পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
স্মৃতিচারণ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

কেন যে এত মায়া মায়া লাগে?



রাতে বাসায় ফেরাটা নতুন কিছু নয়। সেই মধ্য আশির দশক থেকে যখন দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতাম, কত কত মাঝ রাত পেরিয়ে বাসায় এসেছি। সেই সময়ের রাতগুলোকে মনে হতো গুপ্ত ঘাতকের মতো। ফাঁদে ফেলার জন্য সারাক্ষণ ওৎ পেতে থাকতো। বাসায় ফেরার বাহন ছিল অফিসের ভাড়া করা সবেধন নীলমণি বেবিট্যাক্সি। এক সময়ের জনপ্রিয় এ বাহনকে এখন আর ঢাকায় দেখা যায় না। বাসায় ফেরার সময় চোখে জড়ানো থাকতো ঘুম। একই বাহনের আরোহী সহকর্মীদের নামিয়ে দিয়ে ফিরতে ফিরতে কখনও কখনও ভোররাত হয়ে যেত। চালক কাকে যে কোথায় নামিয়ে দিত, টেরই পেতাম না। তখন ঢাকার কত বিচিত্র রূপ দেখেছি। ঘুম ঘুম চোখে তো আর রোমান্টিকতা থাকতো না। বরং পথের বাধা-বিঘ্নগুলোকে রীতিমতো নির্যাতনই মনে হতো। পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদ, ছিনতাইকারীর ধাওয়া, মাতালের খিস্তি, নিশি পরীদের হুল্লোড়, বেওয়ারিশ কুকুরদের ঘুর ঘুর করা, নৈশপ্রহরীর বাঁশির বুক কাঁপানো তীব্র হুঁইসেল-আরও কত যে কি। অবশ্য রাতের নির্জনতা ভেঙে বিকট শব্দে আমাদের বেবিট্যাক্সি চলার সময় সচকিত হয়ে উঠতো চারপাশ। অনেকে আড়ালে চলে যেতেন। অবৈধ লেনদেনও ক্ষণিকের তরে থেমে যেত। আমার এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তখন একটাই চিন্তা, কতক্ষণে বাসায় গিয়ে দু'মুঠো মুখে দিয়ে বিছানায় ক্লান্ত দেহখানি এলিয়ে দেবো।


এটা অবশ্য বুঝতে পারতাম, রাত কিন্তু কখনও ঘুমিয়ে পড়তো না। তার আলাদা একটা রূপ ছিল। সৌন্দর্য ছিল। মাদকতা ছিল। তার কদর বুঝতেন রসিকজনরা। ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ শিরোনামে কবি শামসুর রাহমান তার খানিকটা বর্ণনা দিয়েছেন ঢাকার কুট্রিদের ভাষায়, 


হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের 

লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি 

মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা 

রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন 

আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান 

আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও।

 

আমি সারাজীবনই বেরসিক মানুষ। শিশু বয়স থেকে বসবাস সূত্রে ঢাকার বাসিন্দা হলেও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার মোটেও সমৃদ্ধ নয়। বুকের মধ্যে নেই কোনো কাব্যিকতা। তাই রাতের ঢাকার প্রকৃত রূপ ফুটিয়ে তোলা আমার কর্ম নয়। তবে কখনো কখনো ধবল জোছনা মন উদাস করে দিত। হীরের মতো জ্বল জ্বল করতে থাকা তারাদের ছোটাছুটি দেখে বুকের মধ্যে ভেসে ওঠতো কবি আল মাহমুদের পঙক্তি, ‘তারারা খেলছে তারাদের সাথে’। 


এরশাদ সরকারের সেই রাজত্বকালে অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়। সে সময় প্রায়শই ঢাকায় অস্বাভাবিক রূপ পরিলক্ষিত হতো। কারফিউ, জরুরি অবস্থা, নানান রকম বিধিনিষেধের মধ্যে চলাচল করতে হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর বেবিট্যাক্সি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, কারফিউ পাস দেখতে চাওয়াসহ কত রকম বায়নাক্কার যে মুখোমুখি হতে হয়েছে। সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরও নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ দূর হতে চাইতো না। মুখ ব্যাদান করে যেতে দিত। অবশ্য তাতে আমাদের কিছু আসতো যেত না। সাংবাদিকরা আবার কবে কাকে পরোয়া করেছে? এর পরও বিভিন্ন সময়ে কারফিউ, জরুরি অবস্থার মধ্যেই চলাচল করতে হয়েছে। তাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। আমরা তো আর আইন অমান্য করে চলাফেরা করতাম না। পেশার খাতিরে রাস্তায় নামতে হতো। রাত তো বরাবরই গুলজার করে রাখে প্রেস, প্রস আর পুলিশ। তাই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চলাচল করলেও এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি হতো।


ক’দিন হলো, পুরানো সেই রাতগুলো যেন আবার ফিরে এসেছে। পুরোপুরিভাবে না হলেও অনেকটা তেমনই। শব্দ ও তাৎপর্যগত কিছুটা হেরফের হয়তো আছে। যদিও আগের মতো রাতের গভীর-গোপন রহস্যময়তা নেই। অনেক মানুষ, অনেক সড়ক, অনেক যানবাহন আর আলোর ঝলমলানিতে এ শহরে ব্যস্ততার কোনো কমতি নেই। মধ্য রাতেও দীর্ঘক্ষণ সিগনালের অপেক্ষায় থাকতে হয়। পরিবেশও আগের মতো নেই। কিন্তু ইদানিং পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে অবিকল সেই রাতগুলোর অনুরূপ। এখন তো সন্ধ্যা ৬টার পর একদম লকডাউনই হয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকলে কেমন যেন একটা গা ছমছম করা ভাব। রাস্তার আলোও মনের ভিতরটাকে রাঙিয়ে দিতে পারে না। বরং ম্লান হলদে রঙের আলোয় ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বড় বড় বিল্ডিংগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। পথের পাশের দোকানপাটে থাকে না প্রাণের উত্তাপ। 


এ ধরনের নির্জন পরিস্থিতিতে কেন যেন বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা রাস্তাঘাট, অলিগলিতে খুব বেড়ে যায়। তাতে সব কিছু আরো বেশি অস্বাভাবিক লাগতে থাকে। লোক চলাচল থাকে না বললেই চলে। চলাচল করেন একদমই হাতেগোনা কয়েকজন। হয়তো জরুরি কোনো প্রয়োজনে কারো কারো বের না হয়ে উপায় থাকে না। আবার কেউ কেউ অবশ্য কৌতূহলী হয়েও বের হন। আমাদের অকারণ কৌতূহল তো অন্তহীন। যে কারণে লেগে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায় বিভিন্ন বাহিনীর গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, মিডিয়ার তৎপর বাহন। খান খান করে ভেঙে দেয় রাজপথের হিরণ্ময় নীরবতা। এরই মধ্যে হুট করে কোথাও থেকে এসে পড়ে প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেল এমনকি রিকশাও। সঙ্গত কারণে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার এই সময়ে কেউ কারো কাছাকাছি হওয়াটাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দায়িত্বের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপ্রিয় এ কাজটি করতে হয়। সবার নিরাপত্তার জন্য নিজেদের নিরাপত্তা ব্যাহত করা ছাড়া উপায়ও নেই।


আগেই লিখেছি, রাতের ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেলা দিনের। অতীতের সেই সময়ে রাতের বেলা ভয়ের অনেক কারণ ছিল। কিন্তু কখনও ভয় লাগেনি। অথচ এই সময়ে ভয়ের বড় কোনো কারণ না থাকলেও রাতের ঢাকায় চলাফেরা করতে গিয়ে রীতিমতো আতঙ্কে থাকি। গাড়িতে থাকলেও কেউ কাছাকাছি এলে, কোনো কিছুর ছোঁয়া লাগলে কিংবা কোথাও দিয়ে চলাচল করলে প্রতিনিয়ত মনে হয়, অদৃশ্য সেই শক্তিমান বুঝি কোথাও ঘাপটি মেরে আছেন কিংবা শরীরের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছেন। সেই সংশয় কিছুতেই কাটতে চায় না। তখন মনে হতে থাকে, দেহের তাপমাত্রা বোধহয় বেড়ে গেছে, চিরস্থায়ী হয়ে যাওয়া পরিচিত কাশিটাকে একটু অন্যরকম মনে হতে থাকে, শরীরটা কেমন ব্যথা ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। লক্ষণগুলো মনে মনে কেমন করে যেন দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যায়। এরপর কি আর স্বাভাবিক থাকা যায়। দোয়া-দরূদ পড়ে একটা প্রস্ততি নিতে থাকি।

তারপর চারপাশটাকে শেষবারের মতো পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখতে থাকি। পৃথিবীটাকে মায়াবী হরিণের মতো খুব আপন মনে হতে থাকে। হায়! কেন যে এত মায়া মায়া লাগে?

১২ এপ্রিল ২০২০

কেমন যেন বেভুল হয়ে যাই

 

বয়সকে কি থামিয়ে রাখা যায়? এখন অব্দি তেমন কোনো দৃষ্টান্ত দৃশ্যমান নয়। বয়সের ক্রমবৃদ্ধি হওয়াটা স্বাভাবিক ও অনিবার্য এক প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে শরীরের বিভিন্ন কোষ। তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে দেহে, মনে, মগজে। এর ছাপ ক্রমশ স্পষ্ঠ হয়ে উঠে শরীরের বিভিন্ন অংশে। সময় কেড়ে নেয় শারীরিক সক্ষমতা। গড়মিল হতে থাকে অভ্যন্তরীণ কল-কব্জায়। কমিয়ে দেয় চলার গতি। হ্রাস পেতে থাকে চিন্তাশক্তি। দুর্বল করে দেয় স্মৃতিশক্তিও। একজন মানুষকে অচল ও অক্ষম করে দেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হলো বয়স। মার্কিন কবি টি. এস. এলিয়ট লিখেছেন, I grow old ... I grow old ...I shall wear the bottoms of my trousers rolled. সঙ্গত কারণেই পরিণত বয়সে প্রায়শই ভুল-ভাল হতে থাকে। যদিও আমার স্মৃতিশক্তি কখনই প্রখর নয়। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারি না। আর এখন তো সব এলোমেলো হয়ে যায়। চেনা মানুষকে অচেনা মনে হয়। অচেনা মানুষকে লাগে চেনা চেনা। শিল্পী শ্যামল মিত্রের গাওয়া গানের ভাষায়, ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’। একটুতেই গুলিয়ে ফেলি অনেক কিছুই। এ কারণে সত্যিকার অর্থেই আতান্তরে পড়ে যাই।

যে মানুষগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন চেনাজানা, হয়তো ইদানীং দেখা-সাক্ষাৎ খুব কম হয়, কিন্তু আত্মিক বন্ধন তো অটুট রয়ে গেছে। এ বন্ধন তো একান্তই মনের ব্যাপার। যোগাযোগ না থাকলেও বুঝতে পারি, আমার প্রতি তাঁর বা তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা ও সহানুভূতির কোনো কমতি নেই। এমন সহানুভূতিশীলদের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়। বেশি না হওয়ার দায় অবশ্য আমারই। সবার সঙ্গে আমি প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি না। মিশতেও পারি না। আমার প্রতি সহানুভূতিশীলদের বাইরে যাঁরা আছেন, সেভাবে হয়তো তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বা সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তাঁদেরও তো অনেক দিন ধরে চিনি বা জানি। প্রায় প্রত্যেকের কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্য মুখস্থ। কেউ কেউ তো নিজ গুণে মহিম্বান্বিত। তাঁরা আমাকে নিয়ে কী ভাবেন, তা অবশ্য জানি না। তাঁদেরকে তো আমার দূরের ভাবার কোনো কারণ নেই। কাছের পরিমণ্ডলেরই মনে করি। এ পরিমণ্ডলের কেউ যখন হঠাৎ চলে যান, তখন বিরাট একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এত এত দিন ধরে চেনা মানুষটার অনুপস্থিতিতে বুকের মধ্যে কেমন কেমন লাগে। কাছের মানুষ হিসেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। প্রকৃতির সহজাত নিয়মে তারপর একসময় এ শূন্যতাকে মানিয়ে নিতে হয়। এছাড়া তো আর গত্যন্তর নেই। বেশ কিছুদিন চলে যাওয়ার পর একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকি। ইদানীং এটি বেশি হচ্ছে। হুট করে হয়তো মনে হয়, আচ্ছা, অমুককে তো অনেক দিন দেখি না, তিনি কেমন আছেন? হঠাৎ হয়তো তাঁকে দেখার জন্য এক ধরনের আকুলতা কাজ করে। পরে হয়তো জানতে পারি, তিনি তো আর ইহলোকে নেই। আবার এমনও হয়, জীবিত আছেন, কিন্তু অনেক দিন দেখা হয় না, তখন মনে হয়, তিনি কি বেঁচে আছেন? কেমন একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। নিজেকে তখন খুব অসহায় মনে হয়। আসলে বয়স বাড়তে থাকলে কোনো কিছু আর ঠিকঠাক মতো নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আমেরিকান কবি ডোনাল্ড হলের মতে, To grow old is to lose everything.

আমার মোবাইলের কললিস্টে এমন অনেকেই আছেন, তাঁরা আর জীবিত নেই। কিন্তু আমার কাছে তাঁরা জীবন্তই রয়ে গেছেন। সে নামগুলো ডিলিট করতে একদমই ইচ্ছে করে না। যাঁরা একসময় সক্রিয় ও সজীব ছিলেন, ছিলেন আমার চেনা গণ্ডির মধ্যে, তাঁদেরকে কি চাইলেই মুছে ফেলা যায়? যে কারণে প্রতিদিন এ নামগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলে মনে হয়, তাঁরা বোধকরি আছেন আগেরই মতোই। হারিয়ে যাওয়া এ মানুষগুলোর সঙ্গে আমার হয়তো মোবাইলে কালেভদ্রে কথা হতো কিংবা একদমই হতো না, তারপরও তাঁদের অস্তিত্বকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। কখনও কখনও মনে হয়, তাঁকে ফোন করলে শুনতে পাবো আলাপিত সেই কণ্ঠ। ভেসে উঠবে পরিচিত সেই অবয়ব। বাস্তবে সেই কণ্ঠ শুনতে পাই না। সেই অবয়বও দেখতে পাই না। এ কেবলই বিভ্রম। এ বিভ্রম আমি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ বিভ্রান্তি আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলছে। আমি তার থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছি না। কেমন যেন দিশেহারা লাগে।

আর এমনটি মূলত জাতীয় প্রেস ক্লাবের আমার পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এ ক্লাবের সঙ্গে যতটা বন্ধন গড়ে উঠেছে, আর কোনোকিছুর সঙ্গে ততটা বোধকরি নয়। দেখতে দেখতে ক্লাবের সদস্য হিসেবে পেরিয়ে এসেছি তিন দশকেরও বেশি সময়। এক জীবনে এটি নেহাত কম সময় নয়। এ সময় কত জনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে। হৃদ্যতা হয়েছে। কত জন জীবন থেকে হারিয়েও গেছেন। যদিও অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে সবার সঙ্গে যে আমার ঘনিষ্টতা হয়েছে, তা হয়তো বলা যাবে না। সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও তাঁদের মুখগুলো তো আমি চিনি। তাঁরাও হয়তো আমাকে চেনেন। এটিইবা কম কি? অসংখ্য মানুষের ভিড়ে একজীবনে কজনের সঙ্গেইবা সম্পর্ক হয়? প্রতিনিয়ত দেখা হয়? প্রখর স্মৃতিধর না হলে কজনকেইবা মনে রাখা সম্ভব? এমনকি খুব কাছের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও সাধারণত খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। তাঁরাও ধীরে ধীরে মনের আড়ালে চলে যান। কিন্তু জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্কটা তেমন নয়। এর সঙ্গে যে আত্মার বন্ধন। যেখানে গেলে পাওয়া যায় এক বুক স্বস্তি। এ ক্লাবের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে আছেন, তাঁরা তো আমার স্বজনের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। চেনা মুখগুলোর সঙ্গে অনেক সময় দেখা হয়। আবার অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা হয় না। নতুন সদস্যদের আগমন ঘটে। তাঁদের সঙ্গেও পরিচয় হয়। কখনো কথা হয়। অবশ্য পেশাগত কারণে কারও কারও সঙ্গে ক্লাবের বাইরেও দেখা-সাক্ষাৎ হয়। নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত দেখা হওয়া মোটামুটি সবাই তো মুখ চেনা। তাঁদের তো কাছের পরিমণ্ডলের মনে না হওয়ার কারণ নেই। যে কারণেই হোক না কেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেস ক্লাবের প্রতি নির্ভরতা আরো বাড়ছে। বাড়ছে স্মৃতির মৌতাত। নৈকট্য পেতে ইচ্ছে করে দীর্ঘদিনের সহযোগীদের। যত দিন বেঁচে থাকবো, তত দিন তো এ মানুষগুলোর সান্নিধ্যে কেটে যাওয়ার কথা।

আমি মানুষটা একদমই গুটিয়ে থাকা স্বভাবের। যে কারণে নিজ থেকে সবার সঙ্গে মিশতে পারি না। কিন্তু তারপরও অকারণেই অনেকের আশকারা পেয়ে যাই। তাঁরা আমাকে সহজেই আপন করে নেন। তাঁদের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ হুট করে চলে গেলে ছোট হয়ে যায় আমার গণ্ডি। কেমন যেন রিক্ত হয়ে যাই। নিঃস্ব হয়ে যাই। এ রিক্ততা, এ নিঃস্বতা কখনো কখনো নৈর্ব্যক্তিক হয়ে যায়। মনে হয়, তাঁরা আছেন কাছে কিংবা দূরে। ক্লাবে গেলে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে। দেখা হলে হাঁক দিয়ে উঠবেন পরম শ্রদ্ধাভাজন খ্যাতিমান সাংবাদিক এ. বি. এম. মূসা, কীরে তোরে দেখি না কেন? এমন অকৃত্রিমভাবে কে আর কুশল জানতে চাইবেন? তাঁকে ছাড়া কি প্রেস ক্লাব কল্পনা করা যায়? কেন যেন মনে হয়, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)-এর সাবেক মহাসচিব নিভৃতচারী আখতার আহমেদ খান ওয়াশিংটন বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন। যে কোনো দিন ফিরে আসবেন। এসে দিনমান আড্ডায় মশগুল হবেন। ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার সেলিম ভাই (আনিসুর রহমান) নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। সে মানুষটি যে কোন ফাঁকে চলে গেছেন, আমি একদমই জানতেও পারি নি। এটি কেমন করে হয়? জানতে পারার পর অশ্রুসজল হয়ে উঠে চোখ। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। হায়! তিনি আর কোনো দিন বলবেন না, দুলাল, কেমন আছো? অবজারভার পত্রিকার আজিজ ভাই (আজিজুল হক) প্রায়শই আমার অফিসে আসতেন। বসবাস করতাম একই এলাকায়। সর্বশেষ যেদিন দেখা হয়, সেদিন বলেছিলেন, পরের সপ্তাহে তিনি অফিসে আসবেন। কিন্তু তিনি আর আসেননি। অথচ আমি তাঁর অপেক্ষায় থাকি। মনে হয়, তিনি একদিন ঠিকই এসে বলবেন, দুলাল, চা খাওয়ান। দেখা হলেই ক্রিকেটের খোঁজখবর জানতে চাইতেন ইউএনবি’র শেখ রকিবউদ্দিন। ক্লাবে গেলে হয়তো জানতে চাইবেন, তাঁর প্রিয় দল পাকিস্তানের সর্বশেষ হালহকিকত। আলতাফ মাহমুদ তো সারাক্ষণ ঝলমল করতেন। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। দেখা হলে কুশল জিজ্ঞেস করবেন না, এটা তাঁর অভিধানেই ছিল না। খুব বেশিদিন হয়নি চলে গেছেন অনেকের প্রিয়ভাজন, অনেকের শ্রদ্ধাভাজন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর ভাই। তিনি যে নেই, এটি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না। মনে হয়, পরম নির্ভরতা হয়ে তিনি আশে-পাশেই আছেন। দেখা হলেই বলে উঠবেন, কী খবর তোমার? এ রকম অনেকের কথাই খুব মনে পড়ে। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টুকরো টুকরো কত স্মৃতি। তাঁরা চলে গিয়েও যেন রয়ে গেছেন। যে কারণে একটা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। 

ইদানীং বড় বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এই অতিমারি জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে কতগুলো মাস। এমনকি দূরত্ব সৃষ্টি করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গেও। ক্লাবে গিয়ে আড্ডা মারা তো দূরে থাক, থাকতে হয়েছে রীতিমতো ঘরবন্দি। এই সময়ে যেন ঘরের বাইরে কোনো স্মৃতি নেই। বলতে গেলে কেমন একটা বিস্মৃত সময় কেটেছে। সবচেয়ে কষ্টকর হলো, করোনাকালে হারিয়ে গেছেন ক্লাবের বেশ কয়েকজন সদস্য : রওশনউজ্জামান, আবু জাফর পান্না, মোহিতুল ইসলাম রঞ্জু, আসলাম রহমান, কামাল লোহানী, কবি মাসুক চৌধুরী, খন্দকার মোজাম্মেল হক, ফারুক কাজী, ডি. পি. বড়ুয়া, রাশীদ-উন-নবী, আবদুল্লাহ এম. হাসান, ফজলুন নাজিমা খানম, কাজী শামসুল হুদা, আবদুস শহিদ, রাহাত খান, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশি, নুরুদ্দীন ভূঁইয়া, ফকির আবদুর রাজ্জাক, আবুল হাসনাত। তাঁদের সবাই ছিলেন চেনা-পরিচিত। কেউ ছিলেন সহকর্মী। কেউবা ছিলেন ঘনিষ্টজন। তাঁরা যে নেই, এ কথাটা একদমই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সামাজিক দূরত্বের মধ্যে চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, তাঁরা আছেন আগের মতোই। ক্লাবে গেলে হয়তো দেখা হয়ে যাবে। 


জানি, সবটাই মায়া। সবটাই মরীচিকা। যে মানুষগুলো চলে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে আর কখনও কথা হবে না। দেখাও হবে না। আমার খোঁজখবরও জানতে চাইবেন না। যে চলে যায়, সে কি আর কখনও ফিরে আসতে পারে? পারে না। এটি ভাবলেই বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে। অস্থির অস্থির লাগে। তাঁদের স্মৃতিগুলো বেদনাতুর করে তোলে। প্রিয় এ মানুষগুলো চলে গিয়ে আমাকে কেমন যেন বেভুল করে দিয়েছেন। এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, সত্যি সত্যিই কি তাঁরা চলে গেছেন নাকি আগের মতোই আছেন?

১৫ নভেম্বর ২০২০

রবিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২১

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা

রঙ ছিল ফাল্গুনি হাওয়াতে

সব ভালো লাগছিল চন্দ্রিমায়

খুব কাছে তোমাকে পাওয়াতে।

মন খুশি উর্বশী সেই রাতে

সুর ছিল গান ছিল এই প্রাণে

ঐ দুটি হাত ছিল এই হাতে

কি কথা বলছিলে মন জানে

সব ভালো লাগছিল তুমি ছিলে তাই

মন ছিল মনেরই ছায়াতে।

রাত আসে রাত চলে যায় দূরে

সেই স্মৃতি ভুলতে কি আজ পারি

পুরানো দিন আছে মন জুড়ে

ভালোবাসা হয়েছে ভিখারি

ধূপকাঠি মন জ্বলে একা একা তাই

সেই তুমি নেই তুমি নেই সাথে।


আসলেই কি সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল? ঠিক মনে নেই। কিছুই মনে রাখতে পারি না। দিন-তারিখ তো মনে রাখার প্রশ্নই উঠে না। তবে বিশেষ সেই রাতের কথা কখনই ভুলতে পারা যায় না। পারা সম্ভব নয়। সেই রাতে পূর্ণিমা না থাকলেও বুকের মধ্যে ছিল অমল-ধবল জোছনা। আর এ জোছনায় ভেসে গিয়েছিলাম। পেয়েছিলাম টক-ঝাল-মিষ্টি রাত। কোনো আগল ছিল না। কোনো বাঁধন ছিল না। কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না। এমন রাত জীবনে আর কখনো আসে নি। কি যে আনন্দময় রাত! কি যে উন্মদনাময় রাত! কি যে মাতাল করা রাত! বৃষ্টির ছোঁয়ায় রাতটা আরো মধুর হয়ে ওঠে। ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হলো শেষ/ভুবনজুড়ে রইলো লেগে আনন্দ-আবেশ’। এমন আনন্দ-আবেশে বুঝে কিংবা না বুঝে হারিয়ে যায় হুঁশজ্ঞান। তারপর আর কিছু জানা নেই।      

আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে? আমার তো কল্পনার শেষ নেই। জেগে জেগে কত না স্বপ্ন দেখি। এও কি তেমন কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন? কিশোর কুমারের গানের মতো একটি রাতের অপেক্ষায় থাকার চেয়ে মধুর স্বপ্ন আর কি হতে পারে? 


(আজ কিন্তু জোছনা ভেজা রাত। এমন মায়াবী জোছনায় বেগম আখতারের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমান, জোছনা করেছে আড়ি/আসে না আমার বাড়ি/গলি দিয়ে চলে যায়/লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি/চেয়ে চেয়ে পথ তারই/হিয়া মোর হয় ভারী/রুপের মধুর মোহ/বলো না কী করে ছাড়ি।)

স্মৃতিরও সেই পথে আজও...



বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিরা সব উড়াল পাখি হয়ে যায়। চাইলেও ধরে রাখা যায় না। ধূসর পাণ্ডুলিপি হয়ে যায় জীবনের আনন্দ-বেদনার মুহুর্তগুলো। কিন্তু খুব অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কেন জানি কাছের স্মৃতিরা দূরে সরে যায়। আর দূরের স্মৃতিরা কাছে চলে আসে। কেন এমন হয়, আমার ঠিক জানা নেই। সেই কত কাল আগে পেরিয়ে এসেছি শৈশব আর কৈশোরের নির্মল ও সারল্যময় দিনগুলো। অথচ মনে হয়, এই তো সেদিন। হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে সোনাঝরা সেই দিনগুলোকে। আর শৈশবকাল মানেই তো প্রধানত স্কুলজীবন। আমার স্কুলজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপার্থিব ও নিস্কলুষ সব টুকরো টুকরো স্মৃতি। পিছন ফিরে তাকালে এখনও দেখতে পাই, নিপাটসাদা শার্ট আর নীল হাফ প্যান্ট পরে হেঁটে চলেছি সুবোধ বালক আমি। পরিপাট্যের মোটেও কমতি নেই। নারিকেল তেল দেওয়া চকচকে কালো চুল যত্ম করে আঁচড়ানো। হাতে বই-খাতা-কলম। শিক্ষার সন্ধানে, জ্ঞানের সন্ধানে, জীবনদর্শনের সন্ধানে পাঠশালার পানে ছুটে চলেছি। হায়! মেধাহীন আমি কোনো পাঠই নিতে পারি নি।

খুব বেশি দূরে ছিল না স্কুল। বাসা থেকেই দেখা যেত। এমনকি শুনতে পারা যেত স্কুলের ঢং ঢং ঘণ্টাধ্বনিও। তখন তো আর এত কোলাহল ছিল না। ছিল না এত এত মানুষ। তবে পড়ালেখার প্রতি কোনো কালেই ঝোঁক না থাকলেও স্কুলে সময়মতো পৌঁছানোর ব্যাপারে একটা তাগিদ অনুভব করতাম। দেরিতে পৌঁছালে সাজা পাওয়ার ভয় তো ছিলই। তবে আমাকে অসম্ভব টানতো চারপাশের সবুজনিসর্গ, টলটলে পুকুর আর প্রাণোচ্ছ্বল বন্ধুত্ব। পাখির কলকাকলিও কম আকর্ষণ করতো না। আমাদের স্কুলের অবস্থান তো আর যে সে এলাকায় নয়। ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’-এর বিদ্যালয় বলে কথা! চাইলেই দেয়াল টপকে পৌঁছে যাওয়া যেত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। ক্লাস করার সময় হঠাৎ হঠাৎ মনোযোগ কেড়ে নিত বিভিন্ন দেশের উদ্দেশ্যে আকাশে ডানা মেলা নানান আকারের, নানান রঙের, নানান শব্দের উড়োজাহাজ। কখনো-সখনো স্যারের বকুনিতে মুগ্ধতার ধ্যান ভাঙতো। 

তখন অবশ্য জানতাম না ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল’ আসলে কোনটি ছিল? তারপরও রূপান্তরিত ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’এর বাসিন্দা হিসেবে এক ধরনের গর্ব অনুভব করতাম। যদিও ‘দ্বিতীয় রাজধানী’র অভিধাও তত দিনে বদলে গেছে। সেটি হয়ে গেছে একটি দেশের পূর্ণাঙ্গ রাজধানী। তার ব্যাপ্তিও বেড়েছে। তারপরও কারো কারো কাছে শের-এ-বাংলা নগর দীর্ঘ দিন ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’ হিসেবেই বিবেচিত হতো। এর কারণ হতে পারে, সমগ্র পাকিস্তানের ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে এ এলাকার আলাদা একটা অহংকার, আভিজাত্য ও গৌরব ছিল। গৌরব হারিয়ে গেলেও তার নস্টালজিয়া কি আর এত সহজেই কাটিয়ে উঠা যায়? পাকিস্তানের সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ইসলামাবাদকে ‘ফার্স্ট ক্যাপিটাল’ হিসেবে গড়ে তোলার পর একটা ভারসাম্যমূলক নীতির অংশ হিসেবে ১৯৬২ সালের সংবিধানে শের-এ-বাংলা নগরকে ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’ হিসেবে ঘোষণা দেন। এর নামকরণ করা হয় তাঁরই নামে ‘আইয়ুব নগর’। পুরো ঢাকাকে বাদ দিয়ে কেবল ‘আইয়ুব নগর’কে ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ ঘোষণা করাটা বোধকরি কোনো চাণক্য নীতির অংশ ছিল। পরিসর ছোট হলেও একটি রাজধানীর জন্য যে সব অফিস-আদালত-বাসভবন অপরিহার্য, তা নির্মাণ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ হিসেবে গড়ে তোলার আগে এ এলাকাটি ছিল বিস্তীর্ণ কৃষি খামার। তাতে ছিল নানান রকম ফসলের সমারোহ। অবশ্য কিছুটা হলেও এখনও তার রেশ রয়ে গেছে। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে বহুকাল আগে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের-এ-বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের গড়ে তোলা কৃষি ইনস্টিটিউট (বর্তমানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়), খামারবাড়ি, কৃষি সংক্রান্ত বিভিন্ন অবকাঠামো। ‘সেকেন্ড ক্যাপিটাল’ গড়ে তোলার অংশ হিসেবে শুরুতে ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। পরবর্তীকালে আরো ৮০০ একর জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। সবার আগে শোভা হিসেবে নির্মাণ শুরু হয় ন্যাশনাল পার্লামেন্ট হাউজ, আজকের জাতীয় সংসদ ভবন। 

জগতবিখ্যাত আমেরিকান ভাস্কর লুই কানের পরিকল্পনায় জাতীয় সংসদ ভবনকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ও পরিকল্পিত শহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মূলত জাতীয় সংসদ, পিডব্লুউডি, হাসপাতালের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মাণ করা হয় বিভিন্ন ক্যাটাগরির কলোনি। তারই ধারাবাহিকতায় কলোনির বাসিন্দাদের সন্তানদের জন্য গড়ে তোলা হয় একটি সরকারি বালক এবং একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়। রাজনৈতিক পালাবদলে স্বাধীনতার পর ‘আইয়ুব নগর’-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘শের-এ-বাংলা নগর’ এবং বালক বিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয় ‘শের-এ-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়’। পুরো এলাকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্কুলটিতেও দেওয়া হয় লুই কানের নান্দনিক স্পর্শের ছোঁয়া। লাল সিরামিক ইটের নকশায় এল আকৃতির দোতলা স্কুল ভবনটি আলাদা সৌন্দর্য ছড়িয়ে দেয়। এখন অবশ্য এর অবয়বে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে।

যদিও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হওয়ায় পর শের-এ-বাংলা নগরের প্রতি ফোকাসটা আগের মতো আর থাকে নি। নেহাতই রাজধানীর আরো একটি এলাকা হিসেবেই এটি বিবেচিত হয়।তবে এলাকাটি ছিল অনেক বেশি খোলামেলা। পরিকল্পিত নগরের সব সুযোগ-সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে আবাসিক এলাকাটি। সে পরিকল্পনা থমকে গেলেও ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো এখনও এ আবাসিক এলাকাটি খুব বেশি ঠাসবুনোট হয় নি। তবে একটু একটু করে ঘিঞ্জি হয়ে ওঠছে। আশপাশের এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে ইট-বালু-সিমেন্টের অপরিকল্পিত জঙ্গল। হারিয়ে ফেলছে তার নান্দনিক সৌন্দর্য। স্কুলটিকেও ধীরে ধীরে ঘিরে ফেলছে বহুতল ভবনের ছায়া। তারপরও বিদ্যালয়টিকে এখনও পুরোপুরিভাবে আড়াল করতে পারে নি। কিন্তু মেট্টোরেল চালু হওয়ার পর স্কুলের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বোধকরি বদলে যাবে।

শের-এ-বাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমাদের গৌরবের নিশান ছিল সেফটিপিন দিয়ে বুকপকেটে আঁটা মনোগ্রাম সম্বলিত ব্যাজটি। তবে তা নিয়ে কিছুটা দুঃখবোধও ছিল। স্থান সংকুলান না হওয়ায় এ ব্যাজে স্কুলের নামটি সংক্ষেপে লেখা থাকতো শে.বা.ন.স.উ.বা. বিদ্যালয়। দুষ্টু ছেলের দল এর অর্থ বানিয়েছিল ‘শেয়াল, বানর, নরাধম সব উল্লুকের বাচ্চা’। আর যাই হোক, এমন সম্বোধন আমাদের কানে মোটেও মধুর লাগতো না। সেই বাচ্চা বয়সে এ কারণে মন খারাপ হয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

স্কুল থেকেই জীবনে প্রথম বনভোজনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। তখন আমরা ছিলাম নিচের ক্লাসের ছাত্র। সম্ভবত গাজীপুরের চন্দ্রায় আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই প্রথম জীবনে অন্য রকম এক মজা পেয়েছিলাম। এরপর অনেকবার বনভোজনে গিয়েছি। কিন্তু স্কুল থেকে যাওয়া বনভোজনটির আনন্দময় স্মৃতি এখনও উদ্বেলিত করে। 

২০১৮ সালের জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনে বলতে গেলে অচল হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকাসহ পুরো দেশ। আসলে এ নিয়ে আন্দোলন এরআগেও হয়েছে। তখন এতটা সাড়া জাগাতে পারে নি। মুরাদ নামে শের-এ-বাংলা নগর সরকারি বালক বিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে দ্রুতগতির একটি গাড়ি ধাক্কা দিয়ে অনেক দূর টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মর্মান্তিকভাবে মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আশেপাশের স্কুলের ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছিলাম। তখন বোধকরি আমি শের-এ-বাংলা নগর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শাখার ছাত্র ছিলাম। তখন তো মিডিয়ার এমন রমরমা ছিল না। ছিল না ভার্চুয়াল দুনিয়া। যে কারণে আমাদের আন্দোলন সর্বত্র চাউর হয় নি। সম্ভবত সেই আন্দোলনের পর ওই রাস্তায় স্পিডব্রেকার নির্মাণ করা হয়। মুরাদ স্মরণে তাৎক্ষণিকভাবে শ্যামলী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সড়কটির নাম স্বতস্ফূর্তভাবে দেওয়া হয়েছিল মুরাদ স্মৃতি সরণি। এ নামটি অনেক দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। পরবর্তীকালে সরকারিভাবে এ সড়কের নামকরণ করা হয়েছে বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ সরণি। কালের অতলে হারিয়ে গেছেন আমাদের স্কুলের ছাত্র মুরাদ। 

স্কুলে যাওয়ার পরও মনটা পড়ে থাকতো বাইরের জগতে। পাঠ্য বইয়ের পরিবর্তে বাইরের বিষয় আমাকে অসম্ভব টানতো। তখন তো ছিল ঘুড়ি উড়ানোর প্রচণ্ড নেশা। নীল আকাশে শুধু ঘুড়িই উড়াতাম না, সেইসঙ্গে উড়তো কত কত স্বপ্ন। ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে অনেক সময় স্কুলের সময় হয়ে যেত। মনের সুখে উড়তে থাকা ঘুড়িটাকে নামিয়ে আনতে কিছুতে মন সায় দিত না। নাটাইটা বাসার ভিতরে রেখে জানালার সঙ্গে উড়ন্ত ঘুড়ির সুতো শক্ত করে বেঁধে দিয়ে একান্ত নিরুপায় হয়ে চলে যেতাম স্কুলে। ঘুড়ির সঙ্গে বাঁধা থাকতো আমার চঞ্চল মনটাও। স্কুলে যেতে যেতে ফিরে ফিরে তাকাতাম। ক্লাস করার ফাঁকে ফাঁকে দেখতে পেতাম ঘুড়িটা নিঃসঙ্গভাবে দিব্যি উড়ছে। সেটিও কম রোমাঞ্চকর ছিল না। 

স্কুলের সামনে পসরা সাজিয়ে বসে থাকতেন আইসক্রিম, চটপটি, ঝালমুড়ি, আচারওয়ালারা। তাঁদের সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠেছিল। সেই বন্ধন দীর্ঘ দিন অটুট ছিল। ক্লাসে যাওয়া-আসার পথে মজাদার এই খাদ্যদ্রব্যের জন্য মনটা কেমন উঁচাটন হয়ে থাকতো। তখন তো আর পকেটে পয়সা থাকতো না। চাইলেই ইচ্ছে পূরণের সুযোগ ছিল না। তারপরও মাঝে-মধ্যে এর কোনো একটি আইটেমের স্বাদ নিতে না পারলে কেমন যেন আলুনি আলুনি লাগতো।কোনোভাবে পয়সা ম্যানেজ করতে পারলে এর স্বাদ নিতে একটুও ভুল করতাম না। কী যে তৃপ্তি নিয়ে খেতাম। সেই সোয়াদের কোনো তুলনা হয় না। সে কথা ভাবলে এখনও জিবে জল এসে যায়।

স্কুলে ঢোকার পর প্রতি মুহুর্তে ঘণ্টা বাজার অপেক্ষায় থাকতাম। তবে টিফিনের ঘণ্টা শোনার জন্য অনেক বেশি উন্মুখ হয়ে থাকতাম। বুকের মধ্যে কী যে আকুলি-বিকুলি করতো। এক একদিন এক এক পদের টিফিনগুলোকে মনে হতো স্বর্গ থেকে আনা কোনো সুখাদ্য। অবশ্য কোনো কোন দিনের টিফিন একদমই পছন্দ হতো না। এ নিয়ে সম্মিলিতভাবে উষ্ণাও প্রকাশ করতাম। স্কুলেরএকটি ঘণ্টা মানেই তো ছুটির অপেক্ষা। টিফিনের পর সেই অপেক্ষা যেন কিছুতেই ফুরাতে চাইতো না। 

বুকের মধ্যে আনচান করতো, ‘কখন ছুটি হবে, কখন বাজবে সেই ঘণ্টা’। প্রতীক্ষিত সেই ঘণ্টা বেজে উঠার পর কত না মধুর মনে হতো। একসময় তো স্কুল থেকে পুরোপুরিভাবে ছুটি হয়ে যায়। অনেকগুলো বছর একই লক্ষ্য নিয়ে একই ছাদের নিচে থাকা বন্ধুরা সব এলোমেলো হয়ে যাই। কে যে কোথায় হারিয়ে যায়। জীবনের বিস্তৃত আঙিনায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ায় দেখা-সাক্ষাৎ হয় না বললেই চলে। কখনো কখনো মনে হয়, ইস! হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো স্কুলের সেই ঘণ্টাধ্বনি যদি বেজে উঠতো, তাহলে বন্ধুরা সব স্কুলে ফিরে গিয়ে কলতানিতে মেতে উঠতে পারতাম। এমনটি তো আর কখনও হবে না।

ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে টানা পাঁচ বছর একটির পর একটি সিঁড়ি টপকে ১৯৮১ সালে স্কুল থেকে একেবারেই বিদায় নিতে হয়। সে বছরের ৯ মার্চ বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাদের উদ্দেশ্যে পড়া মানপত্র লেখা হয়েছিল, ‘কালের প্রবাহধারায় এক চিরন্তন নিয়মে তোমাদেরকে আমাদের মাঝ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। বৈচিত্রময় জীবনের সোনালী সূর্যের প্রত্যাশায় এতদিন কঠোর সাধনা করেছ। আজ সেই অনাগত দিন তোমাদের দ্বারপ্রান্তে। নতুন দিনকে বরণ করতে যাচ্ছ তোমরা। স্বাভাবিক কারণেই আমাদের ছাড়তে হবে তোমাদের। তাই তোমাদের বিদায় সম্ভাষণ জানাতে আমরা সমবেত। 

তোমাদের বিদায় দিতে আমরা ভীষণভাবে ব্যথিত। শ্রেণী কক্ষের অটল গাম্ভীর্যের বাইরে বিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে কলকাকলীতে মুখরিত হয়েছে আমাদের দিনগুলো। একটানা বেশ ক’টা বছর কেটেছে এক সাথে। তোমাদের সাহচর্য আমাদের মুগ্ধ করেছে। কর্মতৎপরতা ও প্রেরণা জুগিয়েছে সকল কাজে। তাই এই বিদায়ক্ষণে নীরব বেদনায় আমাদের হৃদয় বিষাদময় হয়ে উঠেছে।

বিশাল জাগতিক আহ্বানে সারা দিতে যাচ্ছ তোমরা। এখন আর পিছনে ডাকা নয়। এগিয়ে চল দৃঢ় প্রত্যয় আর দৃঢ় শপথে। এতদিনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বাধÑরচনা করা এক সুন্দর জীবন।’

হৃদয়ের সবটুকু আন্তরিকতা আর ভালোবাসা দিয়ে বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমাদের মঙ্গল কামনা করা হয়েছিল। বিদায়ের সেই মুহুর্তে মনে হয়েছিল, বিশাল জাগতিক আহ্বানে সারা দিয়ে দৃঢ় প্রত্যয় আর দৃঢ় শপথে জীবন চলার পথে এগিয়ে যাবো। এখন তো বুঝতে পারছি, সেই প্রত্যাশা মোটেও পূরণ করতে পারি নি। পারি নি সুন্দর জীবন গড়ে তুলতেও। আমি তো বরাবরই ছিলাম ব্যাকবেঞ্চার। কখনই সামনের সারিতে যেতে পারি নি। এখনও তেমনটি রয়ে গেছি। সবার মেধাতো আর সমান নয়। চাইলেও ইচ্ছেমতো কিছু করতে পারা যায় না। আমিও পারি নি। এ না পারার ব্যর্থতার গ্লানি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জীবনটাকে আবার নতুনভাবে সাজাতে পারলে মন্দ হতো না। এ কারণে ইচ্ছে করে সেই স্কুল জীবনে ফিরে যেতে। যেখানে বুকের মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয় জীবন গড়ার মূলমন্ত্র। তখন তো না বুঝে সেই মন্ত্র অবহেলা করেছি। এখন মনে হয়,নিজেকে সত্যিকার অর্থে যোগ্যতর হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষকদের উপদেশগুলো অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করলে কত না ভালো হতো। বয়সের এই প্রান্তে এসে এমন উপলব্ধি হলেও চাইলেই তো আর সেই জীবনে ফিরে যাওয়া যাবে না।

কী এক আশ্চর্য ব্যাপার, জীবনে প্রথম স্কুলে যাই কাঁদতে কাঁদতে। স্কুল ছেড়ে এসেছি হাসতে হাসতে। আর এখন জীবনের উপান্তে দাঁড়িয়ে স্কুলের সেই জীবন ফিরে পাওয়ার জন্য বুকের মধ্যে অনুভব করছি এক ধরনের হাহাকার। হায়! জীবন যে কত রহস্যময়। তার তল আজও খুঁজে পেলাম না।

মর্মঘাতী সেই সুর

সেই সময়টা ছিল বোধকরি বিষণ্নতায় ভরা। রক্তক্ষয়ী এক মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলেও তখনও ভয়াল এক স্মৃতি তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে থাকে। পথে-ঘাটেও লেগে ছিল রক্তের দাগ। পূর্বকালীন ঘটনার রেশ তো বুকের মধ্যে রেখাপাত না করে পারে না। এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠার সময় বিষাদাচ্ছন্ন না হয়ে কি উপায় থাকে? তদুপরি জীবনের প্রথম পাঠ যদি হয় মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’, তাহলে কৈশোরকাল তো বেদনাবোধে আক্রান্ত হবেই। এমন সময় আরো বেশি বেদনার্ত করে তোলেন নূরু মিঞা। তাঁকে আমি চিনতাম না। চেনার কথাও নয়। আর তাঁর নাম জানার তো প্রশ্নই আসে না। কিন্তু তাঁর বেহালার ছড় আমার বুকের ভিতরটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। যদিও সুরের ব্যাকরণ আমি বুঝি না। সেভাবে বুঝতে চাইও নি। তবে সুর যে মর্মস্পর্শ করতে পারে, চিত্তকে বিদীর্ণ করতে পারে, হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করতে পারে, সেটা অন্তত অনুধাবন করতে পেরেছি। আর এই অনুধাবনটুকু হয়ে যায় একদম অল্প বয়সেই। সেটা নূরু মিঞার কল্যাণে। 

তখন থাকতাম শের-এ-বাংলা নগরে। কোনো এক বিষাদিত দুপুরে শুনতে পাই মর্মঘাতী সেই সুর। সুরের টানে বের হয়ে আসি ঘরের বাইরে। দেখতে পাই, হালকা-পাতলা গড়নের কালো চেহারার মলিন এক লোককে। তাঁর কাঁধে ঝুলানো থলিতে উঁকি মারতে থাকে একতারা আর দোতারা। হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো তারে তারে বাজাতে থাকেন মর্মভেদী এক সুর। তা যে আমার বুকের মধ্যে চিরকালের জন্য স্থায়ী হয়ে যাবে, সেটা তখন বুঝতে পারি নি। আসলে এমনভাবে কোনো সুর আমাকে আর কখনও বিদ্ধ করতে পারে নি। যে কারণে সেই সুর যে অনেকটা গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গ্রন্থের নামকরণের মতো ‘মেমোরিজ অব মাই মিলানকোলি ......’ হয়ে যায়, তা থেকে কখনও মুক্ত হতে পারি নি। স্মৃতির অংশ হয়ে যাওয়া সেই অবিনশ্বর সুর আমার বুকে হঠাৎ হঠাৎ বেজে ওঠে। তখন অনুভব করি আত্মঘাতী এক বেদনা। সেই অনুভবটুকু কাউকে বুঝিয়ে বলা যাবে না। 

সেই বয়সে সত্যিকার অর্থেই আমি নুরু মিঞা হতে চেয়েছিলাম। তাঁর কাছ থেকে একটি একতারা কিনে যখন তাতে টান দেই, জীবনে এর চেয়ে বেশি হতাশ আর কখনও হই নি। সেদিন একতারা বাজাতে না পারার বেদনায় যে মনোকষ্ট পেয়েছিলাম, সেই মর্মযাতনা, সেই ব্যর্থতাবোধ আমি কখনও ভুলতে পারি নি। আমি চেয়েছিলাম নুরু মিঞার শিষ্য হয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে। সেই সুযোগও আর পাই নি। নুরু মিঞার সঙ্গে আমার আর কখনও দেখা হয় নি। তাঁকে মনে মনে কতই না খুঁজেছি। সেই থেকে তিনি হয়ে আছেন আমার স্মৃতির অংশীদার। 

অবশেষে, তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হলো। আজ টিএসসি চত্বরে আগের মতো সেই অনুজ্জ্বলতা নিয়ে একাকী বেহালায় সুর তুলতে দেখলাম। কিন্তু সুরে সেই আত্মনাশী অনুভবটুকু কেন যেন পেলাম না। এটাও তো ঠিক, এরমধ্যে তো পেরিয়ে এসেছি কত কত কাল। এ সময়ে কি তাঁর আত্মনিমগ্নতায় খামতি হয়েছে নাকি আমারই অনুভবের অক্ষমতা? আমি বলতে পারবো না। তবে কাছে গিয়ে জানতে পারি তাঁর নাম। তাঁর নিবাস। কিন্তু তাঁকে বলতে পারি নি, তিনি আমার অস্তিত্বের সঙ্গে কতটা মিশে আছেন। এই বলতে না পারার যে অপারগতা, সেটাও সেই বিষণ্নতার কারণে। কৈশোরের সেই বিষণ্নতাবোধ যেভাবে নির্লিপ্ত ও নিঃসঙ্গ করে দেয়, সেটাকেই তো আজও বয়ে নিয়ে চলেছি।

বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

আমার বইমেলা





বাংলা একাডেমির বইমেলার সঙ্গে বয়সোচিত কারণেই সহজাতভাবেই আমাদের প্রজন্মের একটা আত্মিক বন্ধন গড়ে উঠে। কলেজে উঠার পর পরই বইমেলা হয়ে উঠে তারুণ্যের প্রাণপ্রাচুর্যের বিচরণক্ষেত্র। সেই সময় নিজের মনে করে সবে ক্ষমতার দখল নেন সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদ। সাইকেল চালিয়ে আর কবিতা লিখে তিনি যতই সর্বসাধারণের মন জয় করার চেষ্টা করুন না কেন, ছাত্র সমাজ তাঁকে একদমই মেনে নিতে পারেন নি। ছাত্রদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এরশাদের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি কলাভবন থেকে শিক্ষা ভবন অভিমুখে ছাত্রদের মিছিলে ট্রাক তুলে দেয় পুলিশ। জাফর, জয়নাল, দীপালিরা জীবন দিলে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভের আগুন। সেই আগুনের আঁচে এলোমেলো হয়ে যায় জমজমাট বইমেলা। সেদিনও ছিলাম বইমেলায়। আর বাংলা একাডেমির বইমেলা ছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার।
রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠার পাশাপাশি বইমেলা প্রাঙ্গণে তার উত্তাপ দারুণভাবে টের পাওয়া যেত। কবি মোহন রায়হানদের সাহসী তৎপরতা তো ছিল। কবি-লেখকদের কলমে ছিল তীব্র ঝাঁজ। আবৃত্তিকারদের কণ্ঠের নিনাদে প্রকম্পিত হয়েছে পুরো চত্বর। আর তখন তো লিটল ম্যাগাজিনের স্বর্ণযুগ। তাতেও থাকতো প্রতিবাদী সব লেখা ও কার্টুন। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ তো ছিলই। আমাদের তখন তরুণবেলা। প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ আমাদের দারুণভাবে নাড়িয়ে দিত। বইমেলায় গেলে মনে হতো, আমিও বুঝি আন্দোলনের অংশীদার। এ কারণে বইমেলা আমাদের চুম্বকের মতো টানতো। তাছাড়া কত কত বইয়ের স্পর্শ ও সুঘ্রাণ মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতো। (অথচ কী এক অদ্ভুত কারণে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের স্পর্শ তো দূরে থাক, ঘ্রাণ নিতে একটুও ইচ্ছে করতো না।) তখন তো আর বইমেলায় খুব বেশি বই প্রকাশিত হতো না। মোটামুটিভাবে সব বই ও লেখকের খোঁজ-খবর রাখাটা মোটেও কঠিন ছিল না। সেটাও এক ধরনের আনন্দ ছিল বৈকি।
বইমেলা যখন সাবালক হয়ে উঠতে থাকে, তখন থেকেই তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। সঙ্গত কারণে আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একুশের বইমেলা। সেই থেকে বইমেলার সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক কখনই শিথিল হয় নি। বরং বদলে গেছে ভূমিকা। শুরুর দিকে কেবলই দর্শক হিসেবে বইমেলায় গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সম্পকর্টা গভীরতর হয়েছে।
বইমেলা উপলক্ষে কত কিছু যে আয়োজিত হতো। বিভিন্ন রকমের অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডে সরগরম থাকতো বাংলা একাডেমি এবং সংলগ্ন এলাকা। নাটকের একটি মঞ্চ গড়ে তোলার জন্য অভিনেতা শংকর সাঁজোয়ালের নেতৃত্বে ‘কারক’ নাট্যগোষ্ঠীর বিদ্রুপাত্নক পথনাটক দারুণ উপভোগ করেছি। এজন্য লাল সালুতে টাকা-পয়সা ভালোই জমতো। সেই মঞ্চ কি গড়ে উঠেছে? তাছাড়া মেলায় আগত শিল্প-সাহিত্য-নাটক-সংস্কৃতি-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি জগতের দূরের মানুষদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। কত খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব যে আসতেন। লেখক ইমদাদুল হক মিলন, হুমায়ূন আহমেদ, তসলিমা নাসরিনদের তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তাও দেখেছি। মনে পড়ে, শাড়ি পরা তসলিমা নাসরিনকে প্রথম যেদিন মুগ্ধ হয়ে দেখি, তাঁকে কেন্দ্র করে স্বভাববিরুদ্ধভাবে একপাক ঘুরপাক খেয়েছিলাম। কবি নির্মলেন্দু গুণের হাত ধরে কন্যা মৃত্তিকা গুণ, নাট্যজন রামেন্দু মজুমদারের সঙ্গে কন্যা ত্রপা মজুমদারকে অনেক দিন দেখেছি। এই কিশোরী কন্যারা এখন কত বড় হয়ে গেছেন! সে সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে দেখতে পাওয়া ছিল রোমাঞ্চকর একটি ব্যাপার। 
   

বইমেলা উপলক্ষে লিটল ম্যাগাজিনের ঢেউ আমার বুকেও দোলা দিয়ে যায়। কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই ১৯৮৩ সালে ‘আবাহন’ নামে একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নেই। সেই সুবাদে বাংলা একাডেমি চত্বরে যাতায়াত বেড়ে যায়। একে একে পরিচিত হতে থাকি নবীন-প্রবীণ লেখকদের সঙ্গে। বিশেষ করে কবি আবিদ আজাদ, ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন সহ প্রমুখের সঙ্গে সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। এছাড়াও বিচিত্র সব অভিজ্ঞতা হয়। সাহিত্য জগতের অনেক অভিসন্ধিও নজরে আসে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এক বছর পর সংকলনটি প্রকাশ করা সম্ভব হয়। বইমেলায় সংকলনটি নিয়ে যাওয়ার পর নিজেকে সাহিত্য জগতের কেউকেটা মনে হতে থাকে। বইমেলার সঙ্গে অনেক বেশি নিবিড়তা অনুভব করতে থাকি। মনে হতে থাকে, এত দিনে বইমেলার একজন হতে পেরেছি।
১৯৯০ সালে সাবের হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত (প্রধান সম্পাদক ছিলেন কবি শামসুর রাহমান) সাপ্তাহিক মূলধারা পত্রিকার রিপোর্টার হয়ে অনেক লেখক-সাহিত্যিক-প্রকাশকের খণ্ড খণ্ড সাক্ষাৎকার নিয়েছি। এরপর থেকে পেশাগত কাজে অসংখ্যবার বইমেলা চত্বরে যেতে হয়েছে।     
               

বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেওয়ার পর একুশে বইমেলা উপলক্ষে ক্রীড়া বিষয়ক গ্রন্থ প্রকাশ করার উদ্যোগ নেই। তারই অংশ হিসেবে ১৯৯৩ সালে ২৬ জন লেখকের লেখা নিয়ে ‘খেলার কথা কথার খেলা’ এবং পরবর্তীতে বাংলা ভাষায় সম্ভবত প্রথম ক্রীড়া বিষয়ক ছড়াগ্রন্থ কবি সানাউল হক খানের ‘ছন্দে ছন্দে খেলার আনন্দে’ প্রকাশ করা হয়। আর বই বিক্রির জন্য ১৯৯৩ সালে প্রথম সমিতির উদ্যোগে বইমেলায় স্টল নেওয়া হয়। তাতে শুধু সমিতির নয়, অন্যদের লেখা ক্রীড়া বিষয়ক বই নিয়ে সাজানো হয় সেই স্টল। সব দিক দিয়ে এটি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী একটি প্রয়াস। এছাড়া বই বিক্রি করার অভিনব একটি কৌশলও নেওয়া হয়। প্রতিদিন কোনো না কোনো ক্রীড়া তারকা ক্রীড়ালেখক সমিতির স্টলে উপস্থিত থাকতেন এবং বইয়ের ক্রেতাদের অটোগ্রাফ দিতেন।


তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ফুটবলার আশরাফউদ্দীন চুন্নু, সালাম মুর্শেদী, শেখ মোহাম্মদ আসলাম, কায়সার হামিদ, মোনেম মুন্না, রুমি রিজভী করিম, ইমতিয়াজ সুলতান জনি, রক্সি, ক্রিকেটার ওমর খালেদ রুমি, গাজী আশরাফ হোসেন লিপু, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, ব্যাডমিন্টনের কামরুন্নাহার ডানা, টেবিল টেনিসের জোবেরা রহমান লিনু। এঁদের কেউ কেউ এসেছিলেন সপরিবারে। সবচেয়ে সাড়া জাগিয়েছিল সে সময়কার সুপারস্টার সদ্য বিবাহিত মোনেম মুন্না ও কায়সার হামিদের উপস্থিতি। এই দুই দম্পতির হাতের মেহেদির রং তখনও টাটকা ছিল। মুন্না সস্ত্রীক মেলায় যে দিন স্টলে বসেছিলেন, সেদিন আমাদের স্টলকে কেন্দ্র করে পুরো মেলা যেন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিতরা এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। এ কারণে সম্ভবত মেলার আয়োজকরা আমাদের সতর্ক করে দিয়েছিল।  
 

১৯৯৩ সালেই প্রকৃত প্রকাশক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করি। সে সময় বেশ সুখ্যাতিও অর্জন করি। এ কারণে বইমেলার সঙ্গে সম্পর্কটা আরো দৃঢ়তর হয়। আর প্রকাশক হওয়ার পেছনে অবদান রাখেন লেখক ও সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ১৯৯২ সালে দৈনিক বাংলার বাণী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের জনক কে?’ শিরোনামে একটি লেখা। আলোচিত এ বিষয়টি নিয়ে তখন সর্বত্র তোলপাড় চলতে থাকে। সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে এ লেখাটি। হঠাৎ মাথায় এলো, এ লেখাটিকে বই আকারে প্রকাশ করলে কেমন হয়? বাংলার বাণীর সাংবাদিক সহকর্মী সুধীর কৈবর্ত দাস, প্রণব সাহা, নান্টু রায়ের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করলে তাঁরা সায় দেন। এরপর আর এগিয়ে যেতে সময় লাগে নি। চারজনের অর্থে গড়ে উঠে ‘অক্ষরবৃত্ত’ প্রকাশনী। এই প্রকাশনীর উদ্যোগে লেখকের অনুমোদন নিয়ে বইমেলা উপলক্ষে ‘আমরা বাংলাদেশী না বাঙালি?’ বইটি প্রকাশ করা হয়। যদিও আমাদের কোনো স্টল ছিল না। তারপরও মেলায় বইটি হটকেক হয়ে ওঠে। একাধিক সংস্করণও ছাপতে হয়। একটি প্রবন্ধের বই এতটা সাড়া জাগাবে, এটা আমাদের ধারণায় ছিল না।
তখন দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় বইমেলা কাভার করতেন জনপ্রিয় ছড়াকার ও লেখক লুৎফর রহমান রিটন। তিনি এ বইটিকে কেন্দ্র করে প্রকাশক হিসেবে আমার এক টুকরো সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। এ বইটি দিয়ে আমরা বেশ মুনাফা করতে সক্ষম হই। সেটা হয়ে যায় আমাদের ভালো একটা পুঁজি। প্রকাশনা ব্যবসায় আমরা বেশ উৎসাহী হয়ে ওঠি। পরের বছর থেকে আমরা বইমেলায় নিজেরাই স্টল নেওয়া শুরু করি। দৈনিক বাংলার বাণীতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর স্মৃতিচারণমূলক লেখা ‘ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা’ও আমরা প্রকাশ করার অনুমতি পাই। এ বইটিও পাঠকরা লুফে নেন। কিন্তু এরপর কোনো বিবেচনা ছাড়াই আমরা একের পর এক গ্রন্থ প্রকাশ করতে থাকি। যার তেমন কোনো পাঠক চাহিদা ছিল না। সব মিলিয়ে বোধকরি ১৮টি বই হবে। এ কারণে আমাদের মূলধন ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে থাকে। তাছাড়া প্রকাশক চার জন হলেও সব চাপ গিয়ে পড়ে বাংলা বাজার এলাকায় সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব সুধীর কৈবর্ত দাসের কাঁধে। প্রকৃতঅর্থেই ‘জুতা সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ’ তাঁকেই করতে হয়। আর আমরা বাকি তিন প্রকাশক অনেকটা মেহমান হিসেবে মাঝে-মধ্যে স্টলে চেহারা দেখাতে যেতাম। খোঁজ-খবর খুব একটা নিতাম না। যদিও বইয়ের ব্যবসার প্রসার বাড়তে থাকে। কিন্তু একার পক্ষে এ ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া সুধীর দা’র পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। ব্যবসায় লালবাতি জ্বলতে সময় লাগে নি। এ কারণে প্রকাশক হিসেবে বইমেলার সঙ্গে ২০০০ সালের পর আর সম্পর্ক থাকে নি।
 

১৯৯৮ সাল থেকে বইমেলার সঙ্গে গড়ে ওঠে নতুন এক সম্পর্ক। সে বছর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার প্রথম গ্রন্থ ‘দেখা হলো লংকায়’। ভ্রমণবিষয়ক এ গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কোনো সংযোজন না হলেও বাংলা একডেমির বইমেলায় অভিষেক হয় একজন লেখকের। তবে এটা তো ঠিক, অভিষেক হওয়ার আনন্দ অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা চলে না। যদিও অভিষিক্ত ক্রিকেটারদের মতো মাথায় কেউ ক্যাপ পরিয়ে না দিলেও অদৃশ্য এক ক্যাপ নিজেকে নিজেই পরিয়ে দেই। লেখক হিসেবে বইমেলার সঙ্গে সেই যে হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সেটা আর কাটিয়ে ওঠা যায় নি। এখন তো আর আগের সেই দিন নেই। বইয়ের প্রচার-প্রচারণায় লেখক নিজে সক্রিয় না হলে বইয়ের নাকি কাটতি হয় না। কিন্তু এই দক্ষতা আজও অর্জন করতে পারলাম না।


তবে ২০০৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় আমার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির বটতলায় বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তাতে উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, কবি হালিম আজাদ সহ অন্যরা।
সম্ভবত ২০০৮ সালে বাংলা একাডেমি চত্বর দিয়ে একদিন হাঁটাহাঁটির সময় পরিচিত ছড়াকার ও লেখক আমিরুল ইসলাম ঠেলেঠুলে লুৎফর রহমান রিটন ভাইয়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দেন। ২০০৪ সাল থেকে চ্যানেল আই বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে সরাসরি বইমেলা সম্প্রচার করা শুরু করে। এ অনুষ্ঠানের প্রযোজক আমিরুল ইসলাম। আর দীর্ঘ এক দশক এর উপস্থাপক রিটন ভাই। বিস্মিত, বিস্রস্ত ও বিভ্রান্ত আমি সেদিন নিজের বই সম্ভবত ‘আছি ক্রিকেটে আছি ফুটবলেও’ এবং ক্রীড়া বিষয়ক প্রকাশনা নিয়ে কী বলেছিলাম, সেটা আজ আর স্মরণ নেই। বইমেলায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রোনিক মিডিয়ায় যে দু’বার সাক্ষাৎকার দেই, ঘটনাক্রমে দু’বারই সাক্ষাৎকার নেন আমার একজন অত্যন্ত প্রিয় মানুষ রিটন ভাই। তবে এরপর আর নিজের বই নিয়ে বইমেলায় কখনও কোথাও কিছু বলতে হয় নি।
তারপর থেকে মাঝে-মধ্যে নিজের বই প্রকাশিত হওয়ায় বইমেলার সঙ্গে আবেগগত ও ভালোবাসার একটা বন্ধন গড়ে উঠেছে। তাছাড়া মনের মধ্যে একটা লেখক লেখক ভাবও বোধকরি এসে গেছে! বইমেলা এলে কাছের জনরা জানতে চান, এবার কী বই বের হচ্ছে? এটাও কি কম আনন্দের? বিভিন্ন সময়ে বদলেছে বইমেলার নামকরণ। সাম্প্রতিক সময়ে বইমেলার ব্যাপ্তি বেড়েছে। বিশালত্ব বেড়েছে। বইয়ের সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু সৃজনশীল বইয়ের পাঠক কি বেড়েছে? তবে বইমেলা এলে এখনও বুকের মধ্যে উড়তে থাকে রঙিন প্রজাপতি। যতই কাজে ব্যস্ত থাকি না কেন, নতুন প্রেমে পড়া কিশোরের মতো বইমেলায় ঢু মারার জন্য মনটা সারাক্ষণ উচাটন হয়ে থাকে। আর প্রেমিকা যখন অপেক্ষায় থাকে, তখন যত কাজই থাকুক না কেন, ছুটে না গিয়ে কি পারা যায়?
  

ক্রীড়া সাংবাদিকতার রূপান্তর





ইংরেজ লেখক-দার্শনিক স্যার ফ্রান্সিস বেকন ১৫৯৭ সালে বলেছিলেন, ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’। তাঁর কথাটাকে একটু বদলে এখন বলা হয়, ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’। এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না, আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অমিত শক্তি। চারপাশেই তা অনুভব করা যায়। বিশ্বায়নের খোলা জানালা দিয়ে আমরা যে ‘বিশ্বগ্রাম’-এর বাসিন্দা হয়ে ওঠেছি, সে তো তথ্যের শক্তির ওপর ভিক্তি করে। প্রিন্ট, ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে তথ্যের অনেক বেশি বিকাশ ঘটছে। একই ধারায় ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়া ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও মিডিয়া রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো খেলা হোক না কেন, মিডিয়ার কল্যাণে তার সর্বশেষ তথ্য নিমিষেই সবার কাছে অনায়াসেই পৌঁছে যায়। এ ম্যাজিকটা সম্ভব করেছেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা।
মেঘে মেঘে বেলা তো আর কম হলো না। ব্রিটিশ ভারতে সূচনা ঘটে ক্রীড়া সাংবাদিকতার। একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় ১৮৫৪ সালের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি ফুটবল ম্যাচের খবর প্রকাশ হয়। এ দিয়ে শুরু এ অঞ্চলে ক্রীড়া সাংবাদিকতা। ছোট্ট পরিসরের খেলার এ খবর প্রকাশ করাটা ছিল বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। তারপর তো কলকাতা ফুটবলের তীর্থকেন্দ্র হয়ে ওঠলে সংবাদপত্রেও তার প্রতিফলন ঘটে। শুরুতে ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয় বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতা। অবশ্য ফুটবলের পাশাপাশি অন্য খেলাগুলোও স্থান করে নেয়। সে সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো অসংখ্য পত্র-পত্রিকা। তাতে ক্রীড়াঙ্গনও গুরুত্ব পেতে থাকে। ব্রিটিশদের সঙ্গে ভারতীয়দের ফুটবল ম্যাচ হয়ে ওঠে ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। ম্যাচ রিপোর্টের পাশাপাশি ছাপা হয় সাদা-কালো ছবি। তবে সব কিছুই কলকাতাকেন্দ্রিক হওয়ায় তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় সংবাদপত্রের প্রসার খুব একটা ছিল না।
সে সময় ঢাকায় পত্র-পত্রিকার বিস্তার ছিল খুবই কম। হাতেগোনা যে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তার সঙ্গে খেলাধুলার খুব একটা সম্পৃত্ততা ছিল না। ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ঢাকা নিউজ’ ১৮৫৬, ‘বেঙ্গল টাইমস’ ১৮৬০ সালে ও ১৮৬০ সালে প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক ‘কবিতাকুসুমালী’ প্রকাশিত হয়। ১৮৬১ সালে বের হয় ‘ঢাকা প্রকাশ’। খেলাধুলার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দীর্ঘায়ুর এ পত্রিকাই ছিল সবেধন নীলমণি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক ‘দ্য হেরাল্ড’, বাজারজাত হয় ১৯১৬ সালে। এ ধরনের পত্রিকায় কদাচিৎ খেলার খবর হয়তো থাকতো। তবে তার কোনো হদিস এখন মেলে না। যে কারণে ব্রিটিশ ভারতে ঢাকায় ফুটবল লিগ আয়োজিত হলেও সে সংক্রান্ত তথ্য নেই বললেই চলে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনের খবর মাঝে-মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তা খুব বেশি উল্লেখ করার মতো নয়। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এর ঢাকাস্থ প্রতিনিধির পাঠানো খেলার খবর কালেভদ্রে ছাপা হতো। আজাদ-এর পাশাপাশি দৈনিক ইত্তেহাদ, ডেইলি মর্নিং নিউজ ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সওগাত’ পত্রিকা ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভালোই ভূমিকা রাখে। কলকাতা মোহামেডান ক্লাবকে কাভারেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ পত্রিকাটির অবদান বেশি। খেলোয়াড়দের ছবি ও প্রোফাইল প্রকাশ করে সাড়া জাগায়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনের পালে লাগে নতুন হাওয়া। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ক্রীড়া সাংবাদিকতার অবয়ব। তখন তো সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। উল্লেখযোগ্য হলো সৈনিক, জিন্দেগী, ডেইলি অবজারভার, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক। তবে আজাদ, মর্নিং নিউজ, অবজারভার, সংবাদ, ইত্তেফাক-এর মতো দীর্ঘস্থায়ী পত্রিকাগুলো সমাজমানসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূলত এ পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে বিকশিত হয় ক্রীড়া সাংবাদিকতার ধারা। সে সময় থেকে প্রথমে খ-কালীন, পরবর্তীতে সার্বক্ষণিক ক্রীড়া সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে মনে করা হয় দৈনিক আজাদ-এর সৈয়দ জাফর আলীকে। তিনি এ পত্রিকার চিফ রিপোর্টারের পাশাপাশি স্পোর্টস রিপোর্টিং করতেন। বাংলা পত্রিকায় খেলাধুলার খবর খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এক কলামের বেশি নিউজ প্রকাশ হওয়াটা ছিল অনেক বড় ব্যাপার। অধিকাংশ দিন কোনো নিউজই থাকতো না। তবে ইংরেজি পত্রিকায় খেলার খবর যথেষ্ট গুরুত্ব পেত। ১৯৪৯ সালের ১৯ মার্চ প্রকাশিত অবজারভার প্রথম খ-কালীন স্পোর্টস রিপোর্টার নিয়োগ দেওয়া হয় কানু কবির (নুরুল কবির)কে। ১৯৫৪ সালে সার্বক্ষণিক স্পোটস রিপোর্টার হিসেবে কুতুবউদ্দীনকে নিয়োগ দেয় মর্নিং নিউজ। এরপর থেকে স্পোর্টস রিপোর্টার নিয়োগের ধারাও গড়ে ওঠে। ভারতের মাটিতে নিজেদের দ্বিতীয় টেস্টেই প্রথম এবং স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের জয় আর ফজল মাহমুদ, নজর মোহাম্মদ, মাহমুদ হুসাইনের বিস্ময়কর পারফরম্যান্স দারুণভাবে সে সময় সাড়া জাগায়। সংবাদপত্র জগতও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। পত্রিকার সীমিত পরিসরের বড় একটি অংশ স্থান করে নেয়। এমনকি প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিংও হয়। ১৯৫৫ সালে ভারত, নিউজিল্যান্ড, ১৯৫৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ড, ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের টেস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় ক্রিকেটের রূপ-রস-গন্ধে পল্লবিত হয় ক্রীড়া সাংবাদিকতা।
পর্যায়ক্রমে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগও গুরুত্ব পেতে থাকে। তদানীন্তন পাকিস্তানের ফুটবলের তীর্থকেন্দ্র ছিল ঢাকা। অর্থের প্রলোভনে ঢাকা লিগে খেলার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটে আসতেন ফুটবলাররা। জমজমাট হয়ে ওঠে ঘরোয়া ফুটবল। পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানিদের খেলা হলে তা উত্তেজনার বারুদ ছড়াতো। পাঠকদের আগ্রহের কারণে সংবাদপত্রে খেলাধুলার স্পেস বাড়তে থাকে। পঞ্চাশ দশকের শেষদিকে মর্নিং নিউজ আর অবজারভার-এ খেলার জন্য এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ করলে ক্রীড়া সাংবাদিককতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সে সময় স্পোর্টস এডিটরও নিয়োগ দেওয়া হয়। সবার আগে সাপ্তাহিক খেলার পাতা চালু করে মর্নিং নিউজ। ষাটের দশকের শুরুতে বাংলা পত্রিকার মধ্যে প্রথম এ ধারা অনুসরণ করে দৈনিক আজাদ। ১৯৫৪ সালে ঢাকা স্টেডিয়াম গড়ে উঠলে ক্রীড়াঙ্গনে উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। স্টেডিয়াম এলাকায় ক্রীড়া সাংবাদিকদের আনাগোনা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় সংবাদপত্রের পাতায়। ঢাকা লিগ ছাড়াও রোনাল্ডশে শিল্ড, ১৯৫২, ’৫৭, ’৬২ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল ফুটবল, ১৯৫৫ সালে ৪ জাতির কোয়াড্রাঙ্গুলার, ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু আগা খান গোল্ড কাপ, ১৯৬৭ সালে আরসিডি টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে ঢাকার ফুটবলে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঢাকার মাঠে খেলতে আসে ভিন দেশি শক্তিশালী বিভিন্ন ফুটবল দল। ফুটবল হয়ে ওঠে সংবাদপত্রের প্রধান আকর্ষণ।
১৯৫৫, ’৬০, ’৬৪, ’৬৮ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল গেমস, ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অ্যাথলেট জিনাত আহমেদ ও ১৯৫৬ সালে লাহোরে লুৎফুন্নেছা হক বকুলের স্বর্ণ জয়, ১৯৫৮ সাল থেকে ’৬১ সাল পর্যন্ত সাঁতারু ব্রজেন দাসের ৬বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে সাড়া জাগান। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাথলেটিকস, সাঁতার সহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ক্রীড়া সাংবাদিকদের আকৃষ্ট করে। প্রতিটি ইভেন্টই ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে বিদেশি খেলার খবর টাটকা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে নিউজ পাকিস্তানের করাচি হয়ে আসতো। পঞ্চাশের দশকে থেকে পত্র-পত্রিকায় খেলার ছবিও প্রকাশিত হয়। যদিও সার্বক্ষণিক কোনো ক্রীড়া বিষয়ক আলোকচিত্রী ছিল না। পত্রিকায় ১/২জন যে আলোকচিত্রী থাকতেন, তাঁরাই হতেন সকলের কাজের কাজী। ষাট দশকের মাঝামাঝি দৈনিক পাকিস্তান প্রকাশের পর বাংলা পত্রিকায় অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে খেলাধুলা। সেই সঙ্গে দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক জনপদ এগিয়ে আসে।
স্বাধীনতার পর ক্রীড়া সাংবাদিকতায় মৌলিক একটা পরিবর্তন আসে। যদিও নিদিষ্ট সংখ্যক পত্রিকায় অল্প কয়েক জন ক্রীড়া সাংবাদিক দীর্ঘ দিন সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যে কারণে খুব একটা বৈচিত্র্য ছিল না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কারো কারো উদ্যোগ ও উৎসাহ নজর কাড়তে সক্ষম হয়। পাশাপাশি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্রিকাগুলোও ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকা। তবে আশির দশক থেকে লেখালেখির ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।        
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় দুটি ধারা বরাবরই ছিল। কেউ কেউ এটাকে নিয়েছিলেন পেশা হিসেবে। আবার কারো কারো কাছে এটি ছিল নিছক শখ। অন্য পেশার পাশাপাশি সন্ধ্যার পর ঢাকা স্টেডিয়ামে কিছু সময়ের জন্য ঢু মারতেন। আবার বিনা পয়সায় খেলা দেখতে পারবেন, সেই প্রলোভনেও নাম লেখাতেন ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে। নব্বই দশকেও দেখতে হয়েছে প্রেস রিলিজ সাংবাদিকতা। কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলে সেই ফেডারেশনের প্রেস রিলিজের জন্য অন্তহীন অপেক্ষা। কোনো কারণে প্রেস রিলিজ না পেলে কিংবা প্রেস রিলিজের সংখ্যা কম হলে অনেকেই হাপিত্যেশ করতেন। কীভাবে পৃষ্ঠা ভর্তি করা যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন। এখনও সে ধারা একেবারেই বিলীন হয়ে যায় নি। অনেক মিডিয়ায় কম টাকায় সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ইদানিং ক্রীড়া সাংবাদিকতায় যোগ দিচ্ছেন মেধাবারী। ক্রীড়ালেখনির একটি শক্তিশালী ধারাও রয়েছে। যাঁরা খেলাকে সাহিত্য রসে সিঞ্চিত করে পাঠকদের মুগ্ধ করে যাচ্ছেন।
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর একটা পালাবদল ঘটে। সংবাদপত্র প্রকাশের কঠিন যে বিধি-নিষেধ ছিল তা শিথিল হয়। এরফলে নিত্য-নতুন যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতেও পরিবর্তন আসে। দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুনত্বের একটা ছোঁয়া লাগে। লিটার‌্যালি জার্নালিজমের যে ধারাটা অনুসরণ করা হয়, কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার, আজকাল পত্রিকা আগেই তা প্রচলন করে। প্রতিবেশী রাজ্যের পত্রিকায় রিপোর্টে যতটা না তথ্য থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে গল্প। সে দিক থেকে ব্যতিক্রম আজকের কাগজ এবং পরবর্তীকালে এ ধারার পত্রিকাগুলো। সাহিত্য রস থাকলেও তাতে তথ্যও থাকে। নতুন ধারার এ ক্রীড়া সাংবাদিকতা পাঠকরাও লুফে নেন।
তবে এক একটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করেও আবর্তিত হয়েছে ক্রীড়া সাংবাদিকতা। তৈরি হয়েছে নিজস্ব ঘরানা। সময়ের পরিক্রমায় সংবাদপত্রে খেলার পৃষ্ঠা বেড়েছে। কোনো কোনো পত্রিকায় তো রয়েছে চার পৃষ্ঠাও। আগে সংবাদপত্রে ক্রীড়া সাংবাদিকদের খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। হারাধনের দশটি ছেলের অনাদৃত একটি ছেলে হয়ে থাকতো হতো। কেউ খোঁজ নিতে চাইতো না। এখন ক্রীড়া সাংবাদিকদের সম্মান বেড়েছে। বেড়েছে বিত্ত-বৈভব। প্রথম পার্ট টাইম স্পোর্টস রিপোর্টার যেখানে ৫০ রূপি পেতেন, এখন কোনো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক যে সুযোগ-সুবিধা পান, তা রীতিমতো ঈর্ষাণীয়। ক্রীড়া সাংবাদিক ছাড়া কোনো মিডিয়া এখন ভাবাই যায় না। আগে যেখানে এক-আধজন ক্রীড়া সাংবাদিক দিয়ে কাজ চালানো হতো, এখন দৈনিক প্রথম আলোতে ১৩ ও একাত্তর টিভিতে ১৪ জন কর্মরত আছেন। আশঙ্কাজনক হলো, সংবাদপত্রের সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভির ব্যাপক প্রসার ঘটায় প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিকভাবে সংবাদপত্রের এখন আগের মতো কদর নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি অনেকটাই উপেক্ষিত। বিশ্বব্যাপী চলছে প্রিন্ট মিডিয়ার মন্দা। অনেক বনেদি পত্রিকা হয় বন্ধ নতুবা ইন্টারনেট সংস্করণ বের হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফেসবুক, টুইটারের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে সংবাদপত্রকে। ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। পাঠক কমছে। বাধ্য হয়ে সংবাদপত্রগুলোও অনলাইনে ঝুঁকছে।
প্রিন্ট ও টেলিভিশনের পাশাপাশি বেতার সাংবাদিকতাও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বেতার সম্প্রচার শুরু হয়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বেতারে কোনো কোনো খেলা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ বেতার ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হাল আমলে নতুন মেজাজের বেতারে ক্রীড়া সাংবাদিকতা আলাদা একটি স্থান করে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে টেলিভিশন। মার্কিন এক গবেষণায় জানা যায়, মানুষ যা পড়ে তার ১০ শতাংশ মনে রাখে আর যা দেখে তার ৩০ শতাংশ মনে থাকে। এ থেকে টিভির গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, সংবাদপত্র পড়তে হলে শিক্ষিত হতে হয়। টিভি দেখতে হলে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। টিভি এমন একটি মাধ্যম, যা সহজেই দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে। বাইরের পৃথিবীকে দেখার জন্য টিভি খোলা জানালার মতো। এ জানালা দিয়ে কোথায় কী ঘটছে, তা আমরা জানতে পারি। দেখতে পারি। এর মাধ্যমে ক্রীড়া সাংবাদিকরা ক্রীড়াঙ্গনকে এনে দিচ্ছেন হাতের মুঠোয়।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে নিতে পেরেছে। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় ‘পাকিস্তান টেলিভিশন’-এর সম্প্রচার শুরু হয়। ১৯৮০ সালে শুরু হয় বিটিভির রঙিন সম্প্রচার। একক টিভি হিসেবে দীর্ঘ দিন আধিপত্য বিস্তার করেছে বিটিভি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইভেন্ট সম্প্রচারের কৃতিত্ব বিটিভির। বেতবুনিয়ার ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশের দর্শকরা প্রত্যক্ষ করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল, বক্সার মুহাম্মদ আলীর প্রজাপতি নৃত্য ইত্যাদি। দেশীয় ফুটবলের অনেক ম্যাচও সম্প্রচার করেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে ক্রীড়া সাংবাদিকতার সরাসরি ভূমিকা ছিল না। তবে অবদান রেখেছেন ক্রীড়া ধারাভাষ্যকাররা। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক।
নব্বই দশকের মাঝমাঝি নতুন যুগের সূচনা হয় স্যাটেলাইট টিভির। প্রথম প্রতিষ্ঠিত স্যাটেলাইট টিভি হিসেবে ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই যাত্রা শুরু করে ‘এটিএন বাংলা’। ১৯৯৯ সালে এটি অ্যানালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তর হয়। বিটিভির পর ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল প্রাইভেট টেরিষ্টিয়াল চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে একুশে টেলিভিশন অর্থাৎ ইটিভি। দেশে বর্তমানে স্যাটেলাইট টিভিগুলো যে ধারায় সংবাদ পরিবেশন করে, তার পথিকৃৎ একুশে টিভি। আর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারাও বদলে দেয় একুশে টিভি। এরপর তো চ্যানেলের ঢল নেমেছে। প্রতিনিয়ত নিত্য-নতুন চ্যানেল আত্মপ্রকাশ করছে।
স্পোর্টস আর স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল যেন একে অপরের পরিপূরক। শুরু থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে চ্যানেলগুলো। এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আজ যে জমজমাট অবস্থা, তার পেছনে রয়েছে চ্যানেলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অতীতে খেলাধুলা আটকে ছিল একটা নির্দিষ্ট বৃত্তে। সেটাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে এসেছে চ্যানেলগুলো। খেলাধুলা এমন একটি বিনোদন, যা মানুষের মনকে প্রসারিত করতে পারে। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ খেলাকে ভালোবাসেন। খেলাধুলার খোঁজ-খবর রাখেন। চ্যানেলগুলো ক্রীড়াপ্রেমী এই দর্শকদের কাছে খেলাধুলাকে সহজেই পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের মাধ্যমে পাওয়া যায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের সর্বশেষ খবর। প্রায় সব রকম খেলার খবর দিচ্ছে কিংবা সরাসরি সম্প্রচার করছে। সেটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন। একজন ক্রীড়াবিদ যত না দেশে খেলতে যান, তার চেয়ে বেশি দেশে কাভার করতে যান অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের উপস্থিতি থাকে বেশি। এমনকি যে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশ গ্রহণ থাকে না, সেখানেও ক্রীড়া সাংবাদিকরা পৌঁছে যান।  


অনলাইন সাংবাদিকতা যেভাবে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, আগামীর মিডিয়া মূলত নিয়ন্ত্রণ করবে এই মাধ্যমটি। ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য এটি এসেছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। আগে কাগজ আর একটি কলম ছিল ক্রীড়া সাংবাদিকদের সম্বল। প্রযুক্তির এ যুগে কাগজ-কলম অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। কী বোর্ডের সঙ্গে আঙুলের খেলা তো আছেই, সেইসঙ্গে নতুন অনেক কিছু রপ্ত করতে হচ্ছে। আর ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার সাংবাদিক হলে তাকে রীতিমতো প্রকৌশলী হয়ে ওঠতে হয়। প্রিন্ট মিডিয়া যেভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াকেও নিরাপদ ভাবার সুযোগ নেই। প্রযুক্তি যেভাবে হাতের মুঠোয় সব কিছু এনে দিচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতের ইলেকট্রোনিক মিডিয়াও বড় ধরনের পরিবর্তন আসার লক্ষণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। প্রযুক্তি যতই অত্যাধুনিক হয়ে ওঠছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করে চলেছেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। আর এভাবেই এগিয়ে চলেছে ক্রীড়া সাংবাদিকতার বর্ণিল ধারা। আর তাতে সমৃদ্ধ হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গন।          

    

রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৬

বুকের মধ্যে অনুরণিত হয় তাঁর কবিতা

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই। তারপরও কেন জানি বুকের মধ্যে একটা শূন্য শূন্য অনুভূতি হচ্ছে। সেটা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছি। কেন হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। আসলে শৈশব থেকে আমার চারপাশের যে জগত গড়ে ওঠেছে, তারমধ্যে আছেন তিনি। তাঁর নাম, তাঁর লেখা, তাঁর সৃষ্টিকর্ম হৃদয়ের গহিনে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁকে কখনো দূরের মনে হয়নি। তাঁর সব লেখাই যে আমি পড়েছি, তেমন দাবি করবো না। তবে উল্লেখযোগ্য বইগুলো পড়েছি, ছুঁয়েছি কিংবা নাম শুনেছি। ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ পড়ে তেমন একটি জীবনের স্বপ্ন দেখেছি। তাঁর লেখা কত কত কবিতা বুকের মধ্যে এনে দিয়েছে রোমান্টিক আমেজ। তাঁর জীবনের প্রকাশিত অনেক কাহিনীও তো জানা। বাউন্ডুলে, বেপরোয়া, বর্ণময় জীবন। জানতে পেরেছি কখনো তাঁর স্মৃতিচারণায়, কখনো তাঁর চেনা মানুষদের লেখায়। পত্রিকার পাতায় পড়েছি কিংবা টেলিভিশনেও দেখেছি। বাংলাদেশেও তো তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। এই মাটিরই সন্তান তিনি। সেটা কখনো ভুলতে পারেননি। তাঁর লেখায়ও এর প্রতিফলন দেখা যেত। বিশেষ করে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে তো জড়িয়ে আছে এই বাংলার মাটি ও মানুষ। সব মিলিয়ে তাঁকে পরিচিত গণ্ডির একজনই মনে হতো। শুধু তাই নয়, মনের মধ্যে একটা ছাপও ফেলে দিয়েছেন তিনি। চারপাশে কত জনকে চিনি, কত জনকে দেখি, তাদের ক’জনইবা মনে দাগ কাটেন কিংবা হৃদয়ে স্থায়ী আসন গাড়েন? তিনি তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সেটা পেরেছিলেন। এ কারণে তার সঙ্গে পরিচয় কিংবা দেখা-সাক্ষাৎ না থাকলেও তিনি আমার আপন বলয়েরই লোক হয়ে আছেন। এমন একজন মানুষ চলে গেলে কাছের কেউ চলে যাওয়ারই অনুভূতি হয়। সেটাই হচ্ছে। ছোট হয়ে গেল আমার জগতটাও। তাঁকে ছাড়া পূজা সংখ্যা কল্পনা করা যায় না। এই তো সেদিনও তাঁর লেখা পড়লাম। তাঁর আর নতুন লেখা পাবো না, ভাবতেই পারছি না। তবে তিনি চলে গেলেও আশে-পাশেই থাকবে তাঁর কালজয়ী সব গ্রন্থ। বুকের মধ্যে অনুরণিত হবে তাঁর কবিতা। সঙ্গত কারণে থাকবেন তিনিও।  

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে?

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা রঙ ছিল ফাল্গুনি হাওয়াতে সব ভালো লাগছিল চন্দ্রিমায় খুব কাছে তোমাকে পাওয়াতে। মন খুশি উর্বশী সেই রাতে সুর ছিল গান ছিল এই প্রাণে ঐ দুটি হাত ছিল এই হাতে কি কথা বলছিলে মন জানে সব ভালো লাগছিল তুমি ছিলে তাই মন ছিল মনেরই ছায়াতে। রাত আসে রাত চলে যায় দূরে সেই স্মৃতি ভুলতে কি আজ পারি পুরানো দিন আছে মন জুড়ে ভালোবাসা হয়েছে ভিখারি ধূপকাঠি মন জ্বলে একা একা তাই সেই তুমি নেই তুমি নেই সাথে। আসলেই কি সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল? ঠিক মনে নেই। কিছুই মনে রাখতে পারি না। দিন-তারিখ তো মনে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। তবে বিশেষ সেই রাতের কথা কখনই ভুলতে পারা যায় না। পারা সম্ভব নয়। সেই রাতে পূর্ণিমা না থাকলেও বুকের মধ্যে ছিল অমল-ধবল জোছনা। আর এ জোছনায় ভেসে গিয়েছিলাম। পেয়েছিলাম টক-ঝাল-মিষ্টি রাত। কোনো আগল ছিল না। কোনো বাঁধন ছিল না। কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না। এমন রাত জীবনে আর কখনো আসে নি। কি যে আনন্দময় রাত! কি যে উন্মদনাময় রাত! কি যে মাতাল করা রাত! বৃষ্টির ছোঁয়ায় রাতটা আরো মধুর হয়ে ওঠে। ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হলো শেষ/ভুবনজুড়ে রইলো লেগে আনন্দ-আবেশ’। এমন আনন্দ-আবেশে বুঝে কিংবা না বুঝে হারিয়ে যায় হুঁশজ্ঞান। তারপর আর কিছু জানা নেই। আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে? আমার তো কল্পনার শেষ নেই। জেগে জেগে কত না স্বপ্ন দেখি। এও কি তেমন কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন? কিশোর কুমারের গানের মতো একটি রাতের অপেক্ষায় থাকার চেয়ে মধুর স্বপ্ন আর কি হতে পারে? (আজ কিন্তু জোছনা ভেজা রাত। এমন মায়াবী জোছনায় বেগম আখতারের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমান, জোছনা করেছে আড়ি/আসে না আমার বাড়ি/গলি দিয়ে চলে যায়/লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি/চেয়ে চেয়ে পথ তারই/হিয়া মোর হয় ভারী/রুপের মধুর মোহ/বলো না কী করে ছাড়ি।) ১৮-৪-২০১৬

রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

স্মৃতিরা একদমই হারিয়ে যায় না

স্মৃতিরা বড় অদ্ভুত। বড় রহস্যময়। প্রতারকও। এর কোনও থৈ পাওয়া যায় না। দেখা গেল, অল্প সময়ের আগের স্মৃতি খুব দ্রুত হারিয়ে যায়। অনেক চেষ্টা করেও উদ্ধার করা যায় না। পাওয়া যায় না তার ঠিকুজি। আবার এমন সব বিষয় ফিরে আসে, যা মনে থাকার কথা নয়। হয়তো অতীতের কোন গহনে ঘাপটি মেরে ছিল। তবুও বিস্ময়করভাবে মনে পড়ে যায়। অবাক করা ব্যাপার হলো, মধুর স্মৃতিরা হারিয়ে যেতে বেশি সময় নেয় না। অথচ অনেক অপমান, অনেক কষ্ট, অনেক বেদনার স্মৃতি মন থেকে উপড়ে ফেলতে চাইলেও মুছে ফেলা যায় না। আর আমার স্মৃতিশক্তি তো মাশাল্লাহ ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’। বলতে গেলে কোনও স্মৃতিই জমা হয় না। এ কারণে মাথাটা ফুটো কলসের মতো খালি পড়ে থাকে। কোনও কাজে আসে না। মাঝে মাঝে স্মৃতির তরণি বেয়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে শৈশবে। কেমন ছিল আমার সেই দিনগুলো? হায়! অনেক মাথা খোড়ার পর মনে হয়, আমার বোধহয় কোনও শৈশব ছিল না! না হলে কোনও স্মৃতি কেন মনে পড়ে না? হাল ছেড়ে দিয়ে অসহায়ভাবে বসে থাকি চুপচাপ। যখন স্মৃতি নিয়ে কোনও নাড়াচাড়া করাই ছেড়ে দেই, তখন দেখি, ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মতো কী যেন ভেসে আসছে। তবে সেটা বাস্তব নয়। কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন। কেবলই দেখতে পাই ছায়া ছায়া একটি দৃশ্যপট, একটা শিশু তরোয়াল নিয়ে লড়াই করছে। ভয়ঙ্কর সব সাপ ছুটছে। সেই সঙ্গে একটা উর্দু গানের সুর। গানের লাইনটা বোধকরি এমন, ‘পিয়ারি মা দোয়া করো/ম্যায় জলদ বড়া হো যাউ’। লাইনটা ঠিক লিখলাম কিনা জানি না। আমার জীবনে উর্দু ভাষায় এ একটি লাইনই সম্বল। স্মৃতিতে কুয়াশার মতো জমে থাকা এ লাইনটি ছাড়া আর কিছু মনে করতে পারি না। জোড়াতালি দিয়ে বুঝতে পারি, এটি কোনও উর্দু সিনেমার দৃশ্য ও গান। এই সিনেমাটা কোথায় দেখেছিলাম, আমি নিশ্চিত নই। তবে একটু একটু মনে পড়ে, তখন বোধহয় থাকি মতিঝিল কলোনিতে। সেই সময় বিনোদন বলতে ছিল সিনেমা দেখা।


বাসার কাছে ‘জোনাকী হল’। বড়দের সঙ্গে যেতাম আমিও। আমার তো টিকিট লাগতো না। মা কিংবা অন্য কারও কোলে বসে দেখতাম। কিছু বোঝার কথা নয়। কোনও কিছু মনে থাকারও কথা নয়। কিন্তু স্মৃতির খামখেয়ালি আমাকে মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তান জমানায় আমার জন্ম। তাছাড়া চলচ্চিত্র যে অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম, সেটা অনুভব করতে পারি। নিজের শৈশবের স্মৃতি খুঁজে পাই না। কিন্তু মা কিংবা কোনও আত্মীয়র কোলে বসে দেখা সিনেমার খণ্ড খণ্ড দৃশ্য কেন যেন মনে পড়ে যায়। নিশ্চয়ই রুপালি পর্দায় তরোয়াল, সাপ, গানের মানুষদের চলমানতা আমার শিশু মনে বিস্ময় হয়ে এসেছিল। এ কারণে হয়তো বুকের ভিতরে আঁচড়ও কেটেছিল। মনে পড়ে যায়, উর্দু থেকে থেকে বাংলায় করা ‘তালাশ’ ছবির কথা। শবনম, রহমান, সুভাষ দত্ত অভিনীত এই ছবির তেমন কিছু মনে নেই। কিন্তু ছবির একাধিক গানের কিছু কিছু লাইন হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘তুমি আছো আমি আছি এ রঙিন ক্ষণে/কত সুন্দর এ রাত যে/ও মাশাল্লাহ কী বরাত যে’, ‘মওসুম রঙ্গিলা সোনালি হাওয়া/এ সময় মন হায় কেড়ে নিল কে’, ‘আমি রিক্সাওয়ালা মাতওয়ালা’। এই গানগুলোর উর্দু সংস্করণও কানে বেজেছে। অবশ্য পুরনো ঢাকায় থাকার সময় একটি গান মাইকে হররোজ বাজতো, ‘হো লাল মেরি রাখিও বালা ঝুলে লালরে/সিন্দিরিদা দেবর দা সাকি সাবাস কালান্দার/দমাদম মাস্ত কালান্দার আলীদা বম্বে আন্দার/দমাদম মাস্ত কালান্দার আলীদা প্যায়লা নাম্বার’। এ গানের শিল্পী কে ছিল, এটা কী ধরনের গান, কিছুই জানতাম না। পরবর্তীতে রুনা লায়লার কণ্ঠে এ কাওয়ালি গানটি শুনেছি। তবে এই গানের অর্থ এখনও জানি না। এছাড়াও আরও কিছু উর্দু গান কর্ণগোচর হয়েছে। একটু একটু করে সুর ভাসে। কিন্তু গানের কলি মনে পড়ে না। তবে যে গানগুলোর কথা উল্লেখ করলাম, কোনটা আগে, কোনটা পরে শুনেছি, সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। স্মৃতির ধূসর পাতায় দিন-তারিখ দিয়ে তো দিনলিপি জমা থাকে না। কেন যে থাকে না! এখানে এসে মনে হচ্ছে, স্মৃতিরা আমার সঙ্গে বেশ প্রতারণা করছে। আমি ভজকট পাকিয়ে ফেলছি। এখন স্মরণ হচ্ছে, আমরা তো পুরনো ঢাকায় আগে ছিলাম। তারপর না ছিলাম মতিঝিলে। তাহলে আমার প্রথম স্মৃতি কোনটি? তারপরও কথা থেকে যায়। ১৯৭৫ সালের শেষদিকে রেডিওতে ফিরে এসেছিল উর্দু গান। আমি সময়ের হিসেব গুলিয়ে ফেলছি নাতো? যাহোক, টুকরো টুকরো এই স্মৃতিগুলো মনে করিয়ে দেয়, আমরা ‘পরাধীন’ একটি দেশে থাকতাম। যেখানে ছিল উর্দু ভাষার দাপট। ভাষাও যে এক ধরনের সম্প্রসারণবাদের কাজ করে, সেটা তো এখন বুঝতে পারি। হিন্দির আগ্রাসনে কলকাতায় বাংলা ভাষা আজ অনেকটাই পর্যুদস্ত। যদি বাংলাদেশ না পেতাম, তাহলে আমাদের হয়তো আধা উর্দু আর আধা বাংলার সংমিশ্রণে এক জগাখিচুড়ি ভাষায় অভ্যস্ত হতে হতো। স্মৃতির পাতায় ভর করে দেখি জেগে ওঠেছে জাতীয়তাবাদী চেতনাও। অবশ্য স্মৃতিই তো গড়ে তোলে একজন মানুষের মানসভুবন। তাই বোধকরি স্মৃতিরা একদমই হারিয়ে যায় না। কোনও না কোনওভাবে ফিরে ফিরে আসে।

বুধবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

শুধু তোমাকে

স্মৃতি থেকে সবটাই কি হারিয়ে যায়? আমি ঠিক জানি না। তবে কিছু কিছু স্মৃতি হারিয়ে যেতে যেতে আবার বোধকরি ফিরেও আসে। অন্তত প্রতিটি প্রজন্মের স্মৃতিতে তার সময়ের একটা ছাপ থেকেই যায়। নিজের সময়টাকে সবার কাছেই অত্যন্ত তাৎপর্যময় মনে হয়। মনে হয় অনেক রঙিন। অনেক বর্ণিল। অনেক মাদকতাময়। অন্য সময়ের মানুষের কাছে হয়তো সেটা তেমন গুরুত্ব পায় না। এটাই স্বাভাবিক। এভাবেই তো পেরিয়ে যাচ্ছে জীবন। তবে চিরকালীন যে বিষয়গুলো আছে, তা সব সময়ই বরিত হয়ে আসছে। কম কিংবা বেশি। তবে সময়ের পালাবদলে বাড়ে বৈভব। বাড়ে বৈচিত্র্য। আজ পয়লা ফাল্গুন। চারপাশটা কেমন রঙিন হয়ে ওঠে। হলুদ, লাল, সবুজের বাহারি সাজ আর বাসন্তী হাওয়ায় মনের মধ্যে গেয়ে ওঠে দুষ্টু কোকিল। তাতে টোকা পড়ে হৃদয়ের গহিনে। হঠাৎ কেন জানি বুকের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে গুঞ্জন তুলতে থাকে স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া আমাদের সময়ের কিছু গানের কলি। ধরি ধরি করেও ঠিকমতো ধরতে পারছিলাম না। কেমন যেন অস্পষ্ট হয়ে গেছে। সুরটা আলতোভাবে অনুরণন তুললেও কোথাও যেন একটা গ্যাপ থেকে যাচ্ছিল। অনেকক্ষণ মনের মধ্যে মেঘ আর রোদের মতো লুকোচুরি খেলার পর একে একে মনে পড়তে থাকে স্মৃতিময় সেই গানের কলিগুলো, ‘এক ডালি ফুল তোমার হাতে দিয়ে আমি বলেছিলাম ভালোবাসি ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি শুধু তোমাকে শুধু তোমাকে শুধু তোমাকে।’ ‘ভালোবাসা যদি তুমি নাইবা দিলে এতটুকু ব্যথা ওগো দিয়ে যাও মোরে।’ ‘চলেই যদি যাবে তুমি তবে, এসেছিল কেন আমারই অন্তরে।’ ‘আমি তোমাকে ভালোবেসেছি তুমি আমাকে ভুলে যেও না।’ ‘যাই বলে যেতে নাইরে আরেকটু বসে যা নারে।’ ‘এই তো সেদিন তুমি ছিলে আমারই হৃদয়জুড়ে জানি না কীসের আসায় গেলে চলে মনের দেওয়ালে আজও পড়ে তোমারই ছায়া তাইতো লাগে আজও এত বেশি মায়া এইভাবে দিন যদি যায় চলে স্মৃতির মালা গেঁথে গেঁথে তবে রবে না কোনই ব্যথা এ মনেরও মাঝেতে।’


 জুয়েলের গাওয়া এই গানগুলো এখন আর শোনা যায় না। শিল্পীও এখন অনেকটাই বিস্মৃত। আমাদের প্রজন্মের কারও কারও স্মৃতিতে হয়তো হঠাৎ হঠাৎ ভেসে ওঠেন। অথচ একটা সময় তাঁর গানগুলো ছিল তরুণদের মুখে মুখে। ক্যাসেট প্লেয়ারে কোথাও না কোথাও এই গানগুলো হরদম বাজতো। আশির দশকের শুরুর দিকে আমরা যখন কলেজে পড়ি, তখন স্বভাবতই মনটা ছিল উড়ৃ উড়ৃ, সেই সময় তাঁর গানগুলো আমাদের ভালোবাসার গান হয়ে ওঠে। তখন তো ভালোবাসা এখনকার মতো এত সুলভ ছিল না, এই ধরনের গানেই আমার পেতাম ভালোবাসার সুখ। ভালোবাসার দুখ। এই শিল্পী খুব অল্প বয়সেই জয় করে নেন আমাদের মতো তরুণদের হৃদয়। তাঁর গানে ছিল ভালোবাসার তুমুল আকুতি আর না পাওয়ার তীব্র বেদনা। তখন তো আর আমাদের দেশে ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’ উদযাপিত হতো না। হলে তাঁর গানগুলো হতে পারতো এই দিনটির অন্যতম অনুষঙ্গ। ভালোবাসার মানুষের হাতে এক ডালি ফুল তুলে দিয়ে বলা যেত, ভালোবাসি সবচেয়ে বেশি, শুধু তোমাকে। তবে শিল্পী পেয়েছিলেন অনেক তরুণ-তরুণীর ভালোবাসা। হৃদয়ের নৈবেদ্য। কিন্তু নিজেকে পরিপূর্ণভাবে মেলে ধরার আগেই একবুক ভালোবাসা নিয়ে একদমই অকালে ঝরে যান প্রতিভাবান এই শিল্পী। চলে গিয়েও তিনি রয়ে গেছেন আমাদের স্মৃতিতে। আমাদের অন্তরে। আমাদের ভালোবাসায়।

 (জাহিদুল ইসলাম জুয়েল। জন্ম : ২৩ জানুয়ারি ১৯৬৫। মৃত্যু : ১৪ জানুয়ারি ১৯৮৫। তাঁর প্রথম ক্যাসেট বাজারে আসে ১৯৮৩ সালে।)

সোমবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৩

আবাহন, আবিদ আজাদ এবং অন্যান্য

সে এক শ্বাসরুদ্ধকর সময়। সামরিক শাসনে নিেস্পষিত দেশের মানুষ। দম বন্ধ করা এমন এক পরিবেশে মুক্ত হাওয়ায় শ্বাস নেয়ার জন্য মানুষ ছটফট করতে থাকে। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সৃজনশীল নানা কাজে প্রতিবাদের একটি প্রছন্ন সুর। টিএসসি চত্বর আর বাংলা একাডেমির বইমেলায় দ্রোহের আগুনে ফুটতে থাকে প্রতিবাদী তারুণ্য। লিটল ম্যাগাজিনেও লেগেছে আগুনের হল্কা। বুকের মাঝে জ্বলে ওঠা ক্ষোভের আগুন অস্তমিত করার সৃজনশীল মাধ্যম হয়ে উঠেছে লিটল ম্যাগাজিন। এরশাদীয় শাসনামলের শুরুর দিকে কলেজের ছাত্র হলেও পড়ালেখার দিকে খুব একটা মন নেই। দুর্বৃত্ত সময়ের পাঁকে হাবুডুবু খেতে থাকে আমাদের তারুণ্য। আর এ থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে থাকি আমরা। ঢাকার শের-এ-বাংলা নগর এলাকাটা নিরুপদ্রব হলেও লিটল ম্যাগাজিনের একটা হাওয়া আমাদেরও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। আমাদের বুকের মাঝেও তখন ক্ষোভ, যন্ত্রণা, ঘৃণা এবং সবকিছু ভেঙ্গেচুরে নতুন কিছু গড়ার স্বপ্ন। আর এ সবকিছু শিল্পিতভাবে প্রকাশের জন্য বেছেনেই লিটল ম্যাগাজিনকে। কোনো কিছু না জেনেই সাহিত্য সংকলন বের করার জন্য বন্ধুদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কোনো লেখককেই বলতে গেলে চিনি না। কোনো বিজ্ঞাপনদাতার সঙ্গেও পরিচয় নেই। পত্রিকা কীভাবে ছাপা হয়, তাও জানি না। কিন্তু তাতেও কমতি নেই উৎসাহের। যেভাবেই হোক, সাহিত্য সংকলন বের করতে হবে। মনোভাবটা এমন, এ সংকলন বের না হলে বাংলা সাহিত্যের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। জেনে-শুনে তো বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হতে দিতে পারি না! সে সময় পত্র-পত্রিকায় যারা নিয়মিত লেখালেখি করতেন, লেখার জন্য একে একে তাঁদের ডেরায় হানা দিতে থাকি। লেখার সঙ্গে পরিচিত থাকায় লেখকরা তখন আমাদের কাছে স্বপ্নলোকের মানুষ। পরম বিস্ময় নিয়ে প্রতিদিনই কোনো না কোনো লেখকের সঙ্গে পরিচয় হতে থাকে। কারো কারো কথায় উৎসাহিত হলেও আবার কারো কারো ব্যবহারে ক্ষুব্ধ হই। তবে নিরুৎসাহিত হই না।

এমনিভাবে সম্ভবত বাংলা একাডেমির আঙ্গিনায় পরিচয় কবি আবিদ আজাদের সঙ্গে। চোখে-মুখে একটা ভাবালুতা। উৎকণ্ঠা বা বিষাদের ছায়াও কি দেখেছিলাম? মুখে পান। একজন আধুনিক কবির মুখে পান! ফর্সা মুখে ঠোঁট দুটো রক্তিম হয়ে আছে। কথার মাঝে হালকা বাবরি চুলে কিছুক্ষণ পর পর হাত দিয়ে ব্রাশ করতে থাকেন। কথা বলেন মৃদুস্বরে। সবকিছুতেই একটা কবিসুলভ অভিব্যক্তি। তখন তিনি কবি এবং রেডিও বাংলাদেশের ‘উত্তরণ’ অনুষ্ঠানের গ্রন্থনা করার জন্য খ্যাতিমান। তাঁর কাছে কবিতা চাওয়ার পর তিনি জানতে চাইলেন সংকলনটি কোথা থেকে ছাপাবো? জানালাম, আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। লেখা ও বিজ্ঞাপন পাওয়ার পর সবকিছু ঠিক করবো। তিনি জানালেন, শেখ সাহেব বাজারে তাঁর একটি প্রেস আছে। ঠিকানা দিয়ে যোগাযোগ করতে বললেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলে সংকলন প্রকাশ করার ব্যাপারে অনেকখানি আশ্বস্ত হলাম। একজন প্রেস মালিক সর্বোপরি নামজাদা একজন কবির সহযোগিতা পাওয়া যাবে জেনে আমরা উৎসাহে টগবগিয়ে ফুটতে থাকি। এরপর তাঁর ‘শিল্পতরু’ প্রেসে ঢুঁ মারার পর জীবনের অনেকগুলো দিন অন্যরকমভাবে কেটে যায়। ৯৮ নবাবগঞ্জে কবি আবিদ আজাদের ঢিমে-তেতলা তালে চলা প্রেসটি তখন অনেক তরুণ লেখকের আড্ডাস্থল হয়ে ওঠে। তাঁর সম্পাদিত ‘কবি’ নামে একটি সাহিত্য সংকলন তখন নিয়মিত প্রকাশিত হয়। এ সংকলনে লেখা ছাপা এবং শিল্পতরু প্রকাশনী থেকে প্রথম বই প্রকাশের আশায় তরুণ লেখকরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন। প্রকাশের সৃষ্টিশীল যন্ত্রণায় অনেক তরুণকে তখন ছটফট করতে দেখতাম। সে সময় লিটল ম্যাগাজিন ছাড়া তরুণ লেখকদের লেখা প্রকাশের ক্ষেত্র ছিল খুবই সীমিত। কবি আবিদ আজাদ তাদের কাছে ছিলেন পরম আশ্রয়। তখন দেখা উঠতি অনেক লেখকের মুখ দু’দশকের ব্যবধানে অনেকটাই ঝাপসা হয়ে গেছে। তবে কবি রিফাত চৌধুরী, রাজু আলাউদ্দিন, কাজল শাহনেওয়াজের কথা এখনো মনে পড়ে। আর কেউ না থাকলেও রিফাত চৌধুরীকে পাওয়া যেতোই। কবি আবিদ আজাদের অনুপস্থিতিতে প্রেসের দেখাশোনা অনেকটা অলিখিতভাবে রিফাত চৌধুরীই করতেন। দরবেশ দরবেশ চেহারার রিফাত চৌধুরীকে এখন টেলিভিশনের বিভিন্ন নাটকে দেখা যায়। কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ আসতেন তাঁর গ্রন্থের প্রুফ দেখতে। সে সময় তাঁর মাছ সিরিজবিষয়ক নিরীক্ষাধর্মী একটি কবিতার বই প্রকাশের তোড়জোড় চলছে। তাঁর মাছের ভাগ আমরা আমাদের সংকলনের জন্যও পেয়ে যাই। লেখক না হয়েও কবি আবিদ আজাদের সান্নিধ্যে একটা কাব্যময় পরিবেশের প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ি। সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ ঢিলে হয়ে পড়লেও প্রতিদিনই কী এক মোহে ছুটে যাই শেখ সাহেব বাজারে। ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় কবি আবিদ আজাদের সঙ্গে। এই মেধাবী কবি তখন জীবন সংগ্রামে লিপ্ত। ছোট্ট একটি ঘরে নিজের প্রেসটি মোটেও রমরমা নয়। সময়টা লেটার প্রেসের। সীসার টাইপ আর ট্রেডল মেশিনে ছাপা হতো। বোধহয় দু’জন কর্মচারী ছিল। কাজের তেমন চাপ নেই। টুকটাক কাজ। অধিকাংশই শিল্পতরু প্রকাশনীর। অখ্যাত কিংবা গুরুত্বহীন কোনো কোনো লেখকের গ্রন্থও প্রকাশ হতে দেখেছি। গ্রাসাচ্ছেদন করার জন্য লেখককে বাধ্য হয়ে নানা জায়গায় ছুটতে হয়। কেন জানি না, ধীরে ধীরে আমিও লেখকের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে যাই। কখনো সোনালী ব্যাংকে রম্যলেখক লুৎফর রহমান সরকারের কাছে, কখনো অগ্রণী ব্যাংকে সাহিত্য-সমালোচক নূরুল করিম খসরু, কখনো বেইলি রোডে রেডিও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কবি মুস্তফা আনোয়ারের কাছে, কখনো দৈনিক বাংলায় কবি আহসান হাবীব, মাঝে মধ্যে কবি শামসুর রাহমান, কখনো নবারুণ ও সচিত্র বাংলাদেশে কবি আবদুস সাত্তার ও কে. জি. মোস্তফার কাছে এবং প্রায়শই জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে শিল্পী আবদুর রৌউফ সরকারের কাছে। এ রকম কতজনের কাছেই যে যেতেন। সারাদিন নানা জায়গায় ছোটাছুটি করতে করতে তাঁর বেলা কেটে যেত। কত দুপুর যে না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। আর প্রতিদিনের গন্তব্য ছিল আগারগাঁওয়ের রেডিও বাংলাদেশ। রেডিওতে দীর্ঘদিন যাবৎ নিয়মিত স্ক্রিপ্ট লিখতেন। সম্ভবত এটা ছিল তাঁর নিয়মিত আয়ের উৎস। রিকশায় চড়তে খুব পছন্দ করতেন। সাধারণত সর্বত্রই ছোটাছুটি করতেন রিকশায়। নানা কোলাহলের মাঝে রিকশা জার্নির সময় খুঁজে নিতেন নির্জনতা। এ সময় তিনি ডুব দিতেন মনের মাঝারে। তাঁকে দেখলে মনে হতো সারাক্ষণ কবিতায় মশগুল। ভেতরে ভেতরে বুঝিবা শব্দের খেলায় মেতে থাকতেন। কখনো সখনো আনমনে উচ্চারণ করতেন মনে মনে সাজানো নতুন কবিতার দু’একটি পঙ্ক্তি। মাঝে মাঝে বিষণ্ন হয়ে যেতেন। বলতেন, আপনার ভাবীর শরীরটা ভালো না। অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে বিস্তারিত কিছু জানতে চাইতাম না। শেখ সাহেব বাজারে প্রেসের লাগোয়া তাঁর বাসা ছিল। অনেক সময় কাজের লোকের সঙ্গে ছোট ছেলেটি এলে তাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতেন। সন্তান বাৎসল্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো তাঁর ফর্সা মুখম-ল। ঠোঁটের কোণে খেলে যেত মৃদু হাসি। সন্তানের প্রতি একজন কবির স্নেহ ও ভালোবাসার প্রকাশটুকু আমাকে মুগ্ধ করতো। অভাব-অনটন আর দৈনন্দিন ব্যস্ততার মাঝেও প্রেসের ছোট্ট পরিসরে রাখা একটি টেবিলে বসে কবিতা লিখতেন। তখন তাকে মনে হতো একজন ঘোর লাগা উদাস মানুষ। জীবনের এই টানাপড়েনের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে স্মরণীয় সব কবিতা। মাঝে-মধ্যে চা সহযোগে পুরান ঢাকার ডালপুরি কিংবা বাকরখানি দিয়ে আপ্যায়িত করতেন। কবি আবিদ আজাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ায় আমাদের সাহিত্য সংকলন ‘আবাহন’-এর কাজের গতি খুবই মন্থর হয়ে পড়ে। ততদিনে আমার বন্ধুরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। আমি অবশ্য হাল ছাড়িনি। আমার তখন অভিজ্ঞতা হচ্ছে নতুন এক জগতের। যে জগত সৃষ্টির, আনন্দের। নতুন উদ্দীপনা নিয়ে করছি লেখা সম্পাদনা। শিখছি প্রুফ দেখার কাজ। কবি আবিদ আজাদের সৌজন্যে রেডিও বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কার্যক্রম অনুষ্ঠানেও আমার স্ক্রিপ্ট লেখার অভিজ্ঞতা হয়ে যায়। ১৯৮৪ সালের ৩ মার্চ রাত ৯টায় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান শ্রবণী’তে আমার লেখা সম্প্রচারিত হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েডকে নিয়ে লিখেছিলাম। এভাবেই উদ্দেশ্যহীনভাবে দিনগুলো পেরিয়ে যেতে থাকে। আমাদের সংকলন প্রকাশ করতে কেন যেন বছরখানেক লেগে যায়। এই সংকলনে যাদের লেখা ঠাঁই পায়, সম্পাদক হয়েও তাদের কাউকে কাউকে আমিও চিনতাম না। কবি আবিদ আজাদ তাঁর পরিচিত অনেক তরুণ ও প্রতিভাবান লেখকের লেখা আমাদের সংকলনে প্রকাশের জন্য দেন। তাঁর ভাণ্ডারে সবসময় থরে থরে জমা থাকতো বিভিন্ন লেখকের গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী এবং বিভিন্ন শিল্পীর ব্লক করা স্কেচ। আমাদের সংকলনের কভার করে দেন কবির পরিচিত শিল্পী আব্দুর রৌউফ সরকার। কবি আবিদ আজাদ অনেক সম্ভাবনাময় লেখক ও শিল্পীকে নানাভাবে পরিস্ফুটিত করেছেন। এ কারণে অনেক লেখক ও শিল্পীর তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। ইতোমধ্যে শেখ সাহেব বাজার থেকে প্রেসটি শিফট করে নিয়ে আসেন দৈনিক আজাদ অফিসের উল্টো দিকে ঢাকেশ্বরী রোডে। আগের তুলনায় কাজের পরিধি কিছুটা বাড়তে থাকে। সংসারে সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তাঁর চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। তবে আর্থিক সচ্ছলতার পেছনে হরদম ছুটলেও কবিতা লেখা কখনোই থেমে থাকেনি। পত্র-পত্রিকায় নিয়মিতই লিখতেন। আমরা যারা কবিতা বুঝতাম না; কিন্তু বোঝার একটা আকুলতা ছিল, তাদের কাছে কবি আবিদ আজাদের কবিতার আলাদা একটা আবেদন রয়েছে। কবিতার সূক্ষ্ম কারুকাজ আর অন্তর্নিহিত বাণী আমাদের ভোঁতা বোধকে স্পর্শ করতে না পারলেও তাঁর কবিতা অন্তরকে স্পর্শ করে যায়। তাঁর কবিতার দেহখানি লাবণ্যময়, সুষমামডিত। ছন্দময় তো বটেই, একটা সুরেলা অনুরণন পাওয়া যায়। পড়তেও ভালো লাগে। প্রচ- গরমে অতীষ্ঠ হয়ে ওঠার পর হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলে মন-প্রাণ যেমন স্বিগ্ধতায় ভরে যায়; তেমনিভাবে আবিদ আজাদের কবিতা দিনযাপনের আর প্রাণধারণের গ্লানির মাঝে আমাদের অন্তরকে পরিশোধিত করে দেয়। তাঁর কবিতার িস্বগ্ধতা দিয়ে, মাধুর্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজের একটা স্থান যে পাকাপোক্ত করে নিয়েছেন, তা বুঝতে পারতাম কবি আহসান হাবীব, কবি শামসুর রাহমান, কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রমুখ তাঁকে পছন্দ করতেন এবং দারুণভাবে প্রশ্রয় দিতেন। তাঁর কবিতার বইয়ের নামকরণ থেকে অনুধাবন করা যায় তাঁর কাব্যভাষা। ঘাসের ঘটনা (১৯৭৬), আমার মন কেমন করে (১৯৮০), বনতরুদের মর্ম (১৯৮২), শীতের রচনাবলী (১৯৮৩), আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি (১৯৮৭), তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে (১৯৮৮), ছন্দের বাড়ি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৮৭) প্রভৃতি গ্রন্থ বুকের মাঝে এমনিতেই ছন্দের দোলা দিয়ে যায়। কবিতা ছাড়াও গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, কাব্যনাট্য লিখেছেন। গ্রন্থের সংখ্যা অর্ধ-শতাধিক। কিন্তু কবি হিসেবেই তাঁর সুখ্যাতি। সত্তর দশকের অন্যতম সেরা রোমান্টিক কবি তিনি। কিশোরগঞ্জ থেকে আসা এই কবির কবিতায় গ্রামীণ সহজিয়া জীবনধারার সঙ্গে শহরের নাগরিক জীবনের মেলবন্ধন ঘটেছে। ‘এক স্তব্ধতা থেকে আরেক তপ্ত স্তব্ধতায়’ পা দিয়ে ঢাকা শহর তাঁর কাছে হয়ে ওঠে ‘জরি-চুমকির মতো ঝলমলে কবিতার রাজধানী।’ ‘আত্মরক্ষামূলক যুৎসই নিভৃতি’ হিসেবে তিনি বেছে নেন কবিতাকে। আর এ কারণে পাঠকরা তাঁর কবিতায় শুনতে পেয়েছেন নতুন কণ্ঠস্বর। অন্য সবার চেয়ে তাঁর বলার ভঙ্গিটিও আলাদা। জীবনযাপনের কঠিন এক সময়কে পেছনে ফেলে যখন তিনি একটুখানি থিতু হয়েছেন, যখন তাঁর কবিতায় নিজেকে পুরোপুরিভাবে সঁপে দেয়ার সময় এবং ‘পাথর-চাপা-পড়া সাময়িক নিরানন্দ বন্ধ্যা সময় পার করে’, ‘বর্ণে গন্ধে চিত্রে ছন্দে গদ্যে পাগলের মতো মাথার ভেতর প্রবল স্বপ্নের ঝড়ঝাপটা নিয়ে জেগে উঠেছে কবিতারই বসন্তের হাতের দয়ায়’, ঠিক তখন তিনি চলে গেলেন। একটা সময় খুব কাছাকাছি থাকলেও নাগরিক জীবনের দোলাচলে তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যাই। সেও তো কম সময় হলো না। এর মধ্যে যে এক-আধবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি তা নয়। কিন্তু কখন যে তিনি নাগরিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে একটু একটু করে ক্ষয়ে গেছেন, মোটেও জানতে পারিনি। যখন জানলাম, তখন ‘মৃত্যুর অজস্র বৌলে ভরে গেছে গাছ’। আমরা এমন এক কঠিন ও জটিল সময়ে বসবাস করছি, যখন মন খারাপ করার মতো অজস্র ঘটনা ঘটে যায় অহরহ। সান্ত্বনা ও ভালোবাসাও এখন অনাÍীয় হয়ে গেছে। নিজেকেই নিজের সান্ত্বনা দিতে হয়। নিজেকেই নিজের ভালোবাসতে হয়। আবিদ আজাদের কবিতা আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছে। দিয়েছে ভালোবাসা। মাথায় বুলিয়ে দিয়েছে স্মেহের হাত। হঠাৎ করে তিনি চলে যাওয়ার পর আমরা যেন এক শূন্যতায় পড়ে যাই। আর এই শূন্যতা থেকে মুক্তি পেতে হলে তাঁর কবিতায় নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাঁর সৃষ্টিই আমাদের তাকে মনে করিয়ে দেবে। 

রচনা কাল : মার্চ ২০০৫

আমাদের শৈশবের দুই কিংবদন্তী

একই দিনে চলে গেলেন আমাদের শৈশবের দুই কিংবদন্তী- রোমেনা আফাজ এবং গ্রেগরি পেক। যদিও দু’জনে দুই ভিন্ন ঘরানা এবং দুই প্রান্তের বাসিন্দা। রোমেনা আফাজের রহস্য সিরিজ ‘দস্যু বনহুর’ আর গ্রেগরি পেক-এর দুর্দান্ত অভিনয় আমাদেরকে শৈশব-কৈশোরকে বুঁদ করে রেখেছিল। চকিতে মনের পর্যায় ভেসে ওঠে ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের সেসব অমলিন স্মৃতি। চটপটি, ঝালমুড়ি ও সস্তার আইসক্রিমের সঙ্গে ‘দস্যু বনহুর’ আর হলিউডি ছবি ছিল আমাদের কৈশোরের দুর্বার আকর্ষণ।



জন্মের পর থেকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সেই যে ওতপ্রোত সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তার পলে পলে জড়িয়ে আছে কত না অম্ল-মধুর স্মৃতি। শৈশব-কৈশোরের দুরন্তপনা, খেলাধুলা, বই পড়া, নাটক, সিনেমা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নানা রকম ভেল্কিবাজিসহ এ শহরের বেড়ে ওঠার বাঁকে বাঁকে আমাদের দেহ-মনে ছাপ ফেলে যায় কত না দৃশ্যপট। আমাদের প্রজন্মে, নানাজনের নানা রকম ঝোঁক ছিল। তবে বই পড়ার প্রতি সবারই ছিল অন্যরকম আকর্ষণ। বিশেষ করে, পাঠ্যবই বাদ দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে গল্প, উপন্যাস ও রহস্য সিরিজের বই সে বয়সে কী যে টানতো, তা বলে বোঝানো যাবে না! প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি অতিক্রম করার পর রোমেনা আফাজের রহস্য সিরিজ ‘দস্যু বনহুর’ আমাদের বয়সী বালকরা গোগ্রাসে গিলতাম। ‘দস্যু বনহুর’ ছিল আমাদের স্বপ্ন, কল্পনার নায়ক। যে কোনো বিপদে-আপদে তিনি ঝড়ের বেগে ঘোড়ায় চড়ে এসে হাজির হতেন। যেন অদৃশ্য মানব! রাতের আঁধারে কালো ড্রেসে তার চলাফেরা পাঠক-হৃদয়ে শিহরণ জাগাতো। প্রতিটি বইয়ের শেষটুকু এমনভাবে লেখা হতো, যাতে পরবর্তী বইটি না পড়ে উপায় থাকতো না। প্রতিটি বই এক নিঃশ্বাসে শেষ করার পর পরবর্তী বইটির জন্য আমাদের কী অন্তহীন প্রতীক্ষা! কার আগে কে পড়বো, তা নিয়ে একটা নীরব প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতো। সে বয়সে ঢাকার শের-এ-বাংলা নগরের বাসিন্দা হিসেবে ওই এলাকাই ছিল আমার বা আমাদের সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। শের-এ-বাংলা নগরের গণ্ডির বাইরে যাওয়ার কথা ভাবলেই আমাদের কেঁপে উঠতো বুক। অথচ ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজের বই পড়ার জন্য আমাদের ছিল কী দুঃসাহসিক অভিযাত্রা! ফার্মগেটের বুকস্টল থেকে নতুন ও আনকোরা বই সংগ্রহ করার জন্য কি ঝড়, কি বৃষ্টিতে সাইকেল চালিয়ে উল্কাবেগে বেপরোয়া ছুটতাম। কোনো ভয়-ভীতি ও পিছুটান আমাদের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারতো না। পাঠ্য বইয়ের প্রতি যতটা আমাদের অনীহা ছিল, ঠিক ততটাই আগ্রহ ছিল পাঠ্য বইয়ের বাইরের বইয়ের প্রতি। তবে এ কথা ঠিক, আমাদের পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে লেখিকা রোমেনা আফাজের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। রোমেনা আফাজ ১২ জুন রাতে হঠাৎ চলে যাওয়ায় উসকে উঠে আমাদের বুকে জমে থাকা শৈশব-কৈশোরের সেই স্মৃতি। প্রচলিত অর্থে রোমেনা আফাজকে জীবনধর্মী লেখিকা বলা যাবে না। তার লেখায় পাণ্ডিত্য বা গভীরতা না থাকলেও চুম্বকের মতো পাঠককে টেনে রাখতো। যে কারণে তার লেখা সব বয়সী পাঠককে সমানভাবে আকর্ষণ করতো। তার সময়ে তিনি ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখিকা। তার বই বিক্রি হতো হট-কেকের মতো।

তবে কথাসাহিত্যিক হিসেবে তিনি যতই না খ্যাতিমান ছিলেন, তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন গোয়েন্দা সিরিজ ‘দস্যু বনহুর’-এর রচয়িতা হিসেবে। আড়াই শতাধিক গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। এর মধ্যে রয়েছে বহু গল্প, কবিতা, কিশোর উপন্যাস, সামাজিক উপন্যাস, গোয়েন্দা সিরিজ ও রহস্য সিরিজের গ্রন্থ। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দু’দশকে ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজে ১৩৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া উপন্যাসের সংখ্যা ৬৯টি। তার উপন্যাস নিয়ে চলচ্চিত্র হয়েছে : কাগজের নৌকা, মোমের আলো, মায়ার সংসার, মধুমিতা, মাটির মানুষ ও দস্যু বনহুর ছিল সুপারহিট। তার ছবির কাহিনী ও গান মানুষের মুখে মুখে ফিরতো। এখনো সেসব গান পুরনো দিনের মানুষকে উদাসীন ও স্মৃতিলগ্ন করে তোলে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে গোয়েন্দা সিরিজ ‘দস্যু বনহুর’-এর জন্য আমাদের মতো অনেকের বুকে তিনি চির-জাগরুক হয়ে থাকবেন। রোমেনা আফাজ গোয়েন্দা সিরিজ লেখার শুরুর আগে এ দেশের তরুণ-তরুণীদের প্রিয় ছিল পশ্চিম বাংলার লেখকদের ডিটেকটিভ সিরিজ। তাদের একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারের মাঝে নিজের প্রতিভা ও মেধা দিয়ে নিজের অবস্থান করে নিতে সক্ষম হন রোমেনা আফাজ। ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ কী পরিমাণ বিক্রি হয়েছে, তা কল্পনাও করা যাবে না। আজ জনপ্রিয় হুমায়ূন আহমেদ যেমনি সুখপাঠ্য উপন্যাস, গল্প, নাটক লিখে অসম্ভব জনপ্রিয়তার পাশাপাশি ঝিমিয়ে পড়া পাঠ্যাভ্যাসকে চাঙ্গা করে তুলেছেন, তেমনিভাবে রোমেনা আফাজ পাঠকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হন। বিশেষভাবে কিশোর, তরুণ, যুবকরা তার বই দিয়ে পাঠাভ্যাস শুরু করে পরবর্তীকালে জীবনধর্মী ও ক্লাসিক বই পড়ার প্রতি আগ্রহী হয়েছে। যদিও ৭৭ বছর বয়সে রোমেনা আফাজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, কিন্তু ‘দস্যু বনহুর’-এর রচয়িতা হিসেবে তিনি আমাদের হৃদয়ে চিরতরুণ ও চিরভাস্বর হয়ে থাকবেন। ‘দস্যু বনহুর’-এর স্বপ্নময়তা যখন আস্তে-ধীরে ফিকে হতে থাকে, সে সঙ্গে কৈশোর পেরিয়ে আমরা যখন তারুণ্যে অবগাহন করতে থাকি, ঠিক তখন হলিউডের পুরনো আমলের মারদাঙ্গা ও রোমান্টিক চরিত্র আমাদের ধ্যান-ধারণাকে পাল্টে দিতে থাকে। কিংবদন্তীর যেসব নায়ক-নায়িকা আমাদের চোখে স্বপ্নের অঞ্জন এঁকে দেন, তার মধ্যে গ্রেগরি পেক অন্যতম। গ্রেগরি পেকের দীর্ঘদেহ, স্মার্টনেস, পেটানো চেহারা, চৌকানো চোয়াল, শান্ত কিন্তু গম্ভীর কণ্ঠ আর গভীর ও অন্তর্ভেদী দৃষ্টি আমাদের হৃদয়ে আলাদা স্থান করে দেয়। পুরুষোচিত ইমেজ আর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দিয়ে তিনি আমাদের হৃদয়-মন জয় করে নেন। ‘রোমান হলিডে’, ‘দ্য গানস অব নাভারন’, ‘ম্যাকেনার্স গোল্ড’ প্রভৃতি চলচ্চিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। যদিও এ ছবিগুলো পঞ্চাশ ও ষাট দশকে মুক্তি পেয়েছে; কিন্তু তার আবেদন চিরকালীন। নতুবা আমাদের জন্মের আগের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি আমাদের এবং আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে আকৃষ্ট করতো না। মধুমিতা হলে বসে দেখা এ ছবিগুলোর দৃশ্যায়ন, ঘোড়ার খুরের শব্দ ও চিঁহি চিঁহি রব এ মুহূর্তে কানে এসে বাজছে। ‘রোমান হলিডে’ ছবিতে অড্রে হেপবার্নের সঙ্গে গ্রেগরি পেকের রোমান্টিক প্রেমের দৃশ্যায়নগুলো সবাইকে আপ্লুত করে দেয়। রোমগামী একটি রাজকীয় বহর থেকে আধুনিক কালের প্রিন্সেস হেপবার্ন ‘পালিয়ে’ গিয়ে নিজের আত্মপরিচয় গোপন রাখেন। এ সময় তার সঙ্গে পরিচয় হয় আমেরিকান সাংবাদিক গ্রেগরি পেকের। তারপর দু’জনে প্রেমে হাবুডুবু খেতে থাকেন। প্রতিটি মুহূর্ত ও কথোপকথন দর্শকদের হাসি-আনন্দে, কৌতুকে ও উত্তেজনায় মজিয়ে রাখে। যুদ্ধকে নিয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরা চলচ্চিত্র ‘দ্য গানস অফ নাভারন’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানীর বিশাল অস্ত্রভাণ্ডারকে ধ্বংস করার জন্য গ্রিক আইল্যান্ডে পাঠানো হয় একটি কমান্ডো দলকে। এ কমান্ডো দলের নেতৃত্বে ছিলেন গ্রেগরি পেক। জার্মান ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধে যে স্পেশাল অ্যাফেক্ট ব্যবহার করা হয়, তার সাউন্ড এখনো বুকের মাঝে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো প্রতিধ্বনিত হয়। আরিজোনা ভূখণ্ডে কিংবদন্তীর স্বর্ণের গুপ্তভাণ্ডার নিয়ে গ্রেগরি পেক ও ওমর শরিফের যুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ম্যাকেনার্স গোল্ড’। গুপ্তভাণ্ডারে যাওয়ার পথের সন্ধান জানেন একমাত্র গ্রেগরি পেক। স্বর্ণের গুপ্তভাণ্ডার সন্ধানের পথে মেক্সিকান দস্যু ওমর শরিফের সঙ্গে কখনো সংঘর্ষ, কখনো মিত্রতার খণ্ড খণ্ড দৃশ্য আর ঘোড়ার খুরের প্রতিধ্বনি ও হ্রেষা রব প্রতিটি মুহূর্তকে জমজমাট করে রাখে। আমাদের শৈশবে হলিউডি ছবি সম্পর্কে একটা ধারণা গড়ে ওঠে গ্রেগরি পেকের ছবি দেখে দেখে। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা গ্রেগরি পেক। তিনি ছিলেন হলিউডের স্বর্ণযুগের অভিনেতা। তার ক্ল্যাসিক, রোমান্টিক ও দুর্ধর্ষ অভিনয় আমাদের কাছে অম্লান হয়ে আছে। এরপর আরো ক্ল্যাসিক, আরো রোমান্টিক এবং আরো দুর্ধর্ষ চলচ্চিত্র ও অভিনয় আমাদের হৃদয় ছুঁয়েছে। কিন্তু তারুণ্যের গ্রেগরি পেক আমাদের বুকে গভীরভাবে দাগ কেটে আছেন। ১২ জুন ৮৭ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও তার যৌবনদৃপ্ত, প্রত্যয়ী ও সেক্স সিম্বল ব্যক্তিত্ব আর অসাধারণ অভিনয় মনের মণিকোঠায় চিরঞ্জীব হয়ে থাকবে। এক সময়ের জনপ্রিয় লেখিকা রোমেনা আফাজ আর এককালের পর্দা কাঁপানো অভিনেতা গ্রেগরি পেক- একটা সময় এসে দু’জনেই কেন জানি হঠাৎ নীরব হয়ে যান। যাবতীয় কোলাহল, আলোর ঝলকানি, মানুষের প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা ও সংস্পর্শ থেকে দূরে সরে গিয়ে একটা দুর্ভেদ্য আড়াল গড়ে তোলেন। নিভৃতের জগতে রচনা করেন নিজস্ব একটা পরিম-ল। একান্তই কাছের মানুষ ছাড়া আর সবার সঙ্গে গড়ে ওঠে একটা দূরত্ব। অতীতের খ্যাতি-অখ্যাতি, কলরব, উজ্জ্বলতা- কোনো কিছুই তাদের স্পর্শ করেনি। ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি, সুখ ও বেদনা নিয়ে জাবর কেটেছেন আপন মনে। রোমেনা আফাজ ও গ্রেগরি পেক- দু’জনে দু’জগতের বাসিন্দা হলেও উভয়ই পরিণত বয়সে একই দিনে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। একজন লিখেছেন গোয়েন্দা কাহিনী ও তার লেখা উপন্যাস নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র এবং আরেকজন চলচ্চিত্রের নায়ক ছিলেন। মৃত্যু এবং চলচ্চিত্র দু’জনকে একাত্ম করলেও দু’জনেই একটা প্রজন্মের কাছে চিরদিন আনন্দময় স্মৃতি হয়ে থাকবেন। 

দৈনিক প্রথম আলো : ২৫ জুন ২০০৩