পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বৃহস্পতিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

ক্রীড়া সাংবাদিকতার রূপান্তর





ইংরেজ লেখক-দার্শনিক স্যার ফ্রান্সিস বেকন ১৫৯৭ সালে বলেছিলেন, ‘নলেজ ইজ পাওয়ার’। তাঁর কথাটাকে একটু বদলে এখন বলা হয়, ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’। এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না, আজকের পৃথিবীতে তথ্যের অমিত শক্তি। চারপাশেই তা অনুভব করা যায়। বিশ্বায়নের খোলা জানালা দিয়ে আমরা যে ‘বিশ্বগ্রাম’-এর বাসিন্দা হয়ে ওঠেছি, সে তো তথ্যের শক্তির ওপর ভিক্তি করে। প্রিন্ট, ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার পাশাপাশি অনলাইনের মাধ্যমে তথ্যের অনেক বেশি বিকাশ ঘটছে। একই ধারায় ক্রীড়াঙ্গনকে এগিয়ে নেওয়া ও জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রেও মিডিয়া রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা। বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যে কোনো খেলা হোক না কেন, মিডিয়ার কল্যাণে তার সর্বশেষ তথ্য নিমিষেই সবার কাছে অনায়াসেই পৌঁছে যায়। এ ম্যাজিকটা সম্ভব করেছেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা।
মেঘে মেঘে বেলা তো আর কম হলো না। ব্রিটিশ ভারতে সূচনা ঘটে ক্রীড়া সাংবাদিকতার। একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় ১৮৫৪ সালের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে একটি ফুটবল ম্যাচের খবর প্রকাশ হয়। এ দিয়ে শুরু এ অঞ্চলে ক্রীড়া সাংবাদিকতা। ছোট্ট পরিসরের খেলার এ খবর প্রকাশ করাটা ছিল বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। তারপর তো কলকাতা ফুটবলের তীর্থকেন্দ্র হয়ে ওঠলে সংবাদপত্রেও তার প্রতিফলন ঘটে। শুরুতে ফুটবলকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয় বাংলা ক্রীড়া সাংবাদিকতা। অবশ্য ফুটবলের পাশাপাশি অন্য খেলাগুলোও স্থান করে নেয়। সে সময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত হতো অসংখ্য পত্র-পত্রিকা। তাতে ক্রীড়াঙ্গনও গুরুত্ব পেতে থাকে। ব্রিটিশদের সঙ্গে ভারতীয়দের ফুটবল ম্যাচ হয়ে ওঠে ক্রীড়া সাংবাদিকদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। ম্যাচ রিপোর্টের পাশাপাশি ছাপা হয় সাদা-কালো ছবি। তবে সব কিছুই কলকাতাকেন্দ্রিক হওয়ায় তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় সংবাদপত্রের প্রসার খুব একটা ছিল না।
সে সময় ঢাকায় পত্র-পত্রিকার বিস্তার ছিল খুবই কম। হাতেগোনা যে কয়েকটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তার সঙ্গে খেলাধুলার খুব একটা সম্পৃত্ততা ছিল না। ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘ঢাকা নিউজ’ ১৮৫৬, ‘বেঙ্গল টাইমস’ ১৮৬০ সালে ও ১৮৬০ সালে প্রথম বাংলা সাপ্তাহিক ‘কবিতাকুসুমালী’ প্রকাশিত হয়। ১৮৬১ সালে বের হয় ‘ঢাকা প্রকাশ’। খেলাধুলার সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে দীর্ঘায়ুর এ পত্রিকাই ছিল সবেধন নীলমণি। ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম দৈনিক ‘দ্য হেরাল্ড’, বাজারজাত হয় ১৯১৬ সালে। এ ধরনের পত্রিকায় কদাচিৎ খেলার খবর হয়তো থাকতো। তবে তার কোনো হদিস এখন মেলে না। যে কারণে ব্রিটিশ ভারতে ঢাকায় ফুটবল লিগ আয়োজিত হলেও সে সংক্রান্ত তথ্য নেই বললেই চলে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনের খবর মাঝে-মধ্যে স্থান করে নিয়েছে। তা খুব বেশি উল্লেখ করার মতো নয়। ১৯৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত দৈনিক আজাদ-এর ঢাকাস্থ প্রতিনিধির পাঠানো খেলার খবর কালেভদ্রে ছাপা হতো। আজাদ-এর পাশাপাশি দৈনিক ইত্তেহাদ, ডেইলি মর্নিং নিউজ ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার পর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সওগাত’ পত্রিকা ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ভালোই ভূমিকা রাখে। কলকাতা মোহামেডান ক্লাবকে কাভারেজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ পত্রিকাটির অবদান বেশি। খেলোয়াড়দের ছবি ও প্রোফাইল প্রকাশ করে সাড়া জাগায়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গনের পালে লাগে নতুন হাওয়া। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে ক্রীড়া সাংবাদিকতার অবয়ব। তখন তো সংবাদপত্রের সংখ্যা ছিল খুবই সীমিত। উল্লেখযোগ্য হলো সৈনিক, জিন্দেগী, ডেইলি অবজারভার, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক। তবে আজাদ, মর্নিং নিউজ, অবজারভার, সংবাদ, ইত্তেফাক-এর মতো দীর্ঘস্থায়ী পত্রিকাগুলো সমাজমানসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূলত এ পত্রিকাগুলোর মাধ্যমে বিকশিত হয় ক্রীড়া সাংবাদিকতার ধারা। সে সময় থেকে প্রথমে খ-কালীন, পরবর্তীতে সার্বক্ষণিক ক্রীড়া সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রথম ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে মনে করা হয় দৈনিক আজাদ-এর সৈয়দ জাফর আলীকে। তিনি এ পত্রিকার চিফ রিপোর্টারের পাশাপাশি স্পোর্টস রিপোর্টিং করতেন। বাংলা পত্রিকায় খেলাধুলার খবর খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এক কলামের বেশি নিউজ প্রকাশ হওয়াটা ছিল অনেক বড় ব্যাপার। অধিকাংশ দিন কোনো নিউজই থাকতো না। তবে ইংরেজি পত্রিকায় খেলার খবর যথেষ্ট গুরুত্ব পেত। ১৯৪৯ সালের ১৯ মার্চ প্রকাশিত অবজারভার প্রথম খ-কালীন স্পোর্টস রিপোর্টার নিয়োগ দেওয়া হয় কানু কবির (নুরুল কবির)কে। ১৯৫৪ সালে সার্বক্ষণিক স্পোটস রিপোর্টার হিসেবে কুতুবউদ্দীনকে নিয়োগ দেয় মর্নিং নিউজ। এরপর থেকে স্পোর্টস রিপোর্টার নিয়োগের ধারাও গড়ে ওঠে। ভারতের মাটিতে নিজেদের দ্বিতীয় টেস্টেই প্রথম এবং স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাকিস্তানের জয় আর ফজল মাহমুদ, নজর মোহাম্মদ, মাহমুদ হুসাইনের বিস্ময়কর পারফরম্যান্স দারুণভাবে সে সময় সাড়া জাগায়। সংবাদপত্র জগতও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়। পত্রিকার সীমিত পরিসরের বড় একটি অংশ স্থান করে নেয়। এমনকি প্রথম পৃষ্ঠায় ব্যানার হেডিংও হয়। ১৯৫৫ সালে ভারত, নিউজিল্যান্ড, ১৯৫৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অস্ট্রেলিয়া, ১৯৬২ সালে ইংল্যান্ড, ১৯৬৯ সালে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে পাকিস্তানের টেস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হওয়ায় ক্রিকেটের রূপ-রস-গন্ধে পল্লবিত হয় ক্রীড়া সাংবাদিকতা।
পর্যায়ক্রমে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগও গুরুত্ব পেতে থাকে। তদানীন্তন পাকিস্তানের ফুটবলের তীর্থকেন্দ্র ছিল ঢাকা। অর্থের প্রলোভনে ঢাকা লিগে খেলার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছুটে আসতেন ফুটবলাররা। জমজমাট হয়ে ওঠে ঘরোয়া ফুটবল। পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানিদের খেলা হলে তা উত্তেজনার বারুদ ছড়াতো। পাঠকদের আগ্রহের কারণে সংবাদপত্রে খেলাধুলার স্পেস বাড়তে থাকে। পঞ্চাশ দশকের শেষদিকে মর্নিং নিউজ আর অবজারভার-এ খেলার জন্য এক পৃষ্ঠা বরাদ্দ করলে ক্রীড়া সাংবাদিককতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ হয়। সে সময় স্পোর্টস এডিটরও নিয়োগ দেওয়া হয়। সবার আগে সাপ্তাহিক খেলার পাতা চালু করে মর্নিং নিউজ। ষাটের দশকের শুরুতে বাংলা পত্রিকার মধ্যে প্রথম এ ধারা অনুসরণ করে দৈনিক আজাদ। ১৯৫৪ সালে ঢাকা স্টেডিয়াম গড়ে উঠলে ক্রীড়াঙ্গনে উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। স্টেডিয়াম এলাকায় ক্রীড়া সাংবাদিকদের আনাগোনা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় সংবাদপত্রের পাতায়। ঢাকা লিগ ছাড়াও রোনাল্ডশে শিল্ড, ১৯৫২, ’৫৭, ’৬২ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল ফুটবল, ১৯৫৫ সালে ৪ জাতির কোয়াড্রাঙ্গুলার, ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু আগা খান গোল্ড কাপ, ১৯৬৭ সালে আরসিডি টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে ঢাকার ফুটবলে প্রাণচাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ঢাকার মাঠে খেলতে আসে ভিন দেশি শক্তিশালী বিভিন্ন ফুটবল দল। ফুটবল হয়ে ওঠে সংবাদপত্রের প্রধান আকর্ষণ।
১৯৫৫, ’৬০, ’৬৪, ’৬৮ সালে পাকিস্তান ন্যাশনাল গেমস, ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অ্যাথলেট জিনাত আহমেদ ও ১৯৫৬ সালে লাহোরে লুৎফুন্নেছা হক বকুলের স্বর্ণ জয়, ১৯৫৮ সাল থেকে ’৬১ সাল পর্যন্ত সাঁতারু ব্রজেন দাসের ৬বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে সাড়া জাগান। এছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের অ্যাথলেটিকস, সাঁতার সহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ক্রীড়া সাংবাদিকদের আকৃষ্ট করে। প্রতিটি ইভেন্টই ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। তবে বিদেশি খেলার খবর টাটকা প্রকাশের সুযোগ ছিল না। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার মাধ্যমে নিউজ পাকিস্তানের করাচি হয়ে আসতো। পঞ্চাশের দশকে থেকে পত্র-পত্রিকায় খেলার ছবিও প্রকাশিত হয়। যদিও সার্বক্ষণিক কোনো ক্রীড়া বিষয়ক আলোকচিত্রী ছিল না। পত্রিকায় ১/২জন যে আলোকচিত্রী থাকতেন, তাঁরাই হতেন সকলের কাজের কাজী। ষাট দশকের মাঝামাঝি দৈনিক পাকিস্তান প্রকাশের পর বাংলা পত্রিকায় অনেক বেশি গুরুত্ব পেতে থাকে খেলাধুলা। সেই সঙ্গে দৈনিক পূর্বদেশ, দৈনিক জনপদ এগিয়ে আসে।
স্বাধীনতার পর ক্রীড়া সাংবাদিকতায় মৌলিক একটা পরিবর্তন আসে। যদিও নিদিষ্ট সংখ্যক পত্রিকায় অল্প কয়েক জন ক্রীড়া সাংবাদিক দীর্ঘ দিন সংশ্লিষ্ট ছিলেন। যে কারণে খুব একটা বৈচিত্র্য ছিল না। তবে ব্যক্তিগতভাবে কারো কারো উদ্যোগ ও উৎসাহ নজর কাড়তে সক্ষম হয়। পাশাপাশি সাপ্তাহিক, পাক্ষিক পত্রিকাগুলোও ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিয়েছে। প্রকাশিত হয়েছে ক্রীড়া বিষয়ক পত্রিকা। তবে আশির দশক থেকে লেখালেখির ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।        
ক্রীড়া সাংবাদিকতায় দুটি ধারা বরাবরই ছিল। কেউ কেউ এটাকে নিয়েছিলেন পেশা হিসেবে। আবার কারো কারো কাছে এটি ছিল নিছক শখ। অন্য পেশার পাশাপাশি সন্ধ্যার পর ঢাকা স্টেডিয়ামে কিছু সময়ের জন্য ঢু মারতেন। আবার বিনা পয়সায় খেলা দেখতে পারবেন, সেই প্রলোভনেও নাম লেখাতেন ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে। নব্বই দশকেও দেখতে হয়েছে প্রেস রিলিজ সাংবাদিকতা। কোনো ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হলে সেই ফেডারেশনের প্রেস রিলিজের জন্য অন্তহীন অপেক্ষা। কোনো কারণে প্রেস রিলিজ না পেলে কিংবা প্রেস রিলিজের সংখ্যা কম হলে অনেকেই হাপিত্যেশ করতেন। কীভাবে পৃষ্ঠা ভর্তি করা যাবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন। এখনও সে ধারা একেবারেই বিলীন হয়ে যায় নি। অনেক মিডিয়ায় কম টাকায় সাংবাদিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ইদানিং ক্রীড়া সাংবাদিকতায় যোগ দিচ্ছেন মেধাবারী। ক্রীড়ালেখনির একটি শক্তিশালী ধারাও রয়েছে। যাঁরা খেলাকে সাহিত্য রসে সিঞ্চিত করে পাঠকদের মুগ্ধ করে যাচ্ছেন।
১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর একটা পালাবদল ঘটে। সংবাদপত্র প্রকাশের কঠিন যে বিধি-নিষেধ ছিল তা শিথিল হয়। এরফলে নিত্য-নতুন যে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়, তাতেও পরিবর্তন আসে। দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে নতুনত্বের একটা ছোঁয়া লাগে। লিটার‌্যালি জার্নালিজমের যে ধারাটা অনুসরণ করা হয়, কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার, আজকাল পত্রিকা আগেই তা প্রচলন করে। প্রতিবেশী রাজ্যের পত্রিকায় রিপোর্টে যতটা না তথ্য থাকে, তারচেয়ে বেশি থাকে গল্প। সে দিক থেকে ব্যতিক্রম আজকের কাগজ এবং পরবর্তীকালে এ ধারার পত্রিকাগুলো। সাহিত্য রস থাকলেও তাতে তথ্যও থাকে। নতুন ধারার এ ক্রীড়া সাংবাদিকতা পাঠকরাও লুফে নেন।
তবে এক একটি পত্রিকাকে কেন্দ্র করেও আবর্তিত হয়েছে ক্রীড়া সাংবাদিকতা। তৈরি হয়েছে নিজস্ব ঘরানা। সময়ের পরিক্রমায় সংবাদপত্রে খেলার পৃষ্ঠা বেড়েছে। কোনো কোনো পত্রিকায় তো রয়েছে চার পৃষ্ঠাও। আগে সংবাদপত্রে ক্রীড়া সাংবাদিকদের খুব একটা গুরুত্ব দেওয়া হতো না। হারাধনের দশটি ছেলের অনাদৃত একটি ছেলে হয়ে থাকতো হতো। কেউ খোঁজ নিতে চাইতো না। এখন ক্রীড়া সাংবাদিকদের সম্মান বেড়েছে। বেড়েছে বিত্ত-বৈভব। প্রথম পার্ট টাইম স্পোর্টস রিপোর্টার যেখানে ৫০ রূপি পেতেন, এখন কোনো কোনো ক্রীড়া সাংবাদিক যে সুযোগ-সুবিধা পান, তা রীতিমতো ঈর্ষাণীয়। ক্রীড়া সাংবাদিক ছাড়া কোনো মিডিয়া এখন ভাবাই যায় না। আগে যেখানে এক-আধজন ক্রীড়া সাংবাদিক দিয়ে কাজ চালানো হতো, এখন দৈনিক প্রথম আলোতে ১৩ ও একাত্তর টিভিতে ১৪ জন কর্মরত আছেন। আশঙ্কাজনক হলো, সংবাদপত্রের সংখ্যা দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট টিভির ব্যাপক প্রসার ঘটায় প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিকভাবে সংবাদপত্রের এখন আগের মতো কদর নেই। নতুন প্রজন্মের কাছে এটি অনেকটাই উপেক্ষিত। বিশ্বব্যাপী চলছে প্রিন্ট মিডিয়ার মন্দা। অনেক বনেদি পত্রিকা হয় বন্ধ নতুবা ইন্টারনেট সংস্করণ বের হচ্ছে। ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়। ওয়েবসাইট, ব্লগ, ফেসবুক, টুইটারের সঙ্গে পাল্লা দিতে হচ্ছে সংবাদপত্রকে। ক্রমশ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। পাঠক কমছে। বাধ্য হয়ে সংবাদপত্রগুলোও অনলাইনে ঝুঁকছে।
প্রিন্ট ও টেলিভিশনের পাশাপাশি বেতার সাংবাদিকতাও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। ১৯৩৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় বেতার সম্প্রচার শুরু হয়। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বেতারে কোনো কোনো খেলা সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। দীর্ঘ দিন যাবৎ বেতার ক্রীড়াঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। হাল আমলে নতুন মেজাজের বেতারে ক্রীড়া সাংবাদিকতা আলাদা একটি স্থান করে নিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে টেলিভিশন। মার্কিন এক গবেষণায় জানা যায়, মানুষ যা পড়ে তার ১০ শতাংশ মনে রাখে আর যা দেখে তার ৩০ শতাংশ মনে থাকে। এ থেকে টিভির গুরুত্ব সহজেই অনুধাবন করা যায়। সবচেয়ে বড় কথা, সংবাদপত্র পড়তে হলে শিক্ষিত হতে হয়। টিভি দেখতে হলে অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। টিভি এমন একটি মাধ্যম, যা সহজেই দর্শকদের আকৃষ্ট করতে পারে। বাইরের পৃথিবীকে দেখার জন্য টিভি খোলা জানালার মতো। এ জানালা দিয়ে কোথায় কী ঘটছে, তা আমরা জানতে পারি। দেখতে পারি। এর মাধ্যমে ক্রীড়া সাংবাদিকরা ক্রীড়াঙ্গনকে এনে দিচ্ছেন হাতের মুঠোয়।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টিভি শক্তিশালী অবস্থান গড়ে নিতে পেরেছে। ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় ‘পাকিস্তান টেলিভিশন’-এর সম্প্রচার শুরু হয়। ১৯৮০ সালে শুরু হয় বিটিভির রঙিন সম্প্রচার। একক টিভি হিসেবে দীর্ঘ দিন আধিপত্য বিস্তার করেছে বিটিভি। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইভেন্ট সম্প্রচারের কৃতিত্ব বিটিভির। বেতবুনিয়ার ভূ-উপগ্রহের মাধ্যমে বাংলাদেশের দর্শকরা প্রত্যক্ষ করেছেন আন্তর্জাতিক ফুটবল, বক্সার মুহাম্মদ আলীর প্রজাপতি নৃত্য ইত্যাদি। দেশীয় ফুটবলের অনেক ম্যাচও সম্প্রচার করেছে। যদিও এ ক্ষেত্রে ক্রীড়া সাংবাদিকতার সরাসরি ভূমিকা ছিল না। তবে অবদান রেখেছেন ক্রীড়া ধারাভাষ্যকাররা। তাঁদের অধিকাংশই ছিলেন ক্রীড়া সাংবাদিক।
নব্বই দশকের মাঝমাঝি নতুন যুগের সূচনা হয় স্যাটেলাইট টিভির। প্রথম প্রতিষ্ঠিত স্যাটেলাইট টিভি হিসেবে ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই যাত্রা শুরু করে ‘এটিএন বাংলা’। ১৯৯৯ সালে এটি অ্যানালগ থেকে ডিজিটালে রূপান্তর হয়। বিটিভির পর ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল প্রাইভেট টেরিষ্টিয়াল চ্যানেল হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে একুশে টেলিভিশন অর্থাৎ ইটিভি। দেশে বর্তমানে স্যাটেলাইট টিভিগুলো যে ধারায় সংবাদ পরিবেশন করে, তার পথিকৃৎ একুশে টিভি। আর এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিং। ক্রীড়া সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও প্রচলিত ধারাও বদলে দেয় একুশে টিভি। এরপর তো চ্যানেলের ঢল নেমেছে। প্রতিনিয়ত নিত্য-নতুন চ্যানেল আত্মপ্রকাশ করছে।
স্পোর্টস আর স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল যেন একে অপরের পরিপূরক। শুরু থেকে ক্রীড়াঙ্গনকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে চ্যানেলগুলো। এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আজ যে জমজমাট অবস্থা, তার পেছনে রয়েছে চ্যানেলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। অতীতে খেলাধুলা আটকে ছিল একটা নির্দিষ্ট বৃত্তে। সেটাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে এসেছে চ্যানেলগুলো। খেলাধুলা এমন একটি বিনোদন, যা মানুষের মনকে প্রসারিত করতে পারে। দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ খেলাকে ভালোবাসেন। খেলাধুলার খোঁজ-খবর রাখেন। চ্যানেলগুলো ক্রীড়াপ্রেমী এই দর্শকদের কাছে খেলাধুলাকে সহজেই পৌঁছে দিচ্ছে। তাদের মাধ্যমে পাওয়া যায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের সর্বশেষ খবর। প্রায় সব রকম খেলার খবর দিচ্ছে কিংবা সরাসরি সম্প্রচার করছে। সেটি বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন। একজন ক্রীড়াবিদ যত না দেশে খেলতে যান, তার চেয়ে বেশি দেশে কাভার করতে যান অনেক ক্রীড়া সাংবাদিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের সাংবাদিকদের উপস্থিতি থাকে বেশি। এমনকি যে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশ গ্রহণ থাকে না, সেখানেও ক্রীড়া সাংবাদিকরা পৌঁছে যান।  


অনলাইন সাংবাদিকতা যেভাবে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, আগামীর মিডিয়া মূলত নিয়ন্ত্রণ করবে এই মাধ্যমটি। ক্রীড়া সাংবাদিকদের জন্য এটি এসেছে চ্যালেঞ্জ হিসেবে। আগে কাগজ আর একটি কলম ছিল ক্রীড়া সাংবাদিকদের সম্বল। প্রযুক্তির এ যুগে কাগজ-কলম অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। কী বোর্ডের সঙ্গে আঙুলের খেলা তো আছেই, সেইসঙ্গে নতুন অনেক কিছু রপ্ত করতে হচ্ছে। আর ইলেকট্রোনিক মিডিয়ার সাংবাদিক হলে তাকে রীতিমতো প্রকৌশলী হয়ে ওঠতে হয়। প্রিন্ট মিডিয়া যেভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, ইলেকট্রোনিক মিডিয়াকেও নিরাপদ ভাবার সুযোগ নেই। প্রযুক্তি যেভাবে হাতের মুঠোয় সব কিছু এনে দিচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতের ইলেকট্রোনিক মিডিয়াও বড় ধরনের পরিবর্তন আসার লক্ষণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠেছে। প্রযুক্তি যতই অত্যাধুনিক হয়ে ওঠছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা প্রদর্শন করে চলেছেন ক্রীড়া সাংবাদিকরা। আর এভাবেই এগিয়ে চলেছে ক্রীড়া সাংবাদিকতার বর্ণিল ধারা। আর তাতে সমৃদ্ধ হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গন।          

    

স্মৃতির নেপথেলিন



বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

‘এখান তোকে মানাইছে না গো’


আমার চোখের সামনেই ছোট্ট পরিসর থেকে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। পরিণত হয়েছে মেগাসিটিতে। বদলে যাচ্ছে তার বহিরঙ্গ। দিনে দিনে খোলতাই হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রূপ পাচ্ছে। কখনো কখনো চিনতেও ভুল হয়। এটিই আমার শহর কিনা মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে। এ শহরের জাঁক যত বাড়ছে, জমক যত বাড়ছে, ততই যেন জটিল হয়ে উঠছে। একটা সময় খুব সামান্যতেই খুশি হয়ে যেতাম। আনন্দ পেতাম। এখন অনেক বেশি পেয়েও তেমনটি হতে পারছি না। মতিঝিলে নির্মিত প্রথম উঁচু ভবন ‘টয়োটা বিল্ডিং’ দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসতেন। এখন সারি সারি সুউচ্চ হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের আড়ালে পড়ে গেছে একসময়ের দর্শনীয় এ ভবনটি। ফার্মগেটের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ দেখে তাকিয়ে থেকেছি মুগ্ধতা নিয়ে। এখন দীর্ঘ ফ্লাইওভারের ডানায় উড়াল দিতে দিতে ফুটওভার ব্রিজকে খুবই অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। বিশ্বায়নের এ দুনিয়ায় এখন কোনো কিছু আর অবাক করে দেয় না। যে শহরটি ছিল নির্জন ও নিরিবিলি, এখন সেটি হয়ে ওঠেছে জনবহুল ও কোলাহলময়। এভাবে শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের অনেক কিছুই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। হারিয়েও যাচ্ছে জীবন থেকে। তার মাঝে আমিও যেন অনাহুত হয়ে পড়েছি। জন্মের সামান্য পর থেকেই এ শহরেই বসবাস। এখন এ শহরের সঙ্গে একদমই মানিয়ে নিতে পারছি না। না শারীরিক, না মানসিকভাবে। অনেকটাই মিসফিট হয়ে গিয়েছি।


পথের যে ধুলা না মিশলে চটপটি ‘টেস্টি‘ লাগে না, সেই ধুলাবালিতে রীতিমতো কাহিল হয়ে পড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠি। অথচ এ শহরে বসবাস করবো, আর ধুলোবালি থেকে দূরে থাকবো, এটা কি সম্ভব? চারপাশেই উড়ছে বিস্তর ধুলোর রেণু। পুরো শরীর চিটচিট করে। চুলগুলো হয়ে যায় ধূসর পা-ুলিপির মতো। সুস্থ-সবল থাকার জন্য চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেন প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটার জন্য। অবশ্য এমনিতেই না হেঁটে উপায় নেই। একসময় নির্জন এ শহরে একা একা হাঁটতে রীতিমতো ভয় লাগতো। ছিনতাইকারীর ছুরিতে কখন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাই। আর এখন এত এত মানুষের ভিড়ে হাঁটার সুযোগ পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। মানবজটের এ শহরে হাঁটতে গেলে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে। আর ফুটপাথ শব্দের অর্থগত তাৎপর্য তো হারিয়ে গেছে। এটিকে ‘ফুটবাণিজ্য’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সারি সারি দোকানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গেলে সব রকম ধকল সইতে হয়। কখনো-সখনো হতে হয় নাজেহাল। তাছাড়া অধিকাংশ ফুটপাথই তো মসৃণ নয়। নয় চলার উপযোগী। একটুখানি অমনোযোগী বা অন্যমনস্ক হলেই হোঁচট খাওয়া বা আহত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। পিছলেও পড়তে হয়।


যানজট এ শহরের এক চরম দুর্ভোগের নাম। অসহনীয় এ যানজটে ঘণ্টার ঘণ্টার পর গাড়িতে অসহায়ভাবে নিশ্চুপ বসে থাকতে হয় ধ্যানী বকের মতো। সময় বয়ে যায় আপন নিয়মে। গন্তব্যে কখন পৌঁছানো যাবে, কারো জানা থাকে না। হতাশায় দীর্ণ হতে হয়। অস্থিরতা পেয়ে বসে। বেড়ে যায় অসহিষ্ণু আচরণও। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই। সব মিলিয়ে যানজট কেড়ে নিচ্ছে উচ্ছ্বাস, উদ্দাম, প্রাণশক্তি। এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও।
ইদানিং স্মায়ু কেমন যেন বিবশ হয়ে যাচ্ছে। লোপ পাচ্ছে স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে স্মৃতিশক্তি। ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে অনুভূতি। এটা কেন হচ্ছে, সেটা আমরা যেন বুঝতে পারছি না। যে কারণে এ বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের বিপন্ন করে তুলছে গাড়ির তীব্র হর্ন। বিকট শব্দ ভিতরটা এমনভাবে কাঁপিয়ে দেয়, প্রতিটি স্মায়ুকোষ নির্জীব-নিস্তেজ-নিশ্চল হয়ে যায়। আর গাড়ির বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভিতরটা হয়ে যায় কৃষ্ণবর্ণ।  দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি যে একদমই ভালো হয় না, সেটা অন্তত অনুভব করছি পলে পলে। বাস্তব অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, হর্ন না বাজালে কারো মেজাজ ভালো থাকে না। আবার হর্ন না শুনলে অনেকেরই বোধকরি ভালো লাগে না। যে কারণে সামগ্রিকভাবে এ নিয়ে খুব একটা হেলদোল দেখা যায় না।
কোথাও একটুখানি জিরিয়ে নেওয়া কিংবা খোলা প্রান্তরে মুক্ত হাওয়া সেবন করা, অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে ওঠেছে। সবুজ প্রকৃতি তো দূরে থাকুক, এ শহরে কোনো গাছের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই পাখির কলকাকলি শোনা যায় না। আর খোলা মাঠ, খোলা প্রান্তর এখন যেন বিলাসিতার বিষয়। বরং পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে চিকিৎসালয়। যেন চিকিৎসাধীন থাকাটা আমাদের বিধিলিপি। এটাই হয়ে ওঠেছে আমাদের বড় বিনোদন। চিকিৎসকের কাছে ধন্না না দিলে আমাদের ভালো লাগে না। কে কত বড় চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, কে কত বড় চিকিৎসালয়ে যাচ্ছেন, সেটাই হয়ে ওঠেছে স্ট্যাটাস সিম্বল।


আমার মতো যাঁদের পাবলিক পরিবহনে চলতে হয়, তাঁদের যে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়! কোনো কোনো গাড়ির অবয়ব ও অবকাঠামো দেখলেই মনে হয় প্রাচীন কোনো জাদুঘর থেকে তুলে এনে প্রদর্শনীর জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিতরের জীর্ণ-শীর্ণ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা। বসতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার। বসতে পারলেও চেপেচুপে এমনভাবে বসতে হয়, তাতে স্বস্তিটুকু উবে যায়। একবার বসলে সহজে আর বের হওয়া যায় না। কন্ডাক্টর আর ড্রাইভারের জমিদারি মেজাজ-মর্জির কাছে নিজেকে প্রজা প্রজা মনে হয়। কোনো নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। কখনো মনে হয় যেন মৃত্যুযানের সওয়ার হয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে কফিনবন্দি হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। চলন্ত অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে নামতে বাধ্য করা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না নেমে উপায়ও থাকে না। অবশ্য কোনো কোনো যাত্রীর আচরণও বিদঘুটে। তাঁদের অন্যায় ও অন্যায্য আবদার ও নির্দেশ রাখতে হয় চালককে। সবাই নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। অন্যের কি অসুবিধা হলো, তা নিয়ে মোটেও তোয়াক্কা করেন না। যাতায়াতের সময় যে কত অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা হয়, বেশিরভাগ সময়ই তিক্ত, এ নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।


এ শহর বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে এর জেল্লা। কিন্তু বিনোদনের ক্ষেত্রে এ শহর এখনও সাবালক হয়ে ওঠতে পারলো না। বরং বিনোদনের যে উৎসগুলো ছিল, তা অনেকটা শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু সময় কাটানো কিংবা আনন্দ পাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। জনবহুল এ শহরে বিনোদন নিয়ে কেন যে এত কার্পণ্য, ঠিক বুঝে ওঠতে পারি না। মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হলেও এই একটি ক্ষেত্রে উদার হওয়া যায় নি। যেন বিনোদন খুব একটা তুচ্ছ বিষয়। এর কোনো প্রয়োজন নেই!  
এ শহরে কারো কাছে ভালো কথা, ভালো ব্যবহার, ভালো আচরণ আশা করা যায় না। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, নির্লজ্জতা, দুর্ব্যবহার, মিথ্যা বলা যেন হয়ে ওঠেছে আদর্শ লিপি। যে যত বেশি শঠ, তার কদর তত বেশি। এর ব্যতিক্রম যাঁরা, তাঁদের জন্য যেন এ শহর নয়। যে কারণে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। কূটিলতাও। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।    
এ শহর আমাকে এখন অবসন্ন করে দেয়। ক্লান্ত করে দেয়। বিষণœ করে তোলে। শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। মানসিকভাবেও বিপন্ন করে তোলে। কেবল টেনেটুনে বেঁচে থাকার জন্যই যেন এ শহরে বসবাস। নিজেকে মনে হয় আজনবি। প্রকৃতঅর্থেই মোটেও অ্যাডজাস্ট করতে পারছি না। এভাবে বসবাস করতে আর ইচ্ছেও করে না। যে কারণে বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়, ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা/রাঙামাটির দেশে যা/এখান তোকে মানাইছে না গো/এক্কেবারে মানাইছে না গো’। আমি তো জানি, আমাকে ‘এক্কেবারে মানাইছে’ না। এখান থেকে চলে যেতে চাই। কিন্তু কোথায় পাবো লাল পাহাড়ির দেশ? কোথায় পাবো রাঙামাটির দেশ? সেখানে আমাকে কে নিয়ে যাবে?    

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৭

বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান দুই ব্যক্তিত্ব


বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান দুই ব্যক্তিত্ব কবি আহসান হাবীব আর কথাশিল্পী শওকত ওসমানের আজ (২ জানুয়ারি) জন্মশতবার্ষিকী। শারীরিক গড়ন অনেকটা একই রকম হলেও স্বভাবে দু’জন ছিলেন বিপরীত জগতের বাসিন্দা। একজনের ছিল নিভৃত জগত। আরেকজনের ভুবন ছিল কোলাহলময়। সেই শৈশবেই এই দু’জনের সঙ্গে পরিচয় হয়। একজনের সঙ্গে পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে। আরেকজনের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে। যতদূর মনে পড়ে, স্কুল জীবনে পড়েছিলাম আহসান হাবীবের ছড়া ‘মেঘনা পাড়ের ছেলে’। আর শওকত ওসমানের একাধিক গ্রন্থের নাম যে কারণেই হোক জানা হয়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে দু’জনের সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়েছে।

কলেজে পড়ার সময় একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলে সে সময় ঘনিষ্টতা হয় কবি আবিদ আজাদের সঙ্গে। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে যাওয়ার সুযোগ হয়। দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। চারতলায় বসতেন। তাঁর সামনে অনুজ্জ্বল একটি টেবিল। তাতে জমে থাকতো লেখার স্তুপ। চারপাশে কেমন যেন একটা গুমট পরিবেশ। তার মধ্যেই খুব গম্ভীর ও নিবিষ্ট মনে তিনি সম্পাদনার কাজ করতেন। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। কথা খুবই কম বলতেন। কবি আবিদ আজাদ তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার অন্যতম একজন সেরা কবির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সেদিন নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হয়েছিল।



আমি তখন দৈনিক বাংলার বাণীতে কর্মরত। সে সময় সম্ভবত ‘রকমারি’ নামে চার পৃষ্ঠার একটি সাপ্তাহিক আয়োজনের সম্পাদনা করতেন কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান। তাতে নিয়মিত লিখতেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান। সে সময় তাঁর একটি ধারাবাহিক রচনা ‘স্মৃতিখণ্ড : মুজিবনগর’ প্রকাশিত হচ্ছিল। সে কারণে তিনি বাংলার বাণীতে আড্ডা দিতে আসতেন। তুখোড় আড্ডাবাজ ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে ওঠতো নিউজ রুম। সোহরাব ভাই কিছু দিনের জন্য ছুটিতে দেশের বাইরে গেলে তিনি ‘রকমারি’ দেখার দায়িত্ব আমাকে দিয়ে যান। সেই সময় শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিছুটা অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ হয়। তাঁর লেখার ফাইনাল প্রুফ তিনি নিজেই দেখতেন। দেখা হলেই তাঁর নিজস্ব স্টাইলে সম্বোধন করতেন, ভাই দুলাল কিংবা ভ্রাতৃ দুলাল। আমার অনুপস্থিতিতে দু’দিন আমাকে নিউজপ্রিন্টের কাগজে দুটি চিরকুট লিখে দিয়ে যান। এটি ছিল তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি কত জনকে যে কত কত চিরকুট লিখেছেন। চিরকুটগুলো ছিল খুবই মজার মজার। বেশিরভাগ সময় তাতে থাকতো ছন্দের মিল দিয়ে লিমিরিক জাতীয় কয়েকটি লাইন কিংবা কারো নাম বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কোনো মন্তব্য। আমাকে লেখা তাঁর চিরকুট দুটি ছিল আমার জন্য অমূল্য সম্পদ। দুঃখজনক হলো, সেই সম্পদ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের পাশাপাশি কথাশিল্পী শওকত ওসমান নানান কারণে আলোচিত ছিলেন। আমি যত দূর জানি, গৃহস্থালির কাজে দেশে প্রথম গ্যাসের লাইন সংযোগ দেওয়া হয় তাঁর শান্তিনগরের বাসায়। ১৯৮৩ সালে তিনি পেয়েছিলেন একুশে পদক। সেই সুবাদে তাঁকে দেওয়া হয় একটি স্বর্ণ পদকও। তিনি পদকটি স্বর্ণের দোকানে নিয়ে গিয়ে জানতে পারেন, তাতে খাদ ভর্তি। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক হৈ চৈ হয়। তিনি নিজেও ছিলেন দারুণ হুল্লোড়বাজ। যে কোনো আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো তুলনা ছিল না। এমন ব্যক্তিত্ব এখন আর খুব একটা দেখা যায় না।
কবি আহসান হাবীব ও কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।