পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বৃহস্পতিবার, ২৪ মার্চ, ২০১৬

দাঁতে দাঁতে ঘাস কেটেছি

অনেক তুচ্ছ বিষয়ও অনেকেরই মন হরণ করে নেয়। ঘাসকে কি তুচ্ছ বলা যায়? সেটা এক একজনের কাছে এক একরকম বিবেচনা। কবি আবিদ আজাদ তো ‘ঘাসের ঘটনা’ লিখে কাব্যাঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। জীবনানন্দ দাশ তো ঘাসের তীব্র অনুরাগী ছিলেন। তাঁর মতো করে ঘাসকে কেউ অনুভব করেছেন বলে মনে হয় না। তিনি তো মনে করতেন, ‘পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে’। ‘ঘাস’ কবিতায় লিখেছেন, কচি লেবুপাতার মতো নরম সবুজ আলোয় পৃথিবী ভরে গিয়েছে এই ভোরের বেলা; কাঁচা বাতাবীর মতো সবুজ ঘাস—তেমনি সুঘ্রাণ— হরিণেরা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিচ্ছে! আমারো ইচ্ছে করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো গেলাসে-গেলাসে পান করি, এই ঘাসের শরীর ছানি—চোখে ঘষি, ঘাসের পাখনায় আমার পালক, ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে। ঘাসের নিশ্চয়ই ঔষধি উপকারিতা আছে। সেটা ভালো বলতে পারবেন কবিরাজরা। তবে ভোরবেলা খালি পায়ে ঘাসের ওপরে হাঁটার উপকারিতার কথা শৈশবেই জেনেছি। চোখের দৃষ্টিশক্তিও নাকি তাতে ভালো থাকে। আর ঘাসকে ওষুধ হিসেবেও কত ব্যবহার করেছি। ছোটবেলা দুষ্টুমি করতে গিয়ে কিংবা অন্য কোনও কারণে শরীরের কোথাও কাটেনি, এমন সৌভাগ্যবান খুব কমই আছেন। সেক্ষেত্রে কেটে যাওয়া স্থানে ঘাস চিবিয়ে তার প্রলেপ দিয়ে রক্তপাত বন্ধ করার চেষ্টা করেছি রক্তক্ষরণের। অনেকে অবশ্য থামিয়েছেন ভালোবাসার রক্তক্ষরণও। প্রকৃতপক্ষে ঘাসের উপকারিতা কতটা, সেটা আমার জানা নেই। তবে মনের সঙ্গে ঘাসের একটা সংযোগ অনুভূত হয়। ঘাসের ওপর দিয়ে হাঁটলে মনটা বেশ সতেজ হয়ে যায়। আর প্রিয় কারও হাতে হাত ধরে হাঁটলে তখন ঘাসের পথকে মনে হয় স্বর্গীয় উদ্যান। অবশ্য ঘাস ছাড়া কি কোনও উদ্যান কল্পনা করা যায়? ইদানিং অবশ্য ঘাসের কদর বেড়েছে। কোথাও কোথাও বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষ হয় ঘাসের। খেলার মাঠে ঘাসের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। উইম্বলডন টেনিসের ঘাসের কোর্টের খ্যাতি তো দুনিয়াজোড়া। গলফ কোর্স তো ঘাস ছাড়া চিন্তাই করা যায়। এক একটা গলফ কোর্স যেন ঘাসের উপত্যকা। ঘাসের বুকে আলতোভাবে গড়িয়ে যায় গলফ বল। ক্রিকেট খেলায় উইকেটে ঘাসের উপস্থিতিতে ভিন্ন কৌশল সাজাতে হয় অধিনায়ককে। ফুটবল মাঠেও সবুজ ঘাসের কার্পেট জুড়িয়ে দেয় চোখ। শীতকালে ঘাসের সৌন্দর্য অনেকখানি বেড়ে যায়।

ঘাসের ডগায় জমে থাকে শিশিরবিন্দু। তাতে ভোরের সূর্যের আলোর প্রতিফলনে ঝলমল করে হীরকদ্যুতি। ঘাসের প্রতি আমার এক ধরনের দুর্বলতা আছে। ঘাসের সৌন্দর্য যেমন আমাকে মুগ্ধ করে, তেমনি একটা সময়ে ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি’। কেবল পা-ই ফেলিনি, দাঁতে দাঁতে কত যে ঘাস কেটেছি, তার যোগফল নিশ্চয়ই কম হবে না। ঘাস যেন অনাদৃত এক ভালোবাসা। ঘাসের তো খুব একটা পরিচর্যার প্রয়োজন পড়ে না। একরাশ অবহেলা নিয়ে যেখানে সেখানে বেড়ে ওঠে লকলকিয়ে। বিস্তীর্ণ ঘাসের সবুজ বাগিচার সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। আর অনেকেরই ভালোবাসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঘাস। ঘাস খেয়ে গরু-ছাগল-হরিণেরা জীবন ধারণ করলেও অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায়ও ঘাস যুগিয়েছে পুষ্ঠি। অনেক রোমান্টিক মুহূর্তে কারও কারও কাছে ঘাস ছিল পরম আশ্রয়। ‘সব চোখ ফাঁকি দিয়ে বুকে ভালোবাসা নিয়ে’ কপোত-কপোতিরা যখন নিরিবিলি ঘাসের বিছানায় মিলিত হতেন, তখন তাদের প্রশ্রয় দিত নরম সবুজ ঘাস। প্রেমিকের চোখে সরাসরি তাকাতে বিব্রত লাজুক প্রেমিকা আড়াল হিসেবে খুঁজে নিত ঘাস। ঘাসের দিকে হরিণের মতো মায়াবী চোখে তাকিয়ে, কখনো ঘাস নিয়ে অকারণেই টানাটানি করে, কখনো আনমনে মুখে নিয়ে ইঁদুরের মতো টুকটুক করে ঘাস কেটে অনেক না বলা কথার উত্তর দিয়ে দিতেন। কোনও কোনও প্রেমিকেরও অবলম্বন ছিল ঘাস। আমার তো বদভ্যাসের শেষ নেই। বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে আড্ডা মারতে মারতে ঘাস চিবিয়ে খাওয়াটা ছিল তার একটি অংশ। ঘাসের গোড়ার সাদা অংশটুকুর মধ্যে খুঁজে কি পেতাম আবেগের নির্যাস? ঘাস ছিঁড়ে ছিঁড়ে দাঁতে কাটতে কাটতে বন্ধুত্বের কত কত নিবিড় মুহূর্ত পেরিয়ে এসেছি। শরীরে, মনে লেগে আছে ঘাসের পরশ। অবশ্য সেই দিন তো এখন আর নেই। বদলে গেছে ভালোবাসাবাসির ধরন। বন্ধুত্বের ধরনও পাল্টে গেছে। ঘাসের কার্পেটে আড্ডা মারতে এখন খুব একটা দেখা যায় না। এখন তো সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে ওঠে সম্পর্কের রেসিপি। সেখানে ঘাস কোথায়? এমনিতেই দুর্লভ হয়ে যাচ্ছে ঘাস। অন্তত শহর এলাকায় ঘাসের পরিসর তো দিনে দিনে কমছে। কংক্রিটের এই জঙ্গলে ঘাসের ছোঁয়া না থাকায় মনটাও ক্রমশ কংক্রিট হয়ে যাচ্ছে। হায়! কত কত দিন ঘাসের আস্বাদ পাওয়া হয় না। খালি পায়ে ঘাসের স্পর্শ নেওয়া হয় না। দেখাও তো হয় না! বুকের মধ্যে গুনগুনিয়ে ওঠে, ‘একদিন ছুটি হবে, অনেক দূরে যাবো, নীল আকাশে সবুজ ঘাসে খুশিতে হারাবো’। কবে আসবে সেই দিন?

রবিবার, ২০ মার্চ, ২০১৬

ক্রিকেট কি খুঁজে পেয়েছে তার ঠিকানা?

দীর্ঘ কাল আগে যাত্রা শুরু করেও ক্রিকেট কিন্তু যুগের পর যুগ চলছিল গন্তব্যহীন পথে। যখনকার কথা বলছি, তখন ক্রিকেটটা কেবল খেলা ছিল না। বন্দি হয়েছিল আভিজাত্য আর বনেদিয়ানার নিঃসঙ্গ ঘেরাটোপে। এমন পরিবেশে ক্রিকেট বিকশিত হওয়ার কথা নয়। হয়ওনি। সময়কে খোলামকুচির মতো উড়িয়ে দেওয়া আর রঙিন পানীয় চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে মন চাইলে উপভোগ করাটাই ছিল ক্রিকেট। নিবেদিত ছিল বিত্তের কাছে। আটকে ছিল বিত্তবানদের হাতে। বিত্তহীনদের কাছে ক্রিকেট ছিল মধুর ছলনা। এলিট শ্রেণীর ফাইফরমাশ খাটতে খাটতে ‘নিম্ন শ্রেণী’র কেউ কেউ পরিস্থিতির কারণে কখনো-সখনো স্বাদ পেয়েছেন কথিত এই খেলাটির। ঔপনিবেশিক শক্তির কাছে জিম্মাদার থাকার সময় এটিকে খেলা হিসেবে ভাবা যায় নি। ভাবার কথাও নয়। দিনের পর দিন পেরিয়ে যায়। তবুও অমীমাংসিত থেকে যায় খেলার ফল। যাঁদের প্রকৃতঅর্থে কোনও কাজ ছিল না, সৃষ্টির ফুল ফোটানোর কোনও তাগিদ ছিল না, জীবনে কোনও চাহিদা ছিল না, নিজেদের ভোগের জগত নিয়ে যাঁরা ছিলেন অতিমাত্রায় বিভোর, এমন কিছু বিচ্ছিন্ন মানুষদের হাত ধরে ক্রিকেটের অভিযাত্রা শুরু হয়। খেলার পরতে পরতে ছিল নিজেদের জাহির করার দম্ভ। যদিও সাদা পোশাককে বানানো হয় কেতাদুরস্ততার প্রতীক। অথচ শুভ্রতার আড়ালে জড়িয়ে ছিল রাশি রাশি পাঁক। পুরোটাই ছিল শ্বেতাঙ্গদের মনিবসুলভ অহমিকার প্রকাশ। মনোভাবটা ছিল এমন, যাঁরা ক্রিকেট খেলে, তাঁরা সমাজের উপরতলার মানুষ। অন্যরা অস্পৃশ্য। এভাবে পেরিয়ে যেতে থাকে যুগের পর যুগ। ক্রিকেটে সময়টা যেন থমকে থাকে। ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া প্রথম টেস্ট ম্যাচ আয়োজন করে খেলাটাকে জাতে ওঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একযুগ পর তাদের সঙ্গে যোগ দেয় দক্ষিণ আফ্রিকা। তিন দেশেই ছিল শ্বেতাঙ্গদের প্রভুত্ব। তাদের কাছে ‘জাতপাত’টা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ক্রিকেটেও দেখা যায় চরম বর্ণবাদী মানসিকতা। তবে কাজের প্রয়োজনে শ্বেতাঙ্গদের সঙ্গে মিশতে মিশতে কখন যেন ক্রিকেটটা রপ্ত হয়ে যায় কালো মানুষদের। অবস্থার অনেকটা পরিবর্তন ঘটে, কালো মানুষরা যখন ক্রিকেটের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে জড়িয়ে পড়ে, তখনই কেবল এটি সত্যিকার অর্থে খেলা হয়ে ওঠতে থাকে। ১৯২৮ সালের ২৩ জুন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে গঠিত ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল টেস্ট ঘরানার সদস্য হওয়ার পর ক্রিকেটে সংযুক্তি ঘটে রঙ-রূপ-রসের। সমুদ্রের ফেনিল ঢেউ, নারকেল গাছের দোলা, ক্যালিপসো সুর, কালো মানুষদের উদ্দাম নৃত্য ক্রিকেটের সঙ্গে যোগ হওয়ায় ক্রিকেট সাধারণ মানুষের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিতে থাকে। ক্রিকেটের সঙ্গে তাঁরা মিলিয়ে দেয় জীবনকে। ক্যারিবীয় ক্রিকেট অনেকের কাছে আসে রোমাঞ্চকর হয়ে। তবে দিনের পর দিন মাঠে উপস্থিত হয়ে ক্রিকেট বিনোদনে নিয়োজিত করার মতো সময় কোথায়? এ কারণে অন্তহীন সময়ের ক্রিকেটকে আনা হয় নির্দিষ্ট পরিসরে। ১৯৩২ সালে ২৫ জুন ভারতীয় উপমহাদেশ জড়িত হওয়ার পর সীমিত পরিসরের ক্রিকেটের ব্যাপ্তি যায় বেড়ে। অন্তত জনসংখ্যার অনুপাতে ভালো একটি অবস্থান গড়ে নেয়। তারপরও কিন্তু ক্রিকেট পালে তেমনভাবে হাওয়া লাগতে দেখা যায়নি। মূলত বিলাতি ঘরানার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে ক্রিকেট। ক্রিকেটে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে ১৯৭১ সালের ৫ জানুয়ারি, যেদিন অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ডের মধ্যে মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সীমিত ওভারের একদিনে আন্তর্জাতিক ম্যাচ। টেস্ট ক্রিকেটের ধ্রুপদি ঘরানা থেকে জন্ম নেয় ওয়ান ডে ক্রিকেটের জনপ্রিয় ধারা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপ ক্রিকেট নিয়ে আসে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ চ্যাম্পিয়ন হলে প্রতিষ্ঠিত হয় কালো মানুষদের শ্রেষ্ঠত্ব। ক্রিকেটের মাধ্যমে দেখতে পাওয়া যায় ক্যারিবীয়দের জীবনবোধ। এর আবেদন কোনও অংশে কম ছিল না। তবে ক্রিকেটকে পেশাদার ও রঙদার করে তোলার কৃতিত্ব অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন নেটওয়ার্ক চ্যানেল নাইনের অধিপতি ও ধনকুবের ক্যারি প্যাকারের। ‘ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট’ আয়োজন করে তিনি ধাক্কা দেন প্রচলিত ক্রিকেট কাঠামোকে। প্রকৃতঅর্থে তিনি ক্রিকেটে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। যথার্থ কারণেই তাঁকে বলা হয় ক্রিকেট বিপণনের সেলসম্যান। ক্রিকেট বিনোদনের এই কুশীলবের কারণে ক্রিকেটারদের হাতে আসে অঢেল অর্থ। রঙিন পোশাক, ফ্ল্যাড লাইটে খেলা আর বর্ণিল সব আয়োজনে বদলে যায় ক্রিকেটের খোলনলচে।


১৯৮৩ সালে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ভারত চ্যাম্পিয়ন হলে ক্রিকেটের নতুন শ্লোগান হয় ‘ইট ক্রিকেট, স্লিপ ক্রিকেট’। জনসংখ্যা যে কোনও খেলার জনপ্রিয়তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা ফ্যাক্টর, সেটা দারুণভাবে অনুভূত হয়। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তার ঢেউয়ে প্লাবিত হয় পুরো উপমহাদেশ। দেড় শতাধিক কোটির জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ অঞ্চলে ক্রিকেট হয়ে ওঠে ধর্মের মতো। ভারতের বিশাল কর্পোরেট জগত ক্রিকেট বিপণনে এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মনে হতে থাকে, ক্রিকেটই বুঝি সবার ধর্ম, কর্ম, সাধনা। ক্রিকেটের সাতপাকে বাঁধা পড়ে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব বয়েসী মানুষ। অন্তত এই ক্ষেত্রে কোনও বিভাজন বা বিভক্তি নেই। পালাবদলের পালায় এক যুগে আগে ক্রিকেটে আসে রীতিমতো বিস্ফোরক পরিবর্তন। প্রবর্তন করা হয় টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট। টেস্ট কিংবা ওয়ান ডে ক্রিকেট যেটি হোক না কেন, খেলায় খেলায় কেটে যায় একটি দিন। বিনোদনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া প্রযুক্তির এই যুগে একদমই খাপ খায় না। জীবন তো কেবল খেলার মাঠে কাটিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। হয়তো নেশা ও পেশার কারণে কেউ কেউ কাটিয়ে দেন খেলার মাঠে। এটাকে স্বাভাবিক মনে করার কারণ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিনোদনের আশায় যাঁরা ছুটে যান খেলার মাঠে, তাঁরা কিছু সময় হয়তো ব্যয় করতে পারেন। কথাটা বলা হচ্ছে, পুরো বিশ্বের প্রেক্ষাপটে। সেক্ষেত্রে টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টার মধ্যে শেষ হয়ে যায়। সামগ্রিক অবস্থায় এর বেশ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সে হিসেবে এটাকে এখন খেলা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। গুটিকয়েক দেশের মধ্যে আটকে থাকা ক্রিকেট খেলার টি-টুয়েন্টি সংস্করণের এখন বিশ্বায়ন হতে পারে। এরফলে কিছুটা হলেও ক্রিকেট যেন খুঁজে পেতে পারে তার উদ্দিষ্ট ঠিকানা। কিন্তু ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)-এর সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ক্রিকেটের বিশ্বায়ন হতে পারছে না। ফিফা যেখানে পুরো বিশ্বটাকে তাদের ছাতার তলে নিতে পেরেছে, সেখানে আইসিসি একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে আছে। এত দিন না হয় ফুটবলের গতিময়তার সঙ্গে টেস্ট ও ওয়ান ডে ক্রিকেট পেরে ওঠেনি। এখন তো টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে এসেছে দুরন্ত গতি। বলে বলে বাউন্ডারি মারার তাগিদ। তাহলে ক্রিকেটকে ছড়িয়ে দেওয়াটা খুব একটা কঠিন নয়। একজন জগমোহন ডালমিয়া তো বিশ্বায়নের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর পথ অনুসরণ করলে ক্রিকেটের আঙ্গিনা বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু আইসিসি’র এলিটীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ক্রিকেট বৃত্তের বাইরে যেতে পারছে না। এর অন্যতম উদাহরণ বাংলাদেশ। ক্রিকেটীয় শক্তিমত্তার পাশাপাশি ক্রিকেটের প্রতি আন্তরিকতা, নিবেদন, ভালোবাসার দিক দিয়ে এই দেশটি ক্রিকেট বিশ্বের জন্য গর্ব হতে পারে। হতে পারে দৃষ্টান্তও। এ দেশের ক্রিকেটীয় চর্চার যে বাড়বাড়ন্ত ও খেলার দেখার জন্য ক্রিকেট অনুরাগীরা যেভাবে মাঠে ছুটে যান, তার কোনও তুলনা হয় না। কিন্তু এ বিষয়টি আইসিসির কাছে মোটেও গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। যে কারণে বিশ্বকাপে খেলতে হলে বাংলাদেশকে এখনও কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। বাছাই পর্ব পেরিয়ে চূড়ান্ত পর্বে খেলার ছাড়পত্র নিতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় দেশকেও।

এমন এক প্রেক্ষাপটে ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ষষ্ঠ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেট। এবারও ১৬টি দেশ অংশ নিচ্ছে। র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ ৮টি দেশ স্বাগতিক ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সরাসরি দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলবে। বাকি ৮ দেশ বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ও ওমান ‘এ’ গ্রুপে এবং স্কটল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তান ও হংকং ‘বি’ গ্রুপের হয়ে প্রথম রাউন্ডে খেলবে। দুই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল সুপার টেন পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে। এ পর্যায়ে বাছাই পর্ব খেলতে বাধ্য করাটা বাংলাদেশের ক্রিকেট চর্চা ও ক্রিকেটীয় শক্তিকে খাটো করে দেখার শামিল নয় কি? বাংলাদেশের মতো দেশ যদি ক্রিকেট বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলতে না পারে, তাহলে ক্রিকেটের বিশ্বায়ন হবে কীভাবে? ক্রিকেট কীভাবে পাবে তার প্রকৃত ঠিকানা?
২ মার্চ ২০১৬ 

বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬

ঘুঙুরের কান্না

কী এক কারণে অনেক আগে থেকেই ভারতের লখনৌ শহরের প্রতি একটা অদৃশ্য টান অনুভব করি। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এ শহরে কখনও যাওয়া হয় নি। কখনও যাওয়া হবে কিনা তাও জানি না। কিন্তু শহরটিকে নিয়ে দীর্ঘ দিন যাবৎ বুকের মধ্যে ঘুমিয়ে আছে একটি শিরোনাম। যদি কোনও দিন সেখানে যাওয়া হয় এবং লেখার সুযোগ হয়, সে লেখার শিরোনাম হবে ‘ঘুঙুরের কান্না’। কেন এমন একটি শিরোনাম হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে, আমি এর ব্যাখ্যা দিতে পারবো না। মানুষের জীবনে ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছুই ঘটে। এটাও কি তেমন কিছু? তবে এ শহরটি নিয়ে যখন কল্পনায় ছবি আঁকি, তখন দেখতে পাই, সুর আর সুরায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত রসিকজনেরা। আর তাঁদের তো মজিয়ে দিয়েছেন এ শহরের মশহুর আশেক মির্জা গালিব, ‘সুর আছে, ভেসে যাও সুরের স্রোতে; সুরা আছে, ভুলে যাও সব-কিছু। রূপসীর প্রেমে পাগল হয়ে যাও, সাধুতা থাক অন্যদের জন্য।’ স্বাভাবিক নিয়মে সন্ধ্যা নেমে এলেই গুলজার হয়ে ওঠতে থাকে বিভিন্ন মজলিশ। সরগরম হয়ে ওঠে গজলের মেহফিল, গানের জলসা আর বাঈজীদের জলসাঘর। কান পাতলেই শোনা যায় মীর তকি মীর, মির্জা গালিবের গজল। হাওয়ায় ভাসতে থাকে শের-শায়েরী। আর ঘুঙুরের ঝংকারের ভেঙে যায় রাতের নীরবতা। ‘ভুলভুলাইয়া’-র গোলকধাঁধায় লুকোচুরি খেলতে খেলতে ভেসে আসে আশিক-আশিকীদের খিলখিল হাসি। চারপাশে আতরের সুঘ্রাণ। গোলাপের বাগিচা। হরেক পদের কাবাব ও বিরিয়ানির মৌ মৌ খুশবু।

নবাব ওয়াজিদ আলী শাহ’র তারিফদারিতে মশগুল লখনৌর সংগীত, নৃত্য, নাটক, কবিতার আসর। শতরঞ্জ নিয়ে গভীরভাবে মগ্ন খিলাড়িরা। জীবনকে সুরভিত করার কত রকম উপাদানই না রয়েছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। কেন যেন মনে হয়, নবাব ওয়াজিদ আলী শাহকে ইংরেজরা বিতাড়িত করার পর শহরটিতে নেমে আসে থোকা থোকা বিষণ্নতা। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির এমন একটি প্রাণবন্ত ও প্রাণোচ্ছ্বল শহর হয়ে পড়ে অনেকটা নিস্প্রাণ ও নির্জীব। সব রওশন হারিয়ে শহরটা কেমন যেন বিষণ্নতায় ভুগছে। কবিতায়, সংগীতে, নৃত্যে ছুঁয়ে যায় অন্তহীন বিষাদ। বাঈজীদের ঘুঙুরে বাজতে থাকে উচ্চকিত কান্না। এমনিতে বাঈজীদের জীবন ট্র্যাজেডির শেষ নেই। নবাবহীন লখনৌ শহরটায় তাঁদের সেই কদর কোথায়? আশাভঙ্গের খেদ নিয়ে ঝিমিয়ে পড়ে ঘুঙুর। শহরটা যেন ধুঁকছে ক্ষয়িষ্ণু অবয়ব নিয়ে। আমার বুকের মধ্যে লখনৌ শহর এভাবেই জেগে আছে। এ শহরের ইদানিংকার হালহকিকত ঠিকমতো কল্পনায় আসে না। এ কি অতীতের প্রতি এক ধরনের হ্যাঙওভার? সেটাইবা হবে কেন? আমি তো এ শহরের কেউ না। তবে খুব জানতে ইচ্ছে করে, এখন কি আগের মতো লখনৌ শহর চঞ্চল হয় কথক নৃত্যের ঘুঙুরে? ঠুমরির কি কদর আছে? বেগম আখতার কিংবা তাঁর পরের প্রজন্মের কারও কণ্ঠে কি শুনতে পাওয়া যায় তকি, গালিব বা ওয়াজিদ আলীর গজল? গজল, ঠুমরি, শায়েরী ছাড়া তো এ শহরটাকে একদমই মানবে না। এ শহর তো আলোকিত হওয়ার কথা হিন্দি চলচ্চিত্রের সুরের রাজা নৌশাদ আলী, জাভেদ আখতার, অনুপ জালোটা, কবি কাইফি আজমির মতো ব্যক্তিত্বদের রোশনগিরিতে। নতুন প্রজন্মের কী বোর্ডে ওঠে আসার কথা বিরহ ও বেদনার কবিতা। থাকার কথা আভিজাত্য, খানদানি ও বনেদিয়ানার ঐতিহ্য। আমি তো এ শহরের অতীত ও বর্তমান কিছুই জানি না। তারপরও কেন যেন অতীতের লখনৌ আমাকে আবিষ্ট করে রাখে। সেই মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। আমার স্বভাবের মধ্যে কি লুকিয়ে আছে ওয়াজেদ আলী শাহ’র লখনৌ শহরের কোনও নস্টালজিয়া?

শনিবার, ১২ মার্চ, ২০১৬

জোনাক জ্বলে জোনাক নেভে

আমার কাছে পরম এক বিস্ময় জোনাকী। আদর করে জোনাক পোকা নামেও ডাকা হয়। রাতের আঁধারে নীলাভ-সবুজের অস্থির ছোটাছুটি কী যে মোহনীয় লাগে, বোঝানো যাবে না। আলোর বিপরীতে অবস্থান হলেও জোনাকীর কারণেই অন্ধকারকে অনেক রোমান্টিক লাগে। আর এর পটভূমি তো গ্রামীণ জনপদ। যেখানে সন্ধ্যা নেমে এলে শুরু হয় জোনাকীদের অভিসার। কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী সেই কবে বুকের মধ্যে এঁকে দিয়েছেন এমন দৃশ্যপট, ‘পুকুর ধারে লেবুর তলে থোকায় থোকায় জোনাক জ্বলে’। জ্বলে আর নেভে। নেভে আর জ্বলে। চলতে থাকে ক্রমাগত ছটফটানি। যত বেশি ছটফটায়, ততই উজ্জ্বলতা ছড়ায়। একসঙ্গে যখন অসংখ্য জোনাকী উড়তে থাকে, তখন মনে হয় আতসবাজির রোশনাই। আমার শৈশব-কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জোনাকী। তখন স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার পর প্রতি বছরই বেড়াতে যেতাম গ্রামের বাড়িতে। গ্রাম আমাকে যে কারণে চুম্বকের মতো টানে, তার অন্যতম অনুষঙ্গ জোনাকী। এমনিতে অবশ্য রাতের বেলা সাপ আর অজানা ভয়ে সন্ত্রস্ত থাকতাম। তারপরও জোনাকীর আকর্ষণ এড়াতে পারতাম না। জোনাকীগুলো যখন পথ ভুলে শরীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে যেত, কী যে শিহরণ জাগাতো। মনে হতো, ভালোবাসার কেউ আমার সঙ্গে যেন লুকোচুরি খেলছে। রাত যত বেশি গভীর হয়, জোনাকীরা তত বেশি আলো ছড়ায়। কিন্তু গ্রামের সঙ্গে বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় এখন আর জোনাকীর দেখা পাই না। বুকে বিরহ নিয়ে জোনাকীর অপেক্ষায় থাকি। অবশ্য এই ঢাকা শহরেও জোনাকীর দেখা পেয়েছি। বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে গেলে পাওয়া যায় নিটোল গ্রামীণ আমেজ। সন্ধ্যার পর রিক্সা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে একটু ভিতরে ঢুকলেই অন্ধকার, কবি বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, ‘যে আঁধার আলোর অধিক’। সেখানে পথের পাশে জোনাকীদের ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে দেখা যায়। অবশ্য খুব যে মনের সুখে খেলতে পারে, সেটা বলা যাবে না। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে আসা গাড়ির আলোয় বিড়ম্বনা সইতে হয়। একদমই যাঁরা জোনাকীর সন্ধান পান না, তাঁদের জন্য এটাইবা কম কি। জোনাকীর সন্ধানে প্রিয় কারও সান্নিধ্য যদি পাওয়া যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। সেটার নামকরণ করা হতে পারে জোনাক জোনাক ভালোবাসা। অবশ্য এখন আর জোনাকী দেখা যায় কিনা সেটা বলতে পারবো না। ওদিকটা মাড়ানো হয় না তাওতো অনেক বছর হয়ে গেল। কিন্তু বুকের মধ্যে জোনাকীর জন্য ভালোবাসাটা আজও রয়ে গেছে। ভালোবাসা তো আর নদীর মতো নয় যে শুকিয়ে যাবে। তাই প্রায়শই জেগে ওঠে। সেইসঙ্গে জেগে ওঠে স্মৃতির জোনাকীরাও।

বুধবার, ২ মার্চ, ২০১৬

তবে কি আমি কবি হয়ে গেলাম?

কখনো-সখনো মনের খেয়ালে কবিতা লেখার ঝোঁক চাপে। লিখতে লিখতে হাল ছেড়ে দেই। চাইলেই কি আর কবিতা লেখা যায়? যায় না। অসমাপ্ত বা অর্ধ-সমাপ্ত সেই কবিতা আড়ালেই পড়ে থাকে। হওয়ায় হাওয়ায় উড়েও যায়। বোঝাই যাচ্ছে, আমার কবি হওয়া হবে না। আর বুকের মধ্যে যদি জীবনানন্দ দাশ বাস করেন, তাহলে কি আর কবিতা লেখার উপায় আছে? কবেই তো তিনি রায় দিয়ে গেছেন ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি’। প্রিয় কবির এমন ‘ধমক’-এর পর কবিতা লেখার দুঃসাহস হয় কী করে? তারপরও কেন যেন কবিতার মোহ ছেড়ে যেতে চায় না। কবিতার মায়াবী টানে ছুটতে ইচ্ছে করে। কবিতার কোমল আবষ্টনীতে আশ্লিষ্ট হতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে কবিতায় নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিতে। এটা তখনই খুব বেশি করে, যখন ঝুম ঝুম বৃষ্টি নামে, যখন জোছনায় প্লাবিত হয় চারপাশ, যখন পাশ দিয়ে হেঁটে যায় নাটরের বনলতা সেন, সে মুহূর্তে বুকের মধ্যে বড় স্বাদ জাগে কবিতায় ‘আত্মহত্যা’ করতে। রাস্তায় চলতে চলতে হাতের মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের কী বোর্ডে কাঁপা কাঁপা হাতে কিছু কিছু লাইন লেখা হয়ে যায়। অধিকাংশ সময়ই অসমাপ্ত থেকে যায় কবিতা। এভাবেই কেটে যাচ্ছিল জীবন। এরমধ্যে সদ্য সদ্য ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি ঘটনা ব্যক্ত করার লোভ সামলাতে পারছি না। তাতে যদি কবি হিসেবে কিঞ্চিৎ ‘খ্যাতি-প্রতিপত্তি’ জোটে, মন্দ কি? তাছাড়া বিষয়টি যেহেতু কবিতা, যেটি মোটেও আমার বিষয় নয়, সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে উচ্চারিত হয়েছে এই অভাজনের নাম, স্বভাববিরুদ্ধ হলেও এই সুযোগে নিজের একটু ঢাক-ঢোল পিটালে কেউ নিশ্চয়ই মাইন্ড করবেন না। তাই না?

তালাত মাহমুদের গাওয়া কালজয়ী গান ‘তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে’-এর গীতিকার ও কবি কে জি মোস্তফা’র সম্পাদনায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যদের জন্য গত ১৩ বছর যাবৎ প্রকাশিত হয়ে আসছে মাসিক ‘কবিতাপত্র’। অনেক দিন ধরে তাতে লেখার বাসনা জাগলেও স্বভাবজাত লাজুকতার কারণে লেখা হয়ে ওঠেনি। আমার একজন শুভাকাঙ্খী কবি সুধীর কৈবর্ত দাসের অনবরত তাগিদায় মনের জড়তা কাটিয়ে ওঠে কী মনে করে গত বছর থেকে এই কবিতা পত্রিকার লেখক তালিকায় নাম লিখিয়েছি। তাতে টুকটাক লিখি। কবি হওয়ার তাড়না নিয়ে লিখি না। লিখি একান্তই মনের আনন্দে। প্রতি মাসের শেষ তারিখে যেদিন পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়, সেদিনই এ পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে কবিতা পাঠ ও কবিতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। ইচ্ছে থাকলেও সময় মেলাতে না পারায় আমি কখনও এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারি নি। গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঘটনাক্রমে উপস্থিত ছিলাম জাতীয় প্রেস ক্লাবে। টিভি রুমে আড্ডারত। উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের সিনিয়র বার্তা সম্পাদক প্রণব সাহা সহ ক্লাবের নবীন-প্রবীণ সদস্যরা। ক্লাবের উপরের মিলনায়তনে যে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠান চলছে, সেটা জানতাম না। জানলে একবার নিশ্চয়ই ঢু মারতে পারতাম। কবিতা পাঠের আসরের নিয়মিত সদস্য বিখ্যাত সুধীর কৈবর্ত দাস, ফরিদা ইয়াসমীন সেদিনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নিচে নেমে আমাকে দেখে উপস্থিত সবার সামনে উচ্চকণ্ঠে জানতে চাইলেন, আমার কবিতা পাঠ করার জন্য অনুষ্ঠানে আমি কোনও বান্ধবীকে পাঠিয়েছি কিনা? আমি হতচকিত হয়ে যাই। আমার কবিতা পাঠ! আমার বান্ধবী! কিছুই বুঝে ওঠতে পারছিলাম না। ক্লাবের উপস্থিত সদস্যরা মজার উপাদান পেয়ে কান সজাগ করে আমার দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। এমন অবস্থায় আমি প্রকৃতঅর্থেই বেশ বিব্রত হয়ে পড়ি। নিজে যেখানে আজ অব্দি এ অনুষ্ঠানে যাইনি কবিতা পাঠ করতে, সেখানে আমি আমার কবিতা পাঠের জন্য বান্ধবীকে পাঠাবো! আমাকে যাঁরা কম-বেশি জানেন, তাঁরা বোধকরি জানেন, এতটা দুঃসাহসী মনোভাব অন্তত আমার নেই। আর আমার বান্ধবী? সে এলো কোথা থেকে? বিস্ময়, বিস্ময় আর বিস্ময়। সঙ্গত কারণে এটাও অবিশ্বাস্য যে আমার বান্ধবী জাতীয় প্রেস ক্লাবের মতো চত্বরে যেয়ে আমার লেখা কবিতা পাঠ করবেন। তবে অনুষ্ঠানে উপস্থিতিদের জবানির টুকরো টুকরো সংলাপে যেটুকু জানতে পারলাম, সেদিন প্রকাশিত ‘কবিতাপত্র’-এ আমার যে কবিতা প্রকাশিত হয়েছে, সবাইকে অবাক করে দিয়ে সেই কবিতা আবৃত্তি করেন একটি মেয়ে। মেয়েটি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য নন। তাঁকে সবাই চেনেন না। তবে এ অনুষ্ঠানে ইতোপূর্বেও নাকি তাঁকে দেখা গেছে। কবিতার প্রতি তাঁর আসক্তি আছে, সেটা বুঝতে পারা যায়। কিন্তু তিনি কী মনে করে এই অকবির কবিতা পাঠ করেছেন, সেটা সত্যিকার অর্থেই আমার জীবনের পরম এক বিস্ময়। সেখানে আমার পরিচিত যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরাও এটা বুঝতে পারেননি, মেয়েটি কেন আমার কবিতা পাঠ করলো? অবশ্য না পারারই কথা। তবে কেউ কেউ অনুমান করেছিলেন, নিশ্চয়ই মেয়েটি আমার অতি ঘনিষ্ঠ কেউ হবেন। এমন পরিস্থিতিতে এমনটি ভাবা মোটেও অসমীচীন নয়। একজন অপ্রতিষ্ঠিত ও অপরিচিত লেখকের কবিতা একটি মেয়ের আচানকভাবে পাঠ করাটা অবশ্যই রহস্যজনক মনে হতেই পারে। সে রহস্যের কূল-কিনারা করা যায়নি। মেয়েটি কবিতা পাঠ করায় আমি যে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছি, এমনটি ভাবার কারণ নেই। তবে এটা ঠিক, ভালো তো অবশ্যই লেগেছে। আমার কবিতা অপরিচিতা কেউ একজন পাঠ করেছেন, এতে পুলকিত না হওয়ার কোনও কারণ নেই। তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে বেশ কবি কবি মনে হতে থাকে। তাছাড়া এত এত কবি থাকতে মেয়েটি কেন আমার কবিতা পাঠ করলেন, সেটাও খুব জানতে ইচ্ছে করছে। এক পলক দেখার ইচ্ছে যে করছে না, সেটা অস্বীকার করা হবে সত্যের অপলাপ। হায়! তাঁকে তো আমি চিনি না। দেখা হবে কীভাবে?