পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

সম্পর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সম্পর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

'হরিকল অকালে নিভে গেল'

শিরোনামটা দেখে বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা লেগেছিল। শুরুতেই মনের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, কে এই হরিকল? এমন অভিনব শিরোনাম তো সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। ধাক্কাটা সামলে ধীরে ধীরে পাঠের প্রতি মনোযোগী হতে হয়। সেই আশির দশকে দৈনিক পত্রিকার পাতায় ক্রীড়া বিষয়ক এত বড় লেখা খুব বেশি সুলভ ছিল না। লেখার ট্রিটমেন্টটা বেশ ভালো দেওয়া হয়। 'দৈনিক বাংলা পত্রিকা'র সাপ্তাহিক খেলার পাতায় পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশিত হয় লেখাটি। বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ছবি। অকালে ঝরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার আর্চি জ্যাকসনকে নিয়ে। বয়স ২৩ অতিক্রম করার পর যক্ষ্মা রোগে নিভে যায় অসম্ভব প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারের প্রাণপ্রদীপ। লেখাটা শুরু হয় এভাবে, 'প্রাণ রসায়ন হয়তো বিশদ বিবরণে বলে দিতে পারে কেন মানুষের চোখের পাতা বাষ্পে ভিজে, ফোঁটায় ফোঁটায় এক সময় বানভাসী হয়। কিন্তু হৃদয়ের তলদেশ ছোঁয়া যে বেদনভার হালকা পায়ে চলা কালপুরুষের সুচারুপদক্ষেপকে টলিয়ে দেয়, তার কার্যকারণ বোধের অগম্য। প্রকৃতির সাধারণ দিকচক্রবালে প্রশ্নবোধক আঁকার কি এমন প্রয়োজন বিধাতা-পুরুষের? এ নিঠুর গরজ কেন, কিসের? কেন এমন হৃদয়হীন রসিকতা?'

মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাঁ থেকে দুলাল মাহমুদ, জালাল আহমেদ চৌধুরী, অঘোর মন্ডল ও নাজমুল হক তপন।
 

যেন কোনো ট্র্যাজিক উপন্যাস পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতে থাকে। লেখার স্টাইল, ভঙ্গি, শব্দের বুননে কবেকার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যেন সদ্য জেগে ওঠেছে। সেই শোক, সেই দুঃখ, সেই বেদনা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে ফিরে আসে। আর্চি জ্যাকসনের মৃত্যু টাটকা স্মৃতি হয়ে খোঁচাতে থাকে। শব্দশক্তি দিয়ে পাঠককে এভাবে দুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় অবাক করে দেয়। সবাই তো এমন লিখতে পারেন না। মনদুলুনি এই কলমশিল্পী ছিলেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। তিনি যে এত চমৎকার বাংলা লেখেন, তার আগে আমার জানা ছিল না। এই লেখা পড়ার পর তাঁর লেখার অপেক্ষায় থাকতাম। অপেক্ষাটা সহসা ফুরাতে চাইত না। তিনি যে জাত রোমান্টিক, তা অনুধাবন করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। সে সময় তিনি কর্মরত ছিলেন রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ইংরেজি দৈনিক 'বাংলাদেশ টাইমস' পত্রিকার স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে। আর ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। ক্রিকেটার ও কোচ হিসেবে। ভারতের পাতিয়ালা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ক্রিকেট বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড ও বিভিন্ন ক্লাব দলের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে ক্রিকেটকে রাঙিয়েছেন অসংখ্য ক্রিকেটার।

সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটকে যাঁরা হৃদয়ের গভীরভাবে ধারণ করতেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। একটা সময় সাহিত্যচর্চা করেছেন। কবিতা লিখেছেন। গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন। জড়িয়ে ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে। ঢাকার আজিমপুরের ক্রীড়া ও সাহিত্যের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ক্রিকেটের সঙ্গে সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্রিকেট লিখিয়ে হিসেবে স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলেন। সব মিলিয়ে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন মানুষ।

প্রথম আলো ক্রীড়া পুরষ্কার নির্বাচকমণ্ডলী বাঁ থেকে ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাক, জালাল আহমেদ চৌধুরী, কামরুন নাহার ডানা, দুলাল মাহমুদ ও আশরাফউদ্দিন খান চুন্নু। 


আড্ডার প্রতি তাঁর ছিল সুতীব্র টান। পাক্ষিক 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় নিয়মিত আড্ডা মারতে আসতেন। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। গত প্রায় চার দশকে সেই পরিচয় ক্রমশ বিস্তৃত হয়। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বিচরণক্ষেত্র অভিন্ন হওয়ায় নানাভাবে তাঁর সংস্পর্শে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। দীর্ঘ দিন বিভিন্ন প্রেস বক্সের পাশাপাশি প্রথম আলো ক্রীড়া পুরষ্কারের জুরি বোর্ড, বিএসপিএ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ঔদার্য, তাঁর স্নেহ, তাঁর আন্তরিকতার পরশ পেয়েছি।

সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর কলমের মুগ্ধ পাঠক হয়ে যাই। তিনি যখনই যেখানে যা লেখেন, পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। নিজের গরজে লিখতে চাইতেন না। অনুরুদ্ধ না হলে লেখার তাগিদ পেতেন না। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অনেক দিন লিখেছেন। সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে তা নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকেনি। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভীষণ অলস প্রকৃতির। সহজে কলম ধরতে চাইতেন না। যে কারণে তাঁর লেখার সংখ্যা অপরিমিত নয়। যা তাঁর অনুরাগীদের কাছে অনন্ত আক্ষেপ হয়ে আছে।

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ফেসবুক'-এ তিনি বেশ সরব ছিলেন। তার মানে এই নয়, ধুমসে লিখতেন। মূলত ছোট ছোট মন্তব্য করতে পছন্দ করতেন। যেন এক একটা এলেজি, লিমেরিক বা গালিবের শায়েরী। তাতেই পরিস্ফুটিত হয়ে উঠত তাঁর মেজাজ, তাঁর মনোভাব, তাঁর মুন্সিয়ানা। মন্তব্যগুলো যেন এক এক ফোটা কস্তুরী। তার সৌরভে আমোদিত হতেন পাঠককুল। বিশেষ করে তাতে দারুণভাবে উদ্বেলিত ও অনুপ্রাণিত হতেন নতুন প্রজন্ম। তাঁর লেখা আত্মস্থ করে নিজেদের সেইভাবে প্রস্তুত করার একটা তাগিদ অনুভব করতেন।

সোনার কলমের অধিকারী হয়েও তিনি কেন যে লেখালেখির প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলেন না, তার কোনো যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায় না। হতে পারে আখ মাড়াই করে যেভাবে রস বের করা হয়, তেমনিভাবে সুস্বাদু এক-একটা লেখা লিখতে নিজেকে নিংড়ে দিতে হয়েছে। পাঠকরা রসোত্তীর্ণ লেখা পেয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। পাঠকের ভালো লাগা তাঁকে প্রাণিত করলেও নিয়মিতভাবে লেখার এই চাপ নেওয়াটা তাঁর কাছে পছন্দের না-ও লাগতে পারে।

তিনি জীবনকে উপভোগ করতে চাইতেন নিজের মতো করে। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যে আত্মতৃপ্তি পেতেন, তা সাধারণত নিজের মধ্যেই ধারণ করতে চাইতেন। কেউ জানতে না চাইলে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। এই বোধের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না। বিরলপ্রজ এই লেখকের গ্রন্থ সংখ্যা সর্বসাকুল্যে একটি, 'বিশ্বকাপ ও কয়েক ছত্র ক্রিকেট'। তবে তিনি এ যাবৎ যা লেখালেখি করেছেন, তা সংকলিত হলে একাধিক গ্রন্থ হতে পারে। তেমন উদ্যোগ কি নেওয়া সম্ভব হবে?

শরীরের খুবই নাজুক অংশ ফুসফুস। তার একটুখানি অনাদর হলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সংক্রমিত ফুসফুসের কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটা পলে পলে বুঝতে পারছি। আর ধূমপায়ী হলে তো কথা নেই। ফুসফুসের জন্য ধূমপান মারাত্মক ক্ষতিকর। আমি অধূমপায়ী হয়েও যে ধকল সইতে হচ্ছে আর ধূমপায়ী জালাল ভাইয়ের জন্য এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, সেটা তো এখন সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে। তিনি তা ভালো করেই জানতেন৷ কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো ভাবনা ছিল বলে দৃশ্যমান হয়নি। এ কারণে ধূমপান ছাড়ার বিষয়ে একদমই মাথা ঘামাননি। বরং হাবে-ভাবে মনে হয়েছে, ধূমপান তাঁর কাছে ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ।

দুলাল মাহমুদ ও জালাল আহমেদ চৌধুরী 


একাকীত্ব জীবনে নিকোটিন তাঁকে বোধ করি নিবিড় সঙ্গ দিয়েছে। ক্রিকেট থেকে পাওয়া নির্যাস আর ধূমপানের সুখটানের যুগল বন্ধনে যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তাতে হয়তো নিজের মতো বেঁচে থাকার আনন্দ ছিল। কিন্তু তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে তা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। সবার চোখের সামনে একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকেন তিনি। এভাবেই সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়, তারপরও প্রাণসম্পদে ভরপুর তাঁর মতো একজন সৃজনশীল মানুষের চলে যাওয়াটা শূন্যতারও অধিক একটা হাহাকার বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে বিদায়ী মঞ্চে তাঁর প্রাণহীণ দেহের সামনে যখন বিষাদ আর আর্দ্রতায় মাখামাখি তাঁর সহযোগী, সহকর্মী ও সহমর্মীদের চোখ; ঠিক তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যেন পরিবেশটাকে আরও বেশি শোকাবহ করে তোলে। সেই শোক সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। হায়! বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যে তাঁর মতো করে আর কেউ লিখবেন না।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

চিরসবুজ এক ছড়াকার

 

তিনি কোনো অভিনেতা নন। তিনি কোনো সংগীতশিল্পী নন। এমনকি তাঁকে সেই অর্থে টিভি তারকাও বলা যাবে না। তারপরও তিনি তারকাদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নন। একজন অভিনেতা, একজন সংগীতশিল্পী কিংবা একজন টিভি তারকা যখন প্রতিষ্ঠিত হন, খ্যাতি অর্জন করেন বা জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, তাঁদের কাউকে কাউকে দেখলে মনে হয়, কত কাল থেকে তাঁরা আমাদের চেনা। ধরে নেই, আমাদের চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হবেনই। অথচ অনেকের ক্ষেত্রে বয়স হিসেব করলে দেখা যায়, তাঁরা আমাদের কাছাকাছি বয়সেরই। আসলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়ায় তাঁদের দেখার কারণে এমন একটা বিভ্রম তৈরি হয়। কেউ কেউ খুব অল্প বয়স থেকে টিভি মিডিয়ায় জড়িত হওয়ায় আরো বেশি করে এ রকম মনে হয়।

ছড়া লিখেও যে তারকাদের মতো এমন সুখ্যাতি অর্জন করা যায়, তিনি তাঁর চমৎকার দৃষ্টান্ত। সুপরিচিত অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও টিভি তারকাদের মতো তাঁকেও মনে হয়, কতকাল থেকে তিনিও জ্বলজ্বল করছেন তারকা হয়ে। বয়সে কিছু সিনিয়র হলেও আমাদের শৈশব-কৈশোর থেকে তাঁর নামের সঙ্গে আমার বা আমাদের বয়সীদের পরিচয়। তখন থেকেই তিনি আমাদের কাছে তারকা। আর হবেন না কেন? স্কুলের নিচু ক্লাসের ছাত্র থাকাবস্থায় তিনি উঠে আসেন আলোচনায়। ছড়াতে থাকে তাঁর নাম, পরিচয় ও সুখ্যাতি। তাঁর ছড়ার বিষয়বৈচিত্র্য, সমসাময়িকতা ও গীতলতা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। তাঁর মাথার মধ্যে গিজগিজ করে ছড়া। চট করে তিনি লিখতে পারেন যে কোনো বিষয় নিয়ে। দিন যতই অতিবাহিত হতে থাকে, ততই তিনি আলো ছড়াতে থাকেন। এর মধ্যে তাঁর নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে অনেক পরিচয়, তাতে তিনি রাঙিয়ে দিয়েছেন চারপাশ। তাঁর স্মৃতিগদ্য বাংলা সাহিত্যে নতুন এক ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে। কথাকার হিসেবেও তিনি অতুলনীয়। সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মকান্ড দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও তাঁর অবস্থান গড়ে তোলেন। তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমাও কম উজ্জ্বল নয়। তারপরও তাঁর এক ও অদ্বিতীয় পরিচয় তিনি ছড়াকার। তিনি লুৎফুর রহমান রিটন।

কলেজে পড়ার সময় একটা সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই। মূলত শূন্য হাতেই আমরা এগিয়ে যাই। বয়সোচিত কারণেই হতে পারে, আমরা স্থির করি, এই সংকলন দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তোলপাড় সৃষ্টি করতে হবে। মাঠে নামার পর বুঝতে পারি, যত গর্জে তত বর্ষে না। লেখক তালিকা করতে গিয়েই হিমসিম খেতে হয়। বলতে গেলে কারো সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো কীভাবে? তারপর কার কেমন মেজাজ-মর্জি, সেটাও তো জানা নেই। আমাদের লেখা দেবেন কি-না কে জানে? কি কারণে জানি না, তালিকার একটা নামকে আমাদের খুব আপন মনে হতে থাকে। যদিও তখন তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ একমাত্র ‘ধুত্তুরি’। তাতে কী?

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের সঙ্গে 


লেখক হিসেবে তখন তাঁকে কে না চেনেন? তিনি দু’হাতে লিখছেন। কীভাবে কীভাবে যেন তাঁকে খুঁজে বের করি। সম্ভবত বাংলা অ্যাকাডেমিতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। আমরা যেমনটি অনুমান করেছিলাম, তারচেয়েও বেশি তিনি আমাদের আপন করে নেন। তাঁর চিরকালীন প্রাণখোলা হাসি দেখে আমাদের মন জুড়িয়ে যায়। এ হাসি দিয়েই শুরুতে তিনি সবার হৃদয় জয় করে নেন। আমরাও আমাদের কাজে আস্থা ফিরে পাই। এরই মধ্যে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলাম। কারো ব্যবহার, কারো কথার বরখেলাপ, কারো কারো নেতিবাচক কথাবার্তায় বুঝতে পারি, পথ বড় কন্টকাকীর্ণ। তাঁর সঙ্গে কথা হওয়ার পর আমরা এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। অনেকক্ষণ কথা বলে তিনি আমাদের খোঁজখবর নেন। এগিয়ে যাওয়ার পথ বাতলে দেন। সেই সঙ্গে নিজের লেখা দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। এটা ১৯৮৩ সালের কথা। তিনিও তো তখন ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র। যাহোক, তাঁর লেখা আমরা যথা সময়ে পেয়েছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্মোহিত করার এমন গুণাবলী লুৎফুর রহমান রিটন ছাড়া আর কার হতে পারে?

প্রকৌশলী নকিব আহমেদ নাদভীর নেতৃত্বে ১৯৮৫ সাল থেকে আমরা ৪/৫ জন্য তরুণ ‘হারজিত' নামে একটি খেলার পত্রিকা প্রকাশ করি। সে বয়সে সেটি ছিল আমাদের জন্য মস্ত একটি চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা পাওয়াও খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু লুৎফর রহমান রিটনের মতো প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার যখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, সেটা হয়ে উঠে আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। নতুন এ পত্রিকায় তিনি ছড়া দিয়ে আমাদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেন। তাঁর প্রতিটি ছড়াই আলোচিত হয়েছিল। এই পত্রিকার সুবাদে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তা আর কখনোই ব্যাহত হয়নি। সে সময় ‘ফুটবল’ নামে তাঁর একটি গ্রন্থ বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। সে গ্রন্থের জন্য কিঞ্চিৎ তথ্য দিয়ে সহায়তা করায় তিনি আমাকে অটোগ্রাফসহ একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। 

১৯৯৩ সালে ‘অক্ষরবৃত্ত' নামে আমরা চারজন মিলে একটা প্রকাশনা সংস্থা চালু করি। সে বছর আমাদের প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ছিল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী'। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে সেটি ছিল হট টপিকস। যদিও বইমেলায় আমাদের নিজস্ব স্টল ছিল না। তারপরও সে বছর সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের মধ্যে এটি ছিল একটি। রিটন ভাই তখন কর্মরত ছিলেন দৈনিক ‘বাংলাবাজার’ পত্রিকায়। তিনি এ পত্রিকার হয়ে প্রতিদিন বইমেলা কভার করতেন। পত্রিকার পেছনের পৃষ্ঠায় তিনি চমৎকার ফিচার লিখতেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বইটি নিয়ে তিনি আমার একটা মিনি ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এটা ছিল আমার জীবনের একটি আনন্দময় ঘটনা।

তখন তিনি প্রতি বছর চ্যানেল আইয়ের হয়ে বাংলা অ্যাকাডেমির বইমেলা সরাসরি কভার করতেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় আমার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। এই গ্রন্থটি হাতে নিয়ে আমি বাংলা অ্যাকাডেমিতে গিয়েছিলাম। সে সময় চ্যানেল আইয়ের সম্প্রচার টিমের পরিচিত একজন জোর করে আমাকে রিটন ভাইয়ের সামনে নিয়ে যান। সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যাপারে আমি বরাবরই মোটেও সাবলীল নই। সেদিনও যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু রিটন ভাই তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় যেভাবে আমাকে ডেকে নেন, সরে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আসলে তিনি যেভাবে মানুষকে আপন করে করে নিতে পারেন, সেটাও অনুকরণীয়। এ কারণে তাঁর যে কত অনুরাগী, কত যে ভক্ত, কত যে শুভাকাঙ্খী, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে, তা তিনিও জানেন না। জানার কথাও নয়।

যে কোনো প্রয়োজনে রিটন ভাইয়ের মুখাপেক্ষী হওয়া যায়। তিনি তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে দিতে একদমই দ্বিধা করেন না। বছর দশেক আগে বাংলা অ্যাকাডেমির সদস্য হওয়ার জন্য অ্যাকাডেমির দুজন সদস্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়ে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে মনে পড়ে রিটন ভাইয়ের কথা। চ্যানেল আইতে দেখা হলে আমার আর্জি জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে স্বাক্ষর তো করে দিলেনই, আগ বাড়িয়ে আরেকটি সই তাঁর বন্ধু আহমাদ মাযহারকে দিয়ে করিয়ে দেন। মনোভাবটা এমন, যেন তিনি এটা করে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এটাই তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর মতো এমন পরম হিতৈষী ও দিলখোলা মানুষ হওয়া অনেক সাধনার ব্যাপার।

১ এপ্রিল ২০২১

খেপাটে এক কবির কথা

আশির দশকে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির এক অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে বসা দুলাল মাহমুদ, দিলু খন্দকার, নকিব আহমেদ নাদভী ও কবি সানাউল হক খান 



দৃশ্যপট-১

আশির দশকের মাঝামাঝি। আমরা কজন তরুণপ্রাণ মিলে প্রকাশ করছি 'হারজিত' নামে একটি ক্রীড়া পত্রিকা। কেউ শিক্ষার্থী। কেউ সদ্য চাকরিজীবী। সামর্থ্য সীমিত। সাধ অফুরন্ত। এই পত্রিকাকে পাঠকের কাছে সমাদৃত করার জন্য আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু আর্থিক অবস্থার সঙ্গে কুলিয়ে ওঠতে পারছিলাম না। এ কারণে সাধারণত নামকরা ছাপাখানা বা উন্নতমানের কাগজে পত্রিকা ছাপা হলেও কখনো কখনো সেই ধারা রক্ষা করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় একটি সংখ্যার ছাপার মান খুবই খারাপ হয়ে যায়। বেশিরভাগ লেখাই পড়া যাচ্ছিল না। তাতে তো আর আমাদের কোনো হাত ছিল না। ছাপাখানার গাফিলতির কারণে এমনটা হয়। সংখ্যাটি দেখে আমাদের বুক ভেঙে যাচ্ছিল। নিজেদের নিংড়ে দিয়ে এক একটা সংখ্যা প্রকাশ করি। ছাপাখানার কারণে তা যদি পাঠযোগ্য না হয়, তারচেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে? সবে ছাপাখানা থেকে আনা সেই সংখ্যাটির প্রথম কপিটি নিয়ে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে ছিলাম। চোখে টলমল করছে অশ্রু। এমন সময় এলেন সিনিয়র একজন লেখক। তিনি প্রতিটি সংখ্যায় লেখা দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করে থাকেন। সেই সংখ্যায়ও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা। তিনি আমার হাত থেকে কপিটি নেন। তারপর পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকেন। ভেবেছিলাম, আমার অবস্থা দেখে তিনি একটু সান্ত্বনা দেবেন। সহমর্মিতা প্রকাশ করবেন। সহানুভূতি জানাবেন। বয়সের যে ব্যবধান, তাতে তেমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু যা ভেবেছি হয়েছে তার উল্টো। এমনটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি যা করলেন, তাতে তিনি যেন 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা' দিলেন । তাঁর লেখাটি দেখার পর তিনি সংখ্যাটি ছুঁড়ে মারেন আমার মুখের উপর। তারপর ক্ষোভের ঝাল মিটিয়েছেন মুখের ভাষায়। যেন আমরা ইচ্ছে করে এমনটি করেছি। এমন অবস্থায় কী আর করার থাকে? অধিক শোকে পাথর হয়ে বসে ছিলাম। 

বাঁ থেকে দিলু খন্দকার, নজমুল আমিন কিরণ, সালমা রফিক, দুলাল মাহমুদ, কবি সানাউল হক খান, মনিরুল ইসলাম কাজল ও আরেকজন



দৃশ্যপট-২

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়। পাক্ষিক 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এর প্রসার বাড়ানোর জন্য নানাভাবে উদ্যোগ নেই। তার অংশ হিসেবে পাঠকের ভোটে প্রতি বছর একজন সেরা ক্রীড়াবিদ এবং একজন সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য প্রতি সংখ্যায় কুপন ছাপানো হয়। পাঠকরা কুপন কেটে তা পূরণ করে বছরের সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিকের নাম পাঠিয়ে দেন। সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা সেরা ক্রীড়া সাংবাদিকের পাশাপাশি পাঠকদের জন্যও ছিল অর্থ পুরষ্কার। যথারীতি পত্রিকার কাটতি বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে কুপন গণনা করে সেরা ক্রীড়াবিদ হন ক্রিকেটার আকরাম খান। তখন তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। আইসিসি ট্রফি জয়ের প্রধান নায়ক তিনি। আর সেরা ক্রীড়ালেখক হন 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অস্থায়ীভাবে কর্মরত মাহমুদুল হাসান শামীম। এই পুরষ্কারের ক্রাইটেরিয়া ছিল, 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় স্থায়ীভাবে কর্মরত কেউ এই পুরষ্কার পাবেন না। একবার কেউ এই পুরষ্কার পেলে আগামীতে তাঁর আর পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন তো ক্রীড়ালেখক কিংবা ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য কোনো পুরষ্কারের প্রচলন ছিল না। সে কারণে পর্যায়ক্রমে তাঁদেরকে সম্মানিত করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। যাহোক, বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেওয়ার জন্য পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রথম সচিব কাজী আনিসুর রহমানকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু তাঁর অবদানের কথা জানতাম। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সংখ্যায় একজন সিনিয়র লেখককে দিয়ে তাঁর ওপর প্রতিবেদন লেখানো হয়। সেই সুবাদে তাঁদের দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন একজন মন্ত্রী। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সম্মানিত অতিথি তাঁর বক্তব্যের সময় সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আমরা তো রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যাই। এটা কোনোভাবেই তো তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এ বিষয়ে তাঁর জানারও কথা নয়। বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথির বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে প্রধান অতিথিও একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেন। দুজনের এমনতর বক্তব্যে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য অনেকখানি ম্লান হয়ে যায়। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই বুঝতে পারেন, সম্মানিত অতিথিকে এ বিষয়ে বলতে উদ্বুদ্ধ করেন সিনিয়র সেই লেখক। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় 'কর্মরত' হয়েও শামীম কেন পুরষ্কার পেয়েছেন? তাঁর মতো একজন বিশিষ্ট লেখক কেন পুরষ্কার পাননি, সম্মানিত অতিথি সে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। শামীম 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন। আর পাঠকদের ভোটে সিনিয়র লেখক সম্ভবত দ্বিতীয় হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কী ছিল? সেখানেই সিনিয়র লেখক ক্ষান্ত হননি। এর পর থেকে বেশ কিছু দিন বিভিন্ন জায়গায় তিনি আমার সম্পর্কে এমন সব অপপ্রচার করেন, যা মোটেও শোভনীয় ও সম্মানজনক ছিল না। তাঁর কারণে এরপর থেকে সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচন থেকে বিরত থাকি। অন্যকে সম্মানিত করতে গিয়ে নিজেকে যদি অপমানিত ও অসম্মানিত হতে হয়, তাহলে কার দায় ঠেকেছে এমন আয়োজন করার? 

বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান, প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম হুদা, কবি সানাউল হক খান ও দুলাল মাহমুদ 


দৃশ্যপট-৩

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। বাংলা একাডেমির সাধারণ সভা। সিনিয়র একজন লেখকের সঙ্গে দেখা হয়। আড্ডাও হয়। দুপুরের মধ্যাহ্নভোজনের সময় আমি তাঁকে বললাম, গুলশানে আমার একটি বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে। আমি সেখানে চলে যাবো। গুলশানে যে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রক সিনিয়র লেখকেরও পরিচিত। তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে কিনা সেটা তো আমি জানি না। এ কারণে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যাওয়া আমার পক্ষে শোভনীয় ছিল না। এতে দুজনকেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়। আর তিনি যদি সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন, তাহলে আমি যখন তাঁকে গুলশানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলি, তাঁর তো বুঝে নেওয়ার কথা। তিনি আমাকে সে বিষয়ে কিছু বলেননি। বললে একসঙ্গে যেতে পারতাম। আমি যথারীতি সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেই। দুদিন পর তিনি আমার অফিসে আসেন। আমাকে কিছু বলেননি। আমার আড়ালে সহকর্মীদের বলে যান, আমি একজন মিথ্যেবাদী। আমি যে পরিচিত জনের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছি, সেটা আমি তাঁকে বলিনি। সেই অনুষ্ঠানে তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন। আমন্ত্রকের কাছে আমার চেয়েও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। প্রথম কথা, সেই অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন কিনা আমি কীভাবে জানবো? দ্বিতীয়ত, আমি যখন গুলশানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলি, তিনি তো কিছুই আমাকে বলেননি। তিনি জানতেও চাননি, আমি কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। তৃতীয়ত, তিনি কিন্তু সে অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাঁকে জানানো আমারও কোনো দায় ছিল না। তাহলে এ ক্ষেত্রে আমি কীভাবে মিথ্যেবাদী হলাম? আমি যদি অসত্য বলেও থাকি, সে কথা আমার কাছে জানতে না চেয়ে অফিসের সহকর্মীদের কাছে মিথ্যেবাদী হিসেবে অভিহিত করে আমাকে কেন অসম্মানিত করলেন? এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না।

যে তিনটি দৃশ্যপটের কথা উল্লেখ করলাম, তিনটি ঘটনার সিনিয়র লেখক কিন্তু একই ব্যক্তি। সাহিত্য জগতে তিনি পরিজ্ঞাত। তাঁর সঙ্গে তো সম্পর্ক তো আজকের নয়। প্রায় চার দশক হতে চলেছে। আমার সঙ্গে তাঁর এমন অসংখ্য অম্ল-মধুর ঘটনা বা দৃশ্যপট রয়েছে। তা নিয়ে অনায়াসেই একখানা গ্রন্থ রচনা করা যায়। আমি যদি তাঁর নামটি নাও লিখি, তাঁকে যাঁরা চেনেন কিংবা জানেন, তাঁরা ইতোমধ্যে ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, তিনি কে? তাঁকে অসম্মানিত বা হেয় করার জন্য আমি এই দৃশ্যপটগুলোর কথা উল্লেখ করিনি। তাঁর মতো একজন কৃতী মানুষকে বোঝার জন্য এই দৃশ্যপটগুলো উল্লেখ না করলে তাঁকে পুরোপুরিভাবে চেনা যাবে না। কারণ, তাঁর জীবনী লেখা কিংবা তাঁকে নিয়ে গবেষণা হলে এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি তো আসলেই এমনই। অন্য সবার থেকে আলাদা। মেজাজী, মারমুখী ও মেধাবী। মেধাবীরা বোধকরি একটু খেপাটে বা পাগলাটে হয়ে থাকে। তিনি তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আড়ালে-আবডালে তাঁর ঘনিষ্ঠরা তাঁকে 'পাগলা কবি' বলে থাকেন। এটা তিনি জানেনও। আমার ধারণা, ভিতরে ভিতরে এটা তিনি উপভোগ করে থাকেন। মজার বিষয় হচ্ছে, তিনি এমন সব কাণ্ড-কীর্তি করেন, তা সবার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু তাঁকে যাঁরা চেনেন বা জানেন, তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুব্ধ হলেও তাঁর এই ধরনের আচরণ মেনে নেন। তিনি এমনটা করবেন, এটাই যেন স্বাভাবিক। তিনি যখন তা না করেন, তখন সেটাই অস্বাভাবিক মনে হয়। তবে তিনি যদি এমনটা না করতেন, তাহলে নানাভাবে আরো সম্মানিত হতে পারতেন বলে আমার ধারণা। আমার কেন যেন মনে হয়, তাঁর ভিতরে একটা না পাওয়ার অতৃপ্তি ও ক্ষোভ কাজ করে। কেন এই অতৃপ্তি, কেন এই ক্ষোভ আমি বলতে পারবো না। এই অতৃপ্তি, এই ক্ষোভ তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যে কারণে সেই হতাশা বোধ থেকে সব কিছু ভেঙেচুরে ফেলতে চান। তখন কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, সেই বোধ আর কাজ করে না। যে কারণে একের পর এক জন্ম দেন বিভিন্ন দৃশ্যপট। এই দৃশ্যপটগুলো যে অনেকের হৃদয়ে কষ্টের ছাপ ফেলে দেয়, সেটা কখনো তিনি অনুধাবন করেন কিনা আমার জানা নেই। 

ক্রীড়াজগত কার্যালয়ে বাঁ থেকে কবি সানাউল হক খান, সব্যসাচী ক্রীড়াব্যক্তিত্ব রনজিৎ দাস ও দুলাল মাহমুদ 


ব্যক্তি জীবনে যেমন, লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি স্বতন্ত্র একটা ইমেজ গড়তে পেরেছেন। তিনি কবি হিসেবে সুপরিচিত। ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি নিরন্তর লিখে চলেছেন। ছন্দ নিয়ে তিনি খেলতে পছন্দ করেন।এ ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সাবলীল। ১৯৮০ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ 'অন্ধ করতালি'। এরপর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কার। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ক্রীড়ালেখক হিসেবে অধিক পরিচিত ও সমাদৃত। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি খেলাধুলা নিয়ে লিখে আসছেন। ক্রীড়াঙ্গনে তিনি আলাদা একটা অবস্থান গড়ে নিয়েছেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সেই কৈশোরে যাঁদের লেখা পড়ে ক্রীড়া লেখালেখিতে আকৃষ্ট হই, তিনি তাঁদের অন্যতম। তাঁর লেখার জাদুতে একরকম হিপটোনাইজ হয়ে যাই । প্রতিটি লেখা পড়তাম বুভুক্ষু হৃদয় নিয়ে। তাঁর লেখার বুনন, শব্দের কারুকাজ আর সৌন্দর্যের তুলনা পেতাম না। মনে হতো এক একখানা 'ঢাকাই মসলিন'। অতি মিহি ও সূক্ষ্ণ কাপড় দিয়ে যেভাবে শিল্পীরা আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে বয়ন করতেন জগতবিখ্যাত মসলিন, তিনি যেন তেমনিভাবে আমাদের উপহার দিতেন ঐশ্বর্যময় সব লেখা। লেখার পরিসর সীমিত হলেও তার ব্যঞ্জনা অনেক দূর প্রসারিত। তাতে দ্যুতি ছড়ায় হীরার মতো। তাঁর লেখায় পাওয়া যায় সংগীতের তাল-লয়-সুর। তাঁর উপমা, উৎপেক্ষা, ছন্দ হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। আমার সীমিত জ্ঞানে প্রকৃতঅর্থে ক্রীড়াসাহিত্য বলতে যেটা সাধারণত বোঝায়, বাংলাদেশে অন্তত সেটা তাঁর মাধ্যমে তা চর্চিত হয়। বিকশিত হয়। জনপ্রিয় হয়। নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে তিনি পুরোধা। তাঁর ছড়া, তাঁর গদ্য কিংবা তাঁর যে কোনো লেখা পাঠকদের শুধু মুগ্ধ করে না, অভিভূত করে রাখে। কোনো লেখায় তাঁর নাম না থাকলেও সেটা বুঝে নিতে মোটেও অসুবিধা হয় না, লেখাটি কে লিখেছেন? পুরোদস্তুর একজন কবি হয়েও তিনি যে ক্রীড়াসাহিত্যে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন, এটা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। তিনি লেখালেখি না করলে ক্রীড়াসাহিত্য অনেকখানি অনুজ্জ্বল হয়ে থাকতো। ক্রীড়া বিষয়ক লেখালেখি যে এভাবে করা যায়, তাঁর লেখা না পড়লে কখনো বুঝতে পারতাম না। তবে চাইলেও তাঁকে অনুকরণ এমনকি অনুসরণ করা যায় না। সহজাত যে প্রতিভা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন, সেটা একান্তই তাঁর নিজস্ব ঘরানা। এই ঘরানা বয়ে নিয়ে যেতে দ্বিতীয় কাউকে আমি দেখি না।

ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে আমার অনেক তিক্ততা আছে, আছে মিষ্টতাও, কিন্তু  লেখক হিসেবে তাঁর প্রতি মুগ্ধতা কখনো ম্লান হয়নি। এ কারণে সম্পর্কের সাম্পান বেয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। দীর্ঘ সময়ে যোগাযোগটা কখনো পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। অল্প যে কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর এখনও নিয়মিত যোগাযোগ বা আড্ডা হয়, আমি তাঁদের একজন। তাঁর সমস্যা ও সংকট আমাকে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করে। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকাও তাঁর ভালোবাসার অন্যতম নিকেতন। এখানে ঢুঁ না মারলে তিনিও স্বস্তি পান না। তাঁর সমসাময়িকরা বলতে গেলে নিজেদের অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি এখনও অনুভব করেন তারুণ্যের ঝলকানি। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে আগের মতো উজ্জ্বল লাগে না। শারীরিকভাবে তিনি বরাবরই ফিট। এটা নিয়ে তাঁর এক রকম গর্ব ছিল। কিছু দিন আগে শারীরিকভাবে বড় ধরনের একটা বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ফিটনেস নিয়ে আগের সেই গৌরবটা তাঁর নেই। কথা বলার সময় খানিকটা জড়িয়ে যায়। চলাফেরায় এসেছে মন্থরতা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কাগজ-কলমের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্কটা। এ কারণে লেখালেখিতে আর আগের মতো সক্রিয় নন। এটা আমাদের জন্য বটেই, কবিতা ও ক্রীড়া সাহিত্যের জন্য অনেক বড় একটা ক্ষতি। তবে ধীরে ধীরে হলেও ফিরে পাচ্ছেন তাঁর সুস্থতা ও তাঁর সক্ষমতা। লেখালেখিতে তিনি দ্রুতই আবার আগের মতো ফিরে আসবেন, এই প্রত্যাশা তাঁর তাবৎ অনুরাগীর। 

আমি যত দূর জানি, বাংলা ভাষায় ক্রীড়া বিষয়ক প্রথম ছড়ার গ্রন্থ তাঁর। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৯৩ সালে প্রকাশ করেছিলাম তাঁর 'ছন্দে ছন্দে খেলার আনন্দে' ছড়াগ্রন্থ। কোনো একজনের গ্রন্থ অতীতে তো বটেই, পরবর্তীকালে সমিতি থেকে আর প্রকাশিত হয়নি। তাঁর এই গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করি। তাঁর ক্রীড়া সংক্রান্ত মূল্যবান লেখাগুলো সব এলোমেলো পড়ে আছে। তা যদি গ্রন্থবদ্ধ করা যেত, তা নতুন প্রজন্মের কাছে সমাদৃত হতে পারতো, একই সঙ্গে সমৃদ্ধ হতো বাংলা ক্রীড়া সাহিত্যের ভাণ্ডার। নিশ্চয়ই কোনো একদিন এ কাজটি সম্পন্ন হবে। তিনি ফরমায়েশি লেখা লিখতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। লেখেন মনের আনন্দে। বড় পরিসরের লেখাও লেখেন না। যে কারণে তাঁর গদ্যের আয়তনের তেমন বিস্তার ঘটে না। এটা জানা সত্ত্বেও কবিতা, খেলাধুলা আর সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে লিখতে অনুরোধ করেছিলাম। কবিতা তাঁর সহজাত। খেলাধুলা তাঁর সঞ্জীবনী। আর সংগীত তাঁর চিত্তবৃত্তি। এই তিনের সমন্বয়ে তিনি লিখলে বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছু সংযোজন হতে পারতো। কিন্তু বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেছেন। অথচ 'দিশি গান বিলিতি খেলা' শিরোনামে সংগীত ও ক্রিকেটের যুগলবন্দী ঘটিয়েছেন পশ্চিম বঙ্গের লেখক কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেটা দারুণভাবে সমাদৃত হয়েছে। কিশোর বয়সে সেই পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামের সঙ্গে তাঁর আত্মিক বন্ধন, তিনি অনেক ঘটনার নিবিড় প্রত্যক্ষদর্শী, সেই নস্টালজিয়া তাঁর কাব্যিক কলমে হতে পারতো দারুণ সুস্বাদু, তিনি কেন যেন তা উপেক্ষা করেছেন। এমনকি তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে স্মৃতিকথা লেখার বিষয়ে এখনও তিনি একদমই আগ্রহী হননি।

নানান কার্যকারণের জন্য সমসাময়িক কালের কাউকে মূল্যায়ন করাটা সহজ নয়। বিশেষ করে তাঁর মতো খেপাটে মানুষ, যাঁর সঙ্গে কারো না কারো কারণে বা অকারণে খিটমিটি লেগেই যায়, তাঁকে বিচার-বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে যাচাই না করে তাঁর সৃষ্টিকর্মের যদি মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এক্ষেত্রে তিনি একক ও অদ্বিতীয়। কবি ও ক্রীড়ালেখক হিসেবে সানাউল হক খান সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয়। তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

৩ জানুয়ারি ২০২০

প্রতিবাদী সজ্জন এক কবি

 

নীরবতার যে একটা ভাষা আছে, সেটা তাঁকে দেখলে বুঝতে পারা যায়। তাঁর মুখাবয়বে ফুটে ওঠে দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি। তিনি যখন কথা বলেন, তাতে স্পষ্ট হয় একটা অনমনীয় মনোভাব। কিন্তু বলার মধ্যে দার্ঢ্য  থাকলেও অশোভনীয়ভাবে কিছু প্রকাশ করেন না। কথা বলেন খুব মার্জিত ও স্মার্টলি। এবং আন্তরিকতার সঙ্গে। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে আলাদা একটা ‌মাধুর্য আছে। তা সহজেই আকৃষ্ট করে। তিনি কবি, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা হালিম আজাদ।

গৌরব করার মতো তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন। কিন্তু কখনোই নিজের পরিচয় তুলে ধরে অহমিকা করতে দেখিনি। অহমিকা তো দূরে থাক, সগৌরবে নিজের পরিচয় দিতেও তাঁর অপরিসীম কুণ্ঠা। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলা বা করা তার ধাতে নেই। যে কারণে তিনি গ্ল্যামারাস হতে পারেননি। না পারার কারণে তিনি বরাবরই আড়ালে রয়েছেন। অথচ তিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারতেন। প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখাতে পারতেন। নিজের ঢাকঢোল পেটাতে পারতেন। আর্থিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারতেন। একটুখানি আপস ও সমঝোতার মনোভাব থাকলে সুযোগ-সুবিধা করায়ত্ত করতে পারতেন। 

তিনি তো সেই ধাচের নন। বেছে নেন সংগ্ৰামী জীবনকে। সেই তারুণ্যে যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, তা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। শিল্প-সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি পরিবর্তনের নেশায় বুঁদ হয়ে যান। কিশোর বয়সে করেছেন নাটক ও যাত্রাপালা। পৈত্রিক সূত্রে বুকের মধ্যে দানা বাঁধে সুর। পারিবারিক পরিবেশটাই ছিল সংস্কৃতি চর্চার অনুকূলে। একে একে জড়িয়ে পড়েন প্রতিটি মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে ওঠেন নারায়ণগঞ্জের মেধাবী মুখ। একজন মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা ও মননশীল মানুষ হিসেবে হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অগ্ৰসেনানী। কখনো মিছিল করেছেন। কখনো গান গেয়েছেন। কখনো আবৃত্তি করেছেন। যেখানে অন্যায় সেখানেই গর্জে উঠছেন প্রতিবাদে। নারায়ণগঞ্জের যে কোনো আন্দোলনে, সংগ্ৰামে তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় প্রথম সারিতে। তবে তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা হয়ে ওঠে সাহিত্যচর্চা। স্কুল বয়সেই কবিতার সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্য। লেখালেখির পাশাপাশি সাহিত্য সংকলন সম্পাদনা ও সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংকলন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যের বাগানে বসন্ত নিয়ে আসে 'ড্যাফোডিল'। তাঁর বর্ণে, গন্ধে, সৌরভে সুরভিত হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাহিত্য অনুরাগীরা। এই সংগঠন ও সংকলনের কাণ্ডারিদের অন্যতম ছিলেন তিনি।

২০০৫ সালে বাংলা একাডেমিতে দুলাল মাহমুদের লেখা 'স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ' গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে দ্বিতীয় কবি তাহের উদ্দীন, কবি হালিম আজাদ, দুলাল মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আগামী প্রকাশনীর সত্বাধিকারী ওসমান গণি, লেখক মোস্তফা কামাল 


রাজধানী ঢাকার প্রলোভন সত্ত্বেও শিকড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। নারায়ণগঞ্জের হালিম আজাদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই পরিচয় ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন সবখানেই। পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। সেই সুবাদে ঢাকার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে দৈনিক 'বাংলার বাণী' পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে শুরু করেন সাংবাদিকতার পথপরিক্রমা। প্রায় আড়াই দশক এই পত্রিকার সঙ্গে সুখে-দুঃখে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিলেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকে কখনোই বড় করে দেখেননি। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে এরপর দৈনিক যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), চ্যানেল আই, সাপ্তাহিক বিচিত্রা হয়ে পুনরায় বাসসে কর্মরত ছিলেন। 'বাংলার বাণী' পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতার জীবনে মুখোমুখি হয়েছেন কত রকম অভিজ্ঞতার। কত প্রতিকূলতার। কখনো বুঝতে দেননি। শান্তশিষ্ট নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায়, তিনি তাই। কিন্তু কোনো অন্যায়কে তিনি মেনে নিতে পারেন না। পারেন না বলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবাদে সরব হন। তোয়াক্কা করেন না কোনো ভয়ভীতির।  

সমসাময়িক বিষয়গুলো তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর কবিতায়। তাতে বাঙময় হয়ে ওঠে ভেতরের দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভ-যন্ত্রণাগুলো। যে কথাগুলো তিনি মুখে প্রকাশ করতে পারেন না, তা খুব সাবলীলভাবে কবিতায় ভাষা দেন। 


আমি যদি আবার কথা বলি আমার মুখ যদি 

আবার খুলে যায়, 

তাহলে এক এক করে সকল মায়ের মুখে 

সূর্যের রশ্মির মতো আলোকমালা ফোটাবো।


তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। কবিতায় তাঁর প্রতিবাদ পৌঁছে যায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। হুমকি দেওয়া হয়। থাকতে হয় আত্মগোপনে। বঙ্গভবনে নিয়ে গিয়ে তাঁর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি কখনোই নতি স্বীকার করেননি। আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। কবিতাকে কখনোই পণ্য হতে দেননি। যদিও তিনি পরিচিত সত্তর দশকের কবি হিসেবে। কিন্তু স্কুল বয়স থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখে আসছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় নিমগ্ন হয়ে আছেন কবিতায়। আটকা পড়ে আছেন কবিতার মায়াজালে। তিনি কখনো কবিতাকে ছাড়েননি। কবিতাও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। জীবনে অনেক কঠিন ও দুঃসময় এসেছে। সেই সময় আশ্রয় পেয়েছেন কবিতার কাছে। এছাড়াও আরেক জনের কাছে তিনি চিরঋণী হয়ে আছেন। তাঁর সুখ-দুঃখের সহচরী ভালোবাসার মানুষ ফাহমিদা আজাদ। জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে সব রকম সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছেন তাঁর এই জীবনসঙ্গিনী। ইদানিং শারীরিক অসুস্থতার কারণে হালিম আজাদের চলার গতি খানিকটা মন্থর হয়ে গেলেও লেখালেখিতে সক্রিয় আছেন অবিরাম। ফেসবুক হয়ে ওঠেছে তাঁর প্রধান মাধ্যম। 

১৯৮৭ সালে শেরপুরে সুভাষ চন্দ বাদলের বিয়ের অনুষ্ঠানে দুলাল মাহমুদ, গিয়াস কামাল চৌধুরী, কবি হালিম আজাদ ও দাউদ ভুঁইয়া। 


তাঁকে পেয়েছি সহকর্মী হিসেবে। সহমর্মী হিসেবে। ১৯৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জের টাউন হলে আয়োজিত তাঁর বৌভাতের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। জীবনের চলার পথে কাছের অনেকেই দূরে সরে গেছেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের যে বন্ধন গড়ে ওঠে, তা আজও অটুট রয়েছে। 


(হালিম আজাদের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার মধ্যনগর গ্ৰামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কবিতা : অদ্ভুত দরোজার কাছে (১৯৮২), ভেঙ্গে দাও নারকীয় দেয়াল (১৯৮৫), পাথরের মানুষ (১৯৮৭), কারে কারাে দিকে অবিরাম চেয়ে থাকা (১৯৮৮), যে তিমির হৃদয় ছুঁয়ে যায় (১৯৮৯), মস্কো টাওয়ারে কিছুক্ষণ (১৯৯১), কবিতা সমগ্র (২০১২), নির্বাচিত ২০০ কবিতা (২০১৩), জলমহালের কাব্য (২০১৭)।

উপন্যাস : দূর্বাঘাস আর গ্রেনেডের কল্প (২০০৪), খনন (২০০৫), মুক্তিস্মান (২০০৬), লড়াই (২০০৬), নীল বাংকার (২০১০), গঙ্গানামা (২০১৮), বেদেস্বর (২০১৯)।

ছোট গল্প : ঘরে ঘরে যুদ্ধ (২০০১), সাবিত্রী ও অন্যান্য গল্প (২০১৭)। প্রবন্ধ : শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও অন্যান্য প্রবন্ধ। জীবনীগ্রন্থ : সাংবাদিক-লেখক বেবী মওদুদ (২০১৫)। সম্পাদনা গ্ৰন্থ : পৃথিবীর কাছে নোটিশ (১৯৭৭), চেতনায় তুমি বিপ্লব (১৯৮২), নিরালােকে বসতি (১৯৮৫), ড্যাফোডিল কাব্যগ্রন্থ (১৯৮৪), সুবর্ণ গ্রামের কবিতা (২০১২), সাহিত্য সংকলন সমমনা' র দুটি সংখ্যা (২০১০ ও ২০১২), জনান্তিকে ত্বকী (২০১৪)। 

সংগঠন :

জাতীয় কবিতা পরিষদ, পদাবলী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশ পার্লামেন্ট সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-আহ্বায়ক, নারায়ণগঞ্জ কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাত বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য।

পুরস্কার : 

জাতীয় প্রেস ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার ২০০৩, চ্যানেল আই আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, চারণ সাহিত্য পুরস্কার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি পদক ২০১৫, পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার ২০১১, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা পেয়েছেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং মধ্যনগর প্রাক্তন ছাত্র সমিতির, এম. নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২০

প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন কবি


বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় বাঁ থেকে তৃতীয় ফরিদা ইয়াসমিন, পঞ্চম কবি সোহরাব হাসান, দুলাল মাহমুদ ও কবি সানাউল হক খান 


সংবাদপত্রের নিউজ টেবিল মানে কার্যত একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ। খুব বেশি কথাবার্তা বলা যাবে না। কাজ করতে হবে নিঃশব্দে। না হলে কাজে মনোযোগ থাকবে না। ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যেতে পারে। যেন পরীক্ষার হল। আশির দশকের শুরুর দিকেও এমন একটা মনোভাব দেখেছি।‌ লেখালেখি কিংবা আড্ডা দিতে যাবার সুবাদে বিভিন্ন সংবাদপত্রে যেতাম। তখন দেখতাম, রিপোর্টিং ডেস্কে প্রাণের উত্তাপের কমতি নেই। একটা হৈ-হুল্লোড় লেগেই থাকতো। কিন্তু নিউজ ডেস্কে সবাই মাথা গুঁজে কাজে ডুবে আছেন। যেন এ কাজ করা না হলে পৃথিবীর বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কর্মরতরা কথা বলতেন চেপে চেপে। মেপে মেপে। এমন একটা ধারণা নিয়ে আমি ১৯৮৫ সালের মার্চে দৈনিক 'বাংলার বাণী' পত্রিকায় শিক্ষানবীশ সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। ভিতরে ভিতরে একটা টেনশন তো ছিলই। কিন্তু প্রথম দিনই আমার এই ধারণাটা একদম ভেঙেচুরে দেন সেই সময়ের পালাপ্রধান বা শিফট-ইন-চার্জ। তিনি কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান। তাঁর কাজের ধরন দেখে আমার আগেকার উপলব্ধি ভুল প্রমাণিত হয়। একটি দায়িত্বশীল পদে থেকেও তিনি প্রচলিত ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, জীবনকে এত কঠিনভাবে নেওয়ার কিছু নেই। জীবনে হাসি থাকবে। আনন্দ থাকবে। প্রাণোচ্ছ্বলতা থাকবে। তার মধ্যেই কাজ করতে হবে। তবে কাজটাকেও তুচ্ছ মনে করা যাবে না। সেটাও করতে হবে যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়ে। এই জীবনদর্শন নিজে যেমন মেনে চলেছেন, অন্যকেও অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে কতজন বদলে ফেলেছেন জীবনধারা।

তাঁর অট্রহাসিতে সরগরম থাকতো পুরো নিউজ রুম। শুধু নিউজ ডেস্ক কেন, একই কক্ষে কাছাকাছি অবস্থানে বসতো সম্পাদকীয়, রিপোর্টিং ও সংশোধনী বিভাগ। তাঁর হাসি ছড়িয়ে পড়তো চারপাশে। এমনকি পৌঁছে যেত সম্পাদকের কক্ষ অব্দি। রিপোর্ট লেখার সময় মন বসাতে ব্যর্থ হয়ে সিনিয়র রিপোর্টার দাউদ ভূঁইয়া কিংবা সুভাষ চন্দ বাদল চিৎকার করে ওঠতেন। সম্পাদকীয় লেখায় মনোনিবেশ করতে না পেরে নিজেদের রুম থেকে বের হয়ে আসতেন যুগ্ম-সম্পাদক আজিজ মিসির কিংবা সহকারী সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এমনকি কখনো কখনো সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম সেলিমও। তিনি তাঁদের এমন উত্তর দিয়ে দিতেন, তাঁরা হাসতে হাসতে চলে যেতেন। আবার কখনো তাঁদের কথায় সাময়িক বিরতি দিলেও ফর্মে ফিরে আসতে সময় নিতেন না। এরপর আর কেউ কিছু বলতেন না। কিছু মনেও করতেন না। সবাই জানতেন তিনি এমনই। একটু বোধকরি পাগলাটে কিসিমের। কখনো অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। কখনো প্রাণখোলা হাসিতে উদ্ভাসিত হচ্ছেন। দমবন্ধ করা পরিবেশ মোটেও পছন্দ করতেন না। তাঁর কারণেই নিউজ টেবিলটাই হয়ে ওঠতো আড্ডার কেন্দ্রস্থল। সারাক্ষণই তাঁর মধ্যে থাকতো একটা ছটফটানি। যেন সৃষ্টির উল্লাসে ফুটছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়,


আজ   সৃষ্টি সুখের উল্লাসে 

মোর    মুখ হাসে মাের চোখ হাসে মাের 

টগবগিয়ে খুন হাসে।


এত কথা। এত হাসি। এত আড্ডা। কিন্তু কাজ করতেন কখন? এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রীতিমতো ম্যাজিসিয়ান। যে কোনো কাজ তিনি এত দ্রুত করতে পারতেন, এমনটি আমি অন্তত দেখিনি। সম্পাদনার কাজ তো বটেই, অনুবাদ ও লেখালেখিও খুব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতেন। সকালের শিফটে আন্তর্জাতিক এবং বিকেলের শিফটে মূলত প্রেস রিলিজের কাজ হতো। দেখা যেত, কাজের মাঝপথেই তিনি ডামি প্রস্তুত করে ফেলেছেন। রাতের শিফটে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাজ হতো প্রথম পৃষ্ঠার। তাতে কি? ত্বরিৎ গতিতে কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না। শুধু তাই নয়, চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, দিতেও পারতেন। তিনি শিফট-ইন-চার্জ থাকলে নির্ভার থাকতেন বার্তা বা নির্বাহী সম্পাদক। একজন সাংবাদিক কতটা দক্ষ, সেটা বোঝা যায়, তিনি কত দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। আমার ধারণা, তিনি ইংলিশ কবি ও সাহিত্য সমালোচক ম্যাথিউ আর্নল্ড-এর উদ্ধৃতি 'জার্নালিজম ইজ লিটারেচার ইন এ হারি' মেনে চলতেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি যেমন সুদক্ষ, তেমনিভাবে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় অতুলনীয়। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, 'মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোন আকাশ নেই'। সহযোগিতা ও সহানুভূতি প্রদানের ক্ষেত্রেও তিনি অকৃত্রিম। এটা বুঝতে অসুবিধা হতো না যে, তিনি ছিলেন অফিসে সবচেয়ে জনপ্রিয়। পিয়ন থেকে শুরু করে সম্পাদক পর্যন্ত সবাই তাঁকে সমীহ করতেন, পছন্দ করতেন এবং ভালোবাসতেন। যে কোনো সমস্যায়, সংকটে বুদ্ধি ও পরামর্শের জন্য তিনি ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এ কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বার বার তাঁকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের 'বাংলার বাণী' পত্রিকার ইউনিট চিফ হতে হয়েছে। তিনি চাইলে সাংবাদিক ইউনিয়নের বড় নেতা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন পেশাকে। সত্যিকার অর্থে তিনি একজন পরিপূর্ণ পেশাদার সাংবাদিক।

তিনি যখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় কর্মরত, তখন তাঁকে প্রথম দেখি। সেগুনবাগিচায় পরবর্তীকালে যে ভবনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেখানেই ছিল পত্রিকার কার্যালয়। তাঁর মাথায় ছিল কিউবার বিপ্লবের অন্যতম নায়ক চে গুয়েভারার মতো একটা ক্যাপ। মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে তখন পরিচয় ছিল না। তবে কবি হিসেবে চিনতাম। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় এক ধরনের কোমল পেলবতা। মায়াবী ভালোবাসা। বিপ্লবী স্পন্দন। বোধকরি বুকের মধ্যে লালন করেন বিপ্লবী চে'র রোমান্টিকতা। কবিতায়ও তার প্রতিফলন দেখা যায়। যদিও সাংবাদিকতার কাজে এত বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় যে, কবিতা লেখার নিভৃত জগত পাবেন কখন? তাঁকে দুই হাতে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, প্রবন্ধ লিখতে হয়। বক্তব্য রাখতে হয় বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায় তাঁর মন কেমন করা কবিতা।

পুরোদস্তুর নিউজম্যান হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রচারবহুল সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। 'জনপদ'  দিয়ে শুরু করে 'দেশ', 'গণকণ্ঠ', 'বাংলার বাণী', 'আজাদ', 'ভোরের কাগজ', 'সংবাদ', 'যুগান্তর' হয়ে 'প্রথম আলো'। পালন করেছেন বার্তা সম্পাদকের মতো গুরু দায়িত্ব। সাহিত্য ও ফিচার পাতার সম্পাদক হিসেবেও তিনি তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমানে যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন দৈনিক 'প্রথম আলো' পত্রিকায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ ও যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ কলামিস্ট হিসেবে তাঁকে আলাদাভাবে পরিচিতি দিয়েছে। 

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার অনুষ্ঠানে কবি সোহরাব হাসানের সঙ্গে 

কবি সোহরাব হাসানের সংস্পর্শে যাওয়া, তাঁকে গুরু হিসেবে পাওয়া যে কোনো নবীন সাংবাদিকের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি সহজেই নতুনদের আপন করে নিতে পারেন। কাজের দীক্ষা দিতে পারেন, কাজটা আদায় করে নিতে পারেন। তাঁর সঙ্গে যাঁরা একবার কাজ করেছেন, তাঁকে ভুলতে পারার কথা নয়। তাঁর অগণন ভক্ত-অনুরাগী। তাঁর কাছে সাংবাদিক হিসেবে অনেকের যেমন হাতেখড়ি হয়েছে, তেমনিভাবে তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য লেখক।‌ শুধু সাংবাদিকতার পেশায় নয়, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর গুনগ্ৰাহীর কমতি নেই। অন্তরঙ্গতার ছোঁয়া দিয়ে সর্বত্রই তিনি নিজের অবস্থান গড়ে নিতে পারেন। মাতিয়ে রাখতে পারেন। তিনি কোনো আড্ডায় থাকবেন আর সেখানে হাসি শোনা যাবে না, এমনটি হতেই পারে না। যদি তেমনটি হয়, সেটা বোধকরি আড্ডা নয়, শোকসভা জাতীয় কিছু হবে।

রাজনীতির প্রতি তিনি আলাদা একটা টান অনুভব করেন। কাজে, আড্ডায়, আলোচনা সভায় সরব থাকলেও তাঁর কান সজাগ থাকে রাজপথের দিকে। সেখানে ছুটে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। তাঁর বুকের মধ্যে ছটফট করে দীর্ঘশ্বাসের পাখি-


'তোমরা কেউ আমার কষ্ট বুঝলে না, হয়তো আমিও তোমাদের অনুভবের সাগর ছুঁতে পারেনি। অনুতাপহীন মানুষের দেশে আমি দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছি।'

একদিন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান ও মলিন হয়ে গেছে। রাজপথের বন্ধুরা ঘরমুখী হয়ে যাওয়ায় রক্তক্ষরণ হয় তাঁর বুকের মধ্যে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা কিছুতেই সইতে পারেন না। ফুল ও পাথরের গল্প নিয়েই কাটে তাঁর জীবন।


বন্ধুরা ঘরে ফিরে গেছে 

আপনাপন নারীর কাছে বড় সুখী তারা 

যাদের চালচুলো নেই; বাউন্ডেলে চেহারা 

ইদানিং তারাও সান্ধ্য-আসরে গরহাজির 

আউল বাউল বেশ ছেড়ে হয়েছে একান্ত ঘরমুখী 

একদা রাজপথ যার ঠিকানা ছিল

তারা আজ মিছিলের ভাষা ভুলে গেছে

আমরা সবাই সুখ খুঁজি ব্যক্তিগত প্রেম ও বিশ্বাসে।


একদিন স্বপ্নময় মনে হত 

রঙিন প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথ জুড়ে মানুষের মােহন মিছিল 

সহস্র কোরাস কণ্ঠে স্বপ্নের জাগরণ ধ্বনি ছিল 

ছন্দ ছিল, সাম্য ছিল জীবনের প্রতি পংক্তিতে 

কোলাহল বুকে নিয়ে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি

অন্ধ আবেগে আকাশকে টেনে নিয়েছি হাতের মুঠোয় পাথরকে ফুল করে কত দিন সাজিয়েছি মালা 

হৃদয়ের বাগান থেকে ফুল ঝরে গেছে 

মানুষ নিরেট পাথর।

হৃদয়ের বাগান থেকে ফুল ঝরে গেলেও তিনি নিরেট পাথরে পরিণত হননি। তাঁর বুকের মধ্যে বয়ে চলে ভালোবাসার ফল্গুধারা। অসহায় মানুষদের দেখলে তাঁর হ্নদয় কাঁদে। কারও দুঃখ-কষ্ট তিনি সইতে পারেন না। সর্বহারাদের প্রতি রয়েছে তাঁর নিরন্তর সহানুভূতি। যাঁরা তাঁর কাছাকাছি হয়েছেন, তাঁরাই সেটা অনুভব করতে পারেন। তিনি যে অবস্থানে থাকুন না কেন, কাছের এবং দূরের সবার খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন। সবাই যাতে ভালো থাকে, মনে-প্রাণে সেই কামনা করেন। স্বার্থপর এই সময়ে একজন সোহরাব হাসান ব্যতিক্রম হয়ে আছেন।

(১৯৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠির শৌলজালিয়ায় সোহরাব হাসানের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রকাশিত অগ্নিবারুদেমেশা কাব্যগ্রন্থ 'বাতিল রাজদণ্ড'। প্রকাশিত গ্ৰন্থের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'কালো বারুদ শাদা গোলাপ', 'সুন্দর তোমার সর্বনাশ', 'শূন্যতার কাছে প্রার্থনা', 'ভুল করে বেঁচে আছি', 'যে আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশ', 'প্রেমের কবিতা', গদ্যগ্রন্থ 'মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি', 'রাষ্ট্র ও সংখ্যালঘু', 'মুজিব ভুট্টো মুক্তিযুদ্ধ', 'আদমজীর আয়নায় স্বদেশের মুখ', 'জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধ', 'শেখ মুজিব : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা', 'পাকিস্তাননামা', 'রাজনীতি কার নীতি', 'নেই গণতন্ত্রের দেশে', '২০১৮ নির্বাচনের আগে পরে', 'স্মৃতিতে আগষ্ট', '১৯৭১ : বাংলাদেশের শত্রু মিত্র', 'রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র ১৯৫১' প্রভৃতি। সম্পাদিত গ্ৰন্থ 'তৃতীয় বিশ্বের কবিতা', 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের ভূমিকা'। লেখক মোরশেদ শফিউল হাসানের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গল্প সংকলন 'মানুষের মৃত্যু হলে', 'আহমদ ছফা স্মারকগ্ৰন্থ'।)

১০ সেপ্টেম্বর ২০২০

আশা নিয়ে বেঁচে থাকা



আমি কি কাউকে কোনো কথা দিয়েছিলাম? কোনো প্রতিশ্রুতি? কিংবা কোনো অঙ্গীকার কি করিনি? হতে পারে একান্তে, নিভৃতে কিংবা প্রকাশ্যে। আবেগময় কোনো মুহুর্তে, খোশমেজাজে কিংবা প্রয়োজনের অংশ হিসেবে। করতেই তো পারি। না করাটাই তো অস্বাভাবিক। সমাজে বসবাস করলে কত কিছুই তো করতে হয়। সম্পর্ক হয়। সম্পর্ক ভেঙেও যায়। নানাভাবে লেনদেন হয়। সবটাই যে নিয়ম মেনে হয়, তা তো নয়। অনিয়মও হয়ে যায়। বেলা তো আর কম বয়ে গেল না? এখন একদমই কিছু মনে থাকে না। কখন, কোথায় কার সঙ্গে কী কথা বলেছি, কী করেছি কিছুই মনে করতে পারছি না। আর আমার স্মৃতিশক্তি তো মাশাল্লাহ! একদম ঝরঝরে। অনেক সময় সকালে কী নাস্তা করি, দুপুরবেলাই মনে করতে পারি না। যেটুকু স্মৃতিশক্তি অবশিষ্ট ছিল, এই করোনাকালে সব যেন লেপেপুছে গেছে। করোটির মধ্যে এখন একটা বিষয়ই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে।

কাকে কখন, কোথায় কী বলেছি, কী করেছি, হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করার কী এমন হলো? প্রশ্ন হতেই পারে, লাজ-লজ্জা কি সব ধুয়েমুছে গেল নাকি? আর লাজ-লজ্জা? আসলে সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। কী করবো, কী করবো না, কী করা উচিত, কী উচিত নয়, একদমই বুঝতে পারছি না। মাঝ রাতে ঘুম ভাঙার পর আচমকা ভাবনা হলো, আমাকে যদি চলে যেতে হয়, এটা মনে হওয়ার পর বুকের মধ্যে হু হু করে বইতে থাকে কান্নার প্রবল স্রোত, সেটা নিরুত্তেজ হওয়ার পর মনে হতে থাকে, তাহলে আমার তো নিশ্চয়ই কিছু দায়-দায়িত্ব রয়ে গেছে? রয়ে গেছে হিসাব-নিকাশ। সময়-সুযোগ থাকতে থাকতে তার একটা বিহিত তো অন্তত করে যেতে পারি। তাই না? সেই ভাবনা থেকে তার একটা তালিকা করতে গিয়ে কোনো দিশা পাচ্ছিলাম না। কোনটা রেখে কোনটা করবো? তখনই মনে হলো, প্রথমত আমি কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম? সেটা আমি সবার আগে রক্ষা করতে চাই। কথা দিয়ে কথা না রাখাটা আমার সবচেয়ে অপছন্দের। কথা দিলে পারতপক্ষে আমি কথা রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি তো কোনো মহামানব নই। নিজের অজান্তেই ভুল হয়ে যেতে পারে। হতে পারে আমি সেই সময়ে গুরুত্বও দেইনি। যেহেতু এখন আত্মোপলব্ধি হচ্ছে, ভুলগুলো তো অন্তত শুধরে নেওয়া যায়। যদিও এ জীবনে যত জনের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ হয়েছে, এই ফেসবুকে তো তাদের সবাইকে পাওয়া যাবে না। তারপরও এর মাধ্যমে অনেকের কাছে পৌঁছে যাবার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। ফেসবুকও তো অনেকটা করোনাভাইরাসের মতো। কিছু একটা লিখলে বা আপলোড করলে চট করে দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর ভাইরাল হলে তো কথাই নেই। আমার অনুরোধের কথা কোনোভাবে তাঁরা যদি জানতে পারেন, তাহলে সাড়া তো দিতেই পারেন। প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, ফোন করতে পারেন কিংবা গোপন কিছু হলে মেসেঞ্জারে জানাতে পারেন। সাধ্যে কুলালে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেষ্টার অন্তত কসুর করবো না। এ বয়সে সবটাই তো পারা যাবে না। যতটুকু পারি আরকি। আর যা পারবো না, তা না হয় আলোচনা কিংবা চ্যাটিং-এর মাধ্যমে সুরাহা করে নেওয়া যাবে। কিন্তু কারো সঙ্গে চিটিং করতে চাই না। আপনারা কী বলেন? 

আপাতদৃষ্টিতে আমাকে শান্ত-সুবোধ মনে হয়। মূলত তেমনটি থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় সেটা পেরে ওঠি না। পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারি না। কষ্টকর ব্যাপার হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবাদও করতে পারি না। যে কারণে ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হই। রক্তাক্ত হই। তাতে যা ক্ষতি হওয়ার নিজেরই হয়। তবুও কথিত ভদ্রলোকের মতো চুপচাপ থাকি কিংবা নখ কামড়িয়ে কামড়িয়ে আঙুলের রক্ত বের করে ফেলি। আমাকে যাঁরা ক্ষতবিক্ষত করতে চান, সেটা তাঁরা মনের সুখ মিটিয়ে করেন। আবার অনেক সময় নিজেকে সামলাতে পারি না। অনেক ছোট-খাট বিষয়েও রাগে ফেটে পড়ি। ভিতরের অসুরটা সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে আসে। তখন আমাকে ঠিক চেনা যায় না। সেই সময় অনেকেই আমাকে ঠিক মেলাতে পারেন না। ভাবেন, এই আমি কি সেই আমি? আসলে আমি কিন্তু এমন করতে চাই না। তারপরও কেন যে এমন করি, বুঝতে পারি না। বোঝার পর অনুতপ্ত হই। অনুশোচনা হয়। মুষড়ে পড়ি। তখন তো আর কিছু করার থাকে না। এটা তো জানা কথা, মুখের কথা আর তীর একবার ছুটে গেলে কখনো ফেরানো যায় না। এটা আমারও খুব ভালো করে জানা। কিন্তু রাগের সময় এই বোধ থাকে না। আবার অন্যভাবেও কাউকে মানসিকভাবে আঘাত কিংবা অপমান করা যায়। আমি হয়তো জানি বা জানি না, আমার কথায়, আচরণ বা ব্যবহারে কেউ আঘাত পেয়েছেন বা অপমানিত হয়েছেন, তিনি হয়তো বুঝতে দেননি বা কখনো প্রকাশ করেননি। এমন তো অহরহই হতে পারে।

এখন মনে হচ্ছে, অনেকের সঙ্গে রাগারাগি করেছি, খারাপ ব্যবহার করেছি কিংবা দুর্ব্যবহার করেছি। কার কার সঙ্গে এমনটা করেছি, সেই হিসাব তো এখন আর মেলানো যাবে না। তাঁদের কাছে মনে মনে ক্ষমা চাইলে কেমন হয়? কিন্তু তাঁরা তো বুঝতে পারবেন না। এমনও তো হতে পারে, তাঁদের হয়তো মনেও নেই। থাকলেও ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি ক্ষমা না করে থাকেন? সে ক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?

হঠাৎ মনে হলো, আরে! এ জীবনে কিছুই তো করা হলো না। কিছু একটা না করে গেলে কেমনে হয়? এমন একটা কিছু করতে চাই, অন্তত কাছের মানুষের স্মৃতিপটে যাতে রয়ে যেতে পারি। জানি, এ ধরনের আশা করা মোটেও বাস্তবোচিত নয়। কে যে কাছের মানুষ আর কে যে দূরের মানুষ! আর কে যে কাকে মনে রাখে? দম ফুরালেই তো সব শেষ। তুরস্কের বিশ্বখ্যাত কবি নাজিম হিকমতের ভাষায়,

বিংশ শতাব্দীতে

মানুষের শোকের আয়ু 

বড় জোর এক বছর।

সেও তো বিখ্যাতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমার মতো অভাজনদের জন্য নয়। আমার জন্য সেটা কত মিনিট, কত ঘণ্টা বা কত দিন কে জানে? এটাও ঠিক, কে শোক করলো, কে করলো না, সেটা তো আর জানার সুযোগ থাকবে না। আর এখন এই করোনাকালে জীবিত থাকতেই তো এক রকম মৃত্যু হয়ে যাচ্ছে। কেউ আক্রান্ত হলে তিনি হয়ে যাচ্ছেন নিঃসঙ্গ এক দ্বীপের বাসিন্দা। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ থাকে না। যদিও কতকাল আগে মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে ইংরেজ কবি জন ডান লিখে গেছেন,

No man is an island, 

Entire of itself, 

Every man is a piece of the continent, 

A part of the main.

Any man's death diminishes me, 

Because I am involved in mankind,

হায়! এ ধরনের অনুভূতির এখন আর গুরুত্ব নেই বললেই চলে। সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে মানুষ ও মানবিকতা। এমন এক ভাইরাস এসেছে, মানুষকে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ইচ্ছে থাকলেও করোনাবন্দির সঙ্গে সুযোগ নেই দেখা-সাক্ষাৎ করার। ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেই কেবল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হবে। নতুবা সামাজিক দূরত্ব থাকাবস্থায় মৃত্যু হলে শেষ দেখা তো দূরে থাক, জানাজা ও দাফনেও অংশ নেওয়া যাবে না। এ কারণে কেউ কাছে ঘেঁষতেই সাহস পান না। কোথাও কোথাও নাকি গণকবর দেওয়া হচ্ছে। এরচেয়ে দুঃখজনক ও নির্মম আর কী হতে পারে? এই করোনাকালে মৃত্যু হওয়া মানে কেবলই একটা সংখ্যার বেশি কিছু নয়। তাহলে এ অবস্থায় কাছের মানুষদের হৃদয়ে দাগ কাটার সুযোগ কোথায়? তবুও মন মানে না। 

কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন,

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক

এ তো ইহলোকের ভালোবাসার কথা। পরলোকে চলে যাবার সময় তো আর কাউকে অপেক্ষা করার কথা বলে যাওয়া যায় না। বাস্তব বড় নিষ্ঠুর। তারপরও কেন যেন মনে হয়, চলে যাবার পর কাছের মানুষরা আমার জন্য একটু শোক করুক। আমাকে কিছুটা হলেও মনে রাখুক। মনে মনে ভালোবাসুক। নিরালায় বসে একটুখানি না হয় কাঁদুক। দুনিয়াটা তো মায়ার বাঁধনে জড়ানো। যদিও এর কোনো যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। কে শোক করবে, কে মনে রাখবে, কে ভালোবাসবে, কে কাঁদবে, তা নিয়ে আক্ষেপ করে আর কীইবা হবে? সেটা তো জানতেই পারা যাবে না। কিন্তু মন তো অদ্ভুত এক খেয়াল। তার যে কখন কী ইচ্ছে হয়, বুঝতে পারা যায় না। তাছাড়া বেঁচে থাকার যে মোহ, তা থেকে মুক্ত হওয়া কি এত সহজ? কোনোভাবে বেঁচে থাকা এবং বন্ধনে জড়িয়ে থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই করে বা করতে চায়।

সে কারণে মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটার জন্য কিছু একটা করতে মনটা ছটফট করে। কিন্তু করবোটা কি? আমার সামর্থ্যইবা কী আছে? না আছে মেধা, না আছে বিদ্যা, না আছে ক্যারিশমা, না আছে কোনো ক্ষমতা। তাহলে? সেক্ষেত্রে যেটুকু যা আছে, নিধিরাম সর্দারের মতো তা নিয়ে যদি কিছু একটা করা যায়। কিন্তু ইচ্ছে হলেও উদ্যম যেন হারিয়ে গেছে। না হারিয়ে করবোটা কি। করোনা তো কাউকে একদমই স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। মৃত্যু ভাবনায় বার বার জারিত হতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। কিছুই তো করা হচ্ছে না। হবেও না। অথচ বুকের মধ্যে কত যে ইচ্ছের ছটফটানি। এ জীবনে যা যা করতে চেয়েছি, কিন্তু করতে পারিনি, এখন সব কিছু করার ইচ্ছে জাগছে। মনে হচ্ছে, আমি চাইলেই সব করে ফেলতে পারি। ধন্য আশা কুহকিনী। 

আচ্ছা, আমি যে অনেক কিছু লিখতে চেয়েছি বা পরিকল্পনা করেছি, তার কী হবে? কত কত বিষয় লিখবো বলে মাথার মধ্যে সাজিয়ে রেখেছি। যদিও আমার লেখার কীইবা গুরুত্ব থাকবে? আমি তো কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক নই। এমন সব বিষয় লিখি, যার কোনো গুরুত্ব নেই। তদুপরি আমি যদি না থাকি, আমার পাঠকও তো থাকবে না। তাহলে লিখে কী হবে? ওই যে বললাম, মন নামক এক অনুভূতি আমাকে নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। তার অবাধ্য হতে পারি না। কেন যেন আমাকে লিখতে প্ররোচিত করে। আমি জানি, আমার লেখা কেউ পড়তে পারে, কেউ নাও পড়তে পারে। তাতে তো আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মন আমাকে বোঝায়, সেক্ষেত্রে আর কিছু না হোক, অন্তত নিজের জন্য লিখতে তো কোনো অসুবিধা নেই। নিজের লেখার পাঠক হয়ে নিজেই তো আত্মতৃপ্তি পেতে পারি। চলে যাওয়ার আগে বা পরে কে পড়লো, কে পড়লো না, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী হবে? কিন্তু অশান্ত মন নিয়ে কি লেখা যায়? এত এত মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে কীভাবে সেটা সম্ভব? কিছু পড়তেই তো পারি না। পড়তে গেলে অক্ষরগুলো ম্যাজিক রিয়ালিজম হয়ে যায়। কত সব উল্টাপাল্টা বিষয় মাথার মধ্যে ভেসে ওঠে। তাহলে লিখবো কীভাবে? 


এই করোনাকালে আমার যেন ইচ্ছের শেষ নেই। ইদানিং নানান জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। এর কারণ হতে পারে, এখন তো কোথাও যাবার সুযোগ নেই। বিদেশের কথা না হয় বাদ দিলাম, তা আমার সামর্থ্যরে মধ্যে পড়ে না, দেশের মধ্যেই কত জায়গায় ঘুরতে চেয়েছি। ঘুরি ঘুরি করেও সময়ের দোহাই দিয়ে যাওয়া হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, পরিকল্পিত সে সব স্থানে যেতে না পারলে শান্তি পাবো না। নানান জনের কাছে ভ্রমণের স্থানগুলোতে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে একপ্রকার মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছি। সিলেটের বিছানাকান্দিতে সুউচ্চ ঝরনাধারা থেকে নেমে আসা জলরাশিতে অবগাহন, জোছনা রাতে বিশাল রকেট লঞ্চে বরিশাল ঘুরতে যাওয়া, প্রাকৃতিক বনভূমি সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করা, দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওরে ভরা বর্ষায় গা ছমছম করা অনুভূতি নেওয়া, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে চিত্রা হরিণের দুরন্তপনা দেখা, কুয়াকাটায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার দুর্লভ সুযোগ, বান্দরবানের নীলগিরি পাহাড়ে উঠে মেঘ যদি না ছোঁয়া যায়, তাহলে এ জীবন তো অপূর্ণ রয়ে যাবে। স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এ দেশটির এ রকম কতনা সৌন্দর্য অদেখা হয়ে আছে। তা কি কেবল স্বপ্ন হয়ে থাকবে?


হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, এমন সব স্থানেও তো যাওয়া হয়নি। ঢাকার আশপাশে ইতিহাসখ্যাত নান্দনিক ডিজাইনের কত বাড়িঘর দেখা, নদী-বিল-জলাশয়ের মনোরম শোভায় বিভোর হওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা দ্বীপ বা রিসোর্টে অবস্থান করার অনুভূতিও হলো না। অথচ খুব বেশি দূরে তো নয়। চাইলেই দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়। কিন্তু যাওয়া হয়নি। এমনকি যে ঢাকায় পুরো জীবন কেটে যাচ্ছে, সেই শহরটাই তো অচেনা রয়ে গেছে। পুরানো ঢাকা, নতুন ঢাকা কোনোটার সঙ্গে ঠিকমতো চিনপরিচয় হলো না। এত এত প্রত্যাশার পদ্মা ব্রিজ, মেট্রোরেল কি দেখতে পারবো? এই শহরে রয়েছে চমৎকার সব রেস্তোরাঁ। কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে দেখা যায় চুঁইয়ে পড়া চাঁদের ঘোর লাগা আলো। সেই আলোয় নাকি দুলে উঠে মায়াবী হৃদয়। হায়! এই সামান্য রোমান্টিকতাটুকুও অনুভব করা হলো না। আরো যে কত কিছু করা হলো না। 

কবি হেলাল হাফিজের মতো কোমল হৃদয়ের হলে না হয় বলতাম,

হলো না, হলো না। 

সুন্দর হলো না, অসুন্দরও না 

জীবন হলো না, জীবনেরও না, কার যেন 

কিছুই হলো না, কিচ্ছু হলো না। 

হলো না। না হোক, 

আমি কী এমন লোক

আমার হলো না তাতে কী হয়েছে?

তোমাদের হোক।

কিন্তু স্বার্থপর মন তো। নিজের না হওয়াগুলো নিয়ে বেশি ভাবছি। আর না ভেবেইবা কী করবো? এখন সময়টাই তো অন্য রকম। যে কারণে ভাবনার দোলাচলে প্রতিনিয়ত হাবুডুবু খাচ্ছি। এছাড়া তো কিছু করার নেই। যথেষ্ট অবসর পেয়ে নিজের জমা-খরচের খুচরা হিসাব মিলাচ্ছি। সব হিসাব তো আর আমার কাছে নেই। সেটা মেলানোর জন্য তো আলাদা নিয়োগ দেওয়া আছে। আমি আমার মনের খসড়া খাতার ছোট-খাট বৈষয়িক বিষয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। এই সামান্য হিসাবও মিলাতে পারছি না। 


তাই চলে যাবার যে দুর্ভাবনা ও দুঃস্বপ্ন, তার আগে আমার যত অপারগতা, আমার যত অসম্পূর্ণতা, আমার যত না পূরণ হওয়া অভিলাষ নিয়ে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছি না। অথচ এ জীবনে এ মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ, যখন সুযোগ আসে, তখন তা গ্রহণ করা হয় না। আর যখন সুযোগ থাকে না, তখন তার অপেক্ষায় থাকি। এ ধরনের মনোভাব নিয়ে কিছু করা যায় না। তবে বেঁচে থাকলে আশায় আশায় তো থাকা যায়। একদিন না একদিন হয়ে যেতে পারে। কথায় আছে না, পাগলের সুখ মনে মনে। আমারও সেই অবস্থা। 

তবুও সুস্থ, সুন্দরভাবে নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। কখনো কখনো হার মানতে হয় জীবনের মোহের কাছে। আর যাঁরা হার মানেন না, তেমন মহামানব কি আর সবাই হতে পারেন?

২২ এপ্রিল ২০২০

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

কর্মনিষ্ঠ একজন সামাজিক মানুষ


আমার মতো গুটানো স্বভাবের মানুষ কারো সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়া তো দূরে থাক, সহসা মিশতেও পারে না। সহজাত সেই ক্ষমতাটা আমার নেই। সৃষ্টিকর্তা বোধকরি এমন সব অসামাজিক দুর্লভ প্রজাতির মানুষদের জন্য শাহ আলমগীর ভাইয়ের মতো অন্তরঙ্গ, দিলখোলা ও মিশুক মানুষদের পাঠিয়ে দেন। যাঁরা খুব সহজেই দূরের মানুষকে আপন করে নিতে পারেন। কত মানুষের সঙ্গে যে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা কেবল একমাত্র তিনিই জানতেন। তারপরও যতটা দেখেছি, তাঁর নেটওয়ার্ক ছিল অনেক দূর বিস্তৃত। সেটা তিনি বরাবরই রক্ষা করতেন। এ বিষয়ে তাঁকে কখনও বিরক্ত হতে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বরং প্রতিনিয়ত সম্প্রসারিত হতো তাঁর যোগসূত্র। তাতে যেন তিনি খুশিই হতেন। 

আশির দশকের মাঝামাঝি পেরিয়ে দৈনিক বাংলার বাণীতে কর্মরত অবস্থায় আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তখনও পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমার নবিসি অবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। সাংবাদিক হিসেবে তিনি তখন মোটামুটিভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। শিশু-কিশোর সাপ্তাহিক ‘কিশোরবাংলা’ আর দৈনিক জনতা পত্রিকায় হাত মকশো করে এসেছেন। দীক্ষা নিয়েছেন সাংগঠনিকতায়ও। সেটা তাঁর কাজে-কর্মে টের পাওয়া যেত। তাঁর মধ্যে একটা গুছানো স্বভাব ছিল। তিনি যখন কাজ করতেন, তখন তাতে থাকতো গভীর মনোযোগ। সে সময় অন্য কিছুতে আর খেয়াল থাকতো না। নিউজপ্রিন্টের কাগজে তাঁর ঝকঝকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর হস্তাক্ষরে ফুটে উঠতো দেশ-বিদেশের কত না খবর। সাংবাদিকতায় একটু সিনিয়র হলেই সাধারণত এক ধরনের ভারিক্কি ভাব দেখা যায়। জুনিয়রদের কথা বলতে হয় মেপে মেপে। নতুবা কারণে, অকারণে ধমক খেতে হয়। কিন্তু একদমই ব্যতিক্রম ছিলেন আলমগীর ভাই। তিনি ছিলেন অন্য ধাতুতে গড়া। তাঁর কাছে সিনিয়র-জুনিয়রের কোনো মাপকাঠি ছিল না। বরং জুনিয়রদের প্রতি তাঁর এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। তিনি যেভাবে সবার সঙ্গে মিশতে পারতেন, সুহৃদ হয়ে উঠতে পারতেন, বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে তুলতে পারতেন, তেমনটি সংবাদপত্র জগতে খুব বেশি দেখা যেত না। এ কারণে তাঁর সঙ্গে হৃদ্যতা গড়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি।

তখন তো অধিকাংশ সাংবাদিকের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা খুব একটা ছিল না। বেতন যা হোক না কেন, সেটা একবারে পাওয়াটা ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কিস্তিতে কিস্তিতে পাওয়া যেত। কিন্তু সেটাইবা কবে পাওয়া যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। বাড়তে থাকতো বকেয়া বেতনের সঞ্চয়। সঙ্গত কারণে আর্থিক অনটন লেগেই থাকতো। আর অর্থের অনটন থাকলে কি আর আনন্দে থাকা যায়? মজার ব্যাপার হলো, সে সময় পর্যাপ্ত অর্থ না থাকাটাই যেন আমাদের সুখের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটি কিন্তু মোটেও বাড়িয়ে বলা নয়। এর অন্যতম কারণ, আলমগীর ভাইয়ের মতো সদা সুখী, সর্বদা হাস্যোজ্জ্বল, যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষের সান্নিধ্য। তিনি ছিলেন আমাদের কাছে জীয়নকাঠির মতো। যে কারণে আমরা সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা ভাগাভাগি করে নিতে পারতাম। চারপাশের মালিন্য আমাদের স্পর্শ করতে পারতো না। সেই সময়ে আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে উঠে, তা কখনো ব্যাহত হয়নি। সেই দলে ছিলেন কবি সোহরাব হাসান, সুধীর কৈবর্ত দাস, দাউদ ভুঁইয়া, সুভাষ চন্দ বাদল, কবি হালিম আজাদ, অসীম কুমার উকিল, প্রণব সাহা, মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু, সায়েদুল আরেফিন, শরীফ সাহাবুদ্দিন, ঝর্ণা বেগম, সাইফুল আমিন, ফরিদা ইয়াসমীন, সাইফুল ইসলাম শ্যাম, নান্টু রায়, জি. এম. জোয়ার্দার প্রমুখ। একসঙ্গে কাজ করি কিংবা না করি, বন্ধনটা চিরদিনের জন্য অটুট রয়ে যায়। এমন বন্ধন অসংখ্য মানুষের সঙ্গে তাঁর গড়ে ওঠেছিল। 

১৯৮৭ সালে সরকার দৈনিক বাংলার বাণী নিষিদ্ধ করে দিলে প্রকৃতঅর্থেই আমরা আতান্তরে পড়ে যাই। কবে পত্রিকা প্রকাশিত হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। এমন অবস্থায় সম্ভবত আলমগীর ভাইয়ের উদ্যোগে আমরা কয়েকজন যোগ দেই দৈনিক আজাদ পত্রিকায়। অত্যন্ত সঙ্গিন অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা করছিল পুরানো ঘরানার এ পত্রিকাটি। এরই অংশ হিসেবে বাংলা দৈনিক পত্রিকার মধ্যে প্রথম কম্পিউটার চালু হয় আজাদে। সেই আর্কষণে মূলত আমাদের সেখানে ছুটে যাওয়া। যদিও সে সময় আমাদের খুব বড় কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল না, তারপরও নতুন একটি পদ্ধতিতে কাজ করার আনন্দ অন্তত ছিল। কম্পিউটারে কোনো গড়বড় হলে কালো রঙের বিকল্প ট্যাক্সি নিয়ে মধ্যরাতেও সাংবাদিক ও প্রযুক্তিবিদ মোস্তাফা জব্বারকে দিব্যি হাজির হতে দেখতাম, আজকের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী। আর সেই ইতিহাসের অংশীদার হই আলমগীর ভাইসহ আমরা কয়েকজন। কাজের পরিবেশ যেমনই হোক না কেন, আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা পারিবারিক পর্যায়ে গড়ে ওঠে। আর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন আলমগীর ভাইয়ের গৃহিণী মায়া ভাবী। তিনিও মায়াডোরে এমনভাবে বেঁধে ফেলেন, তাঁকে ভাবী বলবো না আপা বলবো, সেই দ্বিধা আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি। কোনো ঘোষণা ছাড়াই কখনো কখনো আলমগীর ভাইয়ের পল্টনের ছোট্ট কিন্তু ছিমছাম বাসায় গিয়ে দুপুরের খাবারের অংশীদার হয়েছি। ব্যঞ্জন বেশি না থাকলেও ব্যঞ্জনার কোনো কমতি ছিল না। এছাড়া নববর্ষ, একুশে ফেব্রুয়ারি, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, জাতীয় প্রেস ক্লাব কিংবা অন্যত্র প্রাণোচ্ছ্বল আড্ডায় কত কত দিন অবগাহন করেছি। আহ্! তখন কী যে আনন্দময় দিন কেটেছে। 

দৈনিক আজাদ পত্রিকার পর আমাদের কর্মস্থল বদলে গেলেও আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগাটা কখনোই বিচ্যুত হয়নি। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় প্রেস ক্লাব, হাঙ্গেরীভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব জার্নালিস্ট (আইওজে)-এর সঙ্গে সম্পৃত্ততা তো ছিলই, তাছাড়াও নানাভাবে সংস্পর্শ ও সংযোগ রয়ে যায়। হঠাৎ হঠাৎ ‘ক্রীড়াজগত’ পত্রিকায় স্রেফ আড্ডা মারতে তিনি চলে আসতেন। এটা যে নিছক আড্ডা ছিল না, সেটা তখন না বুঝলেও এখন বুঝতে পারি, আমাকে আশ্বস্ত করতেই তিনি যেতেন। আমি ‘ক্রীড়াজগত’ পত্রিকায় যোগ দিতে না চাইলেও যাঁদের আগ্রহ, উৎসাহ ও পরামর্শে শেষ পর্যন্ত সেখানে যোগ দেই, তিনি তাঁদের অন্যতম। আলমগীর ভাই তাঁর মেধা দিয়ে, তাঁর প্রজ্ঞা দিয়ে, তাঁর কর্মদক্ষতা দিয়ে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকেন। দৈনিক সংবাদ হয়ে দৈনিক প্রথম আলোর শুরু থেকেই দায়িত্বপূর্ণ পদ নিয়ে তিনি যুক্ত হন। যেখানেই কর্মরত থাকতেন, সেই প্রতিষ্ঠানের তিনি ছিলেন পরম এক নির্ভরতা। যে কোনো দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হলে অনায়াসেই নিশ্চিত হওয়া যেত। এ কারণে নতুন কোনো মিডিয়া গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি হতেন অটোমিক চয়েজ। যাঁদের হাত ধরে প্রাথমিকভাবে বেসরকারি ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার সূচনা হয়, তিনি তাঁদের একজন। আগে থেকেই তিনি ছিলেন খ্যাতিমান শিশু সাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর এবং কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের একান্তই আপনজন। সঙ্গত কারণে তাঁরা যখন চ্যানেল আইয়ে নিউজ সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নেন, তাঁকে ছাড়া এ ধরনের উদ্যোগের কথা ভাবতে পারেননি। চ্যানেল আই নিউজ সম্প্রচার শুরু করলে আলমগীর ভাই হয়ে উঠেন এর প্রধান কাণ্ডারি। একুশে টেলিভিশনের বিপুল জনপ্রিয়তা আর এটিএন বাংলা সংবাদ সম্প্রচার শুরুর মাঝে তিনি নতুন এক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যান। সংবাদপত্র জগতের তাঁর চেনা-জানা কিংবা স্বল্প চেনা, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ছিলেন কর্মহীন, এমন একদল কর্মীকে নিয়ে নতুন এ উদ্যোগের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো মোটেও সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি নিজেকে নিংড়ে দিয়ে এ প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করাতে সচেষ্ট হন। তাঁর দিন-রাতগুলো একাকার হয়ে যায়। সেই শুরু থেকে আমরা যাঁরা তাঁর সঙ্গে ছিলাম, তাঁকে দেখেছি কাজপাগল একজন মগ্ন সাধক হিসেবে। সংবাদকে কীভাবে দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা যায়, তা ছিল তাঁর সর্বক্ষণের চিন্তা। কোনো পরিস্থিতিতে তিনি উত্তেজিত হতেন না। কাজ করতেন ঠাণ্ডা মাথায়। যে কোনো সমস্যার সহজ সমাধান দিতে পারতেন। কঠিন কথাও হালকাচালে বলতেন। দৈবাৎ রেগে গেলেও কখনই কাণ্ডজ্ঞান হারাতেন না। তিনি নিজে যেমন যুক্তি দিয়ে কথা বলতেন, অন্যদের যুক্তিসঙ্গত কথাও তিনি অবলীলায় গ্রহণ করতেন। তিনি গড়ে তোলেন কর্মঠ, উৎসর্গকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ একদল সংবাদকর্মী। যে কারণে অল্প দিনের মধ্যে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় চ্যানেল হিসেবে দর্শকদের হৃদয়ে স্থান করে নেয় চ্যানেল আই। 

একটা সময় তিনি অন্যত্র চলে গেলেও চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে তাঁর আত্মিক বন্ধন কখনো ছিন্ন হয়নি। এটাও তাঁর প্রধান একটি বৈশিষ্ট্য, কোথাও থেকে চলে গেলেও তিনি একদমই বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেন না। কাজের সম্পর্ক না থাকলেও আত্মিক যোগাযোগটা রয়েই যেত। আর সাগর ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল অন্য মাত্রার। তাছাড়া তাঁদের দুজনের জন্মদিন একই দিনে। এ কারণে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে এ দুজনের জন্মদিন একইসঙ্গে উদযাপিত হতো। এ চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি যাঁদের দীক্ষা দিয়েছেন, তাঁদের অনেকেই আজ ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় সর্বেসর্বা। তিনি আসলে সবার মাঝে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করতেন। এ কারণে মিডিয়া জগত তো বটেই, সব ক্ষেত্রেই তাঁর অনুরাগীর সংখ্যা অগণিত। তাঁরা অন্তর দিয়ে তাঁকে ভালোবাসেন। 

২০১৩ সালে ডিআরইউ-গ্রামীণফোন রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ডের জুরি বোর্ডের সদস্য বাঁ থেকে প্রেস ইনস্টিটিউট মহাপরিচালক শাহ আলমগীর, দুলাল মাহমুদ, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রাজীব মীর, শফিকুল করিম সাবু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও ফিল্ম অধ্যয়ন বিভাগ চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আ.জ.ম. শফিউল আলম ভূঁইয়া, রাশীদ উন নবী বাবু


আলমগীর ভাই একুশে টেলিভিশন, যমুনা টেলিভিশন, মাছরাঙা টেলিভিশন, এশিয়ান টেলিভিশন হয়ে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন নিউ ভিশন টিভিকে। এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন তিনি। অবশ্য এ টেলিভিশন চালু করার সুযোগ পাননি। প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ায় তাঁর ধ্যান-ধারণা হয়ে উঠে এ প্রতিষ্ঠানটি। চাইলে তিনি এ প্রতিষ্ঠানকে আগের মতো ঢিলে-ঢালাভাবে পরিচালনা করতে পারতেন। কিন্তু এটা তাঁর স্বভাবের সঙ্গে যায় না। তিনি যোগ দেওয়ার পর এ প্রতিষ্ঠানটি সত্যিকার অর্থেই তার কাণ্ডারিকে খুঁজে পেয়েছিল। তিনি এ প্রতিষ্ঠানের দিগন্তকে প্রসারিত করে দিয়েছিলেন। করে তুলেছিলেন সাংবাদিকবান্ধব। পিআইবি’র প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ছড়িয়ে দিয়েছিলেন দেশব্যাপী। এ কারণে তাঁকে প্রতিনিয়ত ছুটতে হতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তারপরও তাঁর কোনো কার্যক্রম কিন্তু থেমে থাকেনি। ঢাকায়ও একের পর এক প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও বিভিন্ন কার্যক্রম দিয়ে সরগরম করে তুলেছিলেন। সাংবাদিকতায় স্মাতকোত্তর ডিপ্লোমা ও মাস্টার্স কোর্স চালু করার মতো সাহস দেখিয়েছিলেন। স্বল্পব্যয়ে পিআইবিতে সাংবাদিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করেছেন। গবেষণামূলক প্রকাশনার দিক দিয়ে তিনি নতুন এক মাইলফলক গড়ে তোলেন। আসলে সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা থাকলে, সরকারের মন্থর একটি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে সজীব, সক্রিয় ও সরগরম করে তোলা যায়, তার চমৎকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আলমগীর ভাই। আর এ কারণেই তাঁর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে চুক্তির মেয়াদ ক্রমাগত বাড়ানো হতে থাকে। সরকারিভাবে ‘বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করার পর পিআইবি’র পাশাপাশি একই সঙ্গে এ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বও তাঁকে অর্পণ করা হয়। নতুন এ প্রতিষ্ঠানটিও তার দীপ্তি ছড়াতে থাকে। যথারীতি উপকৃত হতে থাকেন সাংবাদিকরা। পেশাদার সাংবাদিকদের নিয়েই ছিল তাঁর ভাবনা। কীভাবে তাঁদেরকে সমৃদ্ধ করা যায়, সেজন্য তাঁর উদ্যোগের কোনো কমতি ছিল না। এজন্য প্রয়োজনে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র সাংবাদিকদের মেধা ও জ্ঞান কাজে লাগাতেন। একইভাবে টেলিভিশন ও রেডিওর সাংবাদিকদের নিয়ে গড়ে উঠা ‘ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার’ (বিজেসি)-এর তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা।‘ন্যায়পাল’-এর মতো একটি দায়িত্বশীল পদে তিনি অলঙ্কৃত করেন। সাংবাদিকদের যে কোনো সংগঠনের নির্বাচন হলে নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে তাঁকে অবশ্যই থাকতে হতো। এর কারণ, সবার কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।  

আসলে তাঁর কর্মপরিধি ছিল অনেক দিকে বিস্তৃত। সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতি তাঁর বরাবরই টানা ছিল। তাঁদের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সোচ্চার। এ কারণে তাঁর ছিল বিপুল জনপ্রিয়তা। তাঁর প্রমাণ তিনি নির্বাচিত হয়েছেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। অন্য কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লেওএ সংগঠনটির নিয়মিত খোঁজ-খবর রাখতেন। শত ব্যস্ততার মাঝে নিয়মিত ঢুঁ মারতেন জাতীয় প্রেস ক্লাবে। শিশুদের প্রতি তাঁর অপরিসীম দরদ ছিল। শিশু ও কিশোরদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান ‘চাঁদের হাট’-এর সঙ্গে তাঁর সম্পৃত্ততা অনেক আগেই ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় গড়ে তোলেন ‘জাতীয় শিশু কল্যাণ পরিষদ’। শিশুদের নিয়ে তাঁর কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ছিল। খ্যাতিমান অভিনেতা ও নির্মাতা সৈয়দ হাসান ইমামের চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থার সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। হাসান ইমাম ও ভারতের শক্তি সামন্তের যৌথভাবে প্রযোজিত এবং মিঠুন চক্রবর্তী ও রোজিনা অভিনীত ‘অবিচার’ সিনেমা নির্মাণে তিনি ঘনিষ্টভাবে সক্রিয় ছিলেন। 

আলমগীর ভাই আরো একটি বড় কাজ হাতে নিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে প্রথম টিভি নিউজের আর্কাইভ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ‘নিউজ অ্যান্ড ইমেজেস’ নামের এ প্রতিষ্ঠানটির জন্য লালমাটিয়ায় একটি অফিসও নেওয়া হয়েছিল।প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সাজানো হয়েছিল দপ্তরটি। এ কাজটা কিছু দূর এগিয়েছিল। কিন্তু কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল এ কাজের জন্য সার্বক্ষণিক সময় দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এতদিকে তাঁকে জড়িয়ে পড়তে হয়, যে কারণে এ বিষয়ে আর মনোযোগ দিতে পারেননি। তারপরও এটি তিনি বুকের মধ্যে লালন করতেন। অনেক কিছুই তিনি করেছেন। তারচেয়েও বেশি কিছু করতে চেয়েছিলেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর আর কিছু করা হবে না। 

আলমগীর ভাই ছিলেন মূল্যবোধসম্পন্ন একজন সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ মানুষ। তিনি একটি আদর্শ, একটি দর্শন ও একটি নীতি মেনে চলতেন। সেই ৩২/৩৩ বছর আগে তাঁকে যেমন দেখেছি, শেষ পর্যন্ত তাঁর খুুব একটা পরিবর্তন দেখিনি। তিনি সুস্থ ও সুন্দর জীবনবোধ এবং সমাজতান্ত্রিক জীবনধারায় বিশ্বাস করতেন। বিশ্বাস করতেন সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে। যে কারণে যেখানে গেছেন, সবার সঙ্গে গড়ে তোলেন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে সম্পর্ক গড়িয়েছে পারিবারিক বন্ধনে। 

তিনি একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিক ও সংগঠক ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অতুলনীয়। তিনি যদি বুঝতে পারতেন, কোনো সহকর্মীর চাকরি নেই, তিনি তাঁকে বুঝতে না দিয়ে চেষ্টা করতেন তাঁর কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে। কত কত জনকে যে চাকরি দিয়েছেন, তার কোনো হিসেব নেই। এ কারণে তাঁর প্রতি এই আস্থাটুকু ছিল, আমি যদি কখনো বিপদে বা সংকটে পড়ি, তিনি বাড়িয়ে দেবেন সহযোগিতার হাত। এটা শুধু আমার নয়, নিশ্চয়ই অনেকেই এমনটি মনে করতেন। এ আস্থা তিনি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মিডিয়ায় তাঁর মতো ব্যক্তি খুব কমই দেখা যায়। তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী, কিন্তু কর্মনিষ্ঠ, সৃজনশীল ও পরিশ্রমী। যা করতেন সততার সঙ্গে করতেন। আনন্দের সঙ্গে করতেন। ভালোবেসে করতেন। এ কারণে গণমাধ্যম জগতে তিনি আলাদা একটা অবস্থান গড়ে নিতে পেরেছিলেন। 

আমরা শুধু একজন সহযোগী, একজন সহকর্মী ও একজন সহমর্মীকে হারায়নি, হারিয়েছি একজন অকৃত্রিম বন্ধু ও অভিভাবককে। কোনো কিছু হয়তো শূন্য থাকে না। কিন্তু কিছু কিছু শূন্যতা আছে, যা কখনো পূরণ হয় না। আলমগীর ভাইয়ের শূন্যতা অপূরণীয় রয়ে যাবে।

আলমগীর ভাই, আপনাকে ভোলা যাবে না


চারপাশে কেমন থোকা থোকা বিষণ্নতা ছড়ানো। এই ফাগুন মাসে কেন ভরা বর্ষাকালের মতো এমন বিরূপ আবহাওয়া? কেমন অদ্ভুত লাগে না! যদিও প্রকৃতির এ খামখেয়ালিপনা তো নতুন কিছু নয়। এরসঙ্গে মানিয়ে নিয়েই চলতে হয়। তারপরও গোলমেলে এই আবহাওয়ায় কেন জানি না মনের ভিতর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এর কারণ হতে পারে, মানুষ তো প্রকৃতিরই সন্তান। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু প্রকৃতির গর্ভে নিহিত। আর জন্মের পর মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী। যে কোনো সময় এরজন্য প্রস্তুত থাকতেই হয়।

জানা কথা, কেউই মৃত্যুঞ্জয়ী নয়। কিন্তু তাই বলে আমার, আমাদের শাহ আলমগীর ভাই! এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন! এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? না, না, এ কী করে হয়? এমনটি একদমই হতেই পারে না। এই তো সেদিনও দিব্যি হাসি-খুশি মুখে কথা বললেন। তাতে যথারীতি জড়িয়ে ছিল স্নেহ, মায়া ও মমতার পরশ। এটাই তো তাঁর জীবনের অন্যতম ভূষণ। সবাইকে তো এভাবেই আপন করে নিয়েছেন। 

সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে কী সুন্দরভাবে আলোকিত করে রাখেন মিডিয়া জগতকে। সর্বত্রই তাঁর সরব, সর্বাঙ্গীণ ও সর্বাঙ্গসুন্দর উপস্থিতি। সবার সঙ্গে তাঁর চমৎকার সদ্ভাব। সব বয়সীর সঙ্গে তাঁর অকপট, অন্তরঙ্গ ও আন্তরিকতার বন্ধন। এমন একজন সজ্জন, সদালাপী, সদাশয় মানুষ এভাবে চলে যাবেন!

জানি, কখন কী ঘটবে, কারো পক্ষেই ভাবা সম্ভব নয়। তারপরও কোনো কোনো বিষয় খুবই অপ্রস্তুত করে দেয়। আলমগীর ভাই যে এতটা গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, সেটা একদমই বুঝতে পারি নি। পারার কথাও নয়। তিনিও কি বুঝতে পেরেছিলেন? নাকি বুঝতে দেন নি? নিজের ব্যাপারে অনেক চাপা স্বভাবের ছিলেন। বোধকরি নিজের দুঃখে অন্যকে দুঃখী করতে চান নি।

এই তো সেদিন প্রাথমিকভাবে যখন তাঁর অসুস্থতার খবরটা জানতে পারি, ভেবেছি, ধ্যুৎ, আলমগীর ভাই কেন গুরুতর অসুস্থ হবেন? হয়তো ভাইরাসজাতীয় কিছু একটা হয়েছে। সহসাই সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন তাঁর কর্মব্যস্ত জীবনে। কিন্তু সত্যিটা জানার পর আমার কাছে তা বড় ধরনের একটা ধাক্কা হয়ে আসে। এটা কীভাবে হয়? 

আলমগীর ভাই তো সারাক্ষণ হাসিমাখা মুখ নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলবেন। আপনজনের মতো সবার কুশলাদি জানতে চাইবেন। দায়িত্ব আর নিষ্ঠার সঙ্গে একটার পর একটা কাজ করে যাবেন। তাঁর সামনে কত কত কাজ। যে কাজগুলো কখনও হয় নি, সে কাজগুলো করার জন্য তাঁর কত পরিকল্পনা। কত প্রস্তুতি। অথচ অসুস্থতার খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই সপ্তাহ খানেকের মধ্যে অন্তিমযাত্রা! ভিতরে ভিতরে এতটাই কি ক্ষয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবনীশক্তি!

কর্মসূত্রে আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে যে হৃদ্যতা গড়ে উঠে, তা কখনও বিচ্ছিন্ন হয় নি। আমার যা স্বভাব, তাতে এমনটি হওয়ার কথা নয়। তিনিই তা হতে দেন নি। সহকর্মী হিসেবে দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক আজাদ ও চ্যানেল আইয়ে তিনি ছিলেন প্রকৃতঅর্থেই আমার অভিভাবকের মতো। ব্যক্তিগত সমস্যার কথা জানতে পারলে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছেন। পথ বাতলে দিয়েছেন। কখনো কখনো জ্বালিয়ে দিয়েছেন আশার প্রদীপ।

সময়ের পরিক্রমায় তাঁর দায়িত্বের পরিধি বেড়েছে। তিনি ধাপে ধাপে সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে অনেক উপরে ওঠেছেন। পেশার প্রতি তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা ছিল প্রবাদপ্রতীম। যখন যে কাজ করতেন, নিজেকে ঢেলে দিতে একদমই কার্পণ্য করেন নি। যে কারণে পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশের মিডিয়া জগতের অন্যতম আইকনে।

কিন্তু সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর সৌহার্দ্য, তাঁর বন্ধুত্ব, তাঁর অকৃত্রিমতা একটুও হেরফের হয় নি। আগের মতোই যখনই কাঁধে রেখেছেন নির্ভরতার হাত, তাতে আশ্বস্ত হতেই হতো।নিয়মিত দেখা-সাক্ষাৎ না হলেও অনুভব করতে পারতাম, কেউ একজন আছেন, আমি সমস্যা বা সংকটে পড়লে তিনি বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দেবেন। তাঁকে হারিয়ে আমি যেন আমার একজন অভিভাবককে হারালাম। শুধুই কি আমি?

মিডিয়ার সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে আছেন, তাঁদের ভালো-মন্দ’র সঙ্গেও তিনি নিজেকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলেন। মেধা ও দক্ষতা দিয়ে বরাবরই থেকেছেন নেতৃত্বের সারিতে। প্রতিষ্ঠানগত তো বটেই, জাতীয়ভাবে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। কতজনকে কতভাবেই না সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। শুধু কাছের পরিমণ্ডলেরই নয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাংবাদিকদেরও এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান তুলনাহীন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি যতজন মিডিয়াকর্মীর কাছাকাছি পৌঁছতে পেরেছেন, তেমন নজির খুব একটা দেখা যায় না। তাঁর মৃত্যুতে অনেকেই একজন অভিভাবক হারানোর বেদনা অনুভব করছেন। শুধু মিডিয়াজগত নয়, শিশু সংগঠক ও চলচ্চিত্র কর্মী হিসেবেও তাঁর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের কাছেও তিনি ছিলেন পরম আশ্রয়। 

তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত কত স্মৃতি। কিন্তু এ মূহুর্তে সব কেমন যেন ধূসরিত হয়ে গেছে। লিখতে খুব কষ্ট হচ্ছে। বারে বারে অশ্রুসজল হয়ে যাচ্ছে চোখ। রক্তক্ষরণ হচ্ছে বুকের মধ্যে। কোনো সান্ত্বনাই খুঁজে পাচ্ছি না। হায়! আজ আমার জন্মদিন। আর এমন দিনেই চলে গেলেন তিনি! তিনি চলে গেলেও তাঁর সঙ্গে যেন আরও বেশি জড়িয়ে গেলাম আমি। আলমগীর ভাই, আপনাকে কখনও ভোলা যাবে না। আপনার হাসিমাখা মুখখানি হৃদয়ে চিরদিন উদ্ভাসিত হয়ে থাকবে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

লড়তে লড়তে চলে গেলেন প্রণব দা


বাঁ থেকে থেকে দুলাল মাহমুদ, এ এস এম রকিবুল হাসান ও প্রণব সাহা


টেবিলটির বয়স কত, আমি ঠিক জানতাম না। ১৯৮৫ সালের মার্চে কলেজ উত্তীর্ণ আমি যখন টেবিলটিতে বসি, সেটির অবস্থা ছিল খুবই জরাজীর্ণ। জায়গায় জায়গায় টেবিলের চল্টা উঠে গেছে। টেবিলে উপরের থাকা রেক্সিনের অবস্থাও সঙ্গীন। এটির রং যে ছিল সবুজ, সেটা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হতো। অনুজ্জ্বল এই টেবিল থেকেই সংকলিত হতো একটি জনপ্রিয় দৈনিক সংবাদপত্রের যাবতীয় উপাদান। টেবিলটির দুর্দশা দেখে মন খারাপ হয়ে গেলেও এই টেবিলটি ঘিরে চারপাশে যাঁরা বসতেন, তাঁদের সান্নিধ্যে প্রফুল্ল হতে বেশি সময় লাগতো না। যদিও টেবিলটির মতোই তাঁরাও ছিলেন দীপ্তিহীন। কিন্তু কাজে ডুবে থাকার সময় সেটা একদমই বোঝা যেত না। 

দেশি-বিদেশি সংবাদ লেখা আর টেলিফোনে জেলা শহরের সংবাদ সংগ্রহের ফাঁকে ফাঁকে প্রাণবন্ত আড্ডায় বার্তা কক্ষের পরিবেশটা জমজমাট হয়ে ওঠতো। জমিয়ে রাখতেন প্রাণের উত্তাপে টগবগিয়ে ফুটতে থাকা কয়েকজন প্রাণবন্ত যুবক। যাঁদের কোনও পিছুটান ছিল না। তাঁদের একজন ছিলেন প্রণব সাহা। সেই যে তাঁর সঙ্গে পরিচয়, তাতে কখনও বিচ্ছেদ ঘটে নি। তাঁকে দীর্ঘ ৩৩ বছর খুব কাছ থেকে নানাভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে।  

উড়নচণ্ডী হিসেবে প্রণব সাহা তখন দারুণভাবে সুখ্যাত। বেপরোয়া জীবন যাপনের জন্য দারুণভাবে আলোচিত কথাসাহিত্যিক বিপ্লব দাশের সুযোগ্য শিষ্য তিনি। কত বিচিত্রভাবেইনা যাপন করেছেন জীবন! কখন কোথায় রাত কাটাতেন, তার কোনও ঠিক-ঠিকানা ছিল না। যেখানেই রাত, সেখানেই কাত। প্রকৃতঅর্থেই তিনি ছিলেন বাউন্ডুলে জীবনের প্রতিকৃতি। অনেকটা যেন দেবদাসের মতো। তবে কোনো পার্বতীর জন্য তিনি এমনটি করতেন কিনা সেটা আমি জানতাম না। অবশ্য এ ধরনের চরিত্র তখনকার সংবাদপত্রের সঙ্গে বেশ খাপ খাইয়ে যেত। 

বিরোধী দলের মুখপত্র হিসেবে পরিচিত দৈনিক বাংলার বাণীর অর্থনৈতিক অবস্থা তখন মোটেও সুবিধের ছিল না। সরকারি বিজ্ঞাপন খুব একটা পাওয়া যেত না। এ কারণে বেতন নিয়ে একটা অনিশ্চয়তা লেগেই থাকতো। লোকবলও পর্যাপ্ত ছিল না। যাঁরা কাজ করতেন, তাঁদের উপর ছিল প্রচণ্ড চাপ। 

তখন সংবাদপত্রের রাতের শিফটই ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই শিফট সন্ধ্যায় শুরু হয়ে মধ্যরাত পর্যন্ত চলতো। আর ছিল লেট-নাইট ডিউটি। সারা রাত কাটাতে হতো অফিসে। কিন্তু যাতায়াতের তেমন সুব্যবস্থা ছিল না। বাধ্য হয়ে অফিসের নিউজ টেবিলেই ছেঁড়া অভিধানকে উপাধান বানিয়ে মশাদের সুখাদ্য হয়ে ঘুমাতে হতো। লেট-নাইট ডিউটি একদিকে ছিল অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ, অন্যদিকে খুবই কঠিন ও কষ্টকর। এমনও হয়েছে, কাজ করতে হয়েছে একাধিক শিফটে। আর এই কাজটি যে কজন দিনের পর দিন নির্দ্বিধায় ও নিস্বার্থভাবে করতেন, তাঁদের অন্যতম হলেন প্রণব সাহা। নিজের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি সংবাদপত্রের অবয়ব। কী পেয়েছেন, কী পান নি, তা নিয়ে কখনও আক্ষেপ করেন নি।     

তখনকার অধিকাংশ সংবাদপত্রের পরিবেশ-পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, কতটা শোচনীয় ছিল, এখন সেটা অনুধাবন করা যাবে না। কেন জানি না, এই ধারাটা গড়ে উঠে সংবাদপত্রের প্রথম যুগ থেকেই। সংবাদপত্র হয়তো নিয়মিত প্রকাশিত হতো, কিন্তু যাঁদের রক্ত পানি করা শ্রমের বিনিময়ে পত্রিকা, তাদের জীবনের খবর কেউ রাখতো না। মো. আব্দুল জব্বারের গাওয়া বিখ্যাত সেই গানটির মতো, ‘প্রতিদিন কত খবর আসে যে/কাগজের পাতা ভরে/জীবন পাতার অনেক খবর/রয়ে যায় অগোচরে’। সংবাদপত্রে কর্মরত অবস্থায় আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেকেই অকালেই ঝরে গেছেন। আবার কেউ কেউ ক্ষত বুকে নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন যাপন করেন। এভাবে যুগে যুগে নিজের জীবনকে তিলে তিলে ক্ষয় করে যাঁরা গড়ে তুলেছেন আজকের সংবাদপত্র, তাঁদের একজন হলেন প্রণব সাহা। সে কথা কি কেউ মনে রাখবে? 

ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায়ও প্রণব সাহা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের বার্তা বিভাগে খণ্ডকালীন অনুবাদক হিসেবে তিনি যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, তারই পথ বেয়ে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে তা পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবর সিদ্ধিশ্বরীতে নিউজ সম্প্রচার শুরু করে চ্যানেল আই। ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার জমজমাট অবস্থার মধ্যে আলাদা অবস্থান করে নিয়েছে স্যাটেলাইট এই টেলিভিশন। এই নিউজ চ্যানেলটি সেই শুরু থেকেই নতুন ও ব্যতিক্রমধর্মী কিছু করার অঙ্গীকার নিয়ে দর্শকদের সামনে উপস্থিত হয়। শুরু থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাঁরা সম্পৃত্ত হন, তাঁদের একজন হলেন প্রণব সাহা। 

বাঁ থেকে প্রণব সাহা, দুলাল মাহমুদ ও অভিনেতা আরিফিন শুভ।


এরপর তো তাঁর দিন-রাতগুলো একাকার হয়ে যায়। তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা হয়ে উঠে চ্যানেল আই। তাঁর দায়িত্বের পরিধি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে চ্যানেল আইয়ের প্রতি তাঁর আনুগত্য, তাঁর নিষ্ঠা, তাঁর ভালোবাসা। একটা পর্যায়ে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেন তিনি। দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁর কেটেছে এই প্রতিষ্ঠানে। এমনকি যেটুকু সময় বাসায় থাকতেন, সেখান থেকেও চ্যানেল আই থেকে দূরে থাকতে পারতেন না। এ কারণে কেটেছে অনেক নির্ঘুম রাত। তবে অনেক কঠিন জীবন পেরিয়ে এসে তিনি থিতু হয়েছিলেন। পেয়েছিলেন সুখের ঠিকানা। একটু একটু করে উপভোগ করছিলেন জীবনকে। 

কিন্তু বুকের মধ্যে যে ক্ষয় প্রণব সাহা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, সেটি তাঁকে স্বস্তিতে থাকতে দেয় নি। ফেলে আসা বোহেমিয়ান সেই জীবনের খেসারত তাঁকে দিতে হয়। জনপ্রিয় গানের ভাষায়, ‘অমলটা ধুঁকছে দুরন্ত ক্যান্সারে জীবন করে নি তাকে ক্ষমা হায়’। প্রায়শই অসুস্থ হয়ে তাঁকে কাটাতে হয়েছে হাসপাতালে। এই শহরের বিখ্যাত সব চিকিৎসকরা হয়ে উঠেন তাঁর আপনজন। একটা পর্যায়ে কোন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সে ব্যাপারেও তিনি হয়ে উঠেন নির্ভরযোগ্য পরামর্শক। কতজনকেই বাতলে দিয়েছেন চিকিৎসার সঠিক পথ। গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেও তিনি কখনো কাবু হয়ে পড়েন নি। ভেঙে পড়েন নি। হাল ছেড়ে দেন নি। মৃত্যুকে তিনি খুব একটা পরোয়া করতেন না। 

তাঁর মস্ত একটা গুণ ছিল, জীবনকে খুব সহজভাবে নিতে পারতেন। এবং নিয়েছিলেনও। তাঁর জীবনীশক্তি ছিল অপরিসীম। একাধিকবার চিকিৎসকরা যখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন, তিনি ঠিকই ফিরে এসেছেন। কর্মক্ষেত্রের টান কখনই এড়াতে পারেন নি। একটু সুস্থ হলেই নিয়মিত অফিস করেছেন। মিশে যেতেন স্বাভাবিক জীবন যাপনে। শামসুর রাহমানের কবিতার মতো, ‘কাজ করছি, খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুমোচ্ছি, কাজ করছি/খাচ্ছি দাচ্ছি চকচকে ব্লেডে দাড়ি কামাচ্ছি, দু’বেলা/পার্কে যাচ্ছি, মাইক্রোফোনি কথা শুনছি/ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যাচ্ছি’। 

যতক্ষণ সুুস্থ থাকতেন, জীবনকে সম্ভোগ করতেন। একইসঙ্গে তিনি নিয়েছেন একাধিক জীবনের চ্যালেঞ্জ। কখনো জীবনকে অবহেলা করেছেন। কখনো জীবনকে ভালোবেসেছেন। আবার কখনো জীবনকে তওয়াক্কা করেন নি। চলে যেতে যেতে তিনি ফিরে এসেছে চমকে দিয়েছেন। এ কারণে কেন যেন মনে হতো, তিনি এত সহজে চলে যাবেন না। কিন্তু এবার তিনি হুট করে চলে গিয়ে সব ধারণা ভুল প্রমাণ করে দেন। অবশ্য গেলেন লড়াই করে। সত্যি সত্যি তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেলো। 

প্রণবা দা’র সঙ্গে আমার কত কত স্মৃতি। চোখে জল নিয়ে সেই স্মৃতিগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে, ঠিক বুঝতে পারছি না।

৭ জুন ২০১৮

হুট করে এভাবে চলে গেলেন রণজিৎ দা!


তাঁর লেখার যে ভঙ্গি, শৈলী ও সৌন্দর্য, তাতে করে তাঁর লেখনির প্রতি যে কেউই আকৃষ্ট না হয়ে পারবেন না। সব ধরনেরই লেখাই তিনি দু’ হাতে লিখতেন। তবে ক্রীড়ালেখক হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি কাটিয়েছেন ক্রীড়ালেখনির সাম্পানে। ক্রীড়ালেখনির ক্ষেত্রে তিনি স্বতন্ত্র একটি ধারা ও মেজাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হন। বাংলা ভাষায় তাঁর দক্ষতা ও পা-িত্য ছিল বিস্ময়কর। বাবুই পাখির বাসার মতো নিপুণ ও শৈল্পিক দক্ষতায় যেভাবে শব্দের জাল বুনতেন, তার কোনো তুলনা হয় না। তবে ক্রিকেটের প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম দরদ ও ভালোবাসা। তাঁর লেখায় পাওয়া যেত ক্রিকেট সাহিত্যের রূপ-রস-গন্ধ। সঙ্গত কারণেই তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের আগেই তাঁর লেখার মুগ্ধ পাঠক হয়ে যাই। আর পরিচয় হওয়ার পর সেই মুগ্ধতা ক্রমাগত বেড়েই চলে। লেখার মতোই কথপোকথনেও তিনি ছিলেন অন্তরঙ্গ, সাবলীল ও স্মার্ট। তাঁকে কথার জাদুকর বললে ভুল বলা হবে না। তাঁর বিশুদ্ধ উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি ও বলার স্টাইল ছিল অসাধারণ। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় মনে হতো, যেন বেতার বা টেলিভিশনে তাঁর কথা শুনছি। রণজিৎ কুমার বিশ্বাস চট্টগ্রামের সন্তান হলেও তাঁর কথায় বিন্দুমাত্র আঞ্চলিকতার টান ছিল না। তাঁর ব্যবহারে আলাদা একটা মাধুর্য ছিল। অত্যন্ত আন্তরিক, মার্জিত, রুচিবান ও পরিশীলিত মানুষ ছিলেন। পরিচিত সবার সঙ্গে বিনীত ও অমায়িকভাবে কুশলাদি জিজ্ঞেস করতেন। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হলে কারো পক্ষেই তাঁকে ভুলে যাওয়া সহজ ছিল না। 

১৯৮৫ সালে চট্টগ্রামে জাতীয় অ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা কাভার করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। আমরা যাঁরা ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম, তাঁদের সন্মানে সম্ভবত চট্টগ্রাম আবাহনীর একজন কর্মকর্তা স্থানীয় একটি রেঁস্তোরায় সম্মাননার আয়োজন করেন। সেই অনুষ্ঠানে রণজিৎ কুমার বিশ্বাস সহ চট্টগ্রামের নেতৃস্থানীয় ক্রীড়ালেখক ও ক্রীড়া সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই যে তাঁর সঙ্গে পরিচয়, একইসঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন রণজিৎ দা, সেই পরিচয়, সেই সম্বোধন শেষ অব্দি অটুট ছিল। তিনি ঢাকা চলে আসার পর তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ আরো নিবিড় ও ঘনিষ্ট হয়। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির ব্যানারে আমরা একে অপরের অনেক কাছাকাছি হই। সমিতির প্রকাশিত স্মরণিকার জন্য লেখা কিংবা অন্য কোনো বিষয়ে তাঁর পরামর্শ নিয়েছি। সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা বা যে কোনো অনুষ্ঠানে তিনি যখন বক্তব্য রাখতেন, তা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনতাম। তাঁর বক্তব্য বা পরামর্শ আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। 

‘ক্রীড়াজগত’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায়শই ফোন করতেন। লেখা পাঠাতেন। সঙ্গে টুকরো টুকরো চিঠি। তাঁর লেখা পেলে সঙ্গত কারণেই বর্তে যেতাম। তাঁর লেখা পাওয়া মানেই হলো পত্রিকার গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে যাওয়া। তাঁর হাতের লেখা ছিল চমৎকার। চোখ জুড়িয়ে যেত। তিনি হাতে লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। এই সেদিনও তাঁর হাতের লেখা নিবন্ধ পেয়েছি। অধিকাংশ সময়ই তিনি লেখা পাঠাতেন ডাকে। যদিও মাঝে অনেক বেশি ব্যস্ততার কারণে লেখা দিতে পারতেন না। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর সবে ‘ক্রীড়াজগত’ পত্রিকায় ফের লেখা পাঠাতে শুরু করেছিলেন। আমিও ভীষণ খুশি হয়ে ওঠেছিলাম। যাক, এখন থেকে তাঁর লেখা নিয়মিত পাওয়া যাবে। হায়! খুশিটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না।  


রণজিৎ কুমার বিশ্বাস ছিলেন একজন পরিপূর্ণ মানুষ। দায়িত্বশীল চাকরি করতেন। সরকারের সিনিয়র সচিব ছিলেন। সর্বশেষ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। এই দায়িত্বটা ছিল একে অপরের পরিপূরক। তাঁর স্পর্শে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যেমন পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে, তেমনিভাবে তিনিও নিজেকে মেলে ধরার বড় ধরনের একটা প্ল্যাটফরম পেয়ে যান। ক্রীড়ালেখক রণজিৎ কুমার বিশ্বাস হয়ে ওঠেন একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। বছর খানেক আগে চাকরি থেকে তিনি অবসর নেন। অবসর নিলেও সাংস্কৃতিক পরিম-ল তাঁকে আপন করে নেয়। যে কারণে ইদানিং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর ব্যস্ততা অনেক বেড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তাঁর আত্মার খোরাক। এটা তাঁর কথায় ও লেখায় সহজেই অনুধাবন করা যেত। এই তো কিছু দিন আগে রবীন্দ্র সংগীতের বরেণ্য শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সুরের সঙ্গে তাঁর কথার জাদুর যুগল অনুষ্ঠানে বিমোহিত হয়েছিলেন শ্রোতারা। আবৃত্তি অনুষ্ঠানেও তিনি ছিলেন সবার প্রিয়মুখ। টেলিভিশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়মিত দেখা যেত। তবে তাঁর প্রধান গুন ছিল, যে কোনো অবস্থায় লিখতে পারতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকেও লিখতেন। লেখাটা ছিল তাঁর নেশা। বছর দুয়েক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। অনেকটা জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণ থেকে ফিরে আসেন তিনি। সেই সময়ে একটু সুস্থ হতেই হাসপাতালে শুয়ে শুয়ে পত্রিকায় লেখা পাঠাতেন। লেখাটাই ছিল তাঁর বেঁচে থাকার প্রধান রসদ। ক্রীড়ালেখক হলেও ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রন্থের প্রণেতা ছিলেন তিনি। চাকরি থেকে অবসর নিয়ে তিনি যখন মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে জীবনটাকে উপভোগ করছিলেন, লেখালেখির জগতে তিনি যখন নিজেকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন, তখনই তিনি চলে গেলেন। তাঁর হুট করে এভাবে চলে যাওয়াটা মন একদমই মেনে নিতে পারছে না। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল মুখচ্ছবি এখনও চোখের সামনে দেদীপ্যমান। মনে হয়, তিনি যেন আশে-পাশে কোথাও আছেন। 

২৩ জুন ২০১৬