পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

রবিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৬

ক্যানভাসে শীতের অনুভব


সব ঋতু মোটামুটি একইভাবে কেটে যেত। খুব একটা পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। কখনও সহনীয় গরম। কখনও অসহনীয় গরম। কখনও ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। কখনও মুষলধারে বৃষ্টি। কখনও রঙধনু আকাশ। কখনও মেঘলা আকাশ। প্রকৃতির শান্ত রূপ যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি মহা চোটপাটও।  এটাকে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার মনে হতো। মনে তেমন একটা ছাপ ফেলতো না। সেই বয়সে সৌন্দর্যবোধ এতটা ছিল না। রোমান্টিকতা ছিল না। বুদ্ধিমত্তাও শাণিত ছিল না। এমনিতেই আমার বুদ্ধি শার্প ছিল না। (এখনও আগের মতোই আছে।) মস্তিক্সের অ্যান্টেনা কোনো কিছু সহজে ক্যাচ করতে পারতো না। সবাই যেটা চট করে বুঝতে পারে, আমি সেটা পারতাম না। কোনো কিছু বুঝতে বুঝতেই সময় পেরিয়ে যেত। যে কারণে প্রকৃতির রূপ বদলের মর্ম বুঝতে পারতাম না। এখনও খুব যে চালাক-চতুর হতে পেরেছি, সেটা বলা যাবে না। তবে প্রকৃতির বহিরঙ্গের পরিবর্তনটা অন্তত ধরতে পারি। শারীরিক ও মানসিক কারণেও টের পেয়ে যাই। তাছাড়া বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বুদ্ধি কি একটু খোলতাই হয়েছে? ঠিক জানি না।
 

তবে বোধহীন সেই বয়সে একমাত্র বুঝতে পারতাম শীতকালকে। না বুঝে উপায়ও ছিল না। এ ঋতুটি একদমই অন্যরকম। তার কুহক, তার মায়াময়তা, তার সৌন্দর্য আবিষ্ট করে দিয়েছে। তবে তার পাতাঝরার কান্না বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দিত বিষণ্নতা। প্রকৃতিকে যখন উত্তরের হাওয়া বইতে শুরু করতো, তখন ঠিকই টের পাওয়া যেত। আর হাড়কাঁপানো কনকনে শীত তো তার দাপট দিয়ে তার আবির্ভাব কাউকে না বুঝিয়ে ছাড়তো না। প্রত্যুষের কুয়াশা, ভোরের শিশির আর সকালের মিষ্টি নরম রোদের কোনো তুলনা ছিল না। থরে থরে সাজানো প্রকৃতির এ আয়োজনের সঙ্গে সম্পৃত্ত না হয়ে কি পারা যায়? কুয়াশার কারণে মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার সহজাত চুল্লি ছিল বেশ মজাদার। পায়ে পায়ে ঘাসের শিশির মাড়িয়ে যাওয়াটা ছিল পুলকজাগানিয়া। মুক্তোর মতো দেখতে টলমলে শবনম মুখে মাখালে মনে হতো ঔজ্জ্বল্য বুঝি অনেকখানি বেড়ে গেল। শরীরে মিষ্টি রোদের আদর খাওয়াটা আমার কাছে মনে হয়েছে স্বর্গীয় একটা ব্যাপার। এমন মুহুর্তের জন্য চিরকাল মুখিয়ে থাকা যায়।


শীতের রংচঙে পোশাকের কারণে শরীরটাও হয়ে ওঠে রংদার। মনটাও প্রজাপতির মতো রঙিন। চারপাশে যেন আনন্দের পসরা সাজানো থাকে। অনুভবটা হয় এমন : ‘ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো’। চলায় আনন্দ। ঘুরায় আনন্দ। খেলায় আনন্দ। এমনকি খুব বেশি দূরে না গেলেও মনটা প্রফুল্ল হয়ে ওঠেছে। প্রিয়জনের সঙ্গে একই রিক্সায় একই চাদরের আড়ালে উষ্ণতা ভাগাভাগি করে নেওয়াটা ছিল রোমাঞ্চকর। খাওয়াদাওয়া করতেও মজা লেগেছে। ফুলকপি, বাঁধাকপি, শিম, টমেটো, বরবটি, মুলা, লাউ, লাল শাক, পুঁই শাক, পাট শাক, কলমি শাক, ডাটা শাক, মুলা শাক, সরিষা শাক সহ টাটকা শাক-সব্জির কদরই ছিল আলাদা। স্বয়ংক্রিয় বাবুর্চির অদৃশ্য ছোঁয়ায় সব খাবারের সোয়াদও যেন বেড়ে যেত। অবশ্যই পরিবেশিত খাবার গরম গরম হতে হতো। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এরচেয়ে বিস্বাদ খাবার আর কিছু ছিল না।

রাতে ঘুমটাও হয়েছে গভীর। বিছানায় লেপ-তোশকের ওম যে কি আরামদায়ক! যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়েছে জীবনের অনাবিল সুখ। তবে সকাল বেলা এই উষ্ণতা ছেড়ে ওঠে আসাটা জীবনের একটি কঠিনতম কাজ মনে হতো। যেন প্রিয়তমার নিবিড় আলিঙ্গন ছেড়ে অনিচ্ছা নিয়ে সরে যাওয়া। আর শীতল পানি দিয়ে হাত-মুখ ধোয়াও ছিল দণ্ড ভোগ করার মতো। শীতকালে রাতের বেলা আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলার ধুম পড়ে যেত। পাড়ায় পাড়ায়। এমনকি বাড়ির আঙ্গিনায়ও।            

গ্রামের বাড়িতে শীতকালটা ছিল আরো বেশি উপভোগ্যময়। যখন খুব ভোরে গ্রামের ঘুম ভেঙে যেত, তখন প্রকৃতির মাধুর্য বুকের মধ্যে সুখের কাঁপন ধরিয়ে দিত। শুনতে পাওয়া যেত শিশিরের শব্দ। উত্তরীয় দিয়ে শরীর মুড়িয়ে ঘরের বাইরে পা দিলে কুয়াশার মিহি রেশমি চাদরে ঢাকা প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠতো। উদীয়মান সূর্য আর কুয়াশার মিথস্ক্রিয়ায় যে দৃশ্যপট দৃশ্যমান হতো, এমন জীবন্ত ছবি কোনো শিল্পীর তুলিতে প্রস্ফুটিত হওয়া সম্ভব নয়। অপার্থিব এক মায়াবী জগত। কী যে নিষ্পাপ, কী যে পবিত্র, কী যে বিশুদ্ধ। মনটাকেও পরিশুদ্ধ করে দিত। কুয়াশাও এক ধরনের জাদুবাস্তবতা। তার ভেলকিতে অদৃশ্য হয়ে যেত ঘরবাড়ি-নদনদী-বিস্তীর্ণ প্রান্তর। আবার তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একটু একটু করে ম্যাজিকের মতো আড়াল থেকে দৃশ্যমান হতো। সরিষার ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে ওঠতো বিস্তৃত ভূমি। পাখিদের মনেও যেন রংয়ের ছোঁয়া লাগতো। ছড়িয়ে দিত চঞ্চলতা। ছড়িয়ে দিত সুরেলা আমেজ।


বেহেস্তি শরাব কি খেজুরের রসের মতো? ঘুম থেকে ওঠে চুমুক দেওয়ার পর মনে হয়েছে পান করছি শরাবন-তহুরা। তার মৌতাত যেন কাটতেই চাইতো না। আগুনের কুণ্ডুলী জ্বালিয়ে উত্তাপ নেওয়া কিংবা রান্নাঘরের চুলার আগুনে ভাঁপ নেওয়ার সময় সঞ্চালিত হয়েছে রক্তের প্রবাহ। ফসল কাটার পর জমিতে নাড়ার আগুনে কলুই পুড়িয়ে খাওয়া ছিল অন্যরকম আনন্দ। সের বা ডুলায় (বেতের তৈরি) করে পাটালি বা ঝোলা গুড় দিয়ে হুড়ুম বা মুড়ি খাওয়ার মজাও কম ছিল না। গরম ডিম সিদ্ধ, মোয়া, ভাঁপা, চিতই সহ রসের বা রকমারি পিঠাপুলি, পায়েসের ব্যঞ্জন ছিল যেন অমৃত। স্বল্প পানির খাল কিংবা বিলে সংঘবদ্ধ হয়ে পোলো দিয়ে একতালে মাছ ধরার ঐকতান বাঙালির ঐতিহ্যের অংশ। কই মাছ, শোল মাছ, টাকি মাছ, বাইন মাছ, শিং-এর মতো জিওল মাছ ধরতে পারার ধকল কিন্তু কম ছিল না।

শীতের বিপরীত চিত্রও ছিল। যা মোটেও রোমান্টিক নয়। গরীবদের অসহায়তা, দুর্ভোগ ও দুর্দশাও অবলোকন করতে হয়েছে। একটু উষ্ণতা, একটু আশ্রয়, একটি গরম কাপড়ের জন্য তাঁদের উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষার কত চিত্রই তো আমাদের চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি। আর সংবাদপত্রের পাতায় পাতায়ও তা গুরুত্বসহকারে শোভা পেয়েছে। দেখা দিত ঠাণ্ডা জাতীয় রোগ। প্রকোপ বাড়তো সর্দি-কাশি-জ্বরের। তখন শীতকালটাকে অভিশাপের মতো মনে হয়েছে। তাছাড়া কখনও কখনও অকারণেই ছুঁয়ে যেত বিষণ্ণতা। তারপরও সেই বয়সে শীতকালটা ছিল আনন্দের। উপভোগের। উল্লাসের।
    

অতীতের চিত্রপটে শীতকালের যুগপৎ এই ছবি হৃদয়পটে স্থায়ী হয়ে আছে। এখন তো আগের মতো সেই শীত নেই। সেই সবুজ নেই। সেই প্রকৃতিও নেই। শহরে এখন আর নিয়মিত তেমনভাবে তীব্র শীত নামে না। শিশিরের দেখা পাওয়া যায় না। শীতের পাখিও আসে না। তবে যা যা আসে তা হয়তো আমার চোখে ভাসে না। আমারও তো সেই শৈশব নেই। সেই কৈশোর নেই। সেই তারুণ্য নেই। যে কারণে এখনকার শীত হয়তো আমার মনে সেই উচ্ছ্বাস নিয়ে আসে না। সেই আনন্দ পাই না। সেই ভালোবাসাও পাই না।
 

আর গ্রামের সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটাই অপস্রিয়মাণ। বলতে গেলে কোনো যোগাযোগই নেই। তবে দূর থেকে যেটুকু অনুভব করি, গ্রামও তো এখন শহর হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। সেখানেও শীতের তীব্র কামড় নেই। পিঠাপুলির তেমন কদর নেই। মাছের সমাগমও নেই। নদী-নালা-খাল-বিলই তো হারিয়ে যাচ্ছে। তাহলে শীতইবা আসবে কীভাবে? বদলে যাচ্ছে প্রকৃতি। বদলে যাচ্ছে শীতকালও। শীতকালটা তাই হয়ে আছে নস্টালজিয়ায় আঁকা ক্যানভাসের ছবি। ক্যাটালগ উল্টিয়ে উল্টিয়ে আপন মনে তাকে কখনও কখনও খুঁজি।          
         

রবিবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৬

সূর্যস্মান


বুকের মধ্যে অভিমানের মেঘ জমলে তার পরিণতি কী হয়, আমি ঠিক জানি না। তবে তার খেসারত দিতে হয় বেশ ভালোভাবেই। যেমনটি আমাকেও দিতে হচ্ছে। সোনা যতই পোড়ানো হয়, ততই নাকি খাঁটি হয়। মানুষ পুড়লে নিকষিত হেম হয় কিনা জানি না। তবে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যেতে হয়। অনেক দিন যাবৎই আমি ভালো নেই। আমার মন ভালো নেই। সঙ্গত কারণে ঈদ উপলক্ষে আমার কোনোরকম তৎপরতাই ছিল না। কোনো কিছুতেই আমার আগ্রহ ছিল না। লীলাবতির সঙ্গে কথা ছিল, সে কথা রাখে নি। সে কথা রাখেও না। তার কারণে সব কিছুই থেকে আমি নিজেকে গুটিয়ে নেই। এ নিয়ে বাসায় মনোমালিন্য হয়। সেটা আমি পাত্তাই দেই নি। তারপরও আমার জন্য ঈদের নতুন পোশাক কেনা হয়, তখনই আমি বলেছি, এটা কেনা হলে আমি পরবো না। ক’দিন যাবৎ সম্পর্কের বেশ অবনতি ঘটে। কথা-বার্তা বন্ধ। আজ সকালে খুব তাড়াতাড়ি ঘুম ভেঙে যায়। এটা ইদানিং নিয়মিতই হচ্ছে। ঘুমই হতে চায় না। এর কারণ, লীলাবতি। তার কারণে আমি শান্তিতে থাকতে পারছি না। সকালে গোসল করার পর আমাকে নতুন পোশাক পরতে দেওয়া হলে আমি নাকচ করে দেই। বাসার ছোটদের দিয়েও অনুরোধ করা হয়। সেটাও প্রত্যাখ্যান করি। ওমনি ক্ষেপে যায়। যা নয় তাই বলতে থাকে। এমনও বলে, দেশের খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও মিশুকের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলেও আমার মতো অখ্যাতদের কেন অপমৃত্যু হয় না? এটা শোনার পর মেজাজ হারিয়ে ফেলি। গালাগালি করি।

ইচ্ছে করেই কালো প্যান্ট ও কালো গেঞ্জি পরে বাসা থেকে বের হয়ে যাই। অনেক দিন ধরে শেভও করা হয় না। বাসার কাছে সকাল পৌনে নয়টায় নামাজ শেষ করে গন্তব্যহীনভাবে হাঁটতে থাকি। কারো সঙ্গে কোলাকুলিও করা হয় না। সকালে এক চুমুক পানিও খাওয়া হয় নি। ঘরে-বাইরে আমি এক জটিল সময় অতিক্রম করছি। এ থেকে পরিত্রাণ পাচ্ছি না। পারবো কীভাবে? আমার মন আমাকে পারতে দিচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নেই, নিজেকে যতটা পারি পুড়াবো। পুড়িয়ে যদি নিজের ভিতরের সব রাগ-ক্ষোভ-যন্ত্রণা-কষ্ট-অভিমান-ব্যথা-বেদনা গলিয়ে দেওয়া যায়! তেমন একটা ইচ্ছে নিয়ে আমি হাঁটতে থাকি। প্রথমদিকে ছিল রোদ-ছায়ার লুকোচুরি খেলা। একটু একটু করে ঘামতে থাকি। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্গন্ধে পেট গুলিয়ে আসতে চাইছিল। হাউজিং হয়ে বছিলার দিকে যেতে থাকি। বছিলা সড়কে ওঠার পর আগুনের তাপ বের হচ্ছিল। আমি কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সূর্যের তরল সোনায় অবগাহন করতে থাকি। এমনিতেই আমি কালো, সূর্যের আগুন আমাকে করে তোলে কৃষ্ণাঙ্গ।

তবে এই পথে স্মৃতিরা সব ডানা মেলে দেওয়ায় মনের মধ্যে ভাসতে থাকে কত কথা। কত স্মৃতি। স্মৃতির জাবর কাটতে থাকায় সে সময় কোনো কষ্ট হয় নি। বছিলা ব্রিজের নিচে কিছুটা সময় বসে থাকি। জায়গাটা অনেকটা বদলে গেছে। চায়ের দোকানটা নেই। পানি বেড়ে যাওয়ায় নাকি অন্য কারণে পাথরের ঘাটটি সমান্তরাল হয়ে গেছে, বুঝতে পারলাম না। এ এলাকার তরুণ প্রজন্ম  ঈদ উপলক্ষে এখানে এসে একত্রিত হয়। মধ্যবয়সীরা পুনর্মিলনী করলেন। তাদের মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। অন্য সময় লীলাবতির সঙ্গে এখানে আসলে সময় চলে গেলেও একটুও টের পাই না। আর আজ একা একা বসে থাকতে অসহনীয় লাগছে। অস্থির লাগতে থাকে। ঈদের দিন আমাকে এখানে একা একা বসে থাকতে দেখে কেউ কেউ কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে দেখতে থাকেন। সেখান থেকে ওঠে পড়ে বছিলা ব্রিজের নিচে চর ওয়াশপুরের দিকে যাই। এ এলাকায় আগে কখনো আসি নি। অনেকটা পথ যাওয়ার পর দেখলাম, আর যাওয়া যায় না। তবে ঈদ উপলক্ষে এলাকার রাস্তা-ঘাট বেশ জমজমাট। সবাই ঈদটা উপভোগ করছেন। ক্ষুধার্ত পেট। সূর্যের লেলিহান শিখা। রীতিমতো গোসল করতে থাকি। তারপরও থামি নি। বছিলা ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়ার পর দেখলাম, রাস্তার পাশে ছোট ছোট খাবারের দোকান দিয়ে গান বাজানো হচ্ছে গগণবিদারীভাবে। ইংলিশ ও হিন্দি ছবির বিটের গান।

কিছুটা পথ যাওয়ার পর দেখলাম, ডান দিক দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে। চর ঘাটারপুর। এ পথ দিয়েও কখনো যাই নি। গ্রামীণ পথ হলেও তেমন ঘন গাছ-গাছালি নেই। রোদের তাপে ছটফট করতে থাকি। একটা কালভার্ট পেরিয়ে যাওয়ার পর রাস্তা ডানে-বামে চলে গেছে। আমি কোন দিকে যাব, দ্বিধায় পড়ে যাই। বাঁ দিক দিয়েই যেতে থাকি। লুটেরচর। রাস্তা ভালোই। কোথাও কোথাও মাচা বাঁধানো। তাতে বসে অনেকেই গাল-গল্প করছেন। কেউবা তাস খেলছেন। তবে কোনো কোনো দোকানে গ্রামের প্রবীণরা জমিয়ে আড্ডা মারছেন। কিশোরীদের সাজ-সজ্জা ছিল দেখার মতো। মনে হলো, সবাই পার্লার থেকে জমকালো সেজে এসেছে। কিশোরী ও তরুণদের চোখে পড়লো বেশি। তবে বাসা-বাড়ি, দোকানে অেেনকেই টিভি দেখতে থাকেন। বাংলা ছবির প্রতি ঝোঁকটাই বেশি। আমি একবুক ক্লান্তি নিয়ে হাঁটতে থাকি। কোনো কিছু আমাকে দমাতে পারে না। আমি আসলে নিজেও জানি না, আমি কেন এভাবে হাঁটছি, নিজেকে কেন শাস্তি দিচ্ছি? কোনো কোনো বাড়ি থেকে সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণ নাকে আসছিল। তাতে ক্ষুধার্ত পেট গুলিয়ে উঠছিল। কেউ কি ভাবতে পারছিলেন, ঈদের দিনে আমি খালি পেটে নিজেকে শাস্তি দেওয়ার জন্য হেঁটে যাচ্ছি। এমন জানলে বোধহয় পথের কোনো বাড়ি থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে খেতে দিতেন। আমি তো ইচ্ছে করেই খাচ্ছি না। নিজেকে কষ্ট দেব বলেই র্ঠিক করেছি। সেটাই করছি। পথেরও যেন শেষ নেই। অন্তহীন পথ।

হাঁটতে হাঁটতে চলে যাই শ্যামলাশী বাহেরচর। অনেকটা পথ যাওয়ার পর দেখি, জমজমাট মেলা বসেছে। তাতে নানা উপকরণ। আছে পুরস্কারসমেত লটারি ও বিভিন্ন খেলা। সবার সক্রিয় অংশগ্রহণে মেলা বেশ জমে ওঠেছে। মেলা ছাড়িয়ে অনেকটা পথ যাওয়ার পর আমি আর পারছিলাম না। পায়ে ফোস্কা পড়ে যায়। জ্বালাপোড়া করতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, আমি আর হাঁটতেই পারছিলাম না। ভর দুপুরের রোদের তেজ আর ক্ষুধার্ত পেট আমাকে কাহিল করে দেয়। পা ব্যথায় টনটন করছিল। তারপরও যতটা পথ এসেছি, আমাকে ফিরে যেতে হলেও আরো দুই ঘণ্টারও বেশি হাঁটতে হবে। ইচ্ছে করলে ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙাচুরা পথে আমি বেবি ট্যাক্সি বা রিক্সা নিতে পারতাম। সেটা নিলাম না। এ পথ দিয়ে সাভার চলে যাওয়া যায়। এটা জেনে আমি অবাক হয়ে যাই। এ রকম একটা পথ আছে একদমই জানতাম না। আমি ফিরে আসতে থাকি। চোখ জ্বালাপোড়া করতে থাকে। এটা কি ঘামের কারণে নাকি চোখের পানিতে, আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবে বুকের মধ্যে হু হু করে ওঠছিল।

ভাবছিলাম, লীলাবতি কেন আমার সঙ্গে এমন করলো? সে কি এখন তার লীলা নিয়ে ব্যস্ত? সে লীলাখেলা করছে আর আমি তারজন্য নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি? নিজেকে পোড়াচ্ছি? চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে থাকে। কিছুক্ষণ পর পর চশমার গ্লাস মুছতে হচ্ছিল। আমি শারীরিক ক্লান্তির চেয়ে মানসিক ক্লান্তিতে বেশি ভেঙে পড়ছিলাম। নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে। পথের ধুলো-বালিতে আমার প্যান্ট ও গেঞ্জি অনেকটাই শাদা হয়ে যায়। মুখ ও দাঁত বালুতে চিকচিক করতে থাকে। পথ যেন আর শেষ হয় না। রোদের তাপও একটুও কমে না। অন্যান্য দিন ছায়া থাকে। আজ একটানা রোদের অবিরাম বর্ষণ চলতেই থাকে। যেন আমার পরীক্ষা নিচ্ছে। আমি কতটা সইতে পারি। সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে যেতে থাকে। মনে হচ্ছিল, আমার অবস্থানটা কাউকে জানিয়ে দিলে ভালো হতো। নিজেই ক্ষান্ত দিলাম। যা হবার হবে, কাউকে জানানোর দরকার নেই। সেই আগের কালভার্টের কাছে এসে সেই পথ দিয়ে না গিয়ে এবার যেতে থাকি লুটেরচরের উত্তরের দিকে।

সেখান থেকে দেখা যায় বছিলা ব্রিজ। মনে হচ্ছিল, এইতো এসে পড়েছি। কোথায় কি? যেতেই থাকি। পথ যেন অন্তহীন হয়ে যেতে থাকে। চিনিও না। লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে এগিয়ে যেতে থাকি। রাজধানীর সংলগ্ন যে এমন গ্রামীণ জনপদ আছে, এটা বোঝারই উপায় নেই। পা চলতে চায় না। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় আমি বেহাল হয়ে পড়ি। সূর্য ক্লান্তিহীনভাবে তাপ বিতরণ করতে থাকে। তারপর চারপাশে বালুর ঢিবি। তার হল্কা এসে গায়ে লাগতে থাকে। অবধূতের উপন্যাস অবলম্বনে ‘মরুর্তীথ হিংলাজ’ ছবিতে একদল তীর্থযাত্রীর দীর্ঘ মরুপথের দুঃসহ যাত্রার কথা বার বার মনে পড়ছিল। তারা তো ঈশ্বর দর্শনের আশায় কঠিন এই যাত্রা বেছে নেন। কিন্তু আমি কেন এমন করলাম? এর কোনো উত্তর পাই না। শুধু একবুক অভিমান নিয়ে আমি চলতে থাকি। একসময় বছিলা ব্রিজের কাছে এসে পড়ি। তখন দীনমণির উত্তাপ আরো বেড়েছে। আমি ঝরঝর করে ঘামছি। শরীরের শেষ পানিটুকু বোধহয় বের হয়ে আসতে চাইছে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত অবস্থায় আমি হাঁটতে থাকি ধীরে ধীরে। কেউ দেখলে মনে করবে, আমি অসুস্থ। টেনে টেনে ঝুঁকে ঝুঁকে হাঁটা। তীব্র রোদ আমার শরীরের সব নির্যাসটুকু নিংড়ে নিতে থাকে। আমি পারছিলাম না। হোঁচট খাচ্ছিলাম। পড়ে যাচ্ছিলাম।

আসলে শরীরে তখন একটুও শক্তি ছিল না। কেবল মনের জোরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এরমধ্যে একটির পর একটি ফোন আর মেসেজ আসতে থাকে। বাসা থেকে তো কিছুক্ষণ পর পর ফোন। আমি কোনো কিছুতেই সাড়া দেইনি। হাউজিং হয়ে তাজমহল রোডে আসতেই সৃষ্টিকর্তার বোধহয় একটু রহম হয়। ছেঁড়া ছেঁড়া কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি হয়। সেটা গায়ে লাগার পরও কোনো বোধ হচ্ছিল না। প্রায় সাতটি ঘণ্টা একটানা হেঁটে আগুনে পুড়ে আমি তখন বোধহীন হয়ে পড়েছি। পেটেও কোনো খাবার নেই। একটা জায়গায় বসে পড়ি। আমার তো পথের এখানেই শেষ নয়। এখনও অনেক কাজ বাকি। ক্ষুধা পেটে আমাকে সব করতে হবে। আমার কোনো উদ্যম নেই। উৎসাহ নেই। আগ্রহ নেই। তারপরও করতে হবে। সবাই ঈদের দিন ভরপেট খায়। আর আমার পেটে কোনো খাদ্য নেই। সেটা ইচ্ছে করেই নেই। এ আমার নীরব প্রতিবাদ। জানি, আমার এই প্রতিবাদ, আমার অভিমানের কোনো মূল্য নেই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তবুও আমি এটা করবো। আজ আমি সূর্যস্মান করেছি। আজ আমার এক ধরনের রোজা। আজ আমি কোনো কিছুই মুখে দেব না। আমি জানি, এতে কারো কিছু আসবে যাবে না। যায়ওনি। বুঝতে পারলাম, লীলাবতির লীলাখেলা চলছে। চলছে রঙবদল। চলছে তার সব কিছুই। কেবল আমিই কঠোর সূর্যস্মান করছি। নিজেকে পোড়চ্ছি। নিকষিত হেম হচ্ছি। আমার জীবনটাই বোধহয় এমন। শুধু কষ্টই পাব। ভালোবাসা পাব না।    

ভুলি না তোমাকে



তবুও অপেক্ষা