পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

শনিবার, ১২ মার্চ, ২০১৬

জোনাক জ্বলে জোনাক নেভে

আমার কাছে পরম এক বিস্ময় জোনাকী। আদর করে জোনাক পোকা নামেও ডাকা হয়। রাতের আঁধারে নীলাভ-সবুজের অস্থির ছোটাছুটি কী যে মোহনীয় লাগে, বোঝানো যাবে না। আলোর বিপরীতে অবস্থান হলেও জোনাকীর কারণেই অন্ধকারকে অনেক রোমান্টিক লাগে। আর এর পটভূমি তো গ্রামীণ জনপদ। যেখানে সন্ধ্যা নেমে এলে শুরু হয় জোনাকীদের অভিসার। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী সেই কবে বুকের মধ্যে এঁকে দিয়েছেন এমন দৃশ্যপট, ‘পুকুর ধারে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে’। জ্বলে আর নেভে। নেভে আর জ্বলে। চলতে থাকে ক্রমাগত ছটফটানি। যত বেশি ছটফটায়, ততই উজ্জ্বলতা ছড়ায়। একসঙ্গে যখন অসংখ্য জোনাকী উড়তে থাকে, তখন মনে হয় আতসবাজির রোশনাই। আমার শৈশব-কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জোনাকী। তখন স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পর প্রতি বছরই বেড়াতে যেতাম গ্রামের বাড়িতে। গ্রাম আমাকে যে কারণে চুম্বকের মতো টানে, তার অন্যতম অনুষঙ্গ জোনাকী। এমনিতে অবশ্য রাতের বেলা সাপ আর অজানা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতাম। তারপরও জোনাকীর আকর্ষণ এড়াতে পারতাম না। জোনাকীগুলো যখন পথ ভুলে শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত, কী যে শিহরণ জাগাতো। মনে হতো, ভালোবাসার কেউ আমার সঙ্গে যেন লুকোচুরি খেলছে। রাত যত বেশি গভীর হয়, জোনাকীরা তত বেশি আলো ছড়ায়। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় এখন আর জোনাকীর দেখা পাই না। বুকে বিরহ নিয়ে জোনাকীর অপেক্ষায় থাকি। অবশ্য এই ঢাকা শহরেও জোনাকীর দেখা পেয়েছি। বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে গেলে পাওয়া যায় নিটোল গ্রামীণ আমেজ। সন্ধ্যার পর রিক্সা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একটু ভিতরে ঢুকলেই অন্ধকার, কবি বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘যে আঁধার আলোর অধিক’। সেখানে পথের পাশে জোনাকীদের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে দেখা যায়। অবশ্য খুব যে মনের সুখে খেলতে পারে, সেটা বলা যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে আসা গাড়ির আলোয় বিড়ম্বনা সইতে হয়। একদমই যাঁরা জোনাকীর সন্ধান পান না, তাঁদের জন্য এটাইবা কম কি। জোনাকীর সন্ধানে প্রিয় কারও সান্নিধ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সেটার নামকরণ করা হতে পারে জোনাক জোনাক ভালোবাসা। অবশ্য এখন আর জোনাকী দেখা যায় কিনা সেটা বলতে পারবো না। ওদিকটা মাড়ানো হয় না তাওতো অনেক বছর হয়ে গেল। কিন্তু বুকের মধ্যে জোনাকীর জন্য ভালোবাসাটা আজও রয়ে গেছে। ভালোবাসা তো আর নদীর মতো নয় যে শুকিয়ে যাবে। তাই প্রায়শই জেগে ওঠে। সেইসঙ্গে জেগে ওঠে স্মৃতির জোনাকীরাও।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন