পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১৬

এমন দিনে তারে বলা যায়

কত কত দিন কদম ফুলের গন্ধ নেওয়া হয় না। তাকানো হয় না মুগ্ধ দু’চোখে। তবুও এমন বাদল দিনে মনে পড়ে যায় কদম ফুলের কথা। উন্মনা করে দেয় তার বর্ণ, গন্ধ, সৌন্দর্য। নেশাধরানো এ ফুলটি যেন আসে বর্ষার বারতা নিয়ে। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল তো উসকে দেয় স্মৃতিকে। প্রিয়জনের হাত থেকে কদম ফুল নেওয়ার মৌতাত যেন এ জীবনে কিছুতেই কাটতে চায় না। জীবন ভারি অদ্ভুত। এর তল খুঁজে পাওয়া যায় না। কত কঠিন ও জটিল সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তবুও মনটাকে আটকে রাখতে পারা যায় না। যা হাতের নাগালের মধ্যে নেই, যা চাইলেও পাওয়া যায় না, তার জন্য মন কেমন কেমন করে। যা আছে অনুভবে, যা আছে স্মৃতিতে, যা আছে দূরে, সেটাই কেন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বর্ষাকাল বোধকরি এমন। মনটাকে কেমন অচেনা করে দেয়। দুর্বল করে দেয়। ভাবাবেগে আপ্লুত করে তোলে। আকাশ ঘনকালো হলে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলে, মনটা উচাটন উচাটন করে। অকারণেই ভিজে যায় ভিতরভূমি। জমে ওঠে কাব্যের পলিমাটি। উদাসী মন চলে যায় সুদূরে। ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে/আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে’। বর্ষার সঙ্গে মনের


রবিবার, ৮ মে, ২০১৬

গ্রামছাড়া ওই রাঙা মাটির পথ

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিধন্য শান্তিনিকেতনে উৎসবের কোনো কমতি নেই। বলা যায়, পুরো বছরই উৎসবমুখর থাকে। রবীন্দ্র জন্মোৎসব ও তিরোধান বা বৃক্ষরোপণ দিবস, পৌষমেলা, বসন্ত উৎসব সহ বিভিন্ন ঋতুগুলো বেশ ঘটা করে উদযাপন করা হয়। এর বাইরেও আছে রকমারি উৎসব। এসবকে কেন্দ্র করে সংগীত, নৃত্য, নাটক, আবৃত্তি সহ নানামুখী কর্মকা-ে বছরভর মুখর থাকে এ আশ্রম ও শিক্ষাকেন্দ্র। শান্তিনিকেতনে যাঁরা যেতে চান, তাঁরা সাধারণত কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করেই বোলপুরে রওয়ানা হন। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরুতে আমরা যখন আশ্রমে পোঁছাই, সেখানে কোনো উৎসব ছিল না। আনন্দ ছিল না। খুব বেশি জনসমাগমও ছিল না। বরং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন সংরক্ষণ প্রথা তুলে দেওয়ায় চলছিল কঠিন ধর্মঘট। যে কারণে সেখানে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছিল না। এমনিতেই উৎসববিহীন শান্তিনিকেতন, তার ওপর ধর্মঘট, এমন অবস্থায় অনেক দূর থেকে সেখানে যেয়ে যে কারোই মুষড়ে পড়ার কথা। তবে আমরা মোটেও হতোদ্যম হই নি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর শান্তিনিকেতন আমাদের জীবনে অন্য রকম ব্যঞ্জনা নিয়ে আসে। তারপ্রতি আবেগময় এক আকর্ষণ অনুভব করি। সংগত কারণে জীবনে প্রথমবার শান্তিনিকেতন যাওয়াটাই ছিল আমাদের কাছে বড় উৎসব। অন্য কিছু সেই উৎসবকে ম্লান করতে পারে নি। হাওড়া স্টেশন থেকে যখন ‘শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস’-এ ওঠি, তখন থেকেই বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।

এটি আরো বেশি আনন্দময় হয়ে ওঠে, একজন স্মার্ট অন্ধ ভিক্ষুক গায়কের কল্যাণে। অনেকটা পথ তিনি একটির পর একটি রবীন্দ্র সংগীত গাইতে থাকেন। ট্রেনের দোলন আর সুরে সুরে মজে যাই। এছাড়া পথের দুই পাশ দেখছিলাম বুভুক্ষু নয়নে। এ পথ দিয়েই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কত কতবার যাতায়াত করেছেন। আশপাশের বাড়িÑঘর, গাছ-গাছালি, আলো-হাওয়া, জীবনযাত্রা তাঁর মনকে নিশ্চয়ই প্রভাবিত করেছিল। তা থেকে মেতেছেন সৃষ্টির আনন্দে। মনের চোখে সেটা অনুভব করার চেষ্টা করছিলাম। সেটা অনুভব করতে করতে প্রায় ঘণ্টা তিনেকের জার্নি কখন যেন ফুরিয়ে যায়। তখনও মাঘ মাস পুরোপুরিভাবে শেষ না হলেও কড়া রোদ আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। তারপরও এককালের ভুবনডাঙার লালমাটি স্পর্শ করার পর মনটা প্রশান্তিতে ভরে যায়। নামার পরই মনে হচ্ছিল চারদিকে যেন ছড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিশ্বাস-প্রশ্বাস। সেখান থেকে টেম্পোতে কয়েক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে দিতে পাচ্ছিলাম লালমাটি আর সবুজের হাতছানি। মুগ্ধতার আবেশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম গন্তব্যে। প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠেছে শান্তিনিকেতন। সেখানে পৌঁছানোর পর একটা ঘোরের মধ্যে পড়ে যাই। সবটাই মনে হতে থাকে অনেক দিনের চেনা। চাক্ষুষ হয়তো কখনো দেখি নি (টেলিভিশন, বইপত্র-এ দেখার কথা বাদই দিলাম), তবে মনের চোখে তো কম দেখা হয় নি। তারসঙ্গে একটু একটু করে মিলিয়ে নিচ্ছিলাম। পেশাদার গাইড সঙ্গে থাকায় বাড়তি সুবিধা পেয়ে যাই। ভদ্রলোকের এটা রুটি-রুজি হলেও যেভাবে হৃদয়গ্রাহীভাবে সব কিছু তুলে ধরছিলেন, তাতে বুঝতে পারা যায়, তাঁর হৃদয়জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৮৬২ সালে রায়পুরের জমিদারের আমন্ত্রণে রবি ঠাকুরের পিতা ব্রাহ্মè সমাজের নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সেখানে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দু’টি ছাতিম গাছ দেখে সেই গাছের তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন। এখানেই তিনি ‘আমার প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি’ পেয়েছিলেন।

 জায়গাটা তাঁর এত ভালো লেগে যায় যে রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে গ্রহণ করেন ২০ বিঘা জমি। সেই জমিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন উপাসনার জন্য দোতলা একটি বাড়ি। তাঁর নামকরণ করেন ‘শান্তিনিকেতন’। পর্যায়ক্রমে পুরো এলাকাই পরিচিত হয়ে ওঠে এ নামে। ১৮৭৩ সালে ১২ বছর বয়সে এখানে প্রথম আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তারপর থেকেই তাঁর ছিল নিয়মিত যাওয়া-আসা। ১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর গড়ে তোলেন ব্রহ্ম বিদ্যালয়। সেই সময় থেকে জীবনের অধিকাংশ সময়ই কেটে যায় যায় শান্তিনিকেতনে। সবাইকে আমন্ত্রণ জানান এই তীর্থকেন্দ্রে, ‘এসো নীপবনে ছায়াবীথিতলে/এসো করো স্মান নবধারাজলে’। ‘প্রাণের মধ্যে জ্ঞানের প্রতিষ্ঠা’র লক্ষ্য নিয়ে বিদ্যালয়টি রূপান্তরিত করে ১৯১৯ সালে ১৮ জুলাই গড়ে তোলা হয় ‘বিশ্বভারতী’। রবীন্দ্রনাথের ভারত ভাবনা ও বিশ্ব ভাবনার মিলিত রূপই এই বিশ্বতীর্থ। এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই ছিল তাঁর স্বপ্ন ঃ ‘এখানে বিদ্যা আহরণ ও জ্ঞানচর্চার জন্য বিচিত্র মানব আসিয়া একটি নীড় বাঁধিবে’। পরবর্তীতে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে মর্যাদা লাভ করে। এখানকার জীবনদর্শন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, অস্কারজয়ী চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী প্রমুখ। এছাড়া কত কত বিখ্যাত জনের পদস্পর্শ লেগে আছে এখানকার মাটিতে। সেইসঙ্গে শান্তিনিকেতন থেকেই একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ে উনিশ শতকের নবজাগরণের আলো। শান্তিনিকেতনের ছায়াবীথিতলে একে একে পরিচিত হই ছাতিমতলা, বকুলবীথি, শান্তিনিকেতনের বাড়ি, উপাসনাগৃহ বা মন্দির, তালধ্বজ বাড়ি, তিনপাহাড়, আ¤্রকুঞ্জ, দেহলি, গৌরপ্রাঙ্গণ ও ঘণ্টাতলা, গৌরমঞ্চ, শমীন্দ্র শিশু পাঠাগার, পাঠভবনের অফিস, চৈতি, ছাত্রী নিবাস, ব্ল্যাক হাউজ, সংগীত ভবন, কলাভবন, মালঞ্চ বাড়ি, নাট্যঘর, নন্দন ইত্যাদির। এছাড়া দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবাসস্থল উদয়ন, কোণার্ক, উদীচী, বেনুকুঞ্জ, দিনন্তিকা চা চক্র, সন্তোষালয়, চীনাভবন, হিন্দিভবন, দ্বিজবিরাম। দেখতে দেখতে মনের মধ্যে বাজতে থাকে, ‘এসো এসো আমার ঘরে এসো’।

হায়! ঠাকুর তো নেই। কে খুলে দেবেন ঘরের দরজা? প্রতিটি ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস। ধর্মঘটের কারণে রবীন্দ্র মিউজিয়ামে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। সময় না থাকায় যেতে পারি নি ডিয়ার পার্ক, আমার কুঠির, শ্রীনিকেতন, খোয়াই এর মতো দর্শনীয় স্থানে। ‘সেই নিভৃতে, সেই নির্জনে, সেই বনের মর্মরে, সেই পাখির কূজনে, সেই উদার আলোকে, সেই নিবিড় ছায়ায়’ ক্ষণিকের অতিথি হয়ে শান্তিনিকেতনের বিশ্বপ্রকৃতির সুর আর মানবাত্মার সুর অনুধাবন করা মোটেও সহজ নয়। সেই চেষ্টাও করি নি। কেবল অবলোকন করেছি তাঁর কীর্তি, তাঁর সৃষ্টি, তাঁর স্বপ্নকে। চোখের আলোয় যেটুকু দেখা, সেটুকুই অন্তরে গেঁথে নিয়ে এসেছি। যদিও মনটা সেখান থেকে সরে আসতে চাইছিল না। ফেরার সময় বুকের মধ্যে গুঞ্জরিত হচ্ছিল, ‘তুই ফেলে এসেছিস কারে মন, মন রে আমার’। মনটা ফেলে এলেও ফিরে এসেছি রবির ভুবনভরা আলোর ছোঁয়া নিয়ে।

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০১৬

‘তোমায় আমি জোছনা দেব’

চাঁদের হাসির বাঁধ ভেঙেছে, উছলে পড়ে আলো। ও রজনীগন্ধা, তোমার গন্ধসুধা ঢালো।। পাগল হাওয়া বুঝতে নারে ডাক পড়েছে কোথায় তারে-- ফুলের বনে যার পাশে যায় তারেই লাগে ভালো।। নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা, বাণীবনের হংসমিথুন মেলেছে আজ পাখা। পারিজাতের কেশর নিয়ে ধরায়, শশী, ছড়াও কী এ। ইন্দ্রপুরীর কোন্ রমণী বাসরপ্রদীপ জ্বালো।। হায়! এ শহরে এখন চাঁদের হাসির বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাস আর উছলে পড়া আলো দেখার সুযোগ দিনে দিনে সীমিত হয়ে পড়ছে। প্রতি মুহূর্তে ইট-বালু-সিমেন্ট-লোহার আস্তরণ দিয়ে যেভাবে কংক্রিটের সৌধ গড়ে ওঠছে, তাতে হারিয়ে যাচ্ছে নিসর্গ, হারিয়ে যাচ্ছে নীল আকাশ, হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের সারল্য। সেইসঙ্গে কৃত্রিম আলোর বন্যায় ম্লান হয়ে যাচ্ছে জোছনার রুপালি আলো। কখন জোছনা আসে, কখন জোছনা চলে যায়, অধিকাংশ নাগরিকই সেটা অনুধাবন করতে পারেন না। পারেন না বলেই জীবন ক্রমশ নিঃসঙ্গ, বিষণ্ন ও জটিল হয়ে যাচ্ছে। তার প্রভাব পড়েছে সামাজিক জীবনেও। এমন সব ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে একদমই যায় না। তবুও কেউ কেউ এখনও জোছনা ভালোবাসেন। স্নান করেন জোছনায়। ভেসে যান জোছনায়। সুবীর সেনের মতো উদাত্ত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন, ‘নয় থাকলে আরও কিছুক্ষণ/নয় রাখলে হাতে দুটি হাত/নয় ডাকলে আরো কিছু কাছে/দেখো জোছনা ভেজা এই রাত’। বেইলি রোডে চ্যানেল আইয়ের অফিসের পরিসর হয়তো ছোট ছিল। কিন্তু চারপাশে ছিল আলোর ঝলকানি। গ্ল্যামার ছিল। সৌন্দর্য ছিল। (ছিল বলা ঠিক হচ্ছে না। এখনও আছে।) আছে ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ, সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজের সুরেলা কিচিরমিচির। কাছাকাছি আছে রমনা পার্কের সবুজাভ। আছে নাট্যমঞ্চ, মন্ত্রিপাড়া, অফিসার্স ক্লাব। আছে অভিজাত্যের ছোঁয়া।


মুখরোচক খাবার আর জমজমাট আড্ডায় সারাক্ষণ সরগরম তো হয়ে আছেই। আছে কত রকম রসনার হাতছানি। রোজার দিনে রকমারি ইফতারের পসরা সাজানো হয়, তার আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই ছুটে আসেন। রাস্তার পাশের ভ্যানে স্বল্প দামের ফাস্ট ফুড যেমন আছে, তেমনি আছে দামি চেইন শপ। আছে ঝকমকে, স্মার্ট, ড্যাশিং সব ক্রেতা। বাহারি পোশাক। আছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের কলগুঞ্জন। পুরো বেইলি রোড যেন হেসে ওঠে রঙধনুর মতো। আর সন্ধ্যা হলে তো আরো বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। অফিস থেকে বের হলেই মনটা কেমন উড়ৃ উড়ৃ হয়ে যেত। এমন একটি আনন্দময় পরিমণ্ডল থেকে তেজগাও শিল্প এলাকায় চ্যানেল আইয়ের অফিস স্থানান্তর হওয়ায় মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়। যদিও বর্তমান অফিসের সঙ্গে আগের ছোট্ট গণ্ডির অফিসের কোনো তুলনাই হয় না। একটি কর্পোরেট অফিস যেমনটি হওয়া উচিত, তার কোনো কমতি নেই নতুন অফিসে। সাজ-সজ্জায়, সৌকর্যে-সৌন্দর্যে, বহিরঙ্গে। আছে সবুজের কিঞ্চিত ছোঁয়াও। তবুও মনটা পড়ে থাকতো বেইলি রোডে। কিন্তু প্রয়োজন ও চাহিদাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। সে ক্ষেত্রে আবেগও গুরুত্বহীন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একসময় সব কিছু বদলে যায়। এখন আর বেইলি রোডের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। দেখতে দেখতে তাও তো প্রায় সাত বছর হতে চললো। কম সময় তো আর নয়। চ্যানেল আই অফিসের পরিসর এখন অনেক বড়। পরিবারের পরিধিও বেড়েছে। ‘সাপ্তাহিক’, ‘আনন্দ আলো’ পত্রিকার সঙ্গে যোগ হয়েছে ‘রেডিও ভূমি’ ও ‘চ্যানেল আই অনলাইন’ (এ অনলাইনের আজ প্রথম জন্মবার্ষিকী)। সব মিলিয়ে অনেক বেশি জমজমাট।


তাছাড়া অফিস চত্বরে সারা বছরই কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই আছে। এক একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বদলে যায় চ্যানেল আই। সেজে ওঠে নতুন রূপে। হয়ে ওঠে এক খণ্ড বেইলি রোড। কখনো গ্রামীণ পরিবেশের আমেজ পাওয়া যায়। কখনো নাগরিক জীবনের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো লাল-সবুজের ছোঁয়ায় বর্ণিল হয়ে ওঠে। কখনো ব্যান্ড সংগীতে নেচে ওঠে হৃদয়। আবার মাতিয়ে দেয় রবীন্দ্রমেলা, নজরুলমেলা, হুমায়ূনমেলা। এ সব অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমাজের সব স্তরের মানুষের সমাগম লেগেই থাকে। পাশ দিয়ে হেঁটে যান স্বপ্নের তারকারা। কেউ কেউ মুচকি হাসি দিয়ে আলাদাভাবে নজর কেড়ে নেন। তাঁদের ডিওডোরেন্টের সুগন্ধ বুকটা ভরিয়ে দেয়। মনটাও ফুরফুরে হয়ে ওঠে। চাইলে তাঁদের সঙ্গে সেলফিও তোলা যায়। দূরের মানুষদের এতটা কাছাকাছি থাকতে পারাটা তো কম আনন্দদায়ক নয়। তবে আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় চ্যানেল আইয়ের খোলামেলা রুফটপ। এখানেও আয়োজিত হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান। কখনো গানে গানে স্বাগত জানানো হয় ভোরবেলাকে। কখনো প্রাণবন্ত আড্ডা জমে ওঠে লেখক-সাহিত্যিকদের। কখনো সম্ভাবনাময় মডেলদের পদচারণায় অন্য রকম আবেশ ছড়িয়ে পড়ে। চ্যানেল আই ‘নিউজ নাইট’ও কম সৌরভ ছড়ায় না। ক্যান্টিনকে কেন্দ্র করে হরওক্ত ছোট-খাট আড্ডা লেগেই থাকে। ডালপুুরি, লুচি, পরটা-ডিম, মোগলাই পরটা, চায়ের জন্য ছুটে আসেন কম-বেশি সবাই। আপ্যায়িত করা যায় অতিথিদেরও। সিগারেটের নিষিদ্ধ প্রলোভন যাঁরা এড়াতে পারেন না, তাঁদের তো বাধ্য হয়ে আসতেই হয়। আর কাজ করতে করতে হাঁপিয়ে ওঠলে একবুক তাজা বাতাস নেওয়ার জন্য ছাদটাই উত্তম স্থান। খুলে যায় মাথার অনেক জট। ফাঁকে ফাঁকে পুরো অফিসের বিভিন্ন শাখায় কর্মরত সবার সঙ্গে সবার দেখা-সাক্ষাতও হয়ে যায়। ঘুচে যায় দূরত্ব। মোবাইলে সেরে ফেলা যায় গোপন আলাপনও। ছাদটা কখনো হয়ে ওঠে প্রকৃতঅর্থেই খেলার মাঠ। শীতকালে ব্যাডমিন্টন খেলা তো হয়ই, সেইসঙ্গে অনুশীলন চলে ক্রিকেটেরও। একটি ছাদকে কেন্দ্র করে এত আয়োজন, সাধারণত খুব একটা দেখা যায় না। এই ঢাকা শহরে হাইরাইজ বিল্ডিং যেভাবে ওঠছে, তাতে খোলা চাতাল দিনে দিনে দুর্লভ হয়ে ওঠছে। এমনকি আকাশও ঢেকে যাচ্ছে। আড়ালে চলে যাচ্ছে চাঁদমামাও। এ ক্ষেত্রে বিশেষ আকর্ষণ চ্যানেল আইয়ের ছাদ। চারপাশ থেকে অনেকটাই আলাদা হয়ে আছে এই খোলা চত্বর। আধো আলো, আধো অন্ধকারে পাওয়া যায় বসন্তের মাতাল সমীরণ। রিমঝিম বৃষ্টির স্পর্শ। কখনো-সখনো ভালোবাসার মানুষের কাল্পনিক ফিসফিসানি।


সবচেয়ে আনন্দের ব্যাপার, অবলোকন করা যায় মায়াভরা চাঁদ আর মায়াবিনী রাত। সেই সূত্রে ‘আসমান ভাইঙ্গা জোছনা পড়ে’। সেই ধবল জোছনায় ইচ্ছেমতো অবগাহন করা যায়। লুটোপুটি খেলা যায়। চাইলে মন উজাড় করে বিলিয়েও দেওয়া যায় অঢেল জোছনা। এমন জোছনায় বুকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এই অনুভব, ‘তোমায় আমি জোছনা দেব/তারার চাদরে জড়িয়ে নেব’।

আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে?

সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা রঙ ছিল ফাল্গুনি হাওয়াতে সব ভালো লাগছিল চন্দ্রিমায় খুব কাছে তোমাকে পাওয়াতে। মন খুশি উর্বশী সেই রাতে সুর ছিল গান ছিল এই প্রাণে ঐ দুটি হাত ছিল এই হাতে কি কথা বলছিলে মন জানে সব ভালো লাগছিল তুমি ছিলে তাই মন ছিল মনেরই ছায়াতে। রাত আসে রাত চলে যায় দূরে সেই স্মৃতি ভুলতে কি আজ পারি পুরানো দিন আছে মন জুড়ে ভালোবাসা হয়েছে ভিখারি ধূপকাঠি মন জ্বলে একা একা তাই সেই তুমি নেই তুমি নেই সাথে। আসলেই কি সেই রাতে পূর্ণিমা ছিল? ঠিক মনে নেই। কিছুই মনে রাখতে পারি না। দিন-তারিখ তো মনে রাখার প্রশ্নই ওঠে না। তবে বিশেষ সেই রাতের কথা কখনই ভুলতে পারা যায় না। পারা সম্ভব নয়। সেই রাতে পূর্ণিমা না থাকলেও বুকের মধ্যে ছিল অমল-ধবল জোছনা। আর এ জোছনায় ভেসে গিয়েছিলাম। পেয়েছিলাম টক-ঝাল-মিষ্টি রাত। কোনো আগল ছিল না। কোনো বাঁধন ছিল না। কোনো বিধি-নিষেধ ছিল না। এমন রাত জীবনে আর কখনো আসে নি। কি যে আনন্দময় রাত! কি যে উন্মদনাময় রাত! কি যে মাতাল করা রাত! বৃষ্টির ছোঁয়ায় রাতটা আরো মধুর হয়ে ওঠে। ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই প্রহর হলো শেষ/ভুবনজুড়ে রইলো লেগে আনন্দ-আবেশ’। এমন আনন্দ-আবেশে বুঝে কিংবা না বুঝে হারিয়ে যায় হুঁশজ্ঞান। তারপর আর কিছু জানা নেই। আসলেই কি এমন রাত জীবনে কখনো এসেছে? আমার তো কল্পনার শেষ নেই। জেগে জেগে কত না স্বপ্ন দেখি। এও কি তেমন কোনো কল্পনা বা স্বপ্ন? কিশোর কুমারের গানের মতো একটি রাতের অপেক্ষায় থাকার চেয়ে মধুর স্বপ্ন আর কি হতে পারে? (আজ কিন্তু জোছনা ভেজা রাত। এমন মায়াবী জোছনায় বেগম আখতারের কণ্ঠে ঝরে পড়ে অভিমান, জোছনা করেছে আড়ি/আসে না আমার বাড়ি/গলি দিয়ে চলে যায়/লুটিয়ে রুপোলি শাড়ি/চেয়ে চেয়ে পথ তারই/হিয়া মোর হয় ভারী/রুপের মধুর মোহ/বলো না কী করে ছাড়ি।) ১৮-৪-২০১৬

জীবন ভারি রহস্যময়

জীবন থেকে চলে যায় এক একটি দিন। প্রতিটি দিনই কোনো না কোনো ব্যক্তি, সমষ্টি বা জাতীয় জীবনে কম-বেশি আঁচড় কেটে যায়। একটি দিনে জন্ম, মৃত্যু, সম্পর্ক গড়া, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া সহ কত কি হতে পারে। সব দিন তো আর সবার জীবনে সমানভাবে যায় না। কোনো দিন উজ্জ্বলতা ছড়ায়। কোনো দিন অনুজ্জ্বল থেকে যায়। দিনটি হতে পারে মধুর। হতে পারে তিক্ত। হতে পারে মিশ্র অনুভূতির। হতে পারে একান্তই গোপনীয়। স্বাভাবিক কারণেই তা ব্যক্ত করা যায় না। অন্য কারো সঙ্গে শেয়ারও করা যায় না। অনেক সময় বুকের মধ্যে ভারী পাথরের মতো চেপে থাকে। সেই পাথর বয়ে বেড়াতে হয় সারাজীবন। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি, যেখানে নিজেকে মেলে ধরাও সহজ নয়। জীবন ভারি রহস্যময়। যতটা না ধরা দেয়, তারচেয়ে বেশি অধরাই রয়ে যায়। হয়তো কাউকে খুব কাছ থেকে দেখছি, জানছি, মনে করছি, এঁর কোনও কিছুই তো অজানা নয়। কিন্তু এমন অনেক গুরুতর বিষয় আছে, জানতেও পারা যায় না। ব্যক্তি বা ব্যক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টর জন্য দিনটি স্মরণীয়, যা অপ্রকাশিত ও লুকানো, নির্ধারিত সেই দিনে তাঁর বা তাঁদের জীবনে হয়তো ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খাওয়া নৌকার মতো সুখে বা দুঃখে বুকের মধ্যে দুলিয়ে দেয়। কাছাকাছি থেকেও সুখ বা দুঃখের সেই দোলন অন্য কেউ অনুভব করতে পারে না। পারার কথাও নয়। আবার এমনও হতে পারে, সেই দিনটি একটা সময় জীবন থেকে হারিয়েও যায়। সেটা নির্ভর করে কে কীভাবে দিনটিকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন, তার ওপর। কেউ কেউ আছেন, যত বড় ঘটনাই হোক না কেন, সেটিকে স্মরণীয় মনে করেন না। উড়িয়ে দেন তুড়ি মেরে। তাঁরা আরও বড় স্মরণীয় কোনও দিনের অপেক্ষায় থাকেন। তাছাড়া প্রতিদিন এত হিসাব-নিকাশ করতে হয়, এর বাইরে অতীতের হিসেবের খাতাটাকে ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা হয় না। যাঁরা সেটা পারেন না, তাঁদেরই কেবল ভুগতে হয়। জীবন তো এমনই, কেউ নতুনের সন্ধানে থাকেন। কেউ অতীত নিয়ে আঁকড়ে থাকেন। অবশ্য অনেক সময় সেই অতীত নবরূপে ফিরেও আসে। এটা নির্ভর করে সময় ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর। ১৮-৪-২০১৬