পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

‘তোমায় আমি জোছনা দেব’

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো। ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো।। পাগল হাওয়া বুঝতে নারে ডাক পড়েছে কোথায় তারে-- ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো।। নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা, বাণীবনের হংসমিথুন মেলেছে আজ পাখা। পারিজাতের কেশর নিয়ে ধরায়, শশী, ছড়াও কী এ। ইন্দ্রপুরীর কোন্ রমণী বাসরপ্রদীপ জ্বালো।। হায়! এ শহরে এখন চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর উছলে পড়া আলো দেখার সুযোগ দিনে দিনে সীমিত হয়ে পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে ইট-বালু-সিমেন্ট-লোহার আস্তরণ দিয়ে যেভাবে কংক্রিটের সৌধ গড়ে ওঠছে, তাতে হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ, হারিয়ে যাচ্ছে নীল আকাশ, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের সারল্য। সেইসঙ্গে কৃত্রিম আলোর বন্যায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে জোছনার রুপালি আলো। কখন জোছনা আসে, কখন জোছনা চলে যায়, অধিকাংশ নাগরিকই সেটা অনুধাবন করতে পারেন না। পারেন না বলেই জীবন ক্রমশ নিঃসঙ্গ, বিষণ্ন ও জটিল হয়ে যাচ্ছে। তার প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও। এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে একদমই যায় না। তবুও কেউ কেউ এখনও জোছনা ভালোবাসেন। স্নান করেন জোছনায়। ভেসে যান জোছনায়। সুবীর সেনের মতো উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, ‘নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ/নয় রাখলে হাতে দুটি হাত/নয় ডাকলে আরো কিছু কাছে/দেখো জোছনা ভেজা এই রাত’। বেইলি রোডে চ্যানেল আইয়ের অফিসের পরিসর হয়তো ছোট ছিল। কিন্তু চারপাশে ছিল আলোর ঝলকানি। গ্ল্যামার ছিল। সৌন্দর্য ছিল। (ছিল বলা ঠিক হচ্ছে না। এখনও আছে।) আছে ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের সুরেলা কিচিরমিচির। কাছাকাছি আছে রমনা পার্কের সবুজাভ। আছে নাট্যমঞ্চ, মন্ত্রিপাড়া, অফিসার্স ক্লাব। আছে অভিজাত্যের ছোঁয়া।


মুখরোচক খাবার আর জমজমাট আড্ডায় সারাক্ষণ সরগরম তো হয়ে আছেই। আছে কত রকম রসনার হাতছানি। রোজার দিনে রকমারি ইফতারের পসরা সাজানো হয়, তার আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসেন। রাস্তার পাশের ভ্যানে স্বল্প দামের ফাস্ট ফুড যেমন আছে, তেমনি আছে দামি চেইন শপ। আছে ঝকমকে, স্মার্ট, ড্যাশিং সব ক্রেতা। বাহারি পোশাক। আছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের কলগুঞ্জন। পুরো বেইলি রোড যেন হেসে ওঠে রঙধনুর মতো। আর সন্ধ্যা হলে তো আরো বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। অফিস থেকে বের হলেই মনটা কেমন উড়ৃ উড়ৃ হয়ে যেত। এমন একটি আনন্দময় পরিমণ্ডল থেকে তেজগাও শিল্প এলাকায় চ্যানেল আইয়ের অফিস স্থানান্তর হওয়ায় মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। যদিও বর্তমান অফিসের সঙ্গে আগের ছোট্ট গণ্ডির অফিসের কোনো তুলনাই হয় না। একটি কর্পোরেট অফিস যেমনটি হওয়া উচিত, তার কোনো কমতি নেই নতুন অফিসে। সাজ-সজ্জায়, সৌকর্যে-সৌন্দর্যে, বহিরঙ্গে। আছে সবুজের কিঞ্চিত ছোঁয়াও। তবুও মনটা পড়ে থাকতো বেইলি রোডে। কিন্তু প্রয়োজন ও চাহিদাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আবেগও গুরুত্বহীন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একসময় সব কিছু বদলে যায়। এখন আর বেইলি রোডের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। দেখতে দেখতে তাও তো প্রায় সাত বছর হতে চললো। কম সময় তো আর নয়। চ্যানেল আই অফিসের পরিসর এখন অনেক বড়। পরিবারের পরিধিও বেড়েছে। ‘সাপ্তাহিক’, ‘আনন্দ আলো’ পত্রিকার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘রেডিও ভূমি’ ও ‘চ্যানেল আই অনলাইন’ (এ অনলাইনের আজ প্রথম জন্মবার্ষিকী)। সব মিলিয়ে অনেক বেশি জমজমাট।


তাছাড়া অফিস চত্বরে সারা বছরই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই আছে। এক একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বদলে যায় চ্যানেল আই। সেজে ওঠে নতুন রূপে। হয়ে ওঠে এক খণ্ড বেইলি রোড। কখনো গ্রামীণ পরিবেশের আমেজ পাওয়া যায়। কখনো নাগরিক জীবনের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো লাল-সবুজের ছোঁয়ায় বর্ণিল হয়ে ওঠে। কখনো ব্যান্ড সংগীতে নেচে ওঠে হৃদয়। আবার মাতিয়ে দেয় রবীন্দ্রমেলা, নজরুলমেলা, হুমায়ূনমেলা। এ সব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমাগম লেগেই থাকে। পাশ দিয়ে হেঁটে যান স্বপ্নের তারকারা। কেউ কেউ মুচকি হাসি দিয়ে আলাদাভাবে নজর কেড়ে নেন। তাঁদের ডিওডোরেন্টের সুগন্ধ বুকটা ভরিয়ে দেয়। মনটাও ফুরফুরে হয়ে ওঠে। চাইলে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলা যায়। দূরের মানুষদের এতটা কাছাকাছি থাকতে পারাটা তো কম আনন্দদায়ক নয়। তবে আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় চ্যানেল আইয়ের খোলামেলা রুফটপ। এখানেও আয়োজিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কখনো গানে গানে স্বাগত জানানো হয় ভোরবেলাকে। কখনো প্রাণবন্ত আড্ডা জমে ওঠে লেখক-সাহিত্যিকদের। কখনো সম্ভাবনাময় মডেলদের পদচারণায় অন্য রকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। চ্যানেল আই ‘নিউজ নাইট’ও কম সৌরভ ছড়ায় না। ক্যান্টিনকে কেন্দ্র করে হরওক্ত ছোট-খাট আড্ডা লেগেই থাকে। ডালপুুরি, লুচি, পরটা-ডিম, মোগলাই পরটা, চায়ের জন্য ছুটে আসেন কম-বেশি সবাই। আপ্যায়িত করা যায় অতিথিদেরও। সিগারেটের নিষিদ্ধ প্রলোভন যাঁরা এড়াতে পারেন না, তাঁদের তো বাধ্য হয়ে আসতেই হয়। আর কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠলে একবুক তাজা বাতাস নেওয়ার জন্য ছাদটাই উত্তম স্থান। খুলে যায় মাথার অনেক জট। ফাঁকে ফাঁকে পুরো অফিসের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত সবার সঙ্গে সবার দেখা-সাক্ষাতও হয়ে যায়। ঘুচে যায় দূরত্ব। মোবাইলে সেরে ফেলা যায় গোপন আলাপনও। ছাদটা কখনো হয়ে ওঠে প্রকৃতঅর্থেই খেলার মাঠ। শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলা তো হয়ই, সেইসঙ্গে অনুশীলন চলে ক্রিকেটেরও। একটি ছাদকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। এই ঢাকা শহরে হাইরাইজ বিল্ডিং যেভাবে ওঠছে, তাতে খোলা চাতাল দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে ওঠছে। এমনকি আকাশও ঢেকে যাচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে চাঁদমামাও। এ ক্ষেত্রে বিশেষ আকর্ষণ চ্যানেল আইয়ের ছাদ। চারপাশ থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে আছে এই খোলা চত্বর। আধো আলো, আধো অন্ধকারে পাওয়া যায় বসন্তের মাতাল সমীরণ। রিমঝিম বৃষ্টির স্পর্শ। কখনো-সখনো ভালোবাসার মানুষের কাল্পনিক ফিসফিসানি।


সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার, অবলোকন করা যায় মায়াভরা চাঁদ আর মায়াবিনী রাত। সেই সূত্রে ‘আসমান ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’। সেই ধবল জোছনায় ইচ্ছেমতো অবগাহন করা যায়। লুটোপুটি খেলা যায়। চাইলে মন উজাড় করে বিলিয়েও দেওয়া যায় অঢেল জোছনা। এমন জোছনায় বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই অনুভব, ‘তোমায় আমি জোছনা দেব/তারার চাদরে জড়িয়ে নেব’।

আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে?

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা রঙ ছিল ফাল্গুনি হাওয়াতে সব ভালো লাগছিল চন্দ্রিমায় খুব কাছে তোমাকে পাওয়াতে। মন খুশি উর্বশী সেই রাতে সুর ছিল গান ছিল এই প্রাণে ঐ দুটি হাত ছিল এই হাতে কি কথা বলছিলে মন জানে সব ভালো লাগছিল তুমি ছিলে তাই মন ছিল মনেরই ছায়াতে। রাত আসে রাত চলে যায় দূরে সেই স্মৃতি ভুলতে কি আজ পারি পুরানো দিন আছে মন জুড়ে ভালোবাসা হয়েছে ভিখারি ধূপকাঠি মন জ্বলে একা একা তাই সেই তুমি নেই তুমি নেই সাথে। আসলেই কি সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল? ঠিক মনে নেই। কিছুই মনে রাখতে পারি না। দিন-তারিখ তো মনে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। তবে বিশেষ সেই রাতের কথা কখনই ভুলতে পারা যায় না। পারা সম্ভব নয়। সেই রাতে পূর্ণিমা না থাকলেও বুকের মধ্যে ছিল অমল-ধবল জোছনা। আর এ জোছনায় ভেসে গিয়েছিলাম। পেয়েছিলাম টক-ঝাল-মিষ্টি রাত। কোনো আগল ছিল না। কোনো বাঁধন ছিল না। কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না। এমন রাত জীবনে আর কখনো আসে নি। কি যে আনন্দময় রাত! কি যে উন্মদনাময় রাত! কি যে মাতাল করা রাত! বৃষ্টির ছোঁয়ায় রাতটা আরো মধুর হয়ে ওঠে। ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হলো শেষ/ভুবনজুড়ে রইলো লেগে আনন্দ-আবেশ’। এমন আনন্দ-আবেশে বুঝে কিংবা না বুঝে হারিয়ে যায় হুঁশজ্ঞান। তারপর আর কিছু জানা নেই। আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে? আমার তো কল্পনার শেষ নেই। জেগে জেগে কত না স্বপ্ন দেখি। এও কি তেমন কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন? কিশোর কুমারের গানের মতো একটি রাতের অপেক্ষায় থাকার চেয়ে মধুর স্বপ্ন আর কি হতে পারে? (আজ কিন্তু জোছনা ভেজা রাত। এমন মায়াবী জোছনায় বেগম আখতারের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমান, জোছনা করেছে আড়ি/আসে না আমার বাড়ি/গলি দিয়ে চলে যায়/লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি/চেয়ে চেয়ে পথ তারই/হিয়া মোর হয় ভারী/রুপের মধুর মোহ/বলো না কী করে ছাড়ি।) ১৮-৪-২০১৬

জীবন ভারি রহস্যময়

জীবন থেকে চলে যায় এক একটি দিন। প্রতিটি দিনই কোনো না কোনো ব্যক্তি, সমষ্টি বা জাতীয় জীবনে কম-বেশি আঁচড় কেটে যায়। একটি দিনে জন্ম, মৃত্যু, সম্পর্ক গড়া, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া সহ কত কি হতে পারে। সব দিন তো আর সবার জীবনে সমানভাবে যায় না। কোনো দিন উজ্জ্বলতা ছড়ায়। কোনো দিন অনুজ্জ্বল থেকে যায়। দিনটি হতে পারে মধুর। হতে পারে তিক্ত। হতে পারে মিশ্র অনুভূতির। হতে পারে একান্তই গোপনীয়। স্বাভাবিক কারণেই তা ব্যক্ত করা যায় না। অন্য কারো সঙ্গে শেয়ারও করা যায় না। অনেক সময় বুকের মধ্যে ভারী পাথরের মতো চেপে থাকে। সেই পাথর বয়ে বেড়াতে হয় সারাজীবন। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে নিজেকে মেলে ধরাও সহজ নয়। জীবন ভারি রহস্যময়। যতটা না ধরা দেয়, তারচেয়ে বেশি অধরাই রয়ে যায়। হয়তো কাউকে খুব কাছ থেকে দেখছি, জানছি, মনে করছি, এঁর কোনও কিছুই তো অজানা নয়। কিন্তু এমন অনেক গুরুতর বিষয় আছে, জানতেও পারা যায় না। ব্যক্তি বা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টর জন্য দিনটি স্মরণীয়, যা অপ্রকাশিত ও লুকানো, নির্ধারিত সেই দিনে তাঁর বা তাঁদের জীবনে হয়তো ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খাওয়া নৌকার মতো সুখে বা দুঃখে বুকের মধ্যে দুলিয়ে দেয়। কাছাকাছি থেকেও সুখ বা দুঃখের সেই দোলন অন্য কেউ অনুভব করতে পারে না। পারার কথাও নয়। আবার এমনও হতে পারে, সেই দিনটি একটা সময় জীবন থেকে হারিয়েও যায়। সেটা নির্ভর করে কে কীভাবে দিনটিকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন, তার ওপর। কেউ কেউ আছেন, যত বড় ঘটনাই হোক না কেন, সেটিকে স্মরণীয় মনে করেন না। উড়িয়ে দেন তুড়ি মেরে। তাঁরা আরও বড় স্মরণীয় কোনও দিনের অপেক্ষায় থাকেন। তাছাড়া প্রতিদিন এত হিসাব-নিকাশ করতে হয়, এর বাইরে অতীতের হিসেবের খাতাটাকে ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা হয় না। যাঁরা সেটা পারেন না, তাঁদেরই কেবল ভুগতে হয়। জীবন তো এমনই, কেউ নতুনের সন্ধানে থাকেন। কেউ অতীত নিয়ে আঁকড়ে থাকেন। অবশ্য অনেক সময় সেই অতীত নবরূপে ফিরেও আসে। এটা নির্ভর করে সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ১৮-৪-২০১৬

শনিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৬

তবুও চিঠির অপেক্ষায়.....

‘বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই কথা আর সুরে সুরে মন বলে তুমি রয়েছো যে কাছে, আঁখি বলে কতদূরে.....’ জগম্ময় মিত্রের গাওয়া এ গানটি যেন সুদূর থেকে ভেসে আসা কোনো মনোলগ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেজে চলছে নিরন্তন। সুরেলা এ চিঠির ছত্রে ছত্রে বিরহ আর ভালোবাসা মাখামাখি হয়ে আছে। এ গানের যখন জন্ম, তখন তো চিঠিই ছিল যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। টেলিপ্রিন্টার আর টেলিফোন তো অধিকাংশ মানুষের হাতের নাগালে ছিল না। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ব্যথা-বেদনা, রাগ-অনুরাগ, পাওয়া না পাওয়া নিয়ে হৃদয়ের আকুতি জানিয়ে কালির আঁচড়ে সাদা কাগজের বুকে ফুটে ওঠতো অন্তরঙ্গ আলাপন। আমাদের বয়সীরা তো চিঠিকেই মনে করতেন সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রধান যোগসূত্র। শৈশবেই মেলবন্ধন গড়ে ওঠে হলদেটে ইনভেলাপ, মাটিরঙা পোস্টকার্ড, লাল-কালোর ডাকবক্স আর খাকি পোশাকের ডাকপিয়নের সঙ্গে। যদিও বাসায় চিঠি আসতো কালেভদ্রে। তারপরও চিঠির প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতাম। কোন দূর থেকে আজানা কথার মালা খামবন্দি হয়ে আসার মধ্যে যে রোমাঞ্চ ছিল, তার কোনো তুলনা হয় না। চিঠিতে থাকতো কখনো আনন্দ, কখনো শোকের বার্তা। তারপরও চিঠি ছিল পরম আকাঙ্খিত। অবশ্য সব চিঠি পাঠাতে তো আর ইনভেলাপ, পোস্টকার্ড ও ডাকবাক্সের প্রয়োজন পড়তো না। যে চিঠিগুলো লেখা হতো একান্ত মনের মানুষকে, তার আয়োজন ছিল অন্যরকম। নিরালায় লেখা হতো সেই চিঠি। কখনো সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, কখনো পড়ালেখা কিংবা অন্য কোনো কাজের ফাঁকে ফাঁকে। সেই চিঠির ভাষাও ছিল হৃদয়তন্ত্রী থেকে ওঠে আসা অনুভবের রক্তক্ষরণ। আর সম্বোধনটা হতো অনেক মধুর।


রঙিন কাগজ, সবুজ কালি আর নীল খামের মোড়কের সেই চিঠি। চিঠি তো নয়, যেন নিষিদ্ধ বৃক্ষের প্রলুব্ধকর মায়াবী আপেল। সবার চোখ এড়িয়ে দুরু দুরু বুকে সেই চিঠি পৌঁছে দিতে হতো প্রাপকের হাতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বইয়ের মধ্যে চিঠি ভাঁজ করে রেখে লেনদেন করা হতো। কেউ কেউ অবশ্য ঘনিষ্ট বা নির্ভরযোগ্য কোনও বাহকের মাধ্যমে চিঠি পাঠাতেন। চিঠির উত্তরের অপেক্ষায় থাকাটা ছিল সুখের মতো ব্যথা। চিঠি পাওয়ার পর গোপনে সেটি পড়ার সময় ভাবাবেগে স্পন্দিত হতো হৃদয়। আর সাবিনা ইয়াসমীনের গাওয়া গানটি ছিল পরম প্রার্থিত : ‘চিঠি দিও প্রতিদিন, চিঠি দিও। নইলে থাকতে পারবো না। চিঠিগুলো অনেক বড় হবে পড়তে পড়তে সকাল-দুপুর আর রাত্রি চলে যাবে।’ স্কুল বয়সে চিঠি লেখাটাকে কি ইচড়ে পাকামি বলা যায়? সেই বয়সেই আমার মকশো হয় চিঠি লেখায়। তখন তো ছিল পত্রমিতালির যুগ। কারও কারও সঙ্গে কিঞ্চিৎ পত্র বিনিময় হয়। কীভাবে কীভাবে যেন বিশেষ একজনের সঙ্গে চিঠির লেনদেন হয়ে যায়। সমবয়সী দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল না প্রেম, না বন্ধুত্ব ধরনের। আসলে ঠিক তাও নয়। নৈর্ব্যক্তিক এ সম্পর্কে শুধু মনের কথা ব্যক্ত করাই ছিল চিঠি লেখার উদ্দেশ্য। প্রকৃতপক্ষে ব্যতিক্রমধর্মী সেই সম্পর্কটার কোনও ব্যাখ্যা হয় না। সেই চিঠিগুলো রেখে দিয়েছিলাম পরম যত্মে। কিন্তু বাসা বদলের ধাক্কায় হারিয়ে গেছে সব। (নাকি কেউ ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ডাস্টবিনে?)। হারিয়ে ফেলেছি আমার কৈশোর আর তারুণ্যের গন্ধমাখা কিছু আবেগ। তারপর তো পত্র-পত্রিকায় চিঠিপত্র লেখাটা নেশায় পরিণত হয়। প্রতিদিন কোনও না কোনও পত্রিকায় চিঠি লিখতাম। কত কত বিষয়। যা লিখতাম, তার অধিকাংশই অপ্রকাশিত থেকে যেত। তাতে মোটেও হতোদ্যম হইনি। কিন্তু ক্রীড়া লেখালেখির জগতে ঢুকে পড়ার পর চিঠি লেখার আগ্রহ যেন হারিয়ে যায়। অবশ্য চিঠি লেখার ইচ্ছেটা বুকের মধ্যে সুপ্ত থাকলেও মনের নিভৃতকোণের কথা জানানোর জন্য তেমন কাউকে পাওয়া যায় নি। তখন তো সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা কেটে যায় স্টেডিয়াম পাড়ায়। গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব আর সম্পর্কের নতুন বন্ধন। কিন্তু কাছের সেই মানুষরা একে একে বিদেশে পাড়ি জমাতে থাকলে আমি অনেকটাই নিঃসঙ্গ হয়ে যেতে থাকি। তাঁরাও বোধকরি সেটা অনুভব করতে পেরেছিলেন। সে সময় সিঙ্গাপুরে নকিব আহমেদ নাদভী (এখন কানাডায়), ইংল্যান্ডে দিলু খন্দকার, আয়ারল্যান্ড পরে সৌদি আরবে জিয়াউল করিম লোটাস (এখন যুক্তরাষ্ট্রে), জাপানে নজমুল আমিন কিরণ, কানাডায় ফরহাদ মান্নান টিটো, কাজী আলম বাবু, সৌদি আরবে ইকবাল কবীর প্রমুখের সঙ্গে পত্র বিনিময় হয়। তাতে ওঠে আসে অনেক সুখ-দুঃখের কথা। সেই চিঠি লেখাও একসময় থেমে যায়। তারপর কাগজ-কলমে আর চিঠি লেখা হয় নি। এরপর তো এলো ইন্টারনেটের যুগ। ফেসবুকের মতো ভার্চুয়াল জগতে মুঠোবন্দি হয়ে যায় পুরো দুনিয়া। এর দাপটে চিঠি লেখার চল বলতে গেলে ওঠেই গেছে। এরসঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। চেনা-অচেনা কত মানুষের অদৃশ্য পৃথিবী। চোখের পলকেই দূরের মানুষ চলে আসেন কাছে। যদিও আমি এ ব্যাপারে তত দক্ষ নই, তারপরও একজনের সঙ্গে যোগাযোগ হলো ইন্টারনেটে। ভাগ্যরেখা যে কখন কোনদিকে টেনে নিয়ে যায়, কেউ বলতে পারেন না। তবে যোগাযোগের শর্ত ছিল আমরা পরস্পরকে চিঠি লিখবো।


সেই চিঠিতে থাকবে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ। সেও রাজি হলো। অব্যক্ত কত কথাই তো লিখতাম। কিন্তু ভার্চুয়াল চিঠিতে সেই মৌলিক স্বাদ থাকে না। স্পর্শ থাকে না। গন্ধ থাকে না। এর কারণ, তাতে কাগজ, কলম, খাম, ডাকবক্স, ডাকপিয়নের ভূমিকা থাকে না। চিঠির লেনদেন হয় ইমেইলের মাধ্যমে। তারপরও দুধের স্বাদ অন্তত ঘোলে তো পেতাম। মনের কথাগুলো তো আর মিথ্যে ছিল না। কেন যেন সেই যোগাযোগটাও আর থাকলো না। ‘যত লিখে যাই তবু না ফুরায়, চিঠি তো হয় না শেষ- চিঠি নিয়ে আমার আক্ষেপ আজও ঘুচলো না। আমি বড্ড চিঠির কাঙাল। এর একটা কারণ হতে পারে, কথা-বার্তায় আমি মোটেও সাবলীল নই। অনেক বেশি শাই। কিন্তু চিঠিতে নিজেকে উম্মুক্ত করে দিতে আমরা কোনও জড়তা নেই। পত্রমিতালী আমার পছন্দের একটি বিষয়। এ কারণে খুব করে চাই কেউ আমাকে চিঠি লিখুক। জোছনায়, বৃষ্টিতে, বসন্তে। প্রতিদিন। তাতে থাকুক কাঁপা কাঁপা হাতের লেখা, লেপটে যাওয়া কালিতে মুছে যাওয়া অক্ষর, দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজ। থাকুক ঘামের গন্ধ, লিপস্টিকের ছোঁয়া, গোলাপের পাপড়ি। নীল কাগজে, নীল খামে, কোনও এক নীল সকালে পৌঁছে যাক পরম কাঙ্খিত সেই চিঠি। কবি মহাদেব সাহা’র মতো তীব্র আকুতি নিয়ে বলতে চাই, ‘চিঠি দিও’ ঃ ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও খামে ভরে তুলে দিও আঙ্গুলের মিহিন সেলাই। ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও, একটু সামান্য দাবি চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি। ......

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৬

মধ্যবিত্তের রূপান্তর এবং বাংলা নববর্ষের সর্বজনীনতা

১. আমার জন্ম গ্রামে নানী বাড়িতে, আঁতুরঘরে দাইয়ের হাতে। ষাট দশকের মাঝামাঝি, মধুমতি নদীর তীরে। জন্মের দেড়-দুই বছরের মধ্যে ঢাকা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস। শরীরে গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ লেগে থাকলেও বেড়ে ওঠা শহরের আলো-হাওয়ার পরশে। আমাকে নিঃসন্দেহে এ শহরের স্থায়ী বাসিন্দা বলা যেতে পারে। গত চার দশকেরও বেশি এ শহরের পরিবর্তনের ছোঁয়া কিছুটা হলেও অনুভব করতে পেরেছি। আমাদের শৈশব-কৈশোরে পরিবর্তন এলেও তার একটা ধারাবাহিকতা ছিল। কোনো কিছুই বড় কোনো ধামাকা হয়ে আসে নি। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সীমিত আয়। সীমিত ব্যয়। বাড়তি কোনো চাহিদার সুযোগ ছিল না। স্বাধীনতার আগে পুরানো ঢাকার শেখ সাহেব বাজার, সিদ্ধেশ্বরী, শাহজাহানপুর, মতিঝিল কলোনির ভাড়া বাসায় বসবাস করলেও স্বাধীন বাংলাদেশে একদম শুরু থেকেই থিতু হই ‘দ্বিতীয় রাজধানী’ খ্যাত শের-এ-বাংলা নগরের সরকারি কলোনিতে। শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে বসবাস করায় সে সময়কার নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে খুব একটা বঞ্চিত ছিলাম না। যদিও জীবনযাপন মোটেও ঝলমলে ছিল না। তবে এলাকার সবার সঙ্গে সবার কম-বেশি যোগাযোগ ছিল। আত্মীক সম্পর্ক ছিল। বিপদে-আপদে সবাই এগিয়ে আসতেন। সেই সময় রেশন থেকে চাল-আটা-তেল-চিনি না তুলে চলার উপায় ছিল না। রেশনকার্ড দিয়ে সেটা তুলতে যথেষ্ট বেগ পেতে হতো। এই ঢাকা শহরেই ছোটবেলা মাদুর বা পিঁড়িতে বসে খাওয়া-দাওয়া করতাম। হাফ প্যান্ট দিয়ে শুরু হলেও একটু বড় হওয়ার পর লুঙ্গি হয়ে ওঠে আরামদায়ক বসন। পোশাক-পরিচ্ছদ খুব বেশি ফ্যাশনদুরস্ত ছিল না। ঈদ উপলক্ষে এক প্রস্তু নতুন জামা-কাপড় পরিধান করলেও এর বাইরে তেমন বায়না ছিল না। মা-খালাদের সুতি শাড়িতে কেটেছে দিনের পর দিন। সালোয়ার-কামিজ পরতে দেখি নি। ঈদের দিন ছাড়া অন্য সময় সচরাচর সেমাই-পোলাও-কোর্মার দেখা মিলতো না। সাজ-সজ্জার জন্য তিব্বত স্নো-পাউডার-কাজল-ভ্যাসলিনই ছিল প্রধান উপকরণ। উৎসব না এলে অন্তত ছেলেদের ক্ষেত্রে গায়ে দেওয়ার সাবান খুব একটা সুলভ ছিল না। কাপড় কাচার জন্য ছিল ৫৭০ সাবান আর জেট পাউডার। বাসার কাপড়ধোয়া, ঘরমোছা, ঝাড়– দেওয়ার কাজের জন্য পার্টটাইম বুয়া রাখা হতো। আঙ্গুলে পাউডার লাগিয়ে দাঁত মাজতাম। ঈদের দিন আতর মাখানোটাই ছিল একমাত্র সুগন্ধি ব্যবহার। জন্মদিন উদযাপনের কোনও রীতি ছিল না। পকেটমানির প্রশ্নই আসে না। সেটা নানা কৌশলে সংগ্রহ করতে হতো। অনেক দূরের স্কুলে যেতাম হেঁটে হেঁটে। প্রাইভেট টিউটর সুলভ ছিল না। অসুখ হলে সরকারি ডিসপেনসারিতে যেতে হতো। দেওয়া হতো নানা রঙের সিরাপ। বোতলে দাগ কাটা থাকতো। সেই অনুপাতে খেতে হতো। জ্বর হলে সাগু-বার্লি খাওয়াটা ছিল বাধ্যতামূলক। আপেল-আঙ্গুর-কমলা তখন খানদানি ফল। সহসা তার নাগাল পাওয়া যেত না। হরলিক্সও ছিল পরম কাক্সিক্ষত।


সিগারেট প্যাকেট দিয়ে তাস খেলা, সাতচাড়া, ডাংগুলি, মার্বেল, ঘুড়ি উড়ানো ছিল প্রিয় খেলা। ফুটবল, ক্রিকেটও ছিল। তবে খেলার মাঠ, পার্ক ও আকাশ ছিল অবারিত। রোদেও পুড়েছি, বৃষ্টিতেও ভিজেছি। অনিয়মও করেছি। আমাদের নাগালের মধ্যে ছিল স্যাকারিন আর বরফ দিয়ে বানানো দুই পয়সার লাল-সবুজ আইসক্রিম, ঝালমুড়ি আর নানা পদের আচার। খাওয়া-দাওয়ায় খুব বেশি বৈচিত্র্য না থাকলেও তাতে অবশ্য ফরমালিন ছিল না। আর মাঝে-মধ্যে দেখা পাওয়া যেত বায়োস্কোপওয়ালার। এলাকায় টেলিভিশন ছিল দু’একটি বাসায়। কৃষি কলেজের মিলনায়তনে গিয়ে সাদা-কালো টেলিভিশন দেখতাম। তবে বাসায় ছিল রেডিও। সেটাই ছিল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। তাতে অনুরোধের আসর, নাটক, সৈনিক ভাইদের জন্য ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘দুর্বার’ শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম। হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হতো কালেভদ্রে। কমিউনিটি সেন্টারে পাঠাগার ছিল। নাটক আয়োজিত হতো। বেড়াতেও খুব একটা যাওয়া হতো না। বছরে এক-আধবার আত্মীয়-স্বজনের বাসায় যাওয়া হতো। এ ক্ষেত্রে বেবি ট্যাক্সি বা রিক্সাই ছিল প্রধান বাহন। বাসায় আত্মীয় কেউ এলে নিয়ে আসতেন নাবিস্কো বিস্কুট, চকলেট কিংবা গোলপাতায় রসের মিষ্টি। তবে স্কুলের ছুটিতে বছরে এক কি দু’বার গ্রামে বেড়াতে যেতাম। এ কারণে গ্রামের প্রতি একটা টান রয়েই গেছে। গাড়িওয়ালা কোনো আত্মীয় কারো বাসায় এলে সেটা ছিল এলাকার সাড়া জাগানো ঘটনা। কাছাকাছি কেউ বিদেশে গিয়েছে, সে সময় খুব একটা শোনা যেত না। ঈদ ছাড়া খুব একটা উৎসবের দেখা মিলতো না। আর সেটাও খুব বেশি ঝলমলে ছিল না। বাংলা নববর্ষ উদযাপন তো দূরে থাক, আমাদের এলাকায় জাতীয় কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়মিত চোখে পড়তো না। কাছাকাছি এলাকার মধ্যে আজিমপুরে বৈশাখী মেলার উত্তাপ পেতাম। বইমেলাও তখন জমে ওঠে নি। আর জাতীয় পর্যায়ে তো বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতোই। তা ছিল আমাদের নাগালের বাইরে।

২. আমার দুই পুত্রের জন্ম ঢাকার নার্সিং হোমে। দু’জনেই সিজারিয়ান। একজন মাধ্যমিকের গণ্ডি অতিক্রমের অপেক্ষায়। আরেকজন প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছে। যদিও মন-মেজাজে দু’জন দুই ভিন্ন মেরুর। তবুও তাদের বেড়ে ওঠা ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার খুব একটা হেরফের নেই। এ শহরের ইট-বালু-সিমেন্টের সঙ্গেই তাদের মেলবন্ধন। সবুজের দেখা মেলে না। গ্রামের সঙ্গে একদমই যোগাযোগ নেই। যে এলাকায় থাকে, সেখানে খেলার মাঠ নেই। তাই সেখানে তাদের যাওয়ার সুযোগও নেই। ফ্ল্যাটের কারও সঙ্গেও তেমন যোগাযোগ নেই। অনেকটাই বন্দি জীবনের মতো। এ কারণে প্রায়শই ছটফট করে। ডাইনিং টেবিলে খাওয়া ছাড়া এখন তো চিন্তাই করা যায় না। অবশ্য তারা ড্রয়িংরুমে রঙিন টেলিভিশন দেখতে দেখতে খেতে অভ্যস্ত। এলসিডি টেলিভিশন না হলে নাকি মজা পাওয়া যায় না। কম্পিউটার ছাড়া তো প্রতিদিনের জীবন চিন্তাই করা যায় না। সারাক্ষণই গেমস চলছে। অল্প বয়সেই একজনের চোখে চশমা। মোবাইল ফোনে গড়ে ওঠেছে নিজস্ব নেটওয়ার্ক। ইন্টারনেটের কারণে দুনিয়াটা খুব একটা দূরের নয়। আড়ালে-আবডালে ব্যবহার করে ফেসবুক। নতুন নতুন মডেলের মোবাইলের প্রতি টান তো আছেই। তথ্যপ্রযুক্তিতে কিছুটা আগ্রহী। ঈদে একাধিক সেট পোশাক অবশ্যম্ভাবী। তার মধ্যে ব্র্যান্ডের পোশাক থাকতে হবে। এছাড়া সারা বছর নতুন নতুন ড্রেস লেগেই থাকে। রাতের পোশাক আলাদা। এখন তো নতুন নতুন উৎসব। তার সঙ্গে তাল মেলাতে হয়। কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতেও নতুন ড্রেস না হলে চলে না। ড্রেসের সঙ্গে মানানসই কম্বিনেশন। পারফিউম, বডি স্প্রে তো থাকতেই হবে। প্রতিদিন গায়ে সাবান মাখতে হয়। টুথব্রাশের সাথে দামি পেস্ট দিয়ে দাঁত মাজাটাই এখন প্রচলিত। চোখে পড়ার মতো হেয়ারস্টাইল, সানগ্লাস। মায়ের তো নিত্য-নতুন কেনাকাটা আছেই। বদলে যায় ঘরসজ্জা। মাঝে-মধ্যে বাইরের হাল-আমলের রেস্তোরাঁয় না খেলে স্ট্যাটাস থাকে না।


আর বন্ধুদের সঙ্গে পিজ্জা, বার্গার খেতে যেতে হয়। হাতখরচার একটা ব্যাপার আছে। অন্তত পারিবারিকভাবে জন্মদিন পালন করতে হয় ঘটা করে। কোনো উপলক্ষ ছাড়াই পোলাও-কোর্মার আব্দার রক্ষা করতে হয়। বাসায় একজন কাজের বুয়া দিয়ে চলে না। বুয়াদেরও কাজের রেট বেশ বেড়েছে। বেড়েছে স্ট্যাটাসও। এক এক কাজের জন্য এক এক রেট। এখন তো অসুখেরও কোনও লাগাম নেই। লেগেই থাকে। এজন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। তাছাড়া কথায় কথায় প্যারাসিটামলসজাতীয় বিভিন্ন ট্যাবলেট, ক্যাপসুল খাওয়াটা মামুলি একটা ব্যাপার। কেউ রোদে পুড়তে চায় না। চায় না বৃষ্টিতে ভিজতেও। আপেল-আঙ্গুর-কমলা খাওয়ার খুব একটা আগ্রহ নেই। মুচমুচে চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন ফ্রাই পেলে আর কিছু না হলেও চলে। নাগালের মধ্যে পাঠাগার নেই। নাটক নেই। সিনেমা নেই। দৈনিক পত্রিকা, গল্পের বই-পত্র পড়ার খুব একটা আগ্রহও নেই। স্টেডিয়ামে গিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচ দেখার ঝোঁক আছে, কিন্তু সুযোগ হয় না। একজন প্রাইভেট টিউটর দিয়ে চলার প্রশ্নই আসে না। আছে বিভিন্ন কোচিং। বন্ধুদের অনেকেই নাকি এক একটা বিষয় এক একজন টিচারের কাছে পড়ার জন্য ছুটে যায়। এসএসসি’র সীমানা টপকানোর আগেই ব্যয়বহুল প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরিকল্পনা। বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ তো এখন ডালভাত। এর মধ্যে ঘটনাচক্রে একবার বিমানে প্রতিবেশী দেশে ঘুরে আসা হয়েছে। সেটাও খুব একটা মন রাঙাতে পারে নি। ইউরোপ-আমেরিকার প্রতি একটা টান আছে। দুই ফুফুই থাকে দেশের বাইরে। সেটাও অন্যতম আকর্ষণ। রাস্তা-ঘাটে একটুও হাঁটতে রাজি নয়। পিতা ক্যারিসমেটিক না হওয়ায় নিজস্ব ফ্ল্যাট নেই। গাড়ি নেই। এ কারণে আক্ষেপ আছে। মনস্তাপ আছে। অবশ্য পিতার সঙ্গে ছুটির দিন ছাড়া সন্তানদের দেখা-সাক্ষাৎ কম হয়। তাছাড়া দুই প্রজন্মের মধ্যে কেন জানি অজানা একটা দূরত্ব রয়ে যায়। যে কারণে তাদের মনের একান্ত কথা খুব একটা জানা হয় না। সন্তানদের মনোভাব সম্পর্কে যেটুকু অনুভব করতে পারা যায়, সেটাই তুলে ধরা হলো।

৩. যদিও এখানে সীমিত পরিসরে দুই প্রজন্মের ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেটিও একটি এলাকাকেন্দ্রিক। তবে সবার অভিজ্ঞতা তো আর এক রকম হবে না। সেটা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এর আলোকে পরিবর্তনের একটা ছোঁয়া নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যায়। যেভাবেই হোক, বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশ ঘটছে। এ বিষয়ে গবেষণামূলক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে ভারি কোনও প্রবন্ধ রচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে যে ধারণাটা গড়ে ওঠেছে, সেটা ব্যক্ত করাই এ লেখার উদ্দেশ্য। একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই পরিবর্তনটা সহজেই অনুধাবন করা যায়। এমনিতেই তো আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রতিনিয়ত গড়ে ওঠছে হাইরাইজ বিল্ডিং। নিত্য-নতুন চোখ ধাঁধানো মার্কেট। ভিন্নধর্মী প্রলুব্ধকর রেস্তোরাঁ। পার্লার। আরও কত কি! এই শহরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্যবিত্তের বসবাস ফ্ল্যাটে। সন্তানরা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করছে। সংখ্যাটা নেহাত মন্দ নয়। হাতে হাতে মোবাইল। কারো কারো কাছে একাধিক। লেটেস্ট মডেলের। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফেসবুকের কল্যাণে বদলে গেছে সম্পর্কের ধরন। নতুন নতুন দামি ব্র্যান্ডের পোশাক পরিধান করা হয়। বৈচিত্র্যময় ও স্মার্ট সব ড্রেস। বাইরে গিয়ে খাবারের স্বাদবদল নেওয়া হয়। প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়ছে। বাড়ছে ফ্ল্যাইওভার। অনেকেই দেশে ও দেশের বাইরে ঘুরতে যায়। চাকচিক্যময় ও ঝলমলে জীবন। স্বাধীনতার বেশ পরেও এমন জীবন কল্পনা করা যেত না। এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে মধ্যবিত্তের মানসিকতা, মূল্যবোধ, চিন্তাভাবনা, সাংস্কৃতিক কর্মকা-, ভোগবিলাস, বিনোদনে বেশ পরিবর্তন এসেছে। যদিও শহর এলাকার সঙ্গে গ্রামের তফাত রয়েই গেছে। তারপরও গ্রামীণ জীবনও কিন্তু কম বদলায় নি। সেখানেও এখন শহুরে আমেজ পাওয়া যায়। অর্থাৎ কম-বেশি সবকিছুতে পরিবর্তন এসেছে। অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে, সাংস্কৃতিকভাবে, পোশাকে, শিক্ষায়, চিন্তা-ভাবনায়। আগের সেই মধ্যবিত্ত এখন আর নেই।


এমন একটা রূপান্তরিত সমাজ কাঠামোয় কেউ কেউ যখন বলেন, বাংলা নববর্ষ আমাদের ঐতিহ্য নয়। অতীতে খুব বেশি ঘটা করে তা উদযাপন করা হয় নি। এখন কেন এই আদিখ্যেতা? এ ধরনের কথার কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে হয় না। বাংলা নববর্ষ অবশ্যই আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। একদম অতীতের কথা বাদ দিলেও সেই বাদশাহ আকবরের আমল থেকে এর গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। অতীতে হয়তো এখনকার মতো জমকালোভাবে উদযাপিত হয় নি। শুধু বাংলা নববর্ষ কেন, এই সেদিনও আমাদের কোন উৎসব অনেক বেশি জমজমাট ছিল? বলতে গেলে কোনোটাই ছিল না। আসলে সেই সামর্থ্য, সেই মনমানসিকতাই ছিল না। অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মধ্যবিত্তের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব বদলে যাওয়ায় উৎসবগুলো দিনে দিনে অনেক বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠছে। বাড়ছে বৈচিত্র্য। যোগ হচ্ছে নতুনত্ব। যে কোনও পর্যায়ের অনুষ্ঠানই সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছে। এমনকি বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচও হয়ে ওঠেছে উৎসবের উপলক্ষ। তবে জনসংখ্যাও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। লোকসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বাড়ছে উৎসবের ব্যাপ্তি ও বিশালত্ব। আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস। তাছাড়া অসাম্প্রদায়িক একটা চেতনা নিয়ে এই বাংলাদেশের জন্ম। সে কারণে সর্বজনীন উৎসব হয়ে ওঠার সব অনুষঙ্গই আছে বাংলা নববর্ষে। এ উৎসবের বিস্তার ও জাগরণ ঘটছে শুধু এই শহরেই নয়, পুরো দেশেই। এটি যত বেশি বিস্তৃত হবে, যত বেশি ঘটা করে উদযাপিত হবে, যত বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করবে, ততই এগিয়ে যাবে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।