পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২২

সাগর সৈকতে

 


সাগরের তীর থেকে মিষ্টি কিছু হাওয়া এনে 

তোমার কপালে ছোঁয়াবো গো

ভাবি মনে মনে

আকাশের নীল থেকে তারার কান্তি এনে

তোমার নয়নে ছড়াবো গো 

ভাবি মনে মনে

সাগরের তীর থেকে...

প্রাণ-মন উজাড় করে কে গাইছে এই গান? যেন কেউ একজন আমাকে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেওয়ার জন্য বেছে নিয়েছে প্রিয় এই গানটি। অদ্ভুত এক ভালো লাগায় বুকের মধ্যে উথালপাথাল করতে থাকে। খালি গলায় গাইলেও কেমন একটা সম্মোহন সৃষ্টি করেছে কণ্ঠমাধুর্য। এমন পরিবেশে এই গান বোধকরি বুকের গভীর থেকে সহজাতভাবেই উঠে এসেছে। পূর্ণিমার প্রভাবে সাগরে যেমন প্রবলভাবে জোয়ার আসে, তেমনিভাবে কণ্ঠে সুর থাকলে গান তো সহজাতভাবে গাইতে ইচ্ছে করবেই। চারপাশটা কী মায়াময়। বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে চাঁদের আলো। সমুদ্রের ঢেউয়ে ঝিকমিক করছে আলোর রোশনাই। আলো আর আঁধারের সমন্বয়ে অলৌকিক এক আবহ। গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেন সংগত করে চলেছে সাগরের ঢেউ। সবুজ জলরাশির গম্ভীর সুরেলা কলধ্বনি। 

ক্রমান্বয়ে রাতের গভীরতা বেড়ে চলেছে। লোক চলাচল হ্রাস পেলেও পুরোপুরিভাবে নিরিবিলি বলা যাবে না। সমুদ্রের নির্জনতা একান্তভাবে অনুভব করার জন্য অনেকেই এসেছেন। সত্যি সত্যি মিষ্টি মিষ্টি হাওয়া এসে জুড়িয়ে দিতে থাকে অন্তঃকরণ। কেউ কেউ ছাতার নিচে আরামচেয়ারে বসে আছেন। সেখান থেকেই ভেসে আসছে সুরেলা গান। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে গানটা অনেকটা দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পষ্ট শোনা যেতে থাকে গানের কলি। কেমন আচ্ছন্ন করে দেয়। 

গানের কণ্ঠ খুবই পরিচিত মনে হতে থাকে। অবশ্য এই গান শাহনাজ রহমতুল্লাহর কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পেলেও অনেকেই গেয়েছেন। সে কারণে চেনা চেনা মনে হতেই পারে। তারপরও কেন যেন অনেক বছর আগে একজনের কণ্ঠে এই গান শোনার স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সেই গানের স্রোতা ছিলাম একমাত্র আমি। অবশ্য আরও ছিল গাছপালা, পাখপাখালি, ঝিরিঝিরি বাতাস আর বছিলা ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা নদী। নদীতে চলাচল করছিল যাত্রীবাহী নৌকা। হঠাৎ হঠাৎ দেখতে পাওয়া যায় মালামাল বহনকারী বার্জ বা কন্টেইনার। বিকেল গড়িয়ে গেলে ডুবতে থাকা সূর্য ছড়িয়ে দেয় তার অপরূপ মাধুর্য। পরিপার্শ্বটাকে মাখিয়ে দেয় সোনা রঙে। কী যে অদ্ভুত লাগে। 

ঢাকার সন্নিহিত গ্রামীণ এক দৃশ্যপট। আমার আর সুরভির পছন্দের একটা জায়গা। সুযোগ পেলেই সেখানে আমরা ছুটে যেতাম। সেদিন আমরা নৌকায় করে নদীর ওপারের দ্বীপের মতো এলাকায় অবস্থিত বিশাল ইটের ভাটায় যাই। জনবিরল সেই দ্বীপে আমরা প্রজাপতির মতো ইচ্ছেপাখি হয়ে ছোটাছুটি করি। তখন তো যা কিছু করি, তাই লাগে ভালো। কোনও ভয়ডর কাজ করতো না। আশেপাশে তেমন কেউ ছিল না। তারপরও আমার কানে কানে লাজুককণ্ঠে সুরভি বলে, তার খুব হিসি পেয়েছে। সেখানে তো আর ওয়াশরুম থাকার প্রশ্নই আসে না। কী করা যায়? 

এরআগে কখনও এমন সমস্যায় পড়ি নি। তাকিয়ে দেখি, চারপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য ইটের পাঁজা। ভাবলাম, এরচেয়ে ভালো আড়াল হয় না। সুরভিকে তা বলতেই কিছুতেই রাজি হতে চায় না। কিন্তু এছাড়া তো উপায় নেই। গরজ বড় বালাই। অগত্যা সেই প্রাকৃতিক পরিবেশে ঠেকার কাজ চালাতে হয়। গার্ড হিসেবে আমাকে রাখতে হয় তীক্ষ্ণ নজরদারি। কল্লোলিত ঝর্ণাধারা ইউরিয়া সার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। 


চাপমুক্তির একটা আলাদা আনন্দ আছে। নৌকায় ফেরার সময় আমার কাঁধে মাথা রেখে আপন মনে গান গাইতে থাকে সুরভি। সাগরের তীর থেকে...। নিবিড় সেই মুহূর্তে নদীটাকেই আমার কাছে সাগর মনে হতে থাকে। সেদিন মনে হয়েছিল, স্বর্গসুখ কি এমন হয়? তখন নেমে এসেছে অন্ধকার। জোনাকি হয়ে জ্বলতে থাকে দূরের আলো। আকাশে তারার মেলা। নিস্তব্ধতার মাঝে বৈঠা বাওয়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। কেমন যেন মাদকতাময় পরিবেশ। সব মিলিয়ে মনে হতে থাকে, যেন নন্দনকাননে কিন্নরীকণ্ঠে কেউ গান গাইছে। সেই থেকে গানটা আমার বুকের ভিতর চিরদিনের মতো স্থায়ী হয়ে যায়। 

সুরভির সঙ্গে আমার ছিল গভীর গোপন প্রেম। তার সবচেয়ে যা ভালো লাগতো, আমার পছন্দ-অপছন্দকে সে যথেষ্ট গুরুত্ব দিত। জীবনে যা কখনও করে নি, আমার কারণে তা করতে মোটেও কার্পণ্য করতো না। সেই সময় মূলত আমাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় তার জীবন। গানের প্রতি আমার আকর্ষণের কারণে গানের চর্চা শুরু করে। লালমাটিয়া গার্লস কলেজে রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সংগীতের স্কুল 'সুরের ধারা'য় ভর্তি হয়। যত সহজে বলা হলো, ব্যাপারটা তত সহজ ছিল না। পারিবারিক বিধিনিষেধ ছিল। কিন্তু আমার জন্য সে কোনো কিছুই পরোয়া করতো না। 'সুরের ধারা'য় কোর্স কমপ্লিট না করেই তালিম নেয় আধুনিক গানের। এর কারণ, আমি তা পছন্দ করতাম। কিন্তু সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তার সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠা হয় নি। 

তার মধ্যে ছিল একটা খামখেয়ালিপনা। কখন কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা আগের মুহূর্তেও বুঝতে পারা যেত না। পথ চলতে চলতে হঠাৎ হারিয়ে যেত। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা মোটেও সহজ ছিল না। আমি তাকে অসম্ভব ভালোবাসতাম। এ কারণে তার বায়নাক্কা মেনে নিতাম। তারপরও তার মন রক্ষা করা যায় নি। গান যেমন হুট করে ছেড়ে দিতে একটুও ভাবে নি, তেমনিভাবেই আমার সঙ্গে সম্পর্কটা কাট অফ করতে একদমই দ্বিধা হয় নি। কেন সম্পর্ক অটুট রাখে নি, তার কোনও কার্যকারণ জানি না। সেদিন উপলব্দি হয়, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয়।

একটা পর্যায়ে তার হয়তো ইচ্ছে হয়, আমার সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়ার। তার ইচ্ছে হবে, সেটা বাস্তবায়িত হবে না, তা তো হতে পারে না। ওয়ান ফাইন মর্নিং আমি আবিষ্কার করি, তার নামের পাশে সবুজ বাতি আর তো জ্বলে না। জ্বললেও আমি তা দেখতে পাই না। তার জীবন থেকে আমি একদমই নেই হয়ে যাই। কেন, কী কারণে আমাকে বাতিল করে দেওয়া হয়, তার জবাব আজও পাওয়া হয় নি। তবে অস্বীকার করবো না, তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। 

মুক্তা যেমন শুক্তিরও বুকে থাকে, তেমনিভাবে আগলে রেখেছি তার সান্নিধ্যের মধুময় স্মৃতি। যখনই কোথাও তার মতো কাউকে কিংবা অবিকল তার ভঙ্গিমা দেখতে পাই, বুকটা কেমন উচাটন উচাটন করতে থাকে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সবটাই হয়ে যায় মরীচিকা। আর কখনও তার নাগাল পাওয়া হয় নি। এই বিভ্রান্তি নিয়ে তাকে প্রতিনিয়ত খুঁজে চলি। তার কণ্ঠে শোনা গান হররোজ শুনি। কেউ যখন সেই গান গায়, আমি কান পেতে রই।

অনেক বছর পর কক্সবাজারে এসেছি। সব কেমন বদলে গেছে। সৈকত শহরের সেই বর্ণিলতা অনুভব করতে পারছি না। সবুজের গহীনতা নেই। শহরটি যেন রূপ নিয়েছে আবাসিক এলাকায়। হোটেল, মোটেল, রিসোর্টগুলোতে নান্দনিক সৌন্দর্যের বালাই নেই। অধিকাংশই গড়ে তোলা হয়েছে আবাসিক ভবনের মতো করে। তা দেখে প্রাথমিক অবস্থায় বোঝার উপায় নেই এটি সৈকত শহর। কেবল সমুদ্রের কাছে গেলেই তা অনুধাবন করা যায়। দিনের বেলায় জনাকীর্ণ সৈকতে সাগরের ঢেউয়ে চেপে নীল জল দিগন্ত ছুঁয়ে আসার খুব একটা সুযোগ পাওয়া যায় না। এত এত মানুষের ভিড়ে সমুদ্র দূরের হয়ে থাকে। 


যতই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে থাকে, ততই যেন মায়াবিনী হয়ে ওঠে সমুদ্র। ধরা দেয় নানান রূপে। রহস্যময়তার চাদরে মুড়ে দেয় চারদিক। সূর্য ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে দৃশ্যমান হয় অপার্থিব সৌন্দর্যের এক আধার। সেই সৌন্দর্যকে স্মৃতিময় করার জন্য  মুহুমুর্হু জ্বলতে থাকে মোবাইল বা ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। কারও হাতে সূর্য। কারও আঙুলে সূর্য। কারও মাথায় সূর্য। নানান ভঙ্গিমায় সূর্যাস্তকে বন্দী করা হয়। কতভাবেই না গোধূলিকে ধরে রাখার কসরত চলতে থাকে। আমরাইবা পিছিয়ে থাকি কেন? আর সৈকতের পেশাদার ফটোগ্রাফারদের ক্রমাগত তাগাদা তো আছেই। 

আগে সৈকতের ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে প্রিন্ট করে হোটেলে পৌঁছে দিত। সেই সিস্টেম আর নেই। এখন ছবি তোলার পর ডাটা কেবল কিংবা পেন ড্রাইভ দিয়ে ছবি মোবাইল ফোনে ট্রান্সফার করে দেওয়া হয়। বেশি টাকা পাওয়ার জন্য ঘন ঘন ক্যামেরার শাটার টিপে গাদা গাদা ছবি ধরিয়ে দেয়। একই ভঙ্গিমায় অনেক ছবি তোলা হয়। কার্যত কিছু করার থাকে না। অবশ্য প্রিন্ট কপি ছবির গুরুত্ব আগের মতো আর নেই। এখন ছবি তোলা হয় মূলত একবার দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করার জন্য। প্রতিনিয়ত জমা হয় হাজার হাজার ছবি। তার মধ্যে পুরনো ছবির তেমন আর কদর থাকে না।


ব্যস্ততার কারণে কক্সবাজারে তোলা অসংখ্য ছবি ঢাকায় ফিরে আসার আগে আর দেখার সুযোগ হয় নি। অনেক দিন পর ছবিগুলো দেখার সময় চমকে যাই। সেই ছবিগুলোর মধ্যে নানান ভঙ্গিমায় জ্বল জ্বল করতে থাকে সুরভি। কত দিন পর তাকে দেখলাম। ফটোগ্রাফার তার ক্যামেরা থেকে ডাটা কেবল দিয়ে আমার মোবাইলে যে ছবিগুলো দেয়, তাতে শুধু আমাদের ছবি নয়, ভুল করে অন্য অনেকের ছবিও দিয়ে দিয়েছে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সৈকতে ভ্রমণরত সুরভি। তবে খুব কাছাকাছি হলেও ক্ষণিকের জন্য তার সঙ্গে সরাসরি দেখা হলো না। বুকের মধ্যে সুরের হাহাকার ছড়িয়ে দিতে থাকে তার কণ্ঠে গাওয়া গান, সাগরের তীর থেকে...

মঙ্গলবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২২

ভুলতে চাইলেও ভোলা যায় না

 


জানো, ব্যাংকে কাজের এমন চাপ, অনেক সময় প্রস্রাব পর্যন্ত করতে যেতে পারি না।

তাই বুঝি? এ বিষয়ে আমার একটা পরামর্শ আছে। অবশ্য তুমি তো আর মার্কিন কণ্ঠশিল্পী সোফিয়া উরিস্তার মতো সাহসী হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে তো তুমি তোমার পুরানো ফর্মুলা কাজে লাগাতে পারো।

সোফিয়া উরিস্তাটা আবার কে? সে কী করেছে? আর পুরানো ফর্মুলাইবা কোনটা?

সোফিয়া গান গাওয়ার সময় চাপ সইতে না পেরে এক ভক্তকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে তাঁর মুখে হিসি করেন। আর ফর্মুলার কথা মনে নেই তোমার? নেত্রকোনায় থাকতে বদনায় হিসি করে রেখে দিয়েছিলে না? ব্যাংকে তো বদনায় হবে না। একটা বালতি রাখতে পারো।

এই বয়সেও তোমার বদগিরি গেল না?

দেখ, বয়সের আর কী দোষ? মনের বয়স তো আর বাড়ে না। মন যদি আগের মতোই থাকে, তাহলে বদগিরি যাবে কীভাবে? তাছাড়া তুমিও তো কম বদ ছিলে না। না হলে অন্যকে নাজেহাল করার জন্য কেউ কি বদনায় হিসি করে রাখে?

তুমি তো পুরানো কাসুন্দি ভুলতেই পারছো না। আমার তো সেসব স্মৃতি কিছু মনে নেই। তুমি মনে না করালে আর কখনও মনে পড়তো কিনা সন্দেহ। 

তুমি তো সব কিছু অনায়াসেই মুছে ফেলতে পারো। আমি চাইলেও পারি না। যেমন পারি নি তোমাকে ভুলে যেতে। তোমার সব কিছুই আমি পরম যত্মে সযতনে সাজিয়ে রেখেছি। হতে পারে কোনও স্মৃতি কিংবা ফ্রেমবন্দি কোনও মুহূর্ত। 

শোনো, যা চলে গেছে, তা তো গেছেই। আর কখনই ফিরে আসবে না। তাহলে সাজিয়ে রেখে কী লাভ? 

সে তুমি বুঝবে না। সেই অনুভূতি তোমার নেই।

বুঝলাম আমার নেই। তোমার বুঝি খুব অনুভূতি আছে?

দুঃখটাই তো এখানেই। তুমি সেটা বুঝতে পারলে না। আমি জানি না, আর কীভাবে তোমাকে বোঝানো যাবে?

কীভাবে তুমি বুঝিয়েছো যে আমি বুঝতে পারলাম না? ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে এঁকে বোঝালে না হয় হৃদয়ঙ্গম করতে পারতাম।

তুমি যে আমার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য স্থান করে নিয়েছো, এটা কি তুমি বুঝতে পারো না?

মুখে মুখে বললেই বুঝি অনুভূতি হয়ে যায়? 

আমি তো হৃদয় দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করি।

তাহলে এতগুলো বছর চলে গেল। কেন যোগাযোগ করো নি?

আমি তো বরারবই যোগাযোগ করতে চেয়েছি। কিন্তু তুমি তো আমাকে কখনও সুযোগ দাও নি। একবারও আমার দিকে ফিরে তাকানোর চেষ্টা করো নি। তোমার গণ্ডি তো এখন অনেক বড়। কর্পোরেট জগতের মানুষ। অর্থে, বিত্তে ঝলমল করে তোমার চারপাশ। তাছাড়া এখন তোমার সঙ্গে যাদের চলাফেরা কিংবা তোমাকে যারা ঘিরে রেখেছে, তাদের ব্যুহ ভেদ করার সুযোগ কোথায়? তুমিই তো আবার সাবধানে থাকতে বলেছো। নতুবা বড় ধরনের কিছু ঘটে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছো। 

তাহলে পুরানো গীত গেয়ে এখন আর কী লাভ?

আমি আসলে তোমাকে কখনোই ভুলতে পারি নি। পারবোও না। আমার জীবনে সত্যিকার ভালোবাসা তুমি। যেভাবে হোক, আমাদের মধ্যে যে নিবিড় বন্ধন গড়ে উঠে, তা তো অস্বীকার করা যাবে না। আমি অন্তত পারি না। প্রতি মুহূর্তে তুমি থাকো আমার হৃদয়জুড়ে।

হৃদয়জুড়ে কীভাবে আছি? তার কি কোনও চিহ্ন আছে?

তুমি তো বিষয়টাকে তামাশা মনে করছো। আমার কাছে আমাদের সম্পর্কটা অমলিন হয়ে আছে। তোমার সঙ্গে তো অনেক দিন যোগাযোগ নেই। দেখা করার উপায় নেই। কথাও হয় না। কিন্তু আমি প্রতিনিয়ত তোমাকে দেখতে পাই। তোমাকে অনুভব করি। কল্পনায় তোমার সঙ্গে কথা বলি। আমি যা কিছুই লেখালেখি করি না কেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাক তুমি।

তাতে কী এমন মহা উদ্দেশ্য সাধিত হচ্ছে? তুমি তো লেখালেখি করো আমাকে ঝামেলায় ফেলার জন্য। মনে করো, আমি কিছুই বুঝতে পারি না?

মোটেও না। তোমাকে কেন ঝামেলায় ফেলবো?

তোমার লেখায় সব কিছু খুব স্পষ্ঠ হয়ে ওঠে। তারপর লেখায় যেভাবে ছবি ব্যবহার করো, তাতে তো না বোঝার কোনও কারণ নেই। একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলে যে কেউই আমাকে চিনতে পারবে।  

আমি যা যা লেখালেখি করি, যেখানে যেখানে প্রকাশ করি, তোমার চেনাজানার গণ্ডির কারও চোখে পড়ার তেমন সুযোগ নেই। 

তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে?

সেটুকু তো অন্তত বুঝি। তারা যাতে না বুঝতে পারে, সেজন্য আমি নানান কৌশল অবলম্বন করি।

তুমি কি সবাইকে তোমার মতো বুদ্ধু মনে করো নাকি?

তা করবো কেন? অবশ্য কোনও কোনও লেখা আমার পরিচিতজনরাই পড়ে। তারা বোধহয় কেউ কেউ তোমাকে চিনতে পারে। 

মানে কী? কারা চিনতে পারে?

আমার কোনও একটা লেখা পড়ে বাসা থেকে মন্তব্য করা হয়েছে, আমি তোমাকে ভুলতে পারি নি। আর এই কারণে নষ্ট হয়ে গেছে তার জীবন। 

কী বলছো তুমি?

আমি যে তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি, সেটা আমি মোটেও অস্বীকার করি না। করতে চাইও না। তা সবাইকে জানিয়ে দিতে আমার কোনও কার্পণ্য নেই। আমার লেখা পড়ে সেটা তোমার না বোঝার কারণ নেই। 

সেটা না হয় বুঝলাম। তার সঙ্গে জীবন নষ্ট হওয়ার কী সম্পর্ক? 

তোমার সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হওয়ার পর থেকে দীর্ঘ দিন তার সঙ্গে আমার কথা বন্ধ থাকে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আমার কোনও রকম শারীরিক সম্পর্কও নেই। 

একদম বাজে কথা। এটা আমি বিশ্বাস করি না।

আর কিছু যা হোক, আমি পারতপক্ষে মিথ্যা বলি না। আর এই মিথ্যা বলে তো আমার কোনও লাভ নেই। তোমার যদি কোনো সুযোগ থাকে, তুমি যাচাই করে নিতে পারো।

তা কীভাবে হয়? তাহলে শারীরিক সম্পর্ক কীভাবে মিটাও?

তোমার মাধ্যমে।

আমার মাধ্যমে! হাউ ইট পসিবল?

অবশ্য তোমার তো তা বুঝতে পারার কথা নয়। তোমাকে তো কাছাকাছি পাই না। তাতে কী? সেক্ষেত্রে কল্পনায় তোমার সাহায্য নিতে হয়। তোমার সঙ্গে ফিজিক্যাল রিলেশন আর তোমার ছবিগুলো আমাকে উদ্দীপ্ত করে। 

তুমি আসলে অসভ্য একটা লোক। এখনও ভালো হলে না। কেন যে এমন করো?

তুমি আমার অস্তিত্ব জুড়ে যেভাবে মিশে আছো, তোমাকে ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারি না। বছরের পর বছর তোমাতে উপগত হচ্ছি। উত্তেজনা অনুভব করি। অথচ তুমি একটুও অনুভব করতে পারো না। এরচেয়ে কষ্টের আর কী আছে? 

আমি কি স্বর্গের দেবী নাকি? তুমি কী করছো না করছো, আমি দূর থেকে তা কীভাবে অনুভব করবো? যত্ত সব আজগুবি কথা। আচ্ছা, তুমি না হয় নিজের ওপর নির্ভরশীল। আরেকজন কী করে? 

সে খোঁজখবর আমি রাখি না। জানিও না।

এটাও কি বিশ্বাসযোগ্য? 

বিশ্বাস করবে না অবিশ্বাস করবে, সেটা তোমার ওপর নির্ভর করে। আমি একবিন্দু বানিয়ে বলছি না।


এই শোনো, কী খাবে বলো? 

তুমি তোমার পছন্দসই অর্ডার দাও। 

অনেক দিন পর দেখা। কী খাও, কী খাও না, তা তো জানি না। আমার পছন্দের খাবার খেতে পারবে তো?

না পারার কী আছে? অবশ্য এটাও ঠিক, এখন অনেক কিছুই হিসাব-নিকাশ করেই খাওয়া উচিত। কিন্তু তোমার ব্যাপারটা অন্য। একসময় তোমার শরীরের তিতকুটে পানীয় পর্যন্ত খেয়েছি। আর এখন পছন্দের খাবার খেতে পারবো না?

তোমার বদস্বভাব একদমই পাল্টায় নি। সব কিছু মনে করে রেখেছো!

রাখবো না! তা কী কখনও হয়? তোমাকে যতটা পেয়েছি, যেভাবে পেয়েছি, সেটাই ছিল আমার জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়। তা কী করে ভুলবো বলো?

সব ঢঙের কথা। এইসব ফালতু কথা রাখো। বারবিকিউ চিকেন আর ফ্রাইড ভেজিটেবল অর্ডার দিচ্ছি। 

দিতে পারো। অর্ডারের ধরন দেখে বুঝতে পারছি, বেশ স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছো। কিন্তু এত দূর এলে কেন? 

বনানী কি খুব দূরে নাকি? 

আমার জন্য দূর তো বটেই। খুব একটা আসা হয় না। তবে তোমার ভাবভঙ্গি দেখে বুঝতে পারছি, তুমি এদিকে নিয়মিতই আসো।

অফিসের কারণে মাঝে-মধ্যে আসতেই হয়।

তোমার জগতটা অনেক বদলে গেছে। কত জায়গায় তোমাকে যেতে হয়। কত কিছুই না করতে হয়।

মানে কী?

কিছুই না। 

মনে হচ্ছে, তোমার কথার মধ্যে একটা অন্য রকম ইঙ্গিত আছে। 

তুমি এখন অনেকের হয়ে গেছো। কষ্টটা হলো, তুমি শুধু আমার নও। তোমার একটা ক্ষোভ ছিল, সম্পর্কের দিক দিয়ে আমি তোমার চেয়ে এক কদম এগিয়ে ছিলাম। এখন তোমার তো মাল্টিপল সম্পর্ক। আমাকে ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছ।

দেখ, উল্টোপাল্টা কথা বাদ দাও। এত বছর পর আমরা একত্রিত হয়েছি, দিনটা তিক্ততায় ভরিয়ে দিও না।

আসলে আমি এটা কোনোভাবেই মানতে পারি না। আমি তোমাকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছি। তাহলে কেন আমাকে দূরে সরে যেতে হলো?

অতীত নিয়ে টানাটানি করে কোনো লাভ নেই। তাতে মন খারাপ হয়ে যায়। বরং বর্তমান সময়টাকে উপভোগ করার চেষ্টা করো। 

সেটা যদি পারতাম, তাহলে তোমাকে কবেই ভুলে যেতাম। তোমার ভালোবাসা হৃদয়ে বহন করে নিয়ে জীবনটাকে ক্ষয়ে যেতে দিতাম না। 

ক্ষয়ে যেতে দিতে না, এর অর্থ কী? আমি কি তোমাকে বলেছি, আমাকে স্মরণ করে মৈথুন করে নিজেকে ক্ষয় করো। তুমি যা যা করো, সবই করো তোমার মেজাজ-মর্জি মতো। অকারণে আমাকে দোষারোপ করবে না।

মৈথুন করে ক্ষয় হওয়ার কথা তো বলি নি। সেটা করি নিজের শারীরিক চাহিদা পরিপূরণ করার পাশাপাশি তোমাকে নিবিড়  ভাবে অনুভব করার জন্য। তাতে কী ক্ষয় হয় বা হয় না, তা তো আমার জানা নেই। আসলে তোমার সান্নিধ্য না পাওয়াটাই আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে। তোমাকে ছাড়া কেমন যেন ছন্ন ছাড়া হয়ে গেছি। আর কোথাও মন বসে না। 

তোমার এসব মারফতি কথা বাদ দাও তো। 

মোটেও মারফতি কথা নয়। তোমাকে পেয়ে আমার জীবনটা হয়ে উঠে আনন্দময়। সেই আনন্দটুকু দীর্ঘস্থায়ী হলো না। কিন্তু দূরত্ব সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হই। আমি একদমই ভালো নেই। আমার মনের কথা বলার মতো কেউ নেই। আমি একদমই একা হয়ে গেছি। তোমাকে যেভাবে পেয়েছি, তেমনভাবে আর কাউকে পাওয়া সম্ভব নয়। 

এসব আবোল-তাবোল কথা বন্ধ করো তো৷ তোমার এই পুরানো প্যাঁচাল শুনতে ভালো লাগছে না।

তুমি কেন এত নির্দয় বলো তো? এতটা সহানুভূতিহীন হলে কী করে? জীবনের অনেকগুলো মূল্যবান দিন আমাদের হাসি-আনন্দে কেটেছে। আমার ধারণা, এমন দিন তোমার জীবনে আর কখনও আসে নি। সেই দিনগুলো তোমার কাছে কোনও গুরুত্ব নেই?  

যখন দিনগুলো ছিল, তখন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেই দিনগুলো এখন অতীত হয়ে গেছে। তা নিয়ে জাবর কেটে কী আর হবে? জীবন কখনও থেমে থাকে না।

তা হয়তো থাকে না। জীবন যাদের কাছে প্রতিনিয়ত নতুন নতুনভাবে ধরা দেয়, তাদের কাছে জীবন গতিময়। অতীত তাদের স্পর্শ করতে পারে না। কিন্তু আমার জীবন তো তোমার কাছে থেমে আছে। সেখান থেকে আমি আর এগিয়ে যেতে পারি নি। পারার চেষ্টাও করি নি। 

সে তো তোমার সমস্যা। তাতে আমার কী করার আছে? 

তা ঠিক, তোমার কিছু করার নেই। তবে একটা জীবন যখন আরেকটা জীবনের কাছে বাঁধা হয়ে যায়, তখন কি সব কিছু এড়িয়ে থাকা যায়? 

তোমার কথাবার্তার মধ্যে কেমন একটা দার্শনিকসুলভ ভাব। দেখ, এখন আমাদের বয়স বেড়েছে। দুজনের সংসার আছে। সন্তান আছে। সন্তানরাও বড় হয়েছে। এখন কি আর আমাদের ফেলে আসা সম্পর্ক নিয়ে বাড়াবাড়ি করা ঠিক? 

এই কথা কি কেবল আমার জন্য প্রযোজ্য?

তা নয়। কিন্তু তুমি আমাদের সম্পর্কের মধ্যে যেভাবে হাবুডুবু খাচ্ছ, তা কি ঠিক? 

ঠিক-বেঠিক বিবেচনা করে আমি কখনও জীবন যাপন করি নি। আমাকে নিয়ন্ত্রণ করে মন। তার নির্দেশনায় চলি। 

এখন মনটাকে থিতু করার চেষ্টা করো। 

আর যা কিছু পারি না কেন মনকে থিতু করার শক্তি আমার নেই। 

শোনো, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে। 

জরুরি কথা!

দেখ, এখন আর আমাদের পাগলামি করার বয়স নেই। এই বয়সে এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে সবার কাছে হাসি-তামাশার পাত্র হই। তোমার কাছে আমার অনুরোধ, তুমি আমাকে ভুলে যাও। প্লিজ, আমাকে কথা দাও, আমাকে নিয়ে আর পাগলামি করবে না। 

এইজন্য বুঝি তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছো?

এছাড়া তো উপায় ছিল না। আমাদের ভালোবাসার দোহাই লাগে, আমার মাথা ছুঁয়ে কথা দাও, তুমি আমাকে নিয়ে আর কিছু লিখবে না। 

ঠিক আছে, কথা দিলাম। 

সত্যি কথা দিলে তো? আমি জানি, কথা দিলে তুমি বরখেলাপ করবে না। 

তুমি বললে তাই কথা দিলাম। কিন্তু কথা রাখতে পারবো কিনা জানি না। কারণ, আমি আমার ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে পারবো না। তোমাকে ছাড়া আমি কিছুই ভাবতেই পারি না।