পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

বুধবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০১৭

‘এখান তোকে মানাইছে না গো’


আমার চোখের সামনেই ছোট্ট পরিসর থেকে ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে রাজধানী ঢাকা। পরিণত হয়েছে মেগাসিটিতে। বদলে যাচ্ছে তার বহিরঙ্গ। দিনে দিনে খোলতাই হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন রূপ পাচ্ছে। কখনো কখনো চিনতেও ভুল হয়। এটিই আমার শহর কিনা মাঝে মাঝে মনে প্রশ্ন জাগে। এ শহরের জাঁক যত বাড়ছে, জমক যত বাড়ছে, ততই যেন জটিল হয়ে উঠছে। একটা সময় খুব সামান্যতেই খুশি হয়ে যেতাম। আনন্দ পেতাম। এখন অনেক বেশি পেয়েও তেমনটি হতে পারছি না। মতিঝিলে নির্মিত প্রথম উঁচু ভবন ‘টয়োটা বিল্ডিং’ দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসতেন। এখন সারি সারি সুউচ্চ হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের আড়ালে পড়ে গেছে একসময়ের দর্শনীয় এ ভবনটি। ফার্মগেটের প্রথম ফুটওভার ব্রিজ দেখে তাকিয়ে থেকেছি মুগ্ধতা নিয়ে। এখন দীর্ঘ ফ্লাইওভারের ডানায় উড়াল দিতে দিতে ফুটওভার ব্রিজকে খুবই অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। বিশ্বায়নের এ দুনিয়ায় এখন কোনো কিছু আর অবাক করে দেয় না। যে শহরটি ছিল নির্জন ও নিরিবিলি, এখন সেটি হয়ে ওঠেছে জনবহুল ও কোলাহলময়। এভাবে শৈশব-কৈশোর-তারুণ্যের অনেক কিছুই অচেনা হয়ে যাচ্ছে। তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। হারিয়েও যাচ্ছে জীবন থেকে। তার মাঝে আমিও যেন অনাহুত হয়ে পড়েছি। জন্মের সামান্য পর থেকেই এ শহরেই বসবাস। এখন এ শহরের সঙ্গে একদমই মানিয়ে নিতে পারছি না। না শারীরিক, না মানসিকভাবে। অনেকটাই মিসফিট হয়ে গিয়েছি।


পথের যে ধুলা না মিশলে চটপটি ‘টেস্টি‘ লাগে না, সেই ধুলাবালিতে রীতিমতো কাহিল হয়ে পড়ি। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। একটুতেই হাঁপিয়ে ওঠি। অথচ এ শহরে বসবাস করবো, আর ধুলোবালি থেকে দূরে থাকবো, এটা কি সম্ভব? চারপাশেই উড়ছে বিস্তর ধুলোর রেণু। পুরো শরীর চিটচিট করে। চুলগুলো হয়ে যায় ধূসর পা-ুলিপির মতো। সুস্থ-সবল থাকার জন্য চিকিৎসকরা প্রতিনিয়ত পরামর্শ দেন প্রতিদিন কিছু সময় হাঁটার জন্য। অবশ্য এমনিতেই না হেঁটে উপায় নেই। একসময় নির্জন এ শহরে একা একা হাঁটতে রীতিমতো ভয় লাগতো। ছিনতাইকারীর ছুরিতে কখন ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাই। আর এখন এত এত মানুষের ভিড়ে হাঁটার সুযোগ পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার নয়। মানবজটের এ শহরে হাঁটতে গেলে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগে। আর ফুটপাথ শব্দের অর্থগত তাৎপর্য তো হারিয়ে গেছে। এটিকে ‘ফুটবাণিজ্য’ বললে অত্যুক্তি হবে না। সারি সারি দোকানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে গেলে সব রকম ধকল সইতে হয়। কখনো-সখনো হতে হয় নাজেহাল। তাছাড়া অধিকাংশ ফুটপাথই তো মসৃণ নয়। নয় চলার উপযোগী। একটুখানি অমনোযোগী বা অন্যমনস্ক হলেই হোঁচট খাওয়া বা আহত হওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। পিছলেও পড়তে হয়।


যানজট এ শহরের এক চরম দুর্ভোগের নাম। অসহনীয় এ যানজটে ঘণ্টার ঘণ্টার পর গাড়িতে অসহায়ভাবে নিশ্চুপ বসে থাকতে হয় ধ্যানী বকের মতো। সময় বয়ে যায় আপন নিয়মে। গন্তব্যে কখন পৌঁছানো যাবে, কারো জানা থাকে না। হতাশায় দীর্ণ হতে হয়। অস্থিরতা পেয়ে বসে। বেড়ে যায় অসহিষ্ণু আচরণও। এর যেন কোনো প্রতিকার নেই। সব মিলিয়ে যানজট কেড়ে নিচ্ছে উচ্ছ্বাস, উদ্দাম, প্রাণশক্তি। এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও।
ইদানিং স্মায়ু কেমন যেন বিবশ হয়ে যাচ্ছে। লোপ পাচ্ছে স্বাভাবিক চিন্তা-ভাবনা। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে স্মৃতিশক্তি। ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে অনুভূতি। এটা কেন হচ্ছে, সেটা আমরা যেন বুঝতে পারছি না। যে কারণে এ বিষয়টিকে মোটেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। অথচ প্রতিনিয়ত আমাদের বিপন্ন করে তুলছে গাড়ির তীব্র হর্ন। বিকট শব্দ ভিতরটা এমনভাবে কাঁপিয়ে দেয়, প্রতিটি স্মায়ুকোষ নির্জীব-নিস্তেজ-নিশ্চল হয়ে যায়। আর গাড়ির বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভিতরটা হয়ে যায় কৃষ্ণবর্ণ।  দীর্ঘমেয়াদে এর পরিণতি যে একদমই ভালো হয় না, সেটা অন্তত অনুভব করছি পলে পলে। বাস্তব অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে, হর্ন না বাজালে কারো মেজাজ ভালো থাকে না। আবার হর্ন না শুনলে অনেকেরই বোধকরি ভালো লাগে না। যে কারণে সামগ্রিকভাবে এ নিয়ে খুব একটা হেলদোল দেখা যায় না।
কোথাও একটুখানি জিরিয়ে নেওয়া কিংবা খোলা প্রান্তরে মুক্ত হাওয়া সেবন করা, অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে ওঠেছে। সবুজ প্রকৃতি তো দূরে থাকুক, এ শহরে কোনো গাছের দেখা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই পাখির কলকাকলি শোনা যায় না। আর খোলা মাঠ, খোলা প্রান্তর এখন যেন বিলাসিতার বিষয়। বরং পাল্লা দিয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলছে চিকিৎসালয়। যেন চিকিৎসাধীন থাকাটা আমাদের বিধিলিপি। এটাই হয়ে ওঠেছে আমাদের বড় বিনোদন। চিকিৎসকের কাছে ধন্না না দিলে আমাদের ভালো লাগে না। কে কত বড় চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছেন, কে কত বড় চিকিৎসালয়ে যাচ্ছেন, সেটাই হয়ে ওঠেছে স্ট্যাটাস সিম্বল।


আমার মতো যাঁদের পাবলিক পরিবহনে চলতে হয়, তাঁদের যে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হয়! কোনো কোনো গাড়ির অবয়ব ও অবকাঠামো দেখলেই মনে হয় প্রাচীন কোনো জাদুঘর থেকে তুলে এনে প্রদর্শনীর জন্য রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিতরের জীর্ণ-শীর্ণ অপ্রকৃতিস্থ অবস্থা। বসতে পারা তো ভাগ্যের ব্যাপার। বসতে পারলেও চেপেচুপে এমনভাবে বসতে হয়, তাতে স্বস্তিটুকু উবে যায়। একবার বসলে সহজে আর বের হওয়া যায় না। কন্ডাক্টর আর ড্রাইভারের জমিদারি মেজাজ-মর্জির কাছে নিজেকে প্রজা প্রজা মনে হয়। কোনো নিয়ম-কানুনের বালাই নেই। কখনো মনে হয় যেন মৃত্যুযানের সওয়ার হয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে কফিনবন্দি হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়। চলন্ত অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে নামতে বাধ্য করা হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে না নেমে উপায়ও থাকে না। অবশ্য কোনো কোনো যাত্রীর আচরণও বিদঘুটে। তাঁদের অন্যায় ও অন্যায্য আবদার ও নির্দেশ রাখতে হয় চালককে। সবাই নিজের সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। অন্যের কি অসুবিধা হলো, তা নিয়ে মোটেও তোয়াক্কা করেন না। যাতায়াতের সময় যে কত অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা হয়, বেশিরভাগ সময়ই তিক্ত, এ নিয়ে লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে।


এ শহর বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষ বাড়ছে। বাড়ছে এর জেল্লা। কিন্তু বিনোদনের ক্ষেত্রে এ শহর এখনও সাবালক হয়ে ওঠতে পারলো না। বরং বিনোদনের যে উৎসগুলো ছিল, তা অনেকটা শুকিয়ে যাচ্ছে। একটু সময় কাটানো কিংবা আনন্দ পাওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। জনবহুল এ শহরে বিনোদন নিয়ে কেন যে এত কার্পণ্য, ঠিক বুঝে ওঠতে পারি না। মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হলেও এই একটি ক্ষেত্রে উদার হওয়া যায় নি। যেন বিনোদন খুব একটা তুচ্ছ বিষয়। এর কোনো প্রয়োজন নেই!  
এ শহরে কারো কাছে ভালো কথা, ভালো ব্যবহার, ভালো আচরণ আশা করা যায় না। আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, নির্লজ্জতা, দুর্ব্যবহার, মিথ্যা বলা যেন হয়ে ওঠেছে আদর্শ লিপি। যে যত বেশি শঠ, তার কদর তত বেশি। এর ব্যতিক্রম যাঁরা, তাঁদের জন্য যেন এ শহর নয়। যে কারণে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হচ্ছে জটিলতা। কূটিলতাও। এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।    
এ শহর আমাকে এখন অবসন্ন করে দেয়। ক্লান্ত করে দেয়। বিষণœ করে তোলে। শারীরিকভাবে অসুস্থ করে দেয়। মানসিকভাবেও বিপন্ন করে তোলে। কেবল টেনেটুনে বেঁচে থাকার জন্যই যেন এ শহরে বসবাস। নিজেকে মনে হয় আজনবি। প্রকৃতঅর্থেই মোটেও অ্যাডজাস্ট করতে পারছি না। এভাবে বসবাস করতে আর ইচ্ছেও করে না। যে কারণে বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হয়, ‘লাল পাহাড়ির দেশে যা/রাঙামাটির দেশে যা/এখান তোকে মানাইছে না গো/এক্কেবারে মানাইছে না গো’। আমি তো জানি, আমাকে ‘এক্কেবারে মানাইছে’ না। এখান থেকে চলে যেতে চাই। কিন্তু কোথায় পাবো লাল পাহাড়ির দেশ? কোথায় পাবো রাঙামাটির দেশ? সেখানে আমাকে কে নিয়ে যাবে?    

মঙ্গলবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৭

বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান দুই ব্যক্তিত্ব


বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান দুই ব্যক্তিত্ব কবি আহসান হাবীব আর কথাশিল্পী শওকত ওসমানের আজ (২ জানুয়ারি) জন্মশতবার্ষিকী। শারীরিক গড়ন অনেকটা একই রকম হলেও স্বভাবে দু’জন ছিলেন বিপরীত জগতের বাসিন্দা। একজনের ছিল নিভৃত জগত। আরেকজনের ভুবন ছিল কোলাহলময়। সেই শৈশবেই এই দু’জনের সঙ্গে পরিচয় হয়। একজনের সঙ্গে পাঠ্য বইয়ের মাধ্যমে। আরেকজনের সঙ্গে তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে। যতদূর মনে পড়ে, স্কুল জীবনে পড়েছিলাম আহসান হাবীবের ছড়া ‘মেঘনা পাড়ের ছেলে’। আর শওকত ওসমানের একাধিক গ্রন্থের নাম যে কারণেই হোক জানা হয়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে দু’জনের সঙ্গেই সাক্ষাৎ হয়েছে।

কলেজে পড়ার সময় একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলে সে সময় ঘনিষ্টতা হয় কবি আবিদ আজাদের সঙ্গে। সেই সুবাদে তাঁর সঙ্গে বিভিন্ন সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে যাওয়ার সুযোগ হয়। দৈনিক বাংলার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবীব। চারতলায় বসতেন। তাঁর সামনে অনুজ্জ্বল একটি টেবিল। তাতে জমে থাকতো লেখার স্তুপ। চারপাশে কেমন যেন একটা গুমট পরিবেশ। তার মধ্যেই খুব গম্ভীর ও নিবিষ্ট মনে তিনি সম্পাদনার কাজ করতেন। হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। কথা খুবই কম বলতেন। কবি আবিদ আজাদ তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলা ভাষার অন্যতম একজন সেরা কবির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সেদিন নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হয়েছিল।



আমি তখন দৈনিক বাংলার বাণীতে কর্মরত। সে সময় সম্ভবত ‘রকমারি’ নামে চার পৃষ্ঠার একটি সাপ্তাহিক আয়োজনের সম্পাদনা করতেন কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান। তাতে নিয়মিত লিখতেন কথাশিল্পী শওকত ওসমান। সে সময় তাঁর একটি ধারাবাহিক রচনা ‘স্মৃতিখণ্ড : মুজিবনগর’ প্রকাশিত হচ্ছিল। সে কারণে তিনি বাংলার বাণীতে আড্ডা দিতে আসতেন। তুখোড় আড্ডাবাজ ছিলেন। তাঁর উপস্থিতিতে প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে ওঠতো নিউজ রুম। সোহরাব ভাই কিছু দিনের জন্য ছুটিতে দেশের বাইরে গেলে তিনি ‘রকমারি’ দেখার দায়িত্ব আমাকে দিয়ে যান। সেই সময় শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিছুটা অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ হয়। তাঁর লেখার ফাইনাল প্রুফ তিনি নিজেই দেখতেন। দেখা হলেই তাঁর নিজস্ব স্টাইলে সম্বোধন করতেন, ভাই দুলাল কিংবা ভ্রাতৃ দুলাল। আমার অনুপস্থিতিতে দু’দিন আমাকে নিউজপ্রিন্টের কাগজে দুটি চিরকুট লিখে দিয়ে যান। এটি ছিল তাঁর সহজাত বৈশিষ্ট্য। তিনি কত জনকে যে কত কত চিরকুট লিখেছেন। চিরকুটগুলো ছিল খুবই মজার মজার। বেশিরভাগ সময় তাতে থাকতো ছন্দের মিল দিয়ে লিমিরিক জাতীয় কয়েকটি লাইন কিংবা কারো নাম বা বৈশিষ্ট্য নিয়ে ব্যতিক্রমধর্মী কোনো মন্তব্য। আমাকে লেখা তাঁর চিরকুট দুটি ছিল আমার জন্য অমূল্য সম্পদ। দুঃখজনক হলো, সেই সম্পদ আমি খুঁজে পাচ্ছি না।
প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকের পাশাপাশি কথাশিল্পী শওকত ওসমান নানান কারণে আলোচিত ছিলেন। আমি যত দূর জানি, গৃহস্থালির কাজে দেশে প্রথম গ্যাসের লাইন সংযোগ দেওয়া হয় তাঁর শান্তিনগরের বাসায়। ১৯৮৩ সালে তিনি পেয়েছিলেন একুশে পদক। সেই সুবাদে তাঁকে দেওয়া হয় একটি স্বর্ণ পদকও। তিনি পদকটি স্বর্ণের দোকানে নিয়ে গিয়ে জানতে পারেন, তাতে খাদ ভর্তি। এ নিয়ে সে সময় ব্যাপক হৈ চৈ হয়। তিনি নিজেও ছিলেন দারুণ হুল্লোড়বাজ। যে কোনো আসর জমিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো তুলনা ছিল না। এমন ব্যক্তিত্ব এখন আর খুব একটা দেখা যায় না।
কবি আহসান হাবীব ও কথাশিল্পী শওকত ওসমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তাঁদের প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।  

রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৬

ক্যানভাসে শীতের অনুভব


সব ঋতু মোটামুটি একইভাবে কেটে যেত। খুব একটা পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। কখনও সহনীয় গরম। কখনও অসহনীয় গরম। কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। কখনও মুষলধারে বৃষ্টি। কখনও রঙধনু আকাশ। কখনও মেঘলা আকাশ। প্রকৃতির শান্ত রূপ যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি মহা চোটপাটও।  এটাকে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার মনে হতো। মনে তেমন একটা ছাপ ফেলতো না। সেই বয়সে সৌন্দর্যবোধ এতটা ছিল না। রোমান্টিকতা ছিল না। বুদ্ধিমত্তাও শাণিত ছিল না। এমনিতেই আমার বুদ্ধি শার্প ছিল না। (এখনও আগের মতোই আছে।) মস্তিক্সের অ্যান্টেনা কোনো কিছু সহজে ক্যাচ করতে পারতো না। সবাই যেটা চট করে বুঝতে পারে, আমি সেটা পারতাম না। কোনো কিছু বুঝতে বুঝতেই সময় পেরিয়ে যেত। যে কারণে প্রকৃতির রূপ বদলের মর্ম বুঝতে পারতাম না। এখনও খুব যে চালাক-চতুর হতে পেরেছি, সেটা বলা যাবে না। তবে প্রকৃতির বহিরঙ্গের পরিবর্তনটা অন্তত ধরতে পারি। শারীরিক ও মানসিক কারণেও টের পেয়ে যাই। তাছাড়া বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি কি একটু খোলতাই হয়েছে? ঠিক জানি না।
 

তবে বোধহীন সেই বয়সে একমাত্র বুঝতে পারতাম শীতকালকে। না বুঝে উপায়ও ছিল না। এ ঋতুটি একদমই অন্যরকম। তার কুহক, তার মায়াময়তা, তার সৌন্দর্য আবিষ্ট করে দিয়েছে। তবে তার পাতাঝরার কান্না বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিত বিষণ্নতা। প্রকৃতিকে যখন উত্তরের হাওয়া বইতে শুরু করতো, তখন ঠিকই টের পাওয়া যেত। আর হাড়কাঁপানো কনকনে শীত তো তার দাপট দিয়ে তার আবির্ভাব কাউকে না বুঝিয়ে ছাড়তো না। প্রত্যুষের কুয়াশা, ভোরের শিশির আর সকালের মিষ্টি নরম রোদের কোনো তুলনা ছিল না। থরে থরে সাজানো প্রকৃতির এ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃত্ত না হয়ে কি পারা যায়? কুয়াশার কারণে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার সহজাত চুল্লি ছিল বেশ মজাদার। পায়ে পায়ে ঘাসের শিশির মাড়িয়ে যাওয়াটা ছিল পুলকজাগানিয়া। মুক্তোর মতো দেখতে টলমলে শবনম মুখে মাখালে মনে হতো ঔজ্জ্বল্য বুঝি অনেকখানি বেড়ে গেল। শরীরে মিষ্টি রোদের আদর খাওয়াটা আমার কাছে মনে হয়েছে স্বর্গীয় একটা ব্যাপার। এমন মুহুর্তের জন্য চিরকাল মুখিয়ে থাকা যায়।


শীতের রংচঙে পোশাকের কারণে শরীরটাও হয়ে ওঠে রংদার। মনটাও প্রজাপতির মতো রঙিন। চারপাশে যেন আনন্দের পসরা সাজানো থাকে। অনুভবটা হয় এমন : ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো’। চলায় আনন্দ। ঘুরায় আনন্দ। খেলায় আনন্দ। এমনকি খুব বেশি দূরে না গেলেও মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠেছে। প্রিয়জনের সঙ্গে একই রিক্সায় একই চাদরের আড়ালে উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নেওয়াটা ছিল রোমাঞ্চকর। খাওয়াদাওয়া করতেও মজা লেগেছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, টমেটো, বরবটি, মুলা, লাউ, লাল শাক, পুঁই শাক, পাট শাক, কলমি শাক, ডাটা শাক, মুলা শাক, সরিষা শাক সহ টাটকা শাক-সব্জির কদরই ছিল আলাদা। স্বয়ংক্রিয় বাবুর্চির অদৃশ্য ছোঁয়ায় সব খাবারের সোয়াদও যেন বেড়ে যেত। অবশ্যই পরিবেশিত খাবার গরম গরম হতে হতো। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এরচেয়ে বিস্বাদ খাবার আর কিছু ছিল না।

রাতে ঘুমটাও হয়েছে গভীর। বিছানায় লেপ-তোশকের ওম যে কি আরামদায়ক! যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়েছে জীবনের অনাবিল সুখ। তবে সকাল বেলা এই উষ্ণতা ছেড়ে ওঠে আসাটা জীবনের একটি কঠিনতম কাজ মনে হতো। যেন প্রিয়তমার নিবিড় আলিঙ্গন ছেড়ে অনিচ্ছা নিয়ে সরে যাওয়া। আর শীতল পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়াও ছিল দণ্ড ভোগ করার মতো। শীতকালে রাতের বেলা আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলার ধুম পড়ে যেত। পাড়ায় পাড়ায়। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায়ও।            

গ্রামের বাড়িতে শীতকালটা ছিল আরো বেশি উপভোগ্যময়। যখন খুব ভোরে গ্রামের ঘুম ভেঙে যেত, তখন প্রকৃতির মাধুর্য বুকের মধ্যে সুখের কাঁপন ধরিয়ে দিত। শুনতে পাওয়া যেত শিশিরের শব্দ। উত্তরীয় দিয়ে শরীর মুড়িয়ে ঘরের বাইরে পা দিলে কুয়াশার মিহি রেশমি চাদরে ঢাকা প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠতো। উদীয়মান সূর্য আর কুয়াশার মিথস্ক্রিয়ায় যে দৃশ্যপট দৃশ্যমান হতো, এমন জীবন্ত ছবি কোনো শিল্পীর তুলিতে প্রস্ফুটিত হওয়া সম্ভব নয়। অপার্থিব এক মায়াবী জগত। কী যে নিষ্পাপ, কী যে পবিত্র, কী যে বিশুদ্ধ। মনটাকেও পরিশুদ্ধ করে দিত। কুয়াশাও এক ধরনের জাদুবাস্তবতা। তার ভেলকিতে অদৃশ্য হয়ে যেত ঘরবাড়ি-নদনদী-বিস্তীর্ণ প্রান্তর। আবার তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একটু একটু করে ম্যাজিকের মতো আড়াল থেকে দৃশ্যমান হতো। সরিষার ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে ওঠতো বিস্তৃত ভূমি। পাখিদের মনেও যেন রংয়ের ছোঁয়া লাগতো। ছড়িয়ে দিত চঞ্চলতা। ছড়িয়ে দিত সুরেলা আমেজ।


বেহেস্তি শরাব কি খেজুরের রসের মতো? ঘুম থেকে ওঠে চুমুক দেওয়ার পর মনে হয়েছে পান করছি শরাবন-তহুরা। তার মৌতাত যেন কাটতেই চাইতো না। আগুনের কুণ্ডুলী জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়া কিংবা রান্নাঘরের চুলার আগুনে ভাঁপ নেওয়ার সময় সঞ্চালিত হয়েছে রক্তের প্রবাহ। ফসল কাটার পর জমিতে নাড়ার আগুনে কলুই পুড়িয়ে খাওয়া ছিল অন্যরকম আনন্দ। সের বা ডুলায় (বেতের তৈরি) করে পাটালি বা ঝোলা গুড় দিয়ে হুড়ুম বা মুড়ি খাওয়ার মজাও কম ছিল না। গরম ডিম সিদ্ধ, মোয়া, ভাঁপা, চিতই সহ রসের বা রকমারি পিঠাপুলি, পায়েসের ব্যঞ্জন ছিল যেন অমৃত। স্বল্প পানির খাল কিংবা বিলে সংঘবদ্ধ হয়ে পোলো দিয়ে একতালে মাছ ধরার ঐকতান বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। কই মাছ, শোল মাছ, টাকি মাছ, বাইন মাছ, শিং-এর মতো জিওল মাছ ধরতে পারার ধকল কিন্তু কম ছিল না।

শীতের বিপরীত চিত্রও ছিল। যা মোটেও রোমান্টিক নয়। গরীবদের অসহায়তা, দুর্ভোগ ও দুর্দশাও অবলোকন করতে হয়েছে। একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয়, একটি গরম কাপড়ের জন্য তাঁদের উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষার কত চিত্রই তো আমাদের চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি। আর সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়ও তা গুরুত্বসহকারে শোভা পেয়েছে। দেখা দিত ঠাণ্ডা জাতীয় রোগ। প্রকোপ বাড়তো সর্দি-কাশি-জ্বরের। তখন শীতকালটাকে অভিশাপের মতো মনে হয়েছে। তাছাড়া কখনও কখনও অকারণেই ছুঁয়ে যেত বিষণ্ণতা। তারপরও সেই বয়সে শীতকালটা ছিল আনন্দের। উপভোগের। উল্লাসের।
    

অতীতের চিত্রপটে শীতকালের যুগপৎ এই ছবি হৃদয়পটে স্থায়ী হয়ে আছে। এখন তো আগের মতো সেই শীত নেই। সেই সবুজ নেই। সেই প্রকৃতিও নেই। শহরে এখন আর নিয়মিত তেমনভাবে তীব্র শীত নামে না। শিশিরের দেখা পাওয়া যায় না। শীতের পাখিও আসে না। তবে যা যা আসে তা হয়তো আমার চোখে ভাসে না। আমারও তো সেই শৈশব নেই। সেই কৈশোর নেই। সেই তারুণ্য নেই। যে কারণে এখনকার শীত হয়তো আমার মনে সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে না। সেই আনন্দ পাই না। সেই ভালোবাসাও পাই না।
 

আর গ্রামের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটাই অপস্রিয়মাণ। বলতে গেলে কোনো যোগাযোগই নেই। তবে দূর থেকে যেটুকু অনুভব করি, গ্রামও তো এখন শহর হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সেখানেও শীতের তীব্র কামড় নেই। পিঠাপুলির তেমন কদর নেই। মাছের সমাগমও নেই। নদী-নালা-খাল-বিলই তো হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে শীতইবা আসবে কীভাবে? বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। বদলে যাচ্ছে শীতকালও। শীতকালটা তাই হয়ে আছে নস্টালজিয়ায় আঁকা ক্যানভাসের ছবি। ক্যাটালগ উল্টিয়ে উল্টিয়ে আপন মনে তাকে কখনও কখনও খুঁজি।