পৃষ্ঠাসমূহ

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি

এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা...

রবিবার, ৯ অক্টোবর, ২০১৬

‘আমার আঙুলে লেগে থাকুক তোমার আঙুলের সুগন্ধী’

ভালোবাসা তো চিরকালের অনিঃশেষ এক আখ্যান। তার শুরু আছে। শেষ নেই। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মধুর, তোমার শেষ যে না পাই‘। এ কথা যখন লিখছি, তখনও ভালোবাসার সম্মোহন নিয়ে মিলন ঘটছে চার চোখের। কারো না কারো হৃদয়ে অঙ্কুরোদগম ঘটছে ভালোবাসার বীজ। ভালোবাসা অনিবার্য। অপ্রতিহত। অপ্রতিদ্বন্দ্বী। অন্তহীন এর উৎস। ঝরনা থেমে যেতে পারে। নদী শুকিয়ে যেতে পারে। জনপদও হারিয়ে যেতে পারে। ভালোবাসার ফল্গুধারা নিরন্তন বয়ে যায়।
মানব ইতিহাসের শুরু থেকেই ভালোবাসার সূত্রপাত। সেই ধারা চলছে। মানব সভ্যতা যতদিন আছে চলতেই থাকবে। নানা কালে, নানা যুগে, নানা সময়ে ভালোবাসার ধরন-ধারণ ছিল নানা রকম। রশি ভেবে সাপ বেয়ে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করার কথা এখন হয়তো আর ভাবা যায় না। তেমনটি না হলেও ভালোবাসার জন্য মরীয়া ভাবটা এখনও আছে। বিপদের ঝুঁকি নিয়েও দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। বুকের মধ্যে কেমন কেমন করার অনুভূতি কিন্তু বদলে যায় নি। আকাশে মেঘ জমলে বিরহী মন প্রেয়সীর সান্নিধ্য খোঁজে। প্রিয়তমার মন আকুল হয় প্রিয়তমের জন্য। তবে প্রেক্ষাপট অনেকটাই বদলে গেছে। বদলেছে ভালোবাসা নিবেদনের ভঙ্গি। এই সেদিনও ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা এত সহজ ছিল না। একটু কথা বলা, একটুখানি দেখা হওয়া ছিল অসম্ভব এক ব্যাপার। অনেক বেশি প্রতিকূলতা ছিল। ছিল হাজারো প্রতিবন্ধকতা। সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে কেউ কেউ জয়ী হয়েছেন। কেউ না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে দেবদাস হয়ে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কেউবা জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছেন ভালোবাসার বেদীমূলে। তবে ভালোবাসায় মিলনের চেয়ে বিচ্ছেদ বেশি। তারচেয়ে বেশি বিরহ। রাধা-কৃষ্ণ, লাইলী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট তো উৎকীর্ণ হয়ে আছে ভালোবাসার চিরায়ত কাহিনী হিসেবে। আত্মত্যাগে সমুজ্জ্বল অমর সব প্রেম। সময়মতো যোগাযোগ না হওয়ায় ভালোবাসার মন্ত্রে উজ্জীবিত দুই প্রেমিক-প্রেমিকা রোমিও-জুলিয়েট কোনো রকম সংশয় ছাড়াই পান করেছেন ভালোবাসার গরল। অথচ যোগাযোগ করার জন্য প্রেমিক-প্রেমিকাদের এখন খুব বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয় না। এখন তো মুঠোফোন আর ইন্টারনেট যোগাযোগটা করে তুলেছে সহজলভ্য। আর ফেসবুকের মতো ওয়েবসাইটগুলো সহজ করে দিয়েছে পথচলা। চোখের পলকেই যোগাযোগ করা যায়। দু’জনে চাইলে দেখা করাও খুব একটা কঠিন না। অনেকেই মনে করেন, এ কারণে ভালোবাসায় এখন আর গভীরতা নেই। ভালোবাসা হয়ে ওঠেছে রিমোট কন্ট্রোলের মতো। ভালো না লাগলে চ্যানেল বদলে দেওয়ার মতো করে বদলে যায় ভালোবাসার মানুষ। একজনকে নিয়ে সন্তুষ্ট নয় প্রলুব্ধ মন। অনেকের ভালোবাসা চাইলেই যখন পাওয়া যায়, একজনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাটা হয়ে পড়ছে অচল প্রেমের পদ্য। কথা দিয়ে কথা না রাখাটাই হয়ে ওঠেছে রীতিমতো ফ্যাশন। যখন-তখন ভেঙে যাচ্ছে সম্পর্ক।

এত কিছুর পরও ভালোবাসার মানুষের জন্য হৃদয়ে যে আকুতি সেটা তো রয়েই যায়। এখনও বিরহ আছে। আছে বেদনাও। বুকের মধ্যে জমে কষ্টের মেঘ। সম্পর্ক ভেঙে গেলে কারো কারো জীবন হয়ে যায় এলোমেলো। শুধু ভালোবাসাই হারায় না, হারিয়ে যায় বিশ্বাস। বিশ্বাস ভঙ্গের ঘটনা যত বাড়ছে, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। সাহিত্যের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ ভালোবাসায়। কত না গল্প, কত না কবিতা, কত না লেখালেখি। ভালোবাসার জন্য অমর হয়ে আছে কত না সৃষ্টি। কত না কীর্তিগাথা। শুধু সাহিত্য কেন, জীবনের কোথায় ভালোবাসা নেই? ভালোবাসা ছাড়া উৎসাহ-উদ্দীপনা-উদ্যম-প্রেরণা থাকে না। সেটা না থাকলে জীবন হয়ে পড়ে নিষ্প্রাণ, নির্জীব, নিষ্প্রভ। থাকে না সৃষ্টি বা নিবেদনের আকুলতা। বিজ্ঞান কেড়ে নিয়েছে আবেগ, দিয়েছে বেগ। ভালোবাসা ছাড়া কি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা সম্ভব? মোটেও না। তবে নীল খামে কিংবা বইয়ের ভাঁজে এখন আর খুব একটা চিঠি আদান-প্রদান হয় না। কবি মহাদেব সাহার মতো কে আর আকুতি নিয়ে বলবেন, ‘করুণা করে হলেও চিঠি দিও, খামে ভরে তুলে দিও/ আঙ্গুলের মিহিন সেলাই/ ভুল বানানেও লিখো প্রিয়, বেশি হলে কেটে ফেলো তাও,/ এটুকু সামান্য দাবি, চিঠি দিও, তোমার শাড়ির মতো/ অক্ষরের পাড়-বোনা একখানি চিঠি।’ চিঠি পাওয়ার এ আনন্দ এখন বোধহয় খুব একটা আপ্লুত করে না। ব্যস্ত এই সময়ে অনেক সময় নিয়ে কাগজে-কলমে চিঠি লেখা, দুরু দুরু বক্ষে পৌঁছে দেওয়ার ঝামেলায় কে আর যেতে চায়? ভালোবাসাকে কেন্দ্র করেও এখন প্রযু্িক্তর জয়জয়কার। মুঠোফোনে, ইন্টারনেটে প্রতিনিয়ত জন্ম নিচ্ছে ভালোবাসায় জড়ানো শব্দের মায়াজাল। এর অনেকটাই হারিয়ে যায়। রয়ে যায় খুবই কম। ভালোবাসা নিয়ে অনেক লেখালেখি হলেও জীবদ্দশায় প্রেমিক-প্রেমিকরা প্রকৃত ঘটনা খুব একটা তুলে ধরতে পারেন না। হয়তো অনেক সময় জানাজানি হয়ে তুলকালাম হয়। অনেক ক্ষেত্রে মিলনও হয়। কিন্তু ভালোবাসার পাত্র-পাত্রীরা নিজেদের কথা চাউর করার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী বা সাহসী হতে পারেন না। সমাজের ভ্রুকুটির কাছে পরাভব মানতে হয়। কেউ কেউ করলেও অনেক পরে ঘটনার নির্যাসটুকু তুলে ধরেছেন। তাতে সত্যটুকু থাকে না।


যে কারণে ভালোবাসার কত কত ঘটনা আড়ালে পড়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়। এ সমাজে ভালোবাসাকে খুব একটা সম্মতি দেওয়া হয় না। নিজে প্রেম করেও অন্যের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে কোনো যুক্তির প্রয়োজন হয় না। তারপরও যেটুকু প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তা কেবলই অবিবাহিতদের। বিবাহিতদের ভালোবাসাকে দেখা হয় পাপ হিসেবে। যেন বিবাহিত হয়ে গেলে হৃদয়টা পাথর হয়ে যায়। তার আর কাউকে ভালো লাগতে পারবে না। ভালোবাসা থাকবে না। অবদমিত ভালোবাসা নিয়ে কাটাতে হবে চিরকাল। অথচ ভালোবাসা তো একটি আবেগগত ব্যাপার। সেটা কখন, কোথায়, কীভাবে, কার সঙ্গে ঘটবে, সেটা কারো পক্ষে বলা সম্ভব নয়। দেশবরেণ্য শিল্পী রুনা লায়লার একটি জনপ্রিয় গান তো এমন, ‘প্রেমের এই ফাঁদ পাতা ভুবনে কে কোথায় ধরা পড়ে কে জানে’। পরকীয়া ভালোবাসা তো তেমন একটি। এটি এমন একটি বিষয়, একে স্বীকার করা যায় না। আবার অস্বীকার করারও উপায় নেই। পরকীয়া ভালোবাসা স্বীকৃতি পেয়েছে লেখকদের কলমে। লোকসাহিত্যের অন্যতম আকর্ষণ তো পরকীয়া প্রেম। বৈষ্ণব শাস্ত্রের মতবাদই তো এটি। মরমী কবিরা তো এর চর্চা করে এসেছেন। বাউল লালন শাহও ছিলেন এর অনুসারী। যুগে যুগে বন্দিত হয়েছে পরকীয়া প্রেম। কাব্যে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে। বাস্তবে এমনটি হলে অনেকেরই কুঁচকে যায় ভ্রু। তারপরও থেমে নেই পরকীয়া। বরং অতীতের তুলনায় অনেক বেশি বেড়েছে। আড়ালে, আবডালে, গোপনে চলছে সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ এই প্রেম। এর সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়। সমাজের চোখে অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া পরকীয়া প্রেম নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলা সম্ভব হয় না। জানা যায় না এই প্রেমের একান্ত কথামালা। অথচ এ নিয়ে কোথাও কিছু জানা গেলে কিংবা লেখা হলে তাতে কারো আগ্রহের কমতি থাকে না। তবে পরকীয়া প্রেমের কারণে ঘটেছে অনেক নোংরামিও। অবশ্য এমনটি তো সবক্ষেত্রেই ঘটে। তাতে কি থেমে আছে কোনো কিছু? আধুনিক কবি তো সাহসিকতার সঙ্গে লিখেছেন, কী হবে বাড়ি ফিরে?/তার চেয়ে রোদ মাখি ছায়া মাখি/সবুজ ঘাসেদের ভালবাসায় বসি দু’দণ্ড, চলো।/অথবা হেঁটে বেড়াই নির্জন কোনও বিকেলের বুক/আমার আঙুলে লেগে থাকুক তোমার আঙুলের সুগন্ধী।/কী হবে সংসার খেলে?/বেহিসাবি হয়ে উড়িয়ে দিই সব কৃপণতা, কিছু সময়/চলো, পৃথিবী ভুলে ভালবাসা মাখি অল্পখানি, নিস্পাপ দু’জনে।/কী হবে ভয় পেয়ে?/ ঝড়ের হাওয়া এলই বা মৌসুমির মতো/শক্ত হৃদয়ে ধরে থেকো প্রেম/গভীর হোক ভালবাসা/জয় করে দু’জনার কঠিন সময়। (পরকীয়া/সমিত ভৌমিক)। প্রেম গড়ে ওঠতে পারে নানাভাবে। তবে ইদানিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে প্রযুক্তি। এখন তো প্রেম চলাকালে টেলিফোন, মোবাইলে কথা হয় দিনের পর দিন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দেখা-সাক্ষাতে হয় কত না কথা। আবেগী সেই কথামালা হারিয়ে যায়। কবির ভাষায় : ‘আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি/ টেপ করে রাখলে/ পৃথিবীর যে-কোনো গীতি কবিতার/ শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন হতে পারতো।’ (প্রেমের কবিতা/মহাদেব সাহা)।


দু:খজনক হলেও সত্যি, চাইলেও সে কথাগুলোকে এখন আর পাওয়া যাবে না। তবে আগামীতে প্রযুক্তির যখন আরো জয়জয়কার হবে, তখন হয়তো এ কথাগুলোকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে। এমনকি পাওয়া যেতে পারে ভিডিও ফুটেজও। সম্পর্ক থাকার সময় হয় অনেক মেসেজ লেন-দেন। সেগুলোও সংরক্ষিত হয় না। হলে বলা যেতে পারতো, ‘এর চেয়ে ভালো প্রেমের কবিতা আর কী লেখা হবে’। কথোপকথন, চ্যাটিং ও নেটের মাধ্যমে যে চিঠিগুলো বিনিময় হয়, সেগুলো একদমই অকিঞ্চিৎকর নয়। তা প্রকাশিত হলে অনুধাবন করা যেতে পারতো সম্পর্কের উত্থান-পতন। তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠতে পারতো হাল আমলের ভালোবাসার গতি-প্রকৃতি। সমাজবিদরা এ থেকে পেতে পারতেন ভাবনার হরেক উপাদান। অতীতে লেখা ভালোবাসার গোপন চিঠিগুলো এখন কত গুরুত্ব নিয়ে প্রকাশিত হয়। গবেষণা হয়। অথচ একান্ত কথাগুলো, ইন্টারনেট কেন্দ্রিক নিভৃতের লেখাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও কবি নির্মলেন্দু গুন অপ্রকাশিত প্রেমের মহিমাই ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করেন, ‘যেসব নারীকে আমি গোপনে ভালোবেসেছি, তাদের সঙ্গে/আমার কখনও বিচ্ছেদ ঘটেনি।/ পক্ষান্তরে আমার প্রকাশিত প্রেমসমূহ/পূর্ণ হয়েছে বেদনায়, বিচ্ছেদে।/তাই মনে করি, প্রকাশিত প্রেমের তুলনায় অপ্রকাশিত//গোপন প্রেমই ভালো।/যাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করবে, তাকে আমি গোপনে/ভালোবাসবো।/যাকে ভালোবাসি তাকে কখনও তা জানতে দেবো না।/ আমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করার/কোনো সুযোগই সে পাবে না।/আমি তাকে ইচ্ছামতো ভালোবাসবো।/যতদিন খুশি, যতবার খুশি ভালোবাসবো।/এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর থেকে আমি ভালো আছি। শুধু/ভালো নয়, খুব ভালো আছি।/প্রেম নিয়ে আমার সকল উদ্বেগও উৎকণ্ঠার অবসান হয়েছে।/ প্রিয় নারীদের ভালোবেসে আমি এখন পরম স্বস্তিতে আছি/আমার আর কোনো ভয় নেই। প্রকাশ্যে কিংবা অপ্রকাশ্যে যেভাবেই হোক না কেন, গভীর গোপন নিষিদ্ধ ভালোবাসাকে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। বরং জীবন যত কঠিন হচ্ছে, অসন্তুষ্টি যত বাড়ছে, বাড়ছে অপ্রাপ্তি, সম্পর্কগুলো তত বেশি বিস্তার ঘটছে। নানাভাবে মেলছে ডাল-পালা। বাড়ছে নিষিদ্ধ প্রেমের প্রলোভন। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো কোনো বাধাই যেন আটকে রাখতে পারছে না, ‘ভালোবাসা পেলে সব লণ্ডভণ্ড করে চলে যাব/যেদিকে দু’চোখ যায়’।

বৃহস্পতিবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে

যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই চরণ বুকের মধ্যে গুঞ্জরণ তুলছিল। প্রেক্ষাপটটা তখন এমনই ছিল। আসি আসি করছে সন্ধ্যা। যদিও সংগীত কিন্তু তখনও থেমে যায় নি। বরং ভিন্ন ভিন্ন সুরের আলাপনে পরিবেশটা হয়ে ওঠে মাধুর্যময়। দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের কলকাকলি। নদীর মৃদু সুরধুনীধারা। মানুষের কলরোল। ব্রহ্মপুত্র নদের মধ্যিখানে শম্বুকগতিতে বয়ে চলেছে আমাদের নৌকা। কোথাও যাবার কোনো তাড়া নেই। সময়টাকে তারিয়ে


তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। দেখছিলাম চারপাশের নৈসর্গিক সৌন্দর্য। চলমান স্বচ্ছ পানি। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। পাখিদের ক্লান্ত উড়াউড়ি। নদীতে পর্যটনশীল পালতোলা নৌকা। দুই পাশে সবুজের সমারোহ। ভ্রমণপিয়াসীদের ছোটাছুটি। কেউ কাশবনের খোঁজে। কেউবা ক্যামেরায় প্রিয় কোনো মুহুর্ত বা মনের রাখার মতো ফ্রেমের সন্ধানে। নদীর তীরে কত রকম কারুকাজ। প্রকৃতি নামক কুম্ভকার যেন সাজিয়ে দিয়েছে মাটির তৈরি তৈজসপত্র। মাটির আস্তরণ দেখে বোঝা যায়, পলি জমে জমে গড়ে ওঠেছে এই ভূখ-। একটুখানি ভিতরেই গ্রামীণ পরিবেশ। প্রকৃতির অবারিত সান্নিধ্য। উড়ছে প্রজাপতি। একটু একটু করে নিভে আসছিল আলো। নদীর পানিতে নানান রঙের খেলা। পরিবেশটা হয়ে ওঠে মায়াবী। আলো-আঁধারিতে হঠাৎ ভেসে আসে নারী কণ্ঠে সুরেলা আওয়াজ। নদীর এই নির্জনতায় নিজকে উজাড় করে দিয়ে কে গায় এমন গান? সুরটা খুব পরিচিত মনে হচ্ছিল। গানের কলিগুলো ধরি ধরি করেও ধরা যাচ্ছিল না। ঢেউ হয়ে দুলছিল। কানটাকে অনেক বেশি সজাগ করেও নাগাল পাওয়া যাচ্ছিল না। গানটা একটু একটু দূরে সরে যেতে থাকে। শিল্পীকে এক পলক দেখার জন্য মনটা আকুলি-ব্যাকুলি করলেও ইচ্ছেটা অপূর্ণ রয়ে যায়। অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে ফিরতে হয় নদীতটে। কূলে ফিরে আসার পর সে এক অভাবিত দৃশ্য। জোছনায় প্লাবিত চারপাশ। কেমন মোহময় হয়ে ওঠেছে নদী, নদীর তীর আর জয়নুল উদ্যান। উদ্যানের বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে ঝরছে আলোর বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে থাকেন বিনোদনপিয়াসীরা। কেউ চাতালে বসে,


কেউ ঘাসে শুয়ে ¯œাত হচ্ছিলেন জোছনায়। জোছনাগ্রস্ত হওয়ার চমৎকার একটি পরিবেশ। সঙ্গে মাতাল সমীরণ। আর গাছের ফাঁকে ফাঁকে নাচতে থাকে জোনাকি। ময়মনসিংহ শহরটা মনটাকে বেশ রাঙিয়ে দিয়েছে। শহরের রূপ আগের তুলনায় বেশ খোলতাই হয়েছে। বদলে গেছে দেশের অন্যতম পুরানো শহরটি। শহরে ঢুকলেই পরিবর্তনটা ভালোই চোখে পড়ে। শহরটিকে সাজিয়ে তোলার জন্য একটা সযতœ প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে নান্দনিক স্থাপত্য। তাতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক
সময়ের নানান বিষয় স্থান করে নিয়েছে। ভাস্কর্যগুলো সহজেই দৃষ্টি কেড়ে নেয়। এমনিতেই এই শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতির সুখ্যাতি রয়েছে। এক তসলিমা নাসরিনই তো কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরো দুনিয়া। শহরের বেশ কিছু স্থাপনাও মন কেড়ে নেয়। তাতে অনুুধাবন করা যায় পুরনো সময়কে। মনটা নস্টালজিক হয়ে ওঠে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত শশী লজ অর্থাৎ একসময়ের মহারাজ শশীকান্ত আচার্যের বাগানবাড়িটি আকৃষ্ট না করে পারে না। ৯ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত শতাধিক বছরের পুরানো এই বাড়িটি এখন তার আভিজাত্য ও জৌলুশ একটুও হারায় নি। বাড়িটি দেখলেই মনে হবে, এটি কোনো রাজা বা জমিদারের বাড়ি। মূল ফটকে আছে ১৬টি গম্বুজ। ভবনের সামনে রয়েছে বাগান। তাতে শোভা পাচ্ছে ফুল ও দুর্লভ সব গাছ-গাছালি। বাগানের অন্যতম আকর্ষণ শ্বেতপাথরের ফোয়ারা। তার মাঝে আছে গ্রিক দেবী ভেনাসের স্বল্পবসনা ¯œানরতা মর্মর মূর্তি। এটি যেন ইউরোপীয় ঘরানার কোনো ভাস্কর্য। বুকের মধ্যে ছড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের আবেশ। কড়া রোদ মাথায় নিয়ে যখন ভবনটিতে যাই, তখন কেউ আপ্যায়িত করার জন্য উপস্থিত ছিলেন না। যে কারণে বাড়ির একদম ভিতরেও প্রবেশাধিকার ছিল না।

বোধকরি মূল ভবনে সর্বজনকে এখন ঢুকতে দেওয়া হয় না। শশী লজ অবশ্য দীর্ঘ দিন মহিলা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাইরে থেকে বাড়িটাকে যতটা দেখা যায়, ততটাই অবলোকন করি। তাতেই মুগ্ধ হয়ে যাই। অচিরেই এটি দর্শনীর বিনিময়ে উম্মুক্ত করা হবে বলে জানা যায়। ময়মনসিংহের সার্কিট হাউজ এলাকাটি বেশ জমজমাট। পুরো এলাকায় আছে বনেদিয়ানার ছোঁয়া। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও পুরানো দুই ক্লাব ময়মনসিংহ মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ও পন্ডিতপাড়া ক্লাব সহ বিভিন্ন ক্লাবের অবস্থান সার্কিট হাউজ মাঠের লাগোয়া। এ এলাকাটিকে অভিহিত করা হয় ক্রীড়া পল্লী হিসেবে। এই মাঠ থেকেই ওঠে এসেছেন জাতীয় পর্যায়ের অনেক নামজাদা ক্রীড়াবিদ। উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ফুটবলার অভিলাষ ঘোষ, নগেন দে, রাখাল মজুমদার, পাখী সেন, মোশাররফ হোসেন কালা, রজব আলী, অহি গুহ রায়, জ্যোতিষ কর, জগজীবন দত্ত, গণেশ ঘোষ, পরেশ মুখার্জি, নিধু মজুমদার, খালিক, দেবীনাশ, হালিম, কিবরিয়া বাবুল, মিলু প্রমুখ। ক্রিকেটার রামচাঁদ গোয়ালা, বেলায়েত হোসেন বেলাল, আজহার হোসেন, অলোক চক্রবর্তী, হারুনুর রশিদ লিটন, সাইফুল ইসলাম, মাহববুল আলম সেলিম, শরীফুল হক প্লাবন, সানোয়ার হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, শুভাগত হোম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। মুক্তাগাছার জমিদার সূর্যকান্ত আচার্যের নামে ১৯১৫ সালে প্রবর্তন করা হয় দেশের অন্যতম পুরানো টুর্নামেন্ট সূর্যকান্ত শিল্ড। দীর্ঘ দিন এই টুর্নামেন্টটি সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এই মাঠে ফুটবল খেলেছে ব্রিটিশ ফুটবল দল ইসলিংটন কোরিন্থিয়ান, কলকাতা মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব সহ বিখ্যাত অনেক ক্লাব ও খেলোয়াড়রা। মহারাজা ট্রফি নামে আয়োজন করা হয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। ক্রীড়া ঐতিহ্যের সেই ধারা এখনও অব্যাহত আছে। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাঠটি ক্রীড়াবিদদের পদচারণায় সরগরম থাকে। কেউ ফুটবল খেলছেন। কেউবা ক্রিকেট। পাশেই সাহেবিয়ানা নিয়েই আছে সাহেব কোয়ার্টার। সরকারি কর্মকর্তাদের এই আবাসিক এলাকাটিও তার অতীতের ঐতিহ্য অটুট রেখেছে। বিশাল চত্বর নিয়ে এক একটি বাসা। চারপাশে সবুজের আচ্ছাদন। নিরিবিলি পরিবেশ। যেন স্বর্গীয় কানন। সাহেব কোয়ার্টারের দৃষ্টিনন্দন পার্কটি এখন শহরের প্রধান আকর্ষণ। ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই পার্কটি হয়ে ওঠেছে বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক সময়ে পার্কটিকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। এর নামকরণ করা হয়েছে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল উদ্যান’। কত যে গাছগাছালি। বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। তাতে আছে ফল গাছ। ঔষধি গাছ। জানা-অজানা রকমারি গাছ। ঢেকে দিয়েছে রোদেলা আকাশটাকে।

সবুজের এই মনোরম আচ্ছাদন পার্কটির শোভা অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। আছে বিভিন্ন ডিজাইনের আধুনিক চাতাল। ছায়াতরু ছাড়াও নির্মাণ করা হয়েছে শেড। ফোয়ারা। ব্যায়ামাগার। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড। অনায়াসেই যে কাউকেই আকৃষ্ট করবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতনদের কাছে এটি উপভোগ্য একটি স্থান। ভোরের আলো ফোটার আগেই পার্কটি জমজমাট হয়ে ওঠে। কেউ হাঁটছেন। কেউ দৌড়াচ্ছেন। কেউবা এক্সারসাইজ করছেন। বিশুদ্ধ হাওয়ায় নিশ্বাস নিচ্ছেন বুক ভরে। কেউ কেউ সেরে নিচ্ছেন অভিসার। ধুমছে আড্ডাও চলছে। কাউকে কাউকে দেখলাম, বাসার কাজ দিব্যি পার্কে বসে সেরে নিচ্ছেন। বিকেল হলে তো রীতিমতো মেলা বসে যায়। কেউ নৌকায় ঘণ্টা চুক্তিতে নদীতে ঘুরতে ঘুরে বেড়ান। কেউ হাঁটতে আসেন। কেউ ¯্রফে ঘুরতেই আসেন। পার্কে চা-নাস্তা, চটপটি, ঝালমুড়ি সহ আছে হরেক খাবারের আয়োজন। নদীর তীরটি ব্লক দিয়ে বাঁধাই করা। তীর বেয়ে চলে গেছে সিমেন্টের দীর্ঘ হাঁটা পথ। সেই পথ বেয়ে অনেকটা পথ চলে যাওয়া যায়। পার্কে আয়োজন করা হয় পহেলা বৈশাখ সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। নদীর তীর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাওয়া যায়, গড়ে তোলা হয়েছে ‘বিপিন পার্ক’। পার্কটি বেশ আধুনিক। নির্মিত এই পার্কটির নামকরণ করা হয়েছে ময়মনসিংহ পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান বিপিন সেনের নামে। এই পার্কটিও সারাদিনমান মুখরিত থাকে। পুরানো ব্রহ্মপুত্রের নদের তীরে চার দশকের বেশি সময় আগে গড়ে তোলা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা। গড়ে তোলার সময় জীবিত ছিলেন খ্যাতিমান এই চিত্রশিল্পী। এটি প্রতিষ্ঠা ছিল তাঁর অন্যতম একটি স্বপ্ন। তিনি ছিলেন বৃহত্তর ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জের সন্তান। ব্রিটিশ আমলে গড়ে তোলা একটি দোতলা বাসভবনে গড়ে ওঠেছে এই সংগ্রহশালা। ছায়াবীথির মাঝে সংগ্রহশালাটি শিল্পরসিকদের প্রলুব্ধ করে থাকে। এখানে সংরক্ষিত আছে শিল্পীর উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম। এছাড়াও আছে শিল্পীর ব্যবহার্য কিছু নিদর্শন। অবশ্য চাইলে সংগ্রহশালাটি আরো সমৃদ্ধ করা যেতে পারে। হালে সংগ্রহশালার পারিপার্শ্বিক পরিবেশটি মনোরম করে তোলা হয়েছে। সংগ্রহশালার সামনেই স্থাপন করা হয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ ভাস্কর্য। সামনের উদ্যানটি ঢেলে সাজানোর কারণে এর সৌন্দর্য অনেকখানি বেড়ে গেছে। শহরের কেন্দ্রে গাঙ্গিনারপাড় মোড়ের শাপলা স্কোয়ারটি সদা ব্যতিব্যস্ত থাকে। একই সারিতে প্রেস ক্লাব, বইয়ের দোকান, কফি হাউজ, ‘সারিন্দা’র মতো পশ খাবারের দোকান সহ কেনাকাটার জন্য এলাকাটি সারাক্ষণই জমজমাট। স্টেশন রোডের ‘কৃষ্ণা কেবিন’-এর মিষ্টির বেশ কদর আছে। চলার পথে অনেকের সঙ্গে কথায় কথায় জানা যায়, ময়মনসিংহ শহরটির সৌন্দর্য ও শোভা বর্ধনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন তরুণ মেয়র মো. ইকরামুল হক টিটু। এ ক্ষেত্রে তিনি এগিয়ে চলেছেন মহাপরিকল্পনা নিয়ে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একপাক ঘুরে না আসলে ময়মনসিংহ শহরটি অসম্পন্ন রয়ে যায়। বিশাল এই চত্বরটি কৃষি শিক্ষার পূর্ণাঙ্গ একটি প্যাকেজ। এটিকে বলা যেতে পারে আধুনিক একটি গ্রাম। কী নেই? পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। আছে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য। আছে সবুজের বিস্তৃত অরণ্য। ফল-ফুল-গাছগাছালি-শাকসব্জি-মাছের পুকুর-ফসলের জমি। এসব নিয়ে চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। আছে পাখির কলতান। এমনকি দেখা যায় বকও। রাতের বেলা বিশ্ববিদ্যালয়টি যে নিঝুম গ্রাম হয়ে যায়, সেটা অনুমান করা যায়।


আছে রোমান্টিক নির্জনতা, যেখানে শহীদ কাদরীর কবিতার মতো ‘প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে’। তবে হেঁটে হেঁটে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়টি একদিনে পরিদর্শন করা সহজ কাজ নয়। সেক্ষেত্রে একটি অটোরিক্সা একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত ছুটিয়ে নিতে পারে। সেটি হতে পারে আনন্দময় এক ভ্রমণ। ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব খুব বেশি নয়। যাঁরা নতুনত্ব ও বৈচিত্র্যপিয়াসী তাঁরা চাইলেই চট করে শহরটিতে ঘুরে আসতে পারেন। যতটা শুনেছি, সেই সত্তর দশকের শেষদিকে তো কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঢাকা থেকে গিয়ে প্রেম করতেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে। অনুরূপভাবে তসলিমাও রুদ্র’র সঙ্গে দেখা করার জন্য ছুটে আসতেন ঢাকায়। আর এখন তো অনেক উন্নতি ঘটেছে যোগাযোগ ব্যবস্থার। যাতায়াতে খুব বেশি সময়ও লাগে না। সকালে গিয়ে সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বিকেলেই ফিরে আসা যায়। বেড়ানোটা নেহাত মন্দ হবে না। ব্রহ্মপুত্র নদকে কেন্দ্র করে যেভাবে চিত্ত-বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে, তা দেখে একরাশ আক্ষেপও হয়। আমরা আমাদের প্রধান একটি সম্পদ বুড়িগঙ্গা নদীটিকে ক্রমান্বয়ে রীতিমতো হত্যা করে চলেছি। অথচ এই নদীটিকে ঘিরে কত কিছুই না করা সম্ভব। এটি হতে পারে ঢাকা শহরের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। ময়মনসিংহ যদি পারে, তাহলে রাজধানী হয়েও ঢাকা কেন পারবে না? ময়মনসিংহ ঘুরে আসার পর এ প্রশ্নটি মাথার মধ্যে অহর্নিশ ঘুরপাক খাচ্ছে।

সোমবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৬

মেঘালয়ের কোলে জোছনা ও জোনাকি



এই শহর আমাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিষণ্ন করে তোলে। নানা জট, নানান জটিলতা আর সম্পর্কের টানাপড়েনে বড্ড হাঁপ ধরে যায়। মনের মধ্যে সর্বদাই একটা পালাই পালাই ভাব। কিন্তু কোথাও পালানো হয় না। চাইলেও এ শহর ছেড়ে যাওয়া হয় না। আসলে আলসেমির কারণে চেনা ছকের বাইরে কোথাও যেতেও ইচ্ছে করে না। তারপরও বেশ কিছু দিন ধরেই বুকের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে থাকে, ‘দূরে কোথায়....... দূরে..... দূরে...’। সব বন্ধন ছিন্ন করে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার জন্য মনটা ভীষণভাবে আইঢাই করছিল। আর বুকের মধ্যে যখন কোনো কিছু চেপে বসে, সেটা থেকে পরিত্রাণ না পেলে স্বস্তিও মেলে না। আর এই স্বস্তির জন্যই যেখানে মেঘ আছে, যেখানে বৃষ্টি আছে,
যেখানে পাহাড় আছে, আছে নদী-নালা, আছে জোছনা-জোনাকি, তেমন কোথাও যাওয়ার জন্য মন ছুটে যায়। ছুটে যাওয়া মনটাকে তো আর আটকে রাখা যায় না। আকাশে জোছনা উঁকি মারতে দেখে মনে হলো ঘুরে আসা যাক ‘জোছনা ধরার কারিগর‘ হুমায়ূন আহমেদ-এর জন্মভূমিতে। তাঁর লেখায় তো ফুটে ওঠেছে নেত্রকোনার মানুষের জীবনযাপন। তাতে সারল্য যেমন আছে, আছে গরলও। সেই মানুষদের কাছ থেকে দেখার একটা ইচ্ছে তো ছিলই। তাছাড়া নেত্রকোনারই কৃতী সন্তান ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী ’ কবি নির্মলেন্দু গুণ আর প্রেমের কবি হেলাল হাফিজ। এই মাটিতে এমন কী জাদু আছে? যে কারণে এই কবিরা এমন সব কবিতা লিখেছেন, যা কবিতা অনুরাগীদের মুখে মুখে ফেরে। সেটাও অনুধাবন করতে চেয়েছি। সব মিলিয়ে না দেখা ভাটির দেশটির প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করতে থাকি। যদিও তাল পাকা এই গরমে কোথাও ঘুরতে যাওয়া সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত নয়। তারপরও সব পিছুটানকে উপেক্ষা করে ‘মন চলে যায় বন্ধুর দেশে’। ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ যাওয়ার পর ভালোই হোঁচট খেতে হয়। বাস স্টেশন থেকে নির্বিকারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, আমাদের গন্তব্য সুসং দুর্গাপুর অব্দি ইদানিং কোনো বাস চলাচল করে না। রাস্তার গতিক নাকি মোটেও সুবিধের নয়। যেতে হবে ভেঙে ভেঙে। বাধ্য হয়ে জারিয়া পর্যন্ত সিএনজি রিজার্ভ করতে হয়। কিছু দূর যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, কত ধানে কত চাল।

এ রাস্তায় চলাচলের জন্য অদম্য সাহস আর ফিজিক্যাল ফিটনেস যে গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার, সেটা আগে জানা ছিল না। ক্যাঙ্গারুর মতো লাফিয়ে লাফিয়ে যেভাবে সিএনজি চলছিল, তাতে করে চালক মহাশয় একটু বেচঈন হলে যে কোনো অঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কখনও কখনও রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি কিনা সেটা নিয়ে বিভ্রম সৃষ্টি হয়। কোথাও ঢাউস ঢাউস গর্ত, কোথাও সংকীর্ণ পথ, কোথাও কোথাও বিমূর্ত চিত্রকলার মতো দুর্বোধ্য। সেটা বুঝতে গেলে হকচকিয়ে যেতে হয়। অবশ্য দিগন্তবিস্তৃত সবুজ, রকমারি গাছগাছালি, রোয়ানো আমন ধান, খাল-বিল-হাওর-পুকুর, বর্ষার জমে থাকা টলটলে পানি, শাপলা-শালুক, মাছ ধরার সরঞ্জামাদি, ঘাস খাওয়ায় মগ্ন গরুর পাল, উড়ে উড়ে যাওয়া মেঘের ভেলা চোখের জন্য ছিল আরামদায়ক। আর ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা/নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা’ মনটাকে ক্ষণে ক্ষণে উদাস করে দিচ্ছিল। ঘণ্টা দুয়েক অনেক লড়াই-সংগ্রাম করে পোঁছাই কংস নদের তীরে। ঘেয়ে-নেয়ে একদম একাকার অবস্থা। শরীরটা যেন ঝরনা হয়ে যায়। ঘামের সঙ্গে বালুর সংমিশ্রণে শরীর চিটচিট করছিল। পুরো এলাকায় উড়তে থাকে বালু। কংসকে এখন আর নদী বলে মনে হয় না। একসময়ের খরস্রোতা নদটি ভরাট হতে হতে নাব্যতা সংকটে ভুগছে। পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বালি আর পলি পড়ে পড়ে নদীটি তার গতিপথ হারিয়ে ফেলেছে। জারিয়া-ঝানজাইল কংস নদে বাঁধ দিয়ে নদীর উপর সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। আগেকার বেইলি ব্রিজটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর এ কারণে এ পথে স্বাভাবিক চলাচল থমকে গেছে। বালি পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারও ভালো অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। এ নিয়ে কাউকে খুব একটা বিচলিত মনে হলো না। 
 

নৌকায় কংস নদী পেরিয়ে ঝানজাইল বাজার যাওয়ার পর মনে হলো, যে পথটুকু পাড়ি দিয়ে এসেছি, সেটা তো ঢের ঢের ভালো ছিল। এখন দেখি, আমাদের সামনে অপেক্ষা করছে মরণফাঁদ। সিএনজিতে ওঠার পর প্রতি মুহূর্তে ‘বিপথে’ যাওয়ার তীব্র হাতছানি। রাস্তাঘাট ভেঙেচুরে বেহাল। একটুখানি এদিক-সেদিক হলেই ছিটকে পড়তে হবে। বালু আর কাদার সঙ্গে রীতিমতো লড়াই আর সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে করতে এগিয়ে যেতে হয়। বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িকে সাইড দিতে গেলে হৃকম্পন শুরু হয়ে যায়। আর বৃষ্টির দিনে রাস্তাঘাটের হালত নাকি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অথচ পথিমধ্যে স্থানীয় একজন আদিবাসী ভদ্রলোক জানালেন, একসময় তিনি নাকি প্রতিদিন দুর্গাপুর থেকে ঢাকায় অফিস করতেন। তাঁর কথা শুনে বর্তমানে রাস্তাঘাটের হাল দেখে তাঁর দিকে অবিশ্বাস নিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। দুর্গাপুরে ঢোকার মুখে সোমেশ্বরী নদীর উপর নির্মিত ব্রিজটিও দাঁড়িয়ে আছে হুমকি হয়ে। যাহোক, সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে পৌঁছে যাই ‘দুর্গম গিরি কান্তার’ দুর্গাপুরে। আগে থেকে নির্ধারিত জেলা পরিষদের বিবর্ণ ডাকবাংলায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই। এ এলাকার প্রধান বাহন মূলত সিএনজি, অটো রিক্সা আর মটর সাইকেল। একটি অটো রিক্সার সঙ্গে রফা করে অচেনা নেত্রকোনার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ি। চালকই আমাদের ফ্রেন্ড-ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। শুরুতেই নেত্রকোনা বুকের মধ্যে জাগিয়ে দেয় বিপ্লবের স্পন্দন।

তেভাগা টঙ্ক নানকার আন্দোলনের স্মৃতিরক্ষা কমিটির উদ্যোগে ১৯৯৩ সালে নির্মাণ করা হয়েছে ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ। শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের নেতা ও স্থানীয় সন্তান কমরেড মণি সিংহের নেতৃত্বে চল্লিশের দশকে এই আন্দোলন সংগঠিত ও পরিচালিত হয়। সেই আন্দোলন কাঁপিয়ে দিয়েছিল পূর্ব বাংলাকে। প্রতি বছর তাঁর স্মরণে আয়োজন করা হয় মণি সিংহ মেলা। নির্জন স্মৃতিস্তম্ভের পাশের পুকুরে বিশ্রাম নেওয়া হাঁসগুলো বাড়িয়ে দেয় সৌন্দর্যের খানিকটা ছটা। ফুটবল খেলা যে এখনও গ্রামের মানুষের প্রিয়, সামনের মাঠে স্থানীয় যুবকদের খেলতে দেখে সেটা বুঝতে অসুবিধা হলো না। একসময় সুসং রাজ্যের রাজধানী ছিল দুর্গাপুর। দীর্ঘকাল এ এলাকা পর্যায়ক্রমে শাসন করেন সোমেশ্বর পাঠক ও তাঁর বংশধররা। সেই স্মৃতি বহন করছে উপজেলা রোডের সুসং দুর্গাপুর মহারাজার সবুজ পরিবেষ্টিত দু’আনি বাড়ি। এই বাড়ি এখন ‘দ্য চাইল্ড প্রিপারেটরি স্কুল’। জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস হওয়ার পর রাজবংশের সদস্যরা ভারতে চলে যান। তাঁরা না থাকলেও তাঁদের নির্মিত বাড়িগুলো এখনও নজর কেড়ে নেয়। এত রঙদার বাড়ি সাধারণত দেখা যায় না। এই রঙ কি হাল আমলে করা? টিনের চালা দেওয়া বাড়ি হলেও এর সৌন্দর্য একটুও ম্লান হয় নি।

চারপাশে গাছপালা আর ফুলের গাছ। দেওয়ালে টাঙানো হিন্দু দেব-দেবতাদের ছবি। মেঘালয়-নেত্রকোনা সীমান্ত সংলগ্ন গোপালপুর এলাকা। যেতে হয় সোমেশ্বরী নদী পেরিয়ে। সবুজের বাগিচার মধ্যে দিয়ে কিছুটা পথ হাঁটতে হয়। পাশ দিয়ে পাহাড়ি ঝরনা থেকে নিঃসৃত জল নালি বেয়ে ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে। চীনা মাটির পাহাড় বেয়ে ওঠলেই দেখা যায় ভারতীয় সীমান্তের কাঁটা তারের বেড়া। তা দেখার জন্য বিকেল হলে দলে দলে মানুষ ছুটে আসেন। এ এলাকায় গারো ও হাজং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আধিপত্য। তাঁরা নিজেদের মতো করে বসবাস করছেন। অপ্রয়োজনে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের সঙ্গে খুব একটা মেলামেশা করেন বলে মনে হলো না। বিভিন্ন এনজিও এখানে বেশ সক্রিয়। আদিবাসী মেয়েরা শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার জন্য দূর-দূরান্তের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছুটে যায়। কেউ ছাতা মাথায় হেঁটে হেঁটে। আবার কেউ কেউ সাইকেল চালিয়ে। সবাই লক্ষ্যে অবিচল। বিকেল বেলায় সোমেশ্বরী নদীর কাছাকাছি একটি গ্রামের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে দেখতে পাওয়া যায় গ্রামীণ দৃশ্যপট। এক কিশোরীর নৌকা বেয়ে চলা, দুটি গরুর শক্তির লড়াই, ভাসান জাল দিয়ে মাছ ধরা, নিজস্ব কায়দায় শিশুকোলে আদিবাসী তরুণীর হেঁটে চলার চিরায়ত প্রতিচ্ছবি। যেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠা জীবন্ত সব চিত্রকাব্য। সেইসঙ্গে দূরের পাহাড়ের হাতছানি।


যদিও মৃদু মন্থরে সন্ধ্যা নেমে আসায় বেশি দূর যাওয়া হয় নি। নেত্রকোনার আনন্দ ও গর্ব সোমেশ্বরী নদী। ভারতের মেঘালয়ের বৃষ্টি আর ঝরনাধারা থেকে এ নদীটির উৎপত্তি। এ নদীটি দু’হাত বাড়িয়ে আলিঙ্গন করে রেখেছে নেত্রকোনার অনেকখানি এলাকা। কোথাও কোথাও মিলেছে কংস নদের সঙ্গে। আটরাখালি ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কিছুটা দূর থেকে দেখতে পাওয়া যায় শীর্ণকায় নদীটির বয়ে যাওয়া। দেখা যায় অস্তগামী সূর্যের রক্তিম আভা। এ দৃশ্য দেখার জন্য ব্রিজে ভিড় বাড়তে থাকে। বৈকালীন আড্ডার জন্য জায়গাটি অনেকের কাছেই প্রিয়। তবে নদীটিতে পানির একদমই প্রবাহ নেই। শাওন মাসেই কেবল নদীটি ফিরে পায় তার যৌবনজোয়ার। দুর্গাপুরের পরিচিত একটি স্থান বিরিশিরি। এখানে উপজাতীয় সংস্কৃতি চর্চার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি। আলো-আঁধারিতে এই একাডেমিতে যাই। কিন্তু রাতে এর কোনো কার্যক্রম ছিল না। ধবধবে জোছনায় বিরিশিরিকে মনে হতে থাকে মায়াপুরী। একটু অন্ধকার হলেই জোছনায় মাখামাখি হয়ে যায় পুরো সুসং দুর্গাপুর। কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মতো ‘আমি ঘর ছাড়িয়া বাহির হইয়া/জোছনা ধরতে যাই/হাত ভর্তি চান্দের আলো/ধরতে গেলে নাই।’ জোছনায় অবগাহন করার জন্য রিক্সা নিয়ে ছুটে যাই সোমেশ্বরের কূলে আটরাখালি ব্রিজে। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল চারপাশ। নদীর চরে ঝিকিয়ে ওঠছিল আলোকরশ্মি। কিন্তু মটর সাইকেলের হর্ন আর ক্ষণে ক্ষণে উটকো আলোর কারণে ধ্যানস্থ হয়ে জোছনার সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছিল না। ফিরে আসি আমাদের আবাসস্থলে। ঈদগাহের পাশ দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে চলে গেছে পিচঢালা অপ্রশস্ত পৌরসভা সড়ক। চারপাশ নির্জন। নিরিবিলি। নিঃশব্দ। মাথার উপর কেবল চাঁদের বাঁধ ভাঙা হাসি। ঝরনাধারার মতো সেই হাসিতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে হৃদয়। রাস্তার পাশের ঝোঁপের আড়ালে দেখতে পাওয়া যায় জোনাকিও। মনের আনন্দে ছোটাছুটি করছে। জোছনা আর জোনাকির মধ্যে দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো হেঁটে যেতে থাকি। কী যে মোহময়। কী যে মায়াময়। কী যে মুগ্ধকর। সঙ্গী সুধীর কৈবর্ত দাসের সুরেলা কণ্ঠে পরিবেশিত হতে থাকে একটির পর একটি মন কেমন করা গান। পরিবেশটি আরো বেশি মাদকতাময় হয়ে ওঠে। রাত যত গভীর হচ্ছিল, আমরা ততই যেন জোছনাগ্রস্ত হচ্ছিলাম। ছুটতে থাকি আলেয়ার পিছনে। কিন্তু অনেক দূর যাওয়ার পর আমাদের হুস হয়। আরে! আমরা তো অনেকটা পথ চলে এসেছি। অথচ এ পথ চিনি না। এর গন্তব্যও জানি না। এই শহরে আমরা নবাগত। এসেছি মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে। এতটা ঝুঁকি নেওয়া কি ঠিক হলো? এমন প্রশ্ন মনে উদয় হতেই বাধ্য হয়ে ফিরে আসতে হয়। তাতে অবশ্য খুব একটা আক্ষেপ ছিল না। আমরা যতটা পারি জোছনায় ভিজেছি। উপভোগ করেছি জোছনার সান্নিধ্য।

পরের দিন সকালে তেরী বাজার থেকে নৌকায় সোমেশ্বরী নদী পাড়ি দেই। এ সময় নদীটিকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। স্রোতহীন নদী। বর্ষাকালে নদীটি ভরাট থাকলেও এরপর নদীটিতে টান পড়ে। তখন হারিয়ে যায় এর রূপ-রস-গন্ধ। নদী থেকে উত্তোলন করা হচ্ছে মেঘালয়ের পাহাড় থেকে ভেসে আসা কয়লা, নুড়িপাথর ও বালি। কয়লা আর বালি এ এলাকার প্রধান সম্পদ হয়ে ওঠেছে। নদী পেরিয়ে অপর পাড়ের শিবগঞ্জ বাজারে যেতে হলে হাঁটু পানিতে নেমে পড়তে হয়। জুতা খুলে আর প্যান্ট গুটিয়ে নেমে পড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জলধারায়। তীব্র তাপদাহেও শীতল অনুভূতি হয়। জুড়িয়ে যায় মনপ্রাণ। মনে পড়ে যায় শৈশবে পড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই অমর কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’ : ‘আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে/বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে/পার হয়ে যায় গরু, পার হয় গাড়ি/দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি/চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা।’ বাস্তবিকই এই কবিতার সঙ্গে ভাদ্রের সোমেশ্বরী নদীর একটুও অমিল নেই। শিবগঞ্জ বাজারে যেন আমাদের অপেক্ষায় মটর সাইকেল নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে আছেন। যাওয়ামাত্র আমাদের নিয়ে ছুটে চলার জন্য তর সইছে না। দরাদরি করে চেপে বসি মটর সাইকেলে। নেত্রকোনার অন্যতম আকর্ষণ সাদা মাটির পাহাড়। মেঠোপথ দিয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলে আমাদের বাহন।

দুর্গাপুর উপজেলা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে বিজয়পুর গ্রামে ব্যতিক্রমধর্মী এই পাহাড়। যেন বিশাল বিশাল পাথরের চাঁই একবুক দুঃখ নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে। নীরবে করে চলেছে অশ্রুপাত। এ অশ্রু থেকেই যেন সৃষ্টি হয়েছে জলাশয়ের। সামনে দিয়ে বয়ে যাওয়া শান্তশিষ্ট নীল পানির আধারটি মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। শীতকালে এই পানির রঙ হয়ে ওঠে নীলনয়না নারীর মতো। তখন নাকি একদমই চোখ ফেরানো যায় না। পাহাড়ে রয়েছে অনেক অবগুণ্ঠিত গুহা। রহস্যময়তার কারণে সেদিকে কেউ পা মাড়ান না। সাদা মাটি সিরামিক শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ কারণে এর চাহিদা অনেক। তাই কোনো বিচার-বিবেচনা ছাড়াই পাহাড় ও টিলা কেটে কেটে সংগ্রহ করা হয় এই মাটি। এমনকি মাটি কেটে নিয়ে অকারণেই রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয়েছে। ফলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সৌন্দর্যের এই আকরখনি। মানা হচ্ছে না আদালতের নির্দেশনাও। যা কিছু অমূল্য সম্পদ, তা নিষ্ঠুরভাবে সংহার করার জন্য আমরা যেন মুখিয়ে থাকি। বিজয়পুরে ঢোকার মুখে বহেড়াতলীতে স্থাপন করা হয়েছে টঙ্ক ও কৃষক আন্দোলনের নেত্রী হাজংমাতা শহীদ রাশিমণির স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি প্রতিরোধ আন্দোলনে সৈন্যদের গুলিতে নিহত হন রাশিমণি ও তাঁর সহযোদ্ধা সুরেন্দ্র হাজং। তাঁদের স্মরণে প্রতি বছর স্মৃতি সৌধ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় রাশিমণি স্মৃতি মেলা। এ মেলায় ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকেও অনেকেই যোগ দেন। মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কমলা পাহাড় নামে পরিচিত স্থানে শীতকালে কমলার ফলন হয়। উঁচু এই পাহাড়ে উঠতে বেশ ঘাম ঝরাতে হয়। পাহাড়ের উপর স্থাপন করা হয়েছে বড় একটি টাওয়ার। যত দূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর হাত বাড়ালেই যেন ছোঁয়া যায় মেঘালয়ের আকাশ। অনেকটা ভিতরের দিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়ে তোলা পাকা রাস্তা দিয়ে যেতে হয় রাণীখং ক্যাথলিক চার্চ। ঢোকার মুখে ডান পাশে রাণীখং উচ্চ বিদ্যালয় ও ডাকঘর।


পাহাড়ের উপর ১৯১২ সালে গড়ে তোলা সাধু যোষেফের ধর্মপল্লীতে স্বাগত জানায় যিশু খ্রিস্টের ভাস্কর্য। তাঁর কোলে একটি শিশু। চারপাশে ছড়ানো খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন স্থাপনা। আছে ধর্মপাল বিশপ হার্জ আর পাঁচ গারো হাজং আদিবাসীর ভাস্কর্য, কারুকার্যম-িত ক্যাথলিক গির্জা, সাধু যোষেফের ভাস্কর্য, মিশন পরিচালিত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের হোস্টেল। গাছ-গাছালি আর ফুলের বাগান দিয়ে পুরো চত্বরটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে, তাতে এটি হয়ে ওঠেছে ভাস্কর্যের নন্দনকানন। রোদে পুড়ে পাহাড়ের নির্জনতায় শান্তি কুটির বিশ্রামাগারে গিয়ে শরীর জুড়িয়ে যায়। সেইসঙ্গে চোখও। পেছনের গরাদে দিয়ে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় সৌন্দর্যের রাশি রাশি প্রাচুর্য। পাশ দিয়ে মন্থর গতিতে বয়ে চলেছে সোমেশ্বরী নদী। তাতে সারি সারি ডিঙি নৌকা। কয়লার সন্ধানে মগ্ন জীবিকাজীবীরা। ভারতীয় সীমানার দিকে তাকালে বুকের মধ্যে বেজে ওঠে কানন দেবীর গাওয়া কাজী নজরুল ইসলামের অমর সেই গান, ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই’। (ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল র‌্যাডক্লিফ একটু সদয় হলে কিছু পাহাড় হাতের নাগালেই পাওয়া যেত।) রৌদ্রকরোজ্বল আকাশের নিচে এক একটি মুহুর্ত যেন জলরঙে আঁকা দুর্লভ সব ছবি। একটুক্ষণের জন্যও চোখ সরাতে ইচ্ছে করে না। মনে হয়, পুরোটাই সাজিয়ে রাখি হৃদয়ের গ্যালারিতে। এমন সঞ্চয়ের জন্য এ স্থানে ফিরে ফিরে আসতে হয়।

রবিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৬

বন্ধু তোকে মিস্ করছি ভীষণ


দিনগুলো হয়তো একভাবে কেটে যাচ্ছে। দিন তো কারো জন্য অপেক্ষায় থাকে না। কিন্তু বুকের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে একান্ত কথাগুলো জমছে, সে সব কথা কারো সঙ্গে শেয়ার করা যাচ্ছে না। সব কথা তো আর সবার সঙ্গে শেয়ার করা যায়ও না। আর যায় না বলেই মানসিক একটা যাতনা নিয়ে দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছে। অপ্রকাশের বেদনা কি যে ভয়াবহ, কি যে যন্ত্রণাকর, কি যে দুর্বিষহ, সেটা বুঝিয়ে বলা যায় না। আর আমার মতো নিভৃত স্বভাবের হলে তো কথাই নেই। এমন মনোভাব হলে কি যে মারাত্মক সমস্যায় পড়তে হয়, সেটা ভুক্তভোগী না হলে অনুধাবন করা যাবে না। আধুনিক জীবনের পরিভাষায় এটাকে এক ধরনের মানসিক রোগ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এমন স্বভাবের মানুষের বন্ধুত্বের গণ্ডি নির্দিষ্ট একটা সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। তবে মনের সীমানা হারিয়ে ফেললে ‘নো ম্যান্স ল্যান্ড’-এর বাসিন্দা হয়ে যেতে হয়। যে কারণে আমি তো এখন মনের জগতে ঘুরছি অনেকটা অভিবাসীর মতো। হে বন্ধু আমার, অন্তত তুই তো আমাকে ভালো করে জানতিস। আমার যা কিছু কথা, যা কিছু আনন্দ, যা কিছু বেদনা, সবটাই তো তোর সঙ্গে সেন্সর ছাড়াই শেয়ার করতাম। নিজেকে কতভাবেই না উজাড় করে দিতাম। কোনো রাখ-ঢাক না রেখেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দিনের পর দিন। কখনও সামনা-সামনি। কখনও দূরালাপনীতে। আমার যে কথা কেউ জানে না, একমাত্র তুই জানতিস। একমাত্র তোকেই আমি নির্ভর করতে পারতাম। তোর সব কথাও তো কেবল আমি জানতাম। নাকি আর কেউ জানে? যদিও এই মুখচোরা আমি তোর কাছে যতটা অকপট, যতটা প্রাণখোলা, যতটা প্রগলভ ছিলাম, তুই কিন্তু ততটা ছিলি না। একটু বোধহয় র’য়ে-স’য়ে নিজেকে প্রকাশ করতি। আমি জানতে চাইলে বলতি, না হলে নিজ থেকে খুব একটা উৎসাহী ছিলি না।


আমি তোর কাছে যতটা বাচাল হয়ে যেতাম, যতটা খোলামেলা ছিলাম, যতটা বেপরোয়া ছিলাম, তুই কেন জানি নিজেকে একটু বেশি গুটিয়ে রাখতি। সেটা তো হতেই পারে। দু’জনের মনোভাব যে হুবহু একই রকম হবে, এমনটা তো সাধারণত হয় না। দু’জনেই যদি কথা বলতে থাকি, তাহলে কে শুনবে কার কথা? মজার ব্যাপার হলো, যে আমি কথা বলতে গেলে প্রতিনিয়ত হোঁচট খাই, সেই আমি তোর কাছে হয়ে যেতাম হাল আমলের এফএম রেডিও’র ‘কথাবন্ধু’। অনর্গল বকে যেতাম। আমার কথা যেন শেষ হতে চাইতো না। তবে অনেক কিছু আমাদের অদ্ভুতভাবে মিলে যেত। পছন্দ-অপছন্দ তো বটেই। এমনকি কথার পিঠে কথাও। মনে পড়ে, একবার বৃষ্টিভেজা বিকেলে রিক্সায় ঘুরতে ঘুরতে মুখে মুখে কবিতা রচনা করছিলাম। বিস্ময়করভাবে আমাদের কণ্ঠে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল অবিকল একই পংক্তি।


চিন্তা-ভাবনায়, জীবন যাপনে আমরা তখন ‘বন্ধনহীন গ্রন্থি’ হয়েছিলাম, যে কারণে এমনটি হতে পেরেছিল। আমি তোকেই আমার অকৃত্রিম ও প্রকৃত বন্ধু মনে করতাম। যার কাছে নিজেকে মেলে ধরা যায়। সমর্পণ করা যায়। তুই হয়তো সেটা ততটা করতি না। তা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা ছিল না। আমি তোর বন্ধুত্বটুকুই চেয়েছিলাম। সেটা আমি মনে-প্রাণে বেশ উপভোগ করতাম। যে কারণে আমাদের বন্ধুত্ব নিবিড় হতে পেরেছিল। আর বন্ধুত্বের এই ভেলায় ভেসে ভেসে আমরা কত না পথ পাড়ি দিয়েছি। এই আমি বলা যায়, জন্মের পর থেকেই এ শহরের আলো-হাওয়ায় বড় হয়েছি। কিন্তু ঘরকুনো স্বভাবের কারণে এ শহরের আগাপাছতলা আমার দেখা হয় নি। এ শহরে বরাবরই আমি অনেকটা নবাগত হয়ে ছিলাম। যদিও ইচ্ছের পাখি হয়ে শহরের এ মাথা থেকে ও মাথা আমার ঘুরে ঘুরে দেখতে সাধ জাগতো। ওই পর্যন্তই। শেষ অব্দি কোথাও যাওয়া হতো না। কিন্তু তোর কারণে এ শহরটাকে কিছুটা হলেও চিনেছি। জেনেছি।

রোদে-বৃষ্টিতে, আলো-আঁধারে কত জায়গায়ও না ঘুরেছি। কত অচেনা পথে ঘুরপাকে পড়েছি। কত জানা-অজানা জায়গায় আড্ডা মেরেছি। কত তিক্ত-মধুর অভিজ্ঞতা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষেই কত না পাগলামি করেছি। কোনো কিছুরই পরোয়া করি নি। হায়! উন্মাদনাময় সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। বন্ধু, তোর কি মনে পড়ে না? আমাদের কোনো পিছুটান ছিল না। উৎসবের দিনগুলো আমাদের কাছে অনেক বেশি রঙিন হয়ে আসতো। ঈদের দিনও দূরে দূরে কোথাও চলে গিয়েছি। আমাদের তো গন্তব্যের কোনো ঠিক-ঠিকানা ছিল না। পথে বেরিয়ে খুঁজে নিতাম আমাদের গন্তব্য। সেটা হতে পারে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব কিংবা পশ্চিম। কোথাও গেলেই হলো। আমাদের প্রিয় বাহন ছিল রিক্সা। কত দিন অকারণেই রোদে পুড়েছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি। আমাদের চলাচল মূলত এই ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল। কখনও দূরে চলে গেলে মনে হতো, বিশ্ব জয় করে ফেলেছি। সাভার স্মৃতিসৌধে গিয়ে মনে হয়েছিল, কত দূরেই না চলে এসেছি। ক্রমশ প্রসারমাণ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় গিয়ে মনে হয়েছে, ভিন্ন কোনো জগতে চলে এসেছি। ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমায় বাতাসে ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খেতে থাকা বড় বড় সবুজ ঘাস আর কাশবন তো আমরা তো আগেই দেখেছি। সাঁতার না জেনেও দুরন্ত সাহস নিয়ে মেঘলা দিনে বুড়িগঙ্গা নদীতে মনের আনন্দে নৌকায় ঘুরেছি। জোছনা রাতে নৌকাভ্রমণের মজাটাও কম ছিল না। যদিও মাঝিটা ছিল বিরক্তিকর। নাজিমউদ্দিন রোডের ‘নীরব’ হোটেলের রকমারি ভাজি-ভর্তা দিয়ে ভাত খাওয়ার সোয়াদ মুখে লেগে আছে।


ছুটতে ছুটতে গিয়েছিলাম নারায়ণগঞ্জের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘বোস কেবিন’-এ। এ দোকানের চা পান করে প্রশংসা করেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। আমরা কি সেই চা পান না করে পারি? পাগলায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ব্রিটিশ আমলের ভাসমান রেস্তোরাঁ মেরি অ্যান্ডারসনে গিয়ে নিজেদের বেশ ভিআইপি অতিথি মনে হয়েছিল। দুরন্ত গতিতে ছুটে চলা স্পিড বোটে ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খেয়েছি। তোর তো লেখকদের প্রতি একটা সফট-কর্নার ছিল। পুরানো ঢাকার বাংলাবাজারে লেখক-সাহিত্যিকদের এক সময়ের জমজমাট আড্ডাখানা ‘বিউটি বোর্ডিং’-এ গিয়েছিলাম। দেশভাগের পর গড়ে ওঠা এই বোর্ডিং-এ এখনও পাওয়া যায় পুরানো দিনের ফ্লেভার। সেখানে গিয়ে খুঁজেছি লেখকদের সান্নিধ্যের স্মৃতি। বোর্ডিং-এর হোটেলে ঐতিহ্য অনুসারে স্টিলের বড় একটা থালায় পরিবেশন করা হয় ভাত-মাছ। ক্ষুধা পেটে তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছিলাম।


সিনেমা দেখতে গিয়ে পছন্দ না হওয়ায় মাঝখানে হল ছেড়ে চলেও এসেছি। আমরা তো গানের আসরেও যেতাম। তোর পরিচিত এক শিল্পীর ঘরোয়া গানের আসরে উপস্থিত ছিলাম। বেশ মজাই হয়েছিল। একবার তো গাজীপুরের শালবনে গিয়ে ফিরতে ফিরতে বেশ রাত হয়ে যায়। কী দুশ্চিন্তায় না পড়ে গিয়েছিলাম। আরেকবার ঘুরতে ঘুরতে অনেক দূর চলে গিয়েছিলাম। ঢাকা শহর ছাড়িয়ে একদম প্রত্যন্ত এলাকায়। স্থানীয় কিছু মস্তান টাইপের ছেলে কোনো কারণ ছাড়াই আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল। তোর চোখে অশ্রু দেখেছিলাম। আমিও খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। বন্ধুদের আড্ডায় একদিন রাতের বেলা খুব অসুস্থ হয়ে তোকে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছিলাম। তুই যে কীভাবে সেই বেসামাল পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলি, সেটা ভাবলে তোর প্রতি আমার মাথা নুয়ে আসে। এটা আমি কখনই ভুলতে পারবো না। আমাদের সাহস যখন অনেকখানি বেড়ে যায়, তখন গিয়েছিলাম মুন্সীগঞ্জের মাওয়া ফেরি ঘাটে। পাড়ি দিয়েছিলাম একসময়ের উত্তাল পদ্মা নদী। দুপুরের খাওয়ার মেন্যু ছিল টাটকা ইলিশ মাছ। জমজমাট সেই ফেরি ঘাট হয়তো তো হারিয়ে যাবে। সেখানে গড়ে উঠছে দীর্ঘ পদ্মা সেতু। রয়ে যাবে আমাদের স্মৃতিটুকু।


তুই বিদেশি লেখকদের বইয়ের অনুবাদ খুব পছন্দ করতিস। সেই সুবাদে আমাকেও অনেক বই উপহার দিয়েছিস। তোর কারণেই বিদেশি সাহিত্যের কিঞ্চিৎ ছোঁয়া পেয়েছি। তুই কি এখনও আগের মতোই বই পড়িস? দুঃখজনক হলেও সত্য, বলতে গেলে বইয়ের জগতের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগই নেই। সারাদিনই তো কেটে যায় ‘শুধু দিন যাপনের, শুধু প্রাণ ধারনের গ্লানি’তে। বই আর পড়বো কখন? যদিও এটা কোনো অজুহাত হতে পারে না। তারপরও সত্যটুকু তোকেই জানাতে চাই। বৃষ্টি, জোছনা, জোনাকি, নদী, অরণ্যের প্রতি আমার মুগ্ধতার কথা তুই ভালো করেই জানিস। অথচ এসবের সঙ্গে এখন কোনো যোগাযোগ নেই। ভাবতে পারিস তুই? গান এত তীব্রভাবে ভালোবাসি, সেই গানই তো এখন খুব একটা শোনা হয় না। জীবনের সব আনন্দই এখন বিসর্জন দিয়ে দিয়েছি। তুই তো হালের আমাকে চিনিস না। অথচ তোর সঙ্গে কত কত ঘটনা। কত কত কত স্মৃতি। মনের স্মরণিকায় সব ভিড় করছে। মনে হচ্ছে, বন্ধুত্বের এই দিনে সবটাই উজাড় করে দেই। এই পরিসরে সেটা তো আর সম্ভব নয়। জন্মগতভাবেই আমি ভীষণ মুডি টাইপের। তবে তোর মুডের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে হিমসিম খেয়ে যেতাম। তুই ছিলি অসম্ভব রকমের খামখেয়ালি। এ কারণে কত কত দিন কথা হয় নি। যোগাযোগ হয় নি। তুই কিন্তু কখনই এগিয়ে আসতি না। সব সময় আমাকে উদ্যোগী হতে হতো। যেন বন্ধুত্বের যাবতীয় দায়ভার আমার একার। সেই দায় নিতে আমার দিক দিয়ে কোনো খামতি ছিল না। কিন্তু সব সময় তো একইভাবে মানিয়ে নেওয়া যায় না। মন-মেজাজও একই থাকে না। আমারও তো মান-অভিমান থাকতে পারে। দুঃখ-কষ্ট থাকতে পারে। তাই না? সেটা তুই মানতে চাইতি না। তোর দিক থেকে কখনই নমনীয়তা ছিল না। যে কারণে একটা দূরত্ব গড়ে ওঠে। একটু একটু করে সেটা যে এত বড় হয়ে যাবে, এটা আমি কোনো দিন ভাবতেও পারি নি। দেখতে দেখতে কত কত বছর পেরিয়ে গেছে। ভাবলেই একবুক দীর্ঘশ্বাস হাহাকার ছড়ায়।


আমি জানি না, তুই আমাকে মনে রেখেছিস কিনা? মনে তো হয় না। আমি কিন্তু তোকে ভুলি নি। তোর সঙ্গে যে বন্ধুত্ব, যে আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে, সেটাকেই জীবনের মূল্যবান সম্পদ হিসেবে হৃদয়ের খাজাঞ্চিখানায় সযতনে জমা রেখে দিয়েছি। সেখানে আর কাউকে হাত দিতে দেই নি। তুই কি এখনও আগের মতো আছিস? তোর নিশ্চয়ই এখন অনেক বন্ধু। নতুন বন্ধুরা কি তোর মুডের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে? খুব জানতে ইচ্ছে করে। তোকে চুপি চুপি বলে রাখি, আমি কিন্তু আর কারও বন্ধু হতে পারি নি। চারপাশে ‘কতগুলি মুখস্থ মানুষ দেখি’। কিন্তু বন্ধু খুঁজে পাই না। চাইলেই কি আর বন্ধু পাওয়া যায়?

মঙ্গলবার, ২১ জুন, ২০১৬

এমন দিনে তারে বলা যায়

কত কত দিন কদম ফুলের গন্ধ নেওয়া হয় না। তাকানো হয় না মুগ্ধ দু’চোখে। তবুও এমন বাদল দিনে মনে পড়ে যায় কদম ফুলের কথা। উন্মনা করে দেয় তার বর্ণ, গন্ধ, সৌন্দর্য। নেশাধরানো এ ফুলটি যেন আসে বর্ষার বারতা নিয়ে। বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল তো উসকে দেয় স্মৃতিকে। প্রিয়জনের হাত থেকে কদম ফুল নেওয়ার মৌতাত যেন এ জীবনে কিছুতেই কাটতে চায় না। জীবন ভারি অদ্ভুত। এর তল খুঁজে পাওয়া যায় না। কত কঠিন ও জটিল সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তবুও মনটাকে আটকে রাখতে পারা যায় না। যা হাতের নাগালের মধ্যে নেই, যা চাইলেও পাওয়া যায় না, তার জন্য মন কেমন কেমন করে। যা আছে অনুভবে, যা আছে স্মৃতিতে, যা আছে দূরে, সেটাই কেন যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে। বর্ষাকাল বোধকরি এমন। মনটাকে কেমন অচেনা করে দেয়। দুর্বল করে দেয়। ভাবাবেগে আপ্লুত করে তোলে। আকাশ ঘনকালো হলে, অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামলে, মনটা উচাটন উচাটন করে। অকারণেই ভিজে যায় ভিতরভূমি। জমে ওঠে কাব্যের পলিমাটি। উদাসী মন চলে যায় সুদূরে। ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে/আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে’। বর্ষার সঙ্গে মনের