আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সৃষ্ট স্নায়ুযুদ্ধের সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এখন আর তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। অথচ এই দুই পরাশক্তির আধিপত্য নিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিদ্যমান ছিল, তার জন্য কত না খেসারত দিতে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই শান্তিপ্রিয়দের কাছে বিশ্বশান্তি ছিল প্রার্থিত। সেই আলোকে ১৯৮৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম, 'বিশ্বশান্তিঃ দুই পরাশক্তির দর-কষাকষি'।
বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে আশান্বিত করে আগামী শরতে ওয়াশিংটনে রুশ-মার্কিন শীর্ষ বৈঠক বসছে। ওয়াশিংটনের মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে, বিশ্বধ্বংসী পারমাণবিক অস্ত্রসম্ভার যাঁদের আদেশের অপেক্ষায় সদা প্রস্তুত, সেই দুই রাষ্ট্রনেতা গর্বাচেভ আর রিগান আবারও মুখোমুখি হবেন। দু'জনেরই ঘোষিত উদ্দেশ্য, এক সমূহ বিনষ্টির আশংকা থেকে বিশ্বকে কী উপায়ে উদ্ধার করা যায়? পরস্পরের সম্পর্কে তাঁদের দু'দেশের যে সন্দেহ, অবিশ্বাস আর ভয় থেকে মারণশক্তির প্রতিযোগিতার উৎপত্তি, কী করে তাকে কমিয়ে আনা যায়? কোন পথে এগুলে পরস্পরের ওপর সেই আস্থা এবং বিশ্বাস তাঁরা খুঁজে পান, যার ওপর নির্ভর করছে মানবজাতির জীবন-মৃত্যু ।
গত বছর এগারো ও বারোই অক্টোবর আইসল্যান্ডের রাজধানী রিকজাভিকেও শান্তির সদিচ্ছা আর আন্তরিকতা নিয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন পৃথিবীর দুই বৃহত্তম শক্তির কাণ্ডারী রিগান-গর্বাচেভ। এরও আগে পঁচাশির উনিশ, বিশ, একুশে নভেম্বর জেনেভা বৈঠকে এই দুই নেতা তাঁদের মধ্যে আলোচনার শুভ সূচনা ঘটিয়েছেন। কিন্তু দু’ শীর্ষ বৈঠকে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের জীবন-মৃত্যুর হিসেব হেরফের না হলেও তাঁদের প্রাপ্তি ঘটেছে স্বস্তির। কেননা যতক্ষণ বিশ্বের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণকারী দুই কর্তা পরস্পরের সঙ্গে হাসি এবং করমর্দন বিনিময় করবেন, একসঙ্গে বসে কথাবার্তা চালাবেন, ততক্ষণ বিশ্বের পাঁচশত কোটি লোকের মনে বয়ে যাবে শান্তির প্রলেপ। সব সুস্থ মনের মানুষই চান যাতে এই ধরনের শীর্ষ বৈঠক বসে, যাতে পৃথিবীর দুই সর্বাধিক শক্তিশালী নেতা তাঁদের যা সংশয়, সমস্যা ও বিরাগ, তা সরাসরি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই কমিয়ে আনতে পারেন। যদি উভয় পক্ষের সংশয় দূরীভূত হয় কোনওভাবে, তবে সব বিষয়ে মতপার্থক্য মুহূর্তেই ঘুচে না যাক ধীরে ধীরে তা কমে আসবেই। এই আলাপ-আলোচনার কারণে ইতিমধ্যে অবস্থার বেশ পরিবর্তন ঘটছে ।
পৃথিবীর মানুষের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যেখানেই শোনা গেছে, সেখান থেকে ধ্বনি উঠেছে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ কর, পারমাণবিক বিভীষিকার প্রশমন কর, সামূহিক মৃত্যুর সম্ভাবনা বিনষ্ট কর। এখন যাদের দিকে সারা বিশ্ব তাকিয়ে আছে, সেই দুই দেশের কী মনোভাব এ বিষয়ে? প্রকাশ্যে তো তাঁরা ঘোষণা করেন, সম্মেলন সফল হোক দু’পক্ষের সেই লক্ষ্য। কিন্তু লক্ষ্যের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পদক্ষেপ সব সময় মেলে না। অস্ত্র হ্রাস করা প্রয়োজন, সে বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন, দু'পক্ষই তা স্বীকার করেন। দেশের ধন-সম্পদের যে বিপুল অংশ অস্ত্র প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত, যতটা সম্ভব তার মুখ মৃত্যুর দিক থেকে জীবনের দিকে ফিরিয়ে দেয়া দরকার। তাও মানেন উভয় পক্ষই। কিন্তু এসব সুস্থ-সুন্দর উপলব্ধি ও চিন্তার কথা তাঁরা আজই নতুন ঘোষণা করছেন না। বাস্তবে বাধা কী কী?
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হিটলারের সঙ্গে লড়েছে, তখনও হৃদয় তাঁদের সন্দেহমুক্ত ছিল না। সেই কারণেই রণাঙ্গনে কামান বন্দুকের গর্জন থামতে না থামতে স্নায়ু প্রাঙ্গণে ভিন্ন জাতের এক লড়াই শুরু হয়ে যায়। যা অদ্যাবধি চলছে। অবশ্য এরপর সোভিয়েত-মার্কিন বেশ ক’বার আলোচনার টেবিলে বসেছে।
১৯৬৩ সালে ওয়াশিংটন-মস্কো হটলাইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং এই ব্যবস্থাধীনে উভয় রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে টেলিফোন টারমিনাল ও দুটি সার্বক্ষণিক ডুপ্লেক্স সার্কিট ’এর একটি টেলিগ্রাম তার এবং অপরটি রেডিও টেলিগ্রাফ পদ্ধতিতে সংযুক্ত। ১৯৭১ সালে স্বাক্ষরিত আমেরিকা-সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি সংযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন সংক্রান্ত চুক্তিতে উপগ্রহ যোগাযোগের ভিত্তিতে আরো দু’টি অতিরিক্ত সার্কিট প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়। ঐ বছরই সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক যুদ্ধ বাধার ঝুঁকি হ্রাসের ব্যবস্থা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করে যা 'আণবিক দুর্ঘটনা' চুক্তি নামে পরিচিত। চুক্তিতে উভয় রাষ্ট্র দুর্ঘটনাক্রমে অথবা প্রাধিকারহীনভাবে আণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্ব স্ব প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নে অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। অধিকন্তু উভয়ে প্রতিশ্রুতি দান করে যে, যদি দুর্ঘটনাক্রমে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষিপ্ত হয়, তবে একে অপরকে তৎক্ষণাৎ এ সম্পর্কে অবহিত করবে এবং উৎক্ষিপ্ত স্বীয় ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসের ব্যবস্থা নেবে।
উভয় পক্ষ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় যে, অপরকে লক্ষ্য করে জাতীয় সীমা অতিক্রমকারী কোনও পরিকল্পিত পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ ঘটলে এ বিষয়ে পূর্বাহ্নে অবহিত করা হবে। ১৯৭৩ সালের আংশিক পরীক্ষা নিষিদ্ধ চুক্তি (পিটিবিটি) অনুযায়ী নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় বায়ুমণ্ডল, মহাশূন্য ও সমুদ্রতলে আণবিক অস্ত্র পরীক্ষা। এই চুক্তি প্রণয়ন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স এবং তারা ছাড়াও আরও ১০৮টি দেশ চুক্তি অনুমোদন করেছে। ১৯৭৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৫০ কিলোটনের অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভূ-গর্ভস্থ পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা সূচনামূলক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (টিটিবিটি) নামে পরিচিত। চুক্তিতে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে আণবিক পরীক্ষা সীমিত রাখা হয় এবং ভূ-কম্পনীয় যাচাই ব্যবস্থার সহায়ক প্রযুক্তিগত তথ্য বিনিময়ের বিধান সন্নিবেশিত হয়। টিটিবিটি চুক্তি অনুযায়ী পক্ষসমূহ সার্বিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের জন্য আলোচনা অব্যাহত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।
১৯৬৮ সালে আণবিক অস্ত্র প্রসাররোধ চুক্তি স্বাক্ষরের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছিল তারা এখন স্ট্র্যাটেজিক অস্ত্র প্রশ্নে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় ব্রতী হতে আগ্রহী। এই আলোচনা স্ট্র্যাটেজিক অস্ত্র সীমিতকরণ আলোচনা বা সল্ট নামে পরিচিত। ১৯৭২ সালে প্রথম দফা আলোচনার পরিসমাপ্তি ঘটে সল্ট-১ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে। চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিরোধী চুক্তি (এবিএম) এবং ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সীমিতকরণ কতক ব্যবস্থা সংক্রান্ত অন্তঃবর্তী সমঝোতা। ১৯৭২ সালের এবিএম চুক্তি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিরোধী স্থাপনের সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়। ব্যালিস্টিক বিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মোট সংখ্যা ও স্থাপন-ক্ষেত্র বিশেষভাবে নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়। আণবিক একশ' ক্ষেপণাস্ত্রসহ দু'টি ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অঙ্গীকারেও আবদ্ধ হয় যে, তারা স্থানান্তরযোগ্য অথবা ভূ-ভিত্তিক, সমুদ্রভিত্তিক, আকাশভিত্তিক ও মহাশূন্যভিত্তিক এবিএম ব্যবস্থার উন্নয়ন, পরীক্ষা ও মোতায়েন থেকে বিরত থাকবে। তদুপরি প্রতিপালন যাচাইয়ের জন্য চুক্তিতে শুধুমাত্র জাতীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থা ব্যবহারের বিধান রাখা হয় এবং এতদসংক্রান্ত কোনও অস্পষ্টতা ও সংশয় বিবেচনার জন্য স্থায়ী পরামর্শদাতা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। ১৯৭৪ সালে পক্ষদ্বয় একটি প্রটোকলে স্বাক্ষরদান করে, যা উভয় দেশে এবিএম মোতায়েন ক্ষেত্র একটিতে সীমিত করে দেয় ।
১৯৭২ সালের চুক্তিতে সার্বিক চুক্তি সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত পাঁচ বৎসরের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়। পাঁচ বৎসর পর ১৯৭৭ সালের সেপ্টেম্বরে পক্ষদ্বয় আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মারফত জানায় যে, তারা অন্তঃবর্তী মতৈক্যের শর্তসমূহ মেনে চলবে। এই শর্তানুযায়ী কোনও পক্ষই অতিরিক্ত নিশ্চল ভূ-ভিত্তিক আইসিবিএম (আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র) নির্মাণ শুরু করবে না কিংবা হালকা আইসিবিএম উৎক্ষেপকগুলো ভারী আইসিবিএম উৎক্ষেপকে রূপান্তর করবে না। মতৈক্য অনুযায়ী সোভিয়েত ইউনিয়নের ডুবোজাহাজ উৎক্ষিপ্ত ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (এসএলবিএম) সংখ্যা সীমিত থাকবে ৯৫০-এ এবং আণবিক ডুবো জাহাজে মৎস্য অনধিক ৬২তে, অপরদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এসএলবিএম সংখ্যা সীমা হচ্ছে ৭১০ এবং ডুবোজাহাজ অনধিক ৪৪। ১৯৭২ সালে শুরু হয় সল্ট-দুই আলোচনা এবং ফলস্বরূপ প্রণীত হয় ট্র্যাটেজিক আক্রমণাত্মক অস্ত্র সীমিতকরণ চুক্তি। সল্ট-দুই চুক্তির মূল কাঠামো প্রথম আলোচিত হয় ১৯৭৪ সালে ভলাডিভোস্টকে, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। পরে ১৯৭৯ সালে ভিয়েনায় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং চুক্তি অনুযায়ী উভয় পক্ষ স্বীয় স্ট্র্যাটেজিক অস্ত্রবাহক যানের মোট সংখ্যা প্রাথমিকভাবে হ্রাস করে ২৪০০-তে এবং পরে ১৯৮১ সালের মধ্যে ২২৫০এ। একাধিক স্বতন্ত্রভাবে লক্ষ্যভেদী পুনঃপ্রবেশ যান যুসংক্ত (এমআই-আরডি) ব্যালেষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ভারী বোমার সংখ্যা সর্বমোট সমভাবে ১৩২০টিতে সীমিত রাখার বিধান রয়েছে। তদপুরি মির্ভ (এমআরআরভি) যুক্ত ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উচ্চ সীমা নির্ধারিত হয়েছে ১২০০, এর মধ্যে কেবল ৮২০টিতে হতে পারবে আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম)। আইসিবিএমে মির্ভ যুক্ত করা হলে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র বোমামুখের সংখ্যা দুশোর বেশি হতে পারবে না, এসএলবিএমের ক্ষেত্রে এই সর্বোচ্চ সংখ্যা হচ্ছে ১৪ এবং ভারী বোমারু বিমান গড়ে বিমান প্রতি ২৮টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারবে। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত চুক্তি বলবৎ ছিল। চুক্তির আরেকটি ধারা অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহনযোগ্য বা সচল আইসিবিএম ৬০০ কিলোমিটারের বেশি পাল্লার ভূ এবং সমুদ্রভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশ থেকে ভূমিতে নিক্ষেপক ব্যালিষ্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এছাড়া চুক্তির লক্ষ্যদ্বয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নীতিমালা সংক্রান্ত যুক্ত ঘোষণায় সম্মতি ব্যক্ত করে যে তারা ট্রাটেজিক স্থিতিশীলতা সংহত ও তা বিনষ্টকারী স্ট্র্যাটেজিক প্রতিরক্ষা অস্ত্র সীমিতকরণ এবং আকস্মিক আক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস ও পরিহারে সচেষ্ট হবে। তাছাড়া আক্রমণাত্মক অস্ত্র বিপুলভাবে হ্রাস এবং তাদের গুণগত উন্নয়ন সীমিত করতেও তারা সচেষ্ট হবে বলে সম্মতি প্রকাশ করে। উপরন্তু উভয়পক্ষ একটি উপাত্ত ভিত্তিক চুক্তিও স্বাক্ষর করে। এতে ১৯৭৯ সালের জুন মাসে উভয়ের আক্রমণাত্মক অস্ত্রের সংখ্যা তালিকাবদ্ধ করা হয়। অবশ্য সল্ট-২ চুক্তি সম্পাদন হলেও আফগানিস্তানে সোভিয়েত উপস্থিতির প্রতিবাদে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনো তা অনুমোদন করেনি। তৎসত্ত্বেও সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথকভাবে ঘোষণা করেছে যে, তারা চুক্তির বিধানসমূহ ততকাল মেনে চলবে যতকাল অপরপক্ষও তা মান্য করবে।
১৯৮২ সালের জুন থেকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্র্যাটেজিক আণবিক অস্ত্র ব্যবস্থা সংক্রান্ত নতুন পর্যায়ে আলোচনা শুরু করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নে এই আলোচনা পরিচিত ট্র্যাটেজিক অস্ত্র সীমিত ও হ্রাসকরণ আলোচনা হিসেবে এবং আমেরিকার ট্র্যাটেজিক অস্ত্র সীমিতকরণ আলোচনা (স্টার্ট) হিসেবে। কয়েক দফা আলোচনা সম্পন্ন হলেও দেখা গেছে দুই পক্ষের দৃষ্টিভঙ্গির নানা ভিন্নতার দরুণ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব হয়নি। ১৯৮১ সালের নভেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আণবিক অস্ত্র সম্পর্কিত আলোচনা শুরু করে। এই আলোচনা সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে অভিহিত ইউরোপে আণবিক অস্ত্র সীমিতকরণ আলোচনা হিসেবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মধ্য পাল্লার আণবিক শক্তি সীমিতকরণ (আইএনএফ) আলোচনা রূপে। ইউরোপে আরো অতিরিক্ত এমনি অস্ত্র মোতায়েন প্রশ্নে মার্কিন-সোভিয়েত মতবিরোধের ফলে ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। দফাওয়ারী আলোচনার শেষে ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজিক আণবিক অস্ত্র ব্যবস্থা সংক্রান্ত পরবর্তী আলোচনার তারিখ নির্ধারণে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু সোভিয়েত নেতৃত্বে রদবদল ঘটলে গর্বাচেভ আসার পর দু’দেশের মধ্যেকার সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। উভয় পক্ষের পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের মধ্যে একাধিকবার বৈঠকের পর ১৯৮৫ সালের নভেম্বরে গর্বাচেভ-রিগান জেনেভায় শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকের আগে সোভিয়েতের নমনীয় ভূমিকা উল্লেখযোগ্য । তৎকালীন একটি সংবাদ সংস্থা জানায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমস্ত রকম পারমাণবিক পরীক্ষার ওপর স্বেচ্ছায় যে নিষেধ এখন জারি রেখেছে, ছিয়াশিতেও তা চালু রাখতে রাজি। কোনো শর্ত ছাড়াই তারা সম্ভবত পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা নিষেধ চুক্তি হওয়া আলোচনায় অগ্রাধিকার বলে তাঁরা মনে করেন। চুক্তি পালনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তথ্যের আন্তর্জাতিক আদান প্রদানের প্রয়োজনীয় সুবিধার জন্য ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রস্তাবও রাশিয়া দেয়। রিগান জাতিসংঘে ভাষণে বলেন, আসুন আমরা দু'পক্ষই জেনেভায় যাই এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে যে, আমরা একসঙ্গে নির্ভয়ে পথ ধরে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করি, স্বায়ী শান্তির ভিত্তি রচনা করি। তিনি আরো বলেন, পারমাণবিক যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। সে যুদ্ধ কখনোই করা চলে না। সেই জন্য জেনেভাতে আমেরিকা আলোচনা করবে আক্রমণাত্মক পারমাণবিক অস্ত্রের বিপুল সম্ভারসমূহ সমূলে এমনভাবে হ্রাস করার কথা, যা হবে উভয় দেশের পক্ষে ন্যায়সঙ্গত এবং যা যাচাই করা যাবে। উভয় পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছার পরও আলোচনায় বাস্তবভিত্তিক কোন ফলাফল পাওয়া যায়নি। এর এগারো মাস পর রিকজাভিকে রিগান-গর্বাচেভ পৃথিবীকে শান্তিপ্রিয় মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তোলার সদিচ্ছা নিয়ে বৈঠকে বসেন। কিন্তু ফলাফল পূর্বাপর । পারস্পরিক অবিশ্বাস রিগানের ষ্ট্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিসিয়েটিভ 'ষ্টার ওয়ার' প্রকল্প সোভিয়েত ইউনিয়নের পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিরতির প্রস্তাব, চুক্তির শর্তাদি সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তখানি মানছে, তা স্থির করার ব্যাপারে আমেরিকার সংশয়, সোভিয়েত ইউনিয়ন কতটা প্রচারমূল্য কুড়িয়ে নেবার চেষ্টা চালাচ্ছে, আর প্রস্তাবটি দেবার ব্যাপারে রিগানের আন্তরিকতা কতটুকু-এই সব সংশয়ের কারণে গর্বাচেভের মতান্তর ঘটে। শীর্ষ বৈঠকের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন বলছে, আমরা এই শতাব্দীর মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের সম্ভাবনাতে ইতি টানতে চাই। সে জন্য আমরা প্রস্তাব দিচ্ছি, সব পরমাণু অস্ত্র নির্মাণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ করে দেয়া হোক। আমরা এককভাবে অস্ত্র পরীক্ষা তো বন্ধ রেখেছি। তদুপরি গর্বাচেভ রিকজাভিকে প্রস্তাব দিয়েছেন যে, ইউরোপে উভয় পক্ষের যে ক্ষেপণাস্ত্রাদি রয়েছে, তা অকেজো করে ধ্বংস করে ফেলা হোক। গর্বাচেভ অভিযোগ করেন যে, মার্কিন সরকার এই সঙ্গত প্রস্তাবকে আমল দিতে চায় না। এবং সেই কারণেই রিকজাভিকে আমরা যে ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম তা নেয়া গেল না। অন্যদিকে রিগান বলেন, মূল সমস্যা সোভিয়েত ইউনিয়ন এড়িয়ে যেতে চাইছে। যদি সঞ্চিত অস্ত্র ভাণ্ডার ঠিক কতটা তা জানা না যায়, তবে কোন দেশ কত অস্ত্র নষ্ট করে ফেলল, তার পরিমাণ জানতে পারলেও শেষ পর্যন্ত লাভ কী হবে? মার্কিন প্রতিনিধিরা বলছেন, ‘স্টার ওয়ার’ প্রকল্পটাকে একপেশে রেখে অন্য সব সমস্যা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আলোচনায় বসছে না কেন? এই ধোকাবাজি বিশ্ব জনমতকে বিভ্রান্ত করার খেলাটা কেন? দুটি শীর্ষ বৈঠকের পর মার্কিন সোভিয়েত পারস্পরিক দোষারোপের পরও সোভিয়েত রাশিয়া আলোচনার পথকে সুগম রেখেছে। এরফলে দু'দেশের মধ্যে বিশেষজ্ঞ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক নিয়মিত চলতে থাকে। পারস্পরিক আলোচনায় শান্তিকামী মানুষ পূর্বেকার বৈঠকের ব্যর্থতায় হতাশ হওয়ার পরও আশান্বিত হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে সোভিয়েতের আন্তরিকতা বিশ্বের সকল মানুষের সহানুভূতি পায়। আর এই ইতিবাচক পদক্ষেপের সদিচ্ছার প্রেক্ষিতে সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এডোয়ার্ড শেভার্দনাদজে গত ১৩ই সেপ্টেম্বর ওয়াশিংটন পৌছান। প্রায় তিন দিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ শুলজের সাথে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের সকল মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র সম্পূর্ণ নির্মূলে ঐতিহাসিক চুক্তি সই করতে সম্মত হয়েছে। শুলজ-শেভার্দনাদজে বৈঠকের পর এক নাটকীয় ভাষণে প্রেসিডেন্ট রিগান এই ঐকমত্যের কথা ঘোষণা করে বলেন, এই শরতেই তিনি এবং সোভিয়েত নেতা গর্বাচেভ একটি শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়ে চুক্তি সই করবেন। অন্যদিকে মস্কো থেকেও এই মতৈক্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ভূমিভিত্তিক মাঝারি পাল্লার অর্থাৎ পাচ'শ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পাল্লার সকল ক্ষেপণাস্ত্রই ধ্বংস করা হবে। এগুলোর বেশীরভাগই ইউরোপে মোতায়েন রয়েছে। পশ্চিম জার্মানীও তার ৭২টি পার্শিং ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপ করার কথা দিয়েছে। এছাড়া আলোচনা বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা দুই পক্ষ আগামী নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু করবে, এই চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়।
প্রস্তাবিত মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূলের সোভিয়েত-মার্কিন চুক্তির আওতায় পৃথিবী থেকে এক হাজারেরও অধিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বিলুপ্ত হবে। চুক্তির আওতায় পড়বে ১০০০-৫০০০ কিলোমিটার পাল্লার সকল ধরনের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র। এছাড়া এর আওতায় ৫০০-১০০০ কিলোমিটার পাল্লার সকল পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রও ধ্বংস করা হবে।
লন্ডনের আন্তর্জাতিক ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউট সূত্রে প্রাপ্ত উপরোক্ত পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একটি হিসেবঃ
যুক্তরাষ্ট্রঃ পশ্চিম জার্মানীতে মোতায়েন একক ওয়ারহেডবাহী ১০৮টি পার্শিং-২। ন্যাটোর মতে এগুলোর পাল্লা ১৮০০ কিলোমিটার (মস্কোয় আঘাত হানতে সক্ষম নয়)। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতে মস্কোয় আঘাত হানতে সক্ষম। বৃটেনে ৯৬টি, পশ্চিম জার্মানীতে ৬৪টি, ইতালীতে ৮০টি ও বেলজিয়ামে মোতায়েন ১৬টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। পাল্লা ২৫০০ কিলোমিটার। ১৯৮৮ সাল নাগাদ ইউরোপে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ৪৬৪-তে উন্নীত করার কথা ছিল। এছাড়া পশ্চিম জার্মানীতে আরো রয়েছে ৭২০ কিলোমিটার পাল্লার ৭২টি পাশিং-১ ক্ষেপণাস্ত্র।
সোভিয়েত ইউনিয়নঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের ইউরোপীয় ভূখণ্ডে ৪৪১টি এবং এশীয় ভূখণ্ডে মোতায়েন ১৭১টি এস এস-২০ ক্ষেপণাস্ত্র। তিন ওয়ারহেডবাহী এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ৫০০০ কিলোমিটার। সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলে মোতায়েন ১১২টি এস এস-৪ ক্ষেপণাস্ত্র। পাল্লা-২০০০ কিলোমিটার। ৯০০ কিলোমিটার পালার ১৩০টি এস এস-১২ ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলোর মধ্যে ৬৫টি পূর্ব জার্মানী ও চেকোশ্লোভাকিয়ায়, ২৭টি সোভিয়েত ইউনিয়নের পশ্চিমাঞ্চলে এবং ৩৮টি সোভিয়েত দূরপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে।
মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপ চুক্তিতে 'স্বাক্ষরে নীতিগতভাবে' একমত হওয়ার কথা ঘোষণা করলেও রিগান সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে অতীতের মন্তব্য থেকে সরে আসতে অস্বীকার করে বলেন, আমি এখনো মনে করি না যে, সে ‘ধোয়া তুলসী পাতা'।
আসলে ৫৬ বছর বয়স্ক আইনের ছাত্র মিখাইল গর্বা চেভের তুলনায় ৭৬ বছর বয়স্ক এককালের দ্বিতীয় শ্রেণীর অভিনেতা রোনাল্ড রিগান এখনও মেজাজে কড়া ও উচ্চাভিলাষী।
সোভিয়েত-মার্কিন মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপের মতৈক্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পাশাপাশি শান্তিকামী মানুষ আনন্দিত। কেননা এর ফলে সামগ্রিক নিরস্ত্রীকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু বিশ্বকে নিরস্ত্রীকরণের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। কেননা এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সদিচ্ছা যদিও থেকে থাকে, কিন্তু তাদের পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নিরস্ত্রীকরণের সহায়ক নয়। এখানেই সোভিয়েতের সাথে তাদের গুণগত প্রভেদ রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুক্ত অর্থনীতির ধারক হওয়ায় তাদের ব্যক্তি মালিকানার দুয়ার অবারিত। সেখানে পুঁজিবাদীদের উপর সরকারের হস্তক্ষেপ জোরালো নয়। ফলে ব্যক্তি মালিকানায় অস্ত্রের বাজার প্রসার করে আমেরিকান পুঁজিবাদীরা নিরস্ত্রীকরণের পথ ও মতকে তোয়াক্কা করে না। যে কারণে পুঁজিবাদীদের স্বার্থ রক্ষার্থে মার্কিন প্রশাসন অস্ত্রের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে আন্তরিক নয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রের উপর রাশিয়ার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরশীল। মার্কিনীদের সৈন্যবাহিনীর আকার অনেক ছোট, তার প্রথাগত অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভারও ক্ষুদ্রতর। এখানে দু’দেশের প্রতিরক্ষা উল্লেখ করা যায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রঃ ১৯৮৫ সালের জুলাই-এর হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী - ২১ লাখ ৫১ হাজার ৫শ' ৬৮, সেনা – ৭৮ হাজার ৬ শ ৪৮, বিমান ৬ লাখ ৩ হাজার ৮শ ৯৮, নৌ-৫ লাখ ৬৮ হাজার ৭শ' ৮১ এবং মেরিন-১ লাখ ৯৮ হাজার ২শ' ৪৭। প্রকৃতপক্ষে এ সংখ্যা হবে ১২ লাখ, ১২ হাজার ২শ' ৫৪। এছাড়া পারমাণবিক অস্ত্রসহ ট্র্যাটিজিক এয়ার কমাও ও সাব-মেরিন সুসজ্জিত। যুক্তৃরাষ্ট্র ন্যাটো ও আনজুসের সদস্য। প্রতিরক্ষা বাজেট ১৯৮৪-৮৫ সালে ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬ শ' ৭৫ মিলিয়ন ডলার এবং ১৯৮৫-৮৬ সালে প্রস্তাবিত ২ লাখ ৬৭ হাজার ১ শত মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে তিন মিলিয়ন ডলার।
সোভিয়েত ইউনিয়নঃ পশ্চিমাদের মতে, ১৯৮৫ সালের জুলাই-এর হিসেবে সশস্ত্র বাহিনী ৫৩ লাখ। সেনা-১৯ লাখ ৯৫ হাজার, বিমান ৫ লাখ ৭০ হাজার, নৌ ৪ লাখ ৮০ হাজার (এর মধ্যে ৭০ হাজার নৌ বিমান বাহিনীর সদস্য)। ট্র্যাটিজিক রকেট বাহিনী ৩ লাখ, বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী ৬ লাখ ৩৫ হাজার, যোগাযোগ স্থাপনকারী বাহিনী ৬ লাখ ১৫ হাজার এবং ৭ লাখ ৫ হাজার জেনারেল কমান্ড বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার (এর মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার নিরাপত্তা প্রহরী) এবং ২ লাখ ৫০ হাজার সীমান্ত প্রহরী। ১৯৮৫ সালের প্রতিরক্ষা বাজেট আনুমানিক ১৯ হাজার ৬৩ মিলিয়ন রুবেল। এছাড়া সশস্ত্র দূরপাল্লার রকেট ও পারমাণবিক শক্তি রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ওয়ারশর সদস্য। সোভিয়েত নাগরিকদের দু’বছর সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক।
ফলে গত কয়েক বছর ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রশক্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে টেক্কা দেয়ার জন্য এক বিরাট কর্মসূচীর রূপায়ন করে চলেছে। পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষার ওপর কোনও বাধানিষেধ এজন্য তারা গ্রহণ করতে নারাজ। কিন্তু পারমাণবিক শক্তি জোর কদমে বৃদ্ধি করতে গিয়ে মার্কিনীদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় টান পড়ছে। ব্যাপক ঋণের কারণে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ ৬ হাজার বিলিয়ন ডলার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তাছাড়া পশ্চিমা মিত্ররা মার্কিন প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে আমেরিকাতেও প্রবল জনমত গড়ে উঠেছে। এজন্য রিগানের সামরিক খাতে ব্যয় হ্রাস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি প্রতিকূল, সেই সাথে সহধর্মিণী ন্যান্সির প্রভাব রিগানকে বাধ্য করছে কিছুটা নমনীয় হতে। তাছাড়া ক্ষমতায় আর মাত্র ১৫ মাস তাঁর মেয়াদ । দীর্ঘ প্রায় সাত বছরে তাঁর অনমনীয় ও কঠোর ভূমিকা ইতিমধ্যে সর্বত্র নিন্দিত হয়েছে। এছাড়া ইরান কণ্ট্রা কেলেংকারীর কারণে রিগানের ইমেজ বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেষ মুহুর্তে নিজ ও দলের ইমেজ বৃদ্ধির জন্য সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়, এমন একটা কিছু করে রিগান তাঁর মেয়াদ অতিক্রম করতে চাচ্ছেন। ফলে গর্বাচেভের জিরো-জিরো, ডাবল জিরো ও ট্রিপল জিরো কংক্রিট প্রস্তাব রিগান দীর্ঘ দিন প্রত্যাখ্যান করে আসলেও অবশেষে মাঝারি পাল্লার পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি কার্যকর করেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজ ব্যবস্থা সমাজতন্ত্র হওয়ায় তাদের পররাষ্ট্র নীতির মোদ্দা কথা শান্তিতে সহাবস্থান। কিন্তু নিজেদের প্রভাব প্রতিপত্তি বজায় রাখতে মার্কিনীদের সাথে সমান তালে পাল্লা দিয়ে চলছে। ফলে সামরিক খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করার প্রেক্ষিতে তাদের অর্থনীতিতে ক্রমাগত মন্দাভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ কারণে সোভিয়েত ইউনিয়ন অর্থনীতিকে চাঙ্গা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের সুনাম-সুখ্যাতি সুদৃঢ় করতে নিরস্ত্রীকরণের প্রতি ক্রমশঃ ঝুঁকছে। তারা এখন অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী চায়। এর ফলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের 'স্টার ওয়ার প্রকল্প' প্রথম পর্যায়ে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেও শেষাবধি এসডিআই ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনিসিয়েটিভ-এর ব্যাপারে কোনও প্রশ্ন না তুলে উপরন্তু নিজেদের হার স্বীকার করেও মাঝারী পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপ চুক্তিতে সম্মতি জানায়।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়নের নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবস্থার প্রেক্ষিতে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপ চুক্তি মেনে নিয়েছে। কিন্তু আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোন কিছুর পরোয়া না করে পারমাণবিক শক্তির প্রসারে অধিক মাত্রায় এগিয়ে যায়, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। কেননা সল্ট-২ চুক্তি বরখেলাপ করে ইতিমধ্যে তারা এমন নজির রেখেছে।
অন্যদিকে পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তারা সম্ভাব্য রুশ-মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র বিলোপ চুক্তি ন্যাটোর শক্তি হ্রাস করবে বলে মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, এটা অপূরণীয়। ন্যাটো সদর দফতরে কর্মরত একজন সেনা কর্মকর্তা বলেন, কোন সৈনিকই তাঁর অস্ত্র হারাতে রাজী নয়। অনেক পশ্চিমা দেশ এসব অস্ত্র হারানোর ব্যথায় ব্যথিত। পশ্চিমা সামরিক ঘাঁটি ন্যাটোর এমন ধরনের মন্তব্যে শান্তিপ্রিয় মানুষের বুক না কেঁপে ওঠে পারে না। কেননা এতে প্রত্যক্ষভাবে পারমাণবিক শক্তির পক্ষে ওকালতি করা হয়েছে। তারপরেও বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ প্রচণ্ড আশাবাদী। আগামী শরতে বিশ্বের দুই নেতা রিগান-গর্বাচেভ শীর্ষ বৈঠকে চুক্তিটি সই করে মানবজাতির ভবিষ্যৎকে পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের দুঃস্বপ্ন মুক্ত করতে আরো এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে তাঁদের প্রত্যাশা। বিশ্বকে পারমাণবিক ধ্বংসলীলার উদ্যত খড়গকে মানবজাতির মাথার উপর থেকে নামিয়ে আনার যে সূচনা করেছেন, এরপর তারা অস্ত্রমুক্ত, অহিংস পৃথিবী গড়ার শপথ নেবেন।
অবশ্য চুক্তি অনুযায়ী এক হাজার মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হলেও পৃথিবীতে রয়ে যাবে বিভিন্ন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র। তবে সোভিয়েত-মার্কিন পারস্পরিক মতৈক্য, সমঝোতা ও বিশ্বাস ফিরে আসায় বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে উঠেছে। বিশ্বশান্তির জন্য পৃথিবীর দুই বৃহৎ পরাশক্তি বিশ্বকে শান্তিকামী মানুষের বসবাসযোগ্য করে তুলতে তাদের দর-কষাকষি স্থগিত রেখে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলুন, এটাই আমাদের সবিনয় নিবেদন।
২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন