সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি নেই। তারপরও কেন জানি বুকের মধ্যে একটা শূন্য শূন্য অনুভূতি হচ্ছে। সেটা বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছি। কেন হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু বোঝাতে পারছি না। আসলে শৈশব থেকে আমার চারপাশের যে জগত গড়ে ওঠেছে, তারমধ্যে আছেন তিনি। তাঁর নাম, তাঁর লেখা, তাঁর সৃষ্টিকর্ম হৃদয়ের গহিনে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, তাঁকে কখনো দূরের মনে হয়নি। তাঁর সব লেখাই যে আমি পড়েছি, তেমন দাবি করবো না। তবে উল্লেখযোগ্য বইগুলো পড়েছি, ছুঁয়েছি কিংবা নাম শুনেছি। ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ পড়ে তেমন একটি জীবনের স্বপ্ন দেখেছি। তাঁর লেখা কত কত কবিতা বুকের মধ্যে এনে দিয়েছে রোমান্টিক আমেজ। তাঁর জীবনের প্রকাশিত অনেক কাহিনীও তো জানা। বাউন্ডুলে, বেপরোয়া, বর্ণময় জীবন। জানতে পেরেছি কখনো তাঁর স্মৃতিচারণায়, কখনো তাঁর চেনা মানুষদের লেখায়। পত্রিকার পাতায় পড়েছি কিংবা টেলিভিশনেও দেখেছি। বাংলাদেশেও তো তাঁর নিত্য আসা-যাওয়া ছিল। এই মাটিরই সন্তান তিনি। সেটা কখনো ভুলতে পারেননি। তাঁর লেখায়ও এর প্রতিফলন দেখা যেত। বিশেষ করে ‘পূর্ব-পশ্চিম’ উপন্যাসে তো জড়িয়ে আছে এই বাংলার মাটি ও মানুষ। সব মিলিয়ে তাঁকে পরিচিত গণ্ডির একজনই মনে হতো। শুধু তাই নয়, মনের মধ্যে একটা ছাপও ফেলে দিয়েছেন তিনি। চারপাশে কত জনকে চিনি, কত জনকে দেখি, তাদের ক’জনইবা মনে দাগ কাটেন কিংবা হৃদয়ে স্থায়ী আসন গাড়েন? তিনি তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে সেটা পেরেছিলেন। এ কারণে তার সঙ্গে পরিচয় কিংবা দেখা-সাক্ষাৎ না থাকলেও তিনি আমার আপন বলয়েরই লোক হয়ে আছেন। এমন একজন মানুষ চলে গেলে কাছের কেউ চলে যাওয়ারই অনুভূতি হয়। সেটাই হচ্ছে। ছোট হয়ে গেল আমার জগতটাও। তাঁকে ছাড়া পূজা সংখ্যা কল্পনা করা যায় না। এই তো সেদিনও তাঁর লেখা পড়লাম। তাঁর আর নতুন লেখা পাবো না, ভাবতেই পারছি না। তবে তিনি চলে গেলেও আশে-পাশেই থাকবে তাঁর কালজয়ী সব গ্রন্থ। বুকের মধ্যে অনুরণিত হবে তাঁর কবিতা। সঙ্গত কারণে থাকবেন তিনিও।
মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি
এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...
রবিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৬
বুকের মধ্যে অনুরণিত হয় তাঁর কবিতা
বুধবার, ২ নভেম্বর, ২০১৬
বনলতা সেনের বাড়িতে!
বনলতা সেনের জন্য আমার অপেক্ষা চিরকালের। সেই কবে যেন বুকের গভীরে ঠাঁই নিয়েছে রহস্যময়ী এই মানবী। তাকে কখনও ভুলতে পারি নি। এবার যখন তার নিবাসে যাই, এখন তো আর তার দেখা পাওয়ার কথা নয়, তবুও কেন যেন সারাক্ষণই মনজুড়ে ছিলেন মোহময়ী এই নারী। ‘অন্ধকার বিদিশার নিশা’র মতো তার চুল আর ‘শ্রাবস্তীর কারুকার্য’-র মতো তার মুখ খুঁজেছি নিরন্তন। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, মানুষের মনে কত কিছু যে উদয় হয়, নাটোরের রাজবাড়ির সঙ্গে কোনোভাবে হয়তো তিনি সম্পৃত্ত ছিলেন। এমন মনে হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কোনো কারণ নেই, নাটোর যাওয়ার পর এ রকম খুব বেশি মনে হচ্ছে। জীবনানন্দ দাশ কি কখনো নাটোরের রাজবাড়ি গিয়েছিলেন? সেখানে তাঁর সঙ্গে কি দেখা হয়েছিল বনলতা সেনের? এ প্রশ্নটি মনের মধ্যে হরদম ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রিয়তমা মানসীর জন্মস্থানে এবারই প্রথম পা দেওয়ার পর কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলেন, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ আসলেই তো, কেন এত দিন পর এলাম?
বগুড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের বাঁ পাশে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর থেকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দীঘাপতিয়া রাজবাড়ির সিংহদ্বার। কার্তিকের সকালেও ঝলসানো রোদ। রোদ একটু সইয়ে নেওয়ার পর ফটকের সাদা-হলুদ-লালচে রঙ, নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কেড়ে নেয়। চারতলা ফটকের কপালে টিপ হয়ে শোভাবর্ধন করছে পাথরের একটি ঘড়ি। ঘড়িটি এখনও সময় দিয়ে চলেছে। নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখলাম, একটুও হেরফের নেই। ঘড়িটি আনা হয় ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। ঘড়ির পাশে আছে একটি ঘণ্টা। একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি অনেক দূর থেকে শোনা যেত। এই তোরণে আছে প্রহরীদের থাকার সুব্যবস্থা। প্রবেশ দুয়ার দেখেই অনুধাবন করা যায় রাজপ্রাসাদের জেল্লা ও জৌলুশ।
বগুড়া সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় হাতের বাঁ পাশে গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে দূর থেকেই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে দীঘাপতিয়া রাজবাড়ির সিংহদ্বার। কার্তিকের সকালেও ঝলসানো রোদ। রোদ একটু সইয়ে নেওয়ার পর ফটকের সাদা-হলুদ-লালচে রঙ, নকশা ও স্থাপত্যশৈলী সহজেই নজর কেড়ে নেয়। চারতলা ফটকের কপালে টিপ হয়ে শোভাবর্ধন করছে পাথরের একটি ঘড়ি। ঘড়িটি এখনও সময় দিয়ে চলেছে। নিজের ঘড়ির সঙ্গে সময় মিলিয়ে দেখলাম, একটুও হেরফের নেই। ঘড়িটি আনা হয় ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির ফ্লোরেন্স থেকে। ঘড়ির পাশে আছে একটি ঘণ্টা। একসময় এই ঘণ্টাধ্বনি অনেক দূর থেকে শোনা যেত। এই তোরণে আছে প্রহরীদের থাকার সুব্যবস্থা। প্রবেশ দুয়ার দেখেই অনুধাবন করা যায় রাজপ্রাসাদের জেল্লা ও জৌলুশ।
নাটোরের রানি ভবানীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া দীঘাপতিয়া জমিদারীতে রাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন রাজা দয়ারাম রায়। ১৭৩৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন এ প্রাসাদ। বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে রাজত্ব। কিন্তু ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে এই রাজবাড়ি অনেকটা ধসে পড়ে। এরপর প্রায় ৪২ একর জমির উপর এটি পুনঃনির্মাণ করেন রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা প্রমদানাথ রায়। তিনি মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়ে তোলেন রাজসিক বাগানবাড়ি। এ কাজে নিয়োজিত ছিলেন বিদেশি প্রকৌশলী, চিত্রশিল্পী আর দেশীয় মিস্ত্রিরা। সেই সময় তো বটেই, এই সময়েও তার নান্দনিক সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি। রাজবাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত কড়াকড়ি। তবে তাতেও ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আচ্ছাদন। কেউ যাতে সহজে ভিতরে অনুপ্রবেশ করতে না পারেন, সেজন্য উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। পাঁচিলের পাশে সারি সারি গাছ। এরপরই পুরো রাজবাড়ি এলাকা হ্রদ দিয়ে পরিবেষ্টিত। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে এটি ছিল নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। রাজপ্রাসাদের ঢোকার মুখে রাস্তার দু’পাশে সুুউচ্চ পাম গাছের সারি। ডানে-বাঁয়ে পরিখা। তাতে টলমল করছে জল। ফুটে আছে পদ্মফুল।
ভিতরে ঢুকে সোজা পশ্চিম দিকে কিছুটা হাঁটার পর সবুজে ঘেরা প্রধান রাজবাড়ি। আছে রকমারি ফুলের বাহার। তারমাঝে নিশ্চল হয়ে আছে রাজা দয়ারামের আবক্ষ মূর্তি। মার্বেল পাথরের এই ভাস্কর্যটি সবাইকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য চুপচাপ বসে আছে। বাড়িটির স্থাপত্যশৈলী ও সৌকর্যে প্রতিফলন ঘটে এর আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা। অলিন্দ ঘেরা একতলা বাড়ি। খোলামেলা। তিন দিকেই বারান্দা। তবে অনুমতি না থাকায় রাজবাড়ির একদম অন্দরমহলে যাওয়া যায় নি। তবে ফাঁক-ফোকড় দিয়ে ভিতরটা কিছুটা হলেও দেখতে পাওয়া যায়। বড় একটি হল ঘর। এছাড়া আছে বেশ কয়েকটি কক্ষ। দামি আসবাব দিয়ে সাজানো। আবসবাবপত্র ইতালি থেকে আনা হয়। দক্ষিণে ঢাউস আকারের স্তম্ভযুক্ত বারান্দা। ছাদে ওঠার জন্য আছে পেঁচানো সিঁড়ি। তবে সিঁড়িটি এখন আর ব্যবহৃত হয় না।
রাজবাড়ির পেছনেও কারুকার্যম-িত প্রশস্ত চাতাল। ফুলের টব দিয়ে সুসজ্জিত। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে গেছে নিটোল হ্রদ। মুগ্ধকর এ জলাশয়ের পাড়ে সারি সারি পাম গাছ। তাতে তৈরি হয়েছে সবুজের নিবিড় বেষ্টনী। বারান্দা থেকে নেমে গেছে শানবাঁধানো সিঁড়ি। চাইলে টুপ করে হ্রদে নেমে জলকেলি করা যায়। জোছনা রাতে কিংবা বসন্তের মাতাল সমীরণে বারান্দার এমন পরিবেশে মনের মধ্যে কী রকম দোলা দিয়ে যায়, সে অভিজ্ঞতা আমার হয় নি।
দক্ষিণ পাশে সুদৃশ্য ও মনোরম উদ্যান। এটি পরিচিত ‘ইতালিয়ান গার্ডেন’ নামে। সুসজ্জিত প্রাচীন ও দুর্লভ সব গাছগাছালি। কোনোটা ফলজ। কোনোটা ঔষধি বৃক্ষ। পারিজাত, কর্পূর, সৌরভী, এগপ্ল্যান্ট, হোয়াইট পয়েনসেত্তিয়া, হোয়াইট এলিসন, মালতীলতা, শঙ্কচক্র, গোদাপদ্ম, হরীতকী, হাপাবমালি, রাজ-অশোক, রঙ্গন, নাগেশ্বর চম্পা, সাইকাস পাম, যষ্ঠিমধু, মাধবী, তারাঝরা, নীলমণিলতা, হৈমন্তী ইত্যাদি। এর অধিকাংশ গাছই সচরাচর দেখা যায় না। বাহারি পাতা আর রঙিন ফুলের সৌরভে হয়ে ওঠেছে যেন নন্দনকানন। বাগানে আছে বসার বেঞ্চ। রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন স্বর্গের মতো এ বাগানে আছে অত্যাধুনিক ¯œানাগার। কৃত্রিম ঝরনাধারা।
বাগানের শোভা বাড়িয়ে দিয়েছে অসাধারণ কিছু ভাস্কর্য। গ্রিক স্টাইলে নির্মিত। কিছু ভাস্কর্য কালো এবং লোহা দিয়ে তৈরি। ছিপ হাতে কালো রঙের মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যটি মন কেড়ে নেয়। শ্বেত পাথরে গড়া মা-সন্তান কিংবা সুন্দরীতমাদের অপরূপ সব ভঙ্গিমা। সব ইতালিয়ান মার্বেল পাথরে গড়া। হাত ভাঙা একটি স্থাপত্য দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। এটি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সৈন্যদের কীর্তি। বাগানের এক কোনায় আছে কাঠের ‘টি-হাউস’। বিকেলে সেখানে বসে রানি চা পান করতে করতে উপভোগ করতেন প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী। রাজবাড়ির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে কবিতার বীজ। আর সেখানে যদি ঘটনাক্রমে দেখা হয়ে যায় বনলতা সেনের সঙ্গে, তাহলে জীবনানন্দ দাশের মতো জাতকবি হলে অমর সব পংক্তি না লিখে কি পারা যায়?
রাজবাড়িতে আছে দোতলা ‘কুমার প্যালেস’। এটি তহশিল অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হতো। নিচ তলায় অন্ধ কুঠুরি। তাতে ছিল কারাগার ও টর্চার সেল। খাজাঞ্জিখানা, হোলিখেলা, দোলমঞ্চের আকর্ষণের কমতি নেই। আছে কাচারি ভবন, রান্নাঘর, ট্রেজারি বিল্ডিং, মোটর গ্যারেজ, স্টাফ কোয়ার্টার, সেন্ট্রিবক্স ইত্যাদি। আছে বিভিন্ন নামের পুকুর। সামনে শোভা হয়ে আছে ব্রিটিশদের নির্মিত একাধিক কামান। রাজপ্রসাদের সামনে বড় একটি শুভ্র রোয়াক। চারপাশে ডিজাইন করা দেয়াল। এ চত্বরে বসতো বৈকালীন আড্ডা। সেই কত কাল আগে নির্মিত রাজপ্রাসাদটিতে সংমিশ্রণ ঘটেছে রুচি, সৌন্দর্য আর অঢেল ঐশ্বর্যের। এ কারণে এটি এখনও অভিভূত করে পর্যটকদের।
সেই সময় বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, উন্নয়নমূলক কাজে নাটোরের রাজবাড়ির যথেষ্ট অবদান রয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় অবিভক্ত ভারতে ক্রিকেট খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন নাটোরের মহারাজা জগদিন্দ নাথ। কলকাতার বালিগঞ্জে ৪৫ বিঘা জমি কিনে সুরম্য বাগানবাড়ি ছাড়াও গড়ে তোলেন ক্রিকেট মাঠ ও প্যাভিলিয়ন। ১৯০১ সালে গঠন করেন ‘নাটোর ইলেভেন টিম’। শুধু ভারতীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত এ দলের অধিনায়ক ছিলেন মহারাজা নিজে। দীঘাপতিয়ার শেষ রাজা ছিলেন প্রতিভানাথ রায়। দেশভাগের পর পাকিস্তান সরকার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করলে ১৯৫২ সালে তিনি সপরিবারে কলকাতা চলে যান। ১৯৬৬ সালে রাজবাড়ি অধিগ্রহণ করে পাকিস্তান সরকার। ১৯৭২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এটির নামকরণ করা হয় ‘উত্তরা গণভবন’। বর্তমানে রাজবাড়িটি রয়েছে জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে। রাজপ্রাসাদের পুরো সীমানায় আছে যত্ম ও পরিচর্যার ছাপ।
নাটোরে যাব, আর বিখ্যাত কাঁচা গোল্লার স্বাদ নেব না, তা কি হয়? এর সোয়াদ নিয়ে ফিরে আসার সময় মনে হতে থাকে, কোনো এক শীতার্ত সন্ধ্যায় এ রাজবাড়িতে অবস্থান করলে হয়তো অনুভব করা যাবে জীবনানন্দীয় অভিজ্ঞতা : ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মত/সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;/পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পান্ডুলিপি করে আয়োজন/তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল;/সব পাখি ঘরে আসে-সব নদী ফুরায় এ জীবনের লেনদেন;/থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।’ এমন এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য নাটোরের রাজবাড়ি যেন সাজিয়ে রেখেছে হরেক রকম পসরা। তবে অন্ধকারে মুখোমুখি বসার জন্য নেই কোনো বনলতা সেন।
মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০১৬
রাজশাহীর পদ্মার পাড়ে
পৌঁছতে পৌঁছতে একটুখানি দেরি হয়ে যায়। অস্তগামী সূর্যের কুসুম কুসুম পেলবতার দেখা পাওয়া হলো না। তাতে অবশ্য আক্ষেপটুকু রয়েই যায়। তারপরও মোহময় যে পরিবেশের দেখা পেলাম, তার কোনো তুলনা হয় না। যেভাবে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট, তাতে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে সৌন্দর্যের অপরূপ ছটা। প্রকৃতি যে কত বড় চিত্রকর, সেটা পলে পলে অনুভব করতে থাকি। তার তুলির আঁচড়ে খোলতাই হতে থাকে জগতের রূপমাধুরী। দিনমণি সবে ডুবে গেছে। রয়ে গেছে তার মায়াবী আবেশ। চলতে থাকে আলো-ছায়ার অদ্ভুত খেলা। একটু একটু করে চারপাশে জমতে থাকে রক্তিম আভা। যেন কেউ মাখিয়ে দিয়েছে মুঠো মুঠো আবির। গগনজুড়ে বাঙময় হয়ে ওঠে তার লালিমা, তার লালিত্য, তার লাবণ্য। একাকার হয়ে যায় আকাশ, নদী আর প্রকৃতি। এর সম্মিলনে সৃষ্টি হয় মোহনীয় পরিবেশ।
গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে কমনীয় অন্ধকার। বৃক্ষগুলো হয়ে ওঠে প্রকৃতির ক্যানভাসের অংশ। নদীর তীরে অপেক্ষমাণ ছায়া ছায়া নৌকা। দাঁড়িয়ে থাকা মানব-মানবী রূপায়িত হয় ধূসর অবয়বে। আছে থোকা থোকা বিষণœতাও। সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যপটটি রূপ নেয় জলছবিতে। আঁখিপুটে যেন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জলরঙের জাদুকর ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী যোষেফ উইলিয়াম টার্নারের এক একটি মাস্টারপিস। ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেও মনে হতে পারে কোনো চিত্রশিল্পীর ইজেলে আঁকা প্রকৃতির বিমূর্ত সব ছবি। তাতে আছে সুর-ছন্দ-কবিতার সংমিশ্রণ।
গাছের ফাঁক-ফোকর দিয়ে চুইয়ে পড়তে থাকে কমনীয় অন্ধকার। বৃক্ষগুলো হয়ে ওঠে প্রকৃতির ক্যানভাসের অংশ। নদীর তীরে অপেক্ষমাণ ছায়া ছায়া নৌকা। দাঁড়িয়ে থাকা মানব-মানবী রূপায়িত হয় ধূসর অবয়বে। আছে থোকা থোকা বিষণœতাও। সব মিলিয়ে পুরো দৃশ্যপটটি রূপ নেয় জলছবিতে। আঁখিপুটে যেন উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে জলরঙের জাদুকর ব্রিটিশ চিত্রশিল্পী যোষেফ উইলিয়াম টার্নারের এক একটি মাস্টারপিস। ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেও মনে হতে পারে কোনো চিত্রশিল্পীর ইজেলে আঁকা প্রকৃতির বিমূর্ত সব ছবি। তাতে আছে সুর-ছন্দ-কবিতার সংমিশ্রণ।
কাব্যিক এ দৃশ্যপটটি মিলিয়ে যেতে না যেতেই অন্ধকারে ফুটে ওঠে আলোর বর্ণময় ফুটকি। দূর থেকে মনে হতে থাকে যেন দীপালি উৎসব। নদীর পানিতে তার প্রতিবিম্ব। কাঁপা কাঁপা রঙিন বিচ্ছুরণ। বইতে থাকে ঝিরি ঝিরি মাতাল হাওয়া। অপরূপ সেই নৈসর্গিক দৃশ্য। কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে নিভৃতে বসে আছেন কেউ কেউ। দূর থেকে ভেসে আসেন শ্রীকান্ত আচার্য : একা একা এই বেশ থাকা/আলো নেই কোথাও সব মেঘে ঢাকা/ছায়া ছায়া সব আবছায়া/যাকে খোঁজে মন তার নেই দেখা/আনমনে এই একা একা/সব মেঘে ঢাকা, সব মেঘে ঢাকা/আলো-ছায়া দিয়ে দিন চলে গেছে/আমাকে শূন্যতা দিয়ে গেছে/উতলা এক হাওয়া ভাসে/সে হাওয়ার সাথী/ শুধু নীরবতা, শুধু নীরবতা.........। সন্ধ্যা নেমে এলে এমন দৃশ্যপট প্রতিনিয়ত দেখা যায় রাজশাহীর শহর রক্ষা বাঁধ বা টি-গ্রোয়েনে।
দিনের বেলায়ও পদ্মা নদীর তীরের ঔজ্জ্বল্য কম দীপ্তিময় নয়। পাঠানপাড়া, লালন শাহ পার্ক, বড়কুঠির পর্যটন কেন্দ্রে রৌদ্রকরোজ্জ্বল সকালের মাধুর্য ও জৌলুশ বেশ উপভোগ্যময়। যদিও কার্তিকে গা বুলিয়ে দেওয়ার কথা মিঠের রোদের আমেজ। অথচ রোদের তেজের কারণে ঘেয়ে-নেয়ে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছে। তারপরও বিস্তীর্ণ নদীর পাড় ঘেঁষে কাশফুলের নান্দনিক সমাহার মনের মধ্যে এনে দেয় শুভ্র পালকের ছোঁয়া। পাঠানপাড়ায় পরিত্যক্ত আমবাগানে সদ্য গড়ে ওঠেছে ‘সীমান্ত অবকাশ’, ‘সীমান্ত নোঙর’ নামের ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ। আছে সুশোভিত পার্ক। গাছের তলায় চমৎকার বসার ব্যবস্থা। নির্জন। নিরিবিলি। কে যেন গুন গুন করে গাইছে, ‘আমার দিনগুলো সব রং চিনেছে তোমার কাছে এসে/শুধু তোমায় ভালোবেসে’। রোমান্টিক পরিবেশ। প্রেমপিয়াসীরা যাতে পাখির নীড়ের অনুভাব পেতে পারেন, সেজন্য পাকুড় গাছের উপর বেঁধে দেওয়া হয়েছে আচ্ছাদিত মাচা। এই ট্রি-হাউজে ‘নিভৃত নির্জন চারি ধার/দুজনে মুখোমুখি’ হয়ে ‘গভীর দুখে দুখি’ হওয়া যায় কিংবা হতে পারে ‘কেবল আঁখি দিয়ে/আঁখির সুধা পিয়ে’।
বড়কুঠিতে গড়ে তোলা হয়েছে মহানগর উম্মুক্ত নাট্যমঞ্চ। অনেকটা প্রাচীন গ্রিসের অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো। প্রাকৃতিক আলোয় হতে পারে নাটকের আলোক প্রক্ষেপণ। আছে ‘পদ্মা ফুড গার্ডেন’। রঙিন ছাতা। পদ্মা নদীর তীরে পার্ক ছাড়াও গড়ে তোলা হয়েছে টাইলস দিয়ে হাঁটার দীর্ঘ পথ। আছে বসার চমৎকার সুব্যবস্থা। তপ্ত দুপুরকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন বয়সী মানুষের সমাগম। তবে স্কুল-কলেজ পালিয়ে আসা কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা নদীর সুরতরঙ্গ। জুড়িয়ে দেয় মনপ্রাণ। চাইলে স্পিড বোট বা নৌকায় এক পাক ঘুরে আসা যায়। দূর থেকে দেখা যায় ভারতের মুর্শিদাবাদের প্রান্তরেখা। তবে খুব ভোরে কিংবা বিকেল হলে পদ্মা পাড়ের চেহারা আমূল বদলে যায়। সে সময় ঢল নামে মানুষের। জানা যায়, হাল আমলে পদ্মা নদীর তীরকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রধান কারিগর রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। অবশ্য সৌন্দর্যকরণের এই ধারা এখনও অব্যাহত আছে।
বরেন্দ্রভূমির গলার হার হয়ে যুগে যুগে শোভা বর্ধন করছে পদ্মা নদী। যদিও একসময়ের উত্তাল পদ্মা নদী হারিয়েছে তার যৌবন। খুব বেশি দিন পানির ¯্রােত থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে বিশাল এলাকাজুড়ে চর পড়ে। তখন আর প্রমত্ত এই নদীকে চেনা যায় না। এই নদী অনেক মানুষকে নিঃস্ব করে দিলেও এর টান কিন্তু এড়ানো যায় না। পর্যটন কেন্দ্র ছাড়াও নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রকৃতির ছায়ায় মনোরম বাসভবন, সারদা পুলিশ একাডেমি, রাজশাহী ক্যাডেট কলেজের মতো স্থাপনাগুলো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
এই শহরে আছে গুরুত্বপূর্ণ বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। বাংলাদেশের পুরানো জাদুঘরের একটি। প্রত্মতত্ত্ব সংগ্রহের দিক দিয়ে এটি বেশ সমৃদ্ধ। অনেক দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য নিদর্শন আছে। আছে সিন্ধু সভ্যতার গৃহস্থালি তৈজসপত্র। যা পাওয়া যায় মহেঞ্জোদারোতে। শিক্ষাদীক্ষায় শহরটি এগিয়ে আছে। দেশের অন্যতম একটি প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২৮ সালে। আছে বিস্তৃত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সিল্ক সিটি হিসেবে পরিচিত রাজশাহীর গৌরব ‘রাজশাহী সিল্ক’। দেশ-বিদেশে এর দারুণ কদর। বিসিক শিল্প নগরীতে রেশমের বেশ কয়েকটি ফ্যাক্টরি ও শোরুম আছে। সেখানে রেশম চাষ থেকে শুরু করে শাড়ির প্রস্তুতপ্রণালী দেখা যায়। চাহিদা অনুযায়ী রেশমের যে কোনো পণ্য ক্রয় করা যায়।
বাংলাদেশ ডাকবিভাগের রাজশাহীর আঞ্চলিক পরিচালক এস এম তারিক কচির আমন্ত্রণে এবারই প্রথম সেখানে পা দিয়ে অনেক দিক দিয়ে ব্যতিক্রম মনে হলো রাজশাহী শহরটিকে। অনেকটা অনাঘ্রাতা নারীর মতো। এখনও বিভাগীয় এই শহরটির ক্ষত-বিক্ষত হয় নি। ইট-বালু-সিমেন্টের আস্তরের কাছে নিজেকে বিসর্জন দেয় নি। যে কারণে বহুতল ভবন খুব একটা দেখা যায় না। দেখা যায় না ডিজেলচালিত যানবাহন। ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সার প্রাধান্যই বেশি। গাড়িঘোড়ার দাপট দেখা যায় নি। লোকজনের চলাচলও খুব একটা চোখে পড়ে নি। তেমন ধুলোবালি নেই। দূষণ নেই। প্রবাহিত হয় নির্মল বায়ু। রাস্তাÑঘাটগুলো ঢাকার চেয়েও উন্নত। এমনকি গলির মধ্যে রাস্তায়ও ভাঙাচুরা নেই। শহরটা বেশ পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন। চারপাশে সবুজ বেষ্টনী। অসংখ্য গাছগাছালি। সবুজ ঘাস। টলটলে পুকুর আর দীঘি। কোথাও কোথাও কৃত্রিম হ্রদ। তবে আবহাওয়া সাংঘাতিক উত্তপ্ত। হেমন্তের শুরুতেও হিমেল হাওয়ার দেখা পাওয়া যায় নি। দিনের বেলা ঘরের বাইরে এলে বিভাবসু শরীরের রস একদম নিংড়ে নেয়।
অথচ রাজশাহী অঞ্চল এমনিতে রসে টইটম্বুর। মিষ্টান্ন সামগ্রীর যথেষ্ট সুনাম আছে। তবে পুরো এলাকা ফলফলারি আর গাছগাছালিতে ভরপুর। কোথাও একটু বীজ র্পুঁতে দিলেই বেড়ে ওঠে রসালো ফল গাছ। তবে আম, লিচু, আখ, পেয়ারা, কলা গাছের উর্বরভূমি। রাজশাহী থেকে নাটোর যাওয়ার পথে রাস্তার দুই পাশে ফলফলারির বাগান। আছে ফল গবেষণাগার। দেখে মনে হয় সবুজের উপত্যকা। প্রাকৃতিক যে সম্পদ নিয়ে রাজশাহীর অবয়ব, সেটি অটুট রাখতে পারলে শহরটি যে কাউকেই বার বার কাছে টেনে নেবে। বাংলাদেশে এমন শহর ক্রমান্বয়ে দুর্লভ হয়ে ওঠছে।
রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬
‘আমার আঙুলে লেগে থাকুক তোমার আঙুলের সুগন্ধী’
ভালোবাসা তো চিরকালের অনিঃশেষ এক আখ্যান। তার শুরু আছে। শেষ নেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মধুর, তোমার শেষ যে না পাই‘। এ কথা যখন লিখছি, তখনও ভালোবাসার সম্মোহন নিয়ে মিলন ঘটছে চার চোখের। কারো না কারো হৃদয়ে অঙ্কুরোদগম ঘটছে ভালোবাসার বীজ। ভালোবাসা অনিবার্য। অপ্রতিহত। অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অন্তহীন এর উৎস। ঝরনা থেমে যেতে পারে। নদী শুকিয়ে যেতে পারে। জনপদও হারিয়ে যেতে পারে। ভালোবাসার ফল্গুধারা নিরন্তন বয়ে যায়।
মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই ভালোবাসার সূত্রপাত। সেই ধারা চলছে। মানব সভ্যতা যতদিন আছে চলতেই থাকবে। নানা কালে, নানা যুগে, নানা সময়ে ভালোবাসার ধরন-ধারণ ছিল নানা রকম। রশি ভেবে সাপ বেয়ে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার কথা এখন হয়তো আর ভাবা যায় না। তেমনটি না হলেও ভালোবাসার জন্য মরীয়া ভাবটা এখনও আছে। বিপদের ঝুঁকি নিয়েও দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। বুকের মধ্যে কেমন কেমন করার অনুভূতি কিন্তু বদলে যায় নি। আকাশে মেঘ জমলে বিরহী মন প্রেয়সীর সান্নিধ্য খোঁজে। প্রিয়তমার মন আকুল হয় প্রিয়তমের জন্য। তবে প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে গেছে। বদলেছে ভালোবাসা নিবেদনের ভঙ্গি। এই সেদিনও ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা এত সহজ ছিল না। একটু কথা বলা, একটুখানি দেখা হওয়া ছিল অসম্ভব এক ব্যাপার। অনেক বেশি প্রতিকূলতা ছিল। ছিল হাজারো প্রতিবন্ধকতা। সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে কেউ কেউ জয়ী হয়েছেন। কেউ না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে দেবদাস হয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কেউবা জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন ভালোবাসার বেদীমূলে।
তবে ভালোবাসায় মিলনের চেয়ে বিচ্ছেদ বেশি। তারচেয়ে বেশি বিরহ। রাধা-কৃষ্ণ, লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট তো উৎকীর্ণ হয়ে আছে ভালোবাসার চিরায়ত কাহিনী হিসেবে। আত্মত্যাগে সমুজ্জ্বল অমর সব প্রেম। সময়মতো যোগাযোগ না হওয়ায় ভালোবাসার মন্ত্রে উজ্জীবিত দুই প্রেমিক-প্রেমিকা রোমিও-জুলিয়েট কোনো রকম সংশয় ছাড়াই পান করেছেন ভালোবাসার গরল। অথচ যোগাযোগ করার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের এখন খুব বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয় না। এখন তো মুঠোফোন আর ইন্টারনেট যোগাযোগটা করে তুলেছে সহজলভ্য। আর ফেসবুকের মতো ওয়েবসাইটগুলো সহজ করে দিয়েছে পথচলা। চোখের পলকেই যোগাযোগ করা যায়। দু’জনে চাইলে দেখা করাও খুব একটা কঠিন না। অনেকেই মনে করেন, এ কারণে ভালোবাসায় এখন আর গভীরতা নেই। ভালোবাসা হয়ে ওঠেছে রিমোট কন্ট্রোলের মতো। ভালো না লাগলে চ্যানেল বদলে দেওয়ার মতো করে বদলে যায় ভালোবাসার মানুষ। একজনকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয় প্রলুব্ধ মন। অনেকের ভালোবাসা চাইলেই যখন পাওয়া যায়, একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাটা হয়ে পড়ছে অচল প্রেমের পদ্য। কথা দিয়ে কথা না রাখাটাই হয়ে ওঠেছে রীতিমতো ফ্যাশন। যখন-তখন ভেঙে যাচ্ছে সম্পর্ক।
এত কিছুর পরও ভালোবাসার মানুষের জন্য হৃদয়ে যে আকুতি সেটা তো রয়েই যায়। এখনও বিরহ আছে। আছে বেদনাও। বুকের মধ্যে জমে কষ্টের মেঘ। সম্পর্ক ভেঙে গেলে কারো কারো জীবন হয়ে যায় এলোমেলো। শুধু ভালোবাসাই হারায় না, হারিয়ে যায় বিশ্বাস। বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা যত বাড়ছে, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। সাহিত্যের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ ভালোবাসায়। কত না গল্প, কত না কবিতা, কত না লেখালেখি। ভালোবাসার জন্য অমর হয়ে আছে কত না সৃষ্টি। কত না কীর্তিগাথা। শুধু সাহিত্য কেন, জীবনের কোথায় ভালোবাসা নেই? ভালোবাসা ছাড়া উৎসাহ-উদ্দীপনা-উদ্যম-প্রেরণা থাকে না। সেটা না থাকলে জীবন হয়ে পড়ে নিষ্প্রাণ, নির্জীব, নিষ্প্রভ। থাকে না সৃষ্টি বা নিবেদনের আকুলতা। বিজ্ঞান কেড়ে নিয়েছে আবেগ, দিয়েছে বেগ। ভালোবাসা ছাড়া কি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সম্ভব? মোটেও না। তবে নীল খামে কিংবা বইয়ের ভাঁজে এখন আর খুব একটা চিঠি আদান-প্রদান হয় না। কবি মহাদেব সাহার মতো কে আর আকুতি নিয়ে বলবেন, ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/ এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।’ চিঠি পাওয়ার এ আনন্দ এখন বোধহয় খুব একটা আপ্লুত করে না। ব্যস্ত এই সময়ে অনেক সময় নিয়ে কাগজে-কলমে চিঠি লেখা, দুরু দুরু বক্ষে পৌঁছে দেওয়ার ঝামেলায় কে আর যেতে চায়? ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেও এখন প্রযু্িক্তর জয়জয়কার। মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে ভালোবাসায় জড়ানো শব্দের মায়াজাল। এর অনেকটাই হারিয়ে যায়। রয়ে যায় খুবই কম। ভালোবাসা নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও জীবদ্দশায় প্রেমিক-প্রেমিকরা প্রকৃত ঘটনা খুব একটা তুলে ধরতে পারেন না। হয়তো অনেক সময় জানাজানি হয়ে তুলকালাম হয়। অনেক ক্ষেত্রে মিলনও হয়। কিন্তু ভালোবাসার পাত্র-পাত্রীরা নিজেদের কথা চাউর করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী বা সাহসী হতে পারেন না। সমাজের ভ্রুকুটির কাছে পরাভব মানতে হয়। কেউ কেউ করলেও অনেক পরে ঘটনার নির্যাসটুকু তুলে ধরেছেন। তাতে সত্যটুকু থাকে না।
যে কারণে ভালোবাসার কত কত ঘটনা আড়ালে পড়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়। এ সমাজে ভালোবাসাকে খুব একটা সম্মতি দেওয়া হয় না। নিজে প্রেম করেও অন্যের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে কোনো যুক্তির প্রয়োজন হয় না। তারপরও যেটুকু প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তা কেবলই অবিবাহিতদের। বিবাহিতদের ভালোবাসাকে দেখা হয় পাপ হিসেবে। যেন বিবাহিত হয়ে গেলে হৃদয়টা পাথর হয়ে যায়। তার আর কাউকে ভালো লাগতে পারবে না। ভালোবাসা থাকবে না। অবদমিত ভালোবাসা নিয়ে কাটাতে হবে চিরকাল। অথচ ভালোবাসা তো একটি আবেগগত ব্যাপার। সেটা কখন, কোথায়, কীভাবে, কার সঙ্গে ঘটবে, সেটা কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। দেশবরেণ্য শিল্পী রুনা লায়লার একটি জনপ্রিয় গান তো এমন, ‘প্রেমের এই ফাঁদ পাতা ভুবনে কে কোথায় ধরা পড়ে কে জানে’।
পরকীয়া ভালোবাসা তো তেমন একটি। এটি এমন একটি বিষয়, একে স্বীকার করা যায় না। আবার অস্বীকার করারও উপায় নেই। পরকীয়া ভালোবাসা স্বীকৃতি পেয়েছে লেখকদের কলমে। লোকসাহিত্যের অন্যতম আকর্ষণ তো পরকীয়া প্রেম। বৈষ্ণব শাস্ত্রের মতবাদই তো এটি। মরমী কবিরা তো এর চর্চা করে এসেছেন। বাউল লালন শাহও ছিলেন এর অনুসারী। যুগে যুগে বন্দিত হয়েছে পরকীয়া প্রেম। কাব্যে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে। বাস্তবে এমনটি হলে অনেকেরই কুঁচকে যায় ভ্রু। তারপরও থেমে নেই পরকীয়া। বরং অতীতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। আড়ালে, আবডালে, গোপনে চলছে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এই প্রেম। এর সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়। সমাজের চোখে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া পরকীয়া প্রেম নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা সম্ভব হয় না। জানা যায় না এই প্রেমের একান্ত কথামালা। অথচ এ নিয়ে কোথাও কিছু জানা গেলে কিংবা লেখা হলে তাতে কারো আগ্রহের কমতি থাকে না। তবে পরকীয়া প্রেমের কারণে ঘটেছে অনেক নোংরামিও। অবশ্য এমনটি তো সবক্ষেত্রেই ঘটে। তাতে কি থেমে আছে কোনো কিছু? আধুনিক কবি তো সাহসিকতার সঙ্গে লিখেছেন, কী হবে বাড়ি ফিরে?/তার চেয়ে রোদ মাখি ছায়া মাখি/সবুজ ঘাসেদের ভালবাসায় বসি দু’দণ্ড, চলো।/অথবা হেঁটে বেড়াই নির্জন কোনও বিকেলের বুক/আমার আঙুলে লেগে থাকুক তোমার আঙুলের সুগন্ধী।/কী হবে সংসার খেলে?/বেহিসাবি হয়ে উড়িয়ে দিই সব কৃপণতা, কিছু সময়/চলো, পৃথিবী ভুলে ভালবাসা মাখি অল্পখানি, নিস্পাপ দু’জনে।/কী হবে ভয় পেয়ে?/ ঝড়ের হাওয়া এলই বা মৌসুমির মতো/শক্ত হৃদয়ে ধরে থেকো প্রেম/গভীর হোক ভালবাসা/জয় করে দু’জনার কঠিন সময়। (পরকীয়া/সমিত ভৌমিক)।
প্রেম গড়ে ওঠতে পারে নানাভাবে। তবে ইদানিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি। এখন তো প্রেম চলাকালে টেলিফোন, মোবাইলে কথা হয় দিনের পর দিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দেখা-সাক্ষাতে হয় কত না কথা। আবেগী সেই কথামালা হারিয়ে যায়। কবির ভাষায় : ‘আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি/ টেপ করে রাখলে/ পৃথিবীর যে-কোনো গীতি কবিতার/ শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন হতে পারতো।’ (প্রেমের কবিতা/মহাদেব সাহা)।
এত কিছুর পরও ভালোবাসার মানুষের জন্য হৃদয়ে যে আকুতি সেটা তো রয়েই যায়। এখনও বিরহ আছে। আছে বেদনাও। বুকের মধ্যে জমে কষ্টের মেঘ। সম্পর্ক ভেঙে গেলে কারো কারো জীবন হয়ে যায় এলোমেলো। শুধু ভালোবাসাই হারায় না, হারিয়ে যায় বিশ্বাস। বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা যত বাড়ছে, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। সাহিত্যের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ ভালোবাসায়। কত না গল্প, কত না কবিতা, কত না লেখালেখি। ভালোবাসার জন্য অমর হয়ে আছে কত না সৃষ্টি। কত না কীর্তিগাথা। শুধু সাহিত্য কেন, জীবনের কোথায় ভালোবাসা নেই? ভালোবাসা ছাড়া উৎসাহ-উদ্দীপনা-উদ্যম-প্রেরণা থাকে না। সেটা না থাকলে জীবন হয়ে পড়ে নিষ্প্রাণ, নির্জীব, নিষ্প্রভ। থাকে না সৃষ্টি বা নিবেদনের আকুলতা। বিজ্ঞান কেড়ে নিয়েছে আবেগ, দিয়েছে বেগ। ভালোবাসা ছাড়া কি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সম্ভব? মোটেও না। তবে নীল খামে কিংবা বইয়ের ভাঁজে এখন আর খুব একটা চিঠি আদান-প্রদান হয় না। কবি মহাদেব সাহার মতো কে আর আকুতি নিয়ে বলবেন, ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/ এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।’ চিঠি পাওয়ার এ আনন্দ এখন বোধহয় খুব একটা আপ্লুত করে না। ব্যস্ত এই সময়ে অনেক সময় নিয়ে কাগজে-কলমে চিঠি লেখা, দুরু দুরু বক্ষে পৌঁছে দেওয়ার ঝামেলায় কে আর যেতে চায়? ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেও এখন প্রযু্িক্তর জয়জয়কার। মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে ভালোবাসায় জড়ানো শব্দের মায়াজাল। এর অনেকটাই হারিয়ে যায়। রয়ে যায় খুবই কম। ভালোবাসা নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও জীবদ্দশায় প্রেমিক-প্রেমিকরা প্রকৃত ঘটনা খুব একটা তুলে ধরতে পারেন না। হয়তো অনেক সময় জানাজানি হয়ে তুলকালাম হয়। অনেক ক্ষেত্রে মিলনও হয়। কিন্তু ভালোবাসার পাত্র-পাত্রীরা নিজেদের কথা চাউর করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী বা সাহসী হতে পারেন না। সমাজের ভ্রুকুটির কাছে পরাভব মানতে হয়। কেউ কেউ করলেও অনেক পরে ঘটনার নির্যাসটুকু তুলে ধরেছেন। তাতে সত্যটুকু থাকে না।
দু:খজনক হলেও সত্যি, চাইলেও সে কথাগুলোকে এখন আর পাওয়া যাবে না। তবে আগামীতে প্রযুক্তির যখন আরো জয়জয়কার হবে, তখন হয়তো এ কথাগুলোকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে। এমনকি পাওয়া যেতে পারে ভিডিও ফুটেজও। সম্পর্ক থাকার সময় হয় অনেক মেসেজ লেন-দেন। সেগুলোও সংরক্ষিত হয় না। হলে বলা যেতে পারতো, ‘এর চেয়ে ভালো প্রেমের কবিতা আর কী লেখা হবে’। কথোপকথন, চ্যাটিং ও নেটের মাধ্যমে যে চিঠিগুলো বিনিময় হয়, সেগুলো একদমই অকিঞ্চিৎকর নয়। তা প্রকাশিত হলে অনুধাবন করা যেতে পারতো সম্পর্কের উত্থান-পতন। তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠতে পারতো হাল আমলের ভালোবাসার গতি-প্রকৃতি। সমাজবিদরা এ থেকে পেতে পারতেন ভাবনার হরেক উপাদান। অতীতে লেখা ভালোবাসার গোপন চিঠিগুলো এখন কত গুরুত্ব নিয়ে প্রকাশিত হয়। গবেষণা হয়। অথচ একান্ত কথাগুলো, ইন্টারনেট কেন্দ্রিক নিভৃতের লেখাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও কবি নির্মলেন্দু গুন অপ্রকাশিত প্রেমের মহিমাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘যেসব নারীকে আমি গোপনে ভালোবেসেছি, তাদের সঙ্গে/আমার কখনও বিচ্ছেদ ঘটেনি।/ পক্ষান্তরে আমার প্রকাশিত প্রেমসমূহ/পূর্ণ হয়েছে বেদনায়, বিচ্ছেদে।/তাই মনে করি, প্রকাশিত প্রেমের তুলনায় অপ্রকাশিত//গোপন প্রেমই ভালো।/যাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে, তাকে আমি গোপনে/ভালোবাসবো।/যাকে ভালোবাসি তাকে কখনও তা জানতে দেবো না।/ আমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করার/কোনো সুযোগই সে পাবে না।/আমি তাকে ইচ্ছামতো ভালোবাসবো।/যতদিন খুশি, যতবার খুশি ভালোবাসবো।/এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে আমি ভালো আছি। শুধু/ভালো নয়, খুব ভালো আছি।/প্রেম নিয়ে আমার সকল উদ্বেগও উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে।/ প্রিয় নারীদের ভালোবেসে আমি এখন পরম স্বস্তিতে আছি/আমার আর কোনো ভয় নেই। প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যেভাবেই হোক না কেন, গভীর গোপন নিষিদ্ধ ভালোবাসাকে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। বরং জীবন যত কঠিন হচ্ছে, অসন্তুষ্টি যত বাড়ছে, বাড়ছে অপ্রাপ্তি, সম্পর্কগুলো তত বেশি বিস্তার ঘটছে। নানাভাবে মেলছে ডাল-পালা। বাড়ছে নিষিদ্ধ প্রেমের প্রলোভন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো কোনো বাধাই যেন আটকে রাখতে পারছে না, ‘ভালোবাসা পেলে সব লণ্ডভণ্ড করে চলে যাব/যেদিকে দু’চোখ যায়’।
বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে
যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চরণ বুকের মধ্যে গুঞ্জরণ তুলছিল। প্রেক্ষাপটটা তখন এমনই ছিল। আসি আসি করছে সন্ধ্যা। যদিও সংগীত কিন্তু তখনও থেমে যায় নি। বরং ভিন্ন ভিন্ন সুরের আলাপনে পরিবেশটা হয়ে ওঠে মাধুর্যময়। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কলকাকলি। নদীর মৃদু সুরধুনীধারা। মানুষের কলরোল। ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যিখানে শম্বুকগতিতে বয়ে চলেছে আমাদের নৌকা। কোথাও যাবার কোনো তাড়া নেই। সময়টাকে তারিয়ে
তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। দেখছিলাম চারপাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। চলমান স্বচ্ছ পানি। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। পাখিদের ক্লান্ত উড়াউড়ি। নদীতে পর্যটনশীল পালতোলা নৌকা। দুই পাশে সবুজের সমারোহ। ভ্রমণপিয়াসীদের ছোটাছুটি। কেউ কাশবনের খোঁজে। কেউবা ক্যামেরায় প্রিয় কোনো মুহুর্ত বা মনের রাখার মতো ফ্রেমের সন্ধানে। নদীর তীরে কত রকম কারুকাজ। প্রকৃতি নামক কুম্ভকার যেন সাজিয়ে দিয়েছে মাটির তৈরি তৈজসপত্র। মাটির আস্তরণ দেখে বোঝা যায়, পলি জমে জমে গড়ে ওঠেছে এই ভূখ-। একটুখানি ভিতরেই গ্রামীণ পরিবেশ। প্রকৃতির অবারিত সান্নিধ্য। উড়ছে প্রজাপতি। একটু একটু করে নিভে আসছিল আলো। নদীর পানিতে নানান রঙের খেলা। পরিবেশটা হয়ে ওঠে মায়াবী। আলো-আঁধারিতে হঠাৎ ভেসে আসে নারী কণ্ঠে সুরেলা আওয়াজ। নদীর এই নির্জনতায় নিজকে উজাড় করে দিয়ে কে গায় এমন গান? সুরটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। গানের কলিগুলো ধরি ধরি করেও ধরা যাচ্ছিল না। ঢেউ হয়ে দুলছিল। কানটাকে অনেক বেশি সজাগ করেও নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। গানটা একটু একটু দূরে সরে যেতে থাকে। শিল্পীকে এক পলক দেখার জন্য মনটা আকুলি-ব্যাকুলি করলেও ইচ্ছেটা অপূর্ণ রয়ে যায়। অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে ফিরতে হয় নদীতটে। কূলে ফিরে আসার পর সে এক অভাবিত দৃশ্য। জোছনায় প্লাবিত চারপাশ। কেমন মোহময় হয়ে ওঠেছে নদী, নদীর তীর আর জয়নুল উদ্যান। উদ্যানের বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে ঝরছে আলোর বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে থাকেন বিনোদনপিয়াসীরা। কেউ চাতালে বসে,
কেউ ঘাসে শুয়ে ¯œাত হচ্ছিলেন জোছনায়। জোছনাগ্রস্ত হওয়ার চমৎকার একটি পরিবেশ। সঙ্গে মাতাল সমীরণ। আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে নাচতে থাকে জোনাকি। ময়মনসিংহ শহরটা মনটাকে বেশ রাঙিয়ে দিয়েছে। শহরের রূপ আগের তুলনায় বেশ খোলতাই হয়েছে। বদলে গেছে দেশের অন্যতম পুরানো শহরটি। শহরে ঢুকলেই পরিবর্তনটা ভালোই চোখে পড়ে। শহরটিকে সাজিয়ে তোলার জন্য একটা সযতœ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে নান্দনিক স্থাপত্য। তাতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক
সময়ের নানান বিষয় স্থান করে নিয়েছে। ভাস্কর্যগুলো সহজেই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এমনিতেই এই শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির সুখ্যাতি রয়েছে। এক তসলিমা নাসরিনই তো কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরো দুনিয়া। শহরের বেশ কিছু স্থাপনাও মন কেড়ে নেয়। তাতে অনুুধাবন করা যায় পুরনো সময়কে। মনটা নস্টালজিক হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শশী লজ অর্থাৎ একসময়ের মহারাজ শশীকান্ত আচার্যের বাগানবাড়িটি আকৃষ্ট না করে পারে না। ৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত শতাধিক বছরের পুরানো এই বাড়িটি এখন তার আভিজাত্য ও জৌলুশ একটুও হারায় নি। বাড়িটি দেখলেই মনে হবে, এটি কোনো রাজা বা জমিদারের বাড়ি। মূল ফটকে আছে ১৬টি গম্বুজ। ভবনের সামনে রয়েছে বাগান। তাতে শোভা পাচ্ছে ফুল ও দুর্লভ সব গাছ-গাছালি। বাগানের অন্যতম আকর্ষণ শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। তার মাঝে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা ¯œানরতা মর্মর মূর্তি। এটি যেন ইউরোপীয় ঘরানার কোনো ভাস্কর্য। বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের আবেশ। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে যখন ভবনটিতে যাই, তখন কেউ আপ্যায়িত করার জন্য উপস্থিত ছিলেন না। যে কারণে বাড়ির একদম ভিতরেও প্রবেশাধিকার ছিল না।
বোধকরি মূল ভবনে সর্বজনকে এখন ঢুকতে দেওয়া হয় না। শশী লজ অবশ্য দীর্ঘ দিন মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাইরে থেকে বাড়িটাকে যতটা দেখা যায়, ততটাই অবলোকন করি। তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাই। অচিরেই এটি দর্শনীর বিনিময়ে উম্মুক্ত করা হবে বলে জানা যায়। ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ এলাকাটি বেশ জমজমাট। পুরো এলাকায় আছে বনেদিয়ানার ছোঁয়া। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও পুরানো দুই ক্লাব ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও পন্ডিতপাড়া ক্লাব সহ বিভিন্ন ক্লাবের অবস্থান সার্কিট হাউজ মাঠের লাগোয়া। এ এলাকাটিকে অভিহিত করা হয় ক্রীড়া পল্লী হিসেবে। এই মাঠ থেকেই ওঠে এসেছেন জাতীয় পর্যায়ের অনেক নামজাদা ক্রীড়াবিদ। উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার অভিলাষ ঘোষ, নগেন দে, রাখাল মজুমদার, পাখী সেন, মোশাররফ হোসেন কালা, রজব আলী, অহি গুহ রায়, জ্যোতিষ কর, জগজীবন দত্ত, গণেশ ঘোষ, পরেশ মুখার্জি, নিধু মজুমদার, খালিক, দেবীনাশ, হালিম, কিবরিয়া বাবুল, মিলু প্রমুখ। ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালা, বেলায়েত হোসেন বেলাল, আজহার হোসেন, অলোক চক্রবর্তী, হারুনুর রশিদ লিটন, সাইফুল ইসলাম, মাহববুল আলম সেলিম, শরীফুল হক প্লাবন, সানোয়ার হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, শুভাগত হোম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্যের নামে ১৯১৫ সালে প্রবর্তন করা হয় দেশের অন্যতম পুরানো টুর্নামেন্ট সূর্যকান্ত শিল্ড। দীর্ঘ দিন এই টুর্নামেন্টটি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এই মাঠে ফুটবল খেলেছে ব্রিটিশ ফুটবল দল ইসলিংটন কোরিন্থিয়ান, কলকাতা মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব সহ বিখ্যাত অনেক ক্লাব ও খেলোয়াড়রা। মহারাজা ট্রফি নামে আয়োজন করা হয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ক্রীড়া ঐতিহ্যের সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঠটি ক্রীড়াবিদদের পদচারণায় সরগরম থাকে। কেউ ফুটবল খেলছেন। কেউবা ক্রিকেট। পাশেই সাহেবিয়ানা নিয়েই আছে সাহেব কোয়ার্টার। সরকারি কর্মকর্তাদের এই আবাসিক এলাকাটিও তার অতীতের ঐতিহ্য অটুট রেখেছে। বিশাল চত্বর নিয়ে এক একটি বাসা। চারপাশে সবুজের আচ্ছাদন। নিরিবিলি পরিবেশ। যেন স্বর্গীয় কানন। সাহেব কোয়ার্টারের দৃষ্টিনন্দন পার্কটি এখন শহরের প্রধান আকর্ষণ। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই পার্কটি হয়ে ওঠেছে বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে পার্কটিকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যান’। কত যে গাছগাছালি। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তাতে আছে ফল গাছ। ঔষধি গাছ। জানা-অজানা রকমারি গাছ। ঢেকে দিয়েছে রোদেলা আকাশটাকে।
সবুজের এই মনোরম আচ্ছাদন পার্কটির শোভা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। আছে বিভিন্ন ডিজাইনের আধুনিক চাতাল। ছায়াতরু ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে শেড। ফোয়ারা। ব্যায়ামাগার। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড। অনায়াসেই যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছে এটি উপভোগ্য একটি স্থান। ভোরের আলো ফোটার আগেই পার্কটি জমজমাট হয়ে ওঠে। কেউ হাঁটছেন। কেউ দৌড়াচ্ছেন। কেউবা এক্সারসাইজ করছেন। বিশুদ্ধ হাওয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছেন বুক ভরে। কেউ কেউ সেরে নিচ্ছেন অভিসার। ধুমছে আড্ডাও চলছে। কাউকে কাউকে দেখলাম, বাসার কাজ দিব্যি পার্কে বসে সেরে নিচ্ছেন। বিকেল হলে তো রীতিমতো মেলা বসে যায়। কেউ নৌকায় ঘণ্টা চুক্তিতে নদীতে ঘুরতে ঘুরে বেড়ান। কেউ হাঁটতে আসেন। কেউ ¯্রফে ঘুরতেই আসেন। পার্কে চা-নাস্তা, চটপটি, ঝালমুড়ি সহ আছে হরেক খাবারের আয়োজন। নদীর তীরটি ব্লক দিয়ে বাঁধাই করা। তীর বেয়ে চলে গেছে সিমেন্টের দীর্ঘ হাঁটা পথ। সেই পথ বেয়ে অনেকটা পথ চলে যাওয়া যায়। পার্কে আয়োজন করা হয় পহেলা বৈশাখ সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। নদীর তীর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাওয়া যায়, গড়ে তোলা হয়েছে ‘বিপিন পার্ক’। পার্কটি বেশ আধুনিক। নির্মিত এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান বিপিন সেনের নামে। এই পার্কটিও সারাদিনমান মুখরিত থাকে। পুরানো ব্রহ্মপুত্রের নদের তীরে চার দশকের বেশি সময় আগে গড়ে তোলা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। গড়ে তোলার সময় জীবিত ছিলেন খ্যাতিমান এই চিত্রশিল্পী। এটি প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর অন্যতম একটি স্বপ্ন। তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের সন্তান। ব্রিটিশ আমলে গড়ে তোলা একটি দোতলা বাসভবনে গড়ে ওঠেছে এই সংগ্রহশালা। ছায়াবীথির মাঝে সংগ্রহশালাটি শিল্পরসিকদের প্রলুব্ধ করে থাকে। এখানে সংরক্ষিত আছে শিল্পীর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। এছাড়াও আছে শিল্পীর ব্যবহার্য কিছু নিদর্শন। অবশ্য চাইলে সংগ্রহশালাটি আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। হালে সংগ্রহশালার পারিপার্শ্বিক পরিবেশটি মনোরম করে তোলা হয়েছে। সংগ্রহশালার সামনেই স্থাপন করা হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ ভাস্কর্য। সামনের উদ্যানটি ঢেলে সাজানোর কারণে এর সৌন্দর্য অনেকখানি বেড়ে গেছে। শহরের কেন্দ্রে গাঙ্গিনারপাড় মোড়ের শাপলা স্কোয়ারটি সদা ব্যতিব্যস্ত থাকে। একই সারিতে প্রেস ক্লাব, বইয়ের দোকান, কফি হাউজ, ‘সারিন্দা’র মতো পশ খাবারের দোকান সহ কেনাকাটার জন্য এলাকাটি সারাক্ষণই জমজমাট। স্টেশন রোডের ‘কৃষ্ণা কেবিন’-এর মিষ্টির বেশ কদর আছে। চলার পথে অনেকের সঙ্গে কথায় কথায় জানা যায়, ময়মনসিংহ শহরটির সৌন্দর্য ও শোভা বর্ধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তরুণ মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু। এ ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে চলেছেন মহাপরিকল্পনা নিয়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একপাক ঘুরে না আসলে ময়মনসিংহ শহরটি অসম্পন্ন রয়ে যায়। বিশাল এই চত্বরটি কৃষি শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ একটি প্যাকেজ। এটিকে বলা যেতে পারে আধুনিক একটি গ্রাম। কী নেই? পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। আছে সবুজের বিস্তৃত অরণ্য। ফল-ফুল-গাছগাছালি-শাকসব্জি-মাছের পুকুর-ফসলের জমি। এসব নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আছে পাখির কলতান। এমনকি দেখা যায় বকও। রাতের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়টি যে নিঝুম গ্রাম হয়ে যায়, সেটা অনুমান করা যায়।
আছে রোমান্টিক নির্জনতা, যেখানে শহীদ কাদরীর কবিতার মতো ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে’। তবে হেঁটে হেঁটে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টি একদিনে পরিদর্শন করা সহজ কাজ নয়। সেক্ষেত্রে একটি অটোরিক্সা একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত ছুটিয়ে নিতে পারে। সেটি হতে পারে আনন্দময় এক ভ্রমণ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব খুব বেশি নয়। যাঁরা নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যপিয়াসী তাঁরা চাইলেই চট করে শহরটিতে ঘুরে আসতে পারেন। যতটা শুনেছি, সেই সত্তর দশকের শেষদিকে তো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে গিয়ে প্রেম করতেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে। অনুরূপভাবে তসলিমাও রুদ্র’র সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে আসতেন ঢাকায়। আর এখন তো অনেক উন্নতি ঘটেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার। যাতায়াতে খুব বেশি সময়ও লাগে না। সকালে গিয়ে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বিকেলেই ফিরে আসা যায়। বেড়ানোটা নেহাত মন্দ হবে না। ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে যেভাবে চিত্ত-বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, তা দেখে একরাশ আক্ষেপও হয়। আমরা আমাদের প্রধান একটি সম্পদ বুড়িগঙ্গা নদীটিকে ক্রমান্বয়ে রীতিমতো হত্যা করে চলেছি। অথচ এই নদীটিকে ঘিরে কত কিছুই না করা সম্ভব। এটি হতে পারে ঢাকা শহরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। ময়মনসিংহ যদি পারে, তাহলে রাজধানী হয়েও ঢাকা কেন পারবে না? ময়মনসিংহ ঘুরে আসার পর এ প্রশ্নটি মাথার মধ্যে অহর্নিশ ঘুরপাক খাচ্ছে।
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)





















