পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বুধবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২১

জীবন ঝরছে বাড়ছে দুঃখ

সরকার ১৯৮৭ সালের ১৩ আগস্ট দৈনিক 'বাংলার বাণী' পত্রিকা নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে কর্মরত আমরা সবাই বলতে গেলে কর্মহীন হয়ে যাই। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই পত্রিকার সহযোগী প্রকাশনা চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক 'সিনেমা' পত্রিকায় বাড়তি সংযোজন করা হয় চার পৃষ্ঠার 'সিনেমা প্রবাহ'। তাতে স্থান পায় নানান রকম বিষয়। দৈনিকের পাশাপাশি আমি আগে থেকেই 'সিনেমা' পত্রিকায় কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করতাম। সে সময় দেশের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে পত্রিকার ১৯৮৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সংখ্যার প্রথম পৃষ্ঠায় লিখেছিলাম 'জীবন ঝরছে বাড়ছে দুঃখ'। বেশ বড় লেখাটি অন্য পৃষ্ঠায়ও স্থান পেয়েছিল। 




দেশের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতিতে দেশবাসী নিশ্চল। পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতায় সকলেই দিশেহারা, হতচেতন। প্রতিদিনই টুপ-টাপ ঝরে পড়ছে জীবন। বাড়ছে, মানুষের দুঃখ-কষ্ট। গণমাধ্যম দেশব্যাপী চলতি বন্যার যেটুকু সংবাদ বয়ে এনেছে, তাতে সকলেই দারুণ শংকিত। কেননা অর্ধ শতাধিক জেলা প্লাবিত হওয়ায় কম-বেশি সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত।

এমনকি বন্যার পানিতে অরক্ষিত হয়েছে ঢাকা সেনানিবাস, মতিঝিলসহ খোদ রাজধানী। ঢাকার অধিকাংশ আশ-পাশের সড়ক ও আবাসিক এলাকায় জলযান চলতে দেখা গেছে।জানা যায়, সাম্প্রতিক কালে বন্যা পরিস্থিতির এমন অবনতি আর ঘটেনি।

বিবেকের তাড়নায় একটুখানি সহানুভূতির জন্য ছুটে গিয়েছি বন্যা দুর্গত এলাকায়। যদিও গিয়েছি, সীমিত ও বিচ্ছিন্ন কিছু অঞ্চলে। কিন্তু সেসব স্থানে গিয়ে আঁচ করতে পেরেছি সমগ্র দেশের বন্যা পরিস্থিতি। পরিস্থিতি অবলোকন করে অক্ষম যন্ত্রণায় ছটফট করেছি—প্রকৃতি ও মানুষের ছলনায়। হৃদয়ে বন্দী করেছি মানুষের নিদারুণ অসহায়তা।

দু'চোখে জল নিয়ে বিস্তীর্ণ জলের ওপর দিয়ে পথ চলেছি একরাশ অস্থিরতা নিয়ে। দিগন্তব্যাপী অসীম জলরাশির সংস্পর্শে গিয়ে অসহায় মানুষের কাতরতা দেখে দেখে শুষ্ক চোখেও বয়ে যায় জলের ধারা। মানসপটে ভেসে ওঠেছে একটি উর্দু কবিতার চরণঃ


“আসফ আঁখোসে রোয়া ঔর জিগর জলতা হ্যায়। কেয়া কেয়ামৎ হ্যায় কি করসাৎমে ঘর জ্বলতা হায়।” অর্থাৎ চোখ দিয়ে অঝোরে জল করে যাচ্ছে; অথচ হৃদয় জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে। কি আশ্চর্য, যেন প্রবল বর্ষণমুখর শ্রাবণধারায় ঘরটা জ্বলে ছাই হয়ে গেল। (শের শায়েরী)।


এই চরণ আওড়াতে আওড়াতে বুকের মাঝে চিন চিন করে ওঠে ব্যথায়। বাংলার সবুজ-শামল প্রকৃতির রূপ হারিয়ে গিয়ে-যেদিকে চোখ যায় দেখেছি, শুধু থৈ থৈ জলতরঙ্গ। যেখানে গতকালও ছিল জীবনের স্পন্দন, আজ সেখানে জলমগ্ন। আর ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

শুনেছি, ভূমণ্ডলের চার ভাগের তিন ভাগ জল। কিন্তু বন্যা প্লাবিত এলাকায় গিয়ে মনে হয়েছে, বিশাল জলরাশির মাঝে একখণ্ড জমিন উঁকি মারছে, অতিকষ্টে। জনপদের কোথাও নেই জনবসতি।

অথচ জলযানে যে যে স্থানে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেছি বন্যার সর্বগ্রাসী দাপট, ঠিক সেখানেই ছিল হাজারো মানুষের বসবাস আর কোলাহল। অতীতের বন্যায় যখন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, তখন আশ্রয়ের জন্য মানুষ আশ-পাশের সুবিধাজনক স্থানে ঠাঁই নিয়েছে। এবারও আশ্রয় নিয়েছিল তেমনি। যেহেতু চলতি বন্যার চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন, সেহেতু নিকটের নিরাপদ ভূ-খণ্ডটুকুও আশ্রয়হীন করে তোলে, বানভাসীদের।



অনেকে আবার আশ্রয় নিয়েছিল নিজেদের ঘরের উঁচু চালে। কেননা শত বিপর্যয়েও পৈতৃক-ভিটা ছেড়ে কোথাও পরবাসী হতে তাদের মন সায় দেয়নি। এভাবে ক'দিন রজনী কাটায় নিরাপদে। কিন্তু একদিন রাতের অাঁধারে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের একমাত্র আশ্রয়টুকু কখন প্লাবিত হয়ে যায়, তা কেউ টের পায়নি, ঘুণাক্ষরে। ফলে অনেকেই বিলীন হয়ে যায় জলের গহ্বরে। সেই সাথে ঘটেছে দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। 

এমনি একটি ঘটনা চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ঘটেছে। উপজেলার দুরূ খালের পাড় ভেঙ্গে আশ-পাশের এলাকা হয় প্লাবিত। ফলে প্রতি মুহুর্তে বাড়তে থাকে পানি। তবুও একটি পরিবার চায়নি ঘর বাড়ী ত্যাগ করতে। কিন্তু ঘরে পানি ঢুকতে থাকলে এক দম্পতি এগার মাসের সন্তানকে ঘাটে রেখে স্বামী-স্ত্রী মাল-পত্র গুছাতে ব্যস্ত হয়ে উঠে। এক পর্যায়ে ঘরের মধ্যে কোমর পানি ওঠে যায়। সে সময় পানিতে শব্দ শুনে গৃহকর্তা বড় মাছ মনে করে কিরিচ দিয়ে কোপ দিলে পানি রক্তাক্ত হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ পর দু'টুকরো অবস্থায় সন্তানকে ভেসে ওঠতে দেখে পিতা-মাতা সাথে সাথে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন।

প্লাবনে বিলীন হয়েছে, অনেকের সারা জীবনে সঞ্চিত শেষ সম্বলটুকু। নারায়ণগঞ্জের কাশীপুর এলাকার ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ সড়কে গোপচরের শেখ সোমেজ কলাগাছ কেটে কোনো রকমে আশ্রয় নিয়েছেন। এক সময়ের জনবসতি বন্যায় প্লাবিত হয়ে যাওয়ায় তার উপর জলযান বেয়ে বেরে যখন বিভিন্ন সরকারী ত্রাণ শিবিরে পৌঁছেছি, তখন দেখেছি, হাজার হাজার মানুষের আহাজারি। সকলেই শোকাহত। শুনেছি, কারো কারো গগণবিদারী আর্তনাদ, কেউ সন্তান-সন্ততি হারিয়ে, কেউ পিতা-মাতা হারিয়ে, কেউ স্বজন-পরিজন হারিয়ে কিংবা কেউ সব কিছুই হারিয়ে হারিয়ে বোবা যন্ত্রণা নিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে।



ঢাকার নবাবগঞ্জের ওয়াপদা ভেড়ী বাঁধে বন্যার্তদের দৃশ্য দেখে চোখে পানি রাখা কষ্টকর। স্বামী, দুই পুত্র, কন্যাকে হারিয়ে সকিনা বিবির বাঁধের উপর সেকি আহাজারি ও বিলাপ। শুধু সকিনা নয়, আরো অনেকের আর্তনাদে কণ্ঠরোধ হয়ে আসে। কে দেবে তাদের সান্ত্বনা! সবার চোখেই পানি। চারপাশে পানি। আশ্রয় শিবিরে জায়গা না পেয়ে কেউ কেউ বাঁশের মাচানে পানির ঢেউ আর বিষধর সাপের সাথে লড়াই করছে। সিরাজগঞ্জের বল্লাপাড়া গ্রামের চরণ ঘোষ সর্প দংশনে স্ত্রীকে হারিয়ে বানের পানিতে ভাসিয়ে ঘরে ফিরে নিজেই দংশিত হয়।

অনেকের শোক মিলিয়ে গিয়ে চোখে-মুখে ঝরে পড়ছে, বাঁচার দাবিটকু। কেউ তিনদিন, কেউ চারদিন কিংবা একাধিক দিন অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছে। অবুঝ শিশুগুলো মাকে জড়িয়ে ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছে ।

সিরাজগঞ্জের লাহিড়ি মোহনপুরের ধান কলের শ্রমিক বিধবা আছিয়া খাতুন দশদিন অনাহারে থেকে ষ্টেশনের প্লাটফরমে মৃত্যুর সাথে লড়ছে। তার সর্বশেষ খবর জানা সম্ভব হয়নি। ঢাকার গোরান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় শিবিরে অবস্থানরত একজন বৃদ্ধার বক্তব্য : পানির হাত থেকে বাঁচার জন্য এখানে এসেছি। কিন্তু বাঁচবো কিনা আল্লায় জানে। গাইবান্ধার বিভিন্ন গ্রামে তীব্র খাদ্য সংকট। ক্ষুধা মেটাতে মানুষ কলার থোর, কচুলতা, কচুর মুড়ো সেদ্ধ করে খাচ্ছে। এবং এ দৃশ্য দেশের প্রায় সর্বত্র।

বেতার, টেলিভিশন, সংবাদপত্রে সরকারের মন্ত্রী, আমলা, নেতাদের ত্রাণ তৎপরতা সংক্রান্ত কাহিনী শুনলে কিংবা গর্বিত মুখের হাসি দেখলে মনে হতে পারে- বন্যাজনিত পরিস্থিতি বুঝিবা সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু সব হারানো মানুষের মাঝে এসে দাঁড়ালে চোখ বন্যার পানির মত প্লাবিত হয়ে ওঠে। মূক হয়ে যায় মুখের ভাষা । 



জীবন ধারণের ন্যূনতম চাহিদার জন্য বন্যার্তদের চোখে-মুখে সেকি আকুলতা। একখণ্ড রুটি কিংবা এক মুঠো চাউলের জন্য হাজার হাজার মানুষের মিলিত হাত ধেয়ে আসে। ভাগ্যবান কেউ তাৎক্ষণিকভাবে তা হস্তগত করতে পারলে চোখে তার স্বর্গ জয়ের আনন্দ। অথচ পরক্ষণে সে আনন্দের রেশ যায় মিলিয়ে। 

এদিকে অনাহারে, অর্ধাহারে অখাদ্য-কুখাদ্য এবং দূষিত জল নিরুপায় হয়ে খাওয়ার ফলে মড়ক লেগেছে—রক্ত আমাশয়, পেটের পীড়া, ডায়রিয়ার। প্রায় প্রতি দিনই টুপ-টাপ ঝরে পড়ছে দু’একটি জীবন।

সরকারী হিসেবে বলা হয়েছে, এক লাখের বেশী লোক ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। প্রাণ হারিয়েছে ৭৬৷ কিন্তু বেসরকারী হিসেবে ডায়রিয়া, আমাশয়, উদরাময়সহ বিভিন্ন পেটের পীড়ায় দুই লাখেরও বেশী আক্রান্ত। প্রায় ৩০টি জেলায় ডায়রিয়া মারাত্মক সংক্রামক এবং দশাধিক জেলায় মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। মৃতের সংখ্যা অসংখ্য। সরকারী কর্মকর্তারা এই জ্বলজ্যান্ত সত্য স্বীকারে নারাজ। 

এদিকে প্রথমতঃ খাদ্য নেই, দ্বিতীয়তঃ বিশুদ্ধ পানির জন্য মানুষ ছটফটিয়ে মরছে। কবির ভাষায়ঃ “ওয়াটার ওয়াটার এভরিহোয়্যার বাট, নট এ ড্রপ টু ড্রিঙ্ক”। সরকার, তা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

কোথাও কোথাও অনেক মৃতদেহকে দাফন করা যায়নি। কলা গাছের ভেলায় কিংবা পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক মৃতদেহ হয়েছে কুকুরের আহার্য। দিনাজপুর বিরল উপজেলার ৯নং রানিদীঘি ইউনিয়নের একটি দৃশ্য অবিকল এ রকমঃ মা ও তার দুই শিশু সন্তানকে বাহু বন্ধনে আপন বুকে আগলে রেখেছে। গলিত লাশ থেকে বেরুচ্ছে উৎকট দুর্গন্ধ আর এক পাল কুকুর খাবলে খাবলে খাচ্ছে তার মাংস। এর থেকে একটু দূরের আরো একটি লাশ, এক কিশোরীর। কুকুর শেয়ালের পাল ইতিমধ্যেই সে লাশের অর্ধেক সাবাড় করেছে।

এদিকে সরকার দাবি করছেন, ত্রাণ তৎপরতা অপ্রতুল নয়। প্রয়োজন মাফিক তা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ বাস্তব সে সাক্ষ্য দেয় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে একটি দৈনিকের সংবাদদাতার ভাষ্য: রংপুরের বদরগঞ্জে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি বস্ত্র সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। পুরুষ মানুষ লুঙ্গীর বদলে চট পরছে, আর মেয়েরা ছিঁড়া কাঁথা পরছে, কেউ শুধু ছায়া পরে আছে। বন্যা বিধ্বস্ত গ্রাম জনপদগুলোতে কমবেশী অঞ্চলের অবস্থা বিরাজমান। ঐ এলাকার শংকরপুর-বেলপাড়া ইউনিয়নের আবুল্লাহ মিয়া বলেন, প্যাটেতে খাবার নাই তবন (লুঙ্গি) কিনি কি দিয়া ?

এ অবস্থায় অনুমিত হয় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের অবস্থা মোটেও আশানুরূপ নয়। সরকার যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করছে, সুষ্ঠু বণ্টন হলে মাথাপিছু হিসেবে তা পঞ্চাশ পয়সায় সীমাবদ্ধ। তাছাড়া বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রী বন্যার্তদের হাতে পৌঁছানোর আগেই অধিকাংশই আবার ভোজবাজির মত গায়েব হয়ে যায়। ভয়েস অব আমেরিকার ঢাকাস্থ প্রতিনিধি গিয়াস কামাল চৌধুরীর ভাষায়ঃ কাজীর গরু খাতায় আছে, কিন্তু গোয়ালে নেই। একটি সূত্র জানায়, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ না করে সরকারের লোকজন বন্যার্তদের কাছ থেকে জোরপূর্বক টিপসই দিতে না চাইলে তাদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে। এমন একটি ঘটনা শের-এ বাংলা নগর সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের আশ্রয় শিবিরে ঘটেছে। ইতিমধ্যে কালোবাজারে রিলিফের চাল বিক্রির দায়ে গ্রেফতারের খবরও চোখে পড়েছে। এ সংক্রান্ত অসংখ্য মামলা নথিভুক্ত করা হচ্ছে। 

ঢাকাস্থ একটি ত্রাণ শিবিরের খবর। চাল আসছে সকালে দেয়া হবে, বিকেলে দেয়া হবে, এমন আশার বাণী শোনান হয়। আর আশা পূরণের অনিশ্চয়তা নিয়ে দুর্গতরা অধীর অপেক্ষা করেন। খাদ্যের জন্য শিশুদের গলাফাটা আর্ত চীৎকার, সব মিলে পরিবেশ যেমন নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর, তেমনি করুণ ও বেদনাদায়ক। নারায়ণগঞ্জের ইয়ারুন নেছা ক্ষোভের সাথে বলেন, “কই মেম্বার চেয়ারম্যান, হেরা কই, ভোটের আগেতে মা কইয়া পাও ধরে, এহন তো মুখও দেহি না। পাস করলেই গম চুরির চিন্তা।”

সার্বিক হিসেব-নিকেশ করে একটি রেজাল্ট দাঁড়ায়ঃ সহায়-সম্বলহীন বানভাসিদের অধিকাংশই শোচনীয় অবস্থায়। দিনাতিপাত করছে ধুঁকে ধুঁকে। মৃত্যুর পরোয়ানা দুয়ারে হাজির হতে পারে যে কোনো মুহুর্তে ।

দেশের সর্বত্র বন্যা দুর্গতদের আকুল আবেদন আমরা রিলিফ চাই, চাই কোনো মতে বাঁচতে। অথচ অপর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীর কারণে বন্যার্তদের আবেদন অগ্রাহ্য হচ্ছে।

দেশে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ত্রাণ তৎপরতায় এবং সরকারের সহযোগীদের বিরুদ্ধে রিলিফ চুরির অভিযোগ এনেছেন।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মানুষকে বাঁচানোর দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু সরকার এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, জনগণ না খেয়ে মরছে, সেদিকে ক্ষমতাসীনদের কোনো খেয়াল নেই। তারা আখের গোছাতে ব্যস্ত। এ সরকার দুর্গত মানুষের পক্ষের নয়, ধনীক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষার জনাই ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছে। 

বিএনপি চেয়ারম্যান বেগম খালেদা জিয়া বলেছেনঃ বন্যাদুর্গত বিপন্ন মানুষের ত্রাণ তৎপরতার নামেও দুর্নীতি চলছে। এই দুর্গত মানুষের সাহায্যের জন্য সরকার যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তাও মিথ্যায় ভরপুর।দুর্গত মানুষের কাছে সরকারী ত্রাণসামগ্রী পৌঁছছে না।

তিনি আরো বলেনঃ আজ অনাহারে, অর্ধাহারে, অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে ক্ষুধার তাড়নায় হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের খাবারের কোনো বন্দোবস্ত এবং চিকিৎসার সুযোগ নেই।

বাকশালের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক বলেছেনঃ এই ভয়াবহ দুর্যোগে বিপন্ন মানবতার প্রতি আজও বিশ্ব বিবেক ও সরকারসমূহ তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি।

জামাতে ইসলামের আমীর আব্বাস আলী খান বলেছেনঃ এ বন্যা সরকারের পাপের ফসল । 



বন্যার স্রোত আর তৎক্ষণাৎ পরিস্থিতিতে বেশ কিছু জীবন হারিয়ে গেলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সময় পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে অর্থাৎ বন্যার পানি টান ধরলে, প্রাণহানি ঘটবে অসংখ্য মানুষের। এ অবস্থাকে সামাল দিতে হলে প্রয়োজন পর্যাপ্ত খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, ওষুধ। অথচ অবস্থা তেমন সুবিধের নয়।

বন্যার্তদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনও ক্রমাগত ওষ্ঠাগত হয়ে ওঠছে। কেননা পণ্যদ্রব্যের মূল্য পাগলা ঘোড়ার মত ছুটে চলছে। সর্বশেষ বাজার দরে চাল ১৬ টাকায় ঠেকেছে। পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, বন্যাজনিত কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে সরকার ব্যর্থ হতে চলেছে । দেশ-বিদেশে দৌড়াদৌড়ি করেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বাংলাদেশস্থ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার কিংবা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের আবেদন নিবেদন করে এবং সরেজমিনে বন্যা উপদ্রুত এলাকা প্রদর্শন করিয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। উড়িরচরের জলোচ্ছ্বাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সাহায্য পাওয়ার যে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল এবার তার ছিটে-ফোঁটাও মিলছে না। এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধে পাক বাহিনীর পক্ষাবলম্বনকারী বর্তমান সরকারে ত্রাণ, পুনর্বাসন ও ধর্মমন্ত্রী মওলানা আবদুল মান্নান সুযোগ পেয়ে দেশের মান-সম্মানকে ভুলুণ্ঠিত করছেন দ্বিধাহীনচিত্তে। মন্ত্রী মুসলিম দেশগুলোর কাছে ভিক্ষা চেয়ে বলেছে, 'আমরা যাকাত পাবার প্রথম কাতারে'। তা সত্ত্বেও ভিক্ষা আসছে না। মন্ত্রীদের দূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা, চেয়েচিন্তে সাহায্য আনতে। সাহায্য চাওয়া হয়েছে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এসকাপের বৈঠকে। এত উদ্যোগের পর উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী সাংবাদিকদের বলেছেন, বন্যার্তদের জন্য বিদেশী সাহায্যের প্রতিশ্রুতি’ উৎসাহব্যঞ্জক। এই প্রতিশ্রুতি কবে নাগাদ কার্যকর হবে, তা বলতে পারে ভবিতব্য। সাহায্যের একটি নমুনাঃ একটি প্রভাবশালী দৈনিকের খবর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে সংগৃহীত গম আগামী ৩০শে সেপ্টেম্বর পৌঁছাতে পারে। এদিকে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, দেশে কোনো খাদ্য ঘাটতি নেই। কারণ ১০ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় অন্য সম্পদেরও কোন ঘাটতি আমাদের নেই। অন্যদিকে একটি জাতীয় দৈনিকের সাথে সাক্ষাৎকারে বাণিজ্যমন্ত্ৰী মেজর জেনারেল এম, মুনীম দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে নিয়ে বলেছেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নীতি আমরা কার্যকরভাবে সফল করতে পারিনি। সরকার পরিচালিত একটি সাপ্তাহিকীর সম্পাদকীয়তে স্বীকার করা হয়েছে, সারাদেশ ভয়াবহ বন্যায় নিমজ্জিত। মানুষ ক্ষুধার্ত, নিরাশ্রয়, অসহায়। প্রায় সারাদেশ জলবন্দী। বন্যায় ভেসে গেছে ঘর-বাড়ি, শস্যক্ষেত্র, আমন ধান। ভেসে গেছে গবাদিপশু, সহায় সম্পত্তি। বন্যা তাই শুধু মানুষের বর্তমান কেড়ে নেয়নি, একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও শংকিত করে তুলেছে। অপর দিকে উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি দক্ষিণাঞ্চলে ধেয়ে আসছে। ফলে দুঃখ-দুর্দশাও ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। দেশব্যাপী চলতি বন্যায় সবশেষ সরকারী হিসেবঃ ৫২টি জেলা প্লাবিত। প্রাণহানির সংখ্যা পাঁচ শত ছুঁই ছুঁই। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দু'কোটি লোক । ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক তিন হাজার কোটির দিকে অগ্রসরমান। তবে দেশী-বিদেশী গণমাধ্যম ও বেসরকারী হিসেবের সাথে সরকারের দুস্তর ব্যবধান।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় আনলে বন্যা-উত্তর পরিস্থিতি ভয়াবহ। তা সামাল দেয়ার জন্য সরকার এখন পর্যন্ত কার্যকর কিছু করতে পারেনি। যে কারণে প্রতি দিনই জীবন ঝরছে, বাড়ছে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা। একটি প্রশ্ন এখন সবার মনে, দুর্ভিক্ষ কি আসন্ন? 

২৮শে আগষ্ট ১৯৮৭

রাজনীতির আকাশে মহিলা তারকা

১৯৮৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম, 'রাজনীতির আকাশে মহিলা তারকা'।

আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনীতি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। রাজনীতির সংস্পর্শে মানুষের মনে সচেতনা বোধের সঞ্চার ও মতামতের প্রতিফলন ঘটে। আর ব্যক্তিগত চিন্তা-ভাবনার আলোকে যিনি অধিক মানুষকে আকৃষ্ট করতে পারেন, তিনিই নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হন। মানুষ তার আহ্বানে সাড়া দিতে কুণ্ঠা বোধ করে না। তবে রাজনীতির পথ বড্ড জটিল ও কণ্টকাকীর্ণ ৷ প্রতি মুহূর্তে অনিশ্চয়তার হাতছানি।

এ কারণেই রাজনীতির বিসর্পিল পথে মহিলাদের বিচরণ সহজলভ্য নয়। বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের পানে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, মহিলাদের পশ্চাৎপদতা। অবশ্য পুরুষের পাশাপাশি রাজনীতিতে মহিলাদের অবদানের কথা অস্বীকার করার জো নেই। 

সক্রিয় মহিলা রাজনীতিবিদের সংখ্যা অপ্রতুল হলেও অনেকেই নেপথ্যে থেকে রাজনীতির কলকাঠি নাড়িয়ে কিংবা পুরুষকে অনুপ্রাণিত করে রাজনীতি চত্বরকে গতিশীল করেছেন।

এর মাঝেও এমন কিছু মহিলা আছেন যারা শুধুমাত্র রাজনীতিতে কর্মঠ নন পাশাপাশি তারা রাজনীতির অগ্নিকন্যা হিসেবে সারা দুনিয়ায় ঝড় তুলেছেন। টলিয়ে দিয়েছেন - একনায়কতন্ত্র, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরচারী সামরিক শাসকের ভিত। কোথাও কোথাও তারা শত প্রতিকূলতার মাঝেও আপোষহীন ভাবে নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। কারাগার, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, জুলুম, অত্যাচার তাদের আন্দোলনকে পিছপা করতে পারছে না। কেউ কেউ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ করেছেন। সরকার পরিচালনায় অপরিসীম দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। 

তবে যেখানে নারী স্বাধীনতার উত্তুঙ্গ পরিবেশ, সেই টালমাটাল পাশ্চাত্যের তুলনায় রাজনৈতিক আসরে প্রাচ্যের মহিলারা অনেক এগিয়ে। পশ্চিমা দেশগুলোররা জনীতিবিদরা জনগণকে ব্যক্তিত্বের ইমেজ ও মোহে প্রলুব্ধ করতে পারলেই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াক ষ্টসাধ্য নয়। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক ক্ষেত্র বড় বেশি দুর্গম, অমসৃণ ও অনিশ্চয়তায় ভরপুর। জনগণের একচেটিয়া সমর্থনেও ক্ষমতার সিংহাসনে আরোহণ করা যায় না। তাদেরকে ফ্যাসিবাদী সরকার কিংবা বন্দুকের নলের বিরুদ্ধে লড়াই করে চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হয়। এই অবস্থায় যেখানে বলবান পুরুষেরা হিমসিম খেয়ে যান, সেখানে মহিলাদের চলারপ থ পুরোপুরি অসমতল।

এমনিকেই পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় মহিলাদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদাভুক্ত বলে মনে করা হয়। তাছাড়া ধর্মান্ধ ব্যক্তিরা মহিলাদের রাজনীতি করাটা মোটেও মেনে নিতে পারেন না। এখনও সামন্তবাদের গুরুতর প্রভাব। সামগ্রিক অর্থে তলিয়ে দেখলে তৃতীয় বিশ্বে পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের বিভিন্ন রকম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এত সব প্রতিকূলতার মাঝে মহিলাদের রাজনীতিমুখীন হওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। তা সত্ত্বেও তৃতীয় বিশ্বে মহিলা রাজনীতিবিদদের সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়ছে। বরং বলা যায়, তৃতীয় বিশ্বে বার বার মহিলারাই ওঠে আসছেন রাজনৈতিক শিখর দেশে। ফলে পরিবর্তন ঘটছে সনাতন মূল্যবোধের। তবে যুগে

যুগে বিশ্ব রাজনীতিতে মহিলাদের আবির্ভাব ঘটে থাকলেও বর্তমান শতাব্দীতে তারা লাইমলাইটে আসছেন অধিক মাত্রায়। তৃতীয় বিশ্বের একজন মহিলা রাজনীতিবিদকে এখন সারা বিশ্বের লোক চেনেন, জানেন।

তবে মহিলা রাজনীতিবিদদের পথপ্রদর্শক হলেন সুলতানা রাজিয়া। ঘোরতর পশ্চাৎপদ দেশে ও সমাজে তিনি পুরুষদের ডিঙ্গিয়ে দিল্লীর সিংহাসনে আসীন হন। যদিও সিংহাসনে বেশি দিন স্থায়িত্ব পাননি। পুরুষদের চক্রান্তে ক্ষমতাচ্যুত ও নিহত হন।

উন্নত পুঁজিবাদী দেশে অনগ্রসর সামন্ততান্ত্রিক মনোভাবের স্থানে নেই। কোনও পুরুষের দুর্বল ও উজ্জ্বল প্রতিফলন হিসেবে নয়, স্বীয় শক্তি, মেধা ও অধিকারে রাজনীতির জমজমাট হাটে নিজেদের আসনকে পাকাপোক্ত করতে হয়। সামগ্রিক নারী মুক্তির প্রতিফলন কিংবা নারী চেতনায় প্রগতির চিহ্ন হিসেবে তারা রাজনীতির পথে এগিয়ে যান। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক শীর্ষ দেশে মহিলাদের প্রবেশ ও বিকাশ বস্তুত একট সামাজিক ও একটি ব্যক্তিক ঘটনা। কেননা যতটা না সচেতন প্রয়াসের ফল, তার চেয়ে অনেক বেশী আকস্মিক ঘটনা, যতটা না জীবনের দান, তার চেয়ে অনেক বেশী মৃত্যুর। অর্থাৎ তাদের কৃতিত্বের পিছনে প্রাথমিকভাবে পারিবারিক অবস্থানই এত সহজে, এত দ্রুত রাজনৈতিক পাদপ্রদীপের আলোয় আলোকিত করেছে।

হাজার বছরের বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে মহিলারা রাজনীতি সম্পৃক্ত না হয়েও হয়ত প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন কিংবা রাজনীতি সচেতন হয়েও প্রচারণার স্বল্পতার কারণে বন্দী থেকেছেন দেশের সীমানায়।

তাদের সম্পর্কে এই ক্ষুদ্র নিবন্ধে আলোচনা সম্ভব নয়। মূলতঃ যারা রাজনৈতিক আকাশে মহিলা তারকা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন অর্থাৎ যাঁদের কথা দুনিয়ার মানুষ জানেন কম-বেশি জানেন, তাঁদের সম্পর্কেই এখানে বলা হয়েছে।



সিরিমাভো বন্দরনায়েক 

বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হলেন সিরিমাভো ডব্লিউ, আর, ডি, বন্দরনায়েক। ১৯৫৯ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর তাঁর স্বামী শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী এন, ডব্লিউ. আর, ডি, বন্দরনায়েক কলম্বোতে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দ্বারা নিহত হন। স্বামীর হত্যায় রাজনীতিতে বিকশিত হয়েছেন সিরিমাডো বন্দরনায়েক। প্রায় ১৯ বছর স্বামীর সাথে সংসার জীবন করার পর ১৯৬০ সালে রাজনৈতিক জীবনের দীক্ষা নেন। স্বামীর মুত্যুর ছয় মাস পর তিনি শ্রীলংকা ফ্রীডম পার্টি (এস এল এফ ডি)-র পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন। একই বছর তিনি এসএলএফডি-র প্রেসিডেন্ট হন। তারপর তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র ক্রমশঃ প্রসারিত হয়েছে। ঐ বছরই তিনি সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। ১৯৬০ সাল থেকে তিনি একটানা পাঁচ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকেন, মাঝে একটি মেয়াদ ক্ষমতায় উত্তীর্ণ না হতে পারলেও পুনরায় তিনি ১৯৭০ সাল থেকে ৭৭ সাল পর্যন্ত প্রধান মন্ত্রী ছিলেন। অবশ্য সিরি মান্ডে ৬০ সাল থেকে ৮০ সাল পর্যন্ত একটানা ২০ বছর শ্রীলংকার পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও তিনি প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, পরিকল্পনা, অর্থ ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করেছেন। ১৯৬৫ থেকে ৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন বিরোধী দলের নেত্রী। ১৯৭৬-৭৭ সালে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ছিলেন। বর্ণাচ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী সিরিমাভো বন্দরনায়েক এখন সত্তরোর্ধ বয়সেও শ্রীলংকা ফ্রীডম পার্টর প্রেসিডেন্ট হিসেবে শ্রীলংকার লৌহমানব জয়বর্ধনকে অস্থির করে রেখেছেন। আজও জয়বর্ধন তাঁর সমর্থন সংগ্রহ করতে আগ্রহী। 

ইন্দিরা গান্ধী

পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের সর্বাধিক আলোচিত নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দিরার উত্থানের ক্ষেত্রে কোনও নাটকীয়তা না থাকলেও তিনি শক্তি সঞ্চার করেছেন পিতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কিছুটা আকস্মিক এবং মহান মৃত্যুর ঘটনা থেকে। সেই মৃত্যুতেই উদ্দীপিত করেছে তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনকে, অবশ্য মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ১৯৩৮ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হন। ১৯৫৯-৬০ সালে কংগ্রেস পার্টির প্রেসিডেন্ট, ১৯৬২ সালে সিটিজেন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ১৯৬৪-৬৬ সালে লোকসভার সদ্স্য হন। ১৯৬৬ সালের ১১ই জানুয়ারী লাল বাহাদুরের রাশিয়ার তাসখন্দে আকস্মিক মৃত্যু হলে ইন্দিরা বিশাল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। দীর্ঘ ১১ বছর একটানা ক্ষমতাসীন থাকার পর নির্বাচনে বিরোধী দলের কাছে হার মানেন। কিন্তু তিন বছর পর পুনরায় নির্বাচনে জয়ী হয়ে ১৯৮০ সালে ক্ষমতায় ফিরে আসেন। আততায়ীর তীতে নিহত হওয়ার আগাবধি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বর্তমানে তাঁরই পুত্র রাজীব গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। 

গোল্ডামেয়ার

রাজনীতিবিদ হিসেবে গোল্ডা মেয়ার সাফল্যের শিখরে ওঠার কৃতিত্ব অর্জন করেন। আমেরিকায় শিক্ষার্থী মেয়ার আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরুর পাশাপাশি রাজনৈতিক জীবনেও জড়িয়ে পড়েন। ১৯২৮ সালে শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে রাজনীতির হাতেখড়ি নেন। ইসরাইলী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রথম মন্ত্রী পরিষদে (১৯৪৯-৫৬) তিনি শ্রম ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী (১৯৫৬-৬৬) হন। ১৯৬৭ সালে তিনি লেবার পার্টি গঠন করেন। এই পার্টি ক্ষমতায় গেলে (১৯৬৯-৭৪) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার পান। তিনি ৮১ বছর বয়সে ১৯৭৯ সালে মারা যান । গোল্ডা মেয়ার ব্যক্তিগত প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে ধাপে ধাপে সাফল্যের শিখরে উঠেছেন।

মার্গারেট থ্যাচার 

মার্গারেট থ্যাচার, ইউরোপ-আমেরিকার প্রথম মহিলা সরকার প্রধান। থ্যাচারের ক্ষমতায় আরোহণ কোনও দায়সারাগোছের ঘটনা নয়। বরং মহিলা রাজনীতিবিদ হিসেবে ব্যক্তিত্বের দীপ্তছটা দিয়ে তিনি সফলকাম হয়েছেন। ১৯৭০ সালে তিনি কাউন্সিলর, ১৯৮৩ সালে রয়াল সোসাইটির ফেলো এবং ১৯৫৯ সাল থেকে তিনি কনসারভেটিভ পার্টির এম পি হন। ১৯৭৫ থেকে '৭৯ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলের নেত্রী থাকার পর ১৯৭৯ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হন। সম্প্রতি তৃতীয়বারের মতো মার্গারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হয়ে হ্যাটট্রিক করেছেন। বিশ্ব ইতিহাসে এটি একটি দুর্লভ দৃষ্টান্ত। এর ১৮০ বছর আগে বৃটেনেরই লর্ড লিভারপুল ১৮১২ থেকে ১৮২৭ সাল পর্যন্ত তিন দফা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। লৌহমানবী হিসেবে খ্যাত দৃঢ়চেতা, কঠোর ও অনমনীয় থ্যাচার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে যথেষ্ট সাহসিকতার পরিচয় দিচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি ফকল্যান্ড যুদ্ধে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছেন। ৬২ বছর বয়স্ক থ্যাচার যে কোন সমস্যা মোকাবেলায় এখনও প্রত্যয়ী। 

গারাল্ডাইন ফেরারো

গারাল্ডাইন অ্যান ফেরারো হলেন প্রথম মহিলা যিনি ১৯৮৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্সিয়াল নির্বাচনে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ওয়াটার মণ্ডেল। ৫২ বছর বয়স্কা ফেরারো ১৯৭৪-৭৮ সালে নিউইয়র্কের এ্যাসিস্টেন্ট ডিস্ট্রিক্ট এটৰ্নী, ১৯৮১-৮৫ সালে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেনটিভ-এর সদস্য ছিলেন। 

কোরাজন একুইনো

কোরাজন একুইনো এখন এবং আগামী বহুদিন বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় আন্দোলন গণতান্ত্রিক আবেগের জন্ম ও বিকাশভূমি। অথচ ১৯৮৩ সালের ২১শে আগষ্ট ম্যানিলা বিমান বন্দরে বেনিগনো একুইনোর আততায়ীর হাতে মৃত্যু না হলে কোরাজন কখনই ক্ষমতায় আসতেন কিনা সন্দেহ। কেননা স্বামী যত দিন বেঁচে ছিলেন সেই ২৮ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি থেকেছেন আড়ালে আড়ালেই। ১৯৮৪ সালে রাজনীতির আসরে নেমে তিনি প্রথম চোটেই নির্বাচনে জিতে জাতীয় পরিষদে আসন দখল করেন। ১৯৮৬ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারী কোরাজান নির্বাচিত হলেও ২৫শে ফেব্রুয়ারী প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এক ফোটা রক্ত না ঝরিয়ে মার্কোসকে যেভাবে দেশত্যাগে বাধ্য করেন, তা অভাবিত। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এনরিলে এবং ভাইস চীফ অব স্টাফ রামোস তাঁকে সমর্থন করলেও হাজার হাজার লোক কোরাজনের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। আমেরিকায় শিক্ষিতা পাঁচ সস্তানের জননী কোরাজন এই ৫৪ বছর বয়সে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি একের পর এক বিদ্রোহ দমনে ইস্পাত-দৃঢ় ও একরোখা মনোভাবের স্বাক্ষর রাখছেন।

চিয়াঙ চিঙ 

চীনের গ্যাঙ অব ফোর-এর চিয়াঙ চিঙ (জিয়াঙ কিঙ) মাও সে তুঙ-এর পত্মী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাত। চলচ্চিত্র অভিনেত্রী হিসেবে জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি রাজনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩৭ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিসিপি) যোগ দেন এবং ১৯৫০ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রী হন। ১৯৬৫-৬৯ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লবে শীর্ষস্থানীয় মাওবাদী কার্যক্রমে প্রচারণায় অংশ নেন। ১৯৬৯ সালে পলিটব্যুরোর নবম জেনারেল কমিটি এবং ১৯৭৩ সালে পলিটব্যুরোর দশম জেনারেল কমিটির সদস্য হন। ১৯৭৬ সালে 'গ্যাঙ অব ফোর' এর সদস্য হিসেবে গ্রেফতার হন। ১৯৭৭ সালের জুলাইতে সিসিপি থেকে বহিষ্কৃত, ১৯৮০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত মামলায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু পরে ১৯৮৩ সালের জানুয়ারীতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। 

ইভা পেরণ

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট (১৯৪৬-৫০) জুয়ান দোমিনগো পেরণের প্রথম স্ত্রী ইভা মারিয়া দুয়ার্তে ডি পেরণ। প্রথম জীবনে একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ইভা তার অপরিমেয় কর্মক্ষমতা ও উচ্চাকাঙ্খার দরুন রাজনৈতিক ময়দানেও সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। 

বিংশ শতাব্দীর লাতিন আমেরিকায় সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক নেতা জুয়ার পেরণকে বন্দী করা হলে ইভা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি শ্রমিক ইউনিয়নকে চমৎকার কুশলতায় সংগঠিত করে সমগ্র বুয়েন্স আয়ারের্সে র ্যালির আয়োজন করে ১৯৪৫ সালের ১৭ই অক্টোবর জুয়ান পেরণকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনেন। এর কয়েক দিন পর প্ররণ সুদরী ও আকর্ষণীয়া ২৬ বছর বয়স্কা ইভাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি ইভা সামাজিক কার্যক্রমেও যথেষ্ট অবদান রাখেন। ইভা পেরণ মাত্র ৩৩ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ক্যান্সারে মারা যান।

বেনজির ভুট্টো 

"আমার ভাই ও বোনেরা জেনে রাখুন, এই মৃত্যু উপত্যকায় আমি প্রবেশ করেছি সম্পূর্ণ সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায়। ঘাতকরা যখন আমার বাবা আপনাদের প্রিয় নেতা, শহীদ জুলফিকার আলী ভুট্টোকে বধ্যভূমিতে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তাঁর জীবনের সেই অন্তিমতম লগ্নে, তাঁরই ব্রত অবলম্বন করে আমি আমি বাঁচবো এবং মরবো। এই মুহূর্তে সেই ব্রতই আমি উদযাপন করছি। জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে আজ আর কোনও ফারাক নেই।" 

এই ব্রত নিয়েই উপমহাদেশের সবচেয়ে আলোচিতা বেনজির ভুট্টোর রাজনীতিতে প্রবেশ। আট বছর আগে বাবার অসহায় বধ্যভূমিতে এবং ভাই শাহ নেওয়াজের বিদেশে আকস্মিকভাবে মৃত্যু বেনজিরকে হঠাৎ জীবনের চেয়েও বড় করে দিল। পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষোভ ও বিদ্রোহ এসে শক্ত করে দিল, বেনজিরের রাজনৈতিক মঞ্চকে। ভারতীয় একটি পত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে আরো বলা হয় যে, কি তাঁর যাদু! যাতে কেঁপে য্য় পাকিস্তান। পাকিস্তানের এ যাবৎ সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক শাসন। এই সম্মোহন কেন? বেনজির ভুট্টো অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় ছাত্র সংসদের সভানেত্রী ছিলেন। সে সময় তাঁর ভূমিকা যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করে। অবশ্য মাত্র ১৬ বছর বয়সে রাজনীতির সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে।

পাকিস্তানে সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বেনজিরকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দীর্ঘ দিন তিনি গৃহবন্দী ছিলেন। ১৯৮৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে জোরদার করতে গিয়ে তিনি অগ্রগামী ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান হিসেবে জিয়াউল হকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে তীব্রতর করে তুলেছেন ।



নূসরত ভুট্টো 

সাবেক ফার্স্ট লেডি নুসরত ভুট্টো স্বামীর মৃত্যুর পর পাকিস্তানী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান হলেও ৫৩ বছর বয়স্কা নুসরত ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার কারণে পার্টির দায়িত্ব কন্যার হাতে বুঝিয়ে দেন। ১৯৮৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনে নুসরত যথেষ্ট অবদান রাখেন।

মেনেকা গান্ধী 

শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে মান-অভিমান করে মেনেকা আনন্দ গান্ধী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। পাঞ্জাবের মেয়ে, সাবেক বিউটি কুইনের সাথে ১৯৭৪ সালে ইন্দিরার কনিষ্ঠ সন্তান সঞ্জয় গান্ধীর বিয়ে হয়। ১৯৮০ সালে সঞ্জয় বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর বিধবা মেনেকার সাথে শাশুড়ির মনোমালিন্য শুরু হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে তিনি লক্ষৌ কনভেনশনে যোগ দেন এবং ১৯৮৩ সালে রাজনৈতিক দল 'রাষ্ট্রীয় সঞ্জয় মঞ্চ' প্রতিষ্ঠা করেন। ৩১ বছর বয়স্কা মেনেকা গান্ধী বর্তমানে রাজনীতির অঙ্গনে তেমন একটা সরব নন।

শেখ হাসিনা

বিশ্ব মহিলা রাজনীতিবিদের পাশাপাশি বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিবিদদের পদচারণা দীপ্তোজ্জ্বল। উপরন্তু বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিবিদের সংখ্যা অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। সরকার বিরোধী তাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রথম সারিতে তাদের অবস্থান। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পরিবার পরিজনসহ নিহত হন। সেই মৃত্যু সমস্ত জীবনকে শেষ করে দেয়নি। বরঞ্চ মাটি ফুঁড়ে তা বের করে দিয়েছে শেখ হাসিনাকে। অবশ্য ছাত্রী জীবনেই শেখ হাসিনা রাজনৈতিক দীক্ষা পান। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাবস্থায় তিনি ছাত্রী সংসদের নির্বাচনে সহ-সভানেত্রী হন। এর পর পিতার বিশাল রাজনৈতিক জীবনের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠায় রাজনীতির সাথে তাঁর নিবিড়তা গড়ে ওঠে। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এবং পরে ১৫ দলের নেত্রী মনোনীত হন। তারপর থেকে সরকার বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন, ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরও তিনি তিনটি আসনে জয়ী হন। তিনি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। 

খালেদা জিয়া

১৯৮১ সালের ৩০শে মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে জন্ম হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার। এককালের বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান এবং পরে ৭ দলের নেত্রী মনোনীত হয়ে খালেদা সরকার বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশের মহিলা রাজনীতিতে সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, আইভী রহমান প্রমুখ দীর্ঘ দিন যাবৎ প্রভাব বিস্তার করে আছেন।

আর সকল ক্ষেত্রের মত রাজনীতিতেও পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারা ক্রমশঃ এগিয়ে আসছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা পুরুষদের স্নান করে দিয়ে স্বীয় প্রতি ভাকে উজ্জ্বল করে তুলছেন।

১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৮৭

বিশ্বশান্তিঃ দুই পরাশক্তির দর-কষাকষি



আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট এখন অনেকটাই বদলে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যেকার রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে সৃষ্ট স্নায়ুযুদ্ধের সেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এখন আর তেমনভাবে দৃশ্যমান নয়। অথচ এই দুই পরাশক্তির আধিপত্য নিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিদ্যমান ছিল, তার জন্য কত না খেসারত দিতে হয়েছে। সঙ্গত কারণেই শান্তিপ্রিয়দের কাছে বিশ্বশান্তি ছিল প্রার্থিত। সেই আলোকে ১৯৮৭ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর লিখেছিলাম, 'বিশ্বশান্তিঃ দুই পরাশক্তির দর-কষাকষি'।


শুক্রবার, ৮ অক্টোবর, ২০২১

আনাহিতা




আমার খুবই ইচ্ছে ছিল মেয়ের বাবা হওয়ার। এ ব্যাপারে মৌন সম্মতি ছিল শাঙনির। আমার সন্তানের জননী হতে তার আপত্তি ছিল বলে কখনও মনে হয় নি। বরং এক ধরনের প্রশ্রয় ছিল। এমনকি আমরা দুজনের মেয়ের নামও ঠিক করে রাখি। খুবই আনকমন নাম। আনাহিতা। আনাহিতা ছিলেন প্রাচীন পারস্যের উর্বরতা, নিরাময় ও জ্ঞানের দেবী। শাঙনির জ্ঞানবুদ্ধি যথেষ্ট শাণিত। বিদেশি বই-পুস্তক পড়ার কারণে তার জানাশোনার পরিধি অনেক বেশি। যে কারণে এমন একটি সুন্দর নাম সে খুঁজে বের করতে পেরেছে। নামটি আমার দারুণ পছন্দ হয়। 

আমি স্বপ্ন দেখতে থাকি অনাগত কন্যাকে নিয়ে। কবে পৃথিবীতে আসবে, কীভাবে তাকে লালন-পালন করা হবে, সেটি হয়ে উঠে আমার সর্বক্ষণের ভাবনার বিষয়। আমি কি আমার সন্তানকে নিয়মিত দেখতে পারবো? কোলে নিয়ে আদর কি করতে পারবো? আমি যে তার পিতা, বড় হয়ে কন্যা কি তা জানতে পারবে? একটা দ্বিধা-দ্বন্ধ যে আমার ছিল, সেটা অস্বীকার করবো না। তবুও কন্যার পিতা হওয়ার জন্য আমি খুবই আকুলিত হই। 

তবে আমি যা করতে চাই, সাধারণত তা হয়ে উঠে না। হলেও সেটা মোটেও সাবলীলভাবে হয় না। কোথাও না কোথাও প্যাঁচ লেগে যায়। পদে পদে অনেক সমস্যা, সংকট ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। আর যেভাবে আমি কন্যার পিতা হতে চাইছি, সেটি তো মোটেও সহজ-সরল পথ নয়। অনেক জট আছে। আছে জটিলতাও। তারপরও আমি আশাহীন নই। এমন আশাবাদী হওয়ার কারণ শাঙনি। এমন খামখেয়ালি মেয়ে আমি অন্তত দ্বিতীয়টি দেখে নি। কিছু করতে চাইলে তাকে আটকানো যায় না। একটা একগুয়েমি মনোভাব তার আছে। 

শাঙনির রাশি কুম্ভর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, স্বভাবত শান্ত ও ঠাণ্ডা প্রকৃতির। প্রচলিত মতামত অমান্য করে আনন্দ পায়। অধিকতর গতানুগতিক মানুষগুলোর সঙ্গে হঠাৎ করে আকস্মিক ও খাপছাড়া আচরণ করে চমকে দিতে পছন্দ করে। স্বাধীনতাপ্রিয় এই ইউরেনাস মানুষগুলো বস্তুত মজার, লম্পট গোছের, মৌলিক, অভিমানী ও আত্মনির্ভরশীল। অন্য কারও দিকে ঝুঁকে পড়বে। তার আগে আপনাকে বোঝাতে সক্ষম হবে যে, আপনিই তার কাছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। গুণের সমাবেশ না দেখে তারা বরং বন্ধুদের সংখ্যার দিকেই বেশি মনোযোগী। একটা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কোনো সম্পর্কেই তাদের স্থায়িত্ব থাকে না। 

এমন অভিমত আমার নয়। আমি কোনও জ্যোতিষী নই। এমন মন্তব্য পেয়েছি অনলাইনে। রাশি নিয়ে আমার কোনও আগ্রহ নেই। বিশ্বাস তো করিই না। তবে এ বিষয়ে একদম কৌতূহল যে নেই, তা বললে সত্যের অপলাপ হবে। রাশি নিয়ে শাঙনির তুমুল আগ্রহ আছে। কিছুটা চর্চাও করে। চর্চার জন্য তার গুরুও আছে। এই রাশি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ফেসবুকে শাঙনির সঙ্গে আমার যোগাযোগ। তারপর তো তা গড়ায় অনেক দূর। যেহেতু আমরা সন্তানের জন্ম দিতে চেয়েছি, তা থেকে অনুমান করা যায়, আমাদের সম্পর্কের গভীরতা। শাঙনি কিন্তু কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। আমি কন্যার বাবা হতে পারি নি।

বিশ্বাস না করলেও রাশির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে শাঙনির বেশ মিল খুঁজে পেয়েছি। এমন মিল হওয়ার কারণ হিসেবে আমার মনে হয়েছে, কেউ যদি কোনো বিষয় নিয়ে গভীরভাবে চর্চা করেন, তাহলে সে বিষয়ে তার একটা ভালো ধারণা হবেই। জ্যোতিষীরা মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ে চর্চা করার কারণে তাদের যে বুৎপত্তি হয়, তার সঙ্গে বিভিন্ন রাশির মানুষের অনেকটাই মিল পাওয়া মোটেও অস্বাভাবিক নয়। 

শাঙনির সঙ্গে মেহবুবের সম্পর্ক তার বিয়ের পর থেকেই। পারিবারিক বন্ধু হিসেবে তাদের বাসায় মেহবুবের অবাধ যাতায়াত। একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে মেহবুব যথেষ্ট প্রভাবশালী। খুবই বেপরোয়া টাইপের। কোনো কিছু পরোয়া করে না। একটি খুনের মামলার আসামি হিসেবে দেশ থেকে পালিয়ে বিদেশে চলে যায়। সেখানেই মেহবুবের সঙ্গে মেহফুজের পরিচয়। বয়সে মেহবুবের চেয়ে মেহফুজ দশ-বারো বছর বড় হবে। কিন্তু চিন্তা-ভাবনায় দুজনেই একই রাজনৈতিক ঘরানার অনুসারী হওয়ায় সম্পর্কটা ঘনিষ্ট হতে বেশি সময় লাগে নি। 

দীর্ঘ দিন বিদেশে বসবাস করে উভয়ই ফিরে আসে। দেশে ফিরে কোনো কিছুতেই সুবিধা করতে পারছিল না মেহফুজ। গাড়ি সম্পর্কে ভালো অভিজ্ঞতা থাকায় একটি গাড়ির শোরুমে কাজ নেয়। যথেষ্ট বয়স হয়ে যাওয়ায় পারিবারিকভাবে শাঙনির সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তার তুলনায় সামাজিক অবস্থান, লেখাপড়া, স্মার্টনেসের দিক দিয়ে ঢের ঢের এগিয়ে ছিল শাঙনি। বড় চাকরি করলেও তার পিতা মন-মেজাজে খুবই রক্ষণশীল। এমন মনোভাবের কারণে শ্মশ্রুমণ্ডিত মেহফুজকে তার পরহেজগার মনে হয়। এ কারণে বিয়ের পাত্র হিসেবে তাকে সহজেই লুফে নেন। শ্মশ্রুমণ্ডিত হওয়াটাই তার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। 

একমাত্র কন্যার ইচ্ছে-অনিচ্ছার কোনও মূল্য দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন নি। অনিচ্ছুক শাঙনিকে একরকম জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে দেন। বিয়ে করতে বাধ্য হলেও ভিতরে ভিতরে একটা বিদ্রোহী মনোভাব পোষণ করতে থাকে শাঙনি। সেটা অপ্রকাশিতই থেকে যায়। এ বিয়ের অনুষ্ঠানে পাত্রপক্ষ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মেহবুব। তখন থেকেই শাঙনির ওপর চোখে পড়ে যায় তার। অনেকটা কাছাকাছি বয়সের শাঙনির সঙ্গে গড়ে উঠে হৃদ্যতা। 

মেহবুবের পরিবারও অবস্থাপন্ন। যে কোনো প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে বাড়িয়ে দেয় সহযোগিতার হাত। তার ওপর এক ধরনের নির্ভরশীলতা গড়ে উঠে মেহফুজের। এ সুযোগে শাঙনির সঙ্গে মেলামেশায় তার কোনো বাধা থাকে না। একটা পর্যায়ে মেহবুবের দাপটের কাছে একরকম নতজানু হয়ে থাকে মেহফুজ। তার সব কথাকে বেদবাক্য হিসেবে নেয়। 

লেখাপড়ায় দড় না হলেও কূটবুদ্ধিতে মেহবুব খুব ঝানু। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আর্থিকভাবেও নিজেকে আরো গুছিয়ে নিতে সক্ষম হয়। অর্থ-বিত্ত-গাড়ি থাকলে সব কিছুই সুলভ হয়ে যায়। মন যা চায়, তা অনায়াসেই করার সুবিধা পাওয়া যায়। সেই সুযোগটা পুরোপুরিভাবে সে কাজে লাগিয়েছে। ইতোমধ্যে শাঙনি ভূমিষ্ট করে একটি কন্যা সন্তান। মেহবুবও বিয়ে করে দুই সন্তানের জনক হয়। কিন্তু শাঙনির প্রতি তার আকর্ষণ কখনও থিতিয়ে যায় না। 

এমনিতেই শাঙনির তেমন পছন্দের পাত্র ছিল না মেহফুজ। পারিবারিক কারণে বিয়ে করতে হয়। তদুপরি তার কোনো কোনো আচরণ দুজনের মধ্যে ক্রমান্বয়ে একটি দূরত্ব তৈরি করে দেয়। সে স্থানটি সহজেই দখল করে নেয় মেহবুব। চাপাচাপির সংসারে হাঁপিয়ে উঠা শাঙনিকে স্বস্তির নিশ্বাস এনে দেয় মেহবুব। তার প্রাইভেট কারে নানান জায়গায় ঘোরাঘুরি করে। মেহফুজ যখন মেহবুবকে অনেক বেশি প্রশ্রয় দিতে শুরু করে, এ সুযোগে শাঙনিকে মেহবুব নিজের সম্পদ মনে করতে থাকে, সেটা শাঙনির কাছে বিরক্তিকর হয়ে ওঠে। 

চাপিয়ে দেওয়া কোনো কিছু সে মেনে নিতে পারে না। গতানুগতিকতাও তার পছন্দ নয়। একটু গোপনতা, একটু রহস্যময়তা, একটু প্রহেলিকা না থাকলে তার কাছে জীবনটাকে আলুনি আলুনি মনে হয়। যে কারণে মেহবুবের সঙ্গেও তার একটা ব্যবধান গড়ে ওঠে। একটা পর্যায়ে শাঙনির জগত ক্রমশ ছোট হয়ে আসতে থাকে। তখন দুনিয়াব্যাপী বাড়তে থাকে ভার্চুয়াল জগতের পরিধি। তার ফাঁদে ক্রমান্বয়ে ধরা দিতে থাকেন দুনিয়ার গরিষ্ঠ মানুষ। তাতে সবার জগতটা অনেক বিশাল হয়ে যায়। বদলে দিতে থাকে জীবনধারা। 

পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে সন্তানের জননী হওয়ার পর শাঙনির ছটফটে স্বভাবটা হ্রাস পেতে থাকে। অধিকাংশ সময় ঘরে থাকতে থাকতে এক ধরনের বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় খুঁজতে থাকে। সে সময় মুক্তি পাওয়ার জন্য স্মরণাপন্ন হয় কম্পিউটারের। এর মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে ওড়তে থাকে সীমাহীন অন্তরীক্ষে। কখনও গুগল মেসেঞ্জার, কখনও ফেসবুক, কখনও বিভিন্ন নেটওয়ার্কের ডানায় ভর দিয়ে আপন হয়ে উঠে নেটিজেনদের। 

এ সময়ই শাঙনির সঙ্গে সম্পর্ক হয় আমার। আমিও দুই পুত্রের জনক। একটি কন্যার জন্য আমার ব্যাকুলতা থাকলেও সেটা আর হয়ে উঠে নি। সংসারটা তো আর শান্ত কোনো নদী নয়। তার ভাঙাগড়া আছে। নানান কারণে আমার কাছে একঘেয়ে ও ক্লান্তিকর লাগতে থাকে। নেটে নেটে শাঙনি আমার হৃদয়ে দাগ কাটে। তার কাছাকাছি হতে খুব বেশি সময় লাগে নি। কোনো সম্পর্কই তো সাবলীল গতিতে বয়ে যায় না। তাতে উত্থান থাকে। পতন থাকে। সেটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। 

ঘটনাচক্রে আমার স্ত্রী শাঙনির বিষয়টি জেনে যাওয়ায় পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। এমন অবস্থার মধ্যে দিয়েই দুজন ঘনিষ্টতর হয়ে ওঠি। সম্পর্ক গভীরতর হওয়ার পর আমার চাওয়া অনুযায়ী আমরা আনাহিতাকে পৃথিবীতে আনার জন্য একমত হই। এ সম্পর্কটা জেনে যায় মেহবুবও। একদিন শাঙনি আর আমাকে একসঙ্গে দেখতে পায়। তার তো অফুরন্ত সময়। নেটওয়ার্কও বিস্তর। সে আমার সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেয়। 

একদিন হুট করে সহকর্মী রাজন আমার কাছে জানতে চায়, আপনি কি মোহাম্মদপুরের মেহবুবকে চেনেন? আমি না চেনার কথা জানালে সে বলে, মেহবুব তো আপনাকে ভালোভাবে চেনে। আপনার সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইলো। আমি বুঝতে পারি, আমার সামাজিক অবস্থান মাপতে চাইছে মেহবুব। সে তো রাজনীতির ঝানু কর্মী। হিসেব করে দেখে, বিদ্যমান অবস্থায় আমাকে কিছু করা তার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তার অনকূলেও নয়। এমনিতে চাপের মুখে আছে। আমার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবে না মনে করে তখন সে শাঙনির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। 

মেহফুজকেও আমার বিষয়টি জানিয়ে দেয়। কীভাবে যেন আমার ফোন নম্বর পেয়ে আমাকে ফোন করে মেহফুজ অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে বলে, ‘খানকির পোলা, ভালো হয়ে যা। না হলে তোর খবর আসে।’ আমি কোনো প্রতিত্তোর না দিয়ে সব কথা নিঃশব্দে শুনে যাই। দুজনের তীব্র চাপের কারণে শাঙনি পেরে উঠছিল না। ক্রমান্বয়ে আমার কাছ থেকে সরে যেতে থাকে। একটা পর্যায়ে আমাদের আর যোগাযোগ থাকে না। এমনকি সামাজিক মাধ্যমেও সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। 

অনেক বছর পর একদিন রাস্তায় শাঙনির সঙ্গে আমার হঠাৎ দেখা হয়ে যায়। রিক্সায় কোথাও যাচ্ছিল শাঙনি। হেঁটে আসছিলাম আমি। আমাকে দেখে রিক্সা থামায়। দেখতে পাই, বেশ উঁচু হয়ে আছে তার পেট। বুঝতে অসুবিধা হয় না খুব সহসাই আবারো সন্তানের জননী হতে যাচ্ছে শাঙনি। কিছুটা ম্লান ও বিষণ্ন মনে হয় তাকে। শুধু বললো, আমি এখন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। আজ অফিসে সাপ্তাহিক মিটিং আছে। হাতে একদমই সময় নেই। সময়মতো পৌঁছাতে হবে। তাই তোমার সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। পারলে ফোন করো। আর শোনো, আগের নাম্বারে ফোন দিও না। আমি বললাম, কেন? সে বললো, এ নাম্বারে ফোন করলে মেহবুব টের পেয়ে যাবে। নতুন একটি নাম্বার দিয়ে বললো, এটি অফিসের নাম্বার। এ নাম্বারে যোগাযোগ করো। আমি কিছু বুঝতে না পেরে তার দিকে অবুঝের মতো তাকিয়ে থাকি। 

তখন চলতে শুরু করেছে তার রিক্সা। আমি চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খেতে থাকি। অনেক কথা আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। শাঙনি কি তাহলে মেহবুবকে বিয়ে করেছে? স্বামী হিসেবে কি মাহবুব তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়? না হলে সে কেন শাঙনির ফোনে আঁড়ি পাতে? তাকে কেন ভয় পায় শাঙনি? কোনো কিছুর কূলকিনারা করতে পারি না আমি। ফোন করবো কি করবো না ভেবে সন্ধ্যার দিকে শাঙনিকে তার দেওয়া নাম্বারে ফোন করি। 

ফোন রিসিভ করে শাঙনি বলে, একটু পরে করো। কিছুক্ষণ পর ফোন করার পর শাঙনি বললো, মেহফুজ বাসায় ছিল। তোমার সঙ্গে কথা বলবো বলে তাকে বাজারে পাঠালাম। বুঝলাম, মেহফুজ এখন তার ইচ্ছের পুতুল। আমি বললাম, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। তুমি এখন কার নিয়ন্ত্রণে আছো? শাঙনি বললো, এর মধ্যে অনেক কিছু ঘটেছে। এই অল্প সময়ে তোমাকে সব বলা সম্ভব নয়। মেহফুজ স্বামী হিসেবে যথারীতি আমার সঙ্গেই আছে। সে এখন কিছু করে না। অলিখিতভাবে আমাকে মেহবুবের নিয়ন্ত্রণে থাকতে হয়। 

তোমার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি জেনে যাওয়ার পর থেকেই আমার ওপর সে নজরদারি করে। তাতে আমি কোনো মাইন্ড করি না। বোধহয় গভীরভাবে ভালোবাসে বলেই এমনটি করে। মেহফুজের তো কোনো সামর্থ্য নেই। এমনিতেও তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্কও নেই। শুধু একই ছাদের নিচে থাকি। আমাকে কানায় কানায় ভরিয়ে দিতে কার্পণ্য করে না মেহবুব। সে না থাকলে আমার জীবনটা প্রাণহীন হয়ে যেত। তবে তুমি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছো, এটা জানতে পারলে পরিণতি ভয়াবহ হবে। মেহবুবের ক্ষমতা অনেক। এমনকি খুন করতেও পিছপা হবে না। তুমি সাবধানে থেকো। একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলে যায় শাঙনি। 

কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে এক পর্যায়ে আমি জানতে চাইলাম, তোমার পেটে এখন কার সন্তান? শাঙনি একটুখানি হাসি দিয়ে বলে, সেটা তুমি বুঝে নেও। আর কিছু জানতে না চেয়ে আমি বলি, তোমার কাছে একটা অনুরোধ, তোমার সন্তান যদি মেয়ে হয়, তার নাম অন্তত আনাহিতা রেখো না। শাঙনি বলে, কেন রাখবো না? এ নাম তো আমার। আমার ভালোবাসার নাম। আমি বলি, তুমি রাখলেও আনাহিতার পিতা তো আমার হওয়ার কথা ছিল। এ কথায় নিরুত্তর থাকে শাঙনি। তার মৌনতাকে সম্মতি হিসেবেই ধরে নেই। কন্যার পিতা না হলেও এ নামটি আমার অপ্রাপ্তির স্মৃতির স্মারক হয়ে থাকবে। এটাই ছিল আমার সান্ত্বনা। 

এরপর আর তার সঙ্গে আমার আর কখনও যোগাযোগ হয় নি। যদিও আমরা একে অপরের ফ্রেন্ড নই, তবুও ফেসবুকে দেখতে পেয়েছি, শাঙনি দ্বিতীয় একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছে। নাম রেখেছে আনাহিতা।