পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৬

মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে

ষড়ঋতুর এই দেশে প্রকৃতির রঙ বদলে গেলে বুঝতে পারা যায়- এসেছে নতুন ঋতু। প্রতিটি ঋতুরই আছে আলাদা রঙ, আলাদা বৈচিত্র্য, আলাদা মেজাজ। তবে বসন্ত একদমই অন্যরকম। আকাশে হেসে ওঠে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী চাঁদ। চাঁদের হাসি বাঁধ ভাঙে, উছলে পড়ে আলো। যত দূরে চোখ যায় রোমান্টিক নীলের উচ্ছ্বলতা। সঙ্গে মাতাল করা সমীরণ। তার বেশ, ভূষণে বাহারি রঙের সাজ। মুখে হাসি, বুকে সুর। মনে ফাগুনের দোলা। চিরকালের বাউল। ঋতুরাজ বসন্ত এলে চারপাশের রঙই শুধু পাল্টে যায় না, পাল্টে যায় মানুষের মনও। যখন দখিনা বাতাস বইতে থাকে, ফুলের সুবাস নাকে লাগে আর পাখির সুরেলা কণ্ঠ কানে বাজতে থাকে, তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না, বসন্ত জাগ্রত দ্বারে। বুকের মধ্যে শীষ দিতে থাকে ভালোবাসার দুষ্টু কোকিল। শরীর-মনে বয়ে যায় সুখের শিহরণ। বসন্ত তো সুখের, আনন্দের, অনুভবের। বসন্ত আসে শীতের ঝরা পাতা আর রিক্ততাকে দূর করে। শীতের হুল ফোটানো কামড় সরিয়ে দিয়ে আনে এক ধরনের স্বস্তি। ফুলে ফুলে সেজে ওঠে চারপাশ। পাখিরা গান গায় আপন মনে। আনে উৎসবের বর্ণিল মেজাজ। সব বয়সী মানুষকে উজ্জীবিত করে তোলে। প্রকৃতি যখন রূপে, রঙে সেজে ওঠে, তখন সবচেয়ে আকর্ষণীয় মৌসুম এই বসন্ত। গাছে গাছে কচি পাতা। নবীন পাতায় প্রাণের ছোঁয়া। তার প্রকাশ ঘটে মৃদুমন্দ হাওয়া এসে দুলিয়ে দিতে থাকলে। বসন্তে নারীরা সাজে অলঙ্কারে, ফুলের মালায়, বর্ণিল কাপড়ে। তাদের বুকের মধ্যে ওড়ে সুখের প্রজাপতি।
বসন্তের নতুন সাজ, নতুন পরিচ্ছদ সবচেয়ে বেশি রাঙিয়ে দেয় কবি, গীতিকার ও শিল্পীদের হৃদয়। বসন্তকে নিয়ে কত কবিতা, কত গান! কাব্যের সুষমা আর সুরের ঝরনাধারায় প্লাবিত হয় মানুষের হৃদয়। বাংলায় বসন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শান্তিনিকেতনে রঙে, সুরে, নৃত্যে, স্তোত্রে বসন্তকে বরণ করে নেয়ার প্রথা চালু করেন এই চিরপ্রেমিকবর। তখন থেকেই বাংলা ও বাঙালিদের কাছে বসন্ত হয়ে ওঠে উৎসব। নাগরিক জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ সর্বজনীন বসন্ত উৎসব। রবীন্দ্র সঙ্গীত, গীতিনাট্য বসন্ত উৎসবকে দিয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা। বসন্ত এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎসব। তাতে প্রাণে প্রাণ যোগ করে প্রকৃতি ও মানুষ। সহজাতভাবে পরিস্ফুটিত হয় ফুল, পাখি, নারী। সুরে, ছন্দে, আনন্দের রিনিক-ঝিনিক মাদল বাজায় বসন্ত।
 
বসন্তের রঙ বোধহয় হলুদ। তার সঙ্গে আছে লাল ও কমলার নিবিড় বন্ধন। শিমুল, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসার আবীর। আর আম গাছে মুকুল। জানিয়ে দেয়- মধুর বসন্ত এসেছে মধুর মিলন ঘটাতে। এসো, মিলি প্রাণের উৎসবে। বসন্তকে বরণ করে নেয়ার জন্য এখন চলে নানা প্রস্তুতি, নানা আয়োজন। মাঘের শীত ঘুম পাড়িয়ে রাখলেও ফাল্গুনের প্রথম দিনের ভোরে ঘরের বাইরে পা দিলে বাসন্তী হাওয়া এসে দুলিয়ে দিয়ে যায় হৃদয়, আহা আজি এ বসন্তে/কত ফুল ফোটে/কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায় গান...। চারপাশে বাসন্তী রঙের ছড়াছড়ি। অপরূপ সাজে নর-নারীরা। মেয়েদের পরনে বাসন্তী রঙের শাড়ি। কপালে লাল টিপ। ম্যাচিং করে হাতভর্তি কাঁচের চুড়ি, গলায় পুঁতির মালা। চোখে, ঠোঁটে, মুখে, এমনকি হাতের ব্যাগেও রঙের প্রলেপ। হারিয়ে যেতে বসা খোপায় বা বিনুনিতে গাঁদা ফুলের মালা। খোপা না থাকলে দু’একটি গোলাপ বা বেলী গুঁজে দেয়া হয় চুলে। আজকাল তো ফুলেরও নানা বাহার। তাজা কিংবা শুকনো দেশী ও বিদেশী কত না ফুল! কিশোরী, তরুণীরা তো এমনিতে ফুটে থাকে ফুল হয়ে, তাদের সঙ্গে সব বয়সী নারীই হয়ে ওঠেন এক ঝলক হলুদ গাঁদা ফুল। একদম বাসন্তী সাজে সাজা সম্ভব না হলে হলুদের কাছাকাছি বসন কিংবা শরীরের কোথাও না কোথাও একটুকরো হলুদ নিশানা থাকেই। সে শাড়ি হোক কিংবা সালোয়ার-কামিজ। হালে বাঙালিরা ফ্যাশন সচেতন হয়ে ওঠায় বসন্তের পোশাক-আশাকে লেগেছে নানা নকশা ও অলপনার বাহার। কারো কারো হাতে থাকে ফুল। সে সঙ্গে লেগে থাকে মুখভর্তি বাঁধনহারা হাসি। ছেলেরাও এখন আর পিছিয়ে নেই। তাদের পরনে থাকে নানা রঙের পাঞ্জাবী ও ফতুয়া। কেউ কেউ হাতে জড়িয়ে নেন বেলী কিংবা গাঁদা ফুলের মালা। বসন্ত সত্যি সত্যিই মনটা রাঙিয়ে দিয়ে যায়, বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় ভালোবাসার পরশ।
শহর এলাকায় পাখির কূজন শোনা বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। তাই পাখি দেখতে অনেকেই ছুটে যান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা পাখি ডাকা কোনো গ্রামে। বিস্ময়কর হলেও বসন্ত এলে কোলাহলমুখর এই ঢাকা শহরেও হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায় কোকিলের কুহুতান। ইস্কাটন গার্ডেন, রমনা পার্ক, বোটনিক্যাল গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কোনো কোনো বৃক্ষশোভিত এলাকায় ফাগুনে জানান দেয় তাদের অস্তিত্ব। দেহ-মনে যৌবন এলে যেমন তা লুকিয়ে রাখা যায় না, ফাগুন এলে কোকিলের পক্ষে আড়ালে থাকা সম্ভব হয়ে ওঠে না।
বাঙালির বসন্তে যোগ হয়েছে একুশ। এই ফাগুন মাসে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে বাঙালি। থোকা থোকা ফুল হয়ে ফুটে আছেন রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার, বরকত। সেই বায়ান্ন থেকে প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসে রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি। ফাল্গুন তাই শোককে শক্তিতে পরিণত করার মাসও। বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী অমর শহীদদের প্রতি বিনীত ও চেতনার অগ্নিমশালকে প্রজ্বলিত করার জন্য আসে ফাল্গুন। একুশের অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলা। স্বাধীনতার পর প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আয়োজিত গ্রন্থমেলা বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠেছে। এ মেলায় পাওয়া যায় সৃষ্টিশীলতার স্পন্দন। শুধু বইমেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের যে ঢল নামে এবং তাতে পাওয়া যায় যে প্রাণের ছোঁয়া, এর সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে একুশের চেতনা, তেমনিভাবে আছে বসন্তের উতাল হাওয়ায় ঘর থেকে বের হওয়ার আমন্ত্রণবার্তাও।
সাম্প্রতিক সময়ে বসন্তে সংযোজন ঘটেছে ভালোবাসা দিবস। বসন্তকালে হওয়ায় বাঙালি লুফে নিয়েছে এ দিনটিকেও। মন কেমন করা ঝিরিঝিরি উদাসী হাওয়া, পাখ-পাখালির কুঞ্জন, হাজারো রঙয়ের খেলা নিয়ে প্রকৃতির যে আনন্দভোজ, তাতে ভালোবাসা থাকবে না, তা কী করে হয়? ‘ভ্যালেনটাইন্স ডে’ না থাকলেও বসন্ত তো ভালোবাসারই দিবস। এখন হয়তো তার সঙ্গে যোগ হয়েছে লাল শাড়ি, গোলাপ, বই, কার্ড, শোপিস, গয়না, মগ, চকলেট, গানের সিডি কিংবা ডিভিডি। হৃদয় বিনিময়ের এসব উপকরণ না থাকলেও বসন্ত এলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বুকের মধ্যে উথলে ওঠে ভালোবাসার রঙধনু। বসন্ত তো ভালোবাসারই ঋতু।   

সৃষ্টিশীল একজন মানুষের নীরব প্রস্থান

আগস্ট এলেই বুকটা বড্ড কেঁপে ওঠে। বড় নিষ্ঠুর এই মাস। কাকে কখন ছিনিয়ে নেবে, সেই আতঙ্কে থাকতে হয়। নেয় এমন সব ব্যক্তিত্বকে, যারা আমাদের দেখান আলোর পথ। তেমনি একজন ব্যক্তিত্ব চলচ্চিত্রকার আখতারুজ্জামান। ২৩ আগস্ট অনেকটা নীরবে, নিভৃতে চলে গেলেন সৃষ্টির নেশায় মশগুল থাকা এই মানুষটি। তেমনভাবে আলোচিত নন, তবে আলোকিত একজন মানুষ। তাকে যারা চেনেন কিংবা তার কাজের সঙ্গে যারা পরিচিত, তারা জানেন, শিল্পের প্রতি তার ছিল কী প্রগাঢ় আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও ভালোবাসা। আত্মমগ্ন ও অভিমানী এই মানুষটি কখনোই প্রচারের আলোয় থাকেননি। কত কত জনকে পৌঁছে দিয়েছেন খ্যাতির সিংহাসনে, আর দূর থেকে তা দেখে মিটি মিটি হেসেছেন। নিজে কখনো সিংহাসনে বসতে চাননি। আত্মমর্যাদাশীল এই মানুষটি অনেক সুযোগ থাকার পরও কখনোই কারো কাছে করুণা চাননি। তেমনটি করলে তিনি হতে পারতেন আলোচিত ও ঐশ্বর্যম-িত। যতটুকু করেছেন, সবটাই নিজের যোগ্যতা আর সামর্থ্য দিয়ে। যতটা করেছেন, তারচেয়ে অনেক বেশি করার স্বপ্ন নিয়ে ছটফট করতেন। সেটা করতে না পারার অসহায়তা তাকে অস্থির করে রাখতো।
বাংলার বাণী ভবন থেকে প্রকাশিত হত ‘সাপ্তাহিক সিনেমা’। চলচ্চিত্র বিষয়ক এ পত্রিকাটি নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮৫ সালে পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হয়ে আসেন আখতারুজ্জামান। ‘সাপ্তাহিক চিত্রালী‘র সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তখন তার বেশ সুখ্যাতি। তার নেতৃত্বে শুরু হয় ‘সিনেমা’ পত্রিকার নবযাত্রা। সেই নবযাত্রার তার সঙ্গে ছিলেন ফাল্গুনী হামিদ, শামীম আলম দীপেন, শাহনেওয়াজ করিম, মুজতবা সৌদ, গুলজার, খান আখতার হোসেন, অশোক দত্ত, মৃদুল সাহা। ১৯৮৭ সালে কর্মরত ছিলাম ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকায়। এরশাদ সরকার রাজনৈতিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়। আমরা সবাই হঠাৎ বেকার হয়ে যাই। ‘বাংলার বাণী’তে কর্মরত আমরা কেউ কেউ ‘সিনেমা’ পত্রিকাটির সঙ্গে সম্পৃত্ত হই। সে সময় তাকে কাছ থেকে দেখার ও জানার কিছুটা সুযোগ হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি যখন ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকায় যোগ দেন, তখন তাকে পাই আরো কাছে। একটু একটু করে চিনতে পারি আত্মকেন্দ্রিক ও লাজুক স্বভাবের এই মানুষটিকে। একজন উদ্যমী, সৃষ্টিশীল, মেধাবী ও প্রাণোচ্ছ্বল মানুষ বলতে যেমনটি বোঝায়, তিনি ছিলেন তেমনই। আপনভোলা, আনমনা এই মানুষটিকে মগ্নচৈতন্যে কী যেন শিস্ দিয়ে যেত। কাজ করতে করতে হঠাৎ কোথায় যেন ডুব দিতেন। হয়ে যেতেন অন্য এক জগতের বাসিন্দা। তার মিষ্টি হাসিটি যে কারোই মন জয় করে নিত। বুকের মধ্যে বসবাস করতো একজন রোমান্টিক প্রেমিক পুরুষ। কাজপাগল এই মানুষটিকে খুঁজে পাওয়া যেত তার কাজে, কর্মে, সৃষ্টিশীলতায়। সব সময় বিভোর থাকতেন সৃষ্টির আনন্দে। পত্রিকার মেক-আপ, গেট-আপ বর্ণিল করার ব্যাপারে তার জুড়ি মেলা ছিল ভার। চলচ্চিত্র সাংবাদিক হয়েও চটকদার কোনো কিছুতেই বিশ্বাসী ছিলেন না। গসিপ দিয়ে পত্রিকার কাটতি বাড়ানোর পক্ষপাতি ছিলেন না। ছিলেন না বলেই চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবাই তাকে সমীহ করতেন। আপন ভাবতেন। অনেকেই ছুটে আসতেন তার পরামর্শ ও সহযোগিতার জন্য। তার সঙ্গে যারা মিশেছেন, তাকে যারা দেখেছেন, তাকে ভালো না বেসে পারেননি। নিখাদ একজন আত্মভোলা মানুষ ছিলেন তিনি। কোনো আত্মঅহমিকা ছিল না। তিনি ছিলেন নির্ভেজাল ও নির্বিরোধী।
১৯৪৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরসিংদীতে আখতারুজ্জামানের জন্ম। সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন বিভিন্ন পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল তার একটা ভালোবাসার টান। এ কারণেই চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরনো পত্রিকা ‘চিত্রাকাশ’ দিয়ে তার হাতেখড়ি হয় ১৯৬৬ সালে। এরপর কাজ করেছেন  পিপল, নেশন, দৈনিক সংবাদ, সাপ্তাহিক চিত্রালী, সাপ্তাহিক সিনেমা, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায়। তবে চলচ্চিত্র সাংবাদিক হিসেবেই তার পরিচিতি। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস)-র সাধারণ সম্পাদক হন। লেখার হাতটি ছিল অসম্ভব মিষ্টি। যা লিখতেন তাতে পাওয়া যেত ভিন্ন রকমের আমেজ। চলচ্চিত্রের প্রতিই ছিল তার অনুরাগ ও আবেগ। এ ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। সাংবাদিকতার পাশাপাশি নতুন কিছু করার আশায় নির্মাণ করেছেন সিনেমা। ১৯৮৩ সালে বন্ধু সাংবাদিক রফিকুজ্জামানকে নিয়ে যৌথভাবে নির্মাণ করেন ‘ফেরারী বসন্ত’। এ ছবিটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের ছয়টি পুরস্কার পায়। পরের বছর এককভাবে পরিচালনা করেন ‘প্রিন্সেস টিনা খান’। এটি শ্রেষ্ঠ পরিচালকসহ বাচসাসের আটটি পুরস্কার লাভ করে। এরপর নির্মাণ করেন লেখক মঞ্জু সরকারের উপন্যাস ‘নগ্ন আগন্তুক’ অবলম্বনে ‘একাই এক শ’। কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ছবিটি আজও মুক্তির আলো দেখতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে তার জীবনের সেরা ছবি লেখিকা সেলিনা হোসেনের কাহিনী অবলম্বনে ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’। সরকারি অনুদানে নির্মিত হয় ছবিটি। কাহিনী বিন্যাসে গতিময়তা, সুঅভিনয় ও নির্মাণক্ষেত্রে সার্বিক নৈপুণ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমুদ্র তীরবর্তী মানুষের জীবনকে সঠিক ও পরিচ্ছন্নভাবে তুলে ধরার জন্য ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’ সেরা ছবি হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়। এছাড়া সেরা পরিচালক, সেরা কাহিনী ও সেরা চিত্রগ্রাহক বিভাগেও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায় এই ছবিটি। একইসঙ্গে পায় বাচসাসের ১০টি পুরস্কার। এত এত পুরস্কার পাওয়ার পরও চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য তিনি কারো আমন্ত্রণ পাননি। যে কারণে নিজেও আর সেভাবে তাগিদ অনুভব করেননি। কারো কাছে ধর্ণা দেওয়া তার স্বভাবের সঙ্গে যায় না। এ কারণে জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন মেধাবী চলচ্চিত্রকার হয়েও তাকে চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে নির্বাসনে থাকতে হয়। দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে সম্পর্ক না থাকলেও একদমই চুপচাপ বসে থাকেননি। বেশ কয়েকটি নাটক ও টেলিফিল্ম নির্মাণ করেছেন। জড়িয়েছেন শিক্ষকতার সঙ্গে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। চলচ্চিত্র নিয়ে তার স্বপ্ন ও কল্পনা চারিত করেছেন তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে। এ সময় তার সঙ্গে বেশ কয়েকবার দেখা হয়। যখনই দেখা হয়েছে দেখেছি, হাতে কোনো না কোনো বই। দারুণ পড়–য়া ছিলেন তিনি। জানা-শোনার পরিধি ছিল অনেক। প্রচলিত ছকের চলচ্চিত্র ধারার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না। সব সময় ভিন্নধর্মী কিছু করতে চাইতেন। চলচ্চিত্র তাত্ত্বিক হিসেবে তার একটা সুখ্যাতি ছিল। তার মুখে অহরহই শুনতাম আলফ্রেড হিচকক, সের্গেই আইনস্টেইন, চার্লি চ্যাপলিন, ফেদরিকো ফেলিনি, আকিরা কুরোসাওয়া, ইনগমার বার্গম্যান, জাঁ রেঁনোর মত দুনিয়া কাঁপানো চলচ্চিত্রকারদের নাম। তার সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ খ্যাত শেখ নিয়ামত আলী, ‘সুরুজ মিঞা’ খ্যাত কাজল আরেফিন, সুরকার শেখ সাদী খানের মত ব্যক্তিরা।
চলচ্চিত্র নির্মাণ থেকে দূরে থাকলেও তিনি কখনো থেমে থাকেননি। ভেতরে ভেতরে চলতে থাকে তার প্রস্তুতি। দীর্ঘ মানসিক প্রস্তুতির পর সরকারি অনুদান নিয়ে শুরু করেছিলেন ‘সূচনা রেখার দিকে‘। ছবিটির ৯০ ভাগ কাজ শেষ করেছিলেন। অসুস্থতার কারণে বাকিটা করতে পারেননি। ছবিটাই শুধু অসম্পূর্ণ রয়ে গেল না, সেসঙ্গে অসম্পূর্ণ থাকলো তার অনেক স্বপ্ন। আমরা হারালাম একজন স্বাপ্নিক ও সৃজনশীল মানুষকে।
(২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত।)

বুকের মধ্যে অনুরণিত হয় তাঁর কবিতা

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই। তারপরও কেন জানি বুকের মধ্যে একটা শূন্য শূন্য অনুভূতি হচ্ছে। সেটা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছি। কেন হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। আসলে শৈশব থেকে আমার চারপাশের যে জগত গড়ে ওঠেছে, তারমধ্যে আছেন তিনি। তাঁর নাম, তাঁর লেখা, তাঁর সৃষ্টিকর্ম হৃদয়ের গহিনে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁকে কখনো দূরের মনে হয়নি। তাঁর সব লেখাই যে আমি পড়েছি, তেমন দাবি করবো না। তবে উল্লেখযোগ্য বইগুলো পড়েছি, ছুঁয়েছি কিংবা নাম শুনেছি। ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ পড়ে তেমন একটি জীবনের স্বপ্ন দেখেছি। তাঁর লেখা কত কত কবিতা বুকের মধ্যে এনে দিয়েছে রোমান্টিক আমেজ। তাঁর জীবনের প্রকাশিত অনেক কাহিনীও তো জানা। বাউন্ডুলে, বেপরোয়া, বর্ণময় জীবন। জানতে পেরেছি কখনো তাঁর স্মৃতিচারণায়, কখনো তাঁর চেনা মানুষদের লেখায়। পত্রিকার পাতায় পড়েছি কিংবা টেলিভিশনেও দেখেছি। বাংলাদেশেও তো তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। এই মাটিরই সন্তান তিনি। সেটা কখনো ভুলতে পারেননি। তাঁর লেখায়ও এর প্রতিফলন দেখা যেত। বিশেষ করে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে তো জড়িয়ে আছে এই বাংলার মাটি ও মানুষ। সব মিলিয়ে তাঁকে পরিচিত গণ্ডির একজনই মনে হতো। শুধু তাই নয়, মনের মধ্যে একটা ছাপও ফেলে দিয়েছেন তিনি। চারপাশে কত জনকে চিনি, কত জনকে দেখি, তাদের ক’জনইবা মনে দাগ কাটেন কিংবা হৃদয়ে স্থায়ী আসন গাড়েন? তিনি তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সেটা পেরেছিলেন। এ কারণে তার সঙ্গে পরিচয় কিংবা দেখা-সাক্ষাৎ না থাকলেও তিনি আমার আপন বলয়েরই লোক হয়ে আছেন। এমন একজন মানুষ চলে গেলে কাছের কেউ চলে যাওয়ারই অনুভূতি হয়। সেটাই হচ্ছে। ছোট হয়ে গেল আমার জগতটাও। তাঁকে ছাড়া পূজা সংখ্যা কল্পনা করা যায় না। এই তো সেদিনও তাঁর লেখা পড়লাম। তাঁর আর নতুন লেখা পাবো না, ভাবতেই পারছি না। তবে তিনি চলে গেলেও আশে-পাশেই থাকবে তাঁর কালজয়ী সব গ্রন্থ। বুকের মধ্যে অনুরণিত হবে তাঁর কবিতা। সঙ্গত কারণে থাকবেন তিনিও।  

বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১৬

বনলতা সেনের বাড়িতে!

বনলতা সেনের জন্য আমার অপেক্ষা চিরকালের। সেই কবে যেন বুকের গভীরে ঠাঁই নিয়েছে রহস্যময়ী এই মানবী। তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। এবার যখন তার নিবাসে যাই, এখন তো আর তার দেখা পাওয়ার কথা নয়, তবুও কেন যেন সারাক্ষণই মনজুড়ে ছিলেন মোহময়ী এই নারী। ‘অন্ধকার বিদিশার নিশা’র মতো তার চুল আর ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-র মতো তার মুখ খুঁজেছি নিরন্তন। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, মানুষের মনে কত কিছু যে উদয় হয়, নাটোরের রাজবাড়ির সঙ্গে কোনোভাবে হয়তো তিনি সম্পৃত্ত ছিলেন। এমন মনে হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই, নাটোর যাওয়ার পর এ রকম খুব বেশি মনে হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশ কি কখনো নাটোরের রাজবাড়ি গিয়েছিলেন? সেখানে তাঁর সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল বনলতা সেনের? এ প্রশ্নটি মনের মধ্যে হরদম ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়তমা মানসীর জন্মস্থানে এবারই প্রথম পা দেওয়ার পর কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ আসলেই তো, কেন এত দিন পর এলাম?    
বগুড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের বাঁ পাশে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর থেকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দীঘাপতিয়া রাজবাড়ির সিংহদ্বার। কার্তিকের সকালেও ঝলসানো রোদ। রোদ একটু সইয়ে নেওয়ার পর ফটকের সাদা-হলুদ-লালচে রঙ, নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কেড়ে নেয়। চারতলা ফটকের কপালে টিপ হয়ে শোভাবর্ধন করছে পাথরের একটি ঘড়ি। ঘড়িটি এখনও সময় দিয়ে চলেছে। নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখলাম, একটুও হেরফের নেই। ঘড়িটি আনা হয় ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। ঘড়ির পাশে আছে একটি ঘণ্টা। একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি অনেক দূর থেকে শোনা যেত। এই তোরণে আছে প্রহরীদের থাকার সুব্যবস্থা। প্রবেশ দুয়ার দেখেই অনুধাবন করা যায় রাজপ্রাসাদের জেল্লা ও জৌলুশ।

নাটোরের রানি ভবানীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া দীঘাপতিয়া জমিদারীতে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন এ প্রাসাদ। বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে রাজত্ব। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই রাজবাড়ি অনেকটা ধসে পড়ে। এরপর প্রায় ৪২ একর জমির উপর এটি পুনঃনির্মাণ করেন রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায়। তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলেন রাজসিক বাগানবাড়ি। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিদেশি প্রকৌশলী, চিত্রশিল্পী আর দেশীয় মিস্ত্রিরা। সেই সময় তো বটেই, এই সময়েও তার নান্দনিক সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি। রাজবাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি। তবে তাতেও ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আচ্ছাদন। কেউ যাতে সহজে ভিতরে অনুপ্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। পাঁচিলের পাশে সারি সারি গাছ। এরপরই পুরো রাজবাড়ি এলাকা হ্রদ দিয়ে পরিবেষ্টিত। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজপ্রাসাদের ঢোকার মুখে রাস্তার দু’পাশে সুুউচ্চ পাম গাছের সারি। ডানে-বাঁয়ে পরিখা। তাতে টলমল করছে জল। ফুটে আছে পদ্মফুল।
ভিতরে ঢুকে সোজা পশ্চিম দিকে কিছুটা হাঁটার পর সবুজে ঘেরা প্রধান রাজবাড়ি। আছে রকমারি ফুলের বাহার। তারমাঝে নিশ্চল হয়ে আছে রাজা দয়ারামের আবক্ষ মূর্তি। মার্বেল পাথরের এই ভাস্কর্যটি সবাইকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য চুপচাপ বসে আছে। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ও সৌকর্যে প্রতিফলন ঘটে এর আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা। অলিন্দ ঘেরা একতলা বাড়ি। খোলামেলা। তিন দিকেই বারান্দা। তবে অনুমতি না থাকায় রাজবাড়ির একদম অন্দরমহলে যাওয়া যায় নি। তবে ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ভিতরটা কিছুটা হলেও দেখতে পাওয়া যায়। বড় একটি হল ঘর। এছাড়া আছে বেশ কয়েকটি কক্ষ। দামি আসবাব দিয়ে সাজানো। আবসবাবপত্র ইতালি থেকে আনা হয়। দক্ষিণে ঢাউস আকারের স্তম্ভযুক্ত বারান্দা। ছাদে ওঠার জন্য আছে পেঁচানো সিঁড়ি। তবে সিঁড়িটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না।

 
রাজবাড়ির পেছনেও কারুকার্যম-িত প্রশস্ত চাতাল। ফুলের টব দিয়ে সুসজ্জিত। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গেছে নিটোল হ্রদ। মুগ্ধকর এ জলাশয়ের পাড়ে সারি সারি পাম গাছ। তাতে তৈরি হয়েছে সবুজের নিবিড় বেষ্টনী। বারান্দা থেকে নেমে গেছে শানবাঁধানো সিঁড়ি। চাইলে টুপ করে হ্রদে নেমে জলকেলি করা যায়। জোছনা রাতে কিংবা বসন্তের মাতাল সমীরণে বারান্দার এমন পরিবেশে মনের মধ্যে কী রকম দোলা দিয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতা আমার হয় নি।


দক্ষিণ পাশে সুদৃশ্য ও মনোরম উদ্যান। এটি পরিচিত ‘ইতালিয়ান গার্ডেন’ নামে। সুসজ্জিত প্রাচীন ও দুর্লভ সব গাছগাছালি। কোনোটা ফলজ। কোনোটা ঔষধি বৃক্ষ। পারিজাত, কর্পূর, সৌরভী, এগপ্ল্যান্ট, হোয়াইট পয়েনসেত্তিয়া, হোয়াইট এলিসন, মালতীলতা, শঙ্কচক্র, গোদাপদ্ম, হরীতকী, হাপাবমালি, রাজ-অশোক, রঙ্গন, নাগেশ্বর চম্পা, সাইকাস পাম, যষ্ঠিমধু, মাধবী, তারাঝরা, নীলমণিলতা, হৈমন্তী ইত্যাদি। এর অধিকাংশ গাছই সচরাচর দেখা যায় না। বাহারি পাতা আর রঙিন ফুলের সৌরভে হয়ে ওঠেছে যেন নন্দনকানন। বাগানে আছে বসার বেঞ্চ। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন স্বর্গের মতো এ বাগানে আছে অত্যাধুনিক ¯œানাগার। কৃত্রিম ঝরনাধারা।

বাগানের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধারণ কিছু ভাস্কর্য। গ্রিক স্টাইলে নির্মিত। কিছু ভাস্কর্য কালো এবং লোহা দিয়ে তৈরি। ছিপ হাতে কালো রঙের মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যটি মন কেড়ে নেয়। শ্বেত পাথরে গড়া মা-সন্তান কিংবা সুন্দরীতমাদের অপরূপ সব ভঙ্গিমা। সব ইতালিয়ান মার্বেল পাথরে গড়া। হাত ভাঙা একটি স্থাপত্য দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। এটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের কীর্তি। বাগানের এক কোনায় আছে কাঠের ‘টি-হাউস’। বিকেলে সেখানে বসে রানি চা পান করতে করতে উপভোগ করতেন প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। রাজবাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কবিতার বীজ। আর সেখানে যদি ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় বনলতা সেনের সঙ্গে, তাহলে জীবনানন্দ দাশের মতো জাতকবি হলে অমর সব পংক্তি না লিখে কি পারা যায়?

রাজবাড়িতে আছে দোতলা ‘কুমার প্যালেস’। এটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিচ তলায় অন্ধ কুঠুরি। তাতে ছিল কারাগার ও টর্চার সেল। খাজাঞ্জিখানা, হোলিখেলা, দোলমঞ্চের আকর্ষণের কমতি নেই। আছে কাচারি ভবন, রান্নাঘর, ট্রেজারি বিল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, স্টাফ কোয়ার্টার, সেন্ট্রিবক্স ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন নামের পুকুর। সামনে শোভা হয়ে আছে ব্রিটিশদের নির্মিত একাধিক কামান। রাজপ্রসাদের সামনে বড় একটি শুভ্র রোয়াক। চারপাশে ডিজাইন করা দেয়াল। এ চত্বরে বসতো বৈকালীন আড্ডা। সেই কত কাল আগে নির্মিত রাজপ্রাসাদটিতে সংমিশ্রণ ঘটেছে রুচি, সৌন্দর্য আর অঢেল ঐশ্বর্যের। এ কারণে এটি এখনও অভিভূত করে পর্যটকদের।


সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, উন্নয়নমূলক কাজে নাটোরের রাজবাড়ির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় অবিভক্ত ভারতে ক্রিকেট খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ নাথ। কলকাতার বালিগঞ্জে ৪৫ বিঘা জমি কিনে সুরম্য বাগানবাড়ি ছাড়াও গড়ে তোলেন ক্রিকেট মাঠ ও প্যাভিলিয়ন। ১৯০১ সালে গঠন করেন ‘নাটোর ইলেভেন টিম’। শুধু ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এ দলের অধিনায়ক ছিলেন মহারাজা নিজে। দীঘাপতিয়ার শেষ রাজা ছিলেন প্রতিভানাথ রায়। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করলে ১৯৫২ সালে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান। ১৯৬৬ সালে রাজবাড়ি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এটির নামকরণ করা হয় ‘উত্তরা গণভবন’। বর্তমানে রাজবাড়িটি রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। রাজপ্রাসাদের পুরো সীমানায় আছে যত্ম ও পরিচর্যার ছাপ।
নাটোরে যাব, আর বিখ্যাত কাঁচা গোল্লার স্বাদ নেব না, তা কি হয়? এর সোয়াদ নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হতে থাকে, কোনো এক শীতার্ত সন্ধ্যায় এ রাজবাড়িতে অবস্থান করলে হয়তো অনুভব করা যাবে জীবনানন্দীয় অভিজ্ঞতা : ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত/সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;/পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী ফুরায় এ জীবনের লেনদেন;/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এমন এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য নাটোরের রাজবাড়ি যেন সাজিয়ে রেখেছে হরেক রকম পসরা। তবে অন্ধকারে মুখোমুখি বসার জন্য নেই কোনো বনলতা সেন।        

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬

রাজশাহীর পদ্মার পাড়ে


পৌঁছতে পৌঁছতে একটুখানি দেরি হয়ে যায়। অস্তগামী সূর্যের কুসুম কুসুম পেলবতার দেখা পাওয়া হলো না। তাতে অবশ্য আক্ষেপটুকু রয়েই যায়। তারপরও মোহময় যে পরিবেশের দেখা পেলাম, তার কোনো তুলনা হয় না। যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট, তাতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের অপরূপ ছটা। প্রকৃতি যে কত বড় চিত্রকর, সেটা পলে পলে অনুভব করতে থাকি। তার তুলির আঁচড়ে খোলতাই হতে থাকে জগতের রূপমাধুরী। দিনমণি সবে ডুবে গেছে। রয়ে গেছে তার মায়াবী আবেশ। চলতে থাকে আলো-ছায়ার অদ্ভুত খেলা। একটু একটু করে চারপাশে জমতে থাকে রক্তিম আভা। যেন কেউ মাখিয়ে দিয়েছে মুঠো মুঠো আবির। গগনজুড়ে বাঙময় হয়ে ওঠে তার লালিমা, তার লালিত্য, তার লাবণ্য। একাকার হয়ে যায় আকাশ, নদী আর প্রকৃতি। এর সম্মিলনে সৃষ্টি হয় মোহনীয় পরিবেশ।

গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে কমনীয় অন্ধকার। বৃক্ষগুলো হয়ে ওঠে প্রকৃতির ক্যানভাসের অংশ। নদীর তীরে অপেক্ষমাণ ছায়া ছায়া নৌকা। দাঁড়িয়ে থাকা মানব-মানবী রূপায়িত হয় ধূসর অবয়বে। আছে থোকা থোকা বিষণœতাও। সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যপটটি রূপ নেয় জলছবিতে। আঁখিপুটে যেন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জলরঙের জাদুকর ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী যোষেফ উইলিয়াম টার্নারের এক একটি মাস্টারপিস। ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেও মনে হতে পারে কোনো চিত্রশিল্পীর ইজেলে আঁকা প্রকৃতির বিমূর্ত সব ছবি। তাতে আছে সুর-ছন্দ-কবিতার সংমিশ্রণ।
 

কাব্যিক এ দৃশ্যপটটি মিলিয়ে যেতে না যেতেই অন্ধকারে ফুটে ওঠে আলোর বর্ণময় ফুটকি। দূর থেকে মনে হতে থাকে যেন দীপালি উৎসব। নদীর পানিতে তার প্রতিবিম্ব। কাঁপা কাঁপা রঙিন বিচ্ছুরণ। বইতে থাকে ঝিরি ঝিরি মাতাল হাওয়া। অপরূপ সেই নৈসর্গিক দৃশ্য। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে নিভৃতে বসে আছেন কেউ কেউ। দূর থেকে ভেসে আসেন শ্রীকান্ত আচার্য : একা একা এই বেশ থাকা/আলো নেই কোথাও সব মেঘে ঢাকা/ছায়া ছায়া সব আবছায়া/যাকে খোঁজে মন তার নেই দেখা/আনমনে এই একা একা/সব মেঘে ঢাকা, সব মেঘে ঢাকা/আলো-ছায়া দিয়ে দিন চলে গেছে/আমাকে শূন্যতা দিয়ে গেছে/উতলা এক হাওয়া ভাসে/সে হাওয়ার সাথী/ শুধু নীরবতা, শুধু নীরবতা.........। সন্ধ্যা নেমে এলে এমন দৃশ্যপট প্রতিনিয়ত দেখা যায় রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধ বা টি-গ্রোয়েনে।


দিনের বেলায়ও পদ্মা নদীর তীরের ঔজ্জ্বল্য কম দীপ্তিময় নয়। পাঠানপাড়া, লালন শাহ পার্ক, বড়কুঠির পর্যটন কেন্দ্রে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালের মাধুর্য ও জৌলুশ বেশ উপভোগ্যময়। যদিও কার্তিকে গা বুলিয়ে দেওয়ার কথা মিঠের রোদের আমেজ। অথচ রোদের তেজের কারণে ঘেয়ে-নেয়ে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। তারপরও বিস্তীর্ণ নদীর পাড় ঘেঁষে কাশফুলের নান্দনিক সমাহার মনের মধ্যে এনে দেয় শুভ্র পালকের ছোঁয়া। পাঠানপাড়ায় পরিত্যক্ত আমবাগানে সদ্য গড়ে ওঠেছে ‘সীমান্ত অবকাশ’, ‘সীমান্ত নোঙর’ নামের ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। আছে সুশোভিত পার্ক। গাছের তলায় চমৎকার বসার ব্যবস্থা। নির্জন। নিরিবিলি। কে যেন গুন গুন করে গাইছে, ‘আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে তোমার কাছে এসে/শুধু তোমায় ভালোবেসে’। রোমান্টিক পরিবেশ। প্রেমপিয়াসীরা যাতে পাখির নীড়ের অনুভাব পেতে পারেন, সেজন্য পাকুড় গাছের উপর বেঁধে দেওয়া হয়েছে আচ্ছাদিত মাচা। এই ট্রি-হাউজে ‘নিভৃত নির্জন চারি ধার/দুজনে মুখোমুখি’ হয়ে ‘গভীর দুখে দুখি’ হওয়া যায় কিংবা হতে পারে ‘কেবল আঁখি দিয়ে/আঁখির সুধা পিয়ে’।
 

বড়কুঠিতে গড়ে তোলা হয়েছে মহানগর উম্মুক্ত নাট্যমঞ্চ। অনেকটা প্রাচীন গ্রিসের অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো। প্রাকৃতিক আলোয় হতে পারে নাটকের আলোক প্রক্ষেপণ। আছে ‘পদ্মা ফুড গার্ডেন’। রঙিন ছাতা। পদ্মা নদীর তীরে পার্ক ছাড়াও গড়ে তোলা হয়েছে টাইলস দিয়ে হাঁটার দীর্ঘ পথ। আছে বসার চমৎকার সুব্যবস্থা। তপ্ত দুপুরকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম। তবে স্কুল-কলেজ পালিয়ে আসা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা নদীর সুরতরঙ্গ। জুড়িয়ে দেয় মনপ্রাণ। চাইলে স্পিড বোট বা নৌকায় এক পাক ঘুরে আসা যায়। দূর থেকে দেখা যায় ভারতের মুর্শিদাবাদের প্রান্তরেখা। তবে খুব ভোরে কিংবা বিকেল হলে পদ্মা পাড়ের চেহারা আমূল বদলে যায়। সে সময় ঢল নামে মানুষের। জানা যায়, হাল আমলে পদ্মা নদীর তীরকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। অবশ্য সৌন্দর্যকরণের এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। 
 

বরেন্দ্রভূমির গলার হার হয়ে যুগে যুগে শোভা বর্ধন করছে পদ্মা নদী। যদিও একসময়ের উত্তাল পদ্মা নদী হারিয়েছে তার যৌবন। খুব বেশি দিন পানির ¯্রােত থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে বিশাল এলাকাজুড়ে চর পড়ে। তখন আর প্রমত্ত এই নদীকে চেনা যায় না। এই নদী অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে দিলেও এর টান কিন্তু এড়ানো যায় না। পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রকৃতির ছায়ায় মনোরম বাসভবন, সারদা পুলিশ একাডেমি, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মতো স্থাপনাগুলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
 

এই শহরে আছে গুরুত্বপূর্ণ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। বাংলাদেশের পুরানো জাদুঘরের একটি। প্রত্মতত্ত্ব সংগ্রহের দিক দিয়ে এটি বেশ সমৃদ্ধ। অনেক দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন আছে। আছে সিন্ধু সভ্যতার গৃহস্থালি তৈজসপত্র। যা পাওয়া যায় মহেঞ্জোদারোতে। শিক্ষাদীক্ষায় শহরটি এগিয়ে আছে। দেশের অন্যতম একটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৮ সালে। আছে বিস্তৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সিল্ক সিটি হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর গৌরব ‘রাজশাহী সিল্ক’। দেশ-বিদেশে এর দারুণ কদর। বিসিক শিল্প নগরীতে রেশমের বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি ও শোরুম আছে। সেখানে রেশম চাষ থেকে শুরু করে শাড়ির প্রস্তুতপ্রণালী দেখা যায়। চাহিদা অনুযায়ী রেশমের যে কোনো পণ্য ক্রয় করা যায়।
 
  
বাংলাদেশ ডাকবিভাগের রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক এস এম তারিক কচির আমন্ত্রণে এবারই প্রথম সেখানে পা দিয়ে অনেক দিক দিয়ে ব্যতিক্রম মনে হলো রাজশাহী শহরটিকে। অনেকটা অনাঘ্রাতা নারীর মতো। এখনও বিভাগীয় এই শহরটির ক্ষত-বিক্ষত হয় নি। ইট-বালু-সিমেন্টের আস্তরের কাছে নিজেকে বিসর্জন দেয় নি। যে কারণে বহুতল ভবন খুব একটা দেখা যায় না। দেখা যায় না ডিজেলচালিত যানবাহন। ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার প্রাধান্যই বেশি। গাড়িঘোড়ার দাপট দেখা যায় নি। লোকজনের চলাচলও খুব একটা চোখে পড়ে নি। তেমন ধুলোবালি নেই। দূষণ নেই। প্রবাহিত হয় নির্মল বায়ু। রাস্তাÑঘাটগুলো ঢাকার চেয়েও উন্নত। এমনকি গলির মধ্যে রাস্তায়ও ভাঙাচুরা নেই। শহরটা বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। চারপাশে সবুজ বেষ্টনী। অসংখ্য গাছগাছালি। সবুজ ঘাস। টলটলে পুকুর আর দীঘি। কোথাও কোথাও কৃত্রিম হ্রদ। তবে আবহাওয়া সাংঘাতিক উত্তপ্ত। হেমন্তের শুরুতেও হিমেল হাওয়ার দেখা পাওয়া যায় নি। দিনের বেলা ঘরের বাইরে এলে বিভাবসু শরীরের রস একদম নিংড়ে নেয়।

অথচ রাজশাহী অঞ্চল এমনিতে রসে টইটম্বুর। মিষ্টান্ন সামগ্রীর যথেষ্ট সুনাম আছে। তবে পুরো এলাকা ফলফলারি আর গাছগাছালিতে ভরপুর। কোথাও একটু বীজ র্পুঁতে দিলেই বেড়ে ওঠে রসালো ফল গাছ। তবে আম, লিচু, আখ, পেয়ারা, কলা গাছের উর্বরভূমি। রাজশাহী থেকে নাটোর যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে ফলফলারির বাগান। আছে ফল গবেষণাগার। দেখে মনে হয় সবুজের উপত্যকা। প্রাকৃতিক যে সম্পদ নিয়ে রাজশাহীর অবয়ব, সেটি অটুট রাখতে পারলে শহরটি যে কাউকেই বার বার কাছে টেনে নেবে। বাংলাদেশে এমন শহর ক্রমান্বয়ে দুর্লভ হয়ে ওঠছে।