পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

মঙ্গলবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২১

কেন যে এত মায়া মায়া লাগে?



রাতে বাসায় ফেরাটা নতুন কিছু নয়। সেই মধ্য আশির দশক থেকে যখন দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতাম, কত কত মাঝ রাত পেরিয়ে বাসায় এসেছি। সেই সময়ের রাতগুলোকে মনে হতো গুপ্ত ঘাতকের মতো। ফাঁদে ফেলার জন্য সারাক্ষণ ওৎ পেতে থাকতো। বাসায় ফেরার বাহন ছিল অফিসের ভাড়া করা সবেধন নীলমণি বেবিট্যাক্সি। এক সময়ের জনপ্রিয় এ বাহনকে এখন আর ঢাকায় দেখা যায় না। বাসায় ফেরার সময় চোখে জড়ানো থাকতো ঘুম। একই বাহনের আরোহী সহকর্মীদের নামিয়ে দিয়ে ফিরতে ফিরতে কখনও কখনও ভোররাত হয়ে যেত। চালক কাকে যে কোথায় নামিয়ে দিত, টেরই পেতাম না। তখন ঢাকার কত বিচিত্র রূপ দেখেছি। ঘুম ঘুম চোখে তো আর রোমান্টিকতা থাকতো না। বরং পথের বাধা-বিঘ্নগুলোকে রীতিমতো নির্যাতনই মনে হতো। পুলিশী জিজ্ঞাসাবাদ, ছিনতাইকারীর ধাওয়া, মাতালের খিস্তি, নিশি পরীদের হুল্লোড়, বেওয়ারিশ কুকুরদের ঘুর ঘুর করা, নৈশপ্রহরীর বাঁশির বুক কাঁপানো তীব্র হুঁইসেল-আরও কত যে কি। অবশ্য রাতের নির্জনতা ভেঙে বিকট শব্দে আমাদের বেবিট্যাক্সি চলার সময় সচকিত হয়ে উঠতো চারপাশ। অনেকে আড়ালে চলে যেতেন। অবৈধ লেনদেনও ক্ষণিকের তরে থেমে যেত। আমার এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না। তখন একটাই চিন্তা, কতক্ষণে বাসায় গিয়ে দু'মুঠো মুখে দিয়ে বিছানায় ক্লান্ত দেহখানি এলিয়ে দেবো।


এটা অবশ্য বুঝতে পারতাম, রাত কিন্তু কখনও ঘুমিয়ে পড়তো না। তার আলাদা একটা রূপ ছিল। সৌন্দর্য ছিল। মাদকতা ছিল। তার কদর বুঝতেন রসিকজনরা। ‘এই মাতোয়ালা রাইত’ শিরোনামে কবি শামসুর রাহমান তার খানিকটা বর্ণনা দিয়েছেন ঢাকার কুট্রিদের ভাষায়, 


হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের 

লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি 

মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা 

রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন 

আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান 

আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও।

 

আমি সারাজীবনই বেরসিক মানুষ। শিশু বয়স থেকে বসবাস সূত্রে ঢাকার বাসিন্দা হলেও অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার মোটেও সমৃদ্ধ নয়। বুকের মধ্যে নেই কোনো কাব্যিকতা। তাই রাতের ঢাকার প্রকৃত রূপ ফুটিয়ে তোলা আমার কর্ম নয়। তবে কখনো কখনো ধবল জোছনা মন উদাস করে দিত। হীরের মতো জ্বল জ্বল করতে থাকা তারাদের ছোটাছুটি দেখে বুকের মধ্যে ভেসে ওঠতো কবি আল মাহমুদের পঙক্তি, ‘তারারা খেলছে তারাদের সাথে’। 


এরশাদ সরকারের সেই রাজত্বকালে অনেক রকম অভিজ্ঞতা হয়। সে সময় প্রায়শই ঢাকায় অস্বাভাবিক রূপ পরিলক্ষিত হতো। কারফিউ, জরুরি অবস্থা, নানান রকম বিধিনিষেধের মধ্যে চলাচল করতে হয়েছে। কিছুক্ষণ পর পর বেবিট্যাক্সি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ, কারফিউ পাস দেখতে চাওয়াসহ কত রকম বায়নাক্কার যে মুখোমুখি হতে হয়েছে। সব প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরও নিরাপত্তা বাহিনীর সন্দেহ দূর হতে চাইতো না। মুখ ব্যাদান করে যেতে দিত। অবশ্য তাতে আমাদের কিছু আসতো যেত না। সাংবাদিকরা আবার কবে কাকে পরোয়া করেছে? এর পরও বিভিন্ন সময়ে কারফিউ, জরুরি অবস্থার মধ্যেই চলাচল করতে হয়েছে। তাতে খুব বেশি সমস্যায় পড়তে হয়নি। আমরা তো আর আইন অমান্য করে চলাফেরা করতাম না। পেশার খাতিরে রাস্তায় নামতে হতো। রাত তো বরাবরই গুলজার করে রাখে প্রেস, প্রস আর পুলিশ। তাই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে চলাচল করলেও এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি হতো।


ক’দিন হলো, পুরানো সেই রাতগুলো যেন আবার ফিরে এসেছে। পুরোপুরিভাবে না হলেও অনেকটা তেমনই। শব্দ ও তাৎপর্যগত কিছুটা হেরফের হয়তো আছে। যদিও আগের মতো রাতের গভীর-গোপন রহস্যময়তা নেই। অনেক মানুষ, অনেক সড়ক, অনেক যানবাহন আর আলোর ঝলমলানিতে এ শহরে ব্যস্ততার কোনো কমতি নেই। মধ্য রাতেও দীর্ঘক্ষণ সিগনালের অপেক্ষায় থাকতে হয়। পরিবেশও আগের মতো নেই। কিন্তু ইদানিং পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে অবিকল সেই রাতগুলোর অনুরূপ। এখন তো সন্ধ্যা ৬টার পর একদম লকডাউনই হয়ে যায়। রাত বাড়তে থাকলে কেমন যেন একটা গা ছমছম করা ভাব। রাস্তার আলোও মনের ভিতরটাকে রাঙিয়ে দিতে পারে না। বরং ম্লান হলদে রঙের আলোয় ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বড় বড় বিল্ডিংগুলো চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। পথের পাশের দোকানপাটে থাকে না প্রাণের উত্তাপ। 


এ ধরনের নির্জন পরিস্থিতিতে কেন যেন বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা রাস্তাঘাট, অলিগলিতে খুব বেড়ে যায়। তাতে সব কিছু আরো বেশি অস্বাভাবিক লাগতে থাকে। লোক চলাচল থাকে না বললেই চলে। চলাচল করেন একদমই হাতেগোনা কয়েকজন। হয়তো জরুরি কোনো প্রয়োজনে কারো কারো বের না হয়ে উপায় থাকে না। আবার কেউ কেউ অবশ্য কৌতূহলী হয়েও বের হন। আমাদের অকারণ কৌতূহল তো অন্তহীন। যে কারণে লেগে থাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে যায় বিভিন্ন বাহিনীর গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, মিডিয়ার তৎপর বাহন। খান খান করে ভেঙে দেয় রাজপথের হিরণ্ময় নীরবতা। এরই মধ্যে হুট করে কোথাও থেকে এসে পড়ে প্রাইভেট কার, মোটর সাইকেল এমনকি রিকশাও। সঙ্গত কারণে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার এই সময়ে কেউ কারো কাছাকাছি হওয়াটাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দায়িত্বের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অপ্রিয় এ কাজটি করতে হয়। সবার নিরাপত্তার জন্য নিজেদের নিরাপত্তা ব্যাহত করা ছাড়া উপায়ও নেই।


আগেই লিখেছি, রাতের ঢাকার সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেলা দিনের। অতীতের সেই সময়ে রাতের বেলা ভয়ের অনেক কারণ ছিল। কিন্তু কখনও ভয় লাগেনি। অথচ এই সময়ে ভয়ের বড় কোনো কারণ না থাকলেও রাতের ঢাকায় চলাফেরা করতে গিয়ে রীতিমতো আতঙ্কে থাকি। গাড়িতে থাকলেও কেউ কাছাকাছি এলে, কোনো কিছুর ছোঁয়া লাগলে কিংবা কোথাও দিয়ে চলাচল করলে প্রতিনিয়ত মনে হয়, অদৃশ্য সেই শক্তিমান বুঝি কোথাও ঘাপটি মেরে আছেন কিংবা শরীরের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়েছেন। সেই সংশয় কিছুতেই কাটতে চায় না। তখন মনে হতে থাকে, দেহের তাপমাত্রা বোধহয় বেড়ে গেছে, চিরস্থায়ী হয়ে যাওয়া পরিচিত কাশিটাকে একটু অন্যরকম মনে হতে থাকে, শরীরটা কেমন ব্যথা ব্যথা অনুভূত হতে থাকে। লক্ষণগুলো মনে মনে কেমন করে যেন দুয়ে দুয়ে চার হয়ে যায়। এরপর কি আর স্বাভাবিক থাকা যায়। দোয়া-দরূদ পড়ে একটা প্রস্ততি নিতে থাকি।

তারপর চারপাশটাকে শেষবারের মতো পরিপূর্ণ দৃষ্টি দিয়ে দেখতে থাকি। পৃথিবীটাকে মায়াবী হরিণের মতো খুব আপন মনে হতে থাকে। হায়! কেন যে এত মায়া মায়া লাগে?

১২ এপ্রিল ২০২০

কেমন যেন বেভুল হয়ে যাই

 

বয়সকে কি থামিয়ে রাখা যায়? এখন অব্দি তেমন কোনো দৃষ্টান্ত দৃশ্যমান নয়। বয়সের ক্রমবৃদ্ধি হওয়াটা স্বাভাবিক ও অনিবার্য এক প্রক্রিয়া হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে শরীরের বিভিন্ন কোষ। তার প্রতিফলন ঘটতে থাকে দেহে, মনে, মগজে। এর ছাপ ক্রমশ স্পষ্ঠ হয়ে উঠে শরীরের বিভিন্ন অংশে। সময় কেড়ে নেয় শারীরিক সক্ষমতা। গড়মিল হতে থাকে অভ্যন্তরীণ কল-কব্জায়। কমিয়ে দেয় চলার গতি। হ্রাস পেতে থাকে চিন্তাশক্তি। দুর্বল করে দেয় স্মৃতিশক্তিও। একজন মানুষকে অচল ও অক্ষম করে দেওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হলো বয়স। মার্কিন কবি টি. এস. এলিয়ট লিখেছেন, I grow old ... I grow old ...I shall wear the bottoms of my trousers rolled. সঙ্গত কারণেই পরিণত বয়সে প্রায়শই ভুল-ভাল হতে থাকে। যদিও আমার স্মৃতিশক্তি কখনই প্রখর নয়। অনেক কিছুই মনে রাখতে পারি না। আর এখন তো সব এলোমেলো হয়ে যায়। চেনা মানুষকে অচেনা মনে হয়। অচেনা মানুষকে লাগে চেনা চেনা। শিল্পী শ্যামল মিত্রের গাওয়া গানের ভাষায়, ‘চেনা চেনা লাগে তবু অচেনা’। একটুতেই গুলিয়ে ফেলি অনেক কিছুই। এ কারণে সত্যিকার অর্থেই আতান্তরে পড়ে যাই।

যে মানুষগুলোর সঙ্গে দীর্ঘদিন চেনাজানা, হয়তো ইদানীং দেখা-সাক্ষাৎ খুব কম হয়, কিন্তু আত্মিক বন্ধন তো অটুট রয়ে গেছে। এ বন্ধন তো একান্তই মনের ব্যাপার। যোগাযোগ না থাকলেও বুঝতে পারি, আমার প্রতি তাঁর বা তাঁদের স্নেহ, ভালোবাসা ও সহানুভূতির কোনো কমতি নেই। এমন সহানুভূতিশীলদের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়। বেশি না হওয়ার দায় অবশ্য আমারই। সবার সঙ্গে আমি প্রাণ খুলে কথা বলতে পারি না। মিশতেও পারি না। আমার প্রতি সহানুভূতিশীলদের বাইরে যাঁরা আছেন, সেভাবে হয়তো তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্টতা বা সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, কিন্তু তাঁদেরও তো অনেক দিন ধরে চিনি বা জানি। প্রায় প্রত্যেকের কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্য মুখস্থ। কেউ কেউ তো নিজ গুণে মহিম্বান্বিত। তাঁরা আমাকে নিয়ে কী ভাবেন, তা অবশ্য জানি না। তাঁদেরকে তো আমার দূরের ভাবার কোনো কারণ নেই। কাছের পরিমণ্ডলেরই মনে করি। এ পরিমণ্ডলের কেউ যখন হঠাৎ চলে যান, তখন বিরাট একটা শূন্যতা তৈরি হয়। এত এত দিন ধরে চেনা মানুষটার অনুপস্থিতিতে বুকের মধ্যে কেমন কেমন লাগে। কাছের মানুষ হিসেবে সেটাই তো স্বাভাবিক। প্রকৃতির সহজাত নিয়মে তারপর একসময় এ শূন্যতাকে মানিয়ে নিতে হয়। এছাড়া তো আর গত্যন্তর নেই। বেশ কিছুদিন চলে যাওয়ার পর একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকি। ইদানীং এটি বেশি হচ্ছে। হুট করে হয়তো মনে হয়, আচ্ছা, অমুককে তো অনেক দিন দেখি না, তিনি কেমন আছেন? হঠাৎ হয়তো তাঁকে দেখার জন্য এক ধরনের আকুলতা কাজ করে। পরে হয়তো জানতে পারি, তিনি তো আর ইহলোকে নেই। আবার এমনও হয়, জীবিত আছেন, কিন্তু অনেক দিন দেখা হয় না, তখন মনে হয়, তিনি কি বেঁচে আছেন? কেমন একটা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যাই। নিজেকে তখন খুব অসহায় মনে হয়। আসলে বয়স বাড়তে থাকলে কোনো কিছু আর ঠিকঠাক মতো নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আমেরিকান কবি ডোনাল্ড হলের মতে, To grow old is to lose everything.

আমার মোবাইলের কললিস্টে এমন অনেকেই আছেন, তাঁরা আর জীবিত নেই। কিন্তু আমার কাছে তাঁরা জীবন্তই রয়ে গেছেন। সে নামগুলো ডিলিট করতে একদমই ইচ্ছে করে না। যাঁরা একসময় সক্রিয় ও সজীব ছিলেন, ছিলেন আমার চেনা গণ্ডির মধ্যে, তাঁদেরকে কি চাইলেই মুছে ফেলা যায়? যে কারণে প্রতিদিন এ নামগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠলে মনে হয়, তাঁরা বোধকরি আছেন আগেরই মতোই। হারিয়ে যাওয়া এ মানুষগুলোর সঙ্গে আমার হয়তো মোবাইলে কালেভদ্রে কথা হতো কিংবা একদমই হতো না, তারপরও তাঁদের অস্তিত্বকে আমি অস্বীকার করতে পারি না। কখনও কখনও মনে হয়, তাঁকে ফোন করলে শুনতে পাবো আলাপিত সেই কণ্ঠ। ভেসে উঠবে পরিচিত সেই অবয়ব। বাস্তবে সেই কণ্ঠ শুনতে পাই না। সেই অবয়বও দেখতে পাই না। এ কেবলই বিভ্রম। এ বিভ্রম আমি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। যতই দিন যাচ্ছে, ততই এ বিভ্রান্তি আমাকে আষ্টেপৃষ্টে বেধে ফেলছে। আমি তার থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাচ্ছি না। কেমন যেন দিশেহারা লাগে।

আর এমনটি মূলত জাতীয় প্রেস ক্লাবের আমার পরিমণ্ডলকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এ ক্লাবের সঙ্গে যতটা বন্ধন গড়ে উঠেছে, আর কোনোকিছুর সঙ্গে ততটা বোধকরি নয়। দেখতে দেখতে ক্লাবের সদস্য হিসেবে পেরিয়ে এসেছি তিন দশকেরও বেশি সময়। এক জীবনে এটি নেহাত কম সময় নয়। এ সময় কত জনের সঙ্গে সম্পর্ক হয়েছে। হৃদ্যতা হয়েছে। কত জন জীবন থেকে হারিয়েও গেছেন। যদিও অন্তর্মুখী স্বভাবের কারণে সবার সঙ্গে যে আমার ঘনিষ্টতা হয়েছে, তা হয়তো বলা যাবে না। সম্পর্ক গড়ে না উঠলেও তাঁদের মুখগুলো তো আমি চিনি। তাঁরাও হয়তো আমাকে চেনেন। এটিইবা কম কি? অসংখ্য মানুষের ভিড়ে একজীবনে কজনের সঙ্গেইবা সম্পর্ক হয়? প্রতিনিয়ত দেখা হয়? প্রখর স্মৃতিধর না হলে কজনকেইবা মনে রাখা সম্ভব? এমনকি খুব কাছের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গেও সাধারণত খুব একটা দেখা-সাক্ষাৎ হয় না। তাঁরাও ধীরে ধীরে মনের আড়ালে চলে যান। কিন্তু জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গে সম্পর্কটা তেমন নয়। এর সঙ্গে যে আত্মার বন্ধন। যেখানে গেলে পাওয়া যায় এক বুক স্বস্তি। এ ক্লাবের সঙ্গে যাঁরা জড়িয়ে আছেন, তাঁরা তো আমার স্বজনের চেয়ে কোনো অংশে কম নন। চেনা মুখগুলোর সঙ্গে অনেক সময় দেখা হয়। আবার অনেকের সঙ্গে দীর্ঘদিন দেখা হয় না। নতুন সদস্যদের আগমন ঘটে। তাঁদের সঙ্গেও পরিচয় হয়। কখনো কথা হয়। অবশ্য পেশাগত কারণে কারও কারও সঙ্গে ক্লাবের বাইরেও দেখা-সাক্ষাৎ হয়। নিয়মিত কিংবা অনিয়মিত দেখা হওয়া মোটামুটি সবাই তো মুখ চেনা। তাঁদের তো কাছের পরিমণ্ডলের মনে না হওয়ার কারণ নেই। যে কারণেই হোক না কেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রেস ক্লাবের প্রতি নির্ভরতা আরো বাড়ছে। বাড়ছে স্মৃতির মৌতাত। নৈকট্য পেতে ইচ্ছে করে দীর্ঘদিনের সহযোগীদের। যত দিন বেঁচে থাকবো, তত দিন তো এ মানুষগুলোর সান্নিধ্যে কেটে যাওয়ার কথা।

আমি মানুষটা একদমই গুটিয়ে থাকা স্বভাবের। যে কারণে নিজ থেকে সবার সঙ্গে মিশতে পারি না। কিন্তু তারপরও অকারণেই অনেকের আশকারা পেয়ে যাই। তাঁরা আমাকে সহজেই আপন করে নেন। তাঁদের সংখ্যা হয়তো খুব বেশি নয়। এঁদের মধ্যে কেউ কেউ হুট করে চলে গেলে ছোট হয়ে যায় আমার গণ্ডি। কেমন যেন রিক্ত হয়ে যাই। নিঃস্ব হয়ে যাই। এ রিক্ততা, এ নিঃস্বতা কখনো কখনো নৈর্ব্যক্তিক হয়ে যায়। মনে হয়, তাঁরা আছেন কাছে কিংবা দূরে। ক্লাবে গেলে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে। দেখা হলে হাঁক দিয়ে উঠবেন পরম শ্রদ্ধাভাজন খ্যাতিমান সাংবাদিক এ. বি. এম. মূসা, কীরে তোরে দেখি না কেন? এমন অকৃত্রিমভাবে কে আর কুশল জানতে চাইবেন? তাঁকে ছাড়া কি প্রেস ক্লাব কল্পনা করা যায়? কেন যেন মনে হয়, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)-এর সাবেক মহাসচিব নিভৃতচারী আখতার আহমেদ খান ওয়াশিংটন বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিস্টার হিসেবে কর্মরত আছেন। যে কোনো দিন ফিরে আসবেন। এসে দিনমান আড্ডায় মশগুল হবেন। ফিনানসিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার সেলিম ভাই (আনিসুর রহমান) নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। আমাকে অসম্ভব পছন্দ করতেন। সে মানুষটি যে কোন ফাঁকে চলে গেছেন, আমি একদমই জানতেও পারি নি। এটি কেমন করে হয়? জানতে পারার পর অশ্রুসজল হয়ে উঠে চোখ। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। হায়! তিনি আর কোনো দিন বলবেন না, দুলাল, কেমন আছো? অবজারভার পত্রিকার আজিজ ভাই (আজিজুল হক) প্রায়শই আমার অফিসে আসতেন। বসবাস করতাম একই এলাকায়। সর্বশেষ যেদিন দেখা হয়, সেদিন বলেছিলেন, পরের সপ্তাহে তিনি অফিসে আসবেন। কিন্তু তিনি আর আসেননি। অথচ আমি তাঁর অপেক্ষায় থাকি। মনে হয়, তিনি একদিন ঠিকই এসে বলবেন, দুলাল, চা খাওয়ান। দেখা হলেই ক্রিকেটের খোঁজখবর জানতে চাইতেন ইউএনবি’র শেখ রকিবউদ্দিন। ক্লাবে গেলে হয়তো জানতে চাইবেন, তাঁর প্রিয় দল পাকিস্তানের সর্বশেষ হালহকিকত। আলতাফ মাহমুদ তো সারাক্ষণ ঝলমল করতেন। মুখে হাসি লেগেই থাকতো। দেখা হলে কুশল জিজ্ঞেস করবেন না, এটা তাঁর অভিধানেই ছিল না। খুব বেশিদিন হয়নি চলে গেছেন অনেকের প্রিয়ভাজন, অনেকের শ্রদ্ধাভাজন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক শাহ আলমগীর ভাই। তিনি যে নেই, এটি এখনও বিশ্বাস করতে পারি না। মনে হয়, পরম নির্ভরতা হয়ে তিনি আশে-পাশেই আছেন। দেখা হলেই বলে উঠবেন, কী খবর তোমার? এ রকম অনেকের কথাই খুব মনে পড়ে। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে টুকরো টুকরো কত স্মৃতি। তাঁরা চলে গিয়েও যেন রয়ে গেছেন। যে কারণে একটা বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। 

ইদানীং বড় বিভ্রান্তিতে ফেলে দিয়েছে করোনাভাইরাস। এই অতিমারি জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে কতগুলো মাস। এমনকি দূরত্ব সৃষ্টি করেছে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সঙ্গেও। ক্লাবে গিয়ে আড্ডা মারা তো দূরে থাক, থাকতে হয়েছে রীতিমতো ঘরবন্দি। এই সময়ে যেন ঘরের বাইরে কোনো স্মৃতি নেই। বলতে গেলে কেমন একটা বিস্মৃত সময় কেটেছে। সবচেয়ে কষ্টকর হলো, করোনাকালে হারিয়ে গেছেন ক্লাবের বেশ কয়েকজন সদস্য : রওশনউজ্জামান, আবু জাফর পান্না, মোহিতুল ইসলাম রঞ্জু, আসলাম রহমান, কামাল লোহানী, কবি মাসুক চৌধুরী, খন্দকার মোজাম্মেল হক, ফারুক কাজী, ডি. পি. বড়ুয়া, রাশীদ-উন-নবী, আবদুল্লাহ এম. হাসান, ফজলুন নাজিমা খানম, কাজী শামসুল হুদা, আবদুস শহিদ, রাহাত খান, ফেরদৌস আহমেদ কোরেশি, নুরুদ্দীন ভূঁইয়া, ফকির আবদুর রাজ্জাক, আবুল হাসনাত। তাঁদের সবাই ছিলেন চেনা-পরিচিত। কেউ ছিলেন সহকর্মী। কেউবা ছিলেন ঘনিষ্টজন। তাঁরা যে নেই, এ কথাটা একদমই বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। সামাজিক দূরত্বের মধ্যে চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছে, তাঁরা আছেন আগের মতোই। ক্লাবে গেলে হয়তো দেখা হয়ে যাবে। 


জানি, সবটাই মায়া। সবটাই মরীচিকা। যে মানুষগুলো চলে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে আর কখনও কথা হবে না। দেখাও হবে না। আমার খোঁজখবরও জানতে চাইবেন না। যে চলে যায়, সে কি আর কখনও ফিরে আসতে পারে? পারে না। এটি ভাবলেই বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে। অস্থির অস্থির লাগে। তাঁদের স্মৃতিগুলো বেদনাতুর করে তোলে। প্রিয় এ মানুষগুলো চলে গিয়ে আমাকে কেমন যেন বেভুল করে দিয়েছেন। এখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারি না, সত্যি সত্যিই কি তাঁরা চলে গেছেন নাকি আগের মতোই আছেন?

১৫ নভেম্বর ২০২০

কে ছিলেন বনলতা সেন?

এই বয়সেও এত মাধুর্য! 

কে ছিলেন তিনি?

খুব কাছের কেউ?

প্রিয়তমা কোনো নারী?

হঠাৎ ট্রেনে দেখা হওয়া কোনো অপরূপা?

বনেদি পরিবারের অল্প বয়সী সুন্দরী কোনো বিধবা? 

রাজবাড়ীতে আপ্যায়নের দায়িত্ব পাওয়া কোনো রূপসী?

কোনো বারবণিতা? 

রাজবন্দি রমণী?

বিপ্লবী কন্যা?

সাহিত্যানুরাগী তরুণী? 

নাকি নিছক কল্পনা?

আজ অব্দি তাকে চেনা গেল না। কীভাবে যাবে? তাকে যিনি চিনতেন, তিনি তো পুরোপুরিভাবে খোলাসা করেননি। যদিও সেটা তো তার করার কথাও নয়। তারপরও সামান্য আভাস দিয়েছেন। তাতে অনেকেই সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তবে বোঝা যায়, কিছু বাস্তবতা আর কিছু কল্পনা করেই তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। তা হয়ে আছে চিরায়ত। চিরকালীন। সেটাই তো সৃষ্টির আনন্দ। কেন তাকে এভাবে মহিমান্বিত করেছেন, এজন্য তাঁর কাছে প্রতিনিয়ত জবাবদিহি চাওয়া হয়। প্রশ্ন তোলা হয় তাঁর চরিত্র নিয়েও। তাঁকে অপমানিত করা হয়। কলঙ্কিত করা হয়। যে বা যারা তাঁকে অপমান করেন, কলঙ্কিত করেন, তারা তো জানেন, তিনি এসব গায়ে মাখবেন না। কষ্ট পাবেন। ভিতরে ভিতরে ক্ষত-বিক্ষত হবেন। কিন্তু কাউকে কিছু বুঝতে দেবেন না। তিনি তো বরাবরই এমন। লাজুক। মুখচোরা। মিতভাষী। এড়িয়ে গেছেন জনতার কোলাহল। নিজেকে কোথাও মানিয়ে নিতে পারেননি। সংসারী হতে পারেননি। সন্ন্যাসীও হতে পারেননি। এ ধরনের মানুষকে পদে পদে ভুগতে হয়। জীবনে স্বস্তি পাননি। শান্তি পাননি। ভালোবাসা কি পেয়েছিলেন? মনে হয় না। কাউকে যে মুখ ফুটে মনের কথা বলবেন, ততটা সাহসী কি ছিলেন? মনে মনে অনেককে ভালোবেসেছেন। তাদের নিয়ে কল্পনা করেছেন। মনের মাধুরি দিয়ে তাদের কাব্যিক অবয়ব গড়ে তুলেছেন। তাঁর নির্মিত মানুষগুলোকে এখন সবাই চেনেন। জানেন। কিন্তু তারাও তো তাঁকে ভালোবাসেনি। তারা তাঁর কথা মানতো না। কোথাও যেতে কিংবা অপরিচিত কারো সঙ্গে কথা বলতে কত বারণ করেছেন। তীব্র আকুতি নিয়ে বলেছেন,'.... ওইখানে যেওনাকো তুমি, বলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে;....... কি কথা তাহার সাথে? তার সাথে!' হায়! কে শোনে কার কথা? তাঁকে কেইবা পাত্তা দিয়েছে? তা নিয়ে মনস্তাপ থাকলেও জোর গলায় কিছু বলতে পারেননি। মীন রাশির জাতক তো। সব কিছু সইয়ে নিয়েছেন। তিনি সহজেই সম্পর্ক যেমন গড়তে পারেন না, তেমনিভাবে ভাঙতেও পারেন না। যে কারণে কাউকে ভুলতে পারেননি। বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ নিয়ে ভালোবাসার মানুষগুলোকে মহিমাণ্বিত করেছেন। তবে সবাইকে ছাপিয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে বনলতা সেন। যতটা জানা যায়, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। নামটা শুনেই হৃদয়ে গেথে যায়। কে এই বনলতা সেন? তাকে নিয়ে কতনা জল্পনা-কল্পনা। 

কেউ বলেন, বনলতা সেন জীবনানন্দ দাশের খুড়তুতো বোন শোভনা দাশগুপ্ত। কাকা অতুলানন্দ দাশের মেয়ে। প্রথম গ্রন্থ 'ঝরাপালক' জীবনানন্দ তাঁকেই উৎসর্গ করেন। এ কারণেও কানাঘুষাটা পল্লবিত হয়।

নাটোরকেন্দ্রিক প্রচলিত কাহিনি হচ্ছে, জীবনানন্দ দাশ  একবারট্রেনে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। তখন নাটোর হয়ে যেতে হতো। (আসলেও কি তাই?)। নাটোর স্টেশন থেকে উঠেন বনেদি একটি পরিবারের ম্যানেজার ভুবন সেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিধবা বোন বনলতা সেন। জীবনানন্দ দাশের খানিকটা আলাপ হওয়ার পর একসময় মেয়েটি নিজের গন্তব্যে নেমে যান। রেখে যান এক ঝলক ভালোলাগা। সেই ভালোলাগাই রূপান্তরিত হয় কবিতায়। 

দ্বিতীয় কাহিনি, নাটোরে বেড়াতে গিয়ে বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর বাড়িতে অতিথি হন জীবনানন্দ দাশ। এক দুপুরে আমন্ত্রিত হন সুকুল এস্টেটের ম্যানেজার ভুবন সেনের বাড়িতে। তাঁকে আপ্যায়িত করেন ভুবন সেনের অল্প বয়সী বিধবা বোন বনলতা সেন। তাঁর সৌন্দর্য দেখে তিনি অভিভূত হন। সেই সৌন্দর্যকে অমলিন করে রাখেন কবিতায়। 

তৃতীয় কাহিনি, একজন রাজার আমন্ত্রণে নাটোরের রাজবাড়ী বেড়াতে আসেন জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে আপ্যায়নের জন্য দুজন সুন্দরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার মধ্যে একজনকে তাঁর পছন্দ হয়। তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখতে চাইলে লোকলজ্জার ভয়ে তিনি ভিন্ন নামে লিখতে বলেন।সেই নামটি হচ্ছে বনলতা সেন। উল্লেখিত তিনটি কাহিনিতে অনেকটাই সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু কোনো কাহিনির সত্যতাই নিশ্চিত নয়। সবই উড়াধুরা। 

জীবনানন্দ দাশের জীবনীকার গােপালচন্দ্র রায় তাঁর 'জীবনানন্দ' বইয়ে লিখছেন, "একদিন সকালে গেছি! গেলে ঘরে বসিয়ে বললেন আমার 'বনলতা সেন' বইটা সিগনেট প্রেস বার করেছে। এই বলে তিনি আমার হাতে একখানা 'বনলতা সেন' দিয়ে বললেন—কাগজ, ছাপা, বাঁধাই সবই ভাল, কিন্তু কভারের ছবিটি আমার আদৌ পছন্দ হয়নি।

আমি বইটা খুলে দেখছি। সেই সময় তিনি আর একটা 'বনলতা সেন' নিয়ে আমার নাম লিখে আমার হাতে দিলেন।

আমি বই হাতে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম দাদা, বনলতা সেন কে? আপনি তাে লিখেছেন নাটোরের বনলতা সেন। এ নামে সত্যিই আপনার পরিচিত কেউ ছিল নাকি? 

আমার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন। কোনাে উত্তর দিলেন না। 

আমি আবার বললাম-—দাদা, এই রকম আর একটা কবিতা লিখুন। পারবেন না? এবারও তিনি হাসতে লাগলেন। কোনাে কথা বললেন না।"

ঢাকার সন্তান ভারতের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও লেখক অশোক মিত্র ২০১০ সালে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন, 'এক নিভৃত সন্ধ্যায় জীবনানন্দের কাছে প্রশ্ন রেখেছিলাম, বনলতা সেন নামটি কবিতায় ব্যবহারের জন্য তাঁর কী করে মনে এলাে; সেইসঙ্গে এটা জিজ্ঞেস করেছিলাম, কবিতাটির অন্তঃস্থিত অন্ধকারের প্রসঙ্গ তাঁর কি আগে থেকেই ভাবা ছিল, নাকি বনলতা সেন নামটি বেছে নেওয়ার পর কবিতাটি নিজের নিয়তি নির্ধারণ করেছে। দ্বিতীয় প্রশ্নের কোনাে জবাব পাইনি। জীবনানন্দ শুধু জানিয়েছিলেন, সেই সময় আনন্দবাজার পত্রিকায় মাঝে মাঝে নিবর্তক আইনে বন্দিরা কে কোন কারাগারে আছেন, বা কোন জেল থেকে কোন জেলে স্থানান্তরিত হলেন,সে-সমস্ত খবর বেরােত। হয়তাে ১৯৩২ সাল হবে, নয়তাে তার পরের বছর, বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহি জেলে আছেন, খবরটা তাঁর চোখে পড়েছিল, রাজশাহি থেকে নাটোর তাে একচিলতে পথ। ইতিবৃত্তের এখানেই শেষ। প্রাকস্বাধীনতা যুগে রাজবন্দিনী সেই মহিলা পরে গণিতের অধ্যাপিকা হয়েছিলেন, কলকাতার কলেজেও পড়িয়েছেন। বিবাহােত্তর পর্বে অন্য পদবী ব্যবহার করতেন, তাঁর সঙ্গে সামান্য আলাপ হয়েছিল। ভব্যতাবশতই জিজ্ঞেস করা হয়নি তিনি কবিতাটির সঙ্গে আদৌ পরিচিত কিনা। কিছু কিছু রহস্যকে অন্ধকারে ঢেকে রাখাই সম্ভবত শ্রেয়।' 

বনলতা সেন কবিতার স্রষ্টার কাছথেকে অশোক মিত্র এমন তথ্য অবহিত হওয়ার পরও কোনো কোনো গবেষক এমন সব তথ্য পরিবেশন করেছেন, যা রীতিমতো বিভ্রান্তিকর।  

সাবেক সচিব ড. আকবর আলি খান ২০১১ সালে লিখেছেন, 'সরকারী চাকুরি সূত্রে রাজশাহীতে অবস্থানকালে নাটোরের প্রশাসকদের বিভিন্ন প্রতিবেদন দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। প্রশাসকদের দলিল দন্তাবেজ হতে দেখা যায় যে, এ শতাব্দীর প্রথম দিকে নাটোর শুধু কাঁচাগােল্লা বা জমিদারদের জন্য বিখ্যাত ছিল না, নাটোর ছিল উত্তর বঙ্গের রূপাজীবাদের সবচেয়ে বড়কেন্দ্র। আমার কাছে মনে হয়, নাটোর বনলতা সেনের শুধু ঠিকানা নয়। "নাটোর'' শব্দটির দ্বারা তার পেশা সম্পর্কে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে দেখলে বনলতা সেন নামটির তাৎপর্যও সহজে বােঝা যায়।সেন পদবী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সে ভদ্রবংশ উদ্ভূত। বনলতা বাংলাদেশে ব্যবহৃত কোন সাধারণ নাম নয়। তার স্খলনের পর নিজের পরিচয় লুকানাের জন্য সে হয়ত ছদ্মনাম নিয়েছে।

বনলতার এ পরিচয় কবিতাটিকে একটি সম্পূর্ণ নতুন দ্যোতনা দেয়। এখন আমরা বুঝতে পারি, বনলতা সেন কেন কবিকে "দু দণ্ডের শান্তি'' দিয়েছিল, বুঝতে পারি কেন কবির অভিসার “নিশীথের অন্ধকারে” এবং “দূর অন্ধকারে"। এ পটভূমিতে দেখতে গেলে, “এতদিন কোথায়'' ছিলেন একটি সাধারণ প্রশ্ন নয়। বনলতা সেন যেন বলতে চাচ্ছে যে, সে ইচ্ছে করে রূপাজীবা বৃত্তি গ্রহণ করেনি, তার জীবনে অনেক ঝড়ঝঞা গেছে, সে দুঃসময়ে তার পাশে কেউ ছিল না। "এত দিন কোথায় ছিলেন" একটি সৌজন্যমূলক প্রশ্ন নয়, এ হচ্ছে বিপর্যস্ত নারীত্বের আর্তনাদ। বনলতার পরিচয় পেলেই আমরা বুঝতে পারি কবি কেন কবিতার শেষে বলছেন “সব পাখি ঘরে ফেরে''। বনলতাদের সাথে দুদণ্ড সময় কাটালেও শেষ পর্যন্ত জীবনানন্দদের (বিবাহিত পুরুষদের) লাবণ্যপ্রভাদের (স্ত্রীদের) কাছে ফিরে আসতে হয়। বনলতাকে আলােকোজ্জ্বল পৃথিবীতে প্রকাশ্যে পাওয়ার কোন সুযােগ নেই। বনলতার কথা কাউকে বলারও উপায় নেই। বনলতাকে নীরবে নিভৃতে স্মরণ করতে হয় অপরাধবােধ নিয়ে। তাই কবি বলেছেন, থাকে শুধু অন্ধকার, মুখােমুখি বসিবার বনলতা সেন। এ অন্ধকার প্রাকৃতিক নয়, এ অন্ধকার মানসিক।' 

এত দিন জানতাম, কল্পনা দিয়ে কবিতা লেখা যায়। কল্পনা দিয়ে যে নতুন তথ্য উদঘাটন করা যায়, এটা জানা ছিল না। এও এক নবতর দৃষ্টান্ত।

একজন বনলতার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল লেখক অন্নদাশঙ্কর রায়ের। জীবনানন্দ দাশের বরাত দিয়ে অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯৩২ বা ১৯৩৩ সালে বনলতা সেন নাম্নী এক রাজবন্দি রাজশাহী জেলে ছিলেন। ১৯৩৭ সালে রাজশাহী জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তখনকার স্মৃতি নিয়ে ১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত 'জীবনযৌবন' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, 

'তখনকার বাংলা প্রদেশ ছিল ইংরেজিতে যাকে বলে যবধৎঃ-নৎবধশ যড়ঁংব. হিজলি জেল থেকে একটি মেয়ে আমাকে চিঠি লিখে আমার উপন্যাসের প্রশংসা জানায়।মেয়েটির নাম যতদূর মনে পড়ে বনলতা। আমার উত্তর নিশ্চয়ই সেন্সর করা হবে। খুব সাবধানে লিখি। তাও ইংরেজিতে। এইসব রাজবন্দিনীর প্রতি আমার স্নেহ ও সহানুভূতি ছিল। কিন্তু সেটা কি প্রকাশ করতে পারি?'

হিজলিতে ছিল ব্রিটিশ ভারতের একটি ডিটেনশন ক্যাম্প। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্যাম্পটি স্থাপিত হয়। তবে অন্নদাশঙ্কর রায় শুধু 'বনলতা' লেখায় একটা সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। সে সময় দুজন বনলতার কথা জানা যায়। একজন বনলতা দাশগুপ্ত ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব ও অগ্নিকন্যা। ১৯১৫ সালে বিক্রমপুরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতার নামহেমচন্দ্র দাশগুপ্ত ও মাতার নাম নির্মলাসুন্দরী দাশগুপ্ত। স্কুলের ছাত্রী অবস্থাতেই তিনি স্বদেশি আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হন। যোগ দেন বিপ্লবী দলে। ১৯৩০ সালে বেশিরভাগ সদস্যই পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় দলটা ভেঙে যায়। লেখাপড়া ছাড়াও তিনি মােটরগাড়ি ও পিস্তল চালাতে পারতেন। কলেজ হােস্টেলে থাকাকালীন রিভলবার রাখার জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কলকাতার লালবাজার লকআপে তাঁকে রেখে তিন দিন ধরে অমানুষিক অত্যাচার চালানাে হয়। এরপর প্রেসিডেন্সি জেলের অন্ধকার লকআপে একমাস রেখে দেওয়া হয়। তিনি কিছু দিন হিজলি জেলেও বন্দি ছিলেন। এই বনলতা জীবনানন্দ দাশের আত্মীয় হন নাতো? হলে খুব অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। জীবনানন্দ দাশের আদি বাড়িতো বিক্রমপুরের গাউপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত বিক্রমপুর থেকে বরিশালে নিবাস স্থানান্তরিত করেন। সর্বানন্দ দাশগুপ্ত জন্মসূত্রে হিন্দু ছিলেন; পরে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা নেন। কিন্তু বংশের অন্যান্যরা বিক্রমপুরে রয়ে যান। জীবনানন্দ তাঁর নাম থেকে গুপ্ত ছেঁটে দিয়ে শুধু দাশ নামে পরিচিত হন। ১৯৩৬ সালের ১ জুলাই বনলতা দাশগুপ্তের মৃত্যু হয়। তাঁকে নিয়ে কি কবিতা লেখা হয়েছে? অবশ্য তাঁর রাজশাহী জেলে থাকার কথা জানা যায় না। ১৯৩৭ সালে বনলতার চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অন্নদাশঙ্কর রায়। তাহলে তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন কোন বনলতা?


যে বনলতা সেনকে নিয়ে এত কৌতূহল তাঁরও একটা ঠিকুজি পাওয়া যায়। তিনিও ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরােধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন ব্যক্তিত্ব। বৃহত্তর ফরিদপুরের কার্তিকপুর গ্রামে ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে তাঁর জন্ম। (আচ্ছা, কার্তিকপুর কি কেউ চেনেন?) তাঁর পিতার নাম কালীপ্রসন্ন সেন ও মাতার নাম সরােজিনী দেবী। তাঁর পরিবার স্বদেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৩০ সালে তিনি অনুশীলন সমিতির সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৩৩-৩৫ সালের আন্তঃপ্রাদেশিক ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত থাকায় সম্ভবত তিনি কারারুদ্ধ হন। তখন কি তিনি রাজশাহী জেলে ছিলেন? ১৯৩৭ সালে বন্দি মুক্তি আন্দোলন, ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুভাষচন্দ্র বসু ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করলে তিনি তাঁর সঙ্গে যােগদেন। ১৯৪২ সালে 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় মিছিলের পুরােভাগে থাকায় তিনি পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হন এবং প্রেসিডেন্সি জেলে তিন বছর কারাবাস করেন। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়ে তিনি অর্থনীতি শাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৫ সালে মুক্তিলাভের পর তিনি অনুশীলন সমিতির কাল থেকে তাঁর সহকর্মী সরােজ কুমার চক্রবর্তীকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টিতে যােগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় তিনি রিলিফের কাজ করেন। নানান স্থানে শ্রমিক আন্দোলন এবং মহিলাদের মাঝে কাজ গড়ে তােলার জন্য বিভিন্ন মহিলা সংগঠনে যুক্ত ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গেই যোগাযোগ হওয়ার কথা জানিয়েছেন অশোক মিত্র। ১৯৮৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। এই বনলতা কি অন্নদাশঙ্কর রায়কে চিঠি লিখেছিলেন? 

অশোক মিত্র'র ভাষ্য অনুযায়ী, যা এখন অব্দি সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তথ্যও, সম্ভবত ফরিদপুরের এই বনলতা সেনকে নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন জীবনানন্দ দাশ। তার মানে বনলতা সেনের বাড়ি নাটোর নয়। তাতে অবশ্য কিইবা আসে যায়? আমরা যেহেতু জীবনানন্দ দাশের মাধ্যমে বনলতা সেনকে চিনি, তাকে নাটোরের মেয়ে ভাবতেই ভালো লাগে। এই ভালোলাগার কারণে তিনি হয়ে আছেন আমার বা আমাদের প্রিয়তমা নারী। ১০৫ বছর বয়সেও তার মাধুর্য একটুখানি ম্লান হয়নি। বাংলা কবিতা যতদিন পঠিত হবে, ততদিন তার লাবণ্য, তার সৌন্দর্য আর আকর্ষণী ক্ষমতার কোনো কমতি হবে না। বয়স যতই হোক না কেন, তার প্রেমে যুগে যুগে হাবুডুবু খাবেন তাবৎ জীবনানন্দ অনুরাগী। তাই নয় কি?

তথ্যসূত্রঃ

১. জীবনানন্দ দাশঃ জন্মশতবার্ষিকী স্মারকগ্রন্থ, আবদুল মান্নান সৈয়দ/আবুল হাসনাত সম্পাদিত, অবসর প্রকাশনা, ২০০৭

২. অশোক মিত্র, বিক্ষিপ্ত অর্ধশতক, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৪

৩. অন্নদাশঙ্কর রায়, জীবনযৌবন, আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৩

৪. আকবর আলি খান, পরার্থপরতার অর্থনীতি, ইউনিভার্সিটিপ্রেস লিমিটেড, ২০১৬

৫. আজিজুর রহমান খান, বনলতার সন্ধানে, কালি ও কলম, ২০১৫

৬. উইকিপিডিয়া

মন কেন বুঝতে চায় না

 


কী অদ্ভুত এক জীবন! যে জীবন আমি চাইনি, সেই জীবন আমাকে মেনে নিতে হচ্ছে। না মেনে তো উপায়ও নেই। মেনে নিয়েই একান্ত নিরুপায় হয়ে ঘরবন্দি থাকতে হচ্ছে। যদিও এখনও আমাকে সপ্তাহে তিন দিন বাসা থেকে বের হতে হয়। সেটাইবা কত দিন পারবো, কে জানে? যেভাবে আশপাশ ঘিরে ফেলেছে করোনা বাহিনী, কখন যে শমন জারি হয়? তারপরও নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গ ভাবা যাচ্ছে না। কীভাবে ভাববো? যে আমাকে প্রায় সারাদিনই কাজের প্রয়োজনে বাইরে বাইরে থাকতে হয়, তার এভাবে স্বেচ্ছাবন্দি থাকাটাকে ‘দণ্ডকারণ্যে নির্বাসন’-এ পাঠানোর মতো মনে হচ্ছে। অথচ অফুরন্ত এই ‘ছুটি’কে আমার প্রাণভরে উপভোগ করার কথা। তা একদমই উপভোগ্য হয়ে ওঠছে না।

আমাকে যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন বা জানেন, তাঁদের অনেকেই আমার ওপর মাঝে-মধ্যে খুবই বিরক্ত হন। সেটা আমি সহজে বুঝতে পারি। এ বিরক্তিটা কোনো তিক্ততা থেকে নয়, বরং গভীর ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। আমার কাজ-কর্মের ধরন দেখে তাঁরাই ফেড-আপ হয়ে যান। নিজেকে সতেজ রাখার জন্য আমাকে তাঁরা মাঝে মাঝে বিশ্রাম বা ছুটি নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসতে বলেন। আমিও যৌক্তিক কারণেই সহমত পোষণ করি। ভাবি, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপরে, একটি শিশিরবিন্দু’। এমনকি পেশাগত কাজে গিয়ে আমার বন্ধু বা সহকর্মীরা যখন কোপাকাবানা সৈকতে সূর্যাস্ত উপভোগ করেন কিংবা বিলাসবহুল অন্য কোথাও গিয়ে উচ্ছ্বলতায় মেতে ওঠেন, আমারও তখন ইচ্ছে হয়, কাজের ফাঁকে হাতিরঝিলে কিংবা বছিলা ব্রিজে গিয়ে অন্তত দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে আসতে। এর বেশি সামর্থ্য তো আমার নেই। শেষ পর্যন্ত সে ইচ্ছেটাও অপূর্ণ রয়ে যায়। এ অপূর্ণতা নিয়েই জীবনের পরিধি ক্রমশ সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। তা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

যদিও এই করোনাকালে কোথাও যাবার সুযোগ নেই, কিন্তু বাসায় বসে ছুটিটা অন্তত চুটিয়ে উপভোগ করা যায়। কেন যেন সেটাও পারছি না। আমার স্বভাবটা এমন, মিষ্টি হাসি দিয়ে আমার কাছ থেকে কঠিন কাজ যত সহজে আদায় করা যায়, কোষ্ঠকাঠিন্য মনোভাব দেখিয়ে সহজ কাজটা করে নেওয়া ততটাই কিন্তু কঠিন। যে জন্য মুফতে ছুটি পেলেও এর সঙ্গে মোটেও মানিয়ে নিতে পারছি না। এমন ছুটি তো আমার কাঙ্খিত ছিল না। যে কারণে সব মিলিয়ে একটা অস্থিরতার মধ্যে দিন কাটছে। কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারছি না। মানসিক শান্তি যদি না থাকে, তাহলে কীসের ছুটি, কীসের বিশ্রাম আর কীসের প্রশান্তি?  

সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার, সেই স্কুল বয়স থেকে সংবাদপত্র পাঠ করাটা যে কোনও কারণেই হোক অভ্যাসে পরিণত হয়। আর কোনো অভ্যাস বোধকরি এত দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এর কারণ কি জানি না। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন বলেছিলেন, ‘আমাকে যদি সংবাদবিহীন সরকার ও সরকারবিহীন সংবাদপত্রের একটিকে বেছে নিতে বলা হয়, তবে দ্বিতীয়টি বেছে নিতে আমি এক মুহুর্ত দ্বিধা করবো না’। যদিও সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার কোনো সম্ভাবনা আমার নেই, সঙ্গত কারণে এমন প্রশ্ন কেউ আমাকে করবেনও না। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রতি নিখাদ ভালোবাসাটা সহজাতভাবেই গড়ে ওঠেছে। সংবাদপত্রবিহীন একটি দিনও আমি কল্পনা করতে পারি না। আজ অব্দি এ অভ্যাসের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। হাসপাতালে অনেক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বাসায় ফিরে এসে না দেখা সংবাদপত্রে একবার অন্তত চোখ না বুলাতে পারলে অস্বস্তিটা কিছুতেই দূর হতে চায় না। মনে হয়, কোথায় যেন অসম্পূর্ণতা রয়ে গেল।

অথচ সেই আমি বেশ কয়েক দিন হলো, কী অদ্ভুতভাবে সংবাদপত্র ছাড়াই দিনগুলো কাটিয়ে দিচ্ছি। সংবাদপত্র যেমন হাতের নাগালে পাচ্ছি না, তেমনিভাবে আমিও সেই তাগিদ অনুভব করছি না। আর কারো এমন মনোভাব হচ্ছে কিনা আমি জানি না। একজন নাগরিক মানুষ, যে নিজেও মিডিয়া ঘরানার, সে কিনা  সংবাদপত্রের সংস্পর্শে নেই! এটা কি সুস্থ জীবনবোধের লক্ষণ? অবশ্য সময়টাও তো সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর নয়। তার আবার জীবনবোধ!

এমনিতেই ভার্চুয়াল জগতের কারণে প্রিন্ট মিডিয়া তো বটেই, ইলেকট্রনিক মিডিয়াও মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় করোনাভাইরাস প্রিন্ট মিডিয়ার ভবিষ্যতকে অনেক বেশি অনিশ্চিত করে তুলবে বলে আমার মনে হচ্ছে। অনির্ণেয় এ রোগের কারণে বদলে যাচ্ছে মানুষের অভ্যাস, রুচি ও মন-মানসিকতা। কেবলই মিডিয়া নয়, করোনা পরবর্তী সময়ে বদলে যাবে অনেক কিছুরই খোলনলচে। তা কতটা ও কীভাবে যাবে, আমরা হয়তো কল্পনাও করতে পারছি না। 

না চাইলেও মনের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ হাহাকার করে উঠে, বদলে যাওয়া সেই অচিন সময়টাকে দেখার সুযোগ কি পাওয়া যাবে? এ ভাবনাটা সারাক্ষণ মাথার মধ্যে চেপে বসে আছে। কথায় বলে, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা’। এ শয়তানটা হরদম মাথার মধ্যে শুধু প্যাঁচ কষছে। ঘুমাতে যাবার আগে এবং ঘুম থেকে উঠার পর অনবরত নেতিবাচক ভাবনায় পেয়ে বসে। তা থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। এমন ভাবনা না ভাবার জন্য মনকে কত করে বোঝাই। ব্যাটা মন কিছুতেই বুঝতেই চায় না। অবশ্য মন কবেইবা আমাকে বুঝেছিল?

৮ এপ্রিল ২০২০

ভয়ের বিপরীতে অভয়

 


মৃত্যু তো অবশ্যম্ভাবী। কবি মাইকেল মধুসূধন দত্তের ভাষায়, ‘জন্মিলে মরিতে হইবে, অমর কে কথা কবে’। কার, কখন, কোথায়, কীভাবে মৃত্যু হবে, সেটা তো কারো পক্ষে আগাম বলা বা জানা সম্ভব নয়। যে কারণে মৃত্যুর জন্য একটা প্রস্তুতি ভিতরে ভিতরে থাকেই। হঠাৎ আসা মৃত্যু নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কোনো সুযোগও থাকে না। আহাজারি যেটুকু হয়, তা কেবল স্বজনদের। তা তো দেখার সুযোগ পাওয়া যায় না। কিন্তু মৃত্যুর আতঙ্ক নিয়ে বেঁচে থাকা কী যে দুঃসহ যন্ত্রণার, সেটা বিশ্ববাসী পলে পলে অনুভব করছেন। মৃত্যুর নিরন্তর ফিসফিসানি বুকের মাঝে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। আততায়ীর মতো করোনাভাইরাস প্রতি মুহুর্তে আমাদের অনুসরণ করছে। না জেনে ভাইরাসবাহিত কোথাও স্পর্শ করলে, ভাইরাসবহনকারী কারো সংস্পর্শে গেলে অমনি যে কাউকেই চুম্বক লোহার মতো খপ করে ধরে ফেলতে একটুও দ্বিধা করছে না। এ যেন গ্রিক পুরাণের সেই ‘মিডাস টাচ’। লোভী রাজা মিডাস যা কিছু স্পর্শ করেন, তা সোনা হয়ে যায়। নিজের প্রিয় কন্যাও যখন স্বর্ণপিণ্ড হয়ে যায়, তখন তার হুঁশ হয়। রাজা তো লোভের কারণে এমন বর চেয়েছিলেন। দুনিয়ার মানুষ তো ‘করোনা টাচ’ চায়নি। তাহলে এমন হচ্ছে কেন? করোনা ধরলেই যে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলছে, তা অবশ্য নয়। ভয় দেখিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আধমরা করে ফেলছে। আর মারলেও কিছুটা করুণা তো করছে। দয়াপরবশত হয়ে মারার আগে লড়াই করার একটা সুযোগ দিচ্ছে। বাঁচা-মরা অনেকটা নির্ভর করছে প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যার শক্তি, সাহস ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি, সে জিতে যাচ্ছে। প্রতিরোধ ক্ষমতা যেমন নিজের থাকতে হবে, তেমনিভাবে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর তা অনেকটা নির্ভরশীল। 

এ রোগের সংক্রমণ হওয়ার যে কৌশল, তা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। যে ইউরোপ-আমেরিকাকে আমরা সভ্যতার মানদণ্ড হিসেবে নির্ভর করে এসেছি, ভরসা করে এসেছি, মান্য করে এসেছি, করোনাভাইরাস যেভাবে তাদের রীতিমতো ঘোল খাইয়ে দিচ্ছে, তা কোনো হিসেবেই মিলছে না। প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে মৃত্যুর সংখ্যা। এখন অব্দি এটা থামানোর কোনো ওষুধ নেই। কোনো প্রতিকার নেই। সবচেয়ে বড় কথা, এটা কোথায় গিয়ে থামবে, তার নিশ্চয়তা তো দূরে থাক, ঘুণাক্ষরে আঁচ করাও যাচ্ছে না। এটি এমন একটি রোগ, কেউ কাউকে সাহায্য করতে গেলেও আক্রান্ত হতে পারেন। এমনকি একটি দেশ অন্য কোনো দেশকে যে সাহায্য বা সহযোগিতা করবে, সে অবস্থাও নেই। বরং কে কতটা দূরত্ব গড়ে তুলতে পারে, সেটাই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার জিয়নকাঠি। এরচেয়ে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

আর আমাদের মতো ঘনবসতির দেশে এর পরিণতির কথা চিন্তা করে অনেকের ঘুমই হারাম হয়ে গেছে। সেটাই হওয়ার কথা। আমাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের যে বৌদ্ধিক মান, জাতীয় অভ্যাস ও অর্থনেতিক অবস্থা, তা এ ধরনের মহামারি সামাল দেওয়ার মতো নয়। অনেকেই এর মর্ম বোঝেন না। যে কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। অনেকে বুঝলেও বেসামাল আচরণ করেন। মনে করেন, পুরো বাজারটা নিজের বাসায় নিয়ে গেলেই তিনি বা তাঁর পরিবার অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন। আবার অনেকে নিজে সচেতন হলেও অন্যকে সচেতন করা কিংবা পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে সংক্রমণমুক্ত করার ব্যাপারে মোটেও উৎসাহী নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, যে কোনো সংকটে প্রথমেই আমরা মানবিক ও বিবেচনা বোধটা হারিয়ে ফেলি। অথচ যে কোনো সমস্যায়, সংকটে সবার আগে সেটাই প্রয়োজন।

জানি, ভাইরাসটি খুবই স্বার্থপর ধরনের। একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। আপনকেও পর করে দিচ্ছে। তারপরও এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে সম্মিলিতভাবে। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া করোনাভাইরাসকে ঠেকানো যাবে না। কারণ আপনি-আমি এককভাবে চাইলেও ‘করোনা টাচ’ থেকে দীর্ঘ দিন রেহাই পাওয়া মোটেও সহজ নয়।


করোনাভাইরাসকে কেন্দ্র করে এখন পর্যন্ত কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। বরং সর্বত্রই একটা আতঙ্কময় পরিবেশ। মনে হচ্ছে, সবাইকে যত বেশি আতঙ্কিত করা যাবে, তত সুফল পাওয়া যাবে। অনেকেই মহা আনন্দে সেটা করছেন। এ অবস্থা কত দিন অব্যাহত থাকবে, তা তো আমরা জানি না। সেক্ষেত্রে আতঙ্কিত পরিবেশ যদি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি কি হিতে বিপরীত হয়ে যাবে না? অনেকের পক্ষে এই মানসিক চাপ সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়ছে মানসিক রোগ। 

যে কারণে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য মৃত্যু উপত্যকা ইতালিতে বাসার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সম্মিলিতভাবে গান-বাজনা করা হয়। জাগিয়ে তোলা হয় জীবনের স্পন্দন। আমাদের পক্ষে তো সেটা সম্ভব নয়। এমনকি পারবো না জেনিফার হলার হতেও। কিন্তু ভয়ের বিপরীতে অভয়টা জাগিয়ে তোলার মনোভাবটা থাকতে হবে। জ্বালাতে হবে আশার আলো। দূরত্ব বজায় রেখেই গাইতে হবে জীবনের জয়গান ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’।

২১ মার্চ ২০২০