
বুকের মধ্যে অভিমানের মেঘ জমলে তার পরিণতি কী হয়, আমি ঠিক জানি না। তবে তার খেসারত দিতে হয় বেশ ভালোভাবেই। যেমনটি আমাকেও দিতে হচ্ছে। সোনা যতই পোড়ানো হয়, ততই নাকি খাঁটি হয়। মানুষ পুড়লে নিকষিত হেম হয় কিনা জানি না। তবে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতে হয়। অনেক দিন যাবৎই আমি ভালো নেই। আমার মন ভালো নেই। সঙ্গত কারণে ঈদ উপলক্ষে আমার কোনোরকম তৎপরতাই ছিল না। কোনো কিছুতেই আমার আগ্রহ ছিল না। লীলাবতির সঙ্গে কথা ছিল, সে কথা রাখে নি। সে কথা রাখেও না। তার কারণে সব কিছুই থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নেই। এ নিয়ে বাসায় মনোমালিন্য হয়। সেটা আমি পাত্তাই দেই নি। তারপরও আমার জন্য ঈদের নতুন পোশাক কেনা হয়, তখনই আমি বলেছি, এটা কেনা হলে আমি পরবো না। ক’দিন যাবৎ সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটে। কথা-বার্তা বন্ধ। আজ সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায়। এটা ইদানিং নিয়মিতই হচ্ছে। ঘুমই হতে চায় না। এর কারণ, লীলাবতি। তার কারণে আমি শান্তিতে থাকতে পারছি না। সকালে গোসল করার পর আমাকে নতুন পোশাক পরতে দেওয়া হলে আমি নাকচ করে দেই। বাসার ছোটদের দিয়েও অনুরোধ করা হয়। সেটাও প্রত্যাখ্যান করি। ওমনি ক্ষেপে যায়। যা নয় তাই বলতে থাকে। এমনও বলে, দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও মিশুকের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও আমার মতো অখ্যাতদের কেন অপমৃত্যু হয় না? এটা শোনার পর মেজাজ হারিয়ে ফেলি। গালাগালি করি।
ইচ্ছে করেই কালো প্যান্ট ও কালো গেঞ্জি পরে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। অনেক দিন ধরে শেভও করা হয় না। বাসার কাছে সকাল পৌনে নয়টায় নামাজ শেষ করে গন্তব্যহীনভাবে হাঁটতে থাকি। কারো সঙ্গে কোলাকুলিও করা হয় না। সকালে এক চুমুক পানিও খাওয়া হয় নি। ঘরে-বাইরে আমি এক জটিল সময় অতিক্রম করছি। এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। পারবো কীভাবে? আমার মন আমাকে পারতে দিচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নেই, নিজেকে যতটা পারি পুড়াবো। পুড়িয়ে যদি নিজের ভিতরের সব রাগ-ক্ষোভ-যন্ত্রণা-কষ্ট-অভিমান-ব্যথা-বেদনা গলিয়ে দেওয়া যায়! তেমন একটা ইচ্ছে নিয়ে আমি হাঁটতে থাকি। প্রথমদিকে ছিল রোদ-ছায়ার লুকোচুরি খেলা। একটু একটু করে ঘামতে থাকি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্গন্ধে পেট গুলিয়ে আসতে চাইছিল। হাউজিং হয়ে বছিলার দিকে যেতে থাকি। বছিলা সড়কে ওঠার পর আগুনের তাপ বের হচ্ছিল। আমি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সূর্যের তরল সোনায় অবগাহন করতে থাকি। এমনিতেই আমি কালো, সূর্যের আগুন আমাকে করে তোলে কৃষ্ণাঙ্গ।

তবে এই পথে স্মৃতিরা সব ডানা মেলে দেওয়ায় মনের মধ্যে ভাসতে থাকে কত কথা। কত স্মৃতি। স্মৃতির জাবর কাটতে থাকায় সে সময় কোনো কষ্ট হয় নি। বছিলা ব্রিজের নিচে কিছুটা সময় বসে থাকি। জায়গাটা অনেকটা বদলে গেছে। চায়ের দোকানটা নেই। পানি বেড়ে যাওয়ায় নাকি অন্য কারণে পাথরের ঘাটটি সমান্তরাল হয়ে গেছে, বুঝতে পারলাম না। এ এলাকার তরুণ প্রজন্ম ঈদ উপলক্ষে এখানে এসে একত্রিত হয়। মধ্যবয়সীরা পুনর্মিলনী করলেন। তাদের মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। অন্য সময় লীলাবতির সঙ্গে এখানে আসলে সময় চলে গেলেও একটুও টের পাই না। আর আজ একা একা বসে থাকতে অসহনীয় লাগছে। অস্থির লাগতে থাকে। ঈদের দিন আমাকে এখানে একা একা বসে থাকতে দেখে কেউ কেউ কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকেন। সেখান থেকে ওঠে পড়ে বছিলা ব্রিজের নিচে চর ওয়াশপুরের দিকে যাই। এ এলাকায় আগে কখনো আসি নি। অনেকটা পথ যাওয়ার পর দেখলাম, আর যাওয়া যায় না। তবে ঈদ উপলক্ষে এলাকার রাস্তা-ঘাট বেশ জমজমাট। সবাই ঈদটা উপভোগ করছেন। ক্ষুধার্ত পেট। সূর্যের লেলিহান শিখা। রীতিমতো গোসল করতে থাকি। তারপরও থামি নি। বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম, রাস্তার পাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান দিয়ে গান বাজানো হচ্ছে গগণবিদারীভাবে। ইংলিশ ও হিন্দি ছবির বিটের গান।

কিছুটা পথ যাওয়ার পর দেখলাম, ডান দিক দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। চর ঘাটারপুর। এ পথ দিয়েও কখনো যাই নি। গ্রামীণ পথ হলেও তেমন ঘন গাছ-গাছালি নেই। রোদের তাপে ছটফট করতে থাকি। একটা কালভার্ট পেরিয়ে যাওয়ার পর রাস্তা ডানে-বামে চলে গেছে। আমি কোন দিকে যাব, দ্বিধায় পড়ে যাই। বাঁ দিক দিয়েই যেতে থাকি। লুটেরচর। রাস্তা ভালোই। কোথাও কোথাও মাচা বাঁধানো। তাতে বসে অনেকেই গাল-গল্প করছেন। কেউবা তাস খেলছেন। তবে কোনো কোনো দোকানে গ্রামের প্রবীণরা জমিয়ে আড্ডা মারছেন। কিশোরীদের সাজ-সজ্জা ছিল দেখার মতো। মনে হলো, সবাই পার্লার থেকে জমকালো সেজে এসেছে। কিশোরী ও তরুণদের চোখে পড়লো বেশি। তবে বাসা-বাড়ি, দোকানে অেেনকেই টিভি দেখতে থাকেন। বাংলা ছবির প্রতি ঝোঁকটাই বেশি। আমি একবুক ক্লান্তি নিয়ে হাঁটতে থাকি। কোনো কিছু আমাকে দমাতে পারে না। আমি আসলে নিজেও জানি না, আমি কেন এভাবে হাঁটছি, নিজেকে কেন শাস্তি দিচ্ছি? কোনো কোনো বাড়ি থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ নাকে আসছিল। তাতে ক্ষুধার্ত পেট গুলিয়ে উঠছিল। কেউ কি ভাবতে পারছিলেন, ঈদের দিনে আমি খালি পেটে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য হেঁটে যাচ্ছি। এমন জানলে বোধহয় পথের কোনো বাড়ি থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে খেতে দিতেন। আমি তো ইচ্ছে করেই খাচ্ছি না। নিজেকে কষ্ট দেব বলেই র্ঠিক করেছি। সেটাই করছি। পথেরও যেন শেষ নেই। অন্তহীন পথ।
হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই শ্যামলাশী বাহেরচর। অনেকটা পথ যাওয়ার পর দেখি, জমজমাট মেলা বসেছে। তাতে নানা উপকরণ। আছে পুরস্কারসমেত লটারি ও বিভিন্ন খেলা। সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে মেলা বেশ জমে ওঠেছে। মেলা ছাড়িয়ে অনেকটা পথ যাওয়ার পর আমি আর পারছিলাম না। পায়ে ফোস্কা পড়ে যায়। জ্বালাপোড়া করতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আর হাঁটতেই পারছিলাম না। ভর দুপুরের রোদের তেজ আর ক্ষুধার্ত পেট আমাকে কাহিল করে দেয়। পা ব্যথায় টনটন করছিল। তারপরও যতটা পথ এসেছি, আমাকে ফিরে যেতে হলেও আরো দুই ঘণ্টারও বেশি হাঁটতে হবে। ইচ্ছে করলে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙাচুরা পথে আমি বেবি ট্যাক্সি বা রিক্সা নিতে পারতাম। সেটা নিলাম না। এ পথ দিয়ে সাভার চলে যাওয়া যায়। এটা জেনে আমি অবাক হয়ে যাই। এ রকম একটা পথ আছে একদমই জানতাম না। আমি ফিরে আসতে থাকি। চোখ জ্বালাপোড়া করতে থাকে। এটা কি ঘামের কারণে নাকি চোখের পানিতে, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবে বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠছিল।
ভাবছিলাম, লীলাবতি কেন আমার সঙ্গে এমন করলো? সে কি এখন তার লীলা নিয়ে ব্যস্ত? সে লীলাখেলা করছে আর আমি তারজন্য নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি? নিজেকে পোড়াচ্ছি? চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর চশমার গ্লাস মুছতে হচ্ছিল। আমি শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তিতে বেশি ভেঙে পড়ছিলাম। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। পথের ধুলো-বালিতে আমার প্যান্ট ও গেঞ্জি অনেকটাই শাদা হয়ে যায়। মুখ ও দাঁত বালুতে চিকচিক করতে থাকে। পথ যেন আর শেষ হয় না। রোদের তাপও একটুও কমে না। অন্যান্য দিন ছায়া থাকে। আজ একটানা রোদের অবিরাম বর্ষণ চলতেই থাকে। যেন আমার পরীক্ষা নিচ্ছে। আমি কতটা সইতে পারি। সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকে। মনে হচ্ছিল, আমার অবস্থানটা কাউকে জানিয়ে দিলে ভালো হতো। নিজেই ক্ষান্ত দিলাম। যা হবার হবে, কাউকে জানানোর দরকার নেই। সেই আগের কালভার্টের কাছে এসে সেই পথ দিয়ে না গিয়ে এবার যেতে থাকি লুটেরচরের উত্তরের দিকে।
সেখান থেকে দেখা যায় বছিলা ব্রিজ। মনে হচ্ছিল, এইতো এসে পড়েছি। কোথায় কি? যেতেই থাকি। পথ যেন অন্তহীন হয়ে যেতে থাকে। চিনিও না। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে এগিয়ে যেতে থাকি। রাজধানীর সংলগ্ন যে এমন গ্রামীণ জনপদ আছে, এটা বোঝারই উপায় নেই। পা চলতে চায় না। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় আমি বেহাল হয়ে পড়ি। সূর্য ক্লান্তিহীনভাবে তাপ বিতরণ করতে থাকে। তারপর চারপাশে বালুর ঢিবি। তার হল্কা এসে গায়ে লাগতে থাকে। অবধূতের উপন্যাস অবলম্বনে ‘মরুর্তীথ হিংলাজ’ ছবিতে একদল তীর্থযাত্রীর দীর্ঘ মরুপথের দুঃসহ যাত্রার কথা বার বার মনে পড়ছিল। তারা তো ঈশ্বর দর্শনের আশায় কঠিন এই যাত্রা বেছে নেন। কিন্তু আমি কেন এমন করলাম? এর কোনো উত্তর পাই না। শুধু একবুক অভিমান নিয়ে আমি চলতে থাকি। একসময় বছিলা ব্রিজের কাছে এসে পড়ি। তখন দীনমণির উত্তাপ আরো বেড়েছে। আমি ঝরঝর করে ঘামছি। শরীরের শেষ পানিটুকু বোধহয় বের হয়ে আসতে চাইছে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায় আমি হাঁটতে থাকি ধীরে ধীরে। কেউ দেখলে মনে করবে, আমি অসুস্থ। টেনে টেনে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটা। তীব্র রোদ আমার শরীরের সব নির্যাসটুকু নিংড়ে নিতে থাকে। আমি পারছিলাম না। হোঁচট খাচ্ছিলাম। পড়ে যাচ্ছিলাম।

আসলে শরীরে তখন একটুও শক্তি ছিল না। কেবল মনের জোরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এরমধ্যে একটির পর একটি ফোন আর মেসেজ আসতে থাকে। বাসা থেকে তো কিছুক্ষণ পর পর ফোন। আমি কোনো কিছুতেই সাড়া দেইনি। হাউজিং হয়ে তাজমহল রোডে আসতেই সৃষ্টিকর্তার বোধহয় একটু রহম হয়। ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হয়। সেটা গায়ে লাগার পরও কোনো বোধ হচ্ছিল না। প্রায় সাতটি ঘণ্টা একটানা হেঁটে আগুনে পুড়ে আমি তখন বোধহীন হয়ে পড়েছি। পেটেও কোনো খাবার নেই। একটা জায়গায় বসে পড়ি। আমার তো পথের এখানেই শেষ নয়। এখনও অনেক কাজ বাকি। ক্ষুধা পেটে আমাকে সব করতে হবে। আমার কোনো উদ্যম নেই। উৎসাহ নেই। আগ্রহ নেই। তারপরও করতে হবে। সবাই ঈদের দিন ভরপেট খায়। আর আমার পেটে কোনো খাদ্য নেই। সেটা ইচ্ছে করেই নেই। এ আমার নীরব প্রতিবাদ। জানি, আমার এই প্রতিবাদ, আমার অভিমানের কোনো মূল্য নেই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তবুও আমি এটা করবো। আজ আমি সূর্যস্মান করেছি। আজ আমার এক ধরনের রোজা। আজ আমি কোনো কিছুই মুখে দেব না। আমি জানি, এতে কারো কিছু আসবে যাবে না। যায়ওনি। বুঝতে পারলাম, লীলাবতির লীলাখেলা চলছে। চলছে রঙবদল। চলছে তার সব কিছুই। কেবল আমিই কঠোর সূর্যস্মান করছি। নিজেকে পোড়চ্ছি। নিকষিত হেম হচ্ছি। আমার জীবনটাই বোধহয় এমন। শুধু কষ্টই পাব। ভালোবাসা পাব না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন