পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বৃহস্পতিবার, ২১ অক্টোবর, ২০২১

তবুও বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা


 


১.

বৃষ্টির জন্য প্রতীক্ষা আমার চিরকালের। বৃষ্টি এলে মনটা নেচে ওঠে আনন্দে। না চাইলেও প্রতিদিনই কত ময়লা জমে বুকে। কত অপমান, কত তিক্ততা সইতে হয়। ক্লান্ত হই। হাঁপিয়ে ওঠি। তখন অপেক্ষায় থাকি বৃষ্টির। বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় ভিতরের যত জঞ্জাল। তবে ইঁচড়ে পাকা বৃষ্টি একদমই ভালো লাগে না। বরং বিরক্ত লাগে। ধুম বৃষ্টি না হলে ভেতরটা যেন ঠিকমতো ভেজে না। মন যদি ছুঁয়ে না যায়, মর্মমূল যদি গভীরভাবে স্পর্শ না করে, তাহলে তেমন অসম্পন্ন বৃষ্টি আমার কাঙ্খিত নয়। যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে ক্ল্যাসিকাল সংগীতের মতো একটানা বৃষ্টি ঝরতে থাকে, তখন ঐশ্বরিক এক মৌতাতে বুঁদ হয়ে যায় সারা দেহমন। পবিত্র হয়ে ওঠে ভিতরভূমি। অনুভবের সেই বৃষ্টি সচারচর দেখা মেলে না। আর যখন দেখা মেলে, তখন হয়তো আমি প্রস্তুত নই। বৃষ্টি উপভোগ করতে হলে সময় একটা বড় ফ্যাক্টর। দুয়ে দুয়ে না মিললে সেটা উপভোগ্য হয়ে উঠে না। বৃষ্টিও তো সংগীতের মতো। তাকে অনুভব করতে হয় হৃদয় দিয়ে।

২.

কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজতে খুব ইচ্ছে করে। আমার ইচ্ছে করলেই তো আর হবে না। যা কিছু ইচ্ছে করে, যা কিছু ভালো লাগে, যা কিছু ভালোবাসি, তার সঙ্গে আমার কেন যেন একটা আড়ি হয়ে যায়। অথচ এ ক্ষেত্রে আমার কোনো ভূমিকা থাকে না। বোধকরি সৃষ্টিকর্তা আমার শরীর ও মন এমনভাবে গড়েছেন, অনেক কিছুই ঠিকমতো অ্যাডজাস্ট হয় না। নাকি আমিই পারি না? নতুবা যা যা আমি মন দিয়ে চাই, গভীরভাবে চাই, তা কেন পাই না? পেলেও ধরে রাখতে পারি না। চুপি চুপি বলে রাখি, বৃষ্টি কিন্তু অনেক না বলা কথা বলিয়ে নেয়।

৩. 

বৃষ্টি তো আর সব সময় সুরমাধুর্য হয়ে আসে না। অধিকাংশ সময়ই বিড়ম্বনা হয়ে দেখা দেয়। বেশিরভাগ সময় স্কুল-কলেজ-অফিসে যাওয়ার সময় অথবা ফেরার সময় এমনভাবে বৃষ্টি নামে, তখন সেটাকে রীতিমতো মশকারা মনে হয়। বৃষ্টি একদমই মন বুঝতে চায় না। সময় বুঝতে চায় না। এটাই বড় আক্ষেপের। বৃষ্টি একদম না হলে একদিকে যেমন কষ্টের শেষ নেই, অন্যদিকে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলেও অন্তহীন ভোগান্তি। একই সময়, কারো কারো কাছে বৃষ্টি উপভোগের। আবার কারো কারো কাছে উপদ্রবেরও। তবুও বৃষ্টি কিন্তু কারো কাছেই অনাকাঙ্খিত নয়।

তাঁর ছবি দেখলে মন ভালো হয়ে যায়

মন খারাপ থাকলে আমি তার ছবি দেখি। মন ভালো থাকলেও দেখি। মন খারাপের সময় দেখার কারণ, তাতে মন ভালো হয়ে যায়। মন ভালো থাকার সময় না দেখার তো কোনো কারণ নেই। আসলে তাকে আমার খুব ভালো লাগে। কেন লাগে, তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারবো না। কেন জোছনা ভালো লাগে, কেন বৃষ্টি ভালো লাগে, কেন ফুচকা ভালো লাগে, আমি বোঝাতে পারবো না। ভালো লাগা বোঝানো যায় না। অনুভূতি দিয়ে বুঝে নিতে হয়। 

তার মধ্যে আছে মায়াবী এক সৌন্দর্য। তা আমাকে অসম্ভব টানে। হরিণীর মতো মায়াকাড়া তার চোখ। কেমন যেন আবেশ জড়ানো। সারাক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয়, সে কেবল আমাকেই দেখছে। তখন বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে রঙধনু। তাকে খুব আপন আপন মনে হয়। মায়াবিনী মনে হয়। তার হাসিতে যেন মুক্ত ঝরানো। কমনীয় হাসি। নিস্পাপ হাসি। তাতে আছে অনাবিল সারল্য। চুমুকে চুমুকে পান করতে ইচ্ছে জাগে। সারা মুখে আলোর বিচ্ছুরণ।অন্ধকারও আলোকিত হয়ে যায়। কিযে অপরূপা লাগে।  

তাকে যে কত রূপে দেখি। কত ভঙিমায় দেখি। কত রকম পোশাকে দেখি। সে যখন যে সাজ দেয়, যে পোশাক পরে, যে চরিত্র ধারণ করে, মনে হয় সেটি কেবল তাকেই মানায়। এত সুন্দর মানুষ কী করে হয়? দুধে আলতা রঙ বললে যা বোঝায়, অবিকল তাই। আচ্ছা, সে কি দুধে আলতা মিশিয়ে খায়? সুন্দর থাকার জন্য কত জনে কত কী করে। তার সৌন্দর্যের গোপন রহস্য দুধে আলতা নয়তো। এটা একদিন খেয়ে দেখলে হয়, কেমন লাগে? বয়সটাকে কি সুন্দর একই ফ্রেমে বাঁধিয়ে রেখেছে। রূপকথার সেই রাজকন্যার মতো যেন চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতিমা হয়ে আছে। 

একাত্তর টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদকের দফতরে বাঁ থেকে মোজাম্মেল বাবু, দুলাল মাহমুদ, সাবেক ফুটবলার নওশের, সাইদুর রহমান প্যাটেল ও জয়া আহসান।


কে এই সুন্দরীতমা? নাম না লিখলেও তাকে চিনতে না পারার কোনো কারণ নেই। পৃথিবীতে তিনি এক ও অদ্বিতীয়। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশে তিনি অনেক আগেই সুখ্যাতি অর্জন করেন। এখন আন্তর্জাতিক পরিসরেও তিনি আলো ছড়াচ্ছেন। তার প্রতিভা দিয়ে, তার সৌন্দর্য দিয়ে, তার ভুবনমোহিনী হাসি দিয়ে।

মাদ্রিদ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২০-এ বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্রে শ্রেষ্ঠ নারী অভিনয়শিল্পী বিভাগে পুরস্কার জিতেছেন। অভিনন্দন জয়া আহসান। কুয়াশামাখা এই সকালে প্রাণখুলে গাইতে ইচ্ছে করছে, 'তুমি না থাকলে সকালটা এতাে মিষ্টি হতাে না।'

৯ ডিসেম্বর ২০২০

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

'হরিকল অকালে নিভে গেল'

শিরোনামটা দেখে বুকের মধ্যে কেমন একটা ধাক্কা লেগেছিল। শুরুতেই মনের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, কে এই হরিকল? এমন অভিনব শিরোনাম তো সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। ধাক্কাটা সামলে ধীরে ধীরে পাঠের প্রতি মনোযোগী হতে হয়। সেই আশির দশকে দৈনিক পত্রিকার পাতায় ক্রীড়া বিষয়ক এত বড় লেখা খুব বেশি সুলভ ছিল না। লেখার ট্রিটমেন্টটা বেশ ভালো দেওয়া হয়। 'দৈনিক বাংলা পত্রিকা'র সাপ্তাহিক খেলার পাতায় পুরো পৃষ্ঠাজুড়ে প্রকাশিত হয় লেখাটি। বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটা ছবি। অকালে ঝরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার আর্চি জ্যাকসনকে নিয়ে। বয়স ২৩ অতিক্রম করার পর যক্ষ্মা রোগে নিভে যায় অসম্ভব প্রতিভাবান এই ক্রিকেটারের প্রাণপ্রদীপ। লেখাটা শুরু হয় এভাবে, 'প্রাণ রসায়ন হয়তো বিশদ বিবরণে বলে দিতে পারে কেন মানুষের চোখের পাতা বাষ্পে ভিজে, ফোঁটায় ফোঁটায় এক সময় বানভাসী হয়। কিন্তু হৃদয়ের তলদেশ ছোঁয়া যে বেদনভার হালকা পায়ে চলা কালপুরুষের সুচারুপদক্ষেপকে টলিয়ে দেয়, তার কার্যকারণ বোধের অগম্য। প্রকৃতির সাধারণ দিকচক্রবালে প্রশ্নবোধক আঁকার কি এমন প্রয়োজন বিধাতা-পুরুষের? এ নিঠুর গরজ কেন, কিসের? কেন এমন হৃদয়হীন রসিকতা?'

মিরপুর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাঁ থেকে দুলাল মাহমুদ, জালাল আহমেদ চৌধুরী, অঘোর মন্ডল ও নাজমুল হক তপন।
 

যেন কোনো ট্র্যাজিক উপন্যাস পড়ছিলাম। পড়তে পড়তে বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতে থাকে। লেখার স্টাইল, ভঙ্গি, শব্দের বুননে কবেকার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস যেন সদ্য জেগে ওঠেছে। সেই শোক, সেই দুঃখ, সেই বেদনা তাৎক্ষণিকভাবে ফিরে ফিরে আসে। আর্চি জ্যাকসনের মৃত্যু টাটকা স্মৃতি হয়ে খোঁচাতে থাকে। শব্দশক্তি দিয়ে পাঠককে এভাবে দুলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতায় অবাক করে দেয়। সবাই তো এমন লিখতে পারেন না। মনদুলুনি এই কলমশিল্পী ছিলেন জালাল আহমেদ চৌধুরী। তিনি যে এত চমৎকার বাংলা লেখেন, তার আগে আমার জানা ছিল না। এই লেখা পড়ার পর তাঁর লেখার অপেক্ষায় থাকতাম। অপেক্ষাটা সহসা ফুরাতে চাইত না। তিনি যে জাত রোমান্টিক, তা অনুধাবন করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। সে সময় তিনি কর্মরত ছিলেন রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন ইংরেজি দৈনিক 'বাংলাদেশ টাইমস' পত্রিকার স্পোর্টস রিপোর্টার হিসেবে। আর ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক অনেক আগে থেকেই। ক্রিকেটার ও কোচ হিসেবে। ভারতের পাতিয়ালা ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে ক্রিকেট বিষয়ে ট্রেনিং নিয়ে এসেছেন। জাতীয় ক্রিকেট বোর্ড ও বিভিন্ন ক্লাব দলের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাছে দীক্ষা নিয়ে ক্রিকেটকে রাঙিয়েছেন অসংখ্য ক্রিকেটার।

সবচেয়ে বড় কথা, ক্রিকেটকে যাঁরা হৃদয়ের গভীরভাবে ধারণ করতেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। একটা সময় সাহিত্যচর্চা করেছেন। কবিতা লিখেছেন। গ্রন্থের প্রকাশক ছিলেন। জড়িয়ে ছিলেন লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনে। ঢাকার আজিমপুরের ক্রীড়া ও সাহিত্যের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ক্রিকেটের সঙ্গে সাহিত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়ে ক্রিকেট লিখিয়ে হিসেবে স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলেন। সব মিলিয়ে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন মানুষ।

প্রথম আলো ক্রীড়া পুরষ্কার নির্বাচকমণ্ডলী বাঁ থেকে ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাক, জালাল আহমেদ চৌধুরী, কামরুন নাহার ডানা, দুলাল মাহমুদ ও আশরাফউদ্দিন খান চুন্নু। 


আড্ডার প্রতি তাঁর ছিল সুতীব্র টান। পাক্ষিক 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় নিয়মিত আড্ডা মারতে আসতেন। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। গত প্রায় চার দশকে সেই পরিচয় ক্রমশ বিস্তৃত হয়। তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। বিচরণক্ষেত্র অভিন্ন হওয়ায় নানাভাবে তাঁর সংস্পর্শে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়। দীর্ঘ দিন বিভিন্ন প্রেস বক্সের পাশাপাশি প্রথম আলো ক্রীড়া পুরষ্কারের জুরি বোর্ড, বিএসপিএ স্পোর্টস জার্নালিস্ট অ্যাওয়ার্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তাঁর ঔদার্য, তাঁর স্নেহ, তাঁর আন্তরিকতার পরশ পেয়েছি।

সব কিছু ছাপিয়ে তাঁর কলমের মুগ্ধ পাঠক হয়ে যাই। তিনি যখনই যেখানে যা লেখেন, পড়ার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। নিজের গরজে লিখতে চাইতেন না। অনুরুদ্ধ না হলে লেখার তাগিদ পেতেন না। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অনেক দিন লিখেছেন। সংবেদনশীল মনোভাবের কারণে তা নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকেনি। লেখালেখির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন ভীষণ অলস প্রকৃতির। সহজে কলম ধরতে চাইতেন না। যে কারণে তাঁর লেখার সংখ্যা অপরিমিত নয়। যা তাঁর অনুরাগীদের কাছে অনন্ত আক্ষেপ হয়ে আছে।

ইদানিং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম 'ফেসবুক'-এ তিনি বেশ সরব ছিলেন। তার মানে এই নয়, ধুমসে লিখতেন। মূলত ছোট ছোট মন্তব্য করতে পছন্দ করতেন। যেন এক একটা এলেজি, লিমেরিক বা গালিবের শায়েরী। তাতেই পরিস্ফুটিত হয়ে উঠত তাঁর মেজাজ, তাঁর মনোভাব, তাঁর মুন্সিয়ানা। মন্তব্যগুলো যেন এক এক ফোটা কস্তুরী। তার সৌরভে আমোদিত হতেন পাঠককুল। বিশেষ করে তাতে দারুণভাবে উদ্বেলিত ও অনুপ্রাণিত হতেন নতুন প্রজন্ম। তাঁর লেখা আত্মস্থ করে নিজেদের সেইভাবে প্রস্তুত করার একটা তাগিদ অনুভব করতেন।

সোনার কলমের অধিকারী হয়েও তিনি কেন যে লেখালেখির প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলেন না, তার কোনো যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায় না। হতে পারে আখ মাড়াই করে যেভাবে রস বের করা হয়, তেমনিভাবে সুস্বাদু এক-একটা লেখা লিখতে নিজেকে নিংড়ে দিতে হয়েছে। পাঠকরা রসোত্তীর্ণ লেখা পেয়ে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। পাঠকের ভালো লাগা তাঁকে প্রাণিত করলেও নিয়মিতভাবে লেখার এই চাপ নেওয়াটা তাঁর কাছে পছন্দের না-ও লাগতে পারে।

তিনি জীবনকে উপভোগ করতে চাইতেন নিজের মতো করে। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে যে আত্মতৃপ্তি পেতেন, তা সাধারণত নিজের মধ্যেই ধারণ করতে চাইতেন। কেউ জানতে না চাইলে শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না। এই বোধের সঙ্গে অন্য কোনো কিছুর তুলনা হতে পারে না। বিরলপ্রজ এই লেখকের গ্রন্থ সংখ্যা সর্বসাকুল্যে একটি, 'বিশ্বকাপ ও কয়েক ছত্র ক্রিকেট'। তবে তিনি এ যাবৎ যা লেখালেখি করেছেন, তা সংকলিত হলে একাধিক গ্রন্থ হতে পারে। তেমন উদ্যোগ কি নেওয়া সম্ভব হবে?

শরীরের খুবই নাজুক অংশ ফুসফুস। তার একটুখানি অনাদর হলে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সংক্রমিত ফুসফুসের কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটা পলে পলে বুঝতে পারছি। আর ধূমপায়ী হলে তো কথা নেই। ফুসফুসের জন্য ধূমপান মারাত্মক ক্ষতিকর। আমি অধূমপায়ী হয়েও যে ধকল সইতে হচ্ছে আর ধূমপায়ী জালাল ভাইয়ের জন্য এটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, সেটা তো এখন সহজেই অনুধাবন করা যাচ্ছে। তিনি তা ভালো করেই জানতেন৷ কিন্তু এ নিয়ে তাঁর কোনো ভাবনা ছিল বলে দৃশ্যমান হয়নি। এ কারণে ধূমপান ছাড়ার বিষয়ে একদমই মাথা ঘামাননি। বরং হাবে-ভাবে মনে হয়েছে, ধূমপান তাঁর কাছে ছিল বেঁচে থাকার অন্যতম রসদ।

দুলাল মাহমুদ ও জালাল আহমেদ চৌধুরী 


একাকীত্ব জীবনে নিকোটিন তাঁকে বোধ করি নিবিড় সঙ্গ দিয়েছে। ক্রিকেট থেকে পাওয়া নির্যাস আর ধূমপানের সুখটানের যুগল বন্ধনে যে জীবন তিনি বেছে নিয়েছিলেন, তাতে হয়তো নিজের মতো বেঁচে থাকার আনন্দ ছিল। কিন্তু তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে তা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। সবার চোখের সামনে একটু একটু করে ক্ষয়ে যেতে থাকেন তিনি। এভাবেই সবাইকে একদিন চলে যেতে হয়, তারপরও প্রাণসম্পদে ভরপুর তাঁর মতো একজন সৃজনশীল মানুষের চলে যাওয়াটা শূন্যতারও অধিক একটা হাহাকার বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে। ঢাকা স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে বিদায়ী মঞ্চে তাঁর প্রাণহীণ দেহের সামনে যখন বিষাদ আর আর্দ্রতায় মাখামাখি তাঁর সহযোগী, সহকর্মী ও সহমর্মীদের চোখ; ঠিক তখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি যেন পরিবেশটাকে আরও বেশি শোকাবহ করে তোলে। সেই শোক সহজে কাটিয়ে ওঠা যাবে না। হায়! বাংলা ক্রিকেট সাহিত্যে তাঁর মতো করে আর কেউ লিখবেন না।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২১

মননশীল এক ব্যক্তিত্বের চলে যাওয়া

 

বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতি ছিল তাঁর অত্যন্ত প্রিয় একটি বিষয়। জীবনের বেশিরভাগ সময় ব্যয় করেছেন এর চর্চায়। এ বিষয়ে তাঁর নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তুলনারহিত। নিবিষ্ট সাধকের মতো কত অজানা মণি-মাণিক্য তুলে এনেছেন। সমৃদ্ধ করেছেন শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে। বাংলা নববর্ষ নিয়ে তাঁর আলাদা একটা মুগ্ধতা ছিল। এন্তার লিখেছেন বাংলা নববর্ষ ও বাংলা নববর্ষ সংক্রান্ত নানান বিষয়ে। দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় তাঁর লেখা ঋদ্ধ প্রবন্ধগুলো মিটিয়েছে মনের খোরাক। কাকতালীয়ভাবে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনেই চলে গেলেন শামসুজ্জামান খান।

মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা দিয়ে সেই ষাট দশকে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখন থেকেই তিনি বাংলা ও বাঙালিয়ানার দিকে প্রচণ্ডভাবে ঝুঁকে পড়েন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ মোটেও লুকোছাপা ছিল না। প্রতিকূল সেই সময়ে এমন মনোভাব ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি তাঁর পরোয়া করেননি। নিজের বিশ্বাসে তিনি বরাবরই ছিলেন অটল ও আত্মবিশ্বাসী। শিক্ষাব্রতী পরিবারের কাছ থেকে জীবনের যে পাঠ তিনি পেয়েছেন, তাতে গড়ে উঠেছেন উদারনৈতিক, অসাম্প্রদায়িক ও সংস্কারমুক্ত মনের মানুষ হিসেবে। জীবনভর লালন করেন এই দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আলোকে পথ চলেছেন। শিক্ষকতা দিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করলেও বাংলা একাডেমি হয়ে উঠে তাঁর পাদপীঠ। এই প্রতিষ্ঠানটি বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক হয়ে উঠার ক্ষেত্রে তিনিও যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। জীবনের অন্তিম সময় পর্যন্ত তিনি বাংলা একাডেমির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর জগৎ ছিল বইময়। জ্ঞানের বিকাশেই নিজেকে নিবেদন করেন।

তিনি ছিলেন নিভৃতচারী। দূর থেকেই তাঁর খোঁজ-খবর রাখতাম। মূলত তাঁর মননশীল ও চিন্তা উদ্রেককারী লেখা মন দিয়ে পাঠ করতাম। ১৯৯১ সালের শুরুর দিকে 'সাপ্তাহিক মূলধারা’ পত্রিকার হয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ভেতরের মানুষটিকে অনুধাবন করতে পারি। জানতে পারি খোলামেলা অনেক কথা। তিনি বিশ্বাস করতেন যুক্তি-তর্কে, অনুসন্ধিৎসায়, বিজ্ঞানে ও গণতান্ত্রিক চেতনায়। মন-মানসিকতায় তিনি ছিলেন অসম্ভব আধুনিক। তাঁর আগ্রহ ছিল সমাজ, রাজনীতি, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলাসহ যাবতীয় বিষয়ে। সে সময় তাঁর নিজের কথায়, ‘জ্যাক অব অল ট্রেডস বাট মাস্টার অব নান’।

তারপর তো তিন দশক সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে কত দিকেই না তাঁর ব্যাপ্তি ঘটিয়েছেন। তাঁর মেধাবী কলমে, তাঁর পরিশীলিত কণ্ঠের পাশাপাশি তাঁর নিবিড় পরিচর্যায় ভাষা ও সাহিত্যের প্রসার ঘটেছে। ধীরে ধীরে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর সক্রিয়তা টের পাওয়া যায়। অসংখ্য গ্রন্থ রচনার পাশাপাশি সম্পাদনা ও তত্ত্বাবধান করেছেন কত শত বিষয়ে। তাঁর সুখ্যাতি ছাড়িয়েছে দেশের সীমানা।

খেলাধুলার প্রতি তাঁর ছিল তীব্র অনুরাগ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলকে নিয়ে তাঁর লেখা ‘দুনিয়া মাতানো বিশ্বকাপ’ গ্রন্থটি তাঁর ক্রীড়ানুরাগের অসাধারণ কীর্তি। খেলাটা যে হৃদয়ের কতটা গভীরে লালন করেন, তা তাঁর গীতিময় ও গতিময় শব্দের বুননে বাঙ্ময় হয়ে ওঠেছিল। ফুটবলের আদ্যোপান্ত ঝরঝরে ভাষায় এমন সাবলীলভাবে তুলে ধরেন, যা পাঠককে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনায়াসে টেনে নিয়ে যায়। অনুরোধে-উপরোধে খেলা নিয়ে হঠাৎ হঠাৎ লিখে মুগ্ধ করলেও খুব বেশি মনোনিবেশ করার সুযোগ পাননি। আলাপ-আলোচনায় খেলার প্রতি তাঁর গভীর অনুভব উপলব্ধি করা যায়।

১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি প্রকাশিত 'খেলার কথা কথার খেলা 'গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তৃতারত যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা। বসা বাঁ থেকে সমিতির সাধারণ সম্পাদক দুলাল মাহমুদ, বাংলা একাডেমির পরিচালক
শামসুজ্জামান খান ও সমিতির সভাপতি আবদুল তৌহিদ। 







১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রকাশ করেছিলাম ক্রীড়া বিষয়ক সংকলন গ্রন্থ ‘খেলার কথা কথার খেলা'। এই গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত সবাইকে তিনি মন্ত্রমুগ্ধ করে দেন। বাংলা একাডেমির প্রকাশনার তালিকায় ক্রীড়া বিষয়ক গ্রন্থ তেমনভাবে স্থান পায় না। এ বিষয়ে তাঁর আগ্রহের কমতি ছিল না। তিনি মহাপরিচালক থাকাকালে ২০১৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় আমার লেখা গ্রন্থ ‘বাংলার ফুটবল জাদুকর’। গত বছর প্রকাশিত আমার লেখা ‘ক্রীড়াবিদদের স্মৃতিপটে বঙ্গবন্ধু’ গ্রন্থটি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। তারপরও তাঁর সঙ্গে যে নিয়মিত যোগাযোগ হতো, তা বলা যাবে না। তবে আমার প্রতি তাঁর স্নেহ যে অটুট আছে, সেটা বুঝতে পারতাম। সাধারণত বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় দেখা হলে আন্তরিকভাবে খোঁজ-খবর নিতেন।

জাতীয় জাদুঘরের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান খানের হাতে নিজের লেখা গ্রন্থ তুলে দিচ্ছেন দুলাল মাহমুদ 

শামসুজ্জামান খান তাঁর ব্যক্তিত্বের মাধুর্য দিয়ে আলাদা একটা অবস্থান গড়ে নেন। তাঁর ধীর স্বভাব, তাঁর ধীরস্থির কথা, তাঁর অমায়িক ব্যবহার দিয়ে কাছের তো বটেই দূরের মানুষদেরও আপন করে নিতে পারতেন। তাঁর যুক্তিসংগত কথা, তাঁর দৃঢ়তাপূর্ণ মেজাজ, তাঁর প্রগতিশীল ভাবনা সমাজ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। অনুদার, যুক্তিহীন ও মিথ্যাকে কখনো প্রশ্রয় দিতেন না। তিনি বরাবরই চলেছেন সত্যের পথে, যুক্তির পথে, মননশীলতার পথে। তাঁর জীবনদর্শন, তাঁর জীবন জিজ্ঞাসা, তাঁর জীবন উপলব্ধি আমাদেরকে দেখিয়েছে সঠিক পথ। অশীতিপর বয়সেও বিবেকবান মানুষ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর বোধ, তাঁর বুদ্ধি, তাঁর বিবেচনা একটুও টাল খায়নি। প্রতিনিয়ত তিনি ছিলেন সরব ও সক্রিয়। তার প্রমাণ ছড়িয়ে আছে ফেসবুকে তাঁর স্ট্যাটাসে। যে কারণে তাঁর চলে যাওয়াটা একটা শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। সেই শূন্যতা কখনো পূরণ হবে না।

১৪ এপ্রিল ২০২১

চিরসবুজ এক ছড়াকার

 

তিনি কোনো অভিনেতা নন। তিনি কোনো সংগীতশিল্পী নন। এমনকি তাঁকে সেই অর্থে টিভি তারকাও বলা যাবে না। তারপরও তিনি তারকাদের চেয়ে কোনো অংশেই কম নন। একজন অভিনেতা, একজন সংগীতশিল্পী কিংবা একজন টিভি তারকা যখন প্রতিষ্ঠিত হন, খ্যাতি অর্জন করেন বা জনপ্রিয় হয়ে উঠেন, তাঁদের কাউকে কাউকে দেখলে মনে হয়, কত কাল থেকে তাঁরা আমাদের চেনা। ধরে নেই, আমাদের চেয়ে নিশ্চয়ই অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ হবেনই। অথচ অনেকের ক্ষেত্রে বয়স হিসেব করলে দেখা যায়, তাঁরা আমাদের কাছাকাছি বয়সেরই। আসলে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়ায় তাঁদের দেখার কারণে এমন একটা বিভ্রম তৈরি হয়। কেউ কেউ খুব অল্প বয়স থেকে টিভি মিডিয়ায় জড়িত হওয়ায় আরো বেশি করে এ রকম মনে হয়।

ছড়া লিখেও যে তারকাদের মতো এমন সুখ্যাতি অর্জন করা যায়, তিনি তাঁর চমৎকার দৃষ্টান্ত। সুপরিচিত অভিনেতা, সংগীতশিল্পী ও টিভি তারকাদের মতো তাঁকেও মনে হয়, কতকাল থেকে তিনিও জ্বলজ্বল করছেন তারকা হয়ে। বয়সে কিছু সিনিয়র হলেও আমাদের শৈশব-কৈশোর থেকে তাঁর নামের সঙ্গে আমার বা আমাদের বয়সীদের পরিচয়। তখন থেকেই তিনি আমাদের কাছে তারকা। আর হবেন না কেন? স্কুলের নিচু ক্লাসের ছাত্র থাকাবস্থায় তিনি উঠে আসেন আলোচনায়। ছড়াতে থাকে তাঁর নাম, পরিচয় ও সুখ্যাতি। তাঁর ছড়ার বিষয়বৈচিত্র্য, সমসাময়িকতা ও গীতলতা পাঠককে সহজেই আকৃষ্ট করে। তাঁর মাথার মধ্যে গিজগিজ করে ছড়া। চট করে তিনি লিখতে পারেন যে কোনো বিষয় নিয়ে। দিন যতই অতিবাহিত হতে থাকে, ততই তিনি আলো ছড়াতে থাকেন। এর মধ্যে তাঁর নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে অনেক পরিচয়, তাতে তিনি রাঙিয়ে দিয়েছেন চারপাশ। তাঁর স্মৃতিগদ্য বাংলা সাহিত্যে নতুন এক ব্যঞ্জনা তৈরি করেছে। কথাকার হিসেবেও তিনি অতুলনীয়। সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মকান্ড দিয়ে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও তাঁর অবস্থান গড়ে তোলেন। তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমাও কম উজ্জ্বল নয়। তারপরও তাঁর এক ও অদ্বিতীয় পরিচয় তিনি ছড়াকার। তিনি লুৎফুর রহমান রিটন।

কলেজে পড়ার সময় একটা সাহিত্য সংকলন প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেই। মূলত শূন্য হাতেই আমরা এগিয়ে যাই। বয়সোচিত কারণেই হতে পারে, আমরা স্থির করি, এই সংকলন দিয়ে বাংলা সাহিত্যে তোলপাড় সৃষ্টি করতে হবে। মাঠে নামার পর বুঝতে পারি, যত গর্জে তত বর্ষে না। লেখক তালিকা করতে গিয়েই হিমসিম খেতে হয়। বলতে গেলে কারো সঙ্গেই ব্যক্তিগতভাবে পরিচয় নেই। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করবো কীভাবে? তারপর কার কেমন মেজাজ-মর্জি, সেটাও তো জানা নেই। আমাদের লেখা দেবেন কি-না কে জানে? কি কারণে জানি না, তালিকার একটা নামকে আমাদের খুব আপন মনে হতে থাকে। যদিও তখন তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ একমাত্র ‘ধুত্তুরি’। তাতে কী?

ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটনের সঙ্গে 


লেখক হিসেবে তখন তাঁকে কে না চেনেন? তিনি দু’হাতে লিখছেন। কীভাবে কীভাবে যেন তাঁকে খুঁজে বের করি। সম্ভবত বাংলা অ্যাকাডেমিতে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়। আমরা যেমনটি অনুমান করেছিলাম, তারচেয়েও বেশি তিনি আমাদের আপন করে নেন। তাঁর চিরকালীন প্রাণখোলা হাসি দেখে আমাদের মন জুড়িয়ে যায়। এ হাসি দিয়েই শুরুতে তিনি সবার হৃদয় জয় করে নেন। আমরাও আমাদের কাজে আস্থা ফিরে পাই। এরই মধ্যে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে আমরা হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলাম। কারো ব্যবহার, কারো কথার বরখেলাপ, কারো কারো নেতিবাচক কথাবার্তায় বুঝতে পারি, পথ বড় কন্টকাকীর্ণ। তাঁর সঙ্গে কথা হওয়ার পর আমরা এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাই। অনেকক্ষণ কথা বলে তিনি আমাদের খোঁজখবর নেন। এগিয়ে যাওয়ার পথ বাতলে দেন। সেই সঙ্গে নিজের লেখা দেওয়ার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেন। এটা ১৯৮৩ সালের কথা। তিনিও তো তখন ঢাকা বিশ্বিবিদ্যালয়ের বাংলার ছাত্র। যাহোক, তাঁর লেখা আমরা যথা সময়ে পেয়েছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না, সম্মোহিত করার এমন গুণাবলী লুৎফুর রহমান রিটন ছাড়া আর কার হতে পারে?

প্রকৌশলী নকিব আহমেদ নাদভীর নেতৃত্বে ১৯৮৫ সাল থেকে আমরা ৪/৫ জন্য তরুণ ‘হারজিত' নামে একটি খেলার পত্রিকা প্রকাশ করি। সে বয়সে সেটি ছিল আমাদের জন্য মস্ত একটি চ্যালেঞ্জ। এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা পাওয়াও খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু লুৎফর রহমান রিটনের মতো প্রতিষ্ঠিত ছড়াকার যখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, সেটা হয়ে উঠে আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। নতুন এ পত্রিকায় তিনি ছড়া দিয়ে আমাদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেন। তাঁর প্রতিটি ছড়াই আলোচিত হয়েছিল। এই পত্রিকার সুবাদে তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তা আর কখনোই ব্যাহত হয়নি। সে সময় ‘ফুটবল’ নামে তাঁর একটি গ্রন্থ বাংলা অ্যাকাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। সে গ্রন্থের জন্য কিঞ্চিৎ তথ্য দিয়ে সহায়তা করায় তিনি আমাকে অটোগ্রাফসহ একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। 

১৯৯৩ সালে ‘অক্ষরবৃত্ত' নামে আমরা চারজন মিলে একটা প্রকাশনা সংস্থা চালু করি। সে বছর আমাদের প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ ছিল আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমরা বাঙালি না বাংলাদেশী'। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে সেটি ছিল হট টপিকস। যদিও বইমেলায় আমাদের নিজস্ব স্টল ছিল না। তারপরও সে বছর সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের মধ্যে এটি ছিল একটি। রিটন ভাই তখন কর্মরত ছিলেন দৈনিক ‘বাংলাবাজার’ পত্রিকায়। তিনি এ পত্রিকার হয়ে প্রতিদিন বইমেলা কভার করতেন। পত্রিকার পেছনের পৃষ্ঠায় তিনি চমৎকার ফিচার লিখতেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর বইটি নিয়ে তিনি আমার একটা মিনি ইন্টারভিউ নিয়েছিলেন। তাঁর মতো ব্যক্তিত্ব আমার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, এটা ছিল আমার জীবনের একটি আনন্দময় ঘটনা।

তখন তিনি প্রতি বছর চ্যানেল আইয়ের হয়ে বাংলা অ্যাকাডেমির বইমেলা সরাসরি কভার করতেন। ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয় আমার দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’। এই গ্রন্থটি হাতে নিয়ে আমি বাংলা অ্যাকাডেমিতে গিয়েছিলাম। সে সময় চ্যানেল আইয়ের সম্প্রচার টিমের পরিচিত একজন জোর করে আমাকে রিটন ভাইয়ের সামনে নিয়ে যান। সাক্ষাৎকার দেওয়ার ব্যাপারে আমি বরাবরই মোটেও সাবলীল নই। সেদিনও যথারীতি এড়িয়ে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু রিটন ভাই তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় যেভাবে আমাকে ডেকে নেন, সরে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। আসলে তিনি যেভাবে মানুষকে আপন করে করে নিতে পারেন, সেটাও অনুকরণীয়। এ কারণে তাঁর যে কত অনুরাগী, কত যে ভক্ত, কত যে শুভাকাঙ্খী, দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছে, তা তিনিও জানেন না। জানার কথাও নয়।

যে কোনো প্রয়োজনে রিটন ভাইয়ের মুখাপেক্ষী হওয়া যায়। তিনি তাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে দিতে একদমই দ্বিধা করেন না। বছর দশেক আগে বাংলা অ্যাকাডেমির সদস্য হওয়ার জন্য অ্যাকাডেমির দুজন সদস্যের স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়ে। এ ক্ষেত্রে সবার আগে মনে পড়ে রিটন ভাইয়ের কথা। চ্যানেল আইতে দেখা হলে আমার আর্জি জানানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজে স্বাক্ষর তো করে দিলেনই, আগ বাড়িয়ে আরেকটি সই তাঁর বন্ধু আহমাদ মাযহারকে দিয়ে করিয়ে দেন। মনোভাবটা এমন, যেন তিনি এটা করে দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। এটাই তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। তাঁর মতো এমন পরম হিতৈষী ও দিলখোলা মানুষ হওয়া অনেক সাধনার ব্যাপার।

১ এপ্রিল ২০২১

খেপাটে এক কবির কথা

আশির দশকে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির এক অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে বসা দুলাল মাহমুদ, দিলু খন্দকার, নকিব আহমেদ নাদভী ও কবি সানাউল হক খান 



দৃশ্যপট-১

আশির দশকের মাঝামাঝি। আমরা কজন তরুণপ্রাণ মিলে প্রকাশ করছি 'হারজিত' নামে একটি ক্রীড়া পত্রিকা। কেউ শিক্ষার্থী। কেউ সদ্য চাকরিজীবী। সামর্থ্য সীমিত। সাধ অফুরন্ত। এই পত্রিকাকে পাঠকের কাছে সমাদৃত করার জন্য আমাদের চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু আর্থিক অবস্থার সঙ্গে কুলিয়ে ওঠতে পারছিলাম না। এ কারণে সাধারণত নামকরা ছাপাখানা বা উন্নতমানের কাগজে পত্রিকা ছাপা হলেও কখনো কখনো সেই ধারা রক্ষা করা যাচ্ছিল না। এ অবস্থায় একটি সংখ্যার ছাপার মান খুবই খারাপ হয়ে যায়। বেশিরভাগ লেখাই পড়া যাচ্ছিল না। তাতে তো আর আমাদের কোনো হাত ছিল না। ছাপাখানার গাফিলতির কারণে এমনটা হয়। সংখ্যাটি দেখে আমাদের বুক ভেঙে যাচ্ছিল। নিজেদের নিংড়ে দিয়ে এক একটা সংখ্যা প্রকাশ করি। ছাপাখানার কারণে তা যদি পাঠযোগ্য না হয়, তারচেয়ে কষ্ট আর কী হতে পারে? সবে ছাপাখানা থেকে আনা সেই সংখ্যাটির প্রথম কপিটি নিয়ে বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতিতে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে ছিলাম। চোখে টলমল করছে অশ্রু। এমন সময় এলেন সিনিয়র একজন লেখক। তিনি প্রতিটি সংখ্যায় লেখা দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করে থাকেন। সেই সংখ্যায়ও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর লেখা। তিনি আমার হাত থেকে কপিটি নেন। তারপর পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকেন। ভেবেছিলাম, আমার অবস্থা দেখে তিনি একটু সান্ত্বনা দেবেন। সহমর্মিতা প্রকাশ করবেন। সহানুভূতি জানাবেন। বয়সের যে ব্যবধান, তাতে তেমনটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু যা ভেবেছি হয়েছে তার উল্টো। এমনটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি যা করলেন, তাতে তিনি যেন 'কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা' দিলেন । তাঁর লেখাটি দেখার পর তিনি সংখ্যাটি ছুঁড়ে মারেন আমার মুখের উপর। তারপর ক্ষোভের ঝাল মিটিয়েছেন মুখের ভাষায়। যেন আমরা ইচ্ছে করে এমনটি করেছি। এমন অবস্থায় কী আর করার থাকে? অধিক শোকে পাথর হয়ে বসে ছিলাম। 

বাঁ থেকে দিলু খন্দকার, নজমুল আমিন কিরণ, সালমা রফিক, দুলাল মাহমুদ, কবি সানাউল হক খান, মনিরুল ইসলাম কাজল ও আরেকজন



দৃশ্যপট-২

নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়। পাক্ষিক 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এর প্রসার বাড়ানোর জন্য নানাভাবে উদ্যোগ নেই। তার অংশ হিসেবে পাঠকের ভোটে প্রতি বছর একজন সেরা ক্রীড়াবিদ এবং একজন সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এজন্য প্রতি সংখ্যায় কুপন ছাপানো হয়। পাঠকরা কুপন কেটে তা পূরণ করে বছরের সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিকের নাম পাঠিয়ে দেন। সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা সেরা ক্রীড়া সাংবাদিকের পাশাপাশি পাঠকদের জন্যও ছিল অর্থ পুরষ্কার। যথারীতি পত্রিকার কাটতি বেড়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে কুপন গণনা করে সেরা ক্রীড়াবিদ হন ক্রিকেটার আকরাম খান। তখন তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা। আইসিসি ট্রফি জয়ের প্রধান নায়ক তিনি। আর সেরা ক্রীড়ালেখক হন 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অস্থায়ীভাবে কর্মরত মাহমুদুল হাসান শামীম। এই পুরষ্কারের ক্রাইটেরিয়া ছিল, 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় স্থায়ীভাবে কর্মরত কেউ এই পুরষ্কার পাবেন না। একবার কেউ এই পুরষ্কার পেলে আগামীতে তাঁর আর পাওয়ার সুযোগ থাকবে না। তখন তো ক্রীড়ালেখক কিংবা ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য কোনো পুরষ্কারের প্রচলন ছিল না। সে কারণে পর্যায়ক্রমে তাঁদেরকে সম্মানিত করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। যাহোক, বিজয়ীদের হাতে পুরষ্কার তুলে দেওয়ার জন্য পত্রিকার প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর দিন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে এ অনুষ্ঠানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের প্রথম সচিব কাজী আনিসুর রহমানকে সম্মানিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। কিন্তু তাঁর অবদানের কথা জানতাম। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী সংখ্যায় একজন সিনিয়র লেখককে দিয়ে তাঁর ওপর প্রতিবেদন লেখানো হয়। সেই সুবাদে তাঁদের দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন একজন মন্ত্রী। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সম্মানিত অতিথি তাঁর বক্তব্যের সময় সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আমরা তো রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যাই। এটা কোনোভাবেই তো তাঁর এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। এ বিষয়ে তাঁর জানারও কথা নয়। বয়োজ্যেষ্ঠ অতিথির বক্তব্যে প্রভাবিত হয়ে প্রধান অতিথিও একই রকম অভিমত ব্যক্ত করেন। দুজনের এমনতর বক্তব্যে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও সৌন্দর্য অনেকখানি ম্লান হয়ে যায়। 

অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকেই বুঝতে পারেন, সম্মানিত অতিথিকে এ বিষয়ে বলতে উদ্বুদ্ধ করেন সিনিয়র সেই লেখক। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় 'কর্মরত' হয়েও শামীম কেন পুরষ্কার পেয়েছেন? তাঁর মতো একজন বিশিষ্ট লেখক কেন পুরষ্কার পাননি, সম্মানিত অতিথি সে প্রশ্ন উত্থাপন করেন। শামীম 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকায় অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করতেন। আর পাঠকদের ভোটে সিনিয়র লেখক সম্ভবত দ্বিতীয় হয়েছিলেন। সেক্ষেত্রে আমাদের করার কী ছিল? সেখানেই সিনিয়র লেখক ক্ষান্ত হননি। এর পর থেকে বেশ কিছু দিন বিভিন্ন জায়গায় তিনি আমার সম্পর্কে এমন সব অপপ্রচার করেন, যা মোটেও শোভনীয় ও সম্মানজনক ছিল না। তাঁর কারণে এরপর থেকে সেরা ক্রীড়াবিদ এবং সেরা ক্রীড়ালেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিক নির্বাচন থেকে বিরত থাকি। অন্যকে সম্মানিত করতে গিয়ে নিজেকে যদি অপমানিত ও অসম্মানিত হতে হয়, তাহলে কার দায় ঠেকেছে এমন আয়োজন করার? 

বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় একাডেমির সভাপতি শামসুজ্জামান খান, প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম হুদা, কবি সানাউল হক খান ও দুলাল মাহমুদ 


দৃশ্যপট-৩

২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। বাংলা একাডেমির সাধারণ সভা। সিনিয়র একজন লেখকের সঙ্গে দেখা হয়। আড্ডাও হয়। দুপুরের মধ্যাহ্নভোজনের সময় আমি তাঁকে বললাম, গুলশানে আমার একটি বিয়ের নিমন্ত্রণ আছে। আমি সেখানে চলে যাবো। গুলশানে যে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ, সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রক সিনিয়র লেখকেরও পরিচিত। তাঁকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে কিনা সেটা তো আমি জানি না। এ কারণে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে যাওয়া আমার পক্ষে শোভনীয় ছিল না। এতে দুজনকেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়। আর তিনি যদি সে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে থাকেন, তাহলে আমি যখন তাঁকে গুলশানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলি, তাঁর তো বুঝে নেওয়ার কথা। তিনি আমাকে সে বিষয়ে কিছু বলেননি। বললে একসঙ্গে যেতে পারতাম। আমি যথারীতি সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেই। দুদিন পর তিনি আমার অফিসে আসেন। আমাকে কিছু বলেননি। আমার আড়ালে সহকর্মীদের বলে যান, আমি একজন মিথ্যেবাদী। আমি যে পরিচিত জনের সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছি, সেটা আমি তাঁকে বলিনি। সেই অনুষ্ঠানে তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন। আমন্ত্রকের কাছে আমার চেয়েও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। প্রথম কথা, সেই অনুষ্ঠানে তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন কিনা আমি কীভাবে জানবো? দ্বিতীয়ত, আমি যখন গুলশানে বিয়ের অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা বলি, তিনি তো কিছুই আমাকে বলেননি। তিনি জানতেও চাননি, আমি কোন অনুষ্ঠানে যাচ্ছি। তৃতীয়ত, তিনি কিন্তু সে অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার বিষয়ে তাঁকে জানানো আমারও কোনো দায় ছিল না। তাহলে এ ক্ষেত্রে আমি কীভাবে মিথ্যেবাদী হলাম? আমি যদি অসত্য বলেও থাকি, সে কথা আমার কাছে জানতে না চেয়ে অফিসের সহকর্মীদের কাছে মিথ্যেবাদী হিসেবে অভিহিত করে আমাকে কেন অসম্মানিত করলেন? এর কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না।

যে তিনটি দৃশ্যপটের কথা উল্লেখ করলাম, তিনটি ঘটনার সিনিয়র লেখক কিন্তু একই ব্যক্তি। সাহিত্য জগতে তিনি পরিজ্ঞাত। তাঁর সঙ্গে তো সম্পর্ক তো আজকের নয়। প্রায় চার দশক হতে চলেছে। আমার সঙ্গে তাঁর এমন অসংখ্য অম্ল-মধুর ঘটনা বা দৃশ্যপট রয়েছে। তা নিয়ে অনায়াসেই একখানা গ্রন্থ রচনা করা যায়। আমি যদি তাঁর নামটি নাও লিখি, তাঁকে যাঁরা চেনেন কিংবা জানেন, তাঁরা ইতোমধ্যে ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, তিনি কে? তাঁকে অসম্মানিত বা হেয় করার জন্য আমি এই দৃশ্যপটগুলোর কথা উল্লেখ করিনি। তাঁর মতো একজন কৃতী মানুষকে বোঝার জন্য এই দৃশ্যপটগুলো উল্লেখ না করলে তাঁকে পুরোপুরিভাবে চেনা যাবে না। কারণ, তাঁর জীবনী লেখা কিংবা তাঁকে নিয়ে গবেষণা হলে এ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি তো আসলেই এমনই। অন্য সবার থেকে আলাদা। মেজাজী, মারমুখী ও মেধাবী। মেধাবীরা বোধকরি একটু খেপাটে বা পাগলাটে হয়ে থাকে। তিনি তাঁর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আড়ালে-আবডালে তাঁর ঘনিষ্ঠরা তাঁকে 'পাগলা কবি' বলে থাকেন। এটা তিনি জানেনও। আমার ধারণা, ভিতরে ভিতরে এটা তিনি উপভোগ করে থাকেন। মজার বিষয় হচ্ছে, তিনি এমন সব কাণ্ড-কীর্তি করেন, তা সবার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় না। কিন্তু তাঁকে যাঁরা চেনেন বা জানেন, তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষুব্ধ হলেও তাঁর এই ধরনের আচরণ মেনে নেন। তিনি এমনটা করবেন, এটাই যেন স্বাভাবিক। তিনি যখন তা না করেন, তখন সেটাই অস্বাভাবিক মনে হয়। তবে তিনি যদি এমনটা না করতেন, তাহলে নানাভাবে আরো সম্মানিত হতে পারতেন বলে আমার ধারণা। আমার কেন যেন মনে হয়, তাঁর ভিতরে একটা না পাওয়ার অতৃপ্তি ও ক্ষোভ কাজ করে। কেন এই অতৃপ্তি, কেন এই ক্ষোভ আমি বলতে পারবো না। এই অতৃপ্তি, এই ক্ষোভ তাঁকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। যে কারণে সেই হতাশা বোধ থেকে সব কিছু ভেঙেচুরে ফেলতে চান। তখন কোনটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক, সেই বোধ আর কাজ করে না। যে কারণে একের পর এক জন্ম দেন বিভিন্ন দৃশ্যপট। এই দৃশ্যপটগুলো যে অনেকের হৃদয়ে কষ্টের ছাপ ফেলে দেয়, সেটা কখনো তিনি অনুধাবন করেন কিনা আমার জানা নেই। 

ক্রীড়াজগত কার্যালয়ে বাঁ থেকে কবি সানাউল হক খান, সব্যসাচী ক্রীড়াব্যক্তিত্ব রনজিৎ দাস ও দুলাল মাহমুদ 


ব্যক্তি জীবনে যেমন, লেখালেখির ক্ষেত্রেও তিনি স্বতন্ত্র একটা ইমেজ গড়তে পেরেছেন। তিনি কবি হিসেবে সুপরিচিত। ষাট দশকের মাঝামাঝি থেকে তিনি নিরন্তর লিখে চলেছেন। ছন্দ নিয়ে তিনি খেলতে পছন্দ করেন।এ ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত সাবলীল। ১৯৮০ সালে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ 'অন্ধ করতালি'। এরপর বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কার। কিন্তু আমাদের কাছে তিনি ক্রীড়ালেখক হিসেবে অধিক পরিচিত ও সমাদৃত। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি খেলাধুলা নিয়ে লিখে আসছেন। ক্রীড়াঙ্গনে তিনি আলাদা একটা অবস্থান গড়ে নিয়েছেন। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, সেই কৈশোরে যাঁদের লেখা পড়ে ক্রীড়া লেখালেখিতে আকৃষ্ট হই, তিনি তাঁদের অন্যতম। তাঁর লেখার জাদুতে একরকম হিপটোনাইজ হয়ে যাই । প্রতিটি লেখা পড়তাম বুভুক্ষু হৃদয় নিয়ে। তাঁর লেখার বুনন, শব্দের কারুকাজ আর সৌন্দর্যের তুলনা পেতাম না। মনে হতো এক একখানা 'ঢাকাই মসলিন'। অতি মিহি ও সূক্ষ্ণ কাপড় দিয়ে যেভাবে শিল্পীরা আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা নিয়ে বয়ন করতেন জগতবিখ্যাত মসলিন, তিনি যেন তেমনিভাবে আমাদের উপহার দিতেন ঐশ্বর্যময় সব লেখা। লেখার পরিসর সীমিত হলেও তার ব্যঞ্জনা অনেক দূর প্রসারিত। তাতে দ্যুতি ছড়ায় হীরার মতো। তাঁর লেখায় পাওয়া যায় সংগীতের তাল-লয়-সুর। তাঁর উপমা, উৎপেক্ষা, ছন্দ হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়। আমার সীমিত জ্ঞানে প্রকৃতঅর্থে ক্রীড়াসাহিত্য বলতে যেটা সাধারণত বোঝায়, বাংলাদেশে অন্তত সেটা তাঁর মাধ্যমে তা চর্চিত হয়। বিকশিত হয়। জনপ্রিয় হয়। নিঃসন্দেহে এ ক্ষেত্রে তিনি পুরোধা। তাঁর ছড়া, তাঁর গদ্য কিংবা তাঁর যে কোনো লেখা পাঠকদের শুধু মুগ্ধ করে না, অভিভূত করে রাখে। কোনো লেখায় তাঁর নাম না থাকলেও সেটা বুঝে নিতে মোটেও অসুবিধা হয় না, লেখাটি কে লিখেছেন? পুরোদস্তুর একজন কবি হয়েও তিনি যে ক্রীড়াসাহিত্যে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন, এটা আমাদের কাছে অনেক বড় পাওয়া। তিনি লেখালেখি না করলে ক্রীড়াসাহিত্য অনেকখানি অনুজ্জ্বল হয়ে থাকতো। ক্রীড়া বিষয়ক লেখালেখি যে এভাবে করা যায়, তাঁর লেখা না পড়লে কখনো বুঝতে পারতাম না। তবে চাইলেও তাঁকে অনুকরণ এমনকি অনুসরণ করা যায় না। সহজাত যে প্রতিভা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন, সেটা একান্তই তাঁর নিজস্ব ঘরানা। এই ঘরানা বয়ে নিয়ে যেতে দ্বিতীয় কাউকে আমি দেখি না।

ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে আমার অনেক তিক্ততা আছে, আছে মিষ্টতাও, কিন্তু  লেখক হিসেবে তাঁর প্রতি মুগ্ধতা কখনো ম্লান হয়নি। এ কারণে সম্পর্কের সাম্পান বেয়ে আমরা এগিয়ে চলেছি। দীর্ঘ সময়ে যোগাযোগটা কখনো পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। অল্প যে কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর এখনও নিয়মিত যোগাযোগ বা আড্ডা হয়, আমি তাঁদের একজন। তাঁর সমস্যা ও সংকট আমাকে দারুণভাবে উদ্বিগ্ন করে। 'ক্রীড়াজগত' পত্রিকাও তাঁর ভালোবাসার অন্যতম নিকেতন। এখানে ঢুঁ না মারলে তিনিও স্বস্তি পান না। তাঁর সমসাময়িকরা বলতে গেলে নিজেদের অনেকটাই গুটিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু তিনি এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি এখনও অনুভব করেন তারুণ্যের ঝলকানি। 

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তাঁকে আগের মতো উজ্জ্বল লাগে না। শারীরিকভাবে তিনি বরাবরই ফিট। এটা নিয়ে তাঁর এক রকম গর্ব ছিল। কিছু দিন আগে শারীরিকভাবে বড় ধরনের একটা বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠতে সক্ষম হন। এরপর থেকে ফিটনেস নিয়ে আগের সেই গৌরবটা তাঁর নেই। কথা বলার সময় খানিকটা জড়িয়ে যায়। চলাফেরায় এসেছে মন্থরতা। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে কাগজ-কলমের সঙ্গে দীর্ঘ দিনের সম্পর্কটা। এ কারণে লেখালেখিতে আর আগের মতো সক্রিয় নন। এটা আমাদের জন্য বটেই, কবিতা ও ক্রীড়া সাহিত্যের জন্য অনেক বড় একটা ক্ষতি। তবে ধীরে ধীরে হলেও ফিরে পাচ্ছেন তাঁর সুস্থতা ও তাঁর সক্ষমতা। লেখালেখিতে তিনি দ্রুতই আবার আগের মতো ফিরে আসবেন, এই প্রত্যাশা তাঁর তাবৎ অনুরাগীর। 

আমি যত দূর জানি, বাংলা ভাষায় ক্রীড়া বিষয়ক প্রথম ছড়ার গ্রন্থ তাঁর। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকালে অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৯৩ সালে প্রকাশ করেছিলাম তাঁর 'ছন্দে ছন্দে খেলার আনন্দে' ছড়াগ্রন্থ। কোনো একজনের গ্রন্থ অতীতে তো বটেই, পরবর্তীকালে সমিতি থেকে আর প্রকাশিত হয়নি। তাঁর এই গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে আমি গর্ব অনুভব করি। তাঁর ক্রীড়া সংক্রান্ত মূল্যবান লেখাগুলো সব এলোমেলো পড়ে আছে। তা যদি গ্রন্থবদ্ধ করা যেত, তা নতুন প্রজন্মের কাছে সমাদৃত হতে পারতো, একই সঙ্গে সমৃদ্ধ হতো বাংলা ক্রীড়া সাহিত্যের ভাণ্ডার। নিশ্চয়ই কোনো একদিন এ কাজটি সম্পন্ন হবে। তিনি ফরমায়েশি লেখা লিখতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। লেখেন মনের আনন্দে। বড় পরিসরের লেখাও লেখেন না। যে কারণে তাঁর গদ্যের আয়তনের তেমন বিস্তার ঘটে না। এটা জানা সত্ত্বেও কবিতা, খেলাধুলা আর সংগীতের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তাঁকে ধারাবাহিকভাবে লিখতে অনুরোধ করেছিলাম। কবিতা তাঁর সহজাত। খেলাধুলা তাঁর সঞ্জীবনী। আর সংগীত তাঁর চিত্তবৃত্তি। এই তিনের সমন্বয়ে তিনি লিখলে বাংলা সাহিত্যে নতুন কিছু সংযোজন হতে পারতো। কিন্তু বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেছেন। অথচ 'দিশি গান বিলিতি খেলা' শিরোনামে সংগীত ও ক্রিকেটের যুগলবন্দী ঘটিয়েছেন পশ্চিম বঙ্গের লেখক কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সেটা দারুণভাবে সমাদৃত হয়েছে। কিশোর বয়সে সেই পঞ্চাশ দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামের সঙ্গে তাঁর আত্মিক বন্ধন, তিনি অনেক ঘটনার নিবিড় প্রত্যক্ষদর্শী, সেই নস্টালজিয়া তাঁর কাব্যিক কলমে হতে পারতো দারুণ সুস্বাদু, তিনি কেন যেন তা উপেক্ষা করেছেন। এমনকি তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন নিয়ে স্মৃতিকথা লেখার বিষয়ে এখনও তিনি একদমই আগ্রহী হননি।

নানান কার্যকারণের জন্য সমসাময়িক কালের কাউকে মূল্যায়ন করাটা সহজ নয়। বিশেষ করে তাঁর মতো খেপাটে মানুষ, যাঁর সঙ্গে কারো না কারো কারণে বা অকারণে খিটমিটি লেগেই যায়, তাঁকে বিচার-বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে যাচাই না করে তাঁর সৃষ্টিকর্মের যদি মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। এক্ষেত্রে তিনি একক ও অদ্বিতীয়। কবি ও ক্রীড়ালেখক হিসেবে সানাউল হক খান সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয়। তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

৩ জানুয়ারি ২০২০

প্রতিবাদী সজ্জন এক কবি

 

নীরবতার যে একটা ভাষা আছে, সেটা তাঁকে দেখলে বুঝতে পারা যায়। তাঁর মুখাবয়বে ফুটে ওঠে দৃঢ়তার প্রতিচ্ছবি। তিনি যখন কথা বলেন, তাতে স্পষ্ট হয় একটা অনমনীয় মনোভাব। কিন্তু বলার মধ্যে দার্ঢ্য  থাকলেও অশোভনীয়ভাবে কিছু প্রকাশ করেন না। কথা বলেন খুব মার্জিত ও স্মার্টলি। এবং আন্তরিকতার সঙ্গে। তাঁর ব্যক্তিত্বের মধ্যে আলাদা একটা ‌মাধুর্য আছে। তা সহজেই আকৃষ্ট করে। তিনি কবি, সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা হালিম আজাদ।

গৌরব করার মতো তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন। কিন্তু কখনোই নিজের পরিচয় তুলে ধরে অহমিকা করতে দেখিনি। অহমিকা তো দূরে থাক, সগৌরবে নিজের পরিচয় দিতেও তাঁর অপরিসীম কুণ্ঠা। যেখানে যতটুকু প্রয়োজন, তার বাইরে অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলা বা করা তার ধাতে নেই। যে কারণে তিনি গ্ল্যামারাস হতে পারেননি। না পারার কারণে তিনি বরাবরই আড়ালে রয়েছেন। অথচ তিনি চাইলে অনেক কিছু করতে পারতেন। প্রভাব-প্রতিপত্তি দেখাতে পারতেন। নিজের ঢাকঢোল পেটাতে পারতেন। আর্থিক ও সামাজিকভাবে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারতেন। একটুখানি আপস ও সমঝোতার মনোভাব থাকলে সুযোগ-সুবিধা করায়ত্ত করতে পারতেন। 

তিনি তো সেই ধাচের নন। বেছে নেন সংগ্ৰামী জীবনকে। সেই তারুণ্যে যে আদর্শ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন, তা থেকে কখনো বিচ্যুত হননি। শিল্প-সাহিত্য-সমাজ-রাজনীতি-অর্থনীতি পরিবর্তনের নেশায় বুঁদ হয়ে যান। কিশোর বয়সে করেছেন নাটক ও যাত্রাপালা। পৈত্রিক সূত্রে বুকের মধ্যে দানা বাঁধে সুর। পারিবারিক পরিবেশটাই ছিল সংস্কৃতি চর্চার অনুকূলে। একে একে জড়িয়ে পড়েন প্রতিটি মাধ্যমে। অল্প সময়ের মধ্যে হয়ে ওঠেন নারায়ণগঞ্জের মেধাবী মুখ। একজন মুক্তবুদ্ধি, মুক্তচিন্তা ও মননশীল মানুষ হিসেবে হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অগ্ৰসেনানী। কখনো মিছিল করেছেন। কখনো গান গেয়েছেন। কখনো আবৃত্তি করেছেন। যেখানে অন্যায় সেখানেই গর্জে উঠছেন প্রতিবাদে। নারায়ণগঞ্জের যে কোনো আন্দোলনে, সংগ্ৰামে তাঁকে দেখতে পাওয়া যায় প্রথম সারিতে। তবে তাঁর জীবনের ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা হয়ে ওঠে সাহিত্যচর্চা। স্কুল বয়সেই কবিতার সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্য। লেখালেখির পাশাপাশি সাহিত্য সংকলন সম্পাদনা ও সাহিত্য সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। সম্পাদনা করেছেন বেশ কয়েকটি সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংকলন। সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যের বাগানে বসন্ত নিয়ে আসে 'ড্যাফোডিল'। তাঁর বর্ণে, গন্ধে, সৌরভে সুরভিত হয়ে ওঠে নতুন প্রজন্মের সাহিত্য অনুরাগীরা। এই সংগঠন ও সংকলনের কাণ্ডারিদের অন্যতম ছিলেন তিনি।

২০০৫ সালে বাংলা একাডেমিতে দুলাল মাহমুদের লেখা 'স্টেডিয়ামের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ' গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে দ্বিতীয় কবি তাহের উদ্দীন, কবি হালিম আজাদ, দুলাল মাহমুদ, কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আগামী প্রকাশনীর সত্বাধিকারী ওসমান গণি, লেখক মোস্তফা কামাল 


রাজধানী ঢাকার প্রলোভন সত্ত্বেও শিকড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। নারায়ণগঞ্জের হালিম আজাদ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সেই পরিচয় ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন সবখানেই। পেশা হিসেবে বেছে নেন সাংবাদিকতাকে। সেই সুবাদে ঢাকার সঙ্গে নিত্য যোগাযোগ ও নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৮৩ সালে দৈনিক 'বাংলার বাণী' পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে শুরু করেন সাংবাদিকতার পথপরিক্রমা। প্রায় আড়াই দশক এই পত্রিকার সঙ্গে সুখে-দুঃখে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিলেন। অর্থনৈতিক টানাপোড়েনকে কখনোই বড় করে দেখেননি। পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে এরপর দৈনিক যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), চ্যানেল আই, সাপ্তাহিক বিচিত্রা হয়ে পুনরায় বাসসে কর্মরত ছিলেন। 'বাংলার বাণী' পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। প্রায় চার দশকের সাংবাদিকতার জীবনে মুখোমুখি হয়েছেন কত রকম অভিজ্ঞতার। কত প্রতিকূলতার। কখনো বুঝতে দেননি। শান্তশিষ্ট নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বোঝায়, তিনি তাই। কিন্তু কোনো অন্যায়কে তিনি মেনে নিতে পারেন না। পারেন না বলেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েও প্রতিবাদে সরব হন। তোয়াক্কা করেন না কোনো ভয়ভীতির।  

সমসাময়িক বিষয়গুলো তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর কবিতায়। তাতে বাঙময় হয়ে ওঠে ভেতরের দুঃখ-কষ্ট-ক্ষোভ-যন্ত্রণাগুলো। যে কথাগুলো তিনি মুখে প্রকাশ করতে পারেন না, তা খুব সাবলীলভাবে কবিতায় ভাষা দেন। 


আমি যদি আবার কথা বলি আমার মুখ যদি 

আবার খুলে যায়, 

তাহলে এক এক করে সকল মায়ের মুখে 

সূর্যের রশ্মির মতো আলোকমালা ফোটাবো।


তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। কবিতায় তাঁর প্রতিবাদ পৌঁছে যায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। হুমকি দেওয়া হয়। থাকতে হয় আত্মগোপনে। বঙ্গভবনে নিয়ে গিয়ে তাঁর কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কিন্তু তিনি কখনোই নতি স্বীকার করেননি। আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়ার কথা ভাবতেই পারেন না। কবিতাকে কখনোই পণ্য হতে দেননি। যদিও তিনি পরিচিত সত্তর দশকের কবি হিসেবে। কিন্তু স্কুল বয়স থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তিনি কবিতা লিখে আসছেন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় নিমগ্ন হয়ে আছেন কবিতায়। আটকা পড়ে আছেন কবিতার মায়াজালে। তিনি কখনো কবিতাকে ছাড়েননি। কবিতাও তাঁকে ছেড়ে যায়নি। জীবনে অনেক কঠিন ও দুঃসময় এসেছে। সেই সময় আশ্রয় পেয়েছেন কবিতার কাছে। এছাড়াও আরেক জনের কাছে তিনি চিরঋণী হয়ে আছেন। তাঁর সুখ-দুঃখের সহচরী ভালোবাসার মানুষ ফাহমিদা আজাদ। জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে সব রকম সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়ে আসছেন তাঁর এই জীবনসঙ্গিনী। ইদানিং শারীরিক অসুস্থতার কারণে হালিম আজাদের চলার গতি খানিকটা মন্থর হয়ে গেলেও লেখালেখিতে সক্রিয় আছেন অবিরাম। ফেসবুক হয়ে ওঠেছে তাঁর প্রধান মাধ্যম। 

১৯৮৭ সালে শেরপুরে সুভাষ চন্দ বাদলের বিয়ের অনুষ্ঠানে দুলাল মাহমুদ, গিয়াস কামাল চৌধুরী, কবি হালিম আজাদ ও দাউদ ভুঁইয়া। 


তাঁকে পেয়েছি সহকর্মী হিসেবে। সহমর্মী হিসেবে। ১৯৮৯ সালে নারায়ণগঞ্জের টাউন হলে আয়োজিত তাঁর বৌভাতের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। জীবনের চলার পথে কাছের অনেকেই দূরে সরে গেছেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের যে বন্ধন গড়ে ওঠে, তা আজও অটুট রয়েছে। 


(হালিম আজাদের জন্ম ১৯৫৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার মধ্যনগর গ্ৰামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ :

কবিতা : অদ্ভুত দরোজার কাছে (১৯৮২), ভেঙ্গে দাও নারকীয় দেয়াল (১৯৮৫), পাথরের মানুষ (১৯৮৭), কারে কারাে দিকে অবিরাম চেয়ে থাকা (১৯৮৮), যে তিমির হৃদয় ছুঁয়ে যায় (১৯৮৯), মস্কো টাওয়ারে কিছুক্ষণ (১৯৯১), কবিতা সমগ্র (২০১২), নির্বাচিত ২০০ কবিতা (২০১৩), জলমহালের কাব্য (২০১৭)।

উপন্যাস : দূর্বাঘাস আর গ্রেনেডের কল্প (২০০৪), খনন (২০০৫), মুক্তিস্মান (২০০৬), লড়াই (২০০৬), নীল বাংকার (২০১০), গঙ্গানামা (২০১৮), বেদেস্বর (২০১৯)।

ছোট গল্প : ঘরে ঘরে যুদ্ধ (২০০১), সাবিত্রী ও অন্যান্য গল্প (২০১৭)। প্রবন্ধ : শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও অন্যান্য প্রবন্ধ। জীবনীগ্রন্থ : সাংবাদিক-লেখক বেবী মওদুদ (২০১৫)। সম্পাদনা গ্ৰন্থ : পৃথিবীর কাছে নোটিশ (১৯৭৭), চেতনায় তুমি বিপ্লব (১৯৮২), নিরালােকে বসতি (১৯৮৫), ড্যাফোডিল কাব্যগ্রন্থ (১৯৮৪), সুবর্ণ গ্রামের কবিতা (২০১২), সাহিত্য সংকলন সমমনা' র দুটি সংখ্যা (২০১০ ও ২০১২), জনান্তিকে ত্বকী (২০১৪)। 

সংগঠন :

জাতীয় কবিতা পরিষদ, পদাবলী ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশ পার্লামেন্ট সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা যুগ্ম-আহ্বায়ক, নারায়ণগঞ্জ কবিতা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সাত বছর সভাপতির দায়িত্ব পালন, জাতীয় প্রেস ক্লাবের স্থায়ী সদস্য।

পুরস্কার : 

জাতীয় প্রেস ক্লাব সাহিত্য পুরস্কার ২০০৩, চ্যানেল আই আনন্দ আলো সাহিত্য পুরস্কার, শ্রুতি সাংস্কৃতিক একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, চারণ সাহিত্য পুরস্কার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি পদক ২০১৫, পদক্ষেপ সাহিত্য পুরস্কার ২০১১, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সংবর্ধনা পেয়েছেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এবং মধ্যনগর প্রাক্তন ছাত্র সমিতির, এম. নুরুল কাদের শিশু সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২০

প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা একজন কবি


বাংলা একাডেমির বার্ষিক সাধারণ সভায় বাঁ থেকে তৃতীয় ফরিদা ইয়াসমিন, পঞ্চম কবি সোহরাব হাসান, দুলাল মাহমুদ ও কবি সানাউল হক খান 


সংবাদপত্রের নিউজ টেবিল মানে কার্যত একটা ভাবগম্ভীর পরিবেশ। খুব বেশি কথাবার্তা বলা যাবে না। কাজ করতে হবে নিঃশব্দে। না হলে কাজে মনোযোগ থাকবে না। ভুল-ভ্রান্তি হয়ে যেতে পারে। যেন পরীক্ষার হল। আশির দশকের শুরুর দিকেও এমন একটা মনোভাব দেখেছি।‌ লেখালেখি কিংবা আড্ডা দিতে যাবার সুবাদে বিভিন্ন সংবাদপত্রে যেতাম। তখন দেখতাম, রিপোর্টিং ডেস্কে প্রাণের উত্তাপের কমতি নেই। একটা হৈ-হুল্লোড় লেগেই থাকতো। কিন্তু নিউজ ডেস্কে সবাই মাথা গুঁজে কাজে ডুবে আছেন। যেন এ কাজ করা না হলে পৃথিবীর বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। কর্মরতরা কথা বলতেন চেপে চেপে। মেপে মেপে। এমন একটা ধারণা নিয়ে আমি ১৯৮৫ সালের মার্চে দৈনিক 'বাংলার বাণী' পত্রিকায় শিক্ষানবীশ সহ-সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। ভিতরে ভিতরে একটা টেনশন তো ছিলই। কিন্তু প্রথম দিনই আমার এই ধারণাটা একদম ভেঙেচুরে দেন সেই সময়ের পালাপ্রধান বা শিফট-ইন-চার্জ। তিনি কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান। তাঁর কাজের ধরন দেখে আমার আগেকার উপলব্ধি ভুল প্রমাণিত হয়। একটি দায়িত্বশীল পদে থেকেও তিনি প্রচলিত ধারায় বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন, জীবনকে এত কঠিনভাবে নেওয়ার কিছু নেই। জীবনে হাসি থাকবে। আনন্দ থাকবে। প্রাণোচ্ছ্বলতা থাকবে। তার মধ্যেই কাজ করতে হবে। তবে কাজটাকেও তুচ্ছ মনে করা যাবে না। সেটাও করতে হবে যথেষ্ট দায়িত্ব নিয়ে। এই জীবনদর্শন নিজে যেমন মেনে চলেছেন, অন্যকেও অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর সংস্পর্শে এসে কতজন বদলে ফেলেছেন জীবনধারা।

তাঁর অট্রহাসিতে সরগরম থাকতো পুরো নিউজ রুম। শুধু নিউজ ডেস্ক কেন, একই কক্ষে কাছাকাছি অবস্থানে বসতো সম্পাদকীয়, রিপোর্টিং ও সংশোধনী বিভাগ। তাঁর হাসি ছড়িয়ে পড়তো চারপাশে। এমনকি পৌঁছে যেত সম্পাদকের কক্ষ অব্দি। রিপোর্ট লেখার সময় মন বসাতে ব্যর্থ হয়ে সিনিয়র রিপোর্টার দাউদ ভূঁইয়া কিংবা সুভাষ চন্দ বাদল চিৎকার করে ওঠতেন। সম্পাদকীয় লেখায় মনোনিবেশ করতে না পেরে নিজেদের রুম থেকে বের হয়ে আসতেন যুগ্ম-সম্পাদক আজিজ মিসির কিংবা সহকারী সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। এমনকি কখনো কখনো সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম সেলিমও। তিনি তাঁদের এমন উত্তর দিয়ে দিতেন, তাঁরা হাসতে হাসতে চলে যেতেন। আবার কখনো তাঁদের কথায় সাময়িক বিরতি দিলেও ফর্মে ফিরে আসতে সময় নিতেন না। এরপর আর কেউ কিছু বলতেন না। কিছু মনেও করতেন না। সবাই জানতেন তিনি এমনই। একটু বোধকরি পাগলাটে কিসিমের। কখনো অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। কখনো প্রাণখোলা হাসিতে উদ্ভাসিত হচ্ছেন। দমবন্ধ করা পরিবেশ মোটেও পছন্দ করতেন না। তাঁর কারণেই নিউজ টেবিলটাই হয়ে ওঠতো আড্ডার কেন্দ্রস্থল। সারাক্ষণই তাঁর মধ্যে থাকতো একটা ছটফটানি। যেন সৃষ্টির উল্লাসে ফুটছেন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়,


আজ   সৃষ্টি সুখের উল্লাসে 

মোর    মুখ হাসে মাের চোখ হাসে মাের 

টগবগিয়ে খুন হাসে।


এত কথা। এত হাসি। এত আড্ডা। কিন্তু কাজ করতেন কখন? এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন রীতিমতো ম্যাজিসিয়ান। যে কোনো কাজ তিনি এত দ্রুত করতে পারতেন, এমনটি আমি অন্তত দেখিনি। সম্পাদনার কাজ তো বটেই, অনুবাদ ও লেখালেখিও খুব তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতেন। সকালের শিফটে আন্তর্জাতিক এবং বিকেলের শিফটে মূলত প্রেস রিলিজের কাজ হতো। দেখা যেত, কাজের মাঝপথেই তিনি ডামি প্রস্তুত করে ফেলেছেন। রাতের শিফটে ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাজ হতো প্রথম পৃষ্ঠার। তাতে কি? ত্বরিৎ গতিতে কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো জুড়ি ছিল না। শুধু তাই নয়, চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন, দিতেও পারতেন। তিনি শিফট-ইন-চার্জ থাকলে নির্ভার থাকতেন বার্তা বা নির্বাহী সম্পাদক। একজন সাংবাদিক কতটা দক্ষ, সেটা বোঝা যায়, তিনি কত দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অনন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন। আমার ধারণা, তিনি ইংলিশ কবি ও সাহিত্য সমালোচক ম্যাথিউ আর্নল্ড-এর উদ্ধৃতি 'জার্নালিজম ইজ লিটারেচার ইন এ হারি' মেনে চলতেন। কাজের ক্ষেত্রে তিনি যেমন সুদক্ষ, তেমনিভাবে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালোবাসায় অতুলনীয়। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন, 'মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় কোন আকাশ নেই'। সহযোগিতা ও সহানুভূতি প্রদানের ক্ষেত্রেও তিনি অকৃত্রিম। এটা বুঝতে অসুবিধা হতো না যে, তিনি ছিলেন অফিসে সবচেয়ে জনপ্রিয়। পিয়ন থেকে শুরু করে সম্পাদক পর্যন্ত সবাই তাঁকে সমীহ করতেন, পছন্দ করতেন এবং ভালোবাসতেন। যে কোনো সমস্যায়, সংকটে বুদ্ধি ও পরামর্শের জন্য তিনি ছিলেন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। এ কারণে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বার বার তাঁকে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের 'বাংলার বাণী' পত্রিকার ইউনিট চিফ হতে হয়েছে। তিনি চাইলে সাংবাদিক ইউনিয়নের বড় নেতা হতে পারতেন। কিন্তু তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন পেশাকে। সত্যিকার অর্থে তিনি একজন পরিপূর্ণ পেশাদার সাংবাদিক।

তিনি যখন দৈনিক দেশ পত্রিকায় কর্মরত, তখন তাঁকে প্রথম দেখি। সেগুনবাগিচায় পরবর্তীকালে যে ভবনে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেখানেই ছিল পত্রিকার কার্যালয়। তাঁর মাথায় ছিল কিউবার বিপ্লবের অন্যতম নায়ক চে গুয়েভারার মতো একটা ক্যাপ। মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। তাঁর সঙ্গে তখন পরিচয় ছিল না। তবে কবি হিসেবে চিনতাম। তাঁর কবিতায় পাওয়া যায় এক ধরনের কোমল পেলবতা। মায়াবী ভালোবাসা। বিপ্লবী স্পন্দন। বোধকরি বুকের মধ্যে লালন করেন বিপ্লবী চে'র রোমান্টিকতা। কবিতায়ও তার প্রতিফলন দেখা যায়। যদিও সাংবাদিকতার কাজে এত বেশি ব্যস্ত থাকতে হয় যে, কবিতা লেখার নিভৃত জগত পাবেন কখন? তাঁকে দুই হাতে সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, নিবন্ধ, প্রবন্ধ লিখতে হয়। বক্তব্য রাখতে হয় বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে। তারপরও হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায় তাঁর মন কেমন করা কবিতা।

পুরোদস্তুর নিউজম্যান হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রচারবহুল সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। 'জনপদ'  দিয়ে শুরু করে 'দেশ', 'গণকণ্ঠ', 'বাংলার বাণী', 'আজাদ', 'ভোরের কাগজ', 'সংবাদ', 'যুগান্তর' হয়ে 'প্রথম আলো'। পালন করেছেন বার্তা সম্পাদকের মতো গুরু দায়িত্ব। সাহিত্য ও ফিচার পাতার সম্পাদক হিসেবেও তিনি তাঁর মেধা ও যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমানে যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত আছেন দৈনিক 'প্রথম আলো' পত্রিকায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর তীক্ষ্ণ ও যুক্তিসঙ্গত বিশ্লেষণ কলামিস্ট হিসেবে তাঁকে আলাদাভাবে পরিচিতি দিয়েছে। 

দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার অনুষ্ঠানে কবি সোহরাব হাসানের সঙ্গে 

কবি সোহরাব হাসানের সংস্পর্শে যাওয়া, তাঁকে গুরু হিসেবে পাওয়া যে কোনো নবীন সাংবাদিকের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার। তিনি সহজেই নতুনদের আপন করে নিতে পারেন। কাজের দীক্ষা দিতে পারেন, কাজটা আদায় করে নিতে পারেন। তাঁর সঙ্গে যাঁরা একবার কাজ করেছেন, তাঁকে ভুলতে পারার কথা নয়। তাঁর অগণন ভক্ত-অনুরাগী। তাঁর কাছে সাংবাদিক হিসেবে অনেকের যেমন হাতেখড়ি হয়েছে, তেমনিভাবে তিনি গড়ে তুলেছেন অসংখ্য লেখক।‌ শুধু সাংবাদিকতার পেশায় নয়, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও তাঁর গুনগ্ৰাহীর কমতি নেই। অন্তরঙ্গতার ছোঁয়া দিয়ে সর্বত্রই তিনি নিজের অবস্থান গড়ে নিতে পারেন। মাতিয়ে রাখতে পারেন। তিনি কোনো আড্ডায় থাকবেন আর সেখানে হাসি শোনা যাবে না, এমনটি হতেই পারে না। যদি তেমনটি হয়, সেটা বোধকরি আড্ডা নয়, শোকসভা জাতীয় কিছু হবে।

রাজনীতির প্রতি তিনি আলাদা একটা টান অনুভব করেন। কাজে, আড্ডায়, আলোচনা সভায় সরব থাকলেও তাঁর কান সজাগ থাকে রাজপথের দিকে। সেখানে ছুটে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। তাঁর বুকের মধ্যে ছটফট করে দীর্ঘশ্বাসের পাখি-


'তোমরা কেউ আমার কষ্ট বুঝলে না, হয়তো আমিও তোমাদের অনুভবের সাগর ছুঁতে পারেনি। অনুতাপহীন মানুষের দেশে আমি দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেঁচে আছি।'

একদিন সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্ন অনেকটাই ম্লান ও মলিন হয়ে গেছে। রাজপথের বন্ধুরা ঘরমুখী হয়ে যাওয়ায় রক্তক্ষরণ হয় তাঁর বুকের মধ্যে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা কিছুতেই সইতে পারেন না। ফুল ও পাথরের গল্প নিয়েই কাটে তাঁর জীবন।


বন্ধুরা ঘরে ফিরে গেছে 

আপনাপন নারীর কাছে বড় সুখী তারা 

যাদের চালচুলো নেই; বাউন্ডেলে চেহারা 

ইদানিং তারাও সান্ধ্য-আসরে গরহাজির 

আউল বাউল বেশ ছেড়ে হয়েছে একান্ত ঘরমুখী 

একদা রাজপথ যার ঠিকানা ছিল

তারা আজ মিছিলের ভাষা ভুলে গেছে

আমরা সবাই সুখ খুঁজি ব্যক্তিগত প্রেম ও বিশ্বাসে।


একদিন স্বপ্নময় মনে হত 

রঙিন প্ল্যাকার্ড হাতে রাজপথ জুড়ে মানুষের মােহন মিছিল 

সহস্র কোরাস কণ্ঠে স্বপ্নের জাগরণ ধ্বনি ছিল 

ছন্দ ছিল, সাম্য ছিল জীবনের প্রতি পংক্তিতে 

কোলাহল বুকে নিয়ে কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি

অন্ধ আবেগে আকাশকে টেনে নিয়েছি হাতের মুঠোয় পাথরকে ফুল করে কত দিন সাজিয়েছি মালা 

হৃদয়ের বাগান থেকে ফুল ঝরে গেছে 

মানুষ নিরেট পাথর।

হৃদয়ের বাগান থেকে ফুল ঝরে গেলেও তিনি নিরেট পাথরে পরিণত হননি। তাঁর বুকের মধ্যে বয়ে চলে ভালোবাসার ফল্গুধারা। অসহায় মানুষদের দেখলে তাঁর হ্নদয় কাঁদে। কারও দুঃখ-কষ্ট তিনি সইতে পারেন না। সর্বহারাদের প্রতি রয়েছে তাঁর নিরন্তর সহানুভূতি। যাঁরা তাঁর কাছাকাছি হয়েছেন, তাঁরাই সেটা অনুভব করতে পারেন। তিনি যে অবস্থানে থাকুন না কেন, কাছের এবং দূরের সবার খোঁজ-খবর রাখার চেষ্টা করেন। সবাই যাতে ভালো থাকে, মনে-প্রাণে সেই কামনা করেন। স্বার্থপর এই সময়ে একজন সোহরাব হাসান ব্যতিক্রম হয়ে আছেন।

(১৯৫৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ঝালকাঠির শৌলজালিয়ায় সোহরাব হাসানের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রকাশিত অগ্নিবারুদেমেশা কাব্যগ্রন্থ 'বাতিল রাজদণ্ড'। প্রকাশিত গ্ৰন্থের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'কালো বারুদ শাদা গোলাপ', 'সুন্দর তোমার সর্বনাশ', 'শূন্যতার কাছে প্রার্থনা', 'ভুল করে বেঁচে আছি', 'যে আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশ', 'প্রেমের কবিতা', গদ্যগ্রন্থ 'মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি', 'রাষ্ট্র ও সংখ্যালঘু', 'মুজিব ভুট্টো মুক্তিযুদ্ধ', 'আদমজীর আয়নায় স্বদেশের মুখ', 'জঙ্গিবাদ ও যুদ্ধাপরাধ', 'শেখ মুজিব : স্বায়ত্তশাসন থেকে স্বাধীনতা', 'পাকিস্তাননামা', 'রাজনীতি কার নীতি', 'নেই গণতন্ত্রের দেশে', '২০১৮ নির্বাচনের আগে পরে', 'স্মৃতিতে আগষ্ট', '১৯৭১ : বাংলাদেশের শত্রু মিত্র', 'রাওয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র ১৯৫১' প্রভৃতি। সম্পাদিত গ্ৰন্থ 'তৃতীয় বিশ্বের কবিতা', 'বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের ভূমিকা'। লেখক মোরশেদ শফিউল হাসানের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী গল্প সংকলন 'মানুষের মৃত্যু হলে', 'আহমদ ছফা স্মারকগ্ৰন্থ'।)

১০ সেপ্টেম্বর ২০২০

এমন দিনে তারে বলা যায়

 


কত কত দিন কদম ফুলের গন্ধ নেওয়া হয় না। তাকানো হয় না মুগ্ধ দু’চোখে। তবুও এমন বাদল দিনে মনে পড়ে যায় কদম ফুলের কথা। উন্মনা করে দেয় তার বর্ণ, গন্ধ, সৌন্দর্য। নেশাধরানো এ ফুলটি যেন আসে বর্ষার বারতা নিয়ে। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল তো উসকে দেয় স্মৃতিকে। প্রিয়জনের হাত থেকে কদম ফুল নেওয়ার মৌতাত যেন এ জীবনে কিছুতেই কাটতে চায় না। জীবন ভারি অদ্ভুত। এর তল খুঁজে পাওয়া যায় না। কত কঠিন ও জটিল সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তবুও মনটাকে আটকে রাখতে পারা যায় না। যা হাতের নাগালের মধ্যে নেই, যা চাইলেও পাওয়া যায় না, তার জন্য মন কেমন কেমন করে। যা আছে অনুভবে, যা আছে স্মৃতিতে, যা আছে দূরে, সেটাই কেন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। 


বর্ষাকাল বোধকরি এমন। মনটাকে কেমন অচেনা করে দেয়। দুর্বল করে দেয়। ভাবাবেগে আপ্লুত করে তোলে। আকাশ ঘনকালো হলে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলে, মনটা উচাটন উচাটন করে। অকারণেই ভিজে যায় ভিতরভূমি। জমে ওঠে কাব্যের পলিমাটি। উদাসী মন চলে যায় সুদূরে। ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে/আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে’। বর্ষার সঙ্গে মনের বোধকরি একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে। খামখেয়ালি বর্ষার চেয়ে বর্ষাকালের মনও কম অস্থিরমতি নয়। এই মনের সঙ্গে একদমই পেরে উঠা যায় না। চাইলেই কি এখন আর বৃষ্টিতে ভেজা চায়? চঞ্চলিত মনটা কিছুতেই বুঝতে চায় না। কল্পনায় মনটা ছুটে চলে দুরন্ত ঘোড়ার মতো। হয়ে উঠে ইচ্ছেপূরণের বাহন। ভিজিয়ে দেয় ইচ্ছের বৃষ্টিতে। ঘুরিয়ে আনে প্রিয়সান্নিধ্যে। আর এ কারণেই ঝুম বৃষ্টিতে প্রিয়জনের সঙ্গে রিক্সায় হুড নামিয়ে নাম না জানা গন্তব্যে হারিয়ে যেতে মন চায়। বন্ধনহীন, বল্গাহীন সেই ছুটে চলায়, আমি জানি না, অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে এর তুলনা হয় কিনা? অবশ্য সবার ভালো লাগার ধরন তো আর এক রকম নয়। বর্ষাতির ফাঁক-ফোকর দিয়ে দুষ্টু বৃষ্টি যখন একটু একটু ভিজিয়ে দেয়, প্রিয়তমার গাল বেয়ে নামে ধারাবিন্দু, অধরে লেগে থাকে জলের পরাগরেণু, তখন বুকের মধ্যে সুখের কাঁপন না লেগে কি পারে? তখন বোধকরি বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পেতে কোনো দ্বিধা হয় না। টানা বর্ষণে ভেজা শার্টের ভিতর দিয়ে যখন প্রবাহিত হয় শীতল হাওয়া, তখন প্রিয়তমার নিবিড় উষ্ণতায় পাওয়া যায় পানশালার উত্তাপ। বুকের মধ্যে তখন রীতিমতো বাজতে থাকে ভালোবাসার মাদল। কবির ভাষায়, ‘শিহরিত শরীরে কামনার ঘ্রাণ’। বর্ষাকাল খুবই ছন্নছাড়া। কেমন যেন এলোমেলো ভাবনায় ডুবিয়ে রাখে। বেপরোয়া বৃষ্টির মতো কোনও বাঁধ মানতে চায় না। আলগা করে দেয় মনের বাঁধন। সিক্ত করে দেয় বসন। তাতে কখনো-সখনো স্পষ্ট হয়ে উঠে শরীরী বিভঙ্গ। একটু আড়াল করার সুযোগ পাওয়া যায় না। বৃষ্টির কি কোনো লাজ-লজ্জা নেই? কেন যে এমন পাগলামি করে? 


বর্ষাকালে কেন যেন বাবুই পাখিকে খুব মনে পড়ে। প্রশ্ন উঠতে পারে, এত এত পাখি থাকতে বাবুই পাখিকে কেন মনে পড়ে? মানুষের বিচিত্র মন। কেন কী কারণে কাকে কখন মনে পড়ে, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তবে প্রকৃতির শোভা এই পাখিটি বর্ষা আসার আগে আগে শিল্পীর নিপুণ দক্ষতায় যেভাবে নিজেদের দৃষ্টিনন্দন বাসগৃহ বুনে সুখে-শান্তিতে বসবাস করে, তাতে প্রলুব্ধ না হয়ে পারা যায় না। রোদে, বৃষ্টিতে, ঝড়েও পাখিটি সঙ্গিনীর সঙ্গে নির্বিঘ্নে, নিরুপদ্রবে মেতে উঠে প্রণয়ে। তবে বৃষ্টিবাদলের দিনে খুনসুটি ভিন্ন মাত্রা পায়। বাবুই পাখির মতো বাসা বানিয়ে প্রিয়তমাকে নিয়ে বৃষ্টিতে দোল খেতে অনেকেরই ইচ্ছে করতে পারে। ইচ্ছে করলে তো কাউকে অভিযুক্ত করা যায় না। একমাত্র ইচ্ছেই তো উড়তে পারে পাখি হয়ে। তাকে কি আর আটকে রাখা যায়? বাদলদিনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ফিরে আসেন বার বার। তাঁর মতো মন খুলে আওড়াতে ইচ্ছে করতে পারে,    

     এমন দিনে তারে বলা যায়/

     এমন ঘনঘোর বরিষায়।/

     এমন দিনে মন খোলা যায়--/

     এমন মেঘস্বরে  বাদল-ঝরোঝরে/

     তপনহীন ঘন তমসায়॥/

     সে কথা শুনিবে না কেহ আর,/

     নিভৃত নির্জন চারি ধার।/

     দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি,/

     আকাশে জল ঝরে অনিবার--/

     জগতে কেহ যেন নাহি আর॥/

     সমাজ সংসার মিছে সব,/

     মিছে এ জীবনের কলরব।/ 

     কেবল আঁখি দিয়ে  আঁখির সুধা পিয়ে/

     হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব--/

     আঁধারে মিশে গেছে আর সব॥

জানি, বাবুই পাখির মতো বাসা বানিয়ে বৃষ্টির দিনে দোল খেতে চাওয়াটা নিছকই ভাববিলাস। অনেকটা আষাঢ়ের গল্পের মতো বৈকি। আর এমন কল্পনা, এমন গল্প শুধু বৃষ্টিমুখর দিনেই মাথায় আসা সম্ভব। বর্ষাকাল নিয়ে এন্তার অভিযোগ থাকলেও তাকে ভালো না বেসে পারা যায় না। আর যাকে মানুষ সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, তারপ্রতি ক্ষোভও থাকে অন্তহীন। তাই বলে কি তাকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়? এতটা হৃদয়হীন হওয়া কি ঠিক? বর্ষাকাল শুধু ভিজিয়ে দেয় না, জীবনকে রাঙিয়েও দেয়। বেলী, বকুল, জুঁই, দোলনচাঁপা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার সুরভিতে ব্যাকুল হয়ে উঠে হৃদয়। তাই তো ‘আমি তো হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’। হায়! ‘শুধাইল না কেহ’। তবুও বর্ষার জন্য আমাদের কাতরতা চিরকালের। 


আবার এসেছে সেই কদম ফোটার দিন। প্রকৃতিকে ধুইয়ে দিতে। আমাদের ভিতরের কাঠিন্যকে নমনীয় করতে। বৃষ্টি নামবে দু’কূল ভাসিয়ে। বুকের মধ্যে নামবে সুখের প্লাবন। কেউ নিশ্চয়ই প্রিয়জনের হাতে তুলে দেবে একগুচ্ছ ভালোবাসার কদম ফুল। কেউ দূরে কোথাও গিয়ে করবেন বৃষ্টির নিবিড় বন্দনা। কেউ কেউ বারান্দা কিংবা করিডরে দাঁড়িয়ে স্পর্শ করবেন বৃষ্টির উচ্ছ্বাস। একান্তই যদি এর কোনোটাই সম্ভব না হয়, তাহলে একটুখানি আনমনা নিশ্চয়ই হওয়া যাবে। স্মৃতিতে ভাসবে সুখের দিনগুলো। জাগিয়ে তুলবে বিরহ। আর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা কোনো প্রেমিক নচিকেতা’র মতো গেয়ে ওঠতে পারেন, তুমি আসবে বলেই/আকাশ মেঘলা/বৃষ্টি এখনও হয়নি/তুমি আসবে বলেই/কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো/ঝরে যায়নি।


আর বৃষ্টি ভেজার দিন যাঁরা পেরিয়ে এসেছেন, জীবনের বাদলা দিনের আনন্দটুকুকে বাঁধিয়ে রেখেছেন স্মৃতির ফ্রেমে, তাঁদের অবলম্বন তো কোকিলকণ্ঠী লতা মঙ্গেশকারের অমর সেই গান , ‘আষাঢ়-শ্রাবণ মানে নাতো মন/ঝর ঝর ঝর ঝরেছে/তোমাকে আমার মনে পড়েছে’। মনে তো পড়তেই হবে। আষাঢ়-শ্রাবণ এলে কেন জানি অনেক বেশি বেশি মনে পড়ে। তোমার কি পড়ে না মনে?

এই বৃষ্টিতে......


মন কি মেঘলা আকাশ? তা না হলে কেন ভিজে যায় বৃষ্টিতে? বাদল দিনে মন কেন মেঘ হয়ে যায়? কেন বুকের মধ্যে বৃষ্টিপাত হয়? মনের সঙ্গে মেঘের কী সম্পর্ক? আর মনমেঘ নিয়ে এত প্রশ্নইবা কেন মনের মধ্যে তড়পায়? আচ্ছা, বৃষ্টিতে কি নারী কিংবা পুরুষের একই রকম অনুভূতি হয়? তবে এটুকু বুঝতে পারি, বৃষ্টির সঙ্গে তো সম্পর্ক আছে সৃষ্টির। এ কারণেই বোধকরি বৃষ্টি হলে মনটা হয়ে যায় খেয়ালি আকাশ। কত যে তার রং। কত যে তার ভাব। কত যে তার ভঙ্গি। কখনো উদাস। কখনো উড়নচণ্ডি। কখনো আউলা-ঝাউলা। অস্থির কি নয়? বরং বাদল দিনে মন একদমই সুস্থির হতে চায় না। কোনো কিছুতেই কেন যেন মন বসে না। ‘আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদল দিনে/জানি নে, জানি নে/কিছুতেই কেন যে মন লাগে না।’ কেন লাগে না?

আর ঘোর বর্ষাকাল হলে তো কথাই নেই। ‘আষাঢ় শ্রাবণ মানে না তো মন/ঝর ঝর ঝর ঝর ঝরেছে/তোমাকে আমার মনে পড়েছে’। বর্ষাকালে কেন বেশি বেশি মনে পড়ে?

বৃষ্টির দিনে সুস্থির মনটা কেমন যেন চপলমতি হয়ে ওঠে। কারণ কি পাগলা হাওয়া? ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে/পাগল আমার মন জেগে ওঠে’। মেঘলা দিনের সঙ্গে তোমার কি কোনো সম্পর্ক আছে? তা না হলে কেন যেন মন ঘরে থাকতে চায় না। ছুটে যেতে চায় তোমার কাছে। ‘এই মেঘলা দিনে একলা/ঘরে থাকে না তো মন/কাছে যাবো কবে পাবো/ওগো তোমার নিমন্ত্রণ’। পাওয়া যাবে কি নিমন্ত্রণ? 

তবুও ছুটেও যাই তোমার আশ্বাসে। তারপরও তোমার দ্বিধা-দ্বন্ধ কেন যে কাটতে চায় না। কী যে অস্থির অস্থির লাগে। কেন যে আমায় করো অবহেলা? তাহলে কীভাবে কাটবে বর্ষণমুখর দিন? ‘তুমি যদি না দেখা দাও, করো আমায় হেলা/কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা।/দূরের পানে মেলে আঁখি কেবল আমি চেয়ে থাকি/পরান আমার কেঁদে বেড়ায় দুরন্ত বাতাসে’। 

মনের সঙ্গে বোধকরি মেঘের একটি আত্মিক বন্ধন আছে। এ কারণে মনটাও হতে চায় মেঘের সঙ্গী। ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী/উড়ে চলে দিগদিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণসংগীতে/রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম’।

টিপটিপ বৃষ্টি হলে তোমার সঙ্গে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে হয়। ‘চলো সব কাজ ফেলে রেখে/তুমি-আমি দুজনে/ এসো বেরিয়ে পড়ি’। কোথায় যেন হারিয়ে যেতে চায় মন। ‘চলো না দুজন হারিয়ে যাই/বৃষ্টিমুখর জলের আদরে’। তোমার কি এমন ইচ্ছে করে না?


বাদল দিনে মন হয়ে যায় আনমনা। কোথায় যেন হারিয়ে হারিয়ে যায়। এ কারণে মনটা কেমন যেন বেভুল হয়ে যায়। হয়ে যায় এলোমেলো। হৃদয় নিমজ্জিত হতে চায় ভালোবাসার আকণ্ঠ ঋণে। ‘মন হারাবার আজি বেলা/পথ ভুলিবার খেলা/মন চায় মন চায়/হৃদয় জড়াতে কারো চির-ঋণে’। তদুপরি অনেক বর্ষণের পর তুমি যখন আসো, কী যে ভালো লাগে। তুমি কি সেই অনুভূতিটুকু বোঝো? ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে তুমি এলে/যেন একমুঠো রোদ্দুর আমার দুচোখ ভরে/তুমি এলে’। 

কখনো কখনো বিলম্বিত বৃষ্টিটাও প্রত্যাশিত হয়ে ওঠে। তাহলে যে তোমার বিড়ম্বনা পোহাতে হবে না। ‘তুমি আসবে বলেই আকাশ মেঘলা বৃষ্টি এখনো হয় নি/তুমি আসবে বলেই কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো ঝরে যায়নি’।

বর্ষায় যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যায় আকাশ, বদলায় মনটাও। বদলায় মনের রং। অনুভব। অনুভূতি। মনের আকাশে ভেসে উঠে রঙধনুও। তাকে পেতে ইচ্ছে করে। ‘মেঘের আড়ালে ভেসে থাকা সেই/রংধনুকে চায়’। 

বৃষ্টি যখন অঝোর ধারায় ঝরতে থাকে, তখন খুলে দিতে ইচ্ছে করে হৃদয়ের খাজাঞ্চি। কোনো আগল রাখতে একদমই ইচ্ছে করে না। ‘দুজনে মুখোমুখি গভীর দুখে দুখি’ হয়ে বলতে ইচ্ছে জাগে না বলা অনেক কথা। ‘এমন দিনে তারে বলা যায়/এমন ঘনঘোর বরিষায়। এমন দিনে মন খোলা যায়/এমন মেঘস্বরে বাদল-ঝরোঝরে/তপনহীন ঘন তমসায়।/সে কথা শুনিবে না কেহ আর/নিভৃত নির্জন চারি ধার’। হৃদয়ের দাবির কাছে আসলে সব কিছু তুচ্ছ হয়ে যায়। তখন তুমি ছাড়া আর কিছুই যেন মর্মস্পর্শ করে না। ‘সমাজ সংসার মিছে সব/মিছে এ জীবনের কলরব।/কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে/হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব/আঁধারে মিশে গেছে আর সব’।

খুব ইচ্ছে করে তোমার হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে। জানি, তুমি তো ভিজতে চাইবে না। তবুও ইচ্ছের ঘোড়াকে তো আর লাগাম পরানো যায় না। ‘যদি ডেকে বলি, এসো হাত ধরো/চলো ভিজি আজ বৃষ্টিতে/এসো গান করি মেঘ মল্লারে/করুণাধারা দৃষ্টিতে/আসবে না তুমি; জানি আমি জানি/অকারণে তবু কেন কাছে ডাকি/কেন মরে যাই তৃষ্ণাতে/এইই এসো না চলো জলে ভিজি’। এত এত আকুতি নিয়ে অনুরোধ করছি, তুমি কি আমার অনুরোধ রাখবে না? 

আবার কি বৈপরীত্য দেখো, বৃষ্টিতে তোমাকে ভিজতে দিতে চাই না। ভয় পাইয়ে দিয়ে তোমাকে আটকে রাখতে চাই। ‘আকাশ এতো মেঘলা যেও নাকো একলা/এখনি নামবে অন্ধকার/ঝড়ের জল-তরঙ্গে নাচবে নটি রঙ্গে/ভয় আছে পথ হারাবার।’ একটু বেশি সময় তোমাকে রাখার জন্য কত না কথা?  ‘একটু দাঁড়াবে কি, এখনি নামবে বৃষ্টি।/মেঘে আকাশ থমথম, নীড়ে ফিরে যাচ্ছে পাখি;/একটু দাঁড়াবে কি, এখনি নামবে বৃষ্টি।/খেয়ালি আকাশের বুকে, ফুটে থাকা তারার মেলা;/ঢেকে দিয়ে যাচ্ছে যেন, কালো কালো মেঘের ভেলা।/এখনই যেও না তুমি, এখনই যেও না তুমি;/ভালোবাসার অনেক বাকি’। কেমন সেই ভালোবাসা? আমি ঠিক জানি না। 

বৃষ্টি চাই না। আবার চাইও। কী যে দ্বিধা-দ্বন্দ? আসলে বৃষ্টিকে চাই নিজের সুবিধামাফিক। তা কি সম্ভব? বৃষ্টি কি কারও কথা শোনে? সুরের জাদুকর মিয়া তানসেন কি আর সবাই হতে পারেন? ‘ওগো বরষা তুমি ঝরো না গো অমন জোরে/কাছে সে আসবে তবে কেমন করে/রিমঝিম রিমঝিম রিমঝিম/এলে না হয় ঝোরো তখন অঝোর ধারে/যাতে সে যেতে চেয়েও যেতে নাহি পারে/রিমঝিম ঝিম ঝিম ঝিম।’ জানি, যা চাই, তা পাওয়ার সুযোগ নেই। তবুও ‘বৃষ্টি নেশাভরা সন্ধ্যা বেলা’ বেশরম মন কোনো কিছু মানতে চায় না।‘যা না চাইবার তাই আজি চাই গো/যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো।/পাবো না, পাবো না/মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে’। আসলে কী চাই? বৃষ্টিতে ভিজে তোমার ঠাণ্ডা লাগুক, সেটাও কিছুতেই চাইতে পারি না। তাহলে যে সুস্থির থাকতে পারবো না। ‘তুমি বৃষ্টি ভিজো না/ঠাণ্ডা লেগে যাবে/পাগল হলে নাকি/আর আমার যে কী হবে’?

দু চোখে যখন বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরে, তুমি যখন খবর নেও না, তখন খুব খুব অভিমান হয়। ‘বৃষ্টি ঝরে যায়, দু'চোখে গোপনে/সখিগো নিলা না খবর যতনে/আশায় আশায় বসে থাকি তোমার পথে/সখিগো নিলা না খবর মনেতে’।

বৃষ্টিতে ভেসে উঠে কত না বিরহগাঁথা। ভালোবাসার কান্নাটাকে যেন মুছে না দেয়, তার জন্য কত আকুতি। ‘ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না/আমার এতো সাধের কান্নার দাগ ধুয়ো না/সে যেন এসে দেখে/পথ চেয়ে তার কেমন করে কেঁদেছি’। বাদল দিনে বিরহীর কান্না ছুঁয়ে যায় হৃদয়। ‘কোন বিরহীর নয়ন জলে বাদল ঝরে গো’। বৃষ্টির দিনে মনে পড়ে যায় অশ্রুভরা সেই চোখ। ‘আজ এই বৃষ্টির/ কান্না দেখে/মনে পড়লো তোমায়/অশ্রু ভরা দুটি চোখ’। মনটাও হয়ে যায় উদাসী। হারিয়ে যেতে চায় অজানায়। ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে/দূর অজানায় চায় হারাতে’।

বৃষ্টি ঝরিয়ে দেয় বুকের ভেতরে থাকা চাপা কষ্ট। ‘বৃষ্টি দেখে অনেক কেঁদেছি/করেছি কতই আর্তনাদ।’ বৃষ্টি তো ধুইয়ে দেয় অভিমানও। ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে/আমরা ধরা পড়ে যাবো যেনো ঠিক/ধুয়ে যাবে যত আছে অভিমান’।

বৃষ্টির দিনে কত স্মৃতি মনে পড়ে যায়। কত কষ্টের কথা। ‘একদিন বৃষ্টিতে বিকেলে/মনে পড়ে যাবে সব কথা/কথা দিয়ে কথাটা না রাখা/ফেলে আসা চেনা চেনা ব্যথা’। কত কত দিন তোমাকে না দেখার স্মৃতি নস্টালজিক করে তোলে। ‘বৃষ্টি নেমেছে আজ আকাশ ভেঙে/হাঁটছি আমি মেঠো পথে/মনের ক্যানভাসে ভাসছে তোমার ছবি/বহুদিন তোমায় দেখি না যে’। বৃষ্টি নিয়ে কত কিছুই করতে ইচ্ছে করে। কিন্তু তাতেও মনের ক্ষতে প্রলেপ দেওয়া যায় না। বরং তোমার চলে যাওয়াটাই অনেক বেশি ক্ষতবিক্ষত করে। ‘আমি বৃষ্টি দেখেছি, বৃষ্টির ছবি এঁকেছি/আমি রোদে পুড়ে ঘুরে ঘুরে অনেক কেঁদেছি/আমার আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখার খেলা থামেনি/শুধু তুমি চলে যাবে আমি স্বপ্নেও ভাবিনি’।

এখন তো তুমি হয়ে আছো অধরা। খুব কাছাকাছি থাকো, তবুও তোমাকে ছোঁয়া যায় না। ভালোবাসাও যায় না। ‘যদি বৃষ্টি হতাম তোমায় ভিজিয়ে দিতাম/তোমাকে স্পর্শ থাকতো না অধরা.../এতটা কাছে তুমি তবুও যায় না ছোঁওয়া/এতটা ভালোবাসা তবুও হয় না দেওয়া...’।


বাদল দিনে মনে পড়ে যায় আনন্দ-বেদনার কত স্মৃতি। তোমার কি পড়ে না মনে? কখনও কখনও অকারণেই অশ্রুসজল হয়ে উঠে চোখ। তখন তোমার কাছে যাওয়ার জন্য মনটা খুবই ছটফট করে। তোমার ডাকের জন্য কী যে আকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করি। আমার অপেক্ষা আর ফুরায় না। ‘বাদলও দিনের প্রথম কদম ফুল’ নিয়ে শাওনের মতো করে কেউ মায়াবী কণ্ঠে বলে না, ‘যদি মন কাঁদে/তুমি চলে এসো/ চলে এসো/এক বরষায়’। হায়! এমন আমন্ত্রণের জন্য প্রতীক্ষায় প্রতীক্ষায় কেটে যায় দিন। আর অবিরত ঝরতে থাকে বৃষ্টি। ঝরতে থাকে। ঝরতে থাকে। ঝরেই যাচ্ছে।

বুকের ভিতর মেঘ জমে যায়

 


এখন আর সেই আক্ষেপটুকু নেই। চাইলেই আমি ইচ্ছেমতো আকাশ দেখতে পারি। করোনাকাল আমাকে সেই সুযোগ করে দিয়েছে। কর্মসময় সীমিত হয়ে পড়ায় আমার এখন অফুরান অবকাশ। কত কাল পর যে এমন অবসর পাওয়া! আমি মনভরে আকাশ দেখি। কত যে তার রং। কত যে তার রূপ। কত তার মোহময়তা। মেঘের শিল্পকর্ম দেখে আমার আশ মিটতে চায় না। পেখম মেলে কী সুন্দরভাবে উড়ে উড়ে যায় বিচিত্র মেঘমালা। বিশাল ক্যানভাসে মেঘের তুলিতে আঁকা হয় জগতের সেরা সেরা শিল্পকর্ম। আলো আর আঁধারের সমন্বয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় অনিন্দ্যসুন্দর সব চিত্রকলা। যদিও এই শিল্পকর্ম ক্ষণিকের। প্রতি মুহুর্তে বদলে যায় তার দৃশ্যপট। তবে এত এত শৈল্পিক চিত্রপট দেখতে পাওয়ার মজাই আলাদা। হৃদয়টাকে রাঙিয়ে দিয়ে যায় অপার্থিব এক ভালো লাগায়। আকাশের পটে কখনো-সখনো আভাসিত হয় কোনো মুখচ্ছবি বা অবয়ব। সেটা সত্যি নাকি মায়াবী বিভ্রম, ঠাওর করতে পারি না। ইদানিং তো আকাশের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে নানান আকারের, নানান রঙের, নানান মেজাজের ঘুড়ি। কখনো কখনো ইচ্ছে করে ঘুড়ি হয়ে খুব কাছ থেকে দেখে আসি মেঘের শিল্পকর্ম। তা তো আর সম্ভব নয়। তাই বুকের ভিতর থরে থরে সাজিয়ে রাখি মেঘের চিরায়ত সব চিত্রকলা। ইহজাগতিক কোনো সঞ্চয় তো আমার নেই। আমার ভাণ্ডার পরিপূর্ণ প্রকৃতির অলৌকিক সব সৌন্দর্য দিয়ে। যখন শূন্য শূন্য লাগে, তখন তাতে অবগাহন করি।


ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখতে দেখতে মনটাও অনেক সময় তার মতো বিস্তৃত হয়ে যায়। ভিতর থেকে মুছে যায় জাগতিক সব বিষয়-আশয়। তখন নিজেকে মায়াবী জগতের বাসিন্দা মনে হতে থাকে। কল্পনার বাহনে পাড়ি জমাই দূরে দূরে। ঘুরে আসি অমরধামের অনাবিল সেই জগত থেকে। ফিরে এলে দেখতে পাই তার রূপবদল ঘটে গেছে।  




বর্ষার আকাশে পাওয়া যায় ভিন্ন রকম মাধুর্য। জলরঙে আঁকা চিত্রপটগুলো অসাধারণ লাগে। কেন যেন মনে হয়, মহাকাব্যিক সব শিল্পকর্ম সৃষ্টি হয় সাদা-কালোর সংমিশ্রণে। সেটার সার্থক প্রয়োগ ঘটে মেঘের তুলিতে। ছেঁড়া ছেঁড়া কালো কালো রঙের মেঘের কোলাজ কী যে অপূর্ব লাগে। তা দেখে মন চলে যায় কোন সুদূরে। মনে পড়ে যায় স্মৃতিময় শাওন দিনগুলোর কথা। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলে নেমে আসতে হয় বাস্তবের মাটিতে। সকাল থেকে ঘনকালো মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে আছে চারপাশ। অবিরাম ঝরছে শ্রাবণধারা। কখনো অনুচ্চ। কখনো গুরুগম্ভীর। কখনো ঠাসবুনোট। মেঘের শিল্পকলা যেমন দৃষ্টির সৌন্দর্য, তেমনিভাবে বৃষ্টিপাতের সুরধ্বনি হৃদয়ের আরাম। কতভাবেই না বেজে ওঠে তার স্বরমাধুর্য। বৃষ্টি খুলে দেয় বুকের জমাটবাঁধা অর্গল। তখন নিমগ্ন হতে ইচ্ছে করে সুরের ঝর্ণাধারায়।


আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদরদিনে

জানি নে, জানি নে কিছুতে কেন যে মন লাগে না।

এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্ভান্ত মেঘে

মন চায়

মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে

মেঘমল্লার সারা দিনমান।

বাজে ঝরনার গান।

মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার

খেলা-- মন চায়

চিরঋণে।



মেঘের খেলা দেখতে দেখতে আর বৃষ্টির সুরধ্বনি শুনতে শুনতে কেন যেন বুকের ভিতর মেঘ জমে যায়। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। সেটা আনন্দের না বেদনার, আমি ঠিক বুঝতে পারি না।

আশা নিয়ে বেঁচে থাকা



আমি কি কাউকে কোনো কথা দিয়েছিলাম? কোনো প্রতিশ্রুতি? কিংবা কোনো অঙ্গীকার কি করিনি? হতে পারে একান্তে, নিভৃতে কিংবা প্রকাশ্যে। আবেগময় কোনো মুহুর্তে, খোশমেজাজে কিংবা প্রয়োজনের অংশ হিসেবে। করতেই তো পারি। না করাটাই তো অস্বাভাবিক। সমাজে বসবাস করলে কত কিছুই তো করতে হয়। সম্পর্ক হয়। সম্পর্ক ভেঙেও যায়। নানাভাবে লেনদেন হয়। সবটাই যে নিয়ম মেনে হয়, তা তো নয়। অনিয়মও হয়ে যায়। বেলা তো আর কম বয়ে গেল না? এখন একদমই কিছু মনে থাকে না। কখন, কোথায় কার সঙ্গে কী কথা বলেছি, কী করেছি কিছুই মনে করতে পারছি না। আর আমার স্মৃতিশক্তি তো মাশাল্লাহ! একদম ঝরঝরে। অনেক সময় সকালে কী নাস্তা করি, দুপুরবেলাই মনে করতে পারি না। যেটুকু স্মৃতিশক্তি অবশিষ্ট ছিল, এই করোনাকালে সব যেন লেপেপুছে গেছে। করোটির মধ্যে এখন একটা বিষয়ই কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে।

কাকে কখন, কোথায় কী বলেছি, কী করেছি, হঠাৎ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ প্রসঙ্গ উত্থাপন করার কী এমন হলো? প্রশ্ন হতেই পারে, লাজ-লজ্জা কি সব ধুয়েমুছে গেল নাকি? আর লাজ-লজ্জা? আসলে সব কিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। কী করবো, কী করবো না, কী করা উচিত, কী উচিত নয়, একদমই বুঝতে পারছি না। মাঝ রাতে ঘুম ভাঙার পর আচমকা ভাবনা হলো, আমাকে যদি চলে যেতে হয়, এটা মনে হওয়ার পর বুকের মধ্যে হু হু করে বইতে থাকে কান্নার প্রবল স্রোত, সেটা নিরুত্তেজ হওয়ার পর মনে হতে থাকে, তাহলে আমার তো নিশ্চয়ই কিছু দায়-দায়িত্ব রয়ে গেছে? রয়ে গেছে হিসাব-নিকাশ। সময়-সুযোগ থাকতে থাকতে তার একটা বিহিত তো অন্তত করে যেতে পারি। তাই না? সেই ভাবনা থেকে তার একটা তালিকা করতে গিয়ে কোনো দিশা পাচ্ছিলাম না। কোনটা রেখে কোনটা করবো? তখনই মনে হলো, প্রথমত আমি কাকে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম? সেটা আমি সবার আগে রক্ষা করতে চাই। কথা দিয়ে কথা না রাখাটা আমার সবচেয়ে অপছন্দের। কথা দিলে পারতপক্ষে আমি কথা রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি তো কোনো মহামানব নই। নিজের অজান্তেই ভুল হয়ে যেতে পারে। হতে পারে আমি সেই সময়ে গুরুত্বও দেইনি। যেহেতু এখন আত্মোপলব্ধি হচ্ছে, ভুলগুলো তো অন্তত শুধরে নেওয়া যায়। যদিও এ জীবনে যত জনের সঙ্গে পরিচয় ও যোগাযোগ হয়েছে, এই ফেসবুকে তো তাদের সবাইকে পাওয়া যাবে না। তারপরও এর মাধ্যমে অনেকের কাছে পৌঁছে যাবার একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। ফেসবুকও তো অনেকটা করোনাভাইরাসের মতো। কিছু একটা লিখলে বা আপলোড করলে চট করে দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। আর ভাইরাল হলে তো কথাই নেই। আমার অনুরোধের কথা কোনোভাবে তাঁরা যদি জানতে পারেন, তাহলে সাড়া তো দিতেই পারেন। প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সরাসরি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন, ফোন করতে পারেন কিংবা গোপন কিছু হলে মেসেঞ্জারে জানাতে পারেন। সাধ্যে কুলালে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে চেষ্টার অন্তত কসুর করবো না। এ বয়সে সবটাই তো পারা যাবে না। যতটুকু পারি আরকি। আর যা পারবো না, তা না হয় আলোচনা কিংবা চ্যাটিং-এর মাধ্যমে সুরাহা করে নেওয়া যাবে। কিন্তু কারো সঙ্গে চিটিং করতে চাই না। আপনারা কী বলেন? 

আপাতদৃষ্টিতে আমাকে শান্ত-সুবোধ মনে হয়। মূলত তেমনটি থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় সেটা পেরে ওঠি না। পারিপার্শ্বিক অনেক কিছুর সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারি না। কষ্টকর ব্যাপার হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিবাদও করতে পারি না। যে কারণে ভিতরে ভিতরে ক্ষতবিক্ষত হই। রক্তাক্ত হই। তাতে যা ক্ষতি হওয়ার নিজেরই হয়। তবুও কথিত ভদ্রলোকের মতো চুপচাপ থাকি কিংবা নখ কামড়িয়ে কামড়িয়ে আঙুলের রক্ত বের করে ফেলি। আমাকে যাঁরা ক্ষতবিক্ষত করতে চান, সেটা তাঁরা মনের সুখ মিটিয়ে করেন। আবার অনেক সময় নিজেকে সামলাতে পারি না। অনেক ছোট-খাট বিষয়েও রাগে ফেটে পড়ি। ভিতরের অসুরটা সুযোগ পেয়ে বেরিয়ে আসে। তখন আমাকে ঠিক চেনা যায় না। সেই সময় অনেকেই আমাকে ঠিক মেলাতে পারেন না। ভাবেন, এই আমি কি সেই আমি? আসলে আমি কিন্তু এমন করতে চাই না। তারপরও কেন যে এমন করি, বুঝতে পারি না। বোঝার পর অনুতপ্ত হই। অনুশোচনা হয়। মুষড়ে পড়ি। তখন তো আর কিছু করার থাকে না। এটা তো জানা কথা, মুখের কথা আর তীর একবার ছুটে গেলে কখনো ফেরানো যায় না। এটা আমারও খুব ভালো করে জানা। কিন্তু রাগের সময় এই বোধ থাকে না। আবার অন্যভাবেও কাউকে মানসিকভাবে আঘাত কিংবা অপমান করা যায়। আমি হয়তো জানি বা জানি না, আমার কথায়, আচরণ বা ব্যবহারে কেউ আঘাত পেয়েছেন বা অপমানিত হয়েছেন, তিনি হয়তো বুঝতে দেননি বা কখনো প্রকাশ করেননি। এমন তো অহরহই হতে পারে।

এখন মনে হচ্ছে, অনেকের সঙ্গে রাগারাগি করেছি, খারাপ ব্যবহার করেছি কিংবা দুর্ব্যবহার করেছি। কার কার সঙ্গে এমনটা করেছি, সেই হিসাব তো এখন আর মেলানো যাবে না। তাঁদের কাছে মনে মনে ক্ষমা চাইলে কেমন হয়? কিন্তু তাঁরা তো বুঝতে পারবেন না। এমনও তো হতে পারে, তাঁদের হয়তো মনেও নেই। থাকলেও ক্ষমা করে দিতে পারেন। কিন্তু কেউ যদি ক্ষমা না করে থাকেন? সে ক্ষেত্রে আমার করণীয় কী?

হঠাৎ মনে হলো, আরে! এ জীবনে কিছুই তো করা হলো না। কিছু একটা না করে গেলে কেমনে হয়? এমন একটা কিছু করতে চাই, অন্তত কাছের মানুষের স্মৃতিপটে যাতে রয়ে যেতে পারি। জানি, এ ধরনের আশা করা মোটেও বাস্তবোচিত নয়। কে যে কাছের মানুষ আর কে যে দূরের মানুষ! আর কে যে কাকে মনে রাখে? দম ফুরালেই তো সব শেষ। তুরস্কের বিশ্বখ্যাত কবি নাজিম হিকমতের ভাষায়,

বিংশ শতাব্দীতে

মানুষের শোকের আয়ু 

বড় জোর এক বছর।

সেও তো বিখ্যাতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমার মতো অভাজনদের জন্য নয়। আমার জন্য সেটা কত মিনিট, কত ঘণ্টা বা কত দিন কে জানে? এটাও ঠিক, কে শোক করলো, কে করলো না, সেটা তো আর জানার সুযোগ থাকবে না। আর এখন এই করোনাকালে জীবিত থাকতেই তো এক রকম মৃত্যু হয়ে যাচ্ছে। কেউ আক্রান্ত হলে তিনি হয়ে যাচ্ছেন নিঃসঙ্গ এক দ্বীপের বাসিন্দা। কারো সঙ্গে যোগাযোগ করার সুযোগ থাকে না। যদিও কতকাল আগে মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে ইংরেজ কবি জন ডান লিখে গেছেন,

No man is an island, 

Entire of itself, 

Every man is a piece of the continent, 

A part of the main.

Any man's death diminishes me, 

Because I am involved in mankind,

হায়! এ ধরনের অনুভূতির এখন আর গুরুত্ব নেই বললেই চলে। সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে মানুষ ও মানবিকতা। এমন এক ভাইরাস এসেছে, মানুষকে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। ইচ্ছে থাকলেও করোনাবন্দির সঙ্গে সুযোগ নেই দেখা-সাক্ষাৎ করার। ‘স্বেচ্ছাবন্দি’ হয়ে সুস্থ হয়ে ফিরে এলেই কেবল তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হবে। নতুবা সামাজিক দূরত্ব থাকাবস্থায় মৃত্যু হলে শেষ দেখা তো দূরে থাক, জানাজা ও দাফনেও অংশ নেওয়া যাবে না। এ কারণে কেউ কাছে ঘেঁষতেই সাহস পান না। কোথাও কোথাও নাকি গণকবর দেওয়া হচ্ছে। এরচেয়ে দুঃখজনক ও নির্মম আর কী হতে পারে? এই করোনাকালে মৃত্যু হওয়া মানে কেবলই একটা সংখ্যার বেশি কিছু নয়। তাহলে এ অবস্থায় কাছের মানুষদের হৃদয়ে দাগ কাটার সুযোগ কোথায়? তবুও মন মানে না। 

কবি নির্মলেন্দু গুণ লিখেছেন,

আমি বলছি না ভালোবাসতেই হবে, আমি চাই

কেউ একজন আমার জন্য অপেক্ষা করুক

এ তো ইহলোকের ভালোবাসার কথা। পরলোকে চলে যাবার সময় তো আর কাউকে অপেক্ষা করার কথা বলে যাওয়া যায় না। বাস্তব বড় নিষ্ঠুর। তারপরও কেন যেন মনে হয়, চলে যাবার পর কাছের মানুষরা আমার জন্য একটু শোক করুক। আমাকে কিছুটা হলেও মনে রাখুক। মনে মনে ভালোবাসুক। নিরালায় বসে একটুখানি না হয় কাঁদুক। দুনিয়াটা তো মায়ার বাঁধনে জড়ানো। যদিও এর কোনো যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা নেই। কে শোক করবে, কে মনে রাখবে, কে ভালোবাসবে, কে কাঁদবে, তা নিয়ে আক্ষেপ করে আর কীইবা হবে? সেটা তো জানতেই পারা যাবে না। কিন্তু মন তো অদ্ভুত এক খেয়াল। তার যে কখন কী ইচ্ছে হয়, বুঝতে পারা যায় না। তাছাড়া বেঁচে থাকার যে মোহ, তা থেকে মুক্ত হওয়া কি এত সহজ? কোনোভাবে বেঁচে থাকা এবং বন্ধনে জড়িয়ে থাকার জন্য মানুষ কত কিছুই করে বা করতে চায়।

সে কারণে মানুষের হৃদয়ে দাগ কাটার জন্য কিছু একটা করতে মনটা ছটফট করে। কিন্তু করবোটা কি? আমার সামর্থ্যইবা কী আছে? না আছে মেধা, না আছে বিদ্যা, না আছে ক্যারিশমা, না আছে কোনো ক্ষমতা। তাহলে? সেক্ষেত্রে যেটুকু যা আছে, নিধিরাম সর্দারের মতো তা নিয়ে যদি কিছু একটা করা যায়। কিন্তু ইচ্ছে হলেও উদ্যম যেন হারিয়ে গেছে। না হারিয়ে করবোটা কি। করোনা তো কাউকে একদমই স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। মৃত্যু ভাবনায় বার বার জারিত হতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে। কিছুই তো করা হচ্ছে না। হবেও না। অথচ বুকের মধ্যে কত যে ইচ্ছের ছটফটানি। এ জীবনে যা যা করতে চেয়েছি, কিন্তু করতে পারিনি, এখন সব কিছু করার ইচ্ছে জাগছে। মনে হচ্ছে, আমি চাইলেই সব করে ফেলতে পারি। ধন্য আশা কুহকিনী। 

আচ্ছা, আমি যে অনেক কিছু লিখতে চেয়েছি বা পরিকল্পনা করেছি, তার কী হবে? কত কত বিষয় লিখবো বলে মাথার মধ্যে সাজিয়ে রেখেছি। যদিও আমার লেখার কীইবা গুরুত্ব থাকবে? আমি তো কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক নই। এমন সব বিষয় লিখি, যার কোনো গুরুত্ব নেই। তদুপরি আমি যদি না থাকি, আমার পাঠকও তো থাকবে না। তাহলে লিখে কী হবে? ওই যে বললাম, মন নামক এক অনুভূতি আমাকে নিয়ে খেলতে পছন্দ করে। তার অবাধ্য হতে পারি না। কেন যেন আমাকে লিখতে প্ররোচিত করে। আমি জানি, আমার লেখা কেউ পড়তে পারে, কেউ নাও পড়তে পারে। তাতে তো আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। মন আমাকে বোঝায়, সেক্ষেত্রে আর কিছু না হোক, অন্তত নিজের জন্য লিখতে তো কোনো অসুবিধা নেই। নিজের লেখার পাঠক হয়ে নিজেই তো আত্মতৃপ্তি পেতে পারি। চলে যাওয়ার আগে বা পরে কে পড়লো, কে পড়লো না, তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী হবে? কিন্তু অশান্ত মন নিয়ে কি লেখা যায়? এত এত মৃত্যুর মিছিলের মধ্যে কীভাবে সেটা সম্ভব? কিছু পড়তেই তো পারি না। পড়তে গেলে অক্ষরগুলো ম্যাজিক রিয়ালিজম হয়ে যায়। কত সব উল্টাপাল্টা বিষয় মাথার মধ্যে ভেসে ওঠে। তাহলে লিখবো কীভাবে? 


এই করোনাকালে আমার যেন ইচ্ছের শেষ নেই। ইদানিং নানান জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। এর কারণ হতে পারে, এখন তো কোথাও যাবার সুযোগ নেই। বিদেশের কথা না হয় বাদ দিলাম, তা আমার সামর্থ্যরে মধ্যে পড়ে না, দেশের মধ্যেই কত জায়গায় ঘুরতে চেয়েছি। ঘুরি ঘুরি করেও সময়ের দোহাই দিয়ে যাওয়া হয়নি। এখন মনে হচ্ছে, পরিকল্পিত সে সব স্থানে যেতে না পারলে শান্তি পাবো না। নানান জনের কাছে ভ্রমণের স্থানগুলোতে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা শুনতে শুনতে একপ্রকার মোহাচ্ছন্ন হয়ে আছি। সিলেটের বিছানাকান্দিতে সুউচ্চ ঝরনাধারা থেকে নেমে আসা জলরাশিতে অবগাহন, জোছনা রাতে বিশাল রকেট লঞ্চে বরিশাল ঘুরতে যাওয়া, প্রাকৃতিক বনভূমি সুন্দরবনের অপরূপ সৌন্দর্য প্রাণভরে উপভোগ করা, দেশের সর্ববৃহৎ হাকালুকি হাওরে ভরা বর্ষায় গা ছমছম করা অনুভূতি নেওয়া, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপে চিত্রা হরিণের দুরন্তপনা দেখা, কুয়াকাটায় সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার দুর্লভ সুযোগ, বান্দরবানের নীলগিরি পাহাড়ে উঠে মেঘ যদি না ছোঁয়া যায়, তাহলে এ জীবন তো অপূর্ণ রয়ে যাবে। স্বপ্ন দিয়ে তৈরি এ দেশটির এ রকম কতনা সৌন্দর্য অদেখা হয়ে আছে। তা কি কেবল স্বপ্ন হয়ে থাকবে?


হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায়, এমন সব স্থানেও তো যাওয়া হয়নি। ঢাকার আশপাশে ইতিহাসখ্যাত নান্দনিক ডিজাইনের কত বাড়িঘর দেখা, নদী-বিল-জলাশয়ের মনোরম শোভায় বিভোর হওয়া, প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলা দ্বীপ বা রিসোর্টে অবস্থান করার অনুভূতিও হলো না। অথচ খুব বেশি দূরে তো নয়। চাইলেই দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়। কিন্তু যাওয়া হয়নি। এমনকি যে ঢাকায় পুরো জীবন কেটে যাচ্ছে, সেই শহরটাই তো অচেনা রয়ে গেছে। পুরানো ঢাকা, নতুন ঢাকা কোনোটার সঙ্গে ঠিকমতো চিনপরিচয় হলো না। এত এত প্রত্যাশার পদ্মা ব্রিজ, মেট্রোরেল কি দেখতে পারবো? এই শহরে রয়েছে চমৎকার সব রেস্তোরাঁ। কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে দেখা যায় চুঁইয়ে পড়া চাঁদের ঘোর লাগা আলো। সেই আলোয় নাকি দুলে উঠে মায়াবী হৃদয়। হায়! এই সামান্য রোমান্টিকতাটুকুও অনুভব করা হলো না। আরো যে কত কিছু করা হলো না। 

কবি হেলাল হাফিজের মতো কোমল হৃদয়ের হলে না হয় বলতাম,

হলো না, হলো না। 

সুন্দর হলো না, অসুন্দরও না 

জীবন হলো না, জীবনেরও না, কার যেন 

কিছুই হলো না, কিচ্ছু হলো না। 

হলো না। না হোক, 

আমি কী এমন লোক

আমার হলো না তাতে কী হয়েছে?

তোমাদের হোক।

কিন্তু স্বার্থপর মন তো। নিজের না হওয়াগুলো নিয়ে বেশি ভাবছি। আর না ভেবেইবা কী করবো? এখন সময়টাই তো অন্য রকম। যে কারণে ভাবনার দোলাচলে প্রতিনিয়ত হাবুডুবু খাচ্ছি। এছাড়া তো কিছু করার নেই। যথেষ্ট অবসর পেয়ে নিজের জমা-খরচের খুচরা হিসাব মিলাচ্ছি। সব হিসাব তো আর আমার কাছে নেই। সেটা মেলানোর জন্য তো আলাদা নিয়োগ দেওয়া আছে। আমি আমার মনের খসড়া খাতার ছোট-খাট বৈষয়িক বিষয়ে বোঝার চেষ্টা করছি। এই সামান্য হিসাবও মিলাতে পারছি না। 


তাই চলে যাবার যে দুর্ভাবনা ও দুঃস্বপ্ন, তার আগে আমার যত অপারগতা, আমার যত অসম্পূর্ণতা, আমার যত না পূরণ হওয়া অভিলাষ নিয়ে মোটেও স্বস্তি পাচ্ছি না। অথচ এ জীবনে এ মনোবাসনা পূর্ণ হওয়ার তেমন সুযোগ নেই বললেই চলে। কারণ, যখন সুযোগ আসে, তখন তা গ্রহণ করা হয় না। আর যখন সুযোগ থাকে না, তখন তার অপেক্ষায় থাকি। এ ধরনের মনোভাব নিয়ে কিছু করা যায় না। তবে বেঁচে থাকলে আশায় আশায় তো থাকা যায়। একদিন না একদিন হয়ে যেতে পারে। কথায় আছে না, পাগলের সুখ মনে মনে। আমারও সেই অবস্থা। 

তবুও সুস্থ, সুন্দরভাবে নতুন নতুন স্বপ্ন নিয়ে সবাই বেঁচে থাকতে চায়। কখনো কখনো হার মানতে হয় জীবনের মোহের কাছে। আর যাঁরা হার মানেন না, তেমন মহামানব কি আর সবাই হতে পারেন?

২২ এপ্রিল ২০২০