারে আমাদের বিয়ে করার সুযোগ নেই। যদিও এটা আমরা থোরাই কেয়ার করি। কিন্তু আমরা কারো ক্ষতির কারণ হতে চাই না। যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমাদের সম্পর্কটাকে স্থায়ী বন্ধনে আবদ্ধ করার, যে বন্ধনটা আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে থাকবে, সেহেতু পারিবারিক সম্পর্কটাকে টিকিয়ে রেখে কীভাবে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলা যায়, সেটাই ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কোনও কূল-কিনারা করতে পারা যাচ্ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, আমরা গান্ধর্ব প্রথা অনুসারে দাম্পত্যবন্ধনে আবদ্ধ হবো। যেখানে কাজী লাগবে না। সাক্ষীসাবুদ লাগবে না। দলিলপত্র লাগবে না। কোনো নিয়মকানুনের পরোয়া করতে হবে না। লাগবে শুধু ভালোবাসা। অকৃত্রিম ভালোবাসা। তাতে তো আমাদের কোনও কমতি নেই। যেই ভাবা সেই কাজ।
বৈশাখের এক তপ্ত দুপুরে আমাদের মতো করে বিয়ের আয়োজন করা হয়। বিয়েটা ছিল সব দিক দিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী। ভাসমান একটি নৌকায় মাঝির উপস্থিতিতে আমি শামীমার অনামিকায় পরিয়ে দেই বন্ধনের আংটি। দুজন দুজনকে সাক্ষী রেখে সাদা কাগজে নিজেদের মতো কিছু কথা লিখে বিয়ের অঙ্গীকারনামা করি। বিয়েটা উদযাপন করা হয় চকলেট দিয়ে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সন্তানের জনক-জননী হওয়ার। এমনকি নামকরণ করা হয় অনাগত সন্তানের।
চাইলেও তো আর জীবনের সব হিসেব মিলে যায় না। জীবনসঙ্গী হিসেবে শামীমার সবই ভালো লাগে। মজা করতে পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে অকারণেই ক্ষুব্ধ হয়। যুক্তি ছাড়াই উত্থাপন করে এন্তার অভিযোগ। যার কোনও ভিত্তি থাকে না। নিজেদের নিয়মে বিয়ে করার পর তার এই প্রবণটা বাড়তে থাকে। কথায় কথায় অপমান করতে একটুও দ্বিধা করে না। কেন যে এমন করে, ঠিক বুঝতে পারা যায় না। তার সব অপমান নীরবে হজম করে নিতে হয়। কবি আবুল হাসানের অমর পংক্তি ‘ঝিনুক নীরবে সহো’ হয়ে উঠে আমার প্রাত্যহিক জীবনের মূলমন্ত্র। তাকে খুশি করার জন্য চেষ্টার কোনও কমতি থাকে না। যদিও সেটা সহজ ব্যাপার নয়। দিনে দিনে তিক্ততা বাড়তে থাকে। দুজনের যোগাযোগ হয় মূলত ইন্টারনেট আর মোবাইলে। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই আমাকে তার ফেসবুকে ব্লক করে দেয়। ফোন করলে রেসপন্স করে না। আমি অনেকটাই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। তারপরও যতটা পারা যায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করি। কোনোভাবেই আমি তার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে চাই না। সে তার মতো করে আমাকে চরমভাবে অপমান করে। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকে।
এক পর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেই যোগাযোগ। সেটা যে স্থায়ী হয়ে যাবে, বুঝতে পারি নি। ভেবেছি, ও ওর ভুল বুঝতে পারবে। আমার ভালোবাসার গভীরতা অনুধাবন করতে পারবে। এ ভাবনাটা আমার বড় ভুল। ও যে ভিতরে ভিতরে কত কঠিন, সেটা পলে পলে অনুভব করতে থাকি। মনে হতে থাকে, আমাদের এত এত ভালোবাসা, সবটাই কি তাহলে কুহক, সবটাই কি মায়া? সবটাই কি মরীচিকা? এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। ভুলে যাই আমার যত রাগ, আমার যত অভিমান। অনেক দিন পর পুনরায় যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু আগের ঠিকানায় তাকে খুঁজে পাই না। আগের কর্মক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। আগের ফোন নম্বরে প্রিয় গান বাজে না। আর তার সোশ্যাল মিডিয়ায় তো নিষিদ্ধ হয়ে আছি। মাথাকুটেও তাকে আর পাই না। সে যেন আমার জীবন থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এভাবে পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। তবুও তাকে নিরন্তর খুঁজে চলি। পাই না। যেন এই শহরে সে নেই। কখনও ছিল না। কোথায় যে আছে, সেটাও তো জানি না। অথচ তাকে ভুলতেও পারি না। জীবনে অনেক কিছু ভুলে যাওয়া যায়, কিছু কিছু বিষয় কখনই ভুলে যাওয়া যায় না। আমাদের বিয়ের দিনটিও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। এ দিনটিতে কে যেন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায়।
কতক্ষণ আতমগ্ন হয়েছিলাম, খেয়াল ছিল না। মাথাটা কেমন যেন ঝিম ঝিম করতে থাকে। একটু যেন বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। ধাতস্থ হয়ে চারপাশে নজর বুলাই। ক্যাফে ততক্ষণে হয়ে উঠেছে অনেকটাই নির্জন। বাদ্যযন্ত্রে মৃদুলয়ে বাজছে শ্রীকল্যাণ রাগ। খুব একটা কোলাহল নেই। সেই যুগলও কখন যেন চলে গেছে। কেমন একটা শূন্যতায় আক্রান্ত হই। কম বয়সী একজন বিয়ারার এসে একটি টিস্যু পেপার বাড়িয়ে দেয়। ভাঁজ খুলে দেখতে পাই, তাতে লিপস্টিক দিয়ে লেখা, ‘হ্যাপি ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি’। সেটা পাঠ করার পর অনুভব করতে থাকি গজদাঁতের দুষ্টু দুষ্টু হাসি।


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন